Showing posts with label Short Story. Show all posts
Showing posts with label Short Story. Show all posts

Sunday, May 31, 2026

জাগিয়া উঠিল প্রাণ

জন্মের পর থেকেই শাকিলার বোনেরা শুনতে পায় তারা সব বোন। ইদানীং তাদের বাড়ির নাম হয়েছে ৭ বোনের বাড়ি। অনেকটা একই রকম ৭ বোন –কৃষ্ণকলি। রোগাটে পাতলা গড়ন। নাক খাড়া। চোখ পিঙ্গল বর্ণের। তার কারণ তাদের মায়ের রঙ ফর্সা এবং চোখের রঙ পিঙ্গল। অন্যদের দৃষ্টিতে ৭ বোন এক অদ্ভুত প্রজাতি, অন্য গ্রহের কেউ। যে কোন একজনকে দেখলে লোকে বলে ৭ বোনের বোন। তাদের নাম জানবার কারো আগ্রহ নেই। বড় হলেও শাকিলার বয়স মাত্র ১২ বছর। সে একটু চিন্তাশীল। অন্য বোনেরা হইচই করে, বকা খেয়ে দিন কাটায়। তাদের মাতা পিতা প্রকাশ্যেই তাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। ভাল পোশাক, ভাল খাবার তারা কোনদিন পায়নি। তাদের মা তাদেরকে বাড়ির সব কাজ ভাগ করে দিয়েছে। ঘর –দোর, আঙ্গিনা পরিষ্কার করা, ঝাড়া –মোছা  করা, রান্নার যোগাড় দেয়া, বয়সে বড় শাকিলাকে রান্নার ভার দেয়া। বাসন –কোসন পুকুর ঘাটে বসে ঘষে –মেজে পরিষ্কার করে আনা। একটা বাসন পানিতে পড়ে গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা ডুব দিয়ে চোখ লাল করে সেটাকে খুঁজে তুলে আনতে হবে। ছেলে নেই বলে গরু ছাগলের পরিচর্যা করা, বাবার জন্য খাবার নিয়ে মাঠে যাওয়া আরও কত কাজ। আর তিন ক্ষুদে বাহিনী মনের সুখে বড় বোনদের সাহায্য করে। খাওয়ার সময় শাক সবজির ভর্তা, কাঁচা লংকা সহযোগে ভক্ষণ করে। সকালের নাস্তা তাদের লবণ দিয়ে তৈরী শুকনো রুটি। তাতেই তারা অমৃতের স্বাদ পায়। 

এমন সময় একদিন সুবেহ্‌  সাদেকের সময় তাদের পরিবারে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে। তাদের ৭  বোনের একটি ভাই জন্মগ্রহন করে। শান্তির দূত, আনন্দের দূত, সাতবোনের ত্রাণকর্তা। এতদিনে পরিবারের কর্ণধারের আবির্ভাব! বাড়িতে আনন্দ জয়জয়কার। সাত বোনের নয়নের মণি। শতকাজের মাঝে তারা ভাইটিকে মাথায় করে রাখে। 

বাবার কাছ থেকে ভাল ব্যবহার তারা কোনদিন পায়নি। এবার শাকিলা একটু বড় হয়েই স্কুলে যায়। পরবর্তীতে ছোট বোনেরা যেত। বাবা খুব রাগ দেখাত। ছোট ভাইটির জন্ম হওয়ার পর বাবার মেজাজটা একটু নমনীয় হয়। 

ওরা সাত বোনই স্কুলে যায়। পড়ে সাত ক্লাসে। তারা সকলের হাসির পাত্র। কিন্তু সেদিকে ৭ বোনের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তাদেরকে সকলে সার্কাস পার্টির লোকের মত দেখে। কিন্তু পড়াশুনায় তাদেরকে কেউ পেছনে ফেলতে পারেনা। এলো বার্ষিক পরীক্ষা। ৭ বোন নিজের নিজের ক্লাসে সকলকে টপকে উপরের ক্লাসে উঠে গেল। ওদের সাফল্যে সবার ঠাট্টা – মসকরা বন্ধ হয়ে গেল।

স্কুল ছুটির পর ওরা বাড়ি এসে সব কাজ করে, ভাইটিকে দেখে, রাতে পড়া তৈরী করে। শাকিলা তাদের গাইড, তাদের মাস্টার। তাদের পিতামাতার সেদিকে খেয়াল নেই। ওদের বই নেই, খাতা নেই, কলম নেই, কাগজ নেই। শাকিলা পুরাতন বই যোগাড় করে বোনদের জন্য। যেটা নেই নিজে লিখে দেয়। নিজের বই –পত্র রাখে পরের বোনটির জন্য। এভাবে সব বোনেরা ছোট বোনের জন্য বই –খাতা রাখে। পড়ার পরিবেশ নেই বাড়িতে। পড়তে দেখলে বাবা বলেন, তেনারা জর্জ –ব্যারিস্টার হবেন। গায়ের রঙ যাদের হাড়ি –পাতিলের মত, তাদের এত পড়ে কোন লাভ হবে না। পরের ঘরে টিকে থাকতে হলে কাজ জানতে হবে। 

মায়ের গায়ের রঙ ফর্সা। তা সত্ত্বেও মেয়েদের গাত্রবর্ণ কৃষ্ণবর্ণের, বাবার মত। নিজের গায়ের কালি মোছার জন্য সপ্তগ্রামের ওপার হতে ফর্সা মেয়ে আমদানী করা হয়েছিল, বিয়ে করে। কিন্তু বিধির বিধান খন্ডায় কে?

শাকিলার নেতৃত্বে বোনেরা সব একে একে স্কুল ফাইনাল পাশ করে চলে যায় উচ্চশিক্ষার পথে। যদিও সে পথ মোটেই মসৃন নয়। গ্রামের স্কুলের এখন খুব নাম কেবল এই ৭ বোনের জন্য। তাদের ভাল পোশাক নেই। তবুও তারাই শ্রেষ্ঠ। 

অন্ধকার কুসংস্কারাছন্ন গ্রামে, পশ্চাদপদ পরিবারে তারাই আলোর মশাল জ্বালায়। যে মেয়েদেরকে পরিবারের এবং সমাজের সকলে অভিশাপ মনে করতো, তারাই এখন সকলের মধ্যমণি। তাদের একমাত্র হাতিয়ার তাদের বুদ্ধি, বিদ্যা এবং মনের দৃঢ়তা। প্রচন্ড দারিদ্র্যের মধ্যে অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে যায় শাকিলা। সঙ্গে নিয়ে যায় তার বোনদেরকে এবং ভাইটিকে। তারা এখন সকলের পুরোভাগে আলোর বর্তিকা হাতে। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শাকিলা সকলকে তাক লাগিয়ে দেয়। সম্মানজনক চাকুরীতে ঢুকে তার পরিবারকে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে চলে, যা কিনা হ্যামিলনের বাশরীওয়ালার মত এক অগ্রযাত্রাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যে গন্তব্য সকলকে আলোচিত মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেবে। ৭ বোন জাগিয়ে তোলে পুরা জনপদকে। গ্রামের লোকেরা তাদের বাবা –মাকে সম্মান করে। এদিকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্য্যয়নকালে শাকিলার পরিচয় হয় একটি ছেলের সঙ্গে। ক্লাসের সেকেন্ড বয়। পড়ার প্রতিযোগিতা শাকিলার সাথে। তাদের প্রতিযোগিতা প্রণয়ে পরিণত হয়। তারপর এক শুভদিনে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয় তারা।

একদিন প্রত্যুষে তারা খিরু নদীর তীর ধরে হাঁটতে থাকে। চারিদিকে পাখপাখালিরা ডানা ঝাপটা দিয়ে জেগে উঠলো। নিজ নিজ কন্ঠের অনুশীলনে প্রভুর জয়গান করতে লাগলো। পূর্ব দিগন্ত নরম লালিমায় ভরে গেল নবারুণ সম্প্রাতে। তারা দুজনে একসঙ্গে গেয়ে উঠে –‘আজি এ প্রভাতে রবির কর/ কেমনে পশিল প্রাণের প’র/ কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত পাখির গান/ না জানি কেনরে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।’           

...............

ছিন্ন বীণা


মাস্টার অব সোশাল সাইন্সে ভর্তির মৌখিক পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছিল নাহিদ। পরীক্ষা শেষ। রেজাল্ট জানার জন্য সকলেই উদগ্রীব। বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় খুব ভীড়। নানা জায়গা থেকে ছেলেমেয়েদের আগমন। অধীর আগ্রহে প্রহর গুনতে গুনতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। এমন সময়ে রেজাল্টের শিট নোটিসবোর্ডে ঝুলিয়ে দিল। সকলেই হুমড়ি খেয়ে পড়লো সফলতার আশায়। লাইট না থাকায় পড়তে কষ্ট হচ্ছিল। অনেকই নিজের নাম দেখে বাইরে বের হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। মেয়েদের তো দেখবার উপায় নেই। এত ভীড়ে ঢোকা সম্ভব নয়। সেজন্য নাহিদ একজন ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে বললো এই যে, ভাই আমার নামটা একটু দেখে দেবেন!, নাহিদ, রোল নম্বর ৫৬৭। ছেলেটি ২০পর্যন্ত নাম দেখেছিল শেষ পর্যন্ত দেখে বললো, কই দেখছি না তো? আমার তো বিশ নাম্বারে নাম আছে। দাঁড়ান, আবার শুরু থেকে দেখি। দেখতে দেখতে হতাশ হলো। হঠাৎ ১৯শে এসে দেখতে পেল নাহিদ নিশাত। yes, your name is there নাহিদ নিশাত! নাহিদ আনন্দের আত্মহারা। তারপর দুজন ওখান থেকে বের হতে চেষ্টা করলো। প্রচন্ড চাপের মুখে ছেলেটি পথ করে নিল। নাহিদ তাকে অনুসরণ করে বের হয়ে এলো। সিড়ির নিকট এসে দেখলো চৈতালী ধূলোর ঝড় উঠেছে। ঝাপটায় দৃষ্টি অস্বচ্ছ। তার সাথে যুক্ত হচ্ছে মেঘের ঘনঘটা। 

নাহিদ থাকে গ্রীনরোডে। সবাই ছুটে চলেছে। ঝড়ো হাওয়া, অন্ধকার, যানবাহন নেই। ছেলেটি নীলক্ষেতের দিকে এসে একটি ধাবমান রিক্সা জোর করে ধরে নাহিদকে তুলে দিল। আর সে নিজে উল্টো দিকে যাত্রা করলো মালিবাগের বাসার উদ্দেশ্যে। 

কয়েকদিন পর ক্লাশ আরম্ভের চিঠি পেল ওরা। দুরু দুরু বক্ষে ছাত্রছাত্রীরা এসে হাজির। অফিস থেকে এসে জেনে নিল কোথায়, কত নম্বর কক্ষে তাদের ক্লাস হবে।

দিন যায়। পড়াশুনার প্রচন্ড চাপ। তারই মাঝে ছেলেটির সঙ্গে নাহিদের দেখা হতে থাকে। নাহিদের রোল নম্বর ১৯, সাজ্জাদ সুমনের ২০, তারা পরপর রোলকলের জবাব দেয়। বেশ মজা পায়। এক সঙ্গে ক্লাসে ঢোকে, এক সঙ্গে বের হয়। পড়াশুনার আলোচনা তো হয়ই। দুজনেই মেধবী। সুতরাং বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন গড়ে উঠে। দীর্ঘ দু’বছরে তাদের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। এখন একজন আরেকজনকে না দেখে থাকতে পারেনা। একসঙ্গে ঘোরাফেরা, লাইব্রেরিতে যাওয়া, ক্যান্টিনে খাওয়া – নিত্যদিনের রুটিন তাদের। এরমধ্যে ফাইনাল পরীক্ষা এসে যায়। দু’জনেই ভালভাবে পাশ করে। এবারও পরীক্ষার প্রাপ্ত নাম্বার কাছাকাছি। সুমন বলে ১৯ কম, তবুও ১৯ –এর  নম্বর বেশী। নাহিদ হেসে বলে সংখ্যা হিসাবে ২০ পরে আসে, সেজন্য তার নাম্বারও কম আসে। এরকম ভাবে ওরা মজাও করে প্রায়ই। সামনে সিএসপি পরীক্ষা। প্রচুর পড়াশুনা। তাদেরকে সবজান্তা হতে হবে। প্রস্তুতি নিতে থাকে দুজনেই। এরই মাঝে নাহিদের বিয়ের কথাবার্তা চলতে থাকে। নাহিদ দেখতে ভাল। সুতরাং বিয়ের প্রস্তাব প্রচুর আসছে। খবর শুনে সুমনের চমক ভাঙ্গে। সে কি যেন হারাতে যাচ্ছে।সে নাহিদকে জিজ্ঞেস করে, তোমার এ বিয়েতে মত আছে? হঠাৎ নাহিদ কেঁদে ফেলে। বলে, না, নেই। 

- তবে  প্রতিবাদ করো না কেন?

-আমার কথার দাম দেয় না কেউ। 

-সিএসপি পরীক্ষাটা দাও তো আগে।

-তারা বলেন যথেষ্ট হয়েছে। তোমার সিএসপি পরীক্ষা আটকাবে না। পড়তে থাক। ভাল পাত্র হাতছাড়া করা যাবে না। 

সুমন বলে তুমি কি আমার কথা ভাববে না? জবাবে নাহিদ কেবলই চোখের জলে ভাসে। সুমন বলে তুমি উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে। বাবা মাকে বুঝিয়ে বল। তারা তোমার কথার গুরুত্ব দেবেন। 

নাহিদ সাহস সঞ্চয় করে তার মনের কথা বাসায় প্রকাশ করে। অভিভাবকগণ সাজ্জাদ সুমনের বাড়ির, পরিবারের খোঁজ খবর সংগ্রহ করে। সুমনের পিতা গ্রামের একজন স্কুল শিক্ষক। সম্ভ্রান্ত বংশ। তবে এখন পূর্বের অবস্থা নেই। অনেক ভাই –বোন। সবাই লেখাপড়া করছে। সুমন সকলের বড়। তার অনেক দায়িত্ব। নাহিদকে গ্রামে যেতে হবে। গ্রাম সে কোনদিন দেখেনি। নাহিদের পিতা সরকারি উচ্চপদস্থ অফিসার। ইপিসিএস (EPCS) সে যুগে। জীবন যাপনের তরিকা উচ্চ পর্যায়ের। 

সুমন দেখতে শুনতে ভাল। ছেলে ভাল। কিন্তু তাদের মতে এ ভাললাগা, বা ভালবাসা স্থায়ী হতে পারেনা। সুমনকে তাদের পর্যায়ে উন্নীত হতে অনেক সময় লাগবে। তাও যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। সুতরাং এ বিয়ে হতে পারেনা। নাহিদ অনেক জেদ করে। অনশন করে। তাতে কোন ফল হয় না। তার মন এতই ভেঙ্গে পড়ে যে তার পক্ষে সিএসপি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হয় না। লেখাপড়ার ইতি তার এখানেই।  

নাহিদের বিয়ে পাকাপাকি হয়ে গেল এক আর্মির ক্যাপ্টেনের সঙ্গে। সুমন সিএসপি পরীক্ষা দিল। রেজাল্ট ভাল হল। ভাল চাকুরী হল। নাহিদের বিয়ে হল। স্বামী পশ্চিম পাকিস্তানে বদলী হয়ে নাহিদকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল। সুমন ‘শূন্য নদীর কূলে রহিল পড়ি।’ তার সোনার ধান অন্য লোকের নৌকায় বোঝাই হয়ে চলে গেল। সুমন সিভিল সার্ভিসে পশ্চিম পাকিস্তানের গোট্‌কি নামক স্থানে পোস্টিং পেল। কিন্তু সে গেলনা সেখানে। চেষ্টা তদবীর করে ইস্ট পাকিস্তানের এক জেলা শহরে ম্যজিস্ট্রেটের চাকুরী গ্রহণ করলো।

সময় চলতে থাকে অবিরাম। সুমনের ‘অন্তর আপনার মনে আপনি পুড়তে থাকে গন্ধ বিধুর’ ধূপের মত। নাহিদের স্মৃতির দীপশিখাটি তাকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে দগ্ধ করে। কাজে ব্যস্ত থাকে। বাকি সময় নাহিদের স্মৃতির সঙ্গে বসবাস করে। অন্যদিকে নাহিদের সংসার চলে স্বাভাবিক নিয়মে। প্রথম প্রথম সুমনের স্মৃতি নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঘোরাফেরা করতো। ভাবতে চাইতো এই –ই তার সুমন। পরপর তার দুটি সন্তান হয়।  একজনের নাম রাখে সাজ্জাদ। আর মেয়েটির নাম রাখে সুমনা। 

এরই মধ্যে বেজে উঠে ঊনসত্তরের দামামা। পাকিস্তানের রাজনৈতিক আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। শেখ মুজিব বিপুল ভোটে জয়ী হয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা তা মেনে নিতে অস্বীকার করে। চরম নির্লজ্জের মত তারা এই নির্বাচনের ফলাফলকে বয়কট করে। যার ফলশ্রুতিতে শুরু হয় ব্যাপক গণ জাগরণ। বাঙ্গালী ছাত্র সমাজ এবং শিক্ষিত সমাজ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সারাদেশ একত্রিত হয়। ’৭১ এর ২৫শে মার্চ  মধ্যরাত্রে যখন পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে, বাঙ্গালী জাতি তখন হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। পরে এক ভয়ংকর যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। বাঙ্গালীর ছেলে আর ঘরে থাকতে পারলো না। সাজ্জাদ সুমন যুদ্ধে যোগ দিল। কখনও দেশের ভেতরে, কখনও দেশের বাইরে কাজ করে। তার যে এত সাহস আর এত শক্তি ছিল তা সে নিজেও জানতো না। এক কাপড়ে মাসের পর মাস, কত ঝড়ে, জলে ভিজেছে। ভিজা কাপড় গায়ে শুকিয়েছে। পোকামাকড়ের কামড়, জোকের রক্ত শোষণের কত না ইতিহাস। কত ক্ষুধা, তৃষ্ণায় কাতর হয়েছে। তবুও অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। 

এটা ছিল ৭১ এর শেষের দিকের ঘটনা। ওরা জামালপুরের বর্ডারে একটি আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তখন জানতে পারলো গ্রামের ভিতরে কয়েকটি বাড়িতে পাক বর্বর বাহিনী আগুন দিয়েছে। তারা দ্রুত এগিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে। খুব সন্তর্পণে ছোট্ট নদীটির ঢাল বেয়ে সুমনরা এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখে একটি মানুষ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ক্রুশে বোনা সাদা টুপিটি পড়ে আছে অদূরে। শ্বেত শুভ্র বস্ত্র তার ক্ষত –বিক্ষত। দেহে আঘাতের চিহ্ন। চাপ চাপ রক্ত তার দেহ ঘিরে। ওরা মুক্তি সেনারা লাশটি উল্টালো। সাজ্জাদ চমকে উঠলো। এ যে নাহিদের পরহেজগার পিতার লাশ। শ্বেত , শুভ্র চুল, দাড়ি, হাতে তসবীহটি তখনও ধরা। তাকে ঐভাবে রেখে অতি সন্তর্পণে উপরে গ্রামে চলে আসে। দেখে নাহিদের বাড়িটি ভস্মীভূত। কয়েকটি গজারী কাঠের খুঁটি তখনও নিভু নিভু জ্বলছে। ওরা তখন উত্তর দিকের জঙ্গলে চলে গেল। সেখানে ক্ষত –বিক্ষত মানুষ পড়ে আছে। ভোরের আলো ফুটে উঠছে দ্রুত। কে যেন পানি চাচ্ছে মৃদু স্বরে। কাছে গিয়ে দেখে এ যে নাহিদ! সেই সাদা মেয়েটি। দুটি বাচ্চা তার বুকের উপর মৃতের মত পড়ে আছে। সুমন টিউবওয়েল থেকে তার কোমরের গামছা ভিজিয়ে পানি নিয়ে নাহিদের মুখে দিল। ডাকলো, নাহিদ, নাহিদ। সে চেতনা ফিরে পেল। বললো, কোথায় আমার সাজ্জাদ, কোথায় আমার সুমনা?

