Showing posts with label Prose. Show all posts
Showing posts with label Prose. Show all posts

Sunday, May 31, 2026

শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশে মায়ের ভূমিকা




 

এই আমি


 জীবন অর্থই প্রানের স্পন্দন। প্রাণ যতদিন দেহের আশ্রয়ে থাকে, ততদিনই জীবন হিসেবে গণ্য হয়। দেহকে প্রাসাদ বলতে পারি, মন্দির বলতে পারি, কারাগার বলতে পারি, খাঁচাও বলতে পারি। বলাটা নির্ভর করে কখন আত্মার সঙ্গে দেহের কি সম্পর্ক তার উপরে। আত্মার সঙ্গে দেহের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ।দেহ আঘাত পেলে আত্মা হয় ব্যথিত। আত্মাকে অপমান করলে দেহ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে। আত্মাকে সম্মান প্রদর্শন করলে দেহ তার চেহারায় অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। দেহ মন দুটিতে মিলেই একটি যন্ত্র। দেহ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর বড় হতে থাকে । সেই সঙ্গে বড় হতে থাকে আত্মার ধারণ ক্ষমতা। দেহ শারিরীক পূর্ণতা লাভ করে। কিন্তু আত্মার পূর্ণতা লাভ হয় না। অর্থাৎ দেহের বৃদ্ধির প্রাপ্তি শেষ হয়, আত্মার বিকাশ লাভ শেষ হয় না। বরং উত্তরোত্তর অসীম জ্ঞানের ভান্ডারে আত্মা প্রবেশের প্রয়াস পায়। যে যেমন লোক হোক, যেখানে বাস করুক না কেন, তার জ্ঞান বাড়তেই থাকে। দেহের খাঁচা একদিন জীর্ণ হয়। দেহের দেখাদেখি আত্মা কিন্তু জীর্ণ হয় না। তখনই শরীরের সঙ্গে বাধে তার বিরোধ। তাদের সম্পর্ক নষ্ট হয়। 

রোগগ্রস্ত বা জরাগ্রস্ত শরীরে আত্মা অশান্ত হয়। তখন খাঁচা ছেড়ে পাখিটি কোথায় যেন উধাও হতে চায়। দেহ যখন অথর্ব, অকর্মণ্য, জরাগ্রস্ত হয়, তখন আত্মা নির্যাতিত হতে থাকে। আত্মাকে ধারণ করবার ক্ষমতা দেহের থাকে না। আত্মার উন্নতি বা বিকাশের পথ হয় রুদ্ধ। নিপীড়িত আত্মা দেহের বন্ধন ছিন্ন করতে চায়। চায় মুক্ত বিহংগের মত দেহের কয়েদখানা থেকে মুক্তি পেতে। তাই একদিন সে চির পরিচিত দেহ ত্যাগ করে কোথায় যেন কোন নিঃসীম নীলিমায় হারিয়ে যায়। যে শরীর তার যৌবনের রাজপ্রাসাদ ছিল, প্রৌঢ় বয়সের মন্দির ছিল, তা ত্যাগ করতে দ্বিধা করে না । সে যেন এক অচিন পাখি। খাঁচা ছেড়ে অচিন পুরে চলে যায়। প্রাণহীন দেহ পড়ে থাকে। আর কোনদিন উঠতে পারে না। অন্তহীন কালের জন্য সে শয্যা পাতে। চিরশয্যায় সে শায়িত হয়। দেহ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, লয়প্রাপ্ত হয়। মৃত্তিকায় রূপান্তরিত হয়। তার যা কিছু দৈহিক সম্পদ তা মাটিকে উপহার দেয়। মাটি হয়তো তার তৈল সম্পদ উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করে। 

প্রাণ পাখিটি খোঁজ রাখে না তার দেহ মন্দিরটির। সে যে কতকাল এই শরীরে বসবাস করে গেল, তার জন্য তার কোন মমতা নেই। বড় নিষ্ঠুর সে। বড়ই অকৃতজ্ঞ। ‘আর্শী নগরের পড়শী’ আর পেছন ফিরে তাকায় না। অন্য কোথাও, অন্য কোন সোনার খাঁচার বুলবুলি হয়ে সে হয়তো গান করে।

আমি কে, আমি জানি না। ‘আমি’ বলতে আমার অস্তিত্বকেই বুঝি। যাকে আমি হস্ত দ্বারা স্পর্শ করতে পারি, আর্শীতে অবলোকন করতে পারি, উপলব্ধি করতে পারি আমার শ্বাস প্রশ্বাসের উত্থান পতনে, হৃদয়ের স্পন্দনে। এই আমি চলে যাব এই সুন্দর ভুবন ছেড়ে।  আর আসবো না। আর চেনা মহলে একটি বারও ফিরে গিয়ে বলা হবে না এই যে আমি এসেছি, তোমাদের কাছে, তোমাদের কেউ। এই আমি নাম সর্বস্ব প্রানহীন দেহ মাত্র। নামটি দেহের। প্রাণের নয়।একটি মানুষকে আলাদা করে চিহ্নিত করার জন্য নাম। তাও পরিচিত মহলে। অপরিচিত পরিবেশে তার নামটিরও কোন দাম নেই। তবুও দেহের –ই  নাম থাকে। আত্মার নাম থাকে না। দেহের খাঁচায় যে বুলবুলি বাস করে সে নামহীন, গোত্রহীন, ধর্মহীন, বর্ণহীন।

এই নামটি সংগ্রহ করে আমি ঘুমিয়ে থাকবো কবর গুহায় অনন্তকাল।পরিপাটি নিরাপদ কবর। দস্যু তস্করের ভয় নেই, ক্ষুধা তৃষ্ণার  উপদ্রব নেই, আশা নিরাশার দোলা নেই। শুধু থাকবে আমার অস্তিত্বের মিশ্রণে মৃত্তিকা। হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীর পৃষ্ঠে আজকের মত আসবে বর্ষা, আসবে শীত, গ্রীষ্ম পর্যায়ক্রমে। আমার শেষ আবাসস্থলে কত বারিধারা আঘাত হানবে।

কত ঝড় ঝঞ্ঝার দাপটে ধরণী প্রকম্পিত হবে। কত বন্যা আসবে আমার এই বাংলায়। কত অরি, কত মারি, মানবগোষ্ঠীর প্রাণ সংহার করবে। তারা এসে যোগদান করবে শুভ্র কাফনের সমাজে। প্রকৃতির মঞ্চে নামের ভূমিকায় কাজ করে যাবে মানুষ চিরকাল। কেবল আমারই আর উঠে আসা হবে না আগের মত। দু’চোখ ভরে আর দেখা হবে না রূপসী বাংলাকে। আমার নামও মানুষ ভুলে যাবে একদিন। সমাধিও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। হয়তো তার উপর মানুষ একদিন আবাদ করবে সুস্বাদু ফলবান বৃক্ষ অথবা তুষযুক্ত শস্যদানা। কিম্বা তা হবে মানুষের আবাসিক এলাকা। গড়ে উঠবে সুদৃশ্য ইমারতরাজী অথবা রাজপ্রাসাদ। হয়তো বা আমার সমাধি স্থলে রচিত হবে কারো বাসর। সূচিত হবে নতুন জীবন, অথবা পাতবে কেউ মৃত্যু শয্যা। এমনও হতে পারে আবার কেউ হয়তো এখানেই শেষ শয্যা গ্রহণ করবে। কোন মালি হয়তো রচনা করবে ফুলের বাগান আমার সমাধিতে।‘মোর কবরে ফুটবে যে ফুল। না জানি তা কার তরে।’ 

চির বিস্মরণের পাড়ে চলে যাব আমি। কেউ বলবে না এই বাড়িতে, এই গৃহকোণে, এই নামে কেউ একজন ছিল। হাসি কান্না দিয়ে ভরে রেখেছিল এই নিভৃত গৃহকোন। এই প্রাঙ্গন একদিন কারো পদচারণায় মুখরিত ছিল। এই আমার পরিচর্যায় বৃদ্ধি পেয়েছিল ঐ  বৃক্ষ, ঐ তরুলতা, যার শীতল ছায়া, সুমিষ্ট ফল, আমার স্নেহ মাখা উপহার হয়ে তাদেরকে তুষ্ট করছে। পার হয়ে যাবে শত শত বছর। ভুলে যাবে পরবর্তী বংশধরগণ আমার নাম। এই নামে কাউকে তারা চিনবে না, জানবে না। আমার কর্মফল পড়ে থাকবে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অনন্ত কালের গর্ভে আমি বিলীন হয়ে যাব। আর কোনদিন কোন কালে আমার পদচিহ্ন পড়বে না এই বাটে। আমার আত্মা অর্থাৎ এই আমি বাকহীন, শক্তিহীন পদ্মা, যমুনা বিধৌত বঙ্গ ভূমিতে আরো একটিবার দেহ ধারণের তৃষ্ণা নিয়ে বাতাসের সঙ্গে ঘুরে বেড়াব। 

১লা এপ্রিল, ১৯৯৪

ড্রাম ফ্যাক্টরি, ঢাকা ১২০৬.

ডুলি – প্রাচীন কালের বাহন

 

১৯৫৩ সাল। 

গ্রাম বাংলার গভীরে শিক্ষার আলো প্রবেশ করে নাই। লেখাপড়ার জন্য শহরে যেতে হত। শহরে যাবার পথ ছিল মেঠো পথ। বাড়ী থেকে রেল স্টেশন পাঁচ মাইল দূরে। হাঁটা একেবারেই সম্ভব নয়। পায়ে হাঁটা অপ্রশস্ত রাস্তা। তাই ডুলিতে চড়ে খুব ভোরে রওনা হয়ে ‘ধলা’ রেল স্টেশনে পৌঁছাতে হত। গন্তব্য বিদ্যাময়ী ইংরেজি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়,ময়নসিংহ। দেশের সেরা স্কুল যার ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে আমার প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন শুরু। 

আমাদের অঞ্চলে আমার পিতা –ই  একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন। কলিকাতা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯১৯ সালে এন্ট্রাস পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন যে বছরে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন সে বছরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আমার পিতার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা পাশ করার ফলে এলাকায় বিপুল সাড়া পড়ে যায়। একটি অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে একটি আলোর শিখা যেন প্রজ্জ্বলিত হয়। তিনি নান্দিনা মহারাণী হেমন্ত কুমারী উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। নান্দিনার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ও শিক্ষকদের  সঙ্গে তিনিও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি একজন সুশিক্ষিত, তেজস্বী পুরুষ ছিলেন। নারী শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। তিনি গ্রামে আমাদের বাড়ি সংলগ্ন স্থানে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। আমার হাতে খড়ি আমার মায়ের কাছে। বাড়িতে যেহেতু লেখা পড়ার প্রচলন ছিল, সওগাত, মাসিক মোহাম্মদি, বেগম –এসব ম্যাগাজিন আমাদের বাড়িতে আসতো। আমার জন্য ছিল নানারকম বই। বাংলা, ইংরেজী, ঊর্দু, আরবী, ধারাপাত বই আরও অনেক আমার উপযোগী বই। মক্তবে আমার পড়াশুনা করার মত কিছু ছিলনা। সেজন্য মৌলবী (শিক্ষক) সাহেবের নির্দেশে লম্বা ঘোমটা টানা আট, নয় বছর বয়সের মেয়েদেরকে আমি পড়াতাম। শিক্ষক যেহেতু পুরুষ সেজন্য আমাকেই তাদেরকে পড়াতে হত। আমার পিতার উদ্দেশ্য ছিল আমাকে দেশের সেরা স্কুলে পড়াবেন। সেটি ছিল বিদ্যাময়ী স্কুল, ময়মনসিংহ। ১২ বৎসর না হলে হোস্টেলে সীট পাওয়া যায় না। তিনি তার আগেই ষষ্ঠ শ্রেণীতে আমার ভর্তির ব্যবস্থা করে ফেলেন। আমিই প্রথম ঐ অঞ্চলে, এই ডুলিতে চড়ে শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি । তখন মেয়েদের জন্য ছিল বাঁশের তৈরি ডুলি। স্থানীয় ভাষায় খাট। উৎসবের জন্য ছিল পালকি। কাঠের তৈরী, নকশাদার,ভারী,বড় আকারের। ঘাড়ে বহন করবার জন্য কাঠের দন্ড – কারুকাজ করা। ছয়জন বেহারা বহন করত। ডুলি বহন করতো দুই বেহারা।  ডুলি ছিল বাঁশের তৈরী চারকোণার একটি খাঁচা। যথেষ্ট শক্ত। ভেতরে একজন মানুষ সোজা হয়ে বসতে পারে। তার উপরিভাগে একটি শক্ত মোটা বাঁশ,বেশ লম্বা,যা কিনা বেশ শক্ত করে ঐ খাঁচাটিতে বাঁধা আছে। ছিঁড়ে  পড়ে যাবার কোন সম্ভাবনা নেই। বাহনটি ছিল মূলতঃ মেয়েদের জন্য। মহিলারা এত পথ হাঁটতে পারেনা। কারণ তাদের কোলে থাকে শিশু এবং পর্দা রক্ষারও একটি ব্যাপার আছে। ডুলি একটি শাড়ি বা অন্য যে কোন কাপড় দিয়ে ঘেরা থাকতো। যাত্রী মহিলাটির সঙ্গী বা প্রহরীর পা দু’খানাই সম্বল। বেহারাদের সঙ্গে সে দ্রুত পদসঞ্চারণে পথ চলতো। 

বেহারা, যারা ডুলি বা পালকি বহন করতো তাদেরকে আমরা স্থানীয় ভাষায় ‘মাড়োয়া’ বলতাম। বেহারারা ছিল উড়িয়া। হিন্দি –উর্দু মিশ্রণে একরকম বিচিত্র সুরে কথা বলতো। তাদের গাত্রবর্ণ কৃষ্ণবর্ণও নয়,ফর্সাও নয়। বেশ উঁচা লম্বা গড়ন। মালকোঁচা দেওয়া ধুতি খাটো করে পরা। তাদের সঙ্গে কখনও তাদের পরিবার দেখি নাই। সম্ভবতঃ তারা নিজেদের দেশ হিন্দুস্থানে নিজেদের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতো। আমাদের এদিকে তারা সাধারণতঃ ধনী বাড়ির দিঘির চওড়া পাড়ে ঘর তৈরী করে বসবাস করতো। তারা সবসময়ে দলবদ্ধ হয়ে বাস করতো। অনেকে অনেক সময়ে হাট বাজারের উপকন্ঠে আশ্রয় কেন্দ্র তৈরী করে থাকতো। তাদের দলে একজন সর্দার থাকতো। আমাদের বাড়ির কাছের দলের সর্দারের নাম ছিল ‘আঁউতার’। ছাতু ছিল তাদের প্রিয় খাদ্য। ভাত, রুটিও খেত। আমরা বাঙালীরা সেই সময়ে আটার রুটি চিনতাম না। শুকনো তামাক পাতা হাতের তালুতে কচলিয়ে পাউডার করে মুখের ভেতরে মাড়ির ফাঁকে দিয়ে রাখত। সেটাকে বলা হত ‘খইনি।’ অবসরে বৃক্ষ ছায়ায় বসে তারা খইনি বানাত। কোন সঙ্গী সাথী আসলে তারা তদের নিজেদের ভাষায় জিজ্ঞেস করতো, 

'কা  -হো? (কি কর?) 

