Wednesday, May 27, 2026

এলো খুশীর ঈদ

রমজান মাস শেষ। আগামীকাল ঈদ। আকাশে ঈদের বাঁকা চাঁদ মুচকি হেসে খোশ আমদেদ জানালো আমাদেরকে। আর কয়েক ঘন্টা মাত্র বাকী। নগরীর গৃহবাসী সব গভীর নিদ্রায় মগ্ন।স্বপ্ন দেখছে আসছে খুশীর দিনের, যার যার মনের মত শখের পোশাক, অলংকার, পাদুকা, ফিতা, চুল সাজাবার যাবতীয় দ্রাব্যাদি, অর্থাৎ কেশাগ্র থেকে পায়ের নখাগ্র পর্যন্ত সজ্জিত করবার যত উপকরণ সব ক্রয় করে নিয়েছে। খাদ্য দ্রব্যেরও ঘাটতি নেই। সব এখন ঘরে মজুদ। ভোর হওয়ার অপেক্ষায় গভীর ঘুমে স্বপ্ন দেখছে আনন্দের। 

আজকাল আনন্দ কোথায়? আনন্দ ছুটি নিয়ে চলে গেছে দূর দেশে। বেশীর ভাগ মানুষের বিষন্ন মুখ, মন খারাপ, মারামারি, হানাহানি করে দিন কাটায়। তাই আগামী দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে সারাটি মাস এ বাজার, সে বাজার ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে যার যার সাধ্যের মধ্যে পছন্দমতো সবকিছু খরিদ করেছে। এ আনন্দ ঢেউ লেগেছে সুদূর পল্লী অঞ্চলে। সেখানেও কেনাকাটার ভিড়ে প্রাণ অতিষ্ঠ। তবুও খুশীর স্রোতে তারা তাদের ঝাঁপি পূর্ণ করে নিয়ে গিয়েছে ঘরে। সকলেই খুশীতে হাসিতে জীবনের ক্ষয়ে যাওয়া সুখগুলিকে ফিরে পেতে চায়। নেই কোন ভেদাভেদ, নেই কোন বিতরাগ। সকলে এক কাতারে দাঁড়ায়, সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করে। ধন্যবাদ জানায়, কৃতজ্ঞতা জানায়। তারপর শুরু করে ঈদের আনন্দ।    

সুস্বাদু খাদ্য গ্রহণের চাইতে জীবনে আনন্দের আর কিছু নেই। ঘরে ঘরে রান্নার খুশবু।সেমাই, জরদা, পোলাও, কোরমা আরও কত কি? ভোজন পর্ব শেষ করে এবাড়ি, ওবাড়ি বেড়াতে যাওয়া, দেখা সাক্ষাৎ করা, বুকে বুক মিলানো, অন্তরের ধরকন অনুভব করা। সে এক অনির্বচনীয় সুখ! মনে হয় প্রতিদিন যদি এমন দিন হতো! কেন হয় না? একটি শিশু বলে, মা রোজ রোজ ঈদ হয় না কেন? মা হেসে বলেন, রোজ রোজ ঈদ হলে এত আমোদ ফুর্তি হত না। স্কুলে যেতে হবে, হোমওয়ার্ক করতে হবে, আরও কত কাজ! ঈদের খুশী কখন করবে। সেজন্য ঈদ একদিনই ভাল। আনন্দ বেশী হয়। অপেক্ষা করে যে আনন্দ পাওয়া যায়, সেই আনন্দই মজার হয়, সুখের হয়। অনেকদিন মনে থাকে। সে ঈদের চাইতে পরের ঈদ আরো মধুময় হয়। ধৈর্য্য ধর। আবার ঈদ আসবে। 

এত হর্ষ, এত পুলকের আয়োজনের মধ্যে আজ রাতে দুইবার ভূকম্পন অনুভূত হলো। পূর্ব হতে পশ্চিম দিকে ধাক্কা দিয়েছে। সবাই ছুটে বেরিয়ে পড়েছে ঘর ছেড়ে। চেয়ার টেবিল একটার সঙ্গে আরেকটা ধাক্কা খাচ্ছিল। কি না হতে পারতো কয়েক সেকেন্ডে! এ যেন হরিষে বিষাদ। চোখের পলকে সব তছনছ হয়ে যেতে পারতো! আল্লাহ্‌র অশেষ দয়া যে তিনি এই ভয়াবহ বিপদ থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন।

মানুষ যে ধর্মের হোক, যে বিশ্বাসের হোক, উৎসব পছন্দ করে। সে উৎসব হয় নানা ধরণের। ঈদ, পূজা-পার্বন, খৃস্টের জন্মদিন, ব্যক্তির জন্মদিন, পুত্র –কন্যার জন্মদিন। সবই খুশীর দিন। এসবই হর্ষ উৎপাদন বা আনন্দ দান করে। এর বাইরে উৎসব আছে। বন্ধু, আত্মীয়দের ডেকে তাদেরকে আপ্যায়ন করা, সুখ –দুঃখের অংশীদার করা – এসবই সম্যক তৃপ্তিদায়ক।      

ইচ্ছে থাকলে উপলক্ষ্যের অভাব হয় না। আয়োজন বিরাট হতে হবে এমন কোন কথা নেই। সাধ্যের মধ্যে মাঝে মাঝে হালকা নাচ –গান, কবিতা আবৃত্তি, গল্প, আড্ডাছলে উৎসবের আয়োজন করা যায়। না হলে মানুষের মন মরে যায়। জীবন বিষাদ্গ্রস্ত হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকার নানান প্রশ্ন মনে আসে। উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। আত্মীয়, বন্ধুদের বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ে। বন্ধুরা দূরে চলে যায়। একাকীত্ব ভর করে। অন্তর উদাস হয়। জীবন শূন্য মনে হয়। মনে হয় আমার কেউ নেই, কোথাও নেই! অবসাদ্গ্রস্ত জীবন নিজের ও পরিবারের বোঝা স্বরূপ। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এটাই সত্য? না, এটা সত্য নয়। সুখ, আনন্দ, খুশী, শান্তি, তৃপ্তি তৈরী করবার নিজেরও ভূমিকা আছে। নিজের উৎসাহই আসল। নিজেকে সেভাবে সকলের মাঝে স্থাপন করতে হবে। পরের তরে নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে। পরের পাশে দাঁড়াতে হবে। তবেই অন্যের হাত ধরা সহজ হয়। 

মানুষ একা বাঁচতে পারে না। নিজের সুখের জন্য মানুষে মানুষে মেলবন্ধন তৈরী করতে হয়। এটা সকলের জন্য সত্য। কারো একার কাজ নয়। যেহেতু আমরা ‘আশরাফুল মুখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব এবং বুদ্ধিমান জীব, সেজন্য আমাদেরকে একাজটি করতে হবে।‘প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’  মানুষের প্রতি, জীবের প্রতি, প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শনই আমাদেরকে সুখ, শান্তির পথে নিয়ে যাবে। আমাদের মানব জনম সার্থক হবে। ঈদ এবং অন্যান্য উৎসব আমাদের জীবনকে সুখ, শান্তি এবং সমৃদ্ধির সম্ভারে পূর্ণ করে রাখুক। আজকের এই ঈদের প্রক্কালে আমার এই একটি প্রার্থনা। 




 

No comments:

Post a Comment