-এই যে তোমার বাচ্চারা। দেখ, চেয়ে দেখ। ওরা ভাল আছে। 

নাহিদ চিৎকার করে উঠলো। কে, কে, কে কথা বলে? 

কে তুমি? 

সুমনরা তাদের সকলকে ধরাধরি করে নাহিদদের রান্নাঘরে নিয়ে এলো। সে ঘরটি একটু দূরে থাকায় দগ্ধীভূত হয়নি। সকলেই মহিলা আর শিশু। তবে জখম আছে সবারই । চুল দাড়ির ভেতরে সুমনকে চেনা সম্ভব ছিল না। তবুও নাহিদ বলে উঠলো, কে আপনি? সুমন বললো, আমরা মুক্তিযোদ্ধা। সাবধানে থাকবেন। আপনার বাবা নদীর ঘাটের কাছেই আছেন। বলেই ওরা নিমেষেই অন্তর্হিত হলো। সূর্য উঠার পূর্বেই যে তাদেরকে ক্যাম্পে পৌঁছাতে হবে। 

যুদ্ধের সময়ে নাহিদ লাহোরে অবস্থান করছিল। অবস্থা খারাপ বুঝে নাহিদকে তার স্বামী মেজর করিম ঢাকায় পাঠিয়ে দিল। সেটাই ছিল ভারতের উপর দিয়ে শেষ বিমান যাত্রা। তারপরই মেজর করিমের ইউনিট বর্ডার ডিউটিতে চলে গেল। নাহিদ ঢাকায় এসে অন্য সকলের সঙ্গে জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। সুমনের মনের অবস্থা খুব খারাপ। ইচ্ছা করছিল, ঝড় হোক, ঝঞ্ঝা হোক, সাইক্লোন হোক -সব তার জীবনের দুঃখ কষ্টকে উড়িয়ে নিয়ে যাক। এ জীবন তার অভিশপ্ত জীবন। যুদ্ধে যদি তার মৃত্যু হয় সেটাই হবে তার জন্য মুক্তি। যেমন গত পরশু তার প্রিয় বন্ধু সাংবাদিক পিন্টু, আহত মুক্তিযোদ্ধাকে পিঠে করে বহন করে আনার সময় পাক সেনাদের পাতা ফাঁদে পড়ে প্রাণ দিল। অদৃষ্ট কেমন নিষ্ঠুর, মানুষ তা জানে না। না হলে নাহিদের সঙ্গে তার এই অবস্থায় সাক্ষাৎ হওয়ার প্রয়োজন ছিল কি? ছিল না। অথচ অতীতের নাহিদ হারানোর দুঃখজনক স্মৃতির সঙ্গে এই মর্মান্তিক দৃশ্য যুক্ত হলো কেন? নাহিদ, আমার প্রিয় নাহিদ, আমার  প্রাণাধিক নাহিদ, আমার জন্ম –জনান্তরের নাহিদ। কেন প্রথম দেখা হয়েছিল, কেন পুনরায় দেখা হলো? 

মুক্তিযোদ্ধাদের এসব চিন্তা করবার সময় নেই। পরবর্তী কমান্ডের আদেশে তারা বেরিয়ে পড়ে অন্য অপারেশনে, একটি ব্রিজের কাছাকাছি যেদিক দিয়ে এক প্লাটুন পাকিস্তানী সৈন্য অন্য একটি গ্রামে ঢুকে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। সেদিন গভীর রাতে তারা বিলের ঠান্ডা পানিতে ঝোপ ঝাড়ের নীচে লুকিয়ে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে অপেক্ষা করছিল। গভীর রাতে পাক হানাদার বাহিনী এলো। মাইন ফিট করা ছিল ব্রিজের দুইপাশে। ব্রিজে উঠার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। অনেক সৈন্য হতাহত হয়। যে সমস্ত যানবাহন পেছনে ছিল, তারা নিজের অস্ত্র দিয়ে চারিদিকে ফায়ার করতে থাকে। মুক্তিসেনারা ডুব দিয়ে দূরে সরে যেতে থাকে। কেউ কেউ আহত হলো। কেউ অন্য পাড়ে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো। আর্মির গাড়ি চলে গেল। চারিদিক সুনসান।

‘সবকিছু একদিন শেষ হয়। যুদ্ধও একদিন থামে। সেই বিরতি কি শান্তি? ’ শান্তি না হোক স্বস্তি তো আনে।  আশাবাদী মানুষ ধ্বংস স্তুপের ওপর আবার ঘর বাঁধে, বাঁচার স্বপ্ন দেখে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ছিনিয়ে আনে একটি লাল সবুজ পতাকা। বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সাজ্জাদ সুমন দেশে ফেরে। বাড়ি – ঘর তাদের অক্ষত আছে। মাতা –পিতাও জীবিত আছেন। ভাই – বোন সকলেই যুদ্ধে গিয়েছিল তারা কেউ ফেরে নাই। যে ভাইবোনদের সংখ্যা দেখে নাহিদের পিতা ভয় পেয়েছিলেন!

সরকারি চাকুরী তো সুমনের আগেই ছিল। এবার রেড ক্রসে তার পোস্টিং হলো। বৃদ্ধ বাবা –মাকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসে সে নিজের কাছে। কারণ গ্রামের শূণ্য ঘরে তারা কেবল কান্নাকাটি করেই দিন কাটান। সাজ্জাদ সুমন অফিসে যাতায়াত করে। তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে। বাকী সময় কোথায় কার কি কি ক্ষতি হয়েছে –সে সব খোঁজ খবর সংগ্রহ করে।  

একদিন যখন সাজ্জাদ খুব ব্যস্ত তখন এক মহিলা দুই বাচ্চার হাত ধরে অফিসে আসে। তার কাছে প্রতিদিন কতশত লোক তাদের প্রিয়জনের খোঁজ খবর নেবার উদ্দেশ্যে আগমন করে। তাদের আশা, কোথাও না কোথাও তাদের লোক আহত অবস্থায় আটকে পড়েছে। একদিন না একদিন আসবেই।

নাহিদ ধীর পদক্ষেপে রেডক্রস অফিসে প্রবেশ করে অফিসারের ডেস্কের সামনে দাঁড়ায়। অফিসার ফাইল থেকে মুখ না তুলেই ইশারায় আগন্তুককে বসতে বলে। বেশ কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে প্রশ্ন রাখলেন, – কি চাই? নাহিদের বুকের ভিতর রক্ত ছলাৎ করে উঠে। সাজ্জাদ ও নাহিদের দৃষ্টি কোন এক চৌম্বক শক্তির কবলে পড়ে স্থির হয়ে রইলো দীর্ঘক্ষণ। কেউ কোন কথা বললো না। হঠাৎ নীরবতা ভঙ্গ করে নাহিদ কম্পিত কন্ঠে বলে উঠলো, মেজর কে. করিম নামের অফিসার এখন কোথায় আছেন? পশ্চিম পাকিস্তানে তার পোস্টিং ছিল পাঞ্জাবে। সাজ্জাদ দ্রুত হস্তে ফাইল বের করে। পাতা উল্টে –পাল্টে দেখতে থাকে পাকিস্তানে আটকে পড়া অফিসারদের নাম। হঠাৎ এক জায়গায় তার চক্ষু স্থির হলো। সাজ্জাদের হৃদপিন্ড কে যেন চেপে ধরলো। সে মাথা নত করে চোখ বন্ধ করে ফেললো। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে, নাহিদের চোখে চোখ রাখলো। দৃষ্টি এতই স্থির এবং শীতল, যে নাহিদ সহ্য করতে না পেরে মাথা নীচু করতে বাধ্য হলো। সাজ্জাদ একটি কালো বর্ডার যুক্ত কাগজ নাহিদের দিকে এগিয়ে দিল। কয়েক সেকেন্ড পর গায়েবী আওয়াজের মত গম্ভীর নিনাদ তুলে এক ভয়ংকর শব্দ উচ্চারিত হলো –  Major K.Karim got killed in the western front during war.

.........


কত অজানারে

ফারাহ্‌ দিবা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এম. এ. ফাইনাল দিবে। এই সময় একদিন রেডিওতে একটি বিশেষ ঘোষণা শুনতে পায়। সোমালিয়ান দস্যু কর্তৃক শ্রীলংকার বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাই। বুকটা কেঁপে উঠলো। কারণ এই জাহাজে ছয়জন বাঙ্গালী তরুণ অফিসার আছেন। তাদের মধ্যে একজন ইমরান। গত চারবছর ধরে সে তার অন্তরঙ্গ বন্ধু। কিংবা তার চাইতেও অধিক কিছু। সে একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে। তবে মেলামেশা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তার আশেপাশে।  

পারস্য উপসাগরকে লোকে গালফ্‌ বলেই জানে। সাধারণত এখানেই ভিনদেশি বাণিজ্য জাহাজগুলি জলদস্যু কবলিত হয়। কৃষ্ণকায়া সোমালিয়ান দুর্ধর্ষ দস্যুরা – যাদের  হাতে থাকে অতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এ. কে.ফরটি সেভেন রাইফেল, তাদের সঙ্গে লড়াই করবার সাহস কারো নেই। মাত্র কয়েকজন জলদস্যু অনেক লোকজন সহ বিরাট বিরাট জাহাজ আটক করে ফেলে। আক্‌শি বাঁধা মোটা রশি জাহাজের উপরে বিশেষ কায়দায় ছুঁড়ে মারে।রাস্তা তৈরী হয়ে যায়। পরে গান পয়েন্ট তাক করে জাহাজের উপরে উঠে আসে। দিনের পর দিন জাহাজের লোকজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, খুন অনাহারে রাখা, পিপাসায় রাখা ইত্যাদি নানাবিধ অত্যাচার করে তাদের জীবন প্রদীপ নিবু নিবু পর্যায়ে নিয়ে আসে। জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে পড়ে আসহায়। ক্যাপ্টেনের মাধ্যমে শুরু করে জাহাজের মালিকের সঙ্গে দর কষাকষি। জাহজ মালিক এক পর্যায়ে মোটা অংকের মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হয়।জিম্মিরা মুক্ত হয়। প্রানে রক্ষা পায় বটে, তবে জীবনের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।    

ফারাহ্‌ দিবা একা একা এই কষ্ট সহ্য করতে পারছিল না। একদিন বাসায় তার মনোবেদনার কথা প্রকাশ করে। সকলের সহমর্মিতা পায়। জাহাজ ছিনতাই এবং সংবাদ শোনার জন্য সকলে সর্বদা উৎকর্ণ হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখে মুক্তিপণ নিয়ে দরদাম হচ্ছে। শত কোটি মুদ্রা পেলে জলদস্যুরা জাহাজ ছেড়ে দেবে। সংকোচ পরিহার করে ফারাহ্‌ ইমরানদের বাসায় যোগাযোগ করে। তারাও ইমরানের জন্য গভীর ব্যাকুলতা প্রকাশ করে। কিন্তু কোন খবরই আসছে না। ফারাহ্‌ দিবার দিনরাত্রি প্রচন্ড যন্ত্রণায় অতিবাহিত হতে থাকে। সর্বদা ইমরানের দেওয়া আংটি তার অনামিকায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। কার্জন হলের পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে বসে একদিন চৈত্রের বিকেলের উতল হাওয়ায় মনের আনন্দে তারা দুজনে তাদের অংগুরীয় বদল করে ফেলেছিল। ইমরানের অনামিকার আংটি ফারাহ্‌র মধ্যমায় আর তার মধ্যমার আংটি, যার উপর এফ অক্ষর মিনা করা, ইমরানের অনামিকায় বদলী হয়ে গেল। দু’জনে একসংগে গেয়ে উঠলো –

  ‘ভালবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে/

  মনে ক'রে সখী, বাঁধিয়া রাখিয়ো আমার হাতের রাখী—তোমার কনককঙ্কণে॥’ 

গান শেষে ওরা বলেছিল, এই –ই ভাল। আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন কি? চল যাই চাংপাই। চাংপাই রেস্টুরেন্টে দুজনে মুখোমুখি বসে চায়নীজ খাদ্য উপভোগ করে তাদের অলিখিত বন্ধন পাকা করে নিয়েছিল। তারপর থেকে দেখা হলেই দুজনে আংটির সংঘর্ষ করে নিতো। মজা পেত খুব। ঐ পুকুর ঘাট ছিল তাদের বৃন্দাবন। 

পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে মন্দ মধুর হাওয়ায় দোল খেয়ে, রবি ঠাকুরের গান গেয়ে, তাদের প্রণয় দৃঢ়তা লাভ করে। একজন বিহনে আরেক জনের জীবন অর্থহীন মনে হয়। সেই প্রিয় মানুষটি আজ দূরদেশে কোন্‌ সাগরের জলে দস্যু কবলিত। হায়রে অদৃষ্ট! মানুষের জীবনে দুর্ভোগ কত ভাবেই না আসে। একসময়ে শুকিয়ে যায় চোখের জল। দুই পরিবারে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। 

হঠাৎ একদিন রেডিও মারফত জানতে পারে শতকোটি টাকার বিনিময়ে জিম্মিরা মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু ইমরান ফিরে এলো না। কেউ তার খবর  দিতে পারলো না। সময় গড়িয়ে গেল। মাস গেল, বছর গেল। সংবাদ সংগ্রহের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। রেড ক্রসও কোন খবর দিতে পারলো না। হতাশাই দুই পরিবারের সম্বল হলো। 

ফারাহ্‌ দিবা চাকুরী করছিল কলেজে। তার মা –বাবা  মেয়ের জন্য  উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। মেয়েকে সংসার গ্রহণ করবার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। ‘মানুষ একা থাকতে পারে না। কার জন্য অপেক্ষা করছ? সময় থাকতে নিজের পথ দেখ। মানুষের  নিজের আশ্রয় এবং অবলম্বন থাকা উচিত।’

এদিকে একই কলেজে এক ভদ্রলোক চাকুরি করেন। জীব বিজ্ঞানের প্রফেসর। বড্ড গম্ভীর। তারও জীবনের ইতিহাস আছে। একটি মেয়েকে তার ও খুব পছন্দ ছিল। সদা হাসি খুশী টিংকু। রঙ্গিন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায়। ইকরাম স্যারকে তার খুব ভাল লাগে। স্যারকে সে বন্ধুর মতো মনে করে। চঞ্চল চপল টিংকু তার হৃদয় –মন জয় করে নিয়েছে। তবে সে চালাকও বটে। ইকরামের পক্ষপুটে থেকে অন্য ফুলের মধুও আহরণ করে। চেখে দেখে কোনটা বেশী মিষ্টি। তাদে সঙ্গে অভিসারে যায় সুন্দর সুন্দর স্পটে। ইকরামকে তার আনন্দের কথা, আহ্লাদের কথা কিছু কিছু বলে। ইকরাম তার সততার মূল্য দেয়। ভাবে মেয়েটি খুব সরল, ছেলে মানুষ!

একদিন হাসতে হাসতে টিংকু তার বিয়ের খবর জানায় ইকরামকে। বাবা –মার প্রচন্ড আগ্রহ উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। কারণ সে তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান। ইকরাম লজ্জার মাথা খেয়ে বলে, পাত্র হিসেবে আমি কম কিসে? ত্বরিত উত্তর দেয় টিংকু। বাবা –মার অবাধ্য হওয়া যায় না। তবে আমি তোমারই থাকবো চিরকাল। এটা তুমি সত্য বলে জেনো। মানুষের অন্তরের প্রাপ্তিই আসল। এ বলে মায়া কান্না জুড়ে দিল। 

এই ছেলেটির কথা টিংকু অনেকবার বলেছে। এটা ছিল তার শেষ খেলা। কিন্তু তবুও ইকরাম ভয়ংকর মনোবিকলনের শিকার হয়। এ কলেজের চাকুরী ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কলিগরা তাকে বাধা প্রদান করে। বলে কোথায় যাবে তুমি? কার জন্য? মানুষ সব কিছু থেকে দূরে চলে যেতে পারে। কেবল পারে না নিজের কাছ থেকে দূরে থাকতে। সুতরাং কোথাও যাবে না। আমাদের কাছে থাক। কষ্ট শেয়ার করবার লোক পাবে। তোমার সংগে যা ঘটেছে তা পরোক্ষে ভালই হয়েছে। তোমার ঘরে যখন তোমার তথাকথিত প্রিয়া অন্য ফুলের মধু আহরণ করতো, তখন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা দাঁড়াত। সবকিছুরই একটা অন্তরর্নিহিত মঙ্গল আছে। সুতরাং যেও না কোথাও, এখানে থাক। 

ইকরাম থেকে গেল। পরিচয় ছিল কলিগ হিসাবে ফারাহ্‌ দিবার সঙ্গে। গল্প  করতে করতে দুজন দুজনার জীবনের ট্র্যাজিডির কথা জানতে পারে। অন্যরা তো জানেই। তারা সকলে মিলে একদিন এই দুই ব্যক্তিকে ধরে বসে। বলে, আমাদের কলেজে কলিগদের মধ্যে কেউ একা নেই। কেবল তোমরা দুজনে সিঙ্গল। দুজনেই চূড়ান্ত ভাল মানুষ। এবার আর কোন কথা নয়। সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হও। উদ্বাহের বন্ধনের আয়োজন করি আমরা। শীঘ্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর। 

কয়েকদিন পর কলিগরা আবার টিফিন পিরিয়ডের ধূমায়িত চায়ের উপর তাদের মতামত জানতে চাইল। তাদের অধোবদন, হাসিমুখ। সকলে ধরে নিল মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ। 

তারা দুই পরিবারের গার্জিয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিয়ের দিন তারিখ ধার্য্য করে ফেলল। ইকরাম আর ফারাহ্‌ দিবা পবিত্র সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হলো। যাত্রা শুরু হলো একটি সুন্দর সাবলীল সংসারের। মানুষের জীবন একটাই। তাকে সার্থক  করে তুলতে হলে একজন আরেকজনের দুখের সুখের সঙ্গী হতে হবে। দু’জন পরস্পরকে গ্রহণ করতে হবে ‘ভাল মন্দ মিলায়ে সকলি।’ আনন্দ, উৎসব, অনুষ্ঠান সবই হলো প্রথানুযায়ী।