খইনি খা –ল –বা ? (খইনি খাবা?)

সওয়ারি বহন করাই ছিল বেহারা বা মাউরাদের একমাত্র কাজ। গ্রাম –গ্রামান্তরে তারা সারাদিন সাওয়ারী বহন করতো। যাত্রী অবশ্যই মহিলা। ডুলি একাধিক যাত্রী বহন করবার উপযুক্ত বাহন নয়। তবে পালকিতে দু’জন বসতে পারতো,যেমন বর –কনে। সেক্ষেত্রে ছয়জন বেহারা থাকতো। হাতে লাঠি। স্কন্ধে গামছা। বেহারাদের পারশ্রমিক ছিল শুকনো খাবার চাউল,চিড়া,মুড়ি,গুড়।   

চলার পথে দ্রুত পদচারনার সাথে সাথে বেহারারা একরকম শব্দ করতো –হুঁম্‌, হুঁম্‌, হুঁম,... একই তালে, একই ছন্দে । দুই বেহারা এগিয়ে চলতো একই তালে একই সুরে। হয়তো এতে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পেত। ভারি বস্তু বহন করবার সময় একটু দৌড়ের প্রয়োজন হয়। তাতে মাল বহন করা এবং গন্তব্যে পৌঁছা সহজতর হয়।

স্টেশনে পৌঁছালে ঝিক ঝিক শব্দ করে রেলগাড়ী আসতো। বেহারাদের পায়ের গতি বৃদ্ধি পেত। আমি তখন ছোট একজন সওয়ারি। দুই বেহারা নৃত্যের তালে তালে অপেক্ষাকৃত কম সময়ের মধ্যে ধলা স্টেশনের নিকটবর্তী হত। একদিকে মায়ের জন্য কান্না, ছায়া সুনিবিড় গ্রামের জন্য বেদনা বোধ, অন্যদিকে পথের পাঁচালীর অপু দুর্গার মত রেলগাড়ি দেখার কৌতূহল আমাকে আন্দোলিত করত। রেলগাড়ি গফরগাঁও স্টেশন ছেড়ে আসার পর পরেই তার হুইসেল এবং শব্দ শোনা যেত। রেল লাইনের ওপারে স্টেশন। ট্রেনের ভারে রেল লাইনেও এক রকম কম্পন অনুভূত হত। আমার বাহন ডুলিও এসে থামতো। এসব স্টেশনে ট্রেন কখনও পূর্ণ বিরতি নেয় না। গতি কম করে মাত্র। আমার ভাইয়েরা আমাকে ডুলি থেকে টেনে বের করে ট্রেনের ‘জেনানা’লেখা কামরায় ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিত। বেহারা, ডুলি আবৃত করে রাখা শাড়িটি খুলে দ্রুত কামরার জানালা দিয়ে ভিতরে ছুঁড়ে দিত। তারপর আমার ভাইয়েরা দ্রুত পাশের কামরায় উঠে পড়তেন ট্রাঙ্ক, স্যুটকেস, বেডিং নিয়ে। দুই বেহারাকে আট আনা অর্থাৎ ৫০ পয়সা দিতেন। কুলিকে দিতেন ২৫ পয়সা। ট্রেনের গতি বৃদ্ধি পেত। ট্রেনের কামরায় মাত্র কয়েকজন যাত্রী থাকত –অবশ্যই মহিলা। ব্যক্তিগত গল্পে তাদের সময় কেটে যেত, যেন তারা কত কালের পরিচিত। গল্প গুজব, পান কিমাম খাওয়ার আদান প্রদানে যত ব্যক্তিগত, পারিবারিক – সব গল্প চলতে থাকতো। আমি রেলগাড়ির ভেতরের চেহারা দেখতাম, আরো দেখতাম বাইরের সব গাছ –পালা, মাঠ –ঘাট, ক্ষেত –খামার উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছে। দেখে স্তম্ভিত হতাম। কি কারণে উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছে তার কোন কারণ বোধগম্য হতো না। 

ডুলি প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলতে হয়। আমার আম্মা তাঁর ছোট বেলায় লাখ্‌নৌ-তে থাকতেন তাঁর ভাইদের সঙ্গে। তিনি বলেছেন,লাখ্‌নৌ শহরের অলিগলি ভরা ছিল  ডুলিতে। এখনকার সময়ে আমাদের দেশের রিকশার মত। যার যখন দরকার ডুলিকে ডেকে নিত এই বলে,'ও ডোলি ওয়ালা,ইধার আও।'ধনী লোকেরা ঘোড়ার গাড়িতে যাতায়াত করতেন। তখন সময় ১৯২০ থেকে ১৯২৬ সাল। অন্য কোন যানবাহন সে সময়ে ওনাদের চোখে পড়েনি। আজকের এই একবিংশ শতাব্দী থেকে সেই সময় কত দূরে!

...............

দাসপ্রথা উচ্ছেদ হয়েছে কি?


দাস প্রথা একটি প্রাচীন প্রথা। সেই সুদূর অতীত কাল থেকেই যারা স্বচ্ছল মানুষ, তারা সম্পদহীন মানুষের সেবা গ্রহণ করবার নিমিত্তে তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখতো। শুধু তাই নয়, গরু ছাগলের মতো তাদেরকে, খোঁয়াড়ে রাখা হতো এবং শৃংখলিত অবস্থায় বাজারে বিক্রি করা হত। ক্রেতাগণ তাদের দাঁত দেখে, চোখ দেখে, হস্তপদ ঠিক আছে কিনা, অসুখ –বিসুখ আছে কিনা এইসব পরীক্ষা করে দরদাম করে ক্রয় করে বাড়িতে নিয়ে যেত। এরাই ক্রীতদাস। বংশ পরম্পরায় এই সকল দাসেরা অহর্নিশি তাদের মালিকদের খেদমতে নিয়োজিত থাকতো। সামান্য ত্রুটি –বিচ্যুতিতে তাদেরকে চাবুক দিয়ে বেদম প্রহার করতো। তাদের কোন বিশ্রাম ছিল না। নূন্যতম মানুষের মর্যাদা দেওয়া হতনা। জীবন্ত মানুষের অঙ্গ –প্রত্যঙ্গ কেটে ভিতরে কেমন আছে তা দেখতে দ্বিধা করতো না। হজরত রাবেয়া বসরী তার উদাহরণ।

সুদূর আফ্রিকা (কৃষ্ণ মহাদেশ -Dark continent) থেকে চতুর মার্কিনীরা কালো মানুষদেরকে ধরে নিয়ে যেত জাহাজ বোঝাই করে। ফাঁদ পেতে তাদেরকে ধরা হতো। এমনকি পশু পাখির মত জাল ফেলে  তাদেরকে ধরা হত। এটা একটা ব্যবসা ছিল তখনকার দিনে। 

দি রুটস্‌ ছবিটি দেখলে দাস প্রথার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ধনী ব্যক্তিরা দাসদের ঘাড়ে পা রেখে, তাদেরকে অত্যাচারে জর্জরিত করে নিজেরা আরামে, আয়াশে দিন কাটাতো। ক্রীতদাসরা বংশ পরম্পরায় তাদের সেবা করতো।

আমেরিকার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন একজন মহামানব ছিলেন। মানবতার এই অপমান, অমর্যাদা তার অন্তরকে ব্যথিত করে। তিনি আন্দোলনে নামেন। শেষে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ বাঁধে। প্রচন্ড যুদ্ধ হয় ক্রীতদাস প্রথার পক্ষে ও বিপক্ষে। তারপর গেটিসবার্গ এড্রেসে –১৮৬৩ সালের ১লা জানুয়ারি তিনি ঘোষণা করেন যে ক্রীতদাস রূপে যারা বন্দী রয়েছে, তারা এখন থেকে মুক্ত, স্বাধীন।

এতে ধনী সাদা মানুষেরা ক্রুদ্ধ হল। তাদের অন্তর থেকে কালো মানুষের শরীরের কালি কিছুতেই দূর হলো না। কৃষঙ্গরা তাদের দৃষ্টিতে কালো এবং ঘৃণ্যই রয়ে গেল। 

দাস প্রথা আজ নেই। বাজারে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য খোঁয়াড় নেই, ক্রয় বিক্রয় নেই। কিন্তু বাস্তবে প্রথা না থাক, দাসত্ব উচ্ছেদ হয় নাই। শ্রেণী প্রথা অর্থাৎ ধনী দরিদ্রের পার্থক্য অতিশয় প্রকটভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে দরিদ্রের সেবা গ্রহনের প্রচলন খুবই আছে। স্বল্প মূল্যে তাদের শ্রম ক্রয় করে ধনী ব্যক্তিরা। সেই শ্রমলব্ধ ফসল বা উৎপাদিত পণ্য বা দ্রব্যাদি অধিক মূল্যে বিক্রি করে ধনীরা আরো ধনবান হয়। শ্রমদাতাগণ শ্রমিক নাম নিয়ে জীবন ধারণের কঠোর চেষ্টায় লিপ্ত হয়। 

কোথায় সভ্যতা, কোথায় আলো, কোথায় উন্নতি, তারা তার খোঁজ পায় না। রাজপথের সোডিয়াম বাতি আর হাজার গাড়ির বহর দেখে তারা অবাক বিস্ময়ে। রাত্রির কয়েক ঘণ্টা বিরতি বাদে বাকি সময়টুকু ওরা কারখানায় তথাকথিত ‘পোশাক শিল্পের’ ফ্যাক্টরিতে বন্দী থাকে। অনেক কারখানায় রাতেও ছুটি নেই। ওভার টাইম খাটায়। কিন্তু পারিশ্রমিক বাকী থাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। শ্রমিকদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে না মালিকেরা। অশালীন সম্বোধন, অশ্লীল শব্দাবলীর ব্যবহার, এমনকি মারপিট করতেও দ্বিধা করে না। আর ছাটাইয়ের ভয়তো আছেই। যে বেতন পায় তা দিয়ে খেয়ে পরে বেঁচে থাকা বলে না। তাই তাদেরকে মানবেতর জীবন যাপনের গ্লানি বহন করে চলতে হয়। 

সাভারে মাত্র সেদিন ২৪শে এপ্রিল পোশাক কারখানায় হিরোশিমা, নাগাসাকির মত মুহূর্তে যে ঘটনা ঘটে গেল, তা সকলেই অবগত আছেন। এসব ঘটনা দাস প্রথাকে হার মানায়। দফায় দফায় অগ্নিকান্ড, বিল্ডিং ধসে যাওয়া নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা এ দেশে। এইসব শ্রমিকদের প্রাণ রক্ষায় বা স্বার্থ রক্ষায় কোন আইন নেই। মালিকেরা ধরা ছোঁয়ার  বাইরে থেকে যায়। কারণ তারা জানে কিছুদিন পরে এইসব মর্মান্তিক ঘটনার কথা মানুষ ভুলে যাবে। তাই তারা অনেকেই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর ভিতরে সন্ধ্যার পর জরুরী মিটিং করার নামে বসে বসে আনন্দ, আড্ডায় মত্ত হয়, এবং কি করে আরো বেশী টাকা কামাই করতে পারবে এইসব হতদরিদ্র মানুষের রক্ত শোষণের বিনিময়ে সেই উপায় নির্ধারণের কৌশল আবিষ্কার করেন। 

এসব দেখে শুনে মনে হয় দাস প্রথা আজও সমাজে প্রচলিত আছে –পূর্বের চাইতে অধিক পরিমাণে আরো নিষ্ঠুর, আরো মর্মান্তিক ভাবে। দাস প্রথার অবসান হয়নি। মানুষ সরাসরি বাজারে বিক্রয় না হলেও, মানুষের ঘামেভেজা শ্রম বিক্রি হচ্ছে দিবা –রাত্রি!  

........................

