Showing posts with label আমাদের হেলেন আপা. Show all posts
Showing posts with label আমাদের হেলেন আপা. Show all posts

Wednesday, November 26, 1997

আমাদের হেলেন আপা

স্মৃতিচারণ মূলক রচনা


বিদ্যাময়ী গার্লস’ হাই স্কুল। ময়মনসিংহের তথা সমগ্র বাংলাদেশের সেরা স্কুল। আমরা গর্ব বোধ করতাম বিদ্যাময়ী স্কুলের ছাত্রী ছিলাম বলে। সে সময় হেলেন আপাকে পাই আমাদের শিক্ষক হিসাবে। সবে মাত্র সপ্তম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছি। নতুন ক্লাসে নতুন আপাদের সাক্ষাৎ লাভ, সেটা একটা খুবই রোমাঞ্চকর ঘটনা। একটি মেয়ে বললো, এবার আমাদেরকে বাংলা পড়াবেন হেলেন আপা। শুনে চমকে উঠলাম। হেলেন আপা! যাকে দূর থেকে দেখেছি, ভয় পেয়েছি। তিনিই স্বয়ং আমাদের ক্লাস নেবেন। মেয়েটি বলল, কেন আমরা এখন বড় ক্লাসে পড়িনা?  আমরা তো প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রথম সোপানে পা রেখেছি। 

প্রথম বাংলা সাহিত্যের ক্লাসে হেলেন আপার আগমন। ক্ষণটি বেশ স্পষ্টই স্মৃতিতে ভাসে। প্রথম পিরিয়ডেই আপা আমাদের শ্রেণী কক্ষে প্রবেশ করলেন। যেন এক মহিয়সী নারী আমাদের সামনে উপস্থিত। আমরা সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যথাযথ অভিবাদন জানালাম। তিনি মেয়েদের নাম ও মেধার ভিত্তিতে পরিচয় জেনে নিলেন। তাঁর সৌন্দর্য, রুচিশীল পোশাক দেখে আমরা চমৎকৃত হলাম। তিনি বই খুলে একটি গল্প নির্বাচন করে আমাদেরকে পড়াতে শুরু করলেন। গল্পটির নাম ছিল ‘প্যারী নগরী’। হেলেন আপা তখন সদ্য বিলেত ফেরত। ইংল্যান্ডের ওপারেই ফরাসী দেশ। যার রাজধানীর নাম প্যারিস। হেলেন আপা সে দেশও ভ্রমন করে এসেছেন। প্যারিসকে সে দেশের লোকেরা প্যারি উচ্চারণ করে। হেলেন আপা স্বচক্ষে দেখে আসা পৃথিবীর সুন্দরতম শহরের বর্ণনা দিতে লাগলেন। যেন উনার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও সেই শহর ঘুরে ঘুরে দেখছি। বইয়ে যা কিছু লেখা আছে, তিনি তার সবকিছু দেখে এসেছেন। আমরা তাতে পুলকিত হয়েছি সবচেয়ে বেশী। ধাতু নির্মিত আইফেল টাওয়ারের কথা, শহরের স্থাপত্য শিল্পের কথা, রাস্তা ঘাটের কথা, প্রাচুর্যের কথা, সীন নদী  ও তার তীরভূমির নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যের কথা –সব তিনি বর্ণনা করেছেন অতিশয় প্রাঞ্জল ভাষায়। তাঁর পাঠদানের পদ্ধতি ছিল খুব সুন্দর। উনার পড়াবার স্টাইল এত আকর্ষণীয় ছিল যে বাংলা গদ্য আর গদ্যময় মনে হতো না। পাঠদানের ফাঁকে ফাঁকে হেলেন আপার প্রাসংগিক জ্ঞানদান আমাদেরকে বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে সচেতন করে তুলেছে। আমরা বিস্মিত হলাম যে আপা কেবল বাহিরে নয়, অন্তরেও সুন্দর। পরিপূর্ণ একজন মানুষ ও দক্ষ শিক্ষক। তিনি নিজে সাহিত্য চর্চা করেন। তিনি বহু গ্রন্থের প্রণেতা। জীবন ও সমাজ সচেতন একজন লেখক। জীবন ও জগতের ঘাত প্রতিঘাত ও আনন্দ –বেদনার প্রতিচ্ছবি তার গল্পে, উপন্যাসে রূপায়িত করেছেন। তাঁর লেখা ‘আমার পরিচিত বৃহত্তর ময়মনসিংহের কয়েকজন বিশিষ্ট নারী’ –একটি বিশিষ্ট গ্রন্থ। এটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ বলে আমি মনে করি। তিনি যথেষ্ট শ্রম, মনোযোগ দিয়ে সাফল্যের সঙ্গে এই বইটি প্রকাশ করে একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ময়মনসিংহের তখনকার দিনের শিক্ষিত মেয়েদের জন্য এটি একটি ইতিহাসও বটে। বইটি একটি মহা মূল্যবান গ্রন্থ। তিনি আরো লিখুন এবং সুস্থ ও দীর্ঘজীবন লাভ করুন – এই আমার প্রার্থনা। একটি অনন্য প্রয়াসের জন্য হেলেন আপাকে আন্তরিক ধন্যবাদ  জানাই।