দিন চলে যায় নদীর স্রোতের প্রায়। ফারাহ্‌ দিবার দুটি ছেলেমেয়ে। তারা স্কুলে যায় । এমন সময় একদিন ফারাহ্‌ ডি. ভি. পেল। আমেরিকা যাওয়ার ছাড়পত্র। অনেক চিন্তা ভাবনা করে একদিন ওরা পাড়ি জমাল আমেরিকায়। ওরা যেহেতু শিক্ষিত, সেজন্য চাকুরী পেতে অসুবিধা হয়নি। ছেলে মেয়েদেরকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। দেশেও ওরা ইংলিশ মিডিউয়াম স্কুলে পড়াশুনা করছিল। 

বেশ কিছু বছর ওদের এভাবেই কেটে গেল। একবার একটি ভাল চাকুরীর সন্ধান পায় ফারাহ্‌। সব ফরমালিটি পুরা করে সামনা সামনি সাক্ষাত্‌কার দেবার প্রয়োজন পড়ে। ফারাহ্‌ দিবা হাজির হলো সে অফিসে। রিসেপশানে বসা লোকটিকে দেখে মনে হলো ভারতীয়। একটু পর মুখ তুলে লোকটি তাকিয়ে থাকলো ফারাহ্‌ দিবার দিকে। ফারাহ্‌ -ও বিস্ফারিত নেত্রে লোকটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। হঠাত্‌ লোকটি ব্যগ্রস্বরে বলে উঠলো – তুমি? আমি ইমরান।

একটি সূক্ষ্ম যন্ত্রণা এতকাল পরে বক্ষমাঝে আর্তনাদ করে উঠলো। মনটাকে শক্ত করে বেঁধে দ্রুত অফিস কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হলো। মনে হলো আজ সে বড্ড ক্লান্ত। হৃদয় কন্দরে বেজে উঠলো সেই সুর –ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু...। 


Tuesday, March 24, 2026

এক টুকরো হাসি

 কি বলছো? আমি ডাক্তার? হ্যা, আমি ডাক্তার। ডাক্তারই তো! আমি তো লোকের কাছে চিকিৎসক হিসেবেই পরিচিত। মৃত্যু যখন অন্ধের মত আবাল –বৃদ্ধ –বনিতা, সকলকেই ভূ-স্বর্গের কানন থেকে নিষ্ঠুর রসিকের মত ছিনিয়ে নিতে আসে, তখনই ডাক্তার তার প্রতিরোধ করবার প্রয়াস পায়। মনে হয় বিধাতা যমদূতকে দু’টি চোখ দান করলেই ভাল করতেন। 

এমন এক বসন্ত কাল। সে আজ থেকে কুড়ি বৎসর আগের কথা। বয়স ছিল তরুণ, মন ছিল নবীন, দৃষ্টি ছিল রঙ্গিন, জগৎ ছিল মধুময় আর জীবন ছিল কল –কাকলীতে  মুখরিত। গাছে গাছে পাতা ছিল, বৃন্তে বৃন্তে মুকুল ছিল, ফুলে ফুলে গন্ধ ছিল, ফলে ফলে মধু ছিল আর চিত্তে ছিল প্রচুর রস। তখন আকাশ ছিল রঙিন, সূর্য ছিল মিতা, উদয়ে জানাতো আভিনন্দন আর অস্তে জানাতো শুভাশীষ, আগামী ভোরের তরে। বাতাস বয়ে আনত কোন অজানা রাজ্যের সবুজ কন্যার মায়াবাণী, প্রাণে জাগাতো মৃদু শিহরণ, মনে লাগাতো হালকা খুশীর ছোঁয়া, দেহে জাগাতো খুশীর ঢেউ আর আলতো ভাবে চিবুকটি নেড়ে চলে যেত। আকৃষ্ট হতাম ভোরের পাখির কলতানে। জেগেও উঠতাম। তবে মায়াবিনী নিদ্রার হাত থেকে বিশেষ মুক্তি পেতাম না। অনেকটা তন্দ্রাছন্ন হয়ে কাটাতাম আর অনুভব করতে চেষ্টা করতাম, ভোরের পাখি কি বাণী প্রচার করে সদ্য নিদ্রোত্থিত জগতের কাছে। ভাবতাম তারা আমারই জন্য মেতে উঠেছে। তারাই আমার মনের মিতা, তারাই অন্তহীন সুখের সাথী। তারা আমার জীবনে চাঞ্চল্য জাগায়, কাজে উৎসাহ দেয়, কাব্যে প্রেরণা জোগায়। আমার পৃথিবীকে রংধনুর সপ্তরঙে সজ্জিত করে আমার সম্মুখে ধরে রাখে। 

এমন সময়ে এমনি পরিবেশে আমি চিকিৎসা বিদ্যায় সনদ লাভ করেছিলাম। ‘ডাক্তার’ এই একটি মাত্র শব্দের উপর নির্ভর করে আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ছবি অতি সুন্দর সুষ্ঠুভাবে কল্পনা করতাম। সেদিন দেখেছিলাম খ্যাতি, যশ, টাকা আর স্ত্রী –পুত্র –কন্যাসহ সুখী পরিবার। যেখানে দুঃখ দৈন্য প্রবেশ করবার ভিসা কোনদিন পাবে না। 

কিন্তু আজ? 

আজ আমি নামকরা ডাঃ মাহবুব চৌধুরী। বাড়ি, গাড়ি, টাকা, কড়ি কোন কিছুরই অভাব নেই। কিন্তু এসব যেন তুচ্ছাতিতুচ্ছ মনে হচ্ছে। সব থেকেও আজ আমার কিছুই নেই। আমি সুখী বটে, আমার শান্তি নেই। জীবনে যা চেয়েছি, তাই পেয়েছি। এর বেশী যে মানুষের কিছু চাওয়ার আছে, তা আমার রঙিন মনের অগোচরে ছিল। তাই হয়তো বিধাতার কাছে শান্তির জন্য কোন প্রার্থনা করিনি।

জীবনে তেতাল্লিশটা বসন্ত আমি পাড়ি দিয়ে এসেছি। দিনগুলো কেমন করে কেটে গেল তা আর নাই বা বললাম। তবে গত বসন্তের একটি দিনে জগতের সমস্ত আলো নিভে গিয়েছিল। কেবল অন্ধকারের অতল তলে তলিয়ে গিয়েছি, কোন অবলম্বন আজও পাইনি। জীবনে কখনও পাব বলে আশাও করিনে। কারণ আশার আরেক নাম মরীচিকা। কোথা দিয়ে কি হয়ে গেল বুঝতে পারিনি। 

এমনি এক সকালে অসময়ে হাসপাতালে যেতে হল। কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কৌতুহল নিয়েই গিয়েছিলাম। যেয়ে দেখি একটি তরুণ নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। হয়তো তার যন্ত্রণা প্রকাশ করবার ক্ষমতা আর নাই। সুন্দর, বলিষ্ঠ, স্বাস্থ্যবান যুবা। গ্রীষ্মের প্রখর তাপে বৃক্ষলতা যেমন খানিকটা নিরস হয়ে নেতিয়ে পড়ে, একেও অসহ্য যন্ত্রণায় কাবু করে ফেলেছে। রোগটা বিপদজনক –অ্যাপিন্ডিসাইটিস। হাতে সময় ছিলনা। কাজেই তাড়াতাড়ি করতে হলো। নির্দিষ্ট সময়ে সব যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করে সকলের অনুমতি নিয়েই অস্ত্রোপ্রচারে মন দিলাম। বিষয়টা খুবই গুরুতর। আরো আগে আসলে হয়তো রোগটি এত জটিল আকার ধারণ করতে পারতো না। অতি সাবধানে হাত চালাচ্ছিলাম। ওকে বাঁচাবার দায়িত্ব যে আমিই নিয়েছিলাম। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, বিধাতা করেন আরেক। এত সতর্কতা সত্ত্বেও কখন হাত পিছলে হৃদপিন্ডের পরমাত্মীয় একটি ধমণী কেটে গেল। আমি নার্ভাস হয়ে পড়লাম। কোন রকমে রক্ত বন্ধ করা গেল। আসল চিতিৎসা ঠিকই হলো। আমার অভ্যস্ত হাতে কোন প্রকার ত্রুটি হলো না। যথাসময়ে অপারেশন শেষ হলো। রোগী পৃথিবীর আলো বাতাসের স্পর্শ পেল। সবাই বেশ আশ্বস্ত হলো। কিন্তু আমার চিত্তে কোন স্বস্তি ছিল না। আমি প্রতি মুহূর্তে একটা কিছুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। 

পরের দিকে রোগীটিকে তার বেডে ফিরিয়ে আনা হলো। খাণিকক্ষণ বাদে একটি তরুণী রোগীর দর্শন প্রার্থী হয়। মেয়েটি অপরূপ লাবণ্যময়ী। শান্ত মুখশ্রী। উজ্জ্বল দীপ্তি তার চোখে। এগিয়ে যেতে লাগলো ১৩ নম্বর বেডের দিকে। এদিকে ছেলেটির হঠাৎ ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হয়েছে। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তার পরিণতিও বুঝে গিয়েছিলাম। শেষ মুহূর্ত উপস্থিত। এই সময়ে মেয়েটি চাপা উৎকন্ঠা নিয়ে মৃদু  অথচ দ্রুত পদক্ষেপে প্রবেশ করলো। রোগীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। ছেলেটি শেষবারের মত একটু হাসলো। কোনরকমে উচ্চারণ করলো, 

- ‘তুমি এসেছ, রুমু?’ 

রুমু জবাব দিল, ছোট্ট এক টুকরো হাসি দিয়ে। টলে গেল তার গাম্ভীর্য, ছিঁড়ে গেল তার আবরণ, ভুলে গেল বাস্তব দুনিয়া, ঢলে পড়লো মৃতপথ যাত্রীর উপর। আমি আর পরের খবর রাখিনি। তবে অভিভূত হয়েছিলাম, স্তম্ভিত হয়েছিলাম মেয়েটির হাসির কথা স্মরণ করে। হাসির ভেতর দিয়ে যে মানুষের হৃদয়ের গভীর বেদনাকে এত করুণ, এত হৃদয় বিদারক ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, তা আমি কোনদিন দেখিনি, চিন্তাও করিনি। কেবল এক টুকরো হাসি –আর কিছুই নয়! শুনেছি মেয়েটি ও এই ছেলেটি একই পত্রিকায় কাজ করতো। তাদের লেখা প্রায়ই একই দিনে বের হতো। সেই সূত্র ধরে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। মেয়েটি শহরের হস্টেলে থাকে। তাকে এই ছেলেটিই দেখাশুনা করতো।     

গত এক বছর ধরে প্রতিটি মুহূর্তে সেই মেয়েটির এক টুকরো হাসি আমার  স্মৃতিতে আসা যাওয়া করছে। যে হাসি কেবল সর্বহারাদের মুখে ফুটে ওঠে। আর কেউ সে হাসি হাসতে জানে না। কেবলই মনে হয়, সে এসেছিলো আমার কাছে বাঁচতে –এসেছিল মৃত্যুর হিমশীতল পরশ এড়িয়ে এই মাটির পৃথিবীতে আবার শ্বাস প্রশ্বাস নিতে। কিন্তু অদৃষ্টের কি পরিহাস!  আমার জন্য তা হলো না। নব পল্লবিত, মুকুলিত শাখাটি ঝড়ের দাপটে নুইয়ে পড়েছিল আমারই কোলে। নিষ্ঠুর আমি, তাই তাকে আশ্রয় দিতে পারিনি। তাকে আমি নিজ হাতে উড়িয়ে দিয়েছি। 

আশা উদ্দামে পূর্ণ একটি টগবগে যুবকের আমি হন্তা। নীড়হারা পাখির নীড় আমি ভেঙেছি। চকোরীর চকোর, বন্ধুর বন্ধু, মিতার মিতা, প্রিয়ার প্রিয়া, দুর্বলের অবলম্বন আমি নিজ হাতে নষ্ট করে দিয়েছি। 

মানুষ কী ভরসা করে আসে আমার কাছে? বাঁচবে বলে। না, বাঁচানো আমার কাজ নয়। আমি ডাক্তার নই। কে বলে আমি ডাক্তার? 

আমি নরঘাতক! 

আমি যমদূত। 

পাপী, তাপী, খুনী! 

ও নামে কলঙ্ক দিও না। ও নাম কলঙ্কিত করো না। 

আমি খুনী, ছেড়ে দাও, যেতে দাও আমাকে। শাস্তি দাও! আমি খুন করেছি। কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার! কেবল একজন মানুষকেই নয়, আরেকজনের আশা, আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যত জীবনকে!

.............

২৫.০৩.১৯৬১

কুমুদিনী কলেজ, টাঙ্গাইল         


Tuesday, August 19, 2025

এক কৌটা কেরোসিন

 ঝন ঝন ঝনাত –গভীর নিশিথের অখন্ড নীরবতা খান খান করে পিক্‌দানির উল্টো পিঠে রক্ষিত পিতলের কুপিটা বিকট আর্তনাদ করে উঠলো। কুপিটা ছিটকে পড়েছে। পাশের ঘর থেকে শ্বশুর –শাশুড়ি ও একটি শিশু তাল মিলিয়ে পরিবেশটাকে আরো জমকালো করে তুললো। তারপর সমস্বরে ভেসে এলো, 

–‘কি অইছে বউ? কি হইছে? রাইতেও তোমরা একটু শান্তিতে থাকতে দিবা না? কোন কুক্ষণে যে তোমার মত অলক্ষী বউ ঘরে আনছিলাম, তা আল্লাই জানেন।’ ভীত সন্ত্রস্ত বধুটি যথাস্থানে দিয়াশলাই না পেয়ে স্বামীর বালিশের নীচ থেকে তা আবিষ্কার করলো। আলো জ্বালালো। দেখলো আর বুঝতে পারলো যে ঘুমের ঘোরে যে বিড়ালটিকে আঘাত করেছিল, তারই প্রতিঘাতে এই ভীষণ কান্ডের সৃষ্টি। খানিকটা কেরোসিন তৈল গড়িয়ে পড়েছে মাটিতে। প্রকৃত ঘটনা কি তা জানার জন্য পাশের ঘর থেকে বিষমাখা অজস্র প্রশ্নবাণ ছুটে আসছে। শরাহত বধুটি ভীত কন্ঠে ছোট্ট জবাব দিল, ‘কিছু তৈল পইড়া গেছে, মা –জান!’ কিন্তু কথা শেষ হতে না হতেই শ্বাশুড়ীর বেশ কিছুদিনের পুঞ্জিভূত কথার বাণগুলো রুদ্ধমুখ নির্ঝরের মত বাঁধনহারা হয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে ধ্যানী –মৌনী রাত্রির সুগভীর স্তব্ধতাকে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ইথারের তরঙ্গে তরঙ্গে ছড়িয়ে পড়লো। ‘তোমার মত পোড়া কপালী আর কেউ নাই। তোমার কপালের বাতাসে এই কয়মাসেই আমার সংসারের সব ধুইয়া যাইতাছে গা। এই তো সেই দিনকা, কোলের পোলাডার লগে তামাশা কইরা সাড়ে চার টাকা দামের নতুন হারিকেনের চিমনিটা ফাটাইয়া ফেলাইছ। চাইল –ডাইল ধুইবার সময় সের খানিক পানির লগেই থাইক্যা যায়। নবাব সিরাজুদ্দোলার মাইয়া কিনা, হের লিগা কিছু গায়ে লাগেনা।’

তরুণী বধু রাহেলা শুধুই ভাবে আল্লাহ্‌ যদি তার ভাগ্যে তাই –ই লিখেছেন তবে কেন তাকে বধির করে সৃষ্টি করেন নি? আবার ভাবে, বধির হয়ে জন্মগ্রহন করলে, সে যাদেরকে ভালবাসে তাদের আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত থাকতো। তার অতি প্রিয় মানুষটিও বোধহয় শ্বশুর –শাশুড়ির দলে ভিড়ে যেত। না, ঠিক আছে। এমন বকাঝকা শাশুড়িরা বউদের করেই থাকে। তাতে রাগ করবার কি আছে? অনেক রকম চিন্তা করে নিজের মনকে সে বুঝিয়ে বললো, যে, স্বামীর কাছে থাকতে হলে তাকে সবই সইতে হবে। তাই সে রাত্রে স্বামীর ভাষাহীন নীরব সহানুভূতি নিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো।

নিরব পৃথিবী আবার জেগে উঠলো পরদিন প্রভাতে। চোখ মেলে চাইলো।  মুচকি হাসিতে পূর্বাকাশে রাঙা হয়ে উঠলো। ফুল ফুটলো। কিন্তু ঘুম কাতুরে দুটো কুঁড়ি যেন আজ সহসা ফুটতে চাইছে না। ওসমান, রাহেলার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো –শিগগির ওঠো। মা তো অহনাই উইঠা পড়বো। উঠ্‌, উঠ্‌। পাশের ঘর থেকে শিশুর ক্রন্দন ধ্বনি  ভেসে এলো। ধড়মড় করে উঠে বসলো রাহেলা। ওসমান বেরিয়ে গেল। গত রাতের ঘটনা স্মরণ করে রাহেলা শিউরে উঠলো। এত দীর্ঘ দিনটা যে আজ কেমন করে পাড়ি দেবে। পিতৃহীন দুলালী, মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে। তার মা তো তাকে কোনদিনও বকে না। ওসমানও বকে না। তবে ওসমানের মা –বাবা কেন তার ভুল ধরে। 

ক্রমে সূর্যিদেব তার আলোর রথ ছুটিয়ে সব মানুষকে কর্মচঞ্চল করে তুললো। রাহেলার শাশুড়িও জড়তা কাটানোর জন্য বৌকে একই কথা পুনঃ পুনঃ বলতে লাগলো। এক কুপি তেলের দাম দুই আনা। তোমার নবাব বাপের বাড়ি থেইকা আইন্যা ঢালবার পারনা? পরের জিনিসের তো দরদ নাই। এইডা খুব হস্তা! আমার কপালের দোষ। নাইলে এমন অভাগা বউ আইলো আমার ঘরে? খালি খাইবার যম। তোমারে আর রাখতাম না। তোমারে পাঠাইয়া দিমু। 

শেষের বাক্য দুটি রাহেলাকে প্রচন্ড ভাবে আঘাত করলো। দিনের পর দিন যদি তার অপরাধের বোঝা এমনিভাবে বেড়ে যায় –তবে সে কি করবে? তাই সে নিজের ভাগ্যকে বারবার ধিক্কার দিতে লাগলো। যদি তাই না হবে ওসমানের মতো স্বামী কে হারাতে চায়? অজ্ঞানেই হোক আর সজ্ঞানেই হোক, যেখানে একবার ফাটল ধরেছে, তা আর জোড়া দেবার নয়। কাজেই রাহেলা তার ভবিষ্যত চিন্তা করে আকুল হয়ে পড়লো।