Wednesday, May 27, 2026

এলো খুশীর ঈদ

রমজান মাস শেষ। আগামীকাল ঈদ। আকাশে ঈদের বাঁকা চাঁদ মুচকি হেসে খোশ আমদেদ জানালো আমাদেরকে। আর কয়েক ঘন্টা মাত্র বাকী। নগরীর গৃহবাসী সব গভীর নিদ্রায় মগ্ন।স্বপ্ন দেখছে আসছে খুশীর দিনের, যার যার মনের মত শখের পোশাক, অলংকার, পাদুকা, ফিতা, চুল সাজাবার যাবতীয় দ্রাব্যাদি, অর্থাৎ কেশাগ্র থেকে পায়ের নখাগ্র পর্যন্ত সজ্জিত করবার যত উপকরণ সব ক্রয় করে নিয়েছে। খাদ্য দ্রব্যেরও ঘাটতি নেই। সব এখন ঘরে মজুদ। ভোর হওয়ার অপেক্ষায় গভীর ঘুমে স্বপ্ন দেখছে আনন্দের। 

আজকাল আনন্দ কোথায়? আনন্দ ছুটি নিয়ে চলে গেছে দূর দেশে। বেশীর ভাগ মানুষের বিষন্ন মুখ, মন খারাপ, মারামারি, হানাহানি করে দিন কাটায়। তাই আগামী দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে সারাটি মাস এ বাজার, সে বাজার ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে যার যার সাধ্যের মধ্যে পছন্দমতো সবকিছু খরিদ করেছে। এ আনন্দ ঢেউ লেগেছে সুদূর পল্লী অঞ্চলে। সেখানেও কেনাকাটার ভিড়ে প্রাণ অতিষ্ঠ। তবুও খুশীর স্রোতে তারা তাদের ঝাঁপি পূর্ণ করে নিয়ে গিয়েছে ঘরে। সকলেই খুশীতে হাসিতে জীবনের ক্ষয়ে যাওয়া সুখগুলিকে ফিরে পেতে চায়। নেই কোন ভেদাভেদ, নেই কোন বিতরাগ। সকলে এক কাতারে দাঁড়ায়, সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করে। ধন্যবাদ জানায়, কৃতজ্ঞতা জানায়। তারপর শুরু করে ঈদের আনন্দ।    

সুস্বাদু খাদ্য গ্রহণের চাইতে জীবনে আনন্দের আর কিছু নেই। ঘরে ঘরে রান্নার খুশবু।সেমাই, জরদা, পোলাও, কোরমা আরও কত কি? ভোজন পর্ব শেষ করে এবাড়ি, ওবাড়ি বেড়াতে যাওয়া, দেখা সাক্ষাৎ করা, বুকে বুক মিলানো, অন্তরের ধরকন অনুভব করা। সে এক অনির্বচনীয় সুখ! মনে হয় প্রতিদিন যদি এমন দিন হতো! কেন হয় না? একটি শিশু বলে, মা রোজ রোজ ঈদ হয় না কেন? মা হেসে বলেন, রোজ রোজ ঈদ হলে এত আমোদ ফুর্তি হত না। স্কুলে যেতে হবে, হোমওয়ার্ক করতে হবে, আরও কত কাজ! ঈদের খুশী কখন করবে। সেজন্য ঈদ একদিনই ভাল। আনন্দ বেশী হয়। অপেক্ষা করে যে আনন্দ পাওয়া যায়, সেই আনন্দই মজার হয়, সুখের হয়। অনেকদিন মনে থাকে। সে ঈদের চাইতে পরের ঈদ আরো মধুময় হয়। ধৈর্য্য ধর। আবার ঈদ আসবে। 

এত হর্ষ, এত পুলকের আয়োজনের মধ্যে আজ রাতে দুইবার ভূকম্পন অনুভূত হলো। পূর্ব হতে পশ্চিম দিকে ধাক্কা দিয়েছে। সবাই ছুটে বেরিয়ে পড়েছে ঘর ছেড়ে। চেয়ার টেবিল একটার সঙ্গে আরেকটা ধাক্কা খাচ্ছিল। কি না হতে পারতো কয়েক সেকেন্ডে! এ যেন হরিষে বিষাদ। চোখের পলকে সব তছনছ হয়ে যেতে পারতো! আল্লাহ্‌র অশেষ দয়া যে তিনি এই ভয়াবহ বিপদ থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন।

মানুষ যে ধর্মের হোক, যে বিশ্বাসের হোক, উৎসব পছন্দ করে। সে উৎসব হয় নানা ধরণের। ঈদ, পূজা-পার্বন, খৃস্টের জন্মদিন, ব্যক্তির জন্মদিন, পুত্র –কন্যার জন্মদিন। সবই খুশীর দিন। এসবই হর্ষ উৎপাদন বা আনন্দ দান করে। এর বাইরে উৎসব আছে। বন্ধু, আত্মীয়দের ডেকে তাদেরকে আপ্যায়ন করা, সুখ –দুঃখের অংশীদার করা – এসবই সম্যক তৃপ্তিদায়ক।      

ইচ্ছে থাকলে উপলক্ষ্যের অভাব হয় না। আয়োজন বিরাট হতে হবে এমন কোন কথা নেই। সাধ্যের মধ্যে মাঝে মাঝে হালকা নাচ –গান, কবিতা আবৃত্তি, গল্প, আড্ডাছলে উৎসবের আয়োজন করা যায়। না হলে মানুষের মন মরে যায়। জীবন বিষাদ্গ্রস্ত হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকার নানান প্রশ্ন মনে আসে। উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। আত্মীয়, বন্ধুদের বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ে। বন্ধুরা দূরে চলে যায়। একাকীত্ব ভর করে। অন্তর উদাস হয়। জীবন শূন্য মনে হয়। মনে হয় আমার কেউ নেই, কোথাও নেই! অবসাদ্গ্রস্ত জীবন নিজের ও পরিবারের বোঝা স্বরূপ। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এটাই সত্য? না, এটা সত্য নয়। সুখ, আনন্দ, খুশী, শান্তি, তৃপ্তি তৈরী করবার নিজেরও ভূমিকা আছে। নিজের উৎসাহই আসল। নিজেকে সেভাবে সকলের মাঝে স্থাপন করতে হবে। পরের তরে নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে। পরের পাশে দাঁড়াতে হবে। তবেই অন্যের হাত ধরা সহজ হয়। 

মানুষ একা বাঁচতে পারে না। নিজের সুখের জন্য মানুষে মানুষে মেলবন্ধন তৈরী করতে হয়। এটা সকলের জন্য সত্য। কারো একার কাজ নয়। যেহেতু আমরা ‘আশরাফুল মুখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব এবং বুদ্ধিমান জীব, সেজন্য আমাদেরকে একাজটি করতে হবে।‘প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’  মানুষের প্রতি, জীবের প্রতি, প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শনই আমাদেরকে সুখ, শান্তির পথে নিয়ে যাবে। আমাদের মানব জনম সার্থক হবে। ঈদ এবং অন্যান্য উৎসব আমাদের জীবনকে সুখ, শান্তি এবং সমৃদ্ধির সম্ভারে পূর্ণ করে রাখুক। আজকের এই ঈদের প্রক্কালে আমার এই একটি প্রার্থনা। 




 

Friday, March 20, 2026

প্রবন্ধ - অনাদি কালের স্রোতে

 সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। আশরাফুল মখলুকাত। এই মানুষ দুই প্রকারের। একজন নারী অন্যজন পুরুষ। পুরুষ শারীরিক শক্তিতে বলবান। নারী অপেক্ষাকৃত নাজুক। পুরুষ সংগ্রামী। নারী আয়েশী ।পুরুষ ও নারীর জীবন দ্বিমুখী । পুরুষ  বহির্মুখী । নারী অন্তর্মুখী। পুরুষ নারীকে নিরাপদে রাখে। নারী সেই নিরাপত্তা পুরুষের কাছে প্রত্যাশা করে। পুরুষ পিতা হয়ে, ভ্রাতা হয়ে, স্বামী হয়ে, পুত্র হয়ে নারীকে নিরাপদে রাখার সংগ্রাম চালায়। 

সেই সুদূর অতীতে যখন আইন ছিল না, সমাজ ছিল না তখন এই পুরুষ তার গোত্রের নারীদের নিরাপত্তা বিধানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। এমনকি আজকের দিনেও এত উন্নতির যুগে পুরুষের সহযোগিতা না পেলে নারীদের অনেক কর্মকান্ডই ব্যর্থতায় পর্যবাসিত হবে । পুরুষের সহানুভূতি, সাহায্য ব্যতিরেকে  নারীদের একার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব না।  তদ্রূপ নারীদের সাহায্য, সহানুভূতি  ছাড়া পুরুষের একার পক্ষে উন্নতির লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব না । এই দুইয়ের সহস্র বছরের সহযোগিতায় গড়ে  উঠেছে আজকের  সমাজ ব্যবস্থা।  যদি নারীর অবদান না থাকতো তবে মানুষজাত আদিম জীবন যাপন করতো। এই সভ্যতার সুবাতাস আজ নর নারীর জীবনে বইতে পারতো না। পুরুষের শক্ত হাত আদিমতাকে আলিঙ্গন করতো। মেয়েদের কোমল হাত শুধু দাসত্ব করার কাজে নিয়োজিত থাকতো। 

প্রকৃতপক্ষে মেধা ও মননে নারী পুরুষের কোন পার্থক্য নেই। বুদ্ধি ও মেধা আল্লাহর দান। পুরুষের মধ্যে মেধা ও বুদ্ধির তারতম্য লক্ষ্য করা যায় । প্রত্যেক পুরুষ সমান নয়। সেরূপ নারীরাও সকলে সমান বুদ্ধিমতী নয়। কেউ বেশী, কেউ  কম। বুদ্ধি ও বৃত্তি প্রসারের ক্ষেত্র পুরুষের সীমাহীন। সামাজিক ব্যবস্থা পুরুষকে কথা বলার অধিকার দিয়েছে বেশী, জানবার সুযোগ দিয়েছে বেশী। শারীরিক শক্তির বরে তার সাহসও বেশী। এসব কারণে পুরুষের জ্ঞান  বৃদ্ধি পায়  এবং জ্ঞান প্রয়োগের কৌশল তার অভিজ্ঞতার ভান্ডার পূর্ণ করে। অপরদিকে নারী স্বভাবে নমনীয়। সামাজিক ব্যবস্থার ফলে নিজেকে প্রকাশ করবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। গৃহে বন্দি থাকার দরুণ 'বাহির' -কে দেখবার বা শুনবার কোন সুযোগ তার নেই। সুতরাং জ্ঞানের  ভান্ডারে তার শূন্যের ছড়াছড়ি। তার যা কিছু জ্ঞান তা পুরুষের  নিকট থেকে ধার করা। কিন্তু লেখাপড়া  জানা থাকলে বই পুস্তকের মাধ্যমে যা সঞ্চয় করা, বাস্তব জ্ঞান থেকে সেই জ্ঞান অনেক কম।  

আদিম যুগে পৃথিবী বৃক্ষলতার জালে পরিপূর্ণ  ছিল। তার  ভেতরেই অন্যান্য প্রাণীদের সঙ্গে ছিল মানুষের বসবাস। অন্যান্য পশু প্রাণীরা ক্ষিপ্রতায় মানুষের চাইতে অনেক পটু। সেজন্য মানুষ প্রাণ রক্ষার জন্য  বৃক্ষশাখায় রাত কাটাতে শেখে। বৃক্ষশাখায় তারা তাদের অবস্থান স্থায়ী করে। তারপর বুদ্ধির জোরে গাছের ডালে ঘর বাঁধে , অবস্থান দৃঢ়  এবং নিরাপদ করে। এতেও মানুষ থেমে থাকলো না। লক্ষ্য করল তারা দুই ধরণের। একটি আদম, আরেকটি হাওয়া । একটি আদমি - পুরুষ, অন্যটি রমণীয় -রমণী ।  তারা আরো বুঝতে পারলো পুরুষ নারীর সঙ্গ পছন্দ করে। নারী চায় পুরুষের পাশে থাকতে। এভাবেই তারা দিবারাত্রি অতিক্রম করছিল। একদিন এক আদিম মানব কি জানি কি মনে করে একটি জংলী ফুল চয়ন করে তার সঙ্গিনীর এলো খোপায় গুঁজে দেয় । এ কাজটি করে তারা দুজনে স্তম্ভিত হয়ে যায়। এটা কি করে হলো ! সেদিন মনুষ্য জাতি সেই  অরণ্যের  অন্যান্য প্রাণীকুল থেকে পৃথক হয়ে গেল। তাদের বোধোদয় হলো  যে তারা সবার থেকে আলাদা, তারা অসাধারণ । তাদের অনেক কিছুই করার ক্ষমতা আছে। 

আদিম যুগে গৃহ রচিত হয়েছিল নারীদের জন্যই। মেয়েরা কোমল। প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকা তাদের জন্য খুবই কঠিন। তাই  পুরুষকে তার নিজের এবং দলের মেয়েদের নিরাপত্তা বিধানের ভার নিতে হয়। নিরাপদ রাখতে হয় হিংস্র পশুর থাবা থেকে এবং অন্য গোত্রের হিংস্র নরের হাত থেকে। কারণ নারী অপহরণ আজকের মতন আদিম যুগেও ছিল। নারীরা তখনো পুরুষের সম্পত্তির মত ছিল। আজকের যুগেও স্বীকার করতে হয় যে নারী পুরুষের সম্পত্তি। যদিও অনেক মর্যাদা আমরা লাভ করেছি, অনেক অধিকারও পেয়েছি। কিন্তু তা পুরুষের ইচ্ছায়। 

নারীরা প্রাকৃতিক ভাবেই মাতৃত্বের অধিকারী। নারীই মাতা । অন্য কেউ নয়। মাতৃত্ব লাভের সময় তার ক্ষমতা একটু সীমিত থাকে। তখন শত্রুদের হাত হতে রক্ষা করতে হলে সার্বক্ষণিক প্রহরায় পুরুষকে নিয়োজিত থাকতে হয়। সেজন্য পুরুষ অনুভব করে গৃহের প্রয়োজনীয়তা। যেখানে তার নারী নিরাপদে অবস্থান করবে। ঝড়, ঝঞ্ঝা স্পর্শ করবে না, জীব জন্তু আক্রমণ করবে না, শত্রুরা হানা দেবে না। সেই চিন্তা থেকেই পুরুষ নির্মাণ করলো গৃহ - সুরক্ষিত, নিরাপদ আস্তানা তার নারীর জন্য। এই নারীই গৃহলক্ষ্মী, গৃহকর্ত্রী। তাই  নারীর নিরাপত্তা সুরক্ষায় পুরুষের গৃহ নির্মাণে নিত্য নতুন কলাকৌশল আবিষ্কার। এর মূলে যে মন্ত্র কাজ করে তার নাম ভালবাসা।  তাই তার ভালবাসার ধন সুরক্ষিত থাকুক, পুরুষ তাই -ই চায়। 