তারিখ – ২৭.১১.১৯৯৭ 

ঢাকা।

পরিশিষ্ট

হেলেন আপার দেখা পাইনি অনেকদিন। তার সাক্ষাৎ লাভের জন্য চেষ্টা করেছি অনেকবার। পরিচিত অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি তিনি কোথায়? তারা বলেছেন, তিনি দেশে নাই। বিফল মনোরথ হয়ে আশায় আশায় দিন গুনেছি, যেদিন তিনি দেশে আসবেন সেদিন উনার সঙ্গে দেখা করতে যাব। কিন্তু আশা কুহকিনী। মার্চের একদিন পত্রিকা খুলে দেখি হেলেনা খান আর নেই। চলে গিয়েছেন প্রিয় মানুষজন, প্রিয় মাতৃভূমি ত্যাগ করে সেই পরপারে। আর একটিবারও ফিরে আসবেন না। এই যে আমি তোমাদের পরম প্রিয় হেলেন আপা ফিরে এসেছি, তোমাদের কাছে –এ কথাটি আর বলবেন না। ‘এ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়।’ 

পত্রিকায় সংবাদটি দেখে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। একদৃষ্টে চেয়ে থাকলাম সেই ছবিটির পানে। আর তিনি কথা কইবেন না। কলমটি হাতে নেবেন না। লিখবেন না আমাদের জন্য। আমাদের মনের কথাটি আর বলবেন না –‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক। আমি তোমাদেরই লোক।’

কিন্তু তিনি সশরীরে না এলেও আছেন আমাদের মাঝে, থাকবেন আমাদের মাঝে –স্মৃতির মণিকোঠায়। বিদ্বান, বুদ্ধিমান, মমতাময়ী এবং একজন আদর্শ শিক্ষাদানকারী ও সুপথে চলার উপদেশ দানকারী হিসেবে আমাদের অন্তরে চির জাগরূক থাকবেন। তার অন্তর ছিল আলোকিত। তিনি সকল ছাত্রীদেরকে আলো দান করে গেছেন। তিনি উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। সেই সময় খুব কম সংখ্যক মেয়ে সেই সুযোগ লাভ করেছিলেন। সেখান থেকেই তিনি শিক্ষার আলোর মশালটি পরবর্তী নারী শিক্ষা অর্জনের জন্য তুলে ধরেছিলেন। আমরা তাঁর ছাত্রী। অনেক প্রতিকূল অবস্থা অতিক্রম করে শিক্ষার আলোকে আলোকিত হয়েছিলাম। তাই তাঁর কথা আজ খুব মনে পড়ছে। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট লেখিকা। প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। সমাজের এবং মেয়েদের অনেক সমস্যায় আলোকপাত করেছেন। শিক্ষত মেয়েদের সুস্থ চিন্তা ধারার দুয়ার খুলে দিয়েছেন। এগিয়ে চলার উৎসাহ দান করেছেন। 

আজ তিনি নেই। মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ থেকে কারো নিস্তার নেই। তবুও হৃদয় বীণায় তার চলে যাওয়ার বেদনার সুর বাজে। তার জন্ম সার্থক। জীবন সাফল্যময়। এটাই মানুষের জীবনের বেঁচে থাকার সার্থকতা। তাঁকে আমরা চিরকাল স্মরণ রাখবো আমাদের হৃদয়ের মণিমঞ্জুষায়।

‘জীবনের যাত্রাপথে 
কত অগণিত যাত্রীচলে
বিরাম, বিশ্রামহীন –
কেবা মনে রাখে?
তবু তারি মাঝে ক্ষণিক দাঁড়িয়ে 
স্মৃতির ফলকে
যারা পদচিহ্ন আঁকে,
তারা মনে থাকে।’

আমাদের হেলেন আপা ইহলোকে যেমন আলোকিত ছিলেন পরলোকেও সেরকম শান্তি লাভ করুন এবং পরম করুণাময়ের ক্ষমা ও দয়া প্রাপ্ত হউন। এই আমার প্রার্থনা।

০৪.০৭.২০১৯     

শিশু শ্রম -১৯৯৭