দিনান্তে ওসমান বাড়ি ফিরলো। তখন ওসমানের কাছে বউ এর একদফা নালিশ পেশ করা হলো। চঞ্চল পৃথিবী আবার নীরব হলো। রাত্রি নামলো। সে তার সন্তানদের তার ক্রোড়ে আশ্রয় দান করলো। ওসমান আর রাহেলা মিলিত হলো। তারা যেন ক্ষণিকের জন্য দুঃখ ভুলে গেল। অন্যদিনের মত আজও তেমনি জোৎস্না প্লাবিত ছোট্ট আঙ্গিনা পেরিয়ে দিঘীর ঘাটে তারা উপস্থিত হলো। নিত্যকারের মত আলাপ হলো না। শুধু মনের কাছে মন ভীত হলো। কাছে আসতে পারলো না। রাহেলা কেবলই শুনতে পায় –তোমারে আর রাখতাম না। ওসমান বলে, আমি রাখলে তোমারে ছাড়ে কেডা? কিন্ত রাহেলা জানে পারিবারিক ব্যাপারে ওসমানের কোন ক্ষমতা নেই। রাহেলা কোনদিন তার স্বামীর কাছে কোন অভিযোগ জানাতো না। কিন্তু ওসমান সবই অনুমান করতে পারতো। এমনি ভাবে কিছুদিন চলে যায়। কালের পাতায় লেখা ঘটনা মুছে যায় অনেক। কিন্তু শাশুড়ির অন্তর থেকে আধা ছটাক কেরোসিনের দাগ আর শুকায় না। দিনের পর দিন এই বেদনা তাকে পাগল করে তোলে। তাছাড়া প্রতিদিন অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ঘটনা নিয়েও সে এটার আয়তন বৃদ্ধি করে চলছে। রাহেলার কচি মন দিনে দিনে অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে অকেজো হয়ে পড়লো। সে আর কোন রকমেই নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারলো না সেই পরিবেশে। এই অপরাধে অপরাধী হয়ে তাকে পরের দিনই মায়ের বাড়িতে চলে যেতে হয়। যাবার পূর্ব রাত্রিটি তার জীবনের চরম ও পরম রাত্রি হয়ে ধরা দেয়। সেই রাত আর সেই চাঁদ তাদের দুজনার জন্যই যেন সৃষ্ট। ব্যথিত, মথিত, বিক্ষুব্ধ দুটি চিত্তের সেতু বন্ধন। একজনকে আরেকজনের কাছে সমর্পণ করবার উপযুক্ত সময়। অন্তরে অন্তরে আলিঙ্গন। চোখে চোখ আর হাতে হাত রেখে কেবল নিবিড় করে গভীর ভাবে অনুভব করবার এই –ই সময় –এই মহিমাময়ী মৌনা রজনী। অনেক কিছুই বলার ছিল। কিন্তু কিছুই তো মনে আসছে না। তবে হ্যা, নিতান্ত ভাবেই তাকে দু’একটা কথা আজ বলতেই হবে। তাই রাহেলা ভাব বিহ্বল জগতের বাইরে এসে বললো, ‘আমাকে তো কাইল মায়ের কাছে পাঠাইয়া দিব, তুমি তো জানই। আমি তোমার কাছে চিঠি লিখুম। তুমি তো লিখতে জান না, কেবল পড়তেই শিখছো। চিঠির উত্তর চাইনা। আমার চিঠি পাইয়া তুমি যাইও। চিঠির কথা কেউর কাছে কইও না।’ উত্তরে ওসমান বলেছিল, ‘অত ভাইঙ্গা পড়ছ ক্যা? তুমি কাইল যাও। কয়েকদিন পরেই আমি তোমারে লইয়া আসবো। পরে দেখবা সব ঠিক হইয়া যাইব।’ আরো তার কথা বলার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু বাবা –মা যে রকমই হোক না কেন, তারা তো মুরুব্বী। তাই চুপ করে থাকলো। রাহেলা শেষ বারের মত নয়নের জলে ওসমানকে সিক্ত করে দিল। 

রজনী প্রভাত হলো। কিন্তু অন্যদিনের মত রাহেলা তার মায়ের কাছে যাবার আনন্দে আত্মহারা হলনা। যথাসময়ে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হল। মা মেয়েকে কাছে পেয়ে খুব খুশী হল। আদর করে ভরিয়ে দিল। 

গেল বেশ কিছুদিন। রাহেলা ক্রমে ক্রমে অসুস্থ হতে চলল। কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না! অবস্থা খারাপ হতে খারাপতর হতে লাগলো। রাহেলার মা ব্যস্ত হল। রাহেলা স্বামীর স্মরণে স্মারক লিপি রচনা করলো। কোন একটা হিতাকাংখী কর্তৃক পত্রখানি ওসমানের নিকট প্রেরিত হল। 

দুপুর গড়িয়ে গেল। ওসমান লাঙ্গল তুলে গরু ছেড়ে বাড়ির দিকে রওনা হল। আজ তার মনটা ভাল নেই। কোন কাজেই মন বসছে না। তাছাড়া একটা কাক তার মাথার উপর দিয়ে কা –কা কর্কশ রবে উড়ে গেল। ওসমানের অন্তর আর্তনাদ করে উঠলো। সকালে ঘর থেকে বের হবার সময় তার মাথাটা  চালের সঙ্গে ঠুকে গিয়েছিল। এ সমস্ত মোটেই ভাল লক্ষণ নয়। তবে কি তার রাহেলার অসুখ করেছে! তার তো চিঠি পাঠানোর কথা ছিল। আর চিঠি লিখলেই বা এত তাড়াতাড়ি চিঠি নিয়ে কেউ আসবে না। এসব ভাবতে ভাবতে একবার হোঁচট খেয়ে কোনক্রমে টাল সামলে নেয়। এমন সময় একটা লোক এদিক ওদিক তাকিয়ে তার হাতে একটি পত্র গুঁজে দিল। ওসমানের বুকটা ধড়াস করে উঠল। সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিঠি নিয়ে বসে পড়লো। কাঁচা বড় বড় হরফে লেখা সে পড়তে শুরু করলো। 

প্রিয়তম, 

সারা জীবন তোমাকে যাহা দিয়া আসিয়াছে আজ তাহার ব্যতিক্রম হইবে না। আমি জানি তুমি আজও তাহাই গ্রহণ করিবে। তোমাকে ছাড়িয়া আসিতে খুব কষ্ট হইয়াছে। আমি দিনরাত কিছুই চিন্তা করিনা। কেবল পূর্ণিমা রাতের সেই হাসিমাখা মুখটার দিকে চাহিয়া থকি। তুমি এখানে আসিলে তোমার সাথে প্রাণ খুলিয়া কথা বলিতাম। তুমি যে ছল করিয়া আমার হাসি দেখিবার জন্য রান্না ঘরে বার বার আগুন আনিতে যাইতে তাহা আমার মনে পড়ে। এখানে তোমাকে, হাসিয়া কথা বলিলে কেহ তিরস্কার করিবে না।

আমার শরীর অত্যন্ত দুর্বল। তোমাকে দেখিতে খুব ইচ্ছা হয়। হাতের লেখা দেখিলেই বুঝিতে পারিবে আমার শরীর কত খারাপ। অনেক সময় মনে হয় বাঁচিব না। আর না বাঁচলেই বা কি? আমার জীবনের দাম এক কুপি কেরোসিন তেলের চেয়েও কম। আমি মরিয়া গেলে মনে করিও আধা ছটাক কেরোসিন তৈল দৈবক্রমে মাটিতে পড়িয়ে গেল। আর তোমাদের যা কিছু আমার সঙ্গে ছিল, এখান হইতে লইয়া যাইও। দুঃখ করিও না। তোমার জীবনে সুখ আসুক আমি তাই কামনা করি। আর শেষবারের মত যা দেবার ছিল, তা কাছে পাইলাম না বলিয়া বাকী রহিল। 

ইতি –ভাগ্যহীনা রাহেলা


চিঠি পড়া শেষ হল। ওসমানের মাথাটা যেন একবার ঘুরে উঠলো। সে বাহ্যিক জ্ঞানহারা হয়ে পড়লো। উর্ধ্বশ্বাসে রাহেলার কাছে ছুটে চললো। অনেক দূর দৌড়াবার পর সে রাহেলার বাড়ির কাছে এসে হঠাৎ থেমে গেল। দেখলো অনেক লোক জড়ো হয়ে কার যেন জানাজা পড়ছে!

.............

২০.০৮.১৯৬১

Saturday, April 5, 2025

গল্প-আবর্তন

 পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসই প্রথমে দুর্বল হয়ে জন্মায়। তারপর ক্রমে তার শক্তির বিকাশ হয়। পুনরায় সে শক্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তেমনি প্রতিদিন সূর্যও ভূ–গোলকের একটি স্থানে সূচিভেদ্য অন্ধকারকে তাড়িয়ে তার কোমল আলোর পরশে প্রাণিজগতের ঘুম ভেঙ্গে দেয়। ক্রমে তার আলো বা তাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষকেও সে কর্মচঞ্চল করে তোলে। আবার ঢলে পড়ে, ক্লান্তিতে, পশ্চিম দিগন্তে। হয়ত বা বিশ্রাম নেবার উদ্দেশ্যে। তখন মানুষেরাও ক্লান্ত হয়ে আশ্রয় নেয় তাদের নিরালা শান্তিময় বিরাম কুঞ্জে। তেমনি সেদিনও সূর্যি মামা সারাদিন তার নিয়মিত কাজ সেরে দিনান্তে আশ্রয় নিতে চাচ্ছে। তার রক্তিম আভাটুকু তখনও ধরণীর বুক থেকে মুছে যায়নি। তার রশ্মিগুলো তির্যক ভাবে ধরণীর দিকে তাকিয়ে আছে। হয়ত বা বিদায়ের করুণ ব্যথাই তার বুকে বড় হয়ে বাজছে। এমনি পরিবেশে দ্বিতলের একটি কামরায় বসে ডা. রাশেদ যার ডাকনাম ফুল, মুক্ত বাতায়ন পথে সে চেয়ে আছে মহাশূন্যে। তার দৃষ্টি যেন অসীম অনন্তকে ছাড়িয়ে একটি মাত্র বিন্দুকে লক্ষ্য করছে। তাহলে বুঝা যাচ্ছে সে কোন একটি বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করছে। সে হয়ত তার অতীত স্মৃতিকে রোমন্থন করছে –অমৃত লাভের সন্ধানে। কিন্তু তার ভাগ্যে অমৃত উঠবে না গরল উঠবে তা কে জানে? ফুল আজ সারাদিন কিভাবে কাটালো?  

এই একটি দিনই তার জীবনের চরম মুহূর্ত নিয়ে অপেক্ষা করছিল। মনে পড়ে তার সকালের কথা। জরুরী ডাক পড়েছিল হাসপাতালে। তার নতুন চাকুরি। তবুও লোকের কাছে অল্পদিনেই পরিচিত হয়ে উঠেছে,লোকের আকর্ষণের বস্তু হয়ে উঠেছে। সে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল হাসপাতালে। একখানি লতানো দেহ বিপরীত দিকে মুখ করে শুয়ে আছে ‘বেড’–এ । বুঝা গেল রোগী একজন নারী। ডা. ফুল রোগিনীর সামনের দিকে গেল।। সে রোগিনীর শীর্ণ হাতখানি ধরে ঘড়িতে হৃৎস্পন্দন দেখলো। তারপর মুখের দিকে তাকালো। তখন লক্ষ্য করলে দেখা যেতো ফুলের মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার হৃৎপিন্ড খুব দ্রুত রক্ত সঞ্চালন করছে। মৃত্যু যেন তাকেই পেয়ে বসেছে। এমনি তার ভাবখানা। মুহূর্তে সে নিজেকে সামলে নিয়ে কর্তব্য কাজে মন দিল। বোধহয় তার সারাজীবনের ডাক্তারী বিদ্যা আজ কাজে লাগিয়ে এই অকাল মৃত্যুর গ্রাস হতে রোগিনীকে রক্ষা করতে হবে। কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে ফুল বুঝতে পারলো চেষ্টা বৃথাই মাত্র। আশা নেই। প্রদীপে তৈল নেই। তবুও সে হাল ছেড়ে দিল না। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। এসব চিন্তা করে সে একটি ইনজেকশান দিল। একটু পরেই রোগিনী চোখ মেলে চাইলো। কিন্তু তার দৃষ্টি পলকহীন ভাবে পড়ে আছে ফুলের মুখের উপর। তার ভাব দেখে মনে হলো সে যেন কি সুখের মরণ মরতে যাচ্ছে। সকলেই ভাবছে এই দৃষ্টির অর্থ নেই। কিন্তু ডাক্তার বুঝতে পেরেছে এই দৃষ্টির অর্থ। তারপর রোগিনী অতি কষ্টে মৃদুস্বরে উচ্চারণ করলো,‘ফুল।’  

কেউ বুঝতে পারছিল না তার কথা কেবল মাত্র ডাক্তার ছাড়া।  

-‘চলে যাচ্ছি চিরতরে আমার প্রিয় পৃথিবী ছেড়ে। চলে যাওয়াই উচিত। আরো আগেই যেতে হতো। তবে আজ বড় সুখ পেলাম। সে সুখ মৃত্যু যন্ত্রণাকেও জয় করেছে। দুঃখ করো না এভাবে তোমার সঙ্গে দেখা হলো বলে।’  

শেষের কথাগুলো ভাল বুঝা গেলনা। ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও সে তার শেষ কথা বোধ হয় ডাক্তারকে শুনিয়ে গেল। তার কথা বলার শক্তি ধীরে ধীরে শেষ হয়ে এলো। মেয়েটি সুবোধ বালিকার মত শান্ত হয়ে এলো মেয়েটির স্বামী,আত্মীয়,পরিজন যারা কাছে ছিল, তারা সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সবাই ডাক্তারকে আঁকড়ে ধরতে চায়। কিন্তু ডাক্তার নিরুত্তর। বহু কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক রাখে। মেয়েটি অত্যাধিক চঞ্চল হয়ে উঠলো। কি একটা বললো বোধগম্য হল না। সে তার নিঃশেষিত শক্তির সমস্তটুকু দিয়ে ডাক্তারের হাত ধরে থাকলো। ক্রমে সে নিস্তেজ হলো। তার শিথিল হয়ে যাওয়া হাত খুলে গেল। ডাক্তার আবারও তার নাড়ি দেখলো। উদাস দৃষ্টি মেলে আত্মীয়দের দিকে তাকালো। তাকে আস্তে আস্তে যত্নের সঙ্গে শুইয়ে দিল। তারপর দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আরও দ্রুত পদ সঞ্চালন করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডক্টর্স্ কোয়ার্টাসে তার কামরায় পৌঁছে গেল। তখন দেয়াল ঘড়ি ঘোষণা দিল ঢং ঢং ঢং। ফুল এতক্ষণ পর হাত ঘড়ির দিকে তাকালো। দেখলো সত্যি তিনটা বাজে। সে বসে বসে ভাবতে থাকে তার অতীতকে।         

সময় মানুষের জীবনকে কত বদলে দেয়। মনে পড়ে একসময়ে মালা আর ফুলদের বাসা ছিল পাশাপাশি। প্রথমে পরিচয়,পরে বন্ধুত্ব। তারপর আরো কিছু। দুজন –দুজনকে ভালবাসতো নিবিড় করে গভীর ভাবে। স্কুলের সময় ছাড়া তারা একই সঙ্গে থাকতো। তারা যেমন সরল ছিল, সবাই তাদের সরল চোখেই দেখতো। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব গাঢ় হলো,ভালবাসা প্রেমে পরিণত হতে চললো। কিন্তু তাদের চারপাশ তাদের এই মেলামেশা আর সহজ ভাবে মেনে নিতে পারলো না। চারিদিক থেকে এলো বাধা। সব্বাই বললো, ‘পরিণাম খারাপ হবে। দুজনেই সরে পড়।’ মালার স্কুল জীবন সাঙ্গ হলো। বাধ্য হয়ে তাকে সরে পড়তে হলো। দুজনেই দুই শহরের কলেজে ভর্তি হলো। দুজনে দুজনের চোখের আড়াল হলো বটে,তবে মনের আড়াল হতে পারলো না। পরস্পরেরে আকর্ষণ প্রবল হলো। এরপর আরো বহু বাধা এসেছে। এমনকি পত্রালাপও বন্ধ হয়েছে। মনে পড়ে মালার শেষ চিঠির কথা। সে চিঠিটা সে ‘কাবুলীওয়ালা’-র মত সঙ্গেই রাখে। তার মানিব্যাগের ভেতর ওটা স্থান পেয়েছে। সেই চিঠিটা সে বের করে ফেললো। কম্পিত হস্তে সে খুলে ফেললো চিঠিটা।    

প্রিয় ফুল,   

তোমার চিঠি পেলাম। আর হ্য়তো তোমার লেখা আমার হস্তগত হবে না। তোমার চিঠি পেয়ে খুশী হয়েছি না দুঃখিত হয়েছি বলতে পারবো না। তোমার চিঠি না পেলেও শেষ বারের মতো এই চিঠি আমি লিখতাম। কিন্তু কি লিখবো বলতো? আজ যে আমার জীবনের চরম দিন উপস্থিত হয়েছে। এত যত্নে, এত সাধে গড়া সুখের জীবনের কল্পনা আজ মাটি হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জগতের প্রতিটি পদার্থ এমনকি অপদার্থরাও আমাকে বিদ্রূপ করছে। আমি চলেছি যন্ত্রচালিতের ন্যায়, অনুভূতিহীন। আমার উপর চলছে সামরিক শাসন। হঠাৎ মানুষগুলো কেমন বদলে গেল। তাদেরকে বড় অচেনা মনে হচ্ছে আমার। কেউ আমার আপন নয়। তুমি বিশ্বাস করছো কিনা জানি না।  তুমি লিখেছ,‘দীর্ঘকাল ধরে প্রতি মুহূর্তে ফুলে ফুলে যে মালা তুমি রচনা করেছ,সেটা ছিঁড়ে ফেল। নতুন করে মালা তৈরী করে তোমার প্রিয়তমের গলায় পরিয়ে দিও। মানাবে ভাল। আমাদের ফেলে আসা অতীতকে মনের কোণে ভিড় জমাতে দিও না। আর তাছাড়া আতীত এত বোকা নয়,সেও ভিড় করতে আসবে না। অর্থাৎ তার আর সেখানে ঠাঁই হবে না। সাবধানে থেকো। অতীত যদি মনের পর্দা উন্মোচন করে আসেও তাকে অতি গোপনে তাড়িয়ে দিও। প্রতিবাদ জানাবে না। আদর্শ গৃহিনী হও। তোমার প্রিয়তম ভাগ্যবান হউন।’  