পুরুষ নারীকে ভালবাসে। এটা প্রাকৃতিক ও চিরন্তণ। একজন নারীও ঠিক একই ভাবে একটি পুরুষকে  তার হৃদয় কুসুম দান করে।  সেই জন্য মানুষ চিন্তা  করতে থাকে এই ভালবাসাকে কিভাবে স্থায়ী করা যায়। একে স্থায়ী করবার জন্য একটি বন্ধন তৈরী  করা প্রয়োজন। এই বন্ধনই বিবাহ। এই বিবাহ নারী পুরুষের ভালবাসাকে চিরস্থায়ী করবার জন্য চালু করা হয়েছে। এ রাখী বন্ধন মানুষের  হাজার বছরের তপস্যার ফসল। সমাজ একে স্বীকার করে  নিয়ে অধিকার দিয়েছে। কেউ এই সম্পর্কের মধ্যে ভাগ বসাতে পারে না। কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত এই বিবাহ বন্ধনই নর - নারীর ভাললাগা ও  ভালবাসার  সম্পর্ককে ধরে রাখার একমাত্র উপায়। যদি তাই না হতো তবে মানুষ এতদিনে এই প্রথা রদ  করে  অন্য কোন প্রথা উদ্ভাবন করতো। 

সকল ধর্মেই বিয়ের প্রথা প্রচলিত আছে। সুতরাং নারী পুরুষের পারস্পরিক অধিকার কারো একার নয়। দুজনেরই সমান। নর নারীর মধুর সম্পর্কের একটি সুন্দর কথা বলে গিয়েছেন  আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, 

'নর বাহে হল, নারী বহে জল,  সেই জল-মাটি   মিশে
ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।'

আরো  বলা যায়, 
'নারীর  বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি প্রাণ
যতকথা তার হইলো কবিতা, শব্দ হইলো গান।'

এই চমৎকার কথাগুলো শুনলে পরান জুড়িয়ে যায় । মনে হয় দুনিয়াতে এর চাইতে মহৎ ও সুন্দর আর কিছুই নেই। স্বর্গ যেন আমাদের কুঁড়ে ঘরে এসে ঠাই নেয় । তবে পুরুষ কর্তৃক নারী যে নির্যাতিত হচ্ছে না তা নয়। শিক্ষিত, অশিক্ষিত নির্বিশেষে মেয়েরা অত্যাচারিত  হচ্ছে।  যেখানে ভালবাসা নেই, স্নেহ মমতা অনুপস্থিত, সেখানে নারী অবশ্যই নির্যাতিত।  নির্যাতনের বা পীড়ণের অন্য একটি দিক আছে। সেটি হচ্ছে, যে সবল সে দুর্বলকে কষ্ট দেয়। দেখা যায় দুর্বল সর্বদাই নিপীড়িত, অত্যাচারিত। এমনকি নারীরা যে ক্ষেত্রে সবল, সেখানে দুর্বল পুরুষ বা দুর্বল মেয়ে, অল্প বয়স্করা অথবা গৃহে কর্তব্যরত গৃহ কর্মীরাও  অত্যাচারিত হচ্ছে। সুতরাং পুরুষ মাত্রেই যে নারীকে নির্যাতন করছে তা নয়।  তাই সবচেয়ে বড়  কথা নারীকে যোগ্য হতে হবে। তাকে অবলা হয়ে ঘরে বসে স্বামীর পায়ের নীচে বেহেশতের সন্ধান করলে চলবে না। তাকে মানুষ হতে হবে। কিন্তু কে নেবে সেই ভার, সেই গুরুদায়িত্ব তাকে মানুষ করে তুলবার? এর উত্তর হল শিক্ষা। 

শিক্ষাই একমাত্রও শক্তি যা মানুষকে মনুষ্যত্ব এবং যোগ্যতা দিতে সক্ষম। মেয়েরা যদি শিক্ষিত হয় তবেই তারা তাদের অধিকার স¤\^ন্ধে সচেতন হবে। তাকে মানুষের  যোগ্যতা অর্জন করতে গিয়ে জানতে হবে তার কর্তব্য কি, দায়িত্ব কি। যদি কর্তব্যজ্ঞান তার ভিতর না জাগ্রত হয়, তবে অধিকার সচেতন নারী ঘরে ঘরে কলহ বিবাদের সূত্রপাত ঘটাবে। সেজন্য দেশের সরকারকে নাগরিকদের সুশিক্ষার ভার নিতে হবে। তাহলেই  পুরুষ ও রমণী সুশিক্ষিত হয়ে নিজের নিজের অবস্থান দৃঢ় ও সুন্দর করতে সক্ষম হবে। শিক্ষিত পুরুষ, নারীকে নির্যাতন করা থেকে বিরত থাকবে। 

ধরে নিই যে সব পুরুষ অত্যাচারী।  তাই তাদের সংস্পর্শ সযত্নে পরিহার করা উচিত। অথবা যদি বলা হয়, 'ওহে সতী সাধ্বী নারী সমাজ, তোমরা পুরুষের নির্যাতনের শিকার  হয়ো না, তাদের পরিত্যাগ করো, নিজেরা  আত্মমর্যাদার অধিকারী হও', তাহলে অবস্থা কি দাঁড়াবে? উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত পৃথিবী নামক গোটা গ্রহটি মহিলাদের ক্রুদ্ধ পদাঘাতে প্রকম্পিত হবে। তারা যে ধর্মের বা যে বর্ণেরই হোক না কেন সকলে একযোগে বিদ্রোহ  করবে, মিছিল করবে, শ্লোগান দেবে, অনশন পর্যন্ত করবে। এমনকি বরফের ঘরে বাস  করে যে এস্কিমো নারী, তারাও অনশন থেকে বাদ যাবে না। তারপর নারীকুল বলবে, 'আমরা একা বাঁচতে চাই না, আমরা পুরুষের সংস্পর্শে বাঁচতে চাই। পুরুষ বিনে জীবন প্রাণহীন দেহের মতোই মূল্যহীন । আমাদেরে পরম প্রিয় পিতা, ভ্রাতা, পতি ও পুত্রকে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিও না।' অন্যদিকে যদি পুরুষকুলকে বলা হয়, 'ওহে পুরুষ প্রবর, তোমরা রাফ্ , তোমারা টাফ্। তোমরা জুলুমকারী, আর তারা শস্যক্ষেত্র নয়, তাদের কাছে যেও না, তাদেরকে মুক্তি দাও।' যদি পুরুষেরা সুবোধ বালকের মত এসব বাণী মেনেও  চলে তবে কি হবে? ঠিক সেই  মুহূর্ত থেকে দুনিয়াতে প্রলয় শুরু হবে। বিধাতার  সৃষ্টি  স্তব্ধ হবে। সেদিন যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হবে সে হবে এ ধরিত্রীর শেষ মানব সন্তান। সেসময় থেকে শতকরা পঁচিশ ভাগ মানুষ, যাদের বয়স পঞ্চাশের বেশী তারা আগামী পঁচিশ বছরেরে মধ্যে এ ধরণীর মায়া ত্যাগ করে মারা যাবে। তারপরে পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছরের মধ্যে আরও পঞ্চাশ ভাগ মানুষ শুধু বয়সের কারণে নয় অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারণে মারা যাবে।   ততদিনে মানব সম্পদ কমে আসবে। অরণ্য সম্পদ বৃদ্ধি পাবে। ভূপৃষ্ঠ অনাবাদী জমিতে পরিণত হবে। সভ্যতার কর্ণধার এই মানবজাতির সংখ্যা নগণ্য হতে হতে যান্ত্রিক সভ্যতা বিকল হয়ে পড়বে। শস্য উৎপাদনের জন্য সক্ষম পুরুষেরা বৃদ্ধ হবে। নগর সভ্যতা পরিচর্যার অভাবে অকার্যকর হবে। পানি, বিদ্যুত ,গ্যাস, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, শিক্ষা মুখ থুবড়ে পড়বে। যে মানব গোষ্ঠী কৃষ্টি ও সভ্যতাকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় তার জন্ম রহিত হবে। তাদের কাজ আর কে করবে? বনজঙ্গল জনপদ গ্রাস করবে। যে কয়জন নারী পুরুষ চরম ঘোষণার শেষদিনে জন্মগ্রহণ করেছিল, তারা যদি শতবর্ষের পরমায়ু নিয়েও জন্মায় তবুও তারা বাঁচতে পারবে না। জীবন ধারণের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে। জরা, ব্যাধি ও  মৃত্যু তাদের নিকটবর্তী হবে। 

মানুষ অরণ্য থেকে সভ্যতায় উত্থান লাভ করতে পারে, কিন্তু সভ্যতা থেকে বের হয়ে অরণ্যে বাঁচতে পারে না। তাই পুরুষ রমণীর সেই ভাল থাকার 'সারমান' বা বাণী ঘোষণার পর থেকে সত্তর পঁচাত্তর বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জীব মানবজাতি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। 'দাও ফিরে সে অরণ্য, লহো এ নগর' -রবিঠাকুরের সেই প্রার্থনা বাস্তবে পরিণত  হবে। সৃষ্টির আদিযুগের মত পৃথিবী গভীর অরণ্যে পরিণত হবে। জীবজন্তুর পদচারণায় বনভূমি মর্মর ধ্বনিতে ভরে উঠবে। পাখির কণ্ঠে প্রভুর জয়গানে অরণ্য মুখরিত হবে। নদীর কলোচ্ছাস বহুদূর হতে শোনা যাবে। যদিও নদীর কলগান শোনার জন্য কেউ কান পেতে থাকবে না। মনুষ্যবিহীন পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। প্রতিদিন সূর্যোদয়  হবে। পশ্চিমাকাশ লালিমায় ঢেলে দিয়ে সূর্য অস্তও  যাবে। বাংলার ছয় ঋতুর পরিক্রমা কাউকে পুলকিত করবে না। কেউ দুঃখ পাবে না, কেউ হাসবে না, কেউ কাঁদবে না। কেউ কবিতা লিখবে না , গান গাইবে না, কেউ আর আনন্দ করবে না। কেউ আর  ভালবাসবে না। নারীকে  আর নির্যাতনের প্রশ্নই উঠবে না। সব শেষ - সব শান্ত।  

Thursday, March 5, 2026

প্রলাপ

সর্বশক্তিমান স্রষ্টার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। সেই মানুষ কখনও এমন পর্যায়ে পড়ে যা সে নিজেই বুঝে উঠতে পারে না। বিংশ শতাব্দীতে মানুষ প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব চালাচ্ছে, মানুষের মনের উপর প্রভুত্ব চালাচ্ছে। একে অন্যের মনও জয় করছে। নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধির বলে অপরের মনের অবস্থা  হৃদয়ঙ্গম করতেও সক্ষম হচ্ছে। জীবনের সকল ক্ষেত্রেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিচ্ছে। অথচ এই বুদ্ধিমান মানবেরও এমন অবস্থা আসে যখন সে নিজে কোথায় আছে, কি ভাবছে, কি করা উচিৎ, কিছুই বুঝতে পারে না। তার অন্তরে সুখ থাকেনা, শান্তিও থাকে না। সে সর্বদা অস্বস্তি অনুভব করে। কিন্তু কেন, কি কারণে সে অপ্রার্থণীয় ‘মনো বেদনা’ তাকে পেয়ে বসে তা সে নিজে বুঝতে পারেনা। মন কি চায় তা সে খোলাখুলি বলতে পারেনা। আত্মার সেই অব্যক্ত ক্রন্দন  কেউ তো শুনতে পায়না। কেবল শুনতে পায় সে নিজে।

কিন্তু কই? সে শোনারও তো কোন অর্থ নেই। সেতো তার কোন অর্থ করতে পারেনা, সেই বেদনার ভাবকে ভাষায় রূপ দিতে পারেনা। কেন পারেনা? সেই কেন পারেনা-র দলে আমিও তো একজন। ধিক!। 

নিজেকে শতধিক! 

কেন আমি আমার মনের অব্যক্ত কথা প্রকাশ করতে পারিনা। আমি তো পাষাণ নই। আমি মানুষ। আমি এই ব্যাধিগ্রস্ত মানুষ হতে নিজেকে পৃথক করে নিতে চাই, কেবল নিজের মনকে দেখার জন্য।

কি সে?

কি চায় সে?

কেনই বা চায়? 

হয়তো তার প্রশ্নের যথার্থ জবাব খুঁজে না পেলেও ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। অনেক সময় বন্ধুদের কাছে আবোল তাবোল বকে যাই। তাদের তা অপ্রিয় লাগে তা জানি। তা জেনেও কেন এমন ভাবে নিজের মনকে সান্ত্বনা দেবার প্রয়াসে কেন অন্যকে উৎপীড়ন করতে যাই? যার কাছে মনের ভাব প্রকাশ করবো, সেই যদি প্রচন্ড মুষ্ঠাঘাত করে, আমার চঞ্চল, কম্পমান, দিশেহারা হৃদয়কে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয়, তবে আমি কি করবো? এমনভাবে বহুদিন আহত হয়েছি। কিন্তু কেন? আর নয়। এবার আমার মানসিক শান্তি, আনন্দ অক্ষুণ্ণ রাখার দায় আমাকেই নিতে হবে। নিজের সুখ, নিজের শান্তির ব্যাঘাত কেন ঘটাব?

হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমিও না সৃষ্টির সেরা জীবদের একজন। তবে কেন এই অন্যায়ের প্রশ্রয় দেব? তাই মনে পড়লো আমার কাগজ আছে, কলম আছে, কালি আছে। তবে কেন আর অন্যের নিকট ব্যর্থ আব্দার করে ব্যথার বোঝা বড় করা? নীরব শ্রোতা হয়ে কাগজের সাদা, পরিষ্কার, পবিত্র বুকে এঁকে যাব আপন মনে। আসবেনা কোন প্রতিবাদ, না আসুক সহানুভূতি।

তাই আজ কাগজ কলমকেই একমাত্র অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করলাম। সে ভুলে যাবে না কিছুই। যেদিন অতীতকে জানতে চাইবো, ঠিকঠিক কথাগুলো সে জানিয়ে দেবে। মিথ্যে বলবে না একটুও। আমার খুব ভাল লাগবে। আজ সারাটা দিনই কেমন মনমরা হয়ে কাটালাম।কোন বিশেষ কাজ করিনি। সময়ের অপচয় বললে দোষ হবে না। নিছক আকাশ কুসুম কল্পনা করেই কাটিয়েছি। আর ভেবেছি মানুষের মন কতই না বিচিত্র। 

কেটেছে একেলা বিরহের বেলা
            আকাশ কুসুম চয়নে
সব কথা এসে শেষ হলো শেষে
          তোমারই দু’খানি নয়নে, নয়নে...

.............................

০৬/০৩/১৯৫৯   

Tuesday, July 20, 2021

মৃত্যুর মুখোমুখি

হঠাৎ সংবাদ প্রচার হল চীন দেশে এক ভয়ংকর রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, যা দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। আমরা এতটা  উৎকন্ঠিত হইনি তখনো। তবে পর্যবেক্ষণ করছি তার গতিবিধি। খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলীয় দেশ সমূহে। দেখতে দেখতে উত্তর কোরিয়া পেরিয়ে খোদ আমেরিকায় তার প্রবেশ। তখন আমাদের টনক নড়ে, আতঙ্কিত হই। বিপুল সংখ্যক মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। ধনী, নির্ধন, ছোট,বড়, কালো, সাদা কোন ভেদাভেদ নাই। সে এক মারাত্মক রোগ, নাম তার করোনা ভাইরাস – ভয়ংকর রুদ্র রূপ ধারণ করেছে।  অসংখ্য লোক মৃত্যু মুখে পতিত হচ্ছে। সৎকার করবার কেউ নেই। জীবিতের সংখ্যার চাইতে মৃতের সংখ্যাই বেশি। পৃথিবীর মানুষেরা সব গৃহবন্দি। তবুও কোন ফাঁক ফোকড় দিয়ে যেন মানুষের নাসারন্ধ্রে যেন ভাইরাসটি প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য নানাপ্রকার উপায় আবিষ্কার করার চেষ্টা চলছে।এরকম দুঃসময়ে ২০২১ সালে আমরা পুরো পরিবার আক্রান্ত হই।করোনা ভাইরাস সনাক্ত হওয়ার সাথে সাথে হাসপাতালে আশ্রয় গ্রহণ করি। চিকিৎসকগণ তাদের সাধ্যমত চেষ্টায় নিয়োজিত হন। তা সত্ত্বেও দ্রুত ভয়ানক অবস্থায় পতিত হই। মাঝে মাঝে ঘোরের মাঝে চলে যাই। এরকম অবস্থায় একদিন আমি দেখতে পাই রুমের ফ্লোরে শুয়ে আছি। ফ্লোরটি লাল রঙের এবং সেটি ঘুরছে ধীরে ধীরে। আমি সটান লম্বা হয়ে শীতল মেঝেতে শয়ান। আমার শিয়রের কাছে মস্তক বরাবর একটি গর্ত – একজন মানুষ ঢুকতে পারে এরকম। গর্তটি মাটির তৈরী – কালচে রঙ। এব্‌ড়ো থেব্‌ড়ো, মসৃন নয়। আমাকে নিয়ে লাল রঙের ফ্লোরটি ধীরে ধীরে ঘুরছিল। আমার মাথাটিও ঐ গর্তের মধ্যে ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছিল। আমার কোন কষ্ট হচ্ছিল না। এভাবে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে আমার মাথাটি বুক পর্যন্ত অন্ধকার গুহায় প্রবেশ করলো। কিন্তু তাতেও আমার কোন কষ্ট হচ্ছিল না। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে আমি মারা যাচ্ছি। ভাবলাম মৃত্যুর কষ্ট তো অনুভূত হচ্ছে না। এ কেমন মৃত্যু –যন্ত্রণা নেই, কষ্ট নেই। মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় কেন? জীবন আর মৃত্যু তো একইরকম। ভাবনাটা আমার এমন ছিল যে, মৃত্যু কোন আতঙ্কের ঘটনা নয়। জীবন যেমন স্বাভাবিক ছিল, মৃত্যুও তেমনি ‘শান্ত চরণে’ আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি আরামেই ঐ কৃষ্ণ অমসৃণ গহ্বরে প্রবেশ করছি। আমাকে বহনকারী লাল মঞ্চটি ঘুরে চলেছে গর্তটিকে সঙ্গে নিয়ে। একটা প্রশান্তির অনুভব। আমি একা। আমার বলার কিছু নেই। কেবল মনে হচ্ছিল শরীরের সবটুকু একবার পিছলে এই গভীর গহ্বরে পড়ে যাবে। তবুও দুঃখ নেই। শুধু একটি মাত্র কথাই মনে পড়ছিল যে, জীবন মৃত্যু একই সমান্তরালে অবস্থিত। জীবনও সুন্দর। মৃত্যুও সুন্দর।

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দেখি লাল মঞ্চটি এবার আমাকে নিয়ে উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করেছে। গতি আগের মতই মন্থর। আমার শরীর ঐ আঁধার গুহা থেকে উপরের দিকে উঠে আসতে শুরু করলো এবং আগের অবস্থায় ফিরে এলো। মাথার পাশের সেই গর্তটি তখনও দেখা যাচ্ছে। আবার কেন ফিরে আসা? সেই তো ছিল ভাল – মৃত্যুর হিম শীতল পরশখানি। কতক্ষণ এভাবে ছিলাম জানা নেই। লাল ফ্লোরটি তখনও ঘুরে চলেছে। আমি শোয়া অবস্থায়। এমন সময়ে শুনতে পেলাম কারা যেন আমেকে ডাকছে মৃদু স্বরে,

– ‘শুনতে পাচ্ছেন? চোখ খুলুন। কথা বলুন।’

চোখ খোলার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। কথা বলার চেষ্টা করলাম। এবারও ব্যর্থ। আরো মানুষের কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। ধীরে ধীরে আমার নয়ন দুটি একটু উন্মীলিত হলো। দেখি অনেক মুখ আমার মুখের উপর ঝুঁকে আছে। বড় ব্যাকুল আর উদ্বিগ্ন। আমি বিছানায় – বেডে। এতক্ষণ আমার চোখ আসলে বন্ধ ছিল। যদিও আমি সব দেখতে পাচ্ছিলাম বলে মনে হচ্ছিল।

এই আমার স্বপ্নের মত মৃত্যুর দুয়ার হতে ফিরে আসা। সেই দৃশ্যটি আমার অজান্তে ঘটেছিল। তবুও মনে হয় সত্যিই ঘটেছিল।   

…………

জুলাই ২১, ২০২১


Wednesday, January 22, 2020

সাহিত্য ও শিল্পবোধ

 

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। স্বর্গ হতে বহিস্কৃত হয়ে আদম এই  বিশ্ব প্রকৃতিকে কেমন দেখেছিলেন জানি না তবে অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন তাতে  কোন সন্দেহ নেই। চারিদিকে সুন্দর আরে সুন্দরের সমারোহ। বৈচিত্র্যে ভরপুর। তারপর দেখা পেলেন হাওয়ার । হৃদয় মন আত্মা তার নেচে উঠেছিল আনন্দে।  তার হৃদয় নিঃসৃত শব্দ কালি – কলমে লেখা না হলেও , সেই আনন্দ নিঃসৃত বাক্যই সাহিত্য। সৌন্দর্য্য মিশ্রিত শব্দ বলেই সেটি সাহিত্য। ঐ সৌন্দর্য্য মিশ্রনই শিল্প। সেদিক থেকে কথাশিল্পী একজন সাহিত্যিক।

শিল্পবোধের স্থান মানুষের মনে। রসবোধ না থাকলে শিল্প সৃষ্টি হয় না।

ভাবনাকে ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে সঞ্চারিত করাই সাহিত্য চর্চা। মানুষ মাত্রেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখ ও সৌন্দর্য্যের অনুভূতির পরশ পায়। সেই অনুভূতির প্রকাশ করবার অভিলাষ তাদের আছে। কেউ কেউ অনায়াসে মনের ভাব সৌন্দর্য্য রসে জারিত করে প্রকাশ করে। অনেকেই সাধনা করে হৃদয়ের শিল্পমন্ডিত ভাব প্রকাশ করে । আমরা পাঠকগন সেই সব বাক্য বা সাহিত্য পাঠ করে  আমাদের অন্তরের না বলা কথার বহিঃপ্রকাশ দেখে আনন্দ লাভকরি।  নিজেকে নির্ভার মনে করি।

‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইলো না কেহ’। না শুধালেও আমরা সাহিত্যের মাধ্যমে সেই শৈল্পিক রসবোধের আস্বাদ পাই – তখন নিজেকে ধন্য মনে করি।  

মনে করি যা বলতে চেয়েছিলাম, তা এই সাহিত্যের মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে।

সাহিত্য বিশ্বের তাবৎ বিষয় নিয়ে লিখিত হয়। মানুষের জীবন বোধকে জাগ্রত করে। জীবনের মানকে উন্নত করে। মানুষকে অন্ধকার হতে আলোতে আনয়ন করে। তার জীবনকে ভালবাসার এবং ভাললাগার অংগনে নিয়ে যায়। জীবনে পুলক অনুভব করে আনন্দ পায় এবং অন্যকে সেই আনন্দ বিলিয়ে, নিজেকে পরিবারকে, সমাজকে সুখী ও কলষমুক্ত রাখে। সেই জন্য সাহিত্য চর্চার মূল্য বা দান অপরিসীম।

সাহিত্য একটি শিল্প। শিল্পবোধ জাগার ফলে মানুষের জীবন ছন্দময় হয়ে ওঠে। সাহিত্য সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে মানুষ নব নব সৃষ্টির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়।  তখন সে উপলব্ধি করতে পারে, ‘নাল্পে সুখনাস্তি’ – অল্পে সুখ নাই।

সাহিত্য চর্চা মানুষের নিত্যদিনের সংগী হোক । রাওয়া উদ্যোগে এই সাহিত্য সভা আরো সুন্দর হোক। সাহিত্য পাঠ করে জীবন আনন্দময় হোক - এই কামনা করি। 

০০০০০০০০

সাহিত্য একটি শিল্প। শিল্পবোধের স্থান মানুষের মনে। রসবোধ না থাকলে শিল্প সৃষ্টি হয় না। শিল্পবোধ জাগার ফলে মানুষের জীবন ছন্দময় হয়ে ওঠে। সাহিত্য সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে মানুষ নব নব সৃষ্টির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়। তখন সে উপলব্ধি করতে পারে, ‘নাল্পে সুখনাস্তি’ – অল্পে সুখ নাই।

ভাবনাকে ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে সঞ্চারিত করাই সাহিত্য চর্চা।

মানুষ মাত্রেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখ ও সৌন্দর্য্যের অনুভূতির পরশ পায়। সেই অনুভূতির প্রকাশ করবার অভিলাষ তাদের আছে। কেউ কেউ অনায়াসে মনের ভাব সৌন্দর্য্য রসে জারিত করে প্রকাশ করে। অনেকেই সাধনা করে হৃদয়ের শিল্পমন্ডিত ভাব প্রকাশ করে ।

আমরা পাঠকগন সেই সব বাক্য বা সাহিত্য পাঠ করে  আমাদের অন্তরের না বলা কথার বহিঃপ্রকাশ দেখে আনন্দ লাভকরি।  নিজেকে নির্ভার মনে করি।

সাহিত্য বিশ্বের তাবৎ বিষয় নিয়ে লিখিত হয়। মানুষের জীবন বোধকে জাগ্রত করে। জীবনের মানকে উন্নত করে। মানুষকে অন্ধকার হতে আলোতে আনয়ন করে। তার জীবনকে ভালবাসার এবং ভাললাগার অংগনে নিয়ে যায়। জীবনে পুলক অনুভব করে আনন্দ পায় এবং অন্যকে সেই আনন্দ বিলিয়ে, নিজেকে পরিবারকে, সমাজকে সুখী ও কলুষমুক্ত রাখে। সেই জন্য সাহিত্য চর্চার মূল্য  অপরিসীম।

সাহিত্য চর্চা মানুষের নিত্যদিনের সংগী হোক । রাওয়া উদ্যোগে এই সাহিত্য সভা আরো সুন্দর হোক।

সাহিত্য পাঠ করে জীবন আনন্দময় হোক - এই কামনা করি।  ধন্যবাদ।

0000000000000000000

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। স্বর্গ হতে বহিস্কৃত হয়ে আদম এই  বিশ্ব প্রকৃতিকে কেমন দেখেছিলেন জানি না তবে অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন তাতে  কোন সন্দেহ নেই। চারিদিকে সুন্দর আরে সুন্দরের সমারোহ। বৈচিত্র্যে ভরপুর। তারপর দেখা পেলেন হাওয়ার । হৃদয় মন আত্মা তার নেচে উঠেছিল আনন্দে।  তার হৃদয় নিঃসৃত সেই শব্দ এই শূন্য পৃথিবীতে  বলাকার গতির ঝংকারের মতো দিক থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই শব্দতরংগ ভাষা না হলেও , কালি কলমে লেখা না হলেও, তাই –ই সুর, তাই –ই আনন্দ, শিল্প এবং সাহিত্য । সেই সুরের ধ্বনি একদিন ভাষায় রূপ নেয়।

অযুত বরষের পরে আমরা মানুষেরা নানান ভাষায় কথা বলি, গান গাই, অলংকৃত করে সাহিত্যে রূপ দান করি।

 সাহিত্য কেবল কথার সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করা নয়, নান্দনিকতাই নয়, মানুষের জীবনবোধকে উপলব্ধি করা তার বিশেষ একটি দিক। সাহিত্যের প্রধান কাজ মানুষের আত্মাকে অজ্ঞানতার অন্ধকার হতে বাইরে বের করে আনা, তার উপলব্ধিকে জাগ্রত করা, ভালমন্দের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। মানুষকে সুন্দর এবং শান্তির স্বপ্ন দেখানো।