তুমি যা লিখেছ সেজন্য তোমাকে প্রতিঘাত করতে চাইনা। সমাজ সংসারের যে নিয়ম,তুমি তাই অনুসরণ করেছ। তুমি আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পার নাই বা চেষ্টাও কর নাই। তবুও জেনে রেখ, জীবনের প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিদিন তিলে তিলে সমস্ত অনুভূতি দিয়ে ‘ফুলে ফুলে যে মালা’আমি রচনা করেছি,সে মালা আমি তোমাকেই পরিয়ে দিয়েছি। সে মালা পাওয়ার মত ভাগ্যবান অন্য কেউ নেই। হয়তো ভাববে,নেহাৎ মেয়েলী মনের ক্ষণিকের আকুল আবেদন। কিন্তু জেনো আমার মন চিরকাল তোমার জন্যই উন্মুখ হয়ে থাকবে, হয়তো শেষ মিলনের জন্য। আর জেনো একটি মাত্র গ্লাসে সেই আয়তনের দু’গ্লাস জল ধরে না। তোমাকে আর কি বুঝাবো? আজ বাংলাদেশের মেয়েরা গৃহলক্ষী, খুব বাধ্য মেয়ে, একথাই প্রমাণ করতে যাচ্ছি। কিন্তু একটা কথা আছেনা, মেয়েরা ছলনাময়ী। আমি হব তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বলতে লজ্জা নেই, কেননা আমি করতে যাচ্ছি অভিনয়। কেবল অভিনয়। শুধু ফাঁকির বোঝা বয়ে বেড়াবো। অন্তরে অন্তরে পুড়ে ছাই হয়ে যাবো সেই চারুদত্ত আধারকারের মতো। আমি নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে চাই। তবে বিধাতার নিকট আমার প্রার্থনা আমি যেন জীবনের শেষ ক্ষণে তোমার সাক্ষাৎ পাই। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। এটাই আমার শেষ চিঠি। পরম লগ্ন তার বিভিষীকাময় আকুতি নিয়ে কঠিন হাতে লৌহ শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলার জন্য এগিয়ে আসছে। শেষবারের মতো ক্ষমা চাইছি। আর শেষবারের মতো তোমার জন্য রইলো – চিরকাল যা দিয়ে এসেছি – হৃদয় নিংড়ানো প্রীতি, বুক ভরা ভালবাসা। উপহাস করো না লক্ষীটি। তুমি সুখে থেকো ভালো থেকো।                                   

ইতি –                                

তোমারই মালা 

কুমুদিনী কলেজ,টাঙ্গাইল

০৫.০৪.১৯৫৯

Friday, January 3, 2014

বেদনার কালিদহে

 রাস্তার পাশের বাড়িতে বসবাস করবার উপকারিতা আছে, মজাও আছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একই লোক একই  সময়ে ঐ রাস্তায় চলাচল করে। প্রায় প্রতিদিনই দেখতাম একটি লোক ধীরে ধীরে হেঁটে এসে রিক্সায় উঠতো। পরিধানে তার লাল কালো অথবা নীল রঙের পোশাক। আপাদমস্তক। অর্থাৎ তার লুংগি, কুর্তা, পাগড়ি একই রঙের। লম্বা, ফর্সা, বৃদ্ধ, শীর্ণকায়া লোকটি। দীর্ঘদিন একই দৃশ্য অন্তরে কৌতূহল জাগায়। একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে, সে একজন কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি। বহুকাল ধরে এই কবরস্থানের পাশে এই দীঘির ঘাটে বাস করে। দীঘির ঘাটটি শান বাঁধানো। গম্বুজ বিশিষ্ট একটি স্নানঘর আছে, সুদৃশ্য। বিরাট পুকুরটি অতীতের কোন ধনবান ব্যক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কেবল ঘাটই নয়, পুকুরটির চারপাশ নক্সা করা দেয়ালে ঘেরা –সুরক্ষিত ও বটে। পুকুরটির তিন দিকে কবরস্থান। সম্প্রতি কবরস্থান উঠে যাওয়ায় পুকুরের অপর পাশে ঐ বিরাট বটবৃক্ষের গোঁড়ায় তাকে থাকতে দেয়া হয়েছে। লোকটি এখন রোগমুক্ত। লোকটির নাম করম আলী শাহ্‌।           

ভূমিষ্ঠ হয়েছিল মুষ্টিবদ্ধ হাতে বাঁচার অংগীকার নিয়ে। সেদিন সমারোহ না হোক, অনন্দ হয়েছিল তাদের গৃহে। কারণ সে ছিল পিতামাতার পুত্র সন্তান। আশার আলো জ্বলবে ঘরে, সংসারে আনয়ন করবে সমৃদ্ধি আর উন্নতি।

করম আলী শাহ্‌ বাঁচার জন্য এসেছিল। বেঁচেও ছিল অনেকদিন। কিন্তু সে বাঁচা কেমন বাঁচা, আমার গল্পে তাই –ই ব্যক্ত হয়েছে। করম আলী শাহ্‌ এক অভিশপ্ত ব্যাধির শিকার হয়। যার নাম কুষ্ঠ। টগবগে যুবকের আলোক লতার মতন ঝলমলে জীবন। শক্তিতে, আবেগে, আনন্দে, উচ্ছ্বাসে ভরপুর যৌবনে, জীবন তরী বেয়ে যায় সে। হঠাৎই একখন্ড কালো মেঘ কোথা হতে উড়ে এসে তার উপর ছায়া ফেলে। করম আলী শাহ্‌’র অসুখ ধরা পড়ে। ঘনঘোর অন্ধকারে এক ঘূর্ণিঝড় তার জীবন নৌকাখানিকে প্রচন্ড বেগে কয়েক পাক ঘুরিয়ে জলদেশের অতলে কোথায় নিয়ে গেল, কে জানে! তারপর শুরু হল তার দুর্বিষহ জীবন। আপন গৃহ, আপন পরিবার হতে বিতাড়িত হয় সে। প্রথমে নির্জন নদী তীরে পর্ণকুটিরে বন্য পশু পাখিদের সঙ্গে বসবাস। পরে সেখান হতে বহিষ্কৃত হয়ে পরবাস অর্থাৎ গ্রাম ছেড়ে শহরে। যেখানে সবাই পর, কেউ আপন নয়। অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তান হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন। ভিক্ষা গ্রহণ করবার মত ঘৃণ্য কাজ যে আর নাই –তা সে কল্পনাও করতে পারে নাই। কাজটি বড় কঠিন কাজ। মানুষ বড় নির্দয়, ভিক্ষা দিতে চায় না। তবুও পেটের দায় বড় দায়। 

ইচ্ছে করে মানুষ মরতে পারে না। করম আলী শাহ্‌ এই রোগগ্রস্ত দেহ ত্যাগ করবার জন্য প্রস্তুত ছিল। যমদূত অন্যদিকে ব্যস্ত থাকায় তার কথা ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু জীবন তাকে ছাড় দেয়নি, মৃতের চাইতে অধম করে রেখেছিল। দীর্ঘকাল রোগ ভোগের পর রোগমুক্তি হয়েছিল তার। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া হস্তপদের অনেকাংশ ফেরৎ পায়নি সে। হয়নি তার মনুষ্য সমাজে পুনর্বাসন। মানুষ হিসাবে সে আর স্বীকৃতি পায়নি। পরিত্যক্ত মনুষ্যরূপী প্রাণী হিসাবে খাদ্যের অন্বেষণে দিন কাটাতো। রাতে কবরস্থানের এক কোণে মৃতদের পাশেই নিদ্রার আবেশে ফেলে আসা অতীতের স্বপ্নীল জীবনে ঘুরে বেড়াত। সেই সুদূর অতীতে প্রায় ৭৫ বৎসর পূর্বে সে লিখতে পড়তে শিখেছিল। সন্ধ্যায় দোকানে বসে কন্ঠের দরদ দিয়ে পুঁথি পাঠ করতো। গ্রামের লোকদের চিঠি পড়ে দিত। তার কন্ঠে মধু ছিল, হৃদয়ে আবেগ ছিল, চেহারায় সৌন্দর্য্য ছিল, অন্তরে সৃজনশীলতা ছিল। কোথায় গেল সব!

আমার বাসস্থান হতে প্রায় ৫০০ গজ দূরেই ছিল তার জীর্ণ কুটির। সেই কবরস্থানের পাশে সেই বিরাট রাজকীয় দীঘি। তার অপর পাশে এক কোণে আছে এক বিরাট বট বৃক্ষ। শতবর্ষের প্রাচীন তো বটেই। বিশাল এলাকা জুড়ে তার শাখা প্রশাখা বিস্তৃত। তার গুড়িটির পরিধিও খুব বড়। তার বৃহৎ মূল মৃত্তিকার বহু গভীরে প্রোথিত। বৃক্ষের গোঁড়া ঘেঁষে ছিল করম আলী শাহের ক্ষুদ্র নিবাস। ঘরের ভেতর একটি টিনের মাঝারি সাইজের ট্রাংক। আর তার দৈনন্দিন ব্যবহার্য দ্রব্যাদি। আর ছিল গাঢ় নীল, গাঢ় লাল আর কালো বর্ণের লুঙ্গি,পাঞ্জাবী,পাগড়ির সেট। প্রতিক্ষণের সঙ্গী একখানি লাঠি, ঝোলা আর পানীয় জলের ছোট একটি ক্যান।

তারপর বেশ কিছুদিন আর তাকে রাস্তায় যাতায়াত করতে দেখিনা। যে লোকটি আমাকে করম আলী শাহের খবর দিত তাকে জিজ্ঞেস করায় সে উত্তর দিল, সে তো বহুদিন আগে, বছরখানেকের উপরে হবে, চলে গেছে। বললাম, চলে গেছে মানে? 

- কোথায় চলে গেল?

- তিনি তো মারা গেছেন!

- মারা গেছেন? কই শুনিনি তো?

- শুনবেন কি করে। গরীব মানুষ, অসুস্থ, বয়সের ভার। উঠতে বসতে পারছিলেন না। তারপর একদিন...।

- আমার কন্ঠের ব্যাকুলতা দেখে লোকটি আর কিছু বললো না। 

করম আলী শাহ্‌ যে জনমানবহীন কবরস্থানের পাশে আস্তানা গড়েছিল, সেখানে এখন একটি পীরের মাজার ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। মৃতের সমাধিস্থলে এখন গড়ে উঠেছে জীবন্ত মানুষের আধুনিক সুদৃশ্য আবাসিক অট্টালিকা। সেজন্য আবাসিক এলাকা পাহারা দেবার জন্য করম আলী শাহের আস্তানার অদূরেই ছিল সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা রক্ষীদের ব্যারাক। ওরাও তার খোঁজ খবর রাখতো। একটি লোক নিয়োগ করেছিল করম আলী শাহ্‌ নিজেই। সেই তাকে দেখাশুনা করতো, রান্না বান্না করে দিত। তখন করম আলী শাহ্‌’র চলাফেরার ক্ষমতা ছিলনা। বাইরেও যেতে পারতো না। 

লোকটি আরোও বললো, তার কেউ ছিলনা। সরকারি কবরস্থানে তার দাফন হয়েছে। মৃত্যু যাকে দয়া করে নাই, জীবন তাকে মেরে রেখে দিয়েছিল। 

‘জিসে মওত নে  না পুছা

উসে জিন্দেগি নে মারা।’

জানিনা তার আত্মা এই মনুষ্য দেহ থেকে মুক্ত হয়ে কেমন আছে! 

মানুষের থাকে বাঁচার শখ। করম আলী শাহের ছিল মরবার শখ। রাস্তার পাশে বসে থাকতো মানুষের একটু দানের আশায়। মানুষেরা বড় নিষ্ঠুর, ভিক্ষা দিতে চায় না। করম আলী শাহ্‌ কত তরতাজা মানুষকে মরতে দেখেছে এই রাজপথে। কতজনকে দেখেছে প্রিয় স্বজন পরিবৃত্ত হয়ে সমাধিস্থলে যেতে। আজ এতদিন পরে আজরাঈলের সময় হলো। সে করম আলী শাহের দরজায় আঘাত করলো। ইচ্ছে ছিল যমদূতকে দেখবে। একবার –শেষবার। কিন্তু সে সুযোগ যে পায়নি। কেমন যেন ঘনঘোর অন্ধকার তার চোখের আলো কেড়ে নিল। প্রথম কুষ্ঠ রোগের সংবাদ শুনে যেমন তার চেতনার অবলুপ্তি ঘটেছিল, এবারও যেন তাই হলো। সেজন্য মৃত্যুর হীমশীতল পরশখানি তার উপলব্ধির বাইরে থেকে গেল। জীবন এবং মৃত্যুর কোন আশাই পূরণ হলো না। সবই সেই অচেনা, অজানা, অদৃষ্টের হাতে তোলা রইলো। নিঃসংগ করম আলী শাহ্‌ নিভৃতে, নিশীথে, নীরবে, নিঃশব্দে, নির্জন কুটিরে তার জীর্ণ, শীর্ণ, দীর্ঘ দেহখানি ফেলে রেখে চলে গেল। 

করম আলী শাহ্‌র ছোট্ট কুটিরের কি অবস্থা জানতে চাইলাম। লোকটি বললো, সে তো কবেই আর্মি এসে ভেঙ্গে পরিষ্কার করে রেখে গেছে। এটা আর্মির জায়গা তো! করম আলী শাহ্‌কে থাকতে দেওয়া হয়েছিল তার আশ্রয় ছিলনা বলে। 

অন্তরে বেদনা অনুভব  করলাম। একজন মানুষের জীবন কি? দীর্ঘকাল এই পৃথিবীর আলো বাতাসে জীবন সংগ্রাম করে অন্তিম মুহূর্ত অতিক্রম করে চলে গেছে। কেউ আজ জানবে না –এখানে কেউ ছিল! এই প্রাচীন বৃক্ষ তাকে আশ্রয় দিয়েছিল, ছায়া দিয়েছিল, বাতাস দিয়ে তার দেহমন শীতল করেছিল। সেই আশ্রয়দাতা বিরাট বটবৃক্ষই আজ করম আলী শহের জীবন –মরণের নীরব সাক্ষী। তারই দীর্ঘশ্বাস তার পত্র –পল্লবে মর্মরিত হয়।

..............

০৪.০১.২০১৪     

Tuesday, December 15, 2009

জীবনের বাঁকে

 শেষ পর্যন্ত মালিহার পোস্টিং অর্ডার এলো। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক পল্লী গ্রামের কলেজে। মালিহা ইচ্ছে করেই এরকম একটি অদ্ভুত স্থানে চলে এলো। এই কলেজে কয়েকটি মাত্র মেয়ে পড়ে। আর বাকী ছাত্ররা সব আশে পাশের কয়েক গ্রামের। মেয়েদের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ কম্পাউন্ডের ভেতরেই দু’টি রুম নির্দিষ্ট করে রেখেছে। সেই মেয়েদের কামরাতেই মালিহার থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এ কলেজটি সরকারি কলেজ। অনেক সুযোগ দিয়েছে সরকার। কিন্তু শিক্ষকের বড়ই অভাব। এই পাড়াগাঁয়ে কেউ থাকতে চায় না। মালিহার মন্দ লাগে না। গ্রামীণ পরিবেশ। গাছপালার মর্মর ধ্বনি, চারিদিকে সবুজ শ্যামল শস্যক্ষেত্র। অনেকে ভাবে এ মহিলা এখানে কেন? কিন্তু কেউ জানে না মালিহা তার পরিচিত জগৎ থেকে পালিয়ে এসেছে। 

কাজে দক্ষ বলে মালিহাকে সকলে সমীহ করে। এখানে একজন অংকের প্রফেসর আছেন, তিনি অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য তদবীর করেন না। তিনি কলেজের জন্য খুব পরিশ্রম করেন। কলেজে প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপাল নেই।। কারণ এখানে শহরের কোলাহল নেই, বিজলী বাতির চমক নেই। সেই কাক ডাকা ভোরে মালিহার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুরে ঘুরে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে। ‘ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে’- দিনের সূর্যোদয় দেখে। আর দেখা হয়, ‘একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিশির বিন্দু!’

কালক্রমে দেখা যায় অংক স্যার নাসিরুদ্দিন আর মালিহাই কলেজ চালান। অন্য বিষয়ও তাদেরকে পড়াতে হয়। শিক্ষক যায় বদলি হয়ে, নতুন শিক্ষক আসে। ছাত্র ছাত্রীরা পরীক্ষা দিয়ে চলে যায়, নতুন ছাত্র ছাত্রী আসে। স্থায়ী থাকে দু’জন মাত্র। মালিহা আপা, নাসিরুদ্দিন স্যার। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। 

মজার বিষয় এরা দুজন দুজনকে চেনে। কিন্তু পরিচয় জানে না। একদিন নাসিরুদ্দিন বললেন, আপা, আপনার পরিচয় জানা হয়নি। মালিহা বলেন, পরিচয় আমার আহামরি কিছু নয়। ঐ চাকুরীর খাতায় যা লেখা আছে তাই।

– তবুও আরো কথা থাকে।

– আমার সবকিছু থাকা সত্ত্বেও আমি এক নীড়হারা পাখি।এই জন–অরণ্যে আমি একা। পথ হারিয়ে এই নিভৃত পল্লীর কোলে ঠাঁই খুঁজে পেয়েছি।

– আপনি এত হাসি –খুশী, এত কাজ করেন, দেখে মনে হয় না আপনার কোন দুঃখ আছে।

– দুঃখ আমার নেই। তবে অপমান বোধ আছে। একজনকে আশ্রয় – প্রশ্রয় দিয়ে আমি প্রতারিত হয়েছি।  

– যদি আপনার আপত্তি না থাকে তবে আমাকে বলতে পারেন।

– আপনাকে বলে আমার কি লাভ? আপনি কি আমার মনের ভার লাঘব করতে পারবেন? আপনার পরিচয় তো আমার জানা নেই। আগ্রহও জাগেনি। মনে হয় যারা একা থাকে তাদের একটা অতীত আছে। 

– নাসিরুদ্দিন চুপ করে থাকে। নিজের মগ্ন চৈতন্যে কোথায় যেন বেদনার সুর বেজে উঠে। তারপর বলে, আপা, যদি অজান্তে আপনাকে কষ্ট দিয়ে থাকি তার জন্য ক্ষমা চাই। 

– ক্ষমা চাওয়ার মত অপরাধ করেন নি। স্বাভাবিক জীবন যাদের, তাদের গল্প –সল্প আলাদা। তারা জীবনের সুখ –দুঃখের কথা আপনা থেকে অনর্গল বলে যায়। আপনার আমার মত দরজায় অর্গল এঁটে রাখে না। আমার জীবনে অনেক কথা নেই, অনেক ঘটনা নেই। তবে যা ঘটেছে তা মর্মান্তিক। আমি ছোটবেলা থেকে একজনকে চিনতাম। স্কুলের নীচের ক্লাস থেকে। তারপর বহুদিন গত হয়েছে। ইউনিভার্সিটিতে পড়বার সময়ে আবার তার সঙ্গে দেখা হয়। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে মেলা –মেশা একটু বেশী হয়ে গেল। ভাবলাম প্রেমে পড়েছি। সেও তাই ভাবলো। আমার চাইতে তার আগ্রহই অধিক। আমি তা সত্য বলে মেনে নিলাম। পাশ করে বের হলাম উভয়েই। ভাল রেজাল্ট বলে তার ভাল চাকুরী হল। আমি পেলাম শিক্ষকতা। তার আর বিলম্ব সইছে না। সুতরাং পরিবারের দ্বারস্থ হতে হল। উভয় পরিবারের সম্মতি ক্রমে আমাদের সাজানো গোছানো ঘর –সংসার হলো। সুখে, আনন্দে, শান্তিতে দিন যেতে লাগলো। বছর দুয়েক কেটে গেল স্বপ্নের ঘোরে। এবার পরিবারের কলেবর বৃদ্ধির চিন্তায় আমরা বিভোর। সব কাজে তারই উৎসাহ অন্তহীন।

– আমরা ক্লাবে, পার্টিতে যাই। খুব মজা করি। একবার পরীক্ষার খাতা নিয়ে খুব ব্যস্ত। বেশ কিছুদিন যে কোথা দিয়ে গেল! এই সময় তাকে বেশ উদাসীন মনে হতে লাগলো। প্রশ্ন করলে উড়িয়ে দেয়। অল্পদিনের মধ্যে তার আমার দূরত্ব বৃদ্ধি পায়। আমি নিজের দোষ খুঁজে বেড়াই। হঠাৎ একদিন বলে, আমার পোস্টিং হয়ে গেছে।     

– বদলি হয়েছ, কোথায় ? 

– চট্টগ্রামে।      

– হঠাৎ বদলি কেন?

– আমি আর এখানে থাকবো না। কালই চলে যাব।

মনে পড়লো সেদিন সে বাসায়ই ছিল। অফিসে যায়নি। আমি ছিলাম কলেজে। এরই মাঝে তার যা কিছু সব গুছিয়ে রেখেছে। আগে কোনদিন কাপড় –চোপড় , বাক্স গোছাতে জানতো না। এবার খুব ভালভাবে পেরেছে। অবাক হয়ে বললাম, এত তড়িঘড়ি পোস্টিং অর্ডার এলো কেন? কি করেছ অফিসে?

- কিছুই করিনি। আমি যেতে চেয়েছি, তাই যাচ্ছি।  

আরো বিস্মিত হয়ে বললাম, কেন? কি বলছো এসব? 

পরে তোমার সব কথার উত্তর দেবো, আজ নয়। বলে ঘুমিয়ে পড়লো। পরদিন সে চলে যাওয়ার পর আমি আমার টেবিলের উপর ডিভোর্স লেটার পেলাম। বিশ্বাস করতে পারিনি। ঘটনার আকস্মিকতায় জ্ঞান হারালাম।সেদিন ছিল ছুটির দিন। দুপুরে আমাদের বাড়ির লোকজনদের ডেকেছিলাম একসংগে লাঞ্চ করবো বলে। তারা এসে আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় আবিষ্কার করে। শুশ্রূষা করে। জ্ঞান ফেরে আমার। বিকেলে অবস্থার উন্নতি হলে ইকবাল কোথায় তারা জানতে চায়। আমার মনে পড়ে গেল সব কথা। আমি তাদেরকে চিঠিটি দেখতে বললাম।তারাও বিস্ময়ে নির্বাক। কি করে বুঝাই যে কিছুই হয়নি, কোন ঘটনা ঘটেনি। আমার ভাইয়েরা ইকবালের অফিসে খোঁজ নিতে গেল। এক অবিশ্বাস্য সংবাদ সংগ্রহ করে আনলো।ইকবাল কারো বাগদত্তাকে নিয়ে পালিয়ে গেছে দেশের বাইরে। চট্টগ্রামে নয়। চাকরীতে সে বেশ কিছুদিন আগেই ইস্তফা দিয়েছে। আমি আবার মূর্ছিত হয়ে পড়লাম। 

একটানা এত কথা বলে মালিহা থামলো। নাসিরুদ্দিন ও এরকম একটি গল্পের আকস্মিকতায় নির্বাক। মনে মনে খুবই বিব্রত বোধ করল। ভাবলো, এরকম প্রশ্ন করা মোটেই উচিত হয়নি। কেউ আর কোন কথা না বলে উঠে যার যার গন্তব্যে চলে গেল। কেন যেন অনেকদিন পর মালিহার চোখে অশ্রু এলো। বঞ্চনার যন্ত্রণায় অধীর হলো। মেয়েদের হোস্টেলে এসে হাতমুখ ধূয়ে শয্যায় আশ্রয় নিল। ছাত্রী রুমমেটরা আপার বিষন্নতায় বিস্মিত। তারা চা-নাস্তা তৈরী করে নিয়ে এলো। জানতে চাইলো আপার শরীর খারাপ কিনা। জবাবে বললেন, তেমন কিছু নয়। বাড়ির কথা মনে পড়ছে। একমেয়ে সাহস দিয়ে বললো, সামনে তো রমজানের ছুটি আছে, তখন বাড়ি যাবেন। চা পান করলো মালিহা। মেয়েদের খোঁজ –খবর নিল। 

মেয়েদের সর্বপ্রকার তত্ত্বাবধান মালিহা করে থাকেন। কারণ প্রিন্সিপাল, ভাইস –প্রিন্সিপাল ক্ষণস্থায়ী। বদলী হয়ে এ কলেজে আসার পর পরই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দরজায় ধর্না দিতে থাকেন অন্যত্র চলে যাবার জন্য। মালিহার মনে হয় এ কাজটি খুবই খারাপ। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। এ দিকটিতে কারো মনোযোগ নেই। যে কিছুদিন থাকেন, কলেজে না পড়িয়ে প্রাইভেট টিউশানী করে চলে যান। 

সপ্তাহখানেক পর। নাসিরুদ্দিন আর মালিহা কলেজ শেষে গল্প করছিলেন। নাসিরুদ্দিন বললেন, আপা, সেদিন আপনার সঙ্গে কথা বলে সারারাত ঘুমাতে পারিনি। কেবলই মনে পড়ছিল, কোথায় যেন আপনার ঘটনার সঙ্গে আমার জীবনের ঘটনার মিল রয়েছে। আপনার অনুমতি পেলে বলতে পারি। মালিহা বলেন, অনুমতি দিলাম।   

নাসিরুদ্দিন বলতে লাগলেন, আমার জীবনের ঘটনাও খুব মর্মান্তিক। আমি যখন অনার্স পড়ি তখন ট্রেনে একদিন ইডেন কলেজের একটি ছাত্রীও ভ্রমণ করছিল। আলাপ হলো। জানতে পারলাম আমরা একই গন্তব্যের যাত্রী। স্টেশনে নামবার পর মেয়েটির গার্জিয়ান বললো, আপনি যখন আমার এলাকার ছেলে, এরপর নুসরাত আপনার সংগেই আসা যাওয়া করবে। নুসরাত আমার অনেক জুনিয়র। কয়েক বছর ধরে তাকে নিয়ে যাতায়াত করতে হলো নিজের বড় ভাইয়ের মত। সে দেখতে শুনতে ভাল, হাসিখুশী। ঝর্ণার মত চঞ্চল, উদ্দাম, উচ্ছ্বল। আমি চুপচাপ বলে প্রায়ই সে অভিযোগ করে। ঢাকায় আমি তার লোকাল গার্জিয়ান। আমার পড়াশুনা শেষ। সে তখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। তাকে নিউমার্কেট নিয়ে যাওয়ার বায়না ধরে। আমার অস্বস্তি বোধ হয়। শেষ পর্যন্ত আমাদের মেলামেশা শুরু হয়। সে বলে, আমার পড়াশুনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি কোথাও যাবেন না। বললাম, চাকুরী করতে হবে না?

- চাকুরী করবেন, বিয়ে করবেন  না? 

- চাকুরী না থাকলে বিয়ে করবে কে?  

- আগে চেষ্টা করে দেখেন, তারপর বলবেন।

- বৃথা চেষ্টায় কাজ নেই। মেয়ে খোঁজার চাইতে চাকুরী খোঁজার প্রয়োজন অধিক। পাত্রী তো পথে ঘাটে পড়ে থাকে না।

- পড়ে থাকে। দেখতে পান না আপনি? দেখার চোখ থাকতে হয়।

- একদিন ও না দেখিলাম তারে। কোথায় আছে সে?

- আমার চোখের দিকে তাকান। সেখানে যার ছায়া ভেসে উঠবে সেই হবে আপনার পাত্রী। আপনি তাকে খুব চেনেন।

- কই দেখছিনা তো? চোখের মণি দেখা যাচ্ছে।

- কেন আমাকে দেখছেন না? আমি কি অদৃশ্য, অশরীরি?

- তুমি? 

- হ্যা আমি। এবং আমিই, আর কেউ নয়, কোন ভাবেই নয়, কোনদিন নয়, কোন কালেই নয়। চিরকালের আমি! কোনদিন যদি আমাকে ছেড়ে গেছ!

সে আমাকে জড়িয়ে ধরে রইলো। তার বক্ষের হৃদস্পন্দন আমার বক্ষে সঞ্চারিত হলো। আমি সুপ্তিমগ্ন থেকে জেগে উঠলাম। দেখলাম নুসরাতের চোখে পানি।

- কাঁদছো কেন?

- কাঁদবো না, আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। আমি মরে যাব, আমার পড়াশুনা হবে না, জীবন নষ্ট হবে। আমি কি ভাল মেয়ে নই? খারাপ কোনদিক?

- নিশ্চয়ই ভাল মেয়ে। কোনদিন কিছু বলেছি?

- তবে কেন আমার সঙ্গে ভাইগিরি কর?

চিন্তায় পড়ে গেলাম। লোকে কি ভাববে? ওর গার্জিয়ান হয়ে ওকে দখল করে নিয়েছি! কিন্তু বেশী চিন্তা করবার সুযোগ পেলাম না। সে আমাক এত কথা বলতে লাগলো, এত আব্দার করতে লাগলো, যে আমার সকল বাধা চূর্ণ –বিচূর্ণ  হয়ে বন্যার স্রোতে ভেসে গেল। সে নিজে উদ্যোগী হয়ে বিয়ে ঠিক করে ফেললো। দুই পরিবারের সম্পর্ক দেখলাম বেশ জমে উঠেছে। ইতিমধ্যে তারও ইউনিভার্সিটির চৌকাঠ অতিক্রম করা হয়ে গেছে। আমি একটি কলেজে চাকুরী করি। বাসা ভাড়া করে থাকি। সে আমার বাসায় আসে প্রতিদিন বিকেলে। গোছগাছ করে। চা তৈরী করে নিজে খায়, আমাকে দেয়। সে তখনও হোস্টেলে থাকে। চাকুরীর খোঁজে অফিসে এবং অন্যান্য স্থানে ধর্না দেয়। এভাবে সম্ভবতঃ তখনই কারো সাথে তার পরিচয় ঘটে। সে কথা বলে প্রচুর। সাহসী মেয়ে। ছিনিয়ে নিতেও জানে, মারিয়ে যেতেও পারে। আমি তা পারিনা। শেষের দিকে তার কি যেন ব্যস্ততা থাকতো। আমার কাছে তেমন আসতো না। বলতো একটু বিরহ সহ্য কর। না চাইতে জল পেলে তেষ্টা মিটে যায়। 

তার সাজগোজের সখ। দুই পক্ষের কেনাকাটা হয়েছে প্রচুর। বিয়ের অনুষ্ঠান ঢাকায় হোক, তাই তার পছন্দ। সুতরাং সেভাবেই বন্দোবস্ত করা হয়। বিয়ের দিন বিবাহ –বাসরে অতিথিরা সবাই হাজির। কনের দেখা নেই। তিনি গিয়েছেন বিউটি পার্লারে। অভ্যাগতদের আর কত বসিয়ে রাখা যায়। খাবার পরিবেশন করা হয়। খাওয়া শেষে সবাই প্রায় নববধূকে না দেখেই চলে যায়। সময়টা ছিল দুপুরে। দুই পরিবারের লোকেরা কনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এমন সময়ে হন্তদত হয়ে তিন মেয়ে ছুটে এলো। তারা নুসরাতের সংগেই ছিল। তারা যে সংবাদ পরিবেশন করলো, তা অবিশ্বাস্য, মর্মান্তিক। তাদের বক্তব্য হচ্ছে নুসরাত সাজগোজ করতে অনেক সময় নেয়। তারপর ঘড়ি দেখে নেমে আসে নীচে। একটি বেবি ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল। সে তার ভিতর ঢুকে পড়ে তার স্যুটকেস সহ। সঙ্গীদের বলে তোমরা অন্য বেবি ট্যাক্সি ভাড়া করে আস। তিন মেয়ে হতভম্ব। একটু দূরে গিয়ে ট্যাক্সি থামে। কাকে যেন ত্বরিত তুলে নেয়। তিন মেয়ের কাঁপুনি শুরু হয়। তারাও দ্রুত এসে বিবাহ আসরে উপস্থিত হয়। প্রথমে দেখে নুসরাত পৌঁছেছে কি না। তারপর বরকে প্রশ্ন করলো সে কিছু জানে কিনা। কোথায় যেতে পারে, কোথায় গেল। সঙ্গে অনেক গহনা, টাকাপয়সা আর কাপড় চোপড়। কিড্‌ন্যাপড্‌ হয়েছে কিনা। তিন মেয়ের কান্না আর সকলের বিমর্ষ ভাবে ক্যমিউনিটি সেন্টারে এক বেদনা বিধুর পরিবেশের সৃষ্টি হলো। সব বিল শোধ করে ওরা সবাই বাসায় ফিরে এলো। এমন সময় একটা ফোন এলো। এক অপরিচিত লোকের কন্ঠ। আমি নুসরাতকে নিয়ে ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছি। নুসরাতের বাবা নুসরাতের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। নুসরাত বললো, আপনারা আমাকে চেনেন। আমি স্বেচ্ছায় ইকবালের সঙ্গে সহযাত্রী হয়েছি। ঐ মুখচোরা নাসিরুদ্দিনের সাথে নিরানন্দ জীবন কাটানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এ লোক আমারই মত, আমার উপযুক্ত। আমার পথ আমি খুঁজে পেয়েছি। আমার সিদ্ধান্তে আমি অটল। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের ফ্লাইট। 

শুনে সকলের প্রাণবায়ু বহির্গত হওয়ার উপক্রম। কান্নার রোল পড়ে গেল। বিশেষ করে কনের মা ও বোনেরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো। নাসিরুদ্দিন বরের পোশাক খুলে ফেললো। নুসরাতের বাবা মাকে সান্ত্বনা দিল। বললো, আপনারা আজকের ঘটনার জন্য দায়ী নন। তারা বললো, নুসরাত বাটপারের পাল্লায় পড়েছে। তোমার মত ছেলে সে কোথায় পাবে। নাসিরুদ্দিনের আত্মীয়েরা সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে গ্রামে ফিরে গেল। বলে গেল তোমার কোন চিন্তা নাই। কবুল তো ভাগ্যিস পড়া হয়নি। যে যাই বলুক, নাসিরুদ্দিন জানে গত পাঁচ বছরে তাদের কত কথা, কত স্বপ্ন, কত স্মৃতি। কেউ জানে না ভুলে যাওয়া এত সহজ নয়। ‘ভুলে যাওয়ার কঠিন সংকল্পই মনে রাখার প্রবল সহায়ক।’ নাসিরুদ্দিনের মনে পড়লো, অতীতের ঘটনা আমি ঘটাই নি। স্মৃতির আগুনে দগ্ধ হতে হবে চিরকাল। চিরকুমার থাকবো। বৌ খুঁজতে আর যাব না কোনদিন। ‘দৃষ্টিপাত’ –এর আধারকারের কথাগুলো তার জীবনে সত্য হলো, ‘প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে মহিমা।  কিন্তু প্রবঞ্চিতকে দেয় কি? তাকে দেয় দাহ। যে আগুন আলো দেয় না, অথচ দহন করে।’ এই পাড়াগাঁয়ে বেশ আছি। ঐ বাঁশ বনের ধারে লেকচারারদের জন্য দুটি কুড়ে ঘর বাঁধা আছে। একটি উঠান, একটি ইঁদারা, একটি রন্ধনশালা। রাতে যখন ঐ বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ ওঠে তখন মনে হয়, স্বর্গের বাগানে বিরাজ করছি। বসে বসে তার রূপসুধা পান করি। স্বপ্নের ঘোরে চলে যাই। অন্য প্রফেসাররা থাকলে তাদের সঙ্গে আনন্দলোকের গল্প করে সময় কাটাই।

নাসিরুদ্দিন থামলেন। শ্রোতা মালিহা নির্বাক। এই তো সেই ব্যক্তি যে তাকে প্রতারনা করেছে। তার ক্ষেত্রে ইকবাল প্রচন্ড উৎসাহী, উদ্দাম। মালিহা শান্ত, স্নিগ্ধ, বিশ্বাসী। ভাগ্য যাকে মারে তাকে রক্ষা করে কে?

মালিহা, নাসিরুদ্দিন দুজনেই শান্ত, সৎ, কর্তব্যপরায়ণ।কাজ করতে ভালবাসেন। সারা বছর কলেজের কাজে ব্যস্ত থাকেন। দুজনের জীবনের প্রতারণা আর বঞ্চনার গল্প শুনে তাদের পরস্পরের জন্য কেমন একটা সহানুভূতির মমতা জাগে। নাসিরুদ্দিন একদিন বলেন, মালিহা আপা, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেন না? মালিহা নীরব থাকেন। তারপর বলেন, ভবিষ্যৎ চিন্তা করে কি লাভ? এইসব ইতিহাস নিয়ে নতুন করে পাত্র খোঁজা, ভাল মন্দের পরীক্ষা দেয়া এসবে আর রুচি নেই। আআর মন আমারই থাক।কারো কাছে বন্দক রাখার দরকার কি? নির্ঝঞ্ঝাট জীবন, শান্ত নদীটির মত –যেমন আপনার।

- উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমারও নেই, আপনারও নেই। তবুও পাশাপাশি বন্ধুর মত থাকলে মন্দ কি? না হয় বন্ধুর মত দুঃখ সুখ ভাগ করে নিলাম। জীবন কাটিয়ে দিলাম নদীর আপন স্রোতের মত। 

- তাকে কি জীবন বলে? এক সঙ্গে থাকলে অনেক স্বার্থ, অনেক আশা, অনেক পাওয়া –না পাওয়ার প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। তখন আনন্দ বেদনার জীবন তরী বাইতে গিয়ে বৈঠা হয়ে দাঁড়ায় অস্ত্র –একে অপরকে ঘায়েল করতে দ্বিধা করে না। আপনার আমার অতীতে কোন টানা পোড়েন ছিলনা। বিনা মেঘে নীলাকাশের কোল থেকে বজ্র পড়ে সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে গেল। ওরা তো সুখেই আছে – আমার ইকবাল, আপনার নুসরাত। আপনি আমি নির্বাসিত জীবন যাপন করছি। আগেকার দিন হলে আন্দামান অথবা নিকোবরে গিয়ে আশ্রয় নিতে হতো!