আজকের বিশ্ব যখন হতাশা, অস্থিরতা, অন্যায়, অবিচারে অশান্ত, তখন সাহিত্য  মানুষকে পথ দেখায়। মানুষের এই স্বপ্ন শান্তির পক্ষে, সুন্দরের পক্ষে, অসুন্দর এবং বিনাশের বিপক্ষে।

মানুষের অন্তর যখন দুঃখে কষ্টে বিষাদে ম্রিয়মান হয় তখন মানুষ আশ্রয় খোঁজে সাহিত্যে, সংগীতে এবং কবিতায়। সৌন্দর্য্য মিশ্রিত শব্দ বলেই সেটি সাহিত্য। ঐ সৌন্দর্য্য মিশ্রনই শিল্প। সেদিক থেকে কথাশিল্পী একজন সাহিত্যিক।

শিল্পবোধের স্থান মানুষের মনে। রসবোধ না থাকলে শিল্প সৃষ্টি হয় না। ভাবনাকে ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে সঞ্চারিত করাই সাহিত্য চর্চা। মানুষ মাত্রেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখ ও সৌন্দর্য্যের অনুভূতির পরশ পায়। সেই অনুভূতির প্রকাশ করবার অভিলাষ তাদের আছে। কেউ কেউ অনায়াসে মনের ভাব সৌন্দর্য্য রসে জারিত করে প্রকাশ করে। অনেকেই সাধনা করে হৃদয়ের শিল্পমন্ডিত ভাব প্রকাশ করেন । আমরা পাঠকগন, সেই সব বাক্য বা সাহিত্য পাঠ করে  আমাদের অন্তরের না বলা কথার বহিঃপ্রকাশ দেখে আনন্দ লাভকরি।  নিজেকে নির্ভার মনে করি।

‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইলো না কেহ’। না শুধালেও আমরা সাহিত্যের মাধ্যমে সেই শৈল্পিক রসবোধের আস্বাদ পাই – তখন নিজেকে ধন্য মনে করি। 

মনে করি যা বলতে চেয়েছিলাম, তা এই সাহিত্যের মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে।

সাহিত্য বিশ্বের তাবৎ বিষয় নিয়ে লিখিত হয়। মানুষের জীবন বোধকে জাগ্রত করে। জীবনের মানকে উন্নত করে। মানুষকে অন্ধকার হতে আলোতে আনয়ন করে। তার জীবনকে ভালবাসার এবং ভাললাগার অংগনে নিয়ে যায়। জীবনে পুলক অনুভব করে আনন্দ পায় এবং অন্যকে সেই আনন্দ বিলিয়ে, নিজেকে পরিবারকে, সমাজকে সুখী ও কলষমুক্ত রাখে। সেই জন্য সাহিত্য চর্চার মূল্য বা দান অপরিসীম।

সাহিত্য একটি শিল্প। শিল্পবোধ জাগার ফলে মানুষের জীবন ছন্দময় হয়ে ওঠে। সাহিত্য সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে মানুষ নব নব সৃষ্টির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়।  তখন সে উপলব্ধি করতে পারে, ‘নাল্পে সুখনাস্তি’ – অল্পে সুখ নাই।

সাহিত্য চর্চা মানুষের নিত্যদিনের সংগী হোক ।

মহাখালী DOHS COUNCIL এর উদ্যোগে এই সাহিত্য সভা আরো সুন্দর হোক।

সাহিত্য পাঠ করে জীবন আনন্দময় হোক - এই কামনা করি। 

ধন্যবাদ।

 

 

 

 

Tuesday, April 23, 2013

রানা প্লাজা

 ২৪শে এপ্রিল। ২০১৩ সাল। সকাল ৯ ঘটিকার দিকে ঘটে এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা সাভারের রানা প্লাজায়। জরাজীর্ণ ৯ তলা ভবন। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ নেই। ভগ্ন পিলারগুলো তার ভার বহন করতে পারছিল না। কয়েক হাজার লোক তখন সেই গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে কাজে ব্যস্ত ছিল। বিকট শব্দ করে ধ্বসে পড়লো সেই বিল্ডিংটি। ৯টি ঢালাই করা ছাদ।একটির উপর আরেকটি পড়ে গেল, যেন পাউরুটির স্লাইস! নিহত হলো, আহত হলো, আটকা পড়লো কয়েক হাজার মানুষ! তাদের সেই আঘাত ও যন্ত্রণা বর্ণনা করবার ভাষা আমার জানা নেই। এই ভয়ঙ্কর মর্মান্তিক ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। পম্পাই –এর ভূমিকম্পের ঘটনা, উড়িষ্যার দ্বারভাঙ্গার ভূমিকম্পের প্রাকৃতিক মর্মস্পর্শী ঘটনাও যেন এর কাছে হার মানে।

উদ্ধারকর্মে যারা নিজের জীবন বাজি রেখে নিয়োজিত হয়েছিলেন তাদের সাহস ও মানবতাবোধ তুলনা রহিত। নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যারা আটকে পড়া শ্রমিকদেরকে উদ্ধার করেছেন তারা মনুষ্য সমাজে শ্রেষ্ঠ মানুষ। যারা দিনরাত একাকার করে সংবাদ পরিবেশন ও চিত্রধারণ করেছেন দেশের জনগণের জন্য তাদের তুলনা নেই। একেই বলে, ‘মানুষ মানুষের জন্য।’

দেশে দুর্ঘটনার অন্ত নেই। যদি রানা প্লাজার নিদারুণ ঘটনাবলী, ভগ্নস্তুপ, উদ্ধারকাজ, দৃশ্যাবলী, সংবাদ পরিবেশন, চলচ্চিত্র আকারে সংরক্ষিত হয় তবে এটি একটি জীবন্ত মহাট্র্যাজেডি রূপে সমগ্র পৃথিবীর মনুষ্যকে কাঁদাবে। এই হৃদয় বিদারক বাস্তব ঘটনা কল্প কাহিনীকেও হার মানায়। পরবর্তী প্রজন্মের মানুষেরা এই দৃশ্য দেখে সচকিত হবে। এরকম ভয়ংকর দুর্ঘটনা আর না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখবে এবং সচেতন থাকবে।

এই চলচ্চিত্র যদি প্রতি বৎসর ২৪শে এপ্রিল প্রচার করা হয়, তবে যারা মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেছেন, পেছনে ফেলে রেখে গেছেন তাদের চিরদুখী পরিবার, তারা এবং অন্য সকলে তাদের অকালে ঝরে যাওয়া আত্মার জন্য জন্য প্রার্থনা করতে পারেন। এই ঘটনাবলীর দৃশ্য প্রচার করে এ বিশ্বের তথাকথিত ধনী মানুষেরা যেন দরিদ্র জনগণের জীবন নিয়ে খেলা করতে না পারে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

২৪/০৪/২০১৩

Friday, December 31, 2010

কাফেলা

 নদীর স্রোতের মত মানুষের জীবন। মহাকালের পথে সতত  বহমান, সঞ্চরমান। মানুষের জন্ম হয় বিধাতার ইচ্ছায়। শুরু হয় যাত্রা। ব্যক্তি পর্যায়ে তার যাত্রার বিরতি আসে। কিন্তু মহাকালের যাত্রায় নিত্য নব নব যাত্রী এসে সেই যাত্রায় যোগদান করে। এ যাত্রা অগণিত মানুষের যাত্রা চলছে তো চলছে, যেন কাফেলা। তীর্থ যাত্রীর দল। মানুষ মরে যায়, চলে যায়, না জানে কোথায়! তবুও চলতে থাকে বিয়ামহীন। তাতে কাফেলার কলেবর বিন্দুমাত্র হ্রাস পায় না। এই চলার পথের পথিকেরা কেউ সুস্থ, সবল, কেউ অবলা দুর্বল, অসুস্থ। তবুও বাধ্য হয়ে তাকে চলতে হচ্ছে। আর তো উপায় নেই, আর তো পথ নেই।

মানুষের জীবনে ঘাত –প্রতিঘাত আসে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জীবন হয় জর্জরিত। ক্রমাগত জীবন সংগ্রাম জীবনকে করে পর্যদুস্ত। মানুষের মধ্যে ষড়রিপু বাস করে। তার মধ্যে আছে মাৎসর্য নামে এক রিপু। সেজন্য দুর্বল যারা, দরিদ্র্য যারা, তারা সবলের হস্তে হয় নিপীড়িত, নির্যাতিত। অনাদিকাল হতে আজ পর্যন্ত এবং ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া চলে আসছে, চলতে থাকবে। 

এই যাত্রী দল ‘দুর্গম গিরি, কান্তার মরু’ পার হয়ে চলতে থাকে সমুখ পানে। পেছনে ফেরার উপায় নেই। যাত্রীদের ধারণা পথ চলায় যত শ্রম, যত ক্লেশ, ততই পূণ্য অর্জন। পূণ্য অর্জন যদি নাই হবে, পহ চলা যে বৃথা হবে। অর্জনের ঝুলি থাকবে শূন্যতায় ভরা। সময়ের পথ চলতে চলতে অনেকে অবসাদ গ্রস্ত হয়। মিছিলের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনা। কারো গতি হয় শ্লথ, কেউ পড়ে যায়। কেউ আর উঠে দাঁড়াতে পারে না। 

যাত্রীদের কাউ হয়তো তার সুহৃদের জন্য ক্ষণিক দাঁড়ায়। কিন্তু স্রোতের টানে তিষ্ঠাতে পারেনা। ‘মোছাফির মোছ রে আঁখিজল, ফিরে চল আপনারে নিয়া।’ চোখের জল মুছে পথ চলতে থাকে সে। পথের ধূলিতে কে পড়ে রইল, কে চলে গেল চিরতরে, তার খোঁজ রাখতে পারেনা। 

পুরাতন চলে যায়। নতুন আসে। বিশ্ব বিধাতা সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষার জন্য এ বিধান তৈরী করেছেন। বিধাতার সংসারে সকলে তার সৃষ্ট জীব। সেখানে মাতা নেই, পিতা নেই, পুত্র নেই, কন্যা নেই। সকলেই আল্লাহ্‌র বান্দা। সৃষ্টি লীলার অংশ। যাদেরকে আমরা মাতা –পিতা  বলি তাদের মাধ্যমে তিনি তার সৃষ্টির ধারা বজায় রাখেন। সন্তান প্রকৃত পক্ষে পিতামাতার নিকট আল্লাহ্‌ তায়ালার আমানত। মা –বাবা মমতার বন্ধন দিয়ে সন্তানকে আল্লাহ্‌ তায়ালার অনুগত বান্দা হিসাবে গড়ে তোলেন। কি সমতলে, কি পাহাড় –পর্বতের পাদদেশে মানুষের সাধনা হয়ে দাঁড়ায় সন্তানকে সুশীল মানুষ হিসাবে গড়ে তুলবার। পরবর্তীকালে এই ছেলেমেয়েরাই ভবিষ্যতের মানুষ জন্ম দিয়ে যাবে বংশানুক্রমে। তারাও এ তীর্থ যাত্রীদের কাফেলায় শরীক হবে। সারা পৃথিবী জুড়ে এই কাফেলা চলতে থাকবে নিরবচ্ছিন্ন, নিরলস গতিতে। তারা কারও জন্য অপেক্ষা করবে না। কারো জন্য থেমে থাকবে না।‘Let the dog bark and the caravan pass.’এ প্রসঙ্গে কাহলিল জিবরান তাঁর The Prophet গ্রন্থে বলেছেন, ‘তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়। তারা প্রবাহিত জীবনের আকুল প্রত্যাশার পুত্র –কন্যা। তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, কিন্তু তোমাদের ভেতর জন্ম নেয় না। তারা যদিও তোমাদের সাথে থাকে, তারা তোমার সম্পদ নয়।’ পিতা মাতার মাধ্যমে তারা আসে, তারা চলে যায়। তাদের বংশধরেরা একই পথ অনুসরণ করে তাদের প্রতিনিধি রেখে যায়। তাদেরো সেই একি পরিণতি। ওমর খৈয়াম তাঁর রুবাইয়াতের এক জায়গায় বলেছেন, ‘যদি নিয়ে নাও প্রভু তোমার বান্দাকে, তবে সৃষ্টি করবার কি প্রয়োজন ছিল? ’ বংশ পরম্পরায় সকল বান্দা মৃত্যুর অধীন। তবে জন্মানো কেন? বিশ্ব বিধাতার লীলা খেলা অংশ মানুষের জন্ম –মৃত্যু। আর তা একজন ব্যক্তি মানুষের সমগ্র জীবন। 

জীবনে কাছে এবং দূরে বহু মানুষ দেখেছি। তাদের জীবনের সুখের কথা, দুখের কথা শুনেছি। হাতে হাত রেখেছি, কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়েছি, অনেক পথ হেঁটেছি একসাথে, ফুল তুলেছি, গান গেয়েছি। পথ চলতে চলতে একজন, একজন, করে কে যে কোথায় হারিয়ে গেল! জানতে পারিনি। যারা একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তারা অনেকে আজ নেই। 

কোথায় তারা? 