- আমার তো বলার কিছু নেই। আপনি চিন্তা করে দেখেন। আমাদের তো এখানে অনেকদিন থাকা হলো। আমরা অন্য কোথাও বদলী হতে পারি। এ জীবন থেকে অন্য জীবনে পলায়ন।‘হেথা নয়, অন্য কোথাও অন্য কোনখানে।’

মালিহা গভীর ভাবনার মধ্যে পড়ে গেল। ইকবাল কত ভাল ছেলে ছিল। সেই তাকে ত্যাগ করলো। আর একে তো চেনেই না। কেমন ভবিষ্যৎ? আবার যদি দুঃখ আসে, রাখবে কোথায়? তবে লোকটিকে তার পছন্দ। একসঙ্গে জীবন যাপন করতে গেলে যে জিনিসের প্রয়োজন হয়, তার নাম সহমর্মিতা, বিশ্বাস আর ধৈর্য। নাসিরুদ্দিনের তা আছে। নাসিরুদ্দিনের চিন্তা, ভাবনা কম নয়। সে মালিহাকে সুখে রাখতে পারবে কিনা। মালিহা শান্ত মেয়ে। বঞ্চনার বেদনায় তার অন্তর  নীল হয়ে আছে। সে যন্ত্রণা সে লাঘব করতে পারবে কিনা। বেশ কিছুদিন এভাবে গত হলো। একদিন মালিহা বললো, ঠিক আছে, চলেন সামনের গ্রীষ্মের ছুটিতে আমাদের বাড়িতে যাই। তার আগে পোস্টিং চেয়ে দরখাস্ত দিয়ে যাই। এখানে প্রিন্সিপাল, ভাইস –প্রিন্সিপাল, আরেকজন প্রফেসর বদলী হয়ে আসছেন। আমাদের এখন আগের মত দায়িত্ব নেই। 

সে ভাবেই পরিকল্পনা করা হল। ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে আড়ম্বর না করে উদ্বাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। দুই পরিবারের পরিচয় হলো। দুটি প্রাণের গভীর অন্ধকার জীবনে যেন একটি আলোর মশাল জ্বলে উঠলো। ছুটি শেষে তারা কলেজে ফিরে এলেন। থাকলেন আগের মতই। যেহেতু তারা এখানে বহুদিন ধরে চাকুরী করছিলেন, সুতরাং তাদের পোস্টিং আসতে বিলম্ব হল না। একই শহরে। একজন মেয়েদের কলেজে, অন্যজন ছেলেদের কলেজে। যথাসময়ে তাদের বিদায় সম্বর্ধনা এবং নতুন কলেজে যোগদান। এখানে একটি বাসা ভাড়া করে তাদের সংসার জীবন শুরু। অনেকদিন পর মালিহার কেমন জানি অস্বস্তি বোধ হতে থাকে।তবুও তাদের যাত্রা শুরু হয় ভালভাবেই। কলেজের কাজও ভাল চলছে। এর কিছুকাল পরেই তাদের সংসারে নতুন মুখের আগমন ঘটে। একটি পুত্র সন্তান তাদের কোলে আসে। মুখখানা তার অবিকল মায়ের মত। দেখতে দেখতে সে বড় হয়ে উঠে। স্কুল, কলেজ অতিক্রম করে সে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। ইতিমধ্যে মালিহা, নাসিরুদ্দিন নানা স্থানে বদলী হয়েছে।এবার সিনিয়র হিসাবে ঢাকায় বদলী হয়ে আসে। ছেলে আশীস অর্থপেডিক সার্জারিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান করছে। ছোট টি মেয়ে। সে পড়ে বাবার মত অংক। 

ছেলে প্রতিদিন তার রোগীদের কষ্টের কথা বলে, তাদের মানবিক আচরণের কথা বলে।একদিন বললো, একজন পেশেন্ট এসেছে মাল্টিপল্ ফ্র্যাকচার নিয়ে। থাকেন বিদেশে। ত্রিশ বছর পর দেশে এসেছেন বেড়াতে।একদিন সড়ক দুর্ঘটনায় শিকার হন হাইওয়েতে। সঙ্গে থাকা স্ত্রী নিহত হন। ইনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। হাসপাতালে আছেন কয়েক মাস ধরে। খুব কষ্ট তার। আশীসকে তার খুব পছন্দ।তিনি আশীসের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। আশীস তাকে একবার দেখে গেলে তার কষ্ট অনেক উপশম হয়। প্রায়দিনই সে এই অদ্ভুত চঞ্চল রোগীর গল্প বাসায় বলে।রোগী চায় কোন দৈব বলে উঠে দাঁড়াতে। তবে তার অবস্থার এখন  উন্নতি হয়েছে। হাঁটতে শিখেছে ক্র্যাচে ভর করে।বাড়ি গিয়ে দেখবে তার শূন্য ঘর। কান্নায় তার চোখ ছল ছল করে ওঠে। তার একমাত্র পুত্র সাত সাগর পারের নীল নয়নার হাত ধরে আলাদা জীবন যাপন করে। সেই শ্বেতাঙ্গিনী দক্ষিণ এশিয়া লোকদেরকে দু’চক্ষে দেখতে পারেনা।ছেলের সাথে ফোনেই বাতচিত হয়। চেহারা দেখবার সৌভাগ্য আর হয় না। তাদের ইচ্ছা ছিল দেশ থেকে বেড়িয়ে গিয়ে নিজের বাড়িতেই দুজনে জীবন কাটাবে। মাঝে মাঝে এদেশ ওদেশ ঘুরতে যাবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। There is a slip between the cup and the lip. কিন্তু এখন কি হবে? বিলেতে একাকী জীবন যাপন বড় দুঃসহ। দেশে যারা আছে তারা আন্য জেনারেশান। আদর যত্ন করে তারা। তবে ভার নেবার মত কেউ নেই।

সেদিন ভদ্রলোকের প্লাস্টার খোলার দিন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোগী ভদ্রলোক বলেন, আমি গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। একমাত্র তোমার মুখখানা আমার অনন্দের উৎস। মনে হয় তুমি আমার জন্ম জন্মান্তরের চেনা। স্ত্রী নেই, স্বজন নেই। এই বিশ্বসংসারে কোথায় গিয়ে পড়বো! কি পাপ করেছিলাম। আমার কেন এমন হলো? তোমার মুখখানা স্মরণ করে যেন আমার দিনগুল শেষ হয়। তোমার জন্য আমার অশেষ দোয়া থাকবে।

আশীসের মা এই পথে বাড়ি ফিরছিলেন। ছেলের দেরী দেখে ফোন করলেন। জানতে পারলেন আশীস এখনই বাড়ি ফিরবে। মা বললে, চল তোমাকে নিয়ে যাই, তোমার রোগীটিকেও একবার দেখে যাই। মালিহা হাসপাতালে প্রবেশ করলেন। পায়ে পায়ে গিয়ে হাজির হলেন সেই রোগীর কেবিনে। দরজায় নক্‌ করায় আশীস এসে দরজা খুলে দিল। বললো, মা  এই আমার পেশেন্ট। একবার দেখে যাও। ইনার নাম মিস্টার ইকবাল। বড় কষ্ট পেলেন তিনি।

মালিহা একদৃষ্টিতে পেশেন্টের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন –ইকবাল! এতকাল পরে চেহারা চিনতে একটুও দেরী হয়নি। অন্তরের অন্তঃস্থলে ইকবালের চেহারা একটুও ম্লান হয়নি। যদিও বয়সের চিহ্ন ধারণ করেছে। ইকবালেরও তাই। তারও ইচ্ছা করছিল সেই বহুকাল পূর্বের মত মালিহা বলে চিৎকার করে ওঠতে। 

আশীস ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত। কেউ কোন কথা বললেন না! কোন সাধারণ কুশল বিনিময় পর্যন্ত নয়। দুজনেরই কন্ঠ রুদ্ধ। তাদের মধ্যে কোন অমিল বা বিরোধ ছিলনা। তবুও ভাগ্য তাদের টেনে দুদিকে দুজনকে ছিনিয়ে নিল। এর কি নাম কে জানে? হয়তো বা নিয়তি! তারপর সম্ভাষণ বিনিময় ব্যতিরেকেই মালিহা কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হলেন। ইকবাল আশীসকে ডেকে বললো, তোমার মা কে আমার সালাম দিও। মায়ের সঙ্গে তোমার চেহারার বড্ড মিল। এবার তুমি আস। অনেক রাত হলো। তোমার মা অপেক্ষা করছেন। আশীস বেরিয়ে গেল। ইকবালের চোখে অশ্রুর বান এলো। মনে পড়তে লাগলো অতীতের সেই সোনাঝরা দিনগুলো। তবুও এতবড় অন্যায় কাজটি করেছিল একটি উদ্ভ্রান্ত উচ্ছৃঙ্খল মেয়ের জন্য। কি জানি কি ছিল বিধাতার মনে! তারই পাপের ফল তাকে বাকী জীবন ভোগ করতে হবে। 

মালিহা বাসায় ফেরে। বাধ ভাঙ্গা কান্নার স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অচিন গাঙ্গের স্রোতে। অশীস কম্পিউটার নিয়ে বসে তার কাজে। নাসিরুদ্দিন লক্ষ্য করে মালিহার বিষন্নতা। জানতে চায় কোথায় কোন বিভ্রাট ঘটেছে কিনা। মালিহা ব্যালকনিতে গিয়ে বসে। নাসিরুদ্দিন তার পাশে। মালিহা ব্যক্ত করে তার অগ্নিদগ্ধ হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কথা। কেমন করে দুজন প্রতারক দুটি ভাল মানুষকে প্রবঞ্চিত করে অনায়াসে আরেকটি নৌকায় উঠে চলে গেল। পিছনে পড়ে রইলো দুজন আধারকার, যারা সেই ‘দিপ্তীহীন অগ্নির নির্দয় দহনে পলে পলে দগ্ধ হলেন।’

বিধাতা বড় নাট্যকার। মালিহা নাসিরুদ্দিনের মিলন, আর আজকের এই নাটকীয় সাক্ষাৎ একেবারেই অপ্রত্যাশিত। নাসিরুদ্দিনের বক্ষ পিঞ্জরে সেই একই ঝড়। তার নুসরাত এখন পরলোকে চলে গেছে। বলার মত আর কিছুই ছিল না। দুজনে উদাস দৃষ্টি মেলে সুনসান শূন্য গলির দিকে তাকিয়ে রইল। 

.......

১৬.১২.২০০৯        


Thursday, December 16, 1971

লাহোর খান


 ভূমিকা

এই রচনাটি জীবনের জলছবি নয়, সমাজের চালচিত্র নয়, ফেলে আসা অতীতের ঘটনাবলীর স্মৃতিচারণ নয়। এটি হচ্ছে নিজের অবস্থান থেকে একটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করবার ভয়ংকর বাস্তব অভিজ্ঞিতার বর্ণনা। এ সংগ্রাম ছিল পাকিস্তান সরকারের দীর্ঘদিনের অবহেলা, অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চনা ও কুশাসনের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করবার সংগ্রাম। ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়ের মায়া ত্যাগ করে কিশোর, তরুণ, যুবা এক মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। যার জন্য মূল্য দিতে হয়েছিল এক সাগর রক্ত। অর্জিত হয়েছিল এক লাল সূর্য খচিত অমূল্য রত্ন -সবুজ পতাকা। তাই আজ বিশ্বের দরবারে স্থান করে নিয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমরা পাকিস্তানে ছিলাম। সে অবস্থান থেকে আমি নিজে চোখে যা দেখেছি, যা শুনেছি এবং উপলব্ধি করেছি, তারই একটি অংশ এই কথিকাটিতে তুলে ধরবার প্রয়াস পেয়েছি। অবশেষে পাকিস্তানিরা মারাত্মক যুদ্ধে পরাজিত হয়। আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এই দিনিটিকে আমরা বলি বিজয় দিবস। পাকিস্তানিরা বলে Fall of Dhaka.. 

তাদের পরাজয়ের দিনটির একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা, এই গল্পের মূল চরিত্র, যার নাম লাহোর খান।

স্থান - কোয়েটা, ১৯৭১  

ই.এম.ই. মেসে আসার পর আমাদেরকে একজন ব্যাটম্যান দেওয়া হল। ব্যাটম্যানরা সাধারণত অফিসারের ইউনিফর্ম ইত্যাদি দেখাশুনা করে, সবসময় তৈয়ার রাখে আর ঘরের ছোটখাট কাজে সহায়তা করে। এই লোকটির নাম লাহোর খান। জাতিতে পাঠান। নামটি যেমন অদ্ভুত, স্বভাবটিও তেমনি একরোখা, রাগী। আমি মনে মনে তাকে ভয় করতাম।

হারুন সাহেব তার ফিল্ড  অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে অন্যত্র বদলি হয়ে যান। চলে যাওয়ার পূর্বে লাহোর খানকে ব্যাটম্যান হিসাবে মনোনীত করে যান। আমি আমার ভয়ের কথাটি ব্যক্ত করলাম। তিনি বললেন, আমরা বাঙ্গালী, আমাদের জীবন বিপন্ন। যে কোন মুহূর্তে, যে কোন বিপদ এসে আমাদের জীবন পর্যুদস্ত করতে পারে। আমাদের কিছুই করবার নেই। এই একরোখা পাঠান তোমাদেরকে নিরাপদ রাখবে। তার জিম্মায় যখন তোমরা থাকবে, তখন সে তার নিজের জীবন বাজি রেখে তোমাদেরকে বাঁচাবে। এই কথাটি বিশ্বাস কর। বাকি আল্লাহ্ ভরসা। 

ই.এম.ই. অফিসার্স  মেসে আমি দুটি স্যুইট নিয়ে বসবাস করতাম। যুদ্ধের সময় সন্ধ্যার পর Black Out থাকতো। সমগ্র এলাকা নিঃশব্দ, গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। আলো জ্বালাবার উপায় ছিলনা। বাচ্চার খাবার সূর্যাস্তের পূর্বেই তৈরী করে রাখতে হতো। টর্চ বা কোন প্রকার আলো জ্বালাতে পারতাম না। কারণ ঐ আলোর অজুহাতে হয়ত আমাকের নাজেহাল করবে, শত্রু পক্ষকে সহায়তা করার অপরাধ বলে। যখন লাহোর খান বিকালে কাজ করে চলে যেতো, তখন সে সকল জানালা-দরজা বন্ধ করে দিয়ে যেতো। যতক্ষণ না আমি ভিতর থেকে দরজা ভালমত বন্ধ করতাম ততক্ষণ সে দাঁড়িয়ে থাকতো। বারবার সাবধান করে যেতো যেন কোন কারণে দরজা না খুলি। যাওয়ার আগে সে দরজা ধাক্কা দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতো আমি দরজার সব ছিটকিনি লাগিয়েছি কিনা। লাহোর খান চলে যাওয়ার পর আমি দরজার সামনে একটি চেয়ার রেখে দিতাম। যদিও অর্থহীন তবুও আমি দুটি দরজার সামনেই চেয়ার রেখে দিতাম। একদিন সকালে ব্যাটম্যান এসে এ ব্যাপারটি লক্ষ্য করে। সেদিন থেকে সে নিজেই দরজার সামনে চেয়ার রেখে দিয়ে বাইরে যেতো। সন্ধ্যার পর জানালা বন্ধ করা খুব ভয়ঙ্কর ব্যাপার ছিল আমার জন্য, কারণ জানালার নেট ছিল, কিন্তু গ্রীল ছিলনা। সে দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও আমার গা ছমছম করে। তখন কি করে যে আমি একটি ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে ঐ বিদেশে শত্রুপক্ষের লোক হয়ে একাকী একটি মেসে যেখানে আর কোন মহিলা নেই,  দিবারাত্রি অতিক্রম করেছিলাম, তা আজও বিস্ময় জাগায়। 

একটি ক্রিশ্চিয়ান মহিলা এসে আমার সকালের কাজ করে দিয়ে যেত। নাম তার শিলা। সে একটি অতিশয় ভদ্র মেয়ে। আমার শিশুকন্যাকে খুব আদর করতো। আরেকজন ছিল পুরুষ সুইপার। সেও মসীহ্-ক্রিশ্চিয়ান। বৃদ্ধই বলা চলে। সাইকেলে চড়ে আসতো। রাজনীতির গল্প করতো প্রায়ই। পাকিস্তানীরা যে বাঙ্গালীদেরকে বঞ্চিত করছে, শোষণ করছে, এ যেন তার নিজের চোখে দেখা। আমি মনে মনে সতর্ক থাকতাম। লোকটি স্পাই নয় তো? হতেই পারে যুদ্ধের সময় স্পাইদের কাজ বেড়ে যায়। যে কেউ স্পাইং এর কাজে নামে। সে বলতো, পাঞ্জাবীরা কখনও বাঙ্গালীদেরকে উচ্চপদ দেয় না; কি সিভিলে, কি মিলিটারীতে! 

-‘কই, আপকা নাজমুদ্দিন কো জেন্রেল বানায়া? সুকরাবর্দীকো (সোহরোয়ার্দী) জেন্রেল বানায়া? নেহি বানায়া।’ আপনাদের বাঙ্গালী জেনারেল কতজন আছেন? উর্দুতে সে ভাষণ দিতে থাকে। সব সুযোগ-সুবিধা, প্রমোশন তারা নিজেরাই ভোগ করছে? ওর কথা শুনে আমি একটা নিরপেক্ষ উত্তর দিতাম। তারপরেও সে বলতো, 'আপকা বাঙ্গাল আজাদ হো যায়েগা।'

কোয়েটা শহর ইরানের কাছাকাছি। পাকভারত রণাঙ্গন থেকে অনেক দূরে। পাঞ্জাবের বর্ডারে তখন প্রচন্ড লড়াই। সেখানকার যুদ্ধাহতদেরকে ট্রেন বোঝাই করে কোয়েটায় নিয়ে আসতো। প্রতিদিন শত শত রক্তাক্ত সৈনিককে কোয়েটার হাসপাতালগুলোতে প্রেরণ করছিল। আর্মির ইউনিটের সুইপার, হাসপাতালেও ডিউটি করে। আহত জওয়ানদের অবস্থা দেখে প্রতিদিন সে আমাকে এ সব সংবাদ বলে। একদিন সে বলছিল এত ‘জখমী আদমী’ হাসপাতালে আসছে যে, সেখানে তিল ধারনের ঠাঁই নেই। একটা কিছু বলতে হয় বলেই আমি বললাম, ‘বহুত আফসোস কি বাত হ্যায়।’  এতলোক মরে যাওয়া, আহত হওয়ার সংবাদে সমবেদনার ভাব জানাতে হয়। এত লোক মরে যাচ্ছে বলে আর্শ্চয বোধ করলাম। সে তৎক্ষণাত বলে উঠলো, সিপাহীদেরকে মরতেই হবে। ‘সারা সাল ইসকো খিলাতে হ্যায়, পিলাতে হ্যায়, সব কুছ করতে হ্যায়, মরনেকা ওয়াক্ত নেহি মরেগা?’ মমার্থ হলো যে, সিপাইদেরকে সারা বছর খাদ্য, পানীয় দেওয়া হয়, যা কিছু প্রয়োজন সব দেওয়া হয়, আর মরবার সময় তারা মরবেনা? তারা অন্যায় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, মরতে তাদের হবেই। লোকটির মন্তব্য শুনে মনে মনে অবাক হলাম। কি অদ্ভুত মানুষের চিন্তাধারা। 

লাহোর খানের প্রসঙ্গে আবার আসতে হয়। তার বড় দুঃখ ছিল যে, তার কোন পুত্র সন্তান নেই। পুত্র সন্তানই পাঠান সমাজে বংশের ধারা বহন করে,  কন্যা  নয়। পুত্র না জন্মালে তাদের বংশের ধারা মরুপথে হারিয়ে যাবে। তাদের গৃহে জ্বলবেনা সাঁঝের প্রদীপ। সে আমার শিশু কন্যাকে খুব পছন্দ করতো। বলতো ‘মেরা ভি এয়ছা হ্যায়, কৈ আওলাদ নেহি হ্যায়। মেরা স্রেফ এক বেটি হ্যায়।’ অর্থাৎ -আমারও বংশধর নেই, কেবল একটি কন্যা! আপনার কন্যার মতই ছোট। বৃদ্ধ বয়সে আমিও একা হয়ে যাবো, মেয়ে চলে যাবে পরের ঘরে! আমার মৃত্যুর পর আমার ঘর আঁধার হবে,কেউ বাতি জ্বালাবে না! 