যেদিকে তাকাই কেবল নতুন মুখ, অচেনা, নামহীন, পরিচয়হীন জনতা। তবুও আঁখি কেবল খুঁজে ফেরে সেই পুরাতন সহযাত্রীদের মুখ। যদি কখনও দু’একজনের সাক্ষাৎ পাই, একে অপরকে শুধাই কোথায় তারা? সেই প্রশ্নের উত্তরে ওই সমুখের গোধূলি লগ্নের সন্ধ্যাতারার দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে বলে, নাই নাই সে পথিক নাই। ঐ আকাশের তারাদের মাঝে ভীড় করে আছে। রেখে গেছে কেবল পদচিহ্ন – তাদের কীর্তি জীবনের বালুকা বেলায়।       

এই অভিযাত্রীদের মিছিল, এই কাফেলা তার পরিপূর্ণ দলবল নিয়ে ধীরে ধীরে সমুদ্র স্রোতের ন্যায় চলতে থাকে। কে গেলো, কে এলো; তার খোঁজ রাখে না। প্রতিদিন কত মানুষ –এই কাফেলা যাত্রী – মরে গিয়ে পথের ধূলায় লীণ হয়ে যাচ্ছে! আবার কতজনা জন্মগ্রহন করে এই কাফেলায় শরীক হচ্ছে। এটাই নিয়ম। এই দীর্ঘ মিছিলের যেমন শুরু নেই, তেমন শেষও নেই। 

কোন্‌ সাগরের তীরে মানুষের তীর্থ তা সে জানে না। তবুও পুণ্য লাভের আশায় মানুষ ঐ তীর্থ যাত্রী পথিকের দলে ভিড়ে যায়। তারপর একদিন বৃক্ষের হরিদ্রাভ পত্রের ন্যায়, পরিপক্ক ফলের ন্যায়, বৃন্ত হতে বিচ্যুত হয়ে ভূতলে পতিত হয়। সহযাত্রীর নয়ন ভরে উঠে জলে। ‘যেতে নাহি দেব –তবু চলে যায় ।’ আর আসে নাকো ফিরে। এভাবেই চলবে। একদল এই কাফেলায় যোগদান করবে, অন্যদল ঝরে পড়বে। কাফেলায় যাত্রীরা কেউ চিরস্থায়ী নয়। কেউ আসে, কেউ যায়। কাফেলার কলেবর ঠিক থাকে। সে চলবে চিরকাল। 

‘এ পথ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়।’ থেমে যাবার পথও নয়। জীবনের যা কিছু অর্জন, তার কষ্টার্জিত সম্পদ, যক্ষের মত বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল, সব ছেড়ে সে চলে যায়। ক্লান্ত, শ্রান্ত পথিক আক্ষেপ করে বলে, 

‘হায়রে হৃদয়, তোমার সঞ্চয়,

দিনান্তে, নিশান্তে, শুধু পথপ্রান্তে, 

ফেলে যেতে হয়।            

নাই, নাই, নাই যে সময়।’

............

১১.১.১১ 

Sunday, November 25, 2001

সংলাপ

 পন্ডিত ব্যক্তিরা বলেন, অনন্তকালের মাঝে মহাসমুদ্রের বুদবুদের মত নাকি মানুষের জীবন। জন্ম এবং মৃত্যুর মধ্যবর্তী ব্যপ্তিকালকে জীবন বলা হয়। মহাকালের যাত্রাপথে প্রকৃতপক্ষেই মানুষের স্থিতি অতিশয় অল্প সময়ের। এই অল্পকাল জীবনটুকু একজন মানুষের সারাজীবন, দীর্ঘজীবন, চিরকাল। শৈশব, কৈশর, যৌবন, বার্ধক্য, মোটামুটি এই কয়টি জীবনের পর্ব । ধাপে ধাপে মানব সন্তান এসব পর্ব অতিক্রম করে তার আয়ুষ্কালের নাটকের যবনিকা টানে।

সৌরজগতে গ্রহনক্ষত্র সতত সঞ্চরমান। দিবাবসনে রাত্রি নামে। নিশি অবসানে ঊষার অভ্যুদয় ঘটে। এরই মাঝে মানবসন্তান জন্ম লাভ করতে থাকে। মহাশূন্যে জড়বস্তুরা কে কোথায় তখন অবস্থান করে, কে জানে? তবুও সেই জড় পদার্থ গ্রহনক্ষত্রই নাকি মানুষের জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যুর দিনক্ষণও স্থির করে দেয়। অর্থাৎ তার আয়ু, স্থিতিকাল রচিত হয় । 

এই আয়ু বা স্থিতিকালের মধ্যে মানুষ কি চায়? সুখ চায়, শান্তি চায়, ভালবাসা চায়, দীর্ঘদিন বাঁচতে চায়। বাঁচতে গিয়ে প্রতি পদক্ষেপেই অসুখ, অশান্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয়। লড়াই করে কেউ জয়ী হয়, কেউ হেরে যায়। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে একজন মানুষ হেরে যায় বা জয়ী হয় তা নয়। আর প্রতি মুহূর্তে জয়ী হয় তাও নয়।

Life is a pendulum between joys and sorrows, distress and happiness, hopes and despair. সুখ দুঃখ, শান্তি অশান্তি, জয় –পরাজয়, আশা –নিরাশা এসব পর্যায়ক্রমে মানুষের জীবনে আসে। সুখের পরে দুঃখ, দুঃখের পরে সুখ –এভাবেই জীবন কাটে। কারো সুখের পাল্লা ভারী, কারো বা দুঃখের। সেইদিক দিয়ে কেউ ভাগ্যবান, কেউ ভাগ্যহত। 

জন্মের পর মাতৃক্রোড় এক পরম সুখের স্থান। যারা মায়ের কোল পায় তারা পরম ভাগ্যবান। পরম স্নেহে, পরম নির্ভরতায় স্বর্গীয় বিমল আনন্দে কাটে তাদের শিশুকাল। হাঁটি হাঁটি পা পা করে মাতৃ ক্রোড় ছেড়ে নেমে আসে মাটিতে। তারপর বাটির অঙ্গন ছেড়ে প্রাঙ্গনে। তারপর বাল্যকাল, হাসি আর আনন্দ, খেলাধুলা, অক্ষরজ্ঞান লাভ, বিদ্যালয়ে প্রবেশ। পরে শুরু হয় মহাযজ্ঞ। জ্ঞান অর্জনের তপস্যায় ছাত্রজীবন গ্রহণ। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাপ অতিক্রম করে অগ্রসর হতে থাকে। পদার্পণ করে যৌবনে। যৌবন হচ্ছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। ‘এখন যৌবন যার/সময় হচ্ছে তার যুদ্ধে যাবার।’ জীবনে যা কিছু অর্জন, এই যৌবনকালেই সম্ভব। যে যেমনই ব্যক্তি হোক, তার কিছু প্রাপ্তি –ভাল হোক, মন্দ হোক, সফলতা ব্যর্থতা – সব এই সময়ে অর্জিত হয়।

সুশীল তরুণ, জীবনের একটি লক্ষ্য স্থির করে। সেই লক্ষ্যে সে অগ্রসর হয়। নিজেকে প্রস্তুত করে। বিশেষ কোন লক্ষ্য না থাকলে সেই যুবক পথ হারায়। লক্ষ্য না থাকলে গন্তব্যে পৌঁছাবে কি করে? ধরা যাক কেউ শিক্ষক হতে চায়। তাকে মনদিয়ে বিদ্যা উপার্জন করতে হবে। পাঠ্য বহির্ভূত পুস্তকাদিতে মনোনিবেশ করতে হবে। নিজের অধীত জ্ঞান অন্যকে দান করবার ক্ষমতা আয়ত্ত করতে হবে। ‘যতই করিবে দান, তত যাবে বেড়ে।’ বিদ্যা দান করার মধ্য দিয়ে নিজের জ্ঞানের পরিধি বিস্তার লাভ করে। এভাবে একদিন সে সুশিক্ষক হওয়ার গৌরব লাভ করে।   

অন্যদিকে যদি সেই যুবক কোন রকমে পরীক্ষা পাশ করে আর কোন উপায় নেই বলে শিক্ষকের পেশা গ্রহন করে, তবে তার ফল হবে বিপরীত। জ্ঞানের ভান্ডার তার অপূর্ণ। সুতরাং দান করবে কি? পাঠ্যপুস্তকের একই সিলেবাস সারাজীবন ধরে আউরে তিনি নিঃস্ব হবেন। শিক্ষকতার আনন্দ বা গৌরব লাভ তার কোনদিন হবে না। রিক্ততাই তার জীবনের শেষ পাওয়া হবে। 

এরকম সকল পেশায় মানুষকে দক্ষ ও পারদর্শী হতে হবে। নচেৎ সফলতা আসবে না। সফলতাই জীবনের সুখ। নিজের ও পরের কল্যাণ সাধনই জীবনের সন্তুষ্টি আনয়ন করে। এই সন্তুষ্টিই আনন্দ। আনন্দই সফলতার বার্তা বহন করে। 

অনেকে বলেন গ্রহ, নক্ষত্রই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে। যা ভাগ্যে আছে তাই হবে। সুতরাং সে ব্যক্তির করবার তেমন কিছু নেই। গ্রহ নক্ষত্র আসলেই ভাগ্য স্থির করে কিনা তা জ্যোতিষীরা জানেন। তবে এটি একটি বিতর্কিত বিদ্যা। 

অনাদিকাল থেকে মহাশূন্যে গ্রহ নক্ষত্র নিজেরাই অবিরত ঘুরপাক খাচ্ছে, তাদের কেন্দ্রের মহাশক্তিকে ঘিরে। আবর্তনের নিজস্ব ও নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। ভূ-পৃষ্ঠে ২৪ ঘন্টায় যত মানুষ জন্মগ্রহন করে তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণে এসব গ্রহ নক্ষত্রের কোন ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে হয়না। একই সময়ে জন্মগ্রহনকারী সকল জাতকের ভাগ্য একই রকম হয়না। সেইরকম একই ঘটনার শিকার সকল মানুষের জন্ম একই সময় হয়নি। তবুও অনেকে এসব গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থানের সময়ের সঙ্গে মানুষের জন্মের একটা সম্পর্ক স্থাপন করে দীর্ঘকাল গবেষণা করে তারা এক যোগসূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করে। এরকম একটি চিন্তার চর্চা করে তারা হয়তো একটি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। তবে কবে আসবে সেইদিন যেদিন জ্যোতিষিরা হস্তরেখা দ্বারা অনাগত ভবিষ্যতের সকল তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারবে। সকল বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে মানুষকে, সে আশা সুদূর পরাহত।

ভাগ্যের হস্তে সব সমর্পণ করে কেউ সাফল্যের পথে অগ্রসর হতে পারেনা। যে তরী যাত্রীকে তীরে ভিড়ায় সে তরীকেও চালনা করতে হয়। ভাগ্যে যাই থাকুক, মানুষকে তার অন্বেষণ করতে হয়। God has created food for the birds. But they are to fly for it. জীবনের পথকে নির্মাণ করতে হয়। তবেই সে পথে সে হাঁটতে পারবে তার গন্তব্যে পৌঁছার জন্য। একদিন পথের শেষে এসে দেখবে, ‘বেলা যে পড়ে এলো, জলকে চল।’ সময় শেষ। জীবনের অপরাহ্ন সামনে গোধূলী লগ্নের ম্লান আলো। জল নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা তার হিসাব কষতে হবে। হিসাব বরাবরই ভুল হবে, মিলবে না আর। চুপি চুপি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসবে বক্ষপিঞ্জরের ওপার হতে। তারপর একদিন নিজের চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক, হস্ত –পদ সব বিদ্রোহ করবে। মালিকের কথা আর শুনতে চাইবে না। অধীনস্তদের অধীনে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে। সকল কর্ম সমাপ্ত। চুকিয়ে দিতে হবে সকল লেনা দেনা। তামাম শোধ। বিচরণের পরিধি সীমিত। ক্রমে গৃহকোণ, তারপর শয্যা। পদচিহ্ন আর কোথাও পড়েনা। অপেক্ষা করতে হয় জীবন নাটকের শেষ দৃশ্যের।

‘জন্মিলে মরিতে হবে/অমর কে কোথা কবে,
চিরস্থির কবে নীর/ হায়রে জীবন নদে।’

এ যে চিরন্তন বাণী। অনন্ত কালের ধারায় ক্ষণিকের জীবন। কত সুখ, কত দুঃখ, কত বিচিত্রতার ভিতর দিয়ে অতিক্রম করতে হয়।  একটু সুখের জন্য কত না সংগ্রাম করতে হয়। কঠোর পরিশ্রমে তৃপ্ত হয় এই ভেবে যে একদিন তার পরিশ্রমের সোনার ফসল তার গোলা ভরে দেবে। 

‘জীবন যেন পদ্মপত্রে নীড়।’ মৃদু সমীরণে কত না সহজে ঘটে তার পতন! এ যে অমোঘ, এ যে বিধান। জন্ম, জরা, মরণ!   

     

২০০১


Wednesday, November 26, 1997

আমাদের হেলেন আপা

স্মৃতিচারণ মূলক রচনা


বিদ্যাময়ী গার্লস’ হাই স্কুল। ময়মনসিংহের তথা সমগ্র বাংলাদেশের সেরা স্কুল। আমরা গর্ব বোধ করতাম বিদ্যাময়ী স্কুলের ছাত্রী ছিলাম বলে। সে সময় হেলেন আপাকে পাই আমাদের শিক্ষক হিসাবে। সবে মাত্র সপ্তম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছি। নতুন ক্লাসে নতুন আপাদের সাক্ষাৎ লাভ, সেটা একটা খুবই রোমাঞ্চকর ঘটনা। একটি মেয়ে বললো, এবার আমাদেরকে বাংলা পড়াবেন হেলেন আপা। শুনে চমকে উঠলাম। হেলেন আপা! যাকে দূর থেকে দেখেছি, ভয় পেয়েছি। তিনিই স্বয়ং আমাদের ক্লাস নেবেন। মেয়েটি বলল, কেন আমরা এখন বড় ক্লাসে পড়িনা?  আমরা তো প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রথম সোপানে পা রেখেছি। 

প্রথম বাংলা সাহিত্যের ক্লাসে হেলেন আপার আগমন। ক্ষণটি বেশ স্পষ্টই স্মৃতিতে ভাসে। প্রথম পিরিয়ডেই আপা আমাদের শ্রেণী কক্ষে প্রবেশ করলেন। যেন এক মহিয়সী নারী আমাদের সামনে উপস্থিত। আমরা সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যথাযথ অভিবাদন জানালাম। তিনি মেয়েদের নাম ও মেধার ভিত্তিতে পরিচয় জেনে নিলেন। তাঁর সৌন্দর্য, রুচিশীল পোশাক দেখে আমরা চমৎকৃত হলাম। তিনি বই খুলে একটি গল্প নির্বাচন করে আমাদেরকে পড়াতে শুরু করলেন। গল্পটির নাম ছিল ‘প্যারী নগরী’। হেলেন আপা তখন সদ্য বিলেত ফেরত। ইংল্যান্ডের ওপারেই ফরাসী দেশ। যার রাজধানীর নাম প্যারিস। হেলেন আপা সে দেশও ভ্রমন করে এসেছেন। প্যারিসকে সে দেশের লোকেরা প্যারি উচ্চারণ করে। হেলেন আপা স্বচক্ষে দেখে আসা পৃথিবীর সুন্দরতম শহরের বর্ণনা দিতে লাগলেন। যেন উনার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও সেই শহর ঘুরে ঘুরে দেখছি। বইয়ে যা কিছু লেখা আছে, তিনি তার সবকিছু দেখে এসেছেন। আমরা তাতে পুলকিত হয়েছি সবচেয়ে বেশী। ধাতু নির্মিত আইফেল টাওয়ারের কথা, শহরের স্থাপত্য শিল্পের কথা, রাস্তা ঘাটের কথা, প্রাচুর্যের কথা, সীন নদী  ও তার তীরভূমির নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যের কথা –সব তিনি বর্ণনা করেছেন অতিশয় প্রাঞ্জল ভাষায়। তাঁর পাঠদানের পদ্ধতি ছিল খুব সুন্দর। উনার পড়াবার স্টাইল এত আকর্ষণীয় ছিল যে বাংলা গদ্য আর গদ্যময় মনে হতো না। পাঠদানের ফাঁকে ফাঁকে হেলেন আপার প্রাসংগিক জ্ঞানদান আমাদেরকে বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে সচেতন করে তুলেছে। আমরা বিস্মিত হলাম যে আপা কেবল বাহিরে নয়, অন্তরেও সুন্দর। পরিপূর্ণ একজন মানুষ ও দক্ষ শিক্ষক। তিনি নিজে সাহিত্য চর্চা করেন। তিনি বহু গ্রন্থের প্রণেতা। জীবন ও সমাজ সচেতন একজন লেখক। জীবন ও জগতের ঘাত প্রতিঘাত ও আনন্দ –বেদনার প্রতিচ্ছবি তার গল্পে, উপন্যাসে রূপায়িত করেছেন। তাঁর লেখা ‘আমার পরিচিত বৃহত্তর ময়মনসিংহের কয়েকজন বিশিষ্ট নারী’ –একটি বিশিষ্ট গ্রন্থ। এটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ বলে আমি মনে করি। তিনি যথেষ্ট শ্রম, মনোযোগ দিয়ে সাফল্যের সঙ্গে এই বইটি প্রকাশ করে একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ময়মনসিংহের তখনকার দিনের শিক্ষিত মেয়েদের জন্য এটি একটি ইতিহাসও বটে। বইটি একটি মহা মূল্যবান গ্রন্থ। তিনি আরো লিখুন এবং সুস্থ ও দীর্ঘজীবন লাভ করুন – এই আমার প্রার্থনা। একটি অনন্য প্রয়াসের জন্য হেলেন আপাকে আন্তরিক ধন্যবাদ  জানাই।

তারিখ – ২৭.১১.১৯৯৭ 

ঢাকা।

পরিশিষ্ট

হেলেন আপার দেখা পাইনি অনেকদিন। তার সাক্ষাৎ লাভের জন্য চেষ্টা করেছি অনেকবার। পরিচিত অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি তিনি কোথায়? তারা বলেছেন, তিনি দেশে নাই। বিফল মনোরথ হয়ে আশায় আশায় দিন গুনেছি, যেদিন তিনি দেশে আসবেন সেদিন উনার সঙ্গে দেখা করতে যাব। কিন্তু আশা কুহকিনী। মার্চের একদিন পত্রিকা খুলে দেখি হেলেনা খান আর নেই। চলে গিয়েছেন প্রিয় মানুষজন, প্রিয় মাতৃভূমি ত্যাগ করে সেই পরপারে। আর একটিবারও ফিরে আসবেন না। এই যে আমি তোমাদের পরম প্রিয় হেলেন আপা ফিরে এসেছি, তোমাদের কাছে –এ কথাটি আর বলবেন না। ‘এ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়।’ 

পত্রিকায় সংবাদটি দেখে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। একদৃষ্টে চেয়ে থাকলাম সেই ছবিটির পানে। আর তিনি কথা কইবেন না। কলমটি হাতে নেবেন না। লিখবেন না আমাদের জন্য। আমাদের মনের কথাটি আর বলবেন না –‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক। আমি তোমাদেরই লোক।’

কিন্তু তিনি সশরীরে না এলেও আছেন আমাদের মাঝে, থাকবেন আমাদের মাঝে –স্মৃতির মণিকোঠায়। বিদ্বান, বুদ্ধিমান, মমতাময়ী এবং একজন আদর্শ শিক্ষাদানকারী ও সুপথে চলার উপদেশ দানকারী হিসেবে আমাদের অন্তরে চির জাগরূক থাকবেন। তার অন্তর ছিল আলোকিত। তিনি সকল ছাত্রীদেরকে আলো দান করে গেছেন। তিনি উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। সেই সময় খুব কম সংখ্যক মেয়ে সেই সুযোগ লাভ করেছিলেন। সেখান থেকেই তিনি শিক্ষার আলোর মশালটি পরবর্তী নারী শিক্ষা অর্জনের জন্য তুলে ধরেছিলেন। আমরা তাঁর ছাত্রী। অনেক প্রতিকূল অবস্থা অতিক্রম করে শিক্ষার আলোকে আলোকিত হয়েছিলাম। তাই তাঁর কথা আজ খুব মনে পড়ছে। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট লেখিকা। প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। সমাজের এবং মেয়েদের অনেক সমস্যায় আলোকপাত করেছেন। শিক্ষত মেয়েদের সুস্থ চিন্তা ধারার দুয়ার খুলে দিয়েছেন। এগিয়ে চলার উৎসাহ দান করেছেন। 

আজ তিনি নেই। মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ থেকে কারো নিস্তার নেই। তবুও হৃদয় বীণায় তার চলে যাওয়ার বেদনার সুর বাজে। তার জন্ম সার্থক। জীবন সাফল্যময়। এটাই মানুষের জীবনের বেঁচে থাকার সার্থকতা। তাঁকে আমরা চিরকাল স্মরণ রাখবো আমাদের হৃদয়ের মণিমঞ্জুষায়।

‘জীবনের যাত্রাপথে 
কত অগণিত যাত্রীচলে
বিরাম, বিশ্রামহীন –
কেবা মনে রাখে?
তবু তারি মাঝে ক্ষণিক দাঁড়িয়ে 
স্মৃতির ফলকে
যারা পদচিহ্ন আঁকে,
তারা মনে থাকে।’

আমাদের হেলেন আপা ইহলোকে যেমন আলোকিত ছিলেন পরলোকেও সেরকম শান্তি লাভ করুন এবং পরম করুণাময়ের ক্ষমা ও দয়া প্রাপ্ত হউন। এই আমার প্রার্থনা।

০৪.০৭.২০১৯     

Wednesday, March 24, 1971

৭১ এর কালরাত্রি


১৯৭১ সাল। পাকিস্তানের রাজনৈতিক আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা। কারণ নির্বাচনে এ্যাবসোলিউট মেজরিটি পেয়েও শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ, সরকার গঠন করতে পারছে না l কারণ সরকার গঠনে দেশের দুই অংশের সহযোগীতা প্রয়োজন l ওদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা ভুট্টো ঘোষণা করেছেন যে, যে এম পি ঢাকায় সংসদ অধিবেশনে যোগদান করতে যাবে তার পা ভেঙ্গে দেয়া হবে l

পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তখন খুবই অস্থির, উত্তেজিত l ভুট্টো, জেনারেল ইয়াহিয়া খানের বৈঠক চলছে শেখ মুজিবের সঙ্গে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল – বর্তমানের শেরাটনে l এ বৈঠক ছিল নিছক প্রহসন l বৈঠকের নাম করে পাকিস্তানের ধূর্তরা কালক্ষেপণ করছিল মাত্র l ঐ ‘সময়’ টুকু তাদের প্রয়োজন ছিল। কারণ সেই সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে বিপুল সংখ্যক অস্ত্র পাকিস্তান থেকে আনা হয়। বন্দরের বাঙ্গালী কর্মচারীরা এতো বিশাল পরিমাণ মারাণাস্ত্র প্রত্যক্ষ করে চমকে ওঠে। তাদের বুঝতে বাকী থাকে না যে, এগুলো বাঙ্গালীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। তারা জাহাজ থেকে মাল খালাস করতে অস্বীকৃতি জানায়। তাই পাকিস্তান সরকার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বাঙ্গালীদের সরিয়ে নিয়ে পাঞ্জাবী খালাসী নিয়োগ করে।

যাত্রীর ছদ্মবেশে লক্ষ লক্ষ পাঞ্জাবী সেনায় দেশ ছেয়ে যায়। এদিকে সাধারণ জনগণের আশা মুজিব-ভুট্টো বৈঠকে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু শেখ মুজিব বুঝেছিলেন এই দরবার বাস্তবে কোন ফল বয়ে আনবে না। তাই তিনি দেশের জনগনকে ডাক দিলেন। বললেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম – এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

বাংলাদেশের পরিস্থিতি তখন উত্তাল। এরকম সময় ভুট্টো, ইয়াহিয়া রাতের অন্ধকারে ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে যান করাচীতে আর হুকুম দিয়ে যান কুখ্যাত এক জেনারেল, টিক্কা খানকে। টিক্কা খান ছিলেন অতি নিচাশয় নিষ্ঠুর প্রকৃতির ব্যক্তি। ‘বাঙাল’দেরকে খতম করে দেয়ার সনদ লাভ করে টিক্কা খান খুব খুশী। টিক্কা খান সৈন্যদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিল, ‘হামে জামিন চাহিয়ে-ইনসান নেহি।’ বাঙ্গালীদের বাংলা বলার সাধ মিটিয়ে দাও। পাঞ্জাবী এনে বাংলা মুলুকে মানুষের আবাদ করব। উন্মত্ত সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়লো ঢাকা নগরীর ঘুমন্ত মানুষদের উপর। সেদিন ছিল ২৫ শে মার্চের কালরাত্রি ১৯৭১.

ঢাকায় শোনা গেল গুরুগম্ভীর যন্ত্র নিনাদ।

ঢাকাবাসী কাঁচা ঘুম থেকে জেগে উঠলো। মনে করলো ঝড় আসছে , আসছে প্রচন্ড বৃষ্টি। হ্যা, বৃষ্টি হলো ঠিকই, তবে তা কোন কালো মেঘ হতে ঠান্ডা জলকণা নয়। তা ছিল ট্যাংকের ব্যারেল হতে নিক্ষিপ্ত জীবন হরণকারী উত্তপ্ত গোলা। ঘুম ভাঙ্গা মানুষেরা জানতেও পারলো না যে, তাদের মরণ ঘনিয়ে এসেছে। নিরাপরাধ, নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে হত্যা করতে অস্ত্র চালকদের কোন দ্বিধাই থাকলো না। এই নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতশত তাজা প্রাণ ঝরে পড়লো। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে বাঙ্গালীদের নির্মম ভাবে হত্যা করা হলো। মানুষ মেরে খড়ির বোঝার মতন রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্তুপ করে রাখা হলো।

আমরা তখন কোয়েটায় — বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী। ভুট্টো, মুজিবের বৈঠকের ফলাফল শোনার জন্য উৎকর্ণ। পাকিস্তানী প্রচার মাধ্যমের ওপর কোন আস্থা ছিল না আমাদের। বিদেশী রেডিও শোনা ছিল খুবই বিপদজনক। গভীর রাত্রে বিদেশী প্রচার মাধ্যমে ইয়াহিয়া, ভুট্টোর ঢাকা ত্যাগের সংবাদ পেয়ে দারুণ ভাবে উদ্বিগ্ন হই। বিনিদ্র রজনী আর শেষ হতে চায় না। ভোর রাত্রে অল ইন্ডিয়া রেডিওর একটি স্টেশান পাই। রেডিও প্রচার করছে, ‘পূর্বি বাঙ্গাল মে ভারী জান–ই নুকসান হো রাহা হ্যায়।’

সংবাদ শুনে শিউরে উঠলাম। বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু জেনোসাইটের সংবাদ তো আর মিথ্যা হতে পারে না। গভীর দুঃখে পতিত হলাম। একটু পরেই ভোর হলো। দোর খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। চারিদিক শান্ত, সুনসান। রুটিওয়ালা রুটি, দুধওয়ালা দুধ, কাগজওয়ালা পত্রিকা দিয়ে গেল। রেডিওর খবর শুনে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত আমরা। বহির্বিশ্বে পাকিস্তান প্রচার করলো এটা তাদের আভ্যন্তরীন ব্যাপার। কিছু বিদ্রোহী বাঙ্গালীকে শায়েস্তা করবার জন্য তাদেরকে এ পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। এসব লোকদেরকে শেখ মুজিব নষ্ট করে ফেলেছে। শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী করা হয়েছে।

কিন্তু পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী জানতো না যে, অত্যাচার যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, নির্যাতিতের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে, তখন কোন না কোন শেখ মুজিবের জন্ম হবেই হবে। কারার ওই লৌহ কপাট ভেঙ্গে মুক্তির মশাল জ্বালাবে সেই মুজিব। মুজিবের বাণী প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে।

“এরপর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমাদের অনুরোধ রইলো, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। রক্ত যখন দিতে শিখেছি, রক্ত আরো দিব – এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম – এবারের সংগ্রাম – – স্বাধীনতার সংগ্রাম। ”

শিশু শ্রম -১৯৯৭