পাঠানদের গ্রাম আমাদের বাংলাদেশের গ্রামের মত নয়। আমাদের গ্রামগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি গা ঘেঁষাঘেষি করে থাকে। নিবিড় বনজঙ্গল, শস্যক্ষেত্র, খামার, গ্রামগুলোকে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। সেদেশে ছায়াঘন বৃক্ষরাজি নেই। খাঁ খাঁ মরু প্রান্তর। বৃক্ষলতাহীন সমতল ভূমি। মাঠের পর শূন্য মাঠ দিগন্তে হয়ত কোন পাহাড়ে গিয়ে কূল পেয়েছে। সেখানে মাঠে ঘাটে দুর্বাঘাস জন্মায় না। মাটি বড় রুক্ষ। কাঁকড়, পাথর, শুকনো মাটি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। মাঠের মাঝখানে প্রাচীর বেষ্টিত একেকটি গ্রাম। চারিদিকে মাটির দেয়াল অথবা কঠিন শিলাময় পাথরের প্রাচীর। গ্রামটির চারপাশই খোলা প্রান্তর। বিশেষ মৌসুমে তারা গম, ভুট্টা, যব অথবা অন্য ফসল ফলায়। বেশীর ভাগই সেচ ব্যবস্থার কল্যাণে। বৃক্ষ যেগুলো আছে সেগুলো পত্র-পল্লবহীন দাঁড়িয়ে থাকে। শীতের পর যখন একটু বৃষ্টিপাত হয় তখন বৃক্ষলতার শাখা-প্রশাখা প্রাণ ফিরে পায়। হঠাৎ করেই পাতা গজিয়ে তর তর করে বেড়ে উঠে। তারপর তাদের জাত অনুযায়ী ফুলে ফলে ভরে উঠে। ফুল ফলের মৌসুম শেষ হলে আবার উর্দ্ধমুখী হয়ে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তবে বেশীর ভাগ গ্রামেই গাছপালা নেই। একেবারে নিরেট। আমাদের দৃষ্টিতে প্রাণ ধারণ সম্ভব নয়। কিন্তু ওরা বেশ আছে। কুয়ার পানি অথবা ইরিগেশনের ক্যানেলের পানি ব্যবহার করে। আমাদের ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামখানি মেঘে ঢাকা, এরকমটি কোথাও নেই। এরা প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। সেজন্য পরিশ্রমী, কঠোর এবং রাগী। 

লাহোর খানের পরিবারটি বড়। পিতা, পিতৃব্য ও তাদের সন্তান-সন্ততি এক বাড়িতে বাস করে। রক্ষণশীল পরিবার। তবে একটু বেশীই। তারা ধর্মপ্রাণ। তারা যে যেখানে থাকে, সেখানেই নামাজ আদায় করে। লাহোর খানের পরিবার ও আত্মীয়দের মধ্যে চৌদ্দজন লোক আর্মিতে চাকুরী করে। দুর্ভাগ্যবশতঃ তারা সকলেই পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত। 

নভেম্বরে কোয়েটায় প্রচন্ড শীত পড়ে। ডিসেম্বরে পুরো কোয়েটা শহর বরফের নীচে থাকে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মত বরফ কুচি আকাশ থেকে পড়তে থাকে অনবরত। দেখতে দেখতে মাঠ ভরে যায় শুভ্র তুষারে। পত্র পল্লবহীন বৃক্ষশাখাও তাদের সাধ্যমত বরফ ধারণ করে। বাড়ির ছাদ, কার্নিশ সব সাদা। বরফগলা জল ছাদের কার্নিশ বেয়ে যখন নীচের দিকে পড়তে থাকে তখন সেগুলো জমে যায়। সরু কাঠির মত নীচের দিকে সারিবদ্ধভাবে ঝুলে থাকে। বরফ পড়া যখন বন্ধ হয় তখন সম্মুখে দৃষ্টি প্রসারিত করা সম্ভব হয়। যতদূর দৃষ্টি যায় কেবল তুষারবৃত রাস্তা, মাঠ, ঘাট, প্রান্তর আর দিগন্তে আছে পাহাড় পর্বত। সব যেন সাদা টুপি পরে আছে। 

কোয়েটা শহরের চারিদিকে পাহাড়। যখন কোন বরফ মুক্ত দিনে পূর্ব দিগন্তে র্সূযোদয়  হয়, তখন এক অপরূপ দৃশ্য চোখে পড়ে। বরফের চূড়ায় এক নয়ন ভোলানো চোখ ধাঁধানো রূপালী রেখা ফুটে উঠে। ছবিতে যেমন দেখা যায় পিরামিডের ন্যায় পাহাড়, একটির পিছনে আরেকটি, তার পিছনে আরেকটি। ঠিক সেরকম ভাবে রূপালী রেখাটি পর্বত শ্রেণীর উপরিভাগে এক অপূর্ব সৌন্দর্য্যের অবতারণা করে। এরকম হাড় কাঁপানো শীতে আগুন ছাড়া বাঁচা সম্ভব নয়। হাঁড় কাঁপানো শব্দটি কথার গুরুত্ব বোঝাবার জন্য নয়। বস্তুতই হাড়ে কাঁপুনি ধরে। তাই আগুন জ্বালাবার জন্য উদ্ভাবিত হয়েছে ‘কোয়েটা স্টোভ।‘ একটি মাঝারি সাইজের ড্রামের ভিতরে কয়লা ভরে, তাকে ২৪ ঘন্টা জ্বালিয়ে রাখা হয়। তাতেই ঘরখানি গরম থাকে। এই কাজটি করতে হতো লাহোর খানকে। সে কয়লা সংগ্রহ করে কোয়েটা স্টোভটি জ্বালাতো এবং মাঝে মাঝে আরও কয়লা দিয়ে ইন্ধন যোগাতো। গনগনে লাল হয়ে থাকতো স্টোভটি। দেখলেই দোজখের আগুনের কথা মনে পড়তো, কল্পনায় যেমন দেখি। ঘর গরম থাকতো সারাক্ষণ। এই স্টোভের উপরেই পাত্রে পানি গরম হত। ঘর মোছার কাজ, কাপড় ধোয়ার কাজ, সব কাজই এই গরম পানি দ্বারা করা হতো। বাচ্চাকে সন্ধ্যার পর গোসল করিয়ে একেবারে লেপের নীচে ঢুকিয়ে দিতাম। 

বাইরে এত ঠান্ডা যে দরজা খুলে কারো সঙ্গে বেশীক্ষণ কথা বলা সম্ভব হতো না। বাজার থেকে আনা শাক-সবজিগুলো বরফ জমে একসঙ্গে শক্ত হয়ে লেগে থাকতো। কাপড় শুকিয়ে যাওয়ার পর ক্লিপের ভেতরের অংশে বরফ জমে যেত। ফলে দুটি কাপড়ের কোনা টেনে পৃথক করতে হতো। সেজন্য সে দেশের বাড়ির দখিন দিকে তৈরী করা হত একটি সানরুম, কাঁচের ঘর, যার ভেতর রোদ ঢোকে, কিন্তু বাতাস ঢোকেনা। ঐ রুমটি বাসায় সবচেয়ে প্রিয় স্থান দিনের বেলায়। বড় কোজি, আরামদায়ক। 

আমাদের ব্যাটম্যান লাহোর খান একেক দিন একেক সংবাদ নিয়ে আসতো আমার জন্য। সে বলে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানদের উপর হিন্দুরা খুব জুলুম করছে। মুসলমান মেয়েদের ইজ্জত তারা লুটে নিচ্ছে। আমি জানতে চাইলাম, কোন কাগজে বেরিয়েছে এ খবরটি? সে বললো, যারা ওখান থেকে হাত, পা, নাক, কান, চোখ হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছে, তারা বলেছে। তারা স্বচক্ষে দেখে এসেছে। আর প্রশ্ন করা ঠিক হবে না বলে চুপ করে রইলাম। সে বলে, শুনেছি ওখানকার জবান (ভাষা) হিন্দুদের জবান। মুসলমানদের নিজের ভাষা উর্দু তারা বলতেই জানে না। সেখানে মুসলমানেরা মাছলি খায়, গোস্ত খায় না। ভাত খায়, রুটি খায় না। ওরা হিন্দুদের মত চলে। 

সে আরো বলতো, চিন্তা করবেন না, আল্লাহ্ মুসলমানদের জিতিয়ে দেবেন। এদেশ পাক দেশ, পবিত্র দেশ। এখানে বোমা ফেললে, সব বোমা সাদা পোশাক পরিহিত ফেরেশতারা লুফে নেয়। বুজুর্গ লোকেরা এসব দেখতে পান। আমাদের কোন চিন্তা নেই, আখেরি ফাতাহ্ আমাদের হবে। শেষ বিজয় আমাদেরই হবে। এটাই আল্লাহ্-র ইচ্ছা। 

দৃঢ় অন্ধবিশ্বাস নিয়ে সেদেশের আপামর জনগণ সময় কাটাচ্ছিল। যেদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হলো আমি সে খবর পেয়েছিলাম রেডিও মারফত্। কিন্তু লাহোর খানকে সে কথা বলার সাহস হলো না। ভয়ে বক্ষ আমার দুরু দুরু। এই লাহোর খানই হয়ত ক্ষেপে গিয়ে এক্ষুণি আমাকে আমার বাচ্চাসহ কেটে ফেলবে। পাঠানদের রাগ সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মত।

১৭ই ডিসেম্বর কয়েকজন তরুণ অফিসার ক্যাপ্টেন জহির, ক্যাপ্টেন আলম, আরেকজন আমাদের ঘরে এসে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হলো। তারা লাফিয়ে লাফিয়ে ঘরের ছাদ স্পর্শ করতে লাগলো। বললো, মিষ্টি খাবো ভাবী, মিষ্টি তৈরী করেন। তাদের আনন্দ দেখে আমি আবেগ আপ্লুত  হয়ে পড়লাম। আমি বললাম, আপনারা এবার থামেন; কেউ এই আনন্দ-শব্দ শুনতে পেলে বিপদ  হতে পারে। তারা অনেক আনন্দ  করে, অনেক কথা বলে চলে গেলেন। আমার মনে মনে একটু ভয় করতে লাগলো। পাকিস্তানীরা এবার বাঙ্গালীদের উপর হয়ত প্রতিশোধ নেবে। 

দুপুরের দিকে লাহোর খান এলো। এসেই বললো, জানেন কি হয়েছে মাশরেকি (পূর্ব) পাকিস্তানে? বললাম, জানি, খবরের কাগজে লিখেছে। সে খুবই উত্তেজিত। বললো, আপনি বিশ্বাস করেন? এসব কথা? আমি বললাম, না, হতেই পারেনা। 

সে ভীষণ মর্মাহত এবং রাগান্বিত। আমি চেহারা যত করুণ করা যায় ততই করুণ হয়ে রইলাম। সে অনেক কথা বলতে লাগলো। .......পাকিস্তানী ফৌজ কাফিরদের কাছে হেরে গেল.....? 

বললাম, অপেক্ষা কর। আরও খবর হয়ত আগামীকাল পাওয়া যাবে। 

সে বললো, ‘নেহিজী, আওর কেয়া খবর? এ খবর ছাহি হ্যায়’ বলে হাত তালি দিয়ে দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে থাকলো - ‘কেয়া হো গিয়া! কেয়া হো গিয়া!’ 

সে দেশে ধীরলয়ে হাত তালি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। মৃত্যু শোকে বা অন্য কোন গভীর বিপদের সংবাদে তারা হাতে হাতে করঘাত করে হৃদয়ের বেদনা ভার লাঘব করার প্রয়াস পায়। লাহোর খান বড় মর্মান্তিকভাবে আহাজারি করতে লাগলো, আমাদের ভাষায় যাকে বিলাপ করা বলে। তার খাওয়া বন্ধ হল, চা খেতে ভালবাসে, তাও বন্ধ হল। যেন তার বাড়ি শুদ্ধ লোকের অপাঘাতে মৃত্যু হয়েছে। 

একজন সাধারণ সৈনিক, একজন মানুষ নিজের দেশকে কত ভালবাসে! এই দেখে আমি স্তম্ভিত হলাম। মনে মনে আমি ভেবেছিলাম, লাহোর খান ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করবে। বাস্তবে হলো বিপরীত। একটু সাহস সঞ্চয় করে বললাম, খানা খাও। ভগ্ন স্বরে বললো, দেশ যেখানে ভেঙ্গে গেছে, সেখানে জীবন বাঁচিয়ে রেখে আর কি লাভ? সেদিন সে আর কোন কাজে হাত দিল না। খাবারও খেলনা। চলে গেল ব্যারাকে। 

আমার মনে একটি প্রশ্নের উদয় হলো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, যে ইয়াহিয়া খান বা ভুট্টো সাহেব কিংবা পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের, দেশের জন্য এই রকম মমত্ব বোধ নেই - যে মমত্ববোধ যে দেশপ্রেম একজন সৈনিক কিংবা একজন সাধারণ নাগরিকের মধ্যে আছে। যুগে যুগে, দেশে দেশে এই সব তথাকথিত নেতারা সভ্যতার পতন ঘটাচ্ছে এবং মানুষের প্রাণ ও সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে। 

পরদিন লাহোর খান এলো। বড় বিষন্ন! কোয়েটা স্টোভ ধরাচ্ছিল। কয়লা দিয়ে আগুনের তেজ বাড়াবার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ করে সে বলতে শুরু করলো,  ‘আব্ আপ কেয়া কারেঙ্গে?’ (এখন আপনি কি করবেন)? কাঁহা জায়েঙ্গে?’  

বিব্রত বোধ করলাম আমি। সতর্ক উত্তর দিলাম। বললাম, ‘ইঁহাই রাহেঙ্গে।’ 

উৎসাহের সঙ্গে সে বললো, ‘আপ মাৎ যাইয়ে ওধার। ওঁহা সব খতম হো গিয়া। হিন্দুও নে সব্ কব্জা কার লিয়া। ওঁহা আপকা কেয়া হ্যায়?’ 

বললাম, ‘কুছ নেহি।’ 


সে বললো, ‘আপ পাকিস্তান মে রাহে। ম্যায় আপকো জমিন দেঙ্গে। হামারা গাঁও মে বহুত জমিন হ্যায়। আপ হামারা গাঁওমে রাহেঙ্গে। পাঠান জো কওম হ্যায়, ও বহুত কমিন হ্যায়। ও আপকো বাঙ্গাল মে নেহি যানে দেঙ্গে।’ 

আমি একটু ভীত হলাম। লোকটা কি বলতে চায়? পরে বললাম, ‘হাম নেহি যায়েঙ্গে। ইঁহা মেরা ভাইকা পিন্ডিমে মাকান হ্যায়, করাচীকা ক্লিফটন বীচমে জামিন হ্যায়। হাম ইস্ মুলক্মে রাহেঙ্গে। তুম ফিকির মাৎ কারো।’ 

লাহোর খান আরো বললো, ‘যব সাহাব জংছে ঘর ওয়াপাস আয়েঙ্গে তব ম্যায় উনকো সামঝায়েঙ্গে।’ 

আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি শত্রু কবল থেকে মুক্তি লাভ করার কিছুকাল আগে একদিন এক পাঞ্জাবী অফিসার আমাদের দরজায় করাঘাত করে। ভাবলাম হয়তবা কোন হয়রানী করবার পরোয়ানা নিয়ে এসেছে। অর্গল খুলে জানতে চাইলাম, তিনি কি উদ্দেশ্যে এসেছেন। তিনি জানতে চাইলেন, ‘ডক্টর সাহাব ঘর মে হ্যায়?’ হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলাম। তিনি আগেই হয়ত জানতে পেরেছেন যে ইনি মেডিকেল কোরের অফিসার। হারুন সাহেবকে আগন্তুকের আগমন বার্তা পৌঁছে দিলাম। স্বাভাবিক অভিবাদন বিনিময়ের পর তিনি বললেন, তিনি গতকালই পূর্ব পাকিস্তান হতে ফিরেছেন। ওখানকার পুরো পরিস্থিতি তার অবগত। তিনি অনেক কথা বললেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাংলাদেশে তিনি পাকিস্তানীদের যুদ্ধ দেখেছেন, অত্যাচার দেখেছেন। অন্যদিকে তিনি বাঙ্গালীদের সাহস, এবং রুখে দাঁড়াবার কৌশল দেখেছেন। ‘সেখানে ভয়ঙ্কর এক শ্বাস রুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে আপনাদের বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। এ যুদ্ধ অন্যায় যুদ্ধ! এ যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল না। বাঙ্গালীরা জয়ী হবে। আমি এখানে এসেই শুনেছি যে এই মেসে একটি বাঙ্গালী পরিবার আছে। তাই দেখা করতে এসেছি । এই কথাগুলো বলার জন্য। একটি কথা স্মরণ রাখবেন এবং অন্যদেরকে বলবেন যে, সব পাকিস্তানী খারাপ লোক নয়। পাকিস্তানেও বিবেকবান, হৃদয়বান লোক আছেন, যারা এ যুদ্ধ চায় না, নিষ্ঠুরতা  চায় না। এই আমার অনুরোধ আপনার কাছে।'

উপসংহার

বাংলার দামাল ছেলেদের এক কঠিন, প্রাণপণ রক্তক্ষয়ী লড়াই- এ এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই সংগ্রামের প্রত্যক্ষদর্শীরা এখনো জীবিত আছেন। মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, তাদের প্রতি আমার অন্তরের অন্তঃস্থল হতে উৎসারিত অকুন্ঠ ভালোবাসা, মমতা ও শ্রদ্ধা বয়ে যাবে নিরন্তর। তাঁদের কাছে আমাদের ঋণ জন্ম জন্মান্তরেও শোধ হবে না। প্রতিজন মুক্তিসংগ্রামী অমর হোক। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। বাঙ্গালীর জয়রথ শান্তির পথে, সমৃদ্ধির পথে, বিশ্বের রাজপথে এগিয়ে চলুক।

...........

শিশু শ্রম -১৯৯৭