Friday, July 24, 2026
সুবর্ণ স্মৃতিতে বিদ্যাময়ী -১৯৫৩
সেই কবেকার কথা। কবেকার কথাই বটে।গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়। ১৯৫৩ সাল আমি বিদ্যাময়ী গার্লস হাইস্কুলে ভর্তি হই। হোস্টেলে ফাইভের মেয়েদের জন্য সিট ছিল না বলে আমাকে ক্লাস সিক্সের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে হয়েছিল সেটি ছিল। আমার জীবনের প্রথম স্মরনীয় ঘটনা।
ভর্তি পরীক্ষায় আমি বাংলা, ইংরেজী, উর্দু ও অংকে ভাল নম্বর পাই। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে কোন প্রকার ধারণা না থাকায় সেগুলোতে ভাল করতে পারিনি। হস্টেলে না থাকতে পারলে আমার লেখ-পড়া হবে না। সেজন্য কর্তৃপক্ষ আমাকে ক্লাস সিক্সে ভর্তি করে নিলেন।
তখনকার দিনে ম্যাট্রিক পরীক্ষা শুরু হতো মার্চের প্রথম সোমবারে। পরীক্ষার্থীরা হোস্টেল ত্যাগ করতো মার্চের শেষে। সেজন্য এপ্রিল মাসে আমি হোস্টেলে সিট পেলাম।
আমার পিতা নান্দিনা হাইস্কুলে অংক ও ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। তিনি একদিন বাড়ি এসে আম্মাকে বললেন, ‘ওর তো ভর্তির সব ঠিক হইয়ে গিয়েছে, সিটও বরাদ্দ পেয়েছে হোস্টেলে, আগামী শনিবার ওকে নিয়ে যেতে হবে।ওর কাপড় – চোপড় সব গুছিয়ে দাও।’ আমি তখন ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছিলাম। এই কথা শুনে প্রচন্ড হৃৎকম্প শুরু হলো। উৎসাহে নয়, ভয়ে। আমি এক চঞ্চল মেয়ে। বনে বাদাড়ে, গাছের আগডালে, মগডালে –সর্বত্র আমার অবাধ বিচরণ। এই বয়স পর্যন্ত কখনও শান্ত পায়ে হাঁটিনি। কেবল ছুটোছুটি আর আনন্দে দিন কাটাই।সেই আমি হঠাৎ শান্ত হয়ে যাই। আবার হোস্টেলে যাবনা বলতেও অহংবোধ লাগে।
যথাসময়ে পৌঁছালাম বিদ্যাময়ী হোস্টেলে। হেডমিস্ট্রেস হাছিনা আপার সঙ্গে দেখা করে আমার বাবা আমাকে রেখে চলে আসেন। তত্ত্বাবধায়কের সাহায্যে বড় মাঠ পেরিয়ে হোস্টেলের ভিতর এসে পৌঁছালাম। শোবার ব্যবস্থা উপর তলায়।স্টাডি নীচের বিরাট হলরুমে। একটি ডেস্ক পেলাম বইপত্র রাখার জন্য, ড্রেসিংরুমে কাপড় চোপড় রাখবার জন্য পেলাম একটি লকার এবং স্যুটকেস রাখবার জায়গা, ট্রাংক চলে গেল বক্সরুমে। মেয়েরা সাহায্য করলো ঠিকমতো শাড়ি পরতে। সুন্দর করে শাড়ি পরা শিখতে আমার অনেকদিন সময় লেগেছিল।
দিন শেষ। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত এলো। খাওয়া –দাওয়া শেষে লাইন করে উপরে উঠে বিছানায় আশ্রয় নিলাম। এক ডরমিটরিতে দুই সারিতে ত্রিশটি বেড ছিল। এতদিন মায়ের কোলের কাছে ঘুমাতাম সেকথা মনে পড়ে ভীষণ কান্না পেল। মেয়েরা সান্তনা দিল। ভয় দেখাল খালাম্মা (মেট্রন) বকা দিবেন। কিন্তু কিসের কি? সব ভয়, লজ্জা অতিক্রম করে আমার ক্রন্দন রোদনে পরিণত হলো। খালাম্মা এলেন, প্রথমে ধমক দিলেন। পরে স্নেহার্দ্র স্বরে বুঝালেন, যে লেখা –পড়া শিখতে হলে বাড়ি হতে দূরে থাকতে হয়।অন্য মেয়েরা আছে –তাদের দেখ ইত্যাদি।
পরদিন প্রত্যুষে টুং টুং ঘন্টার শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো। তারপর দেখি বাথরুমের সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনেক মেয়ে। দশটি বাথরুমে এক সারিতে। গোসলেরও একই পদ্ধতি। স্নানাগারে ঢুকে কল খুলে দিলাম। সেই পানি পড়ার শব্দের আড়ালে প্রাণ খুলে জোরে জোরে কান্না শুরু করে দিলাম। এটি ছিল আমার প্রতিদিনের রুটিন। বিকেলটা ভাল কাটাতো যখন মেয়েদের সঙ্গে মাঠে খেলা করতাম।
বাবা বলেছিলেন যদি মন দিয়ে লেখাপড়া কর তবে তুমি এম এ পাশ করবে একদিন। আর যদি ফেল কর, তবে লেখা পড়া বন্ধ। মনে মনে ভাবলাম ফেল আমাকে করতেই হবে। এম এ পাশ করবার কোন প্রয়োজন নাই। এপ্রিল মাসে হস্টেলে এসেছি, মে মাসে হাফ-ইয়য়ার্লি পরীক্ষা। ইংরেজী, বাংলায় আশির উপর নম্বর পেয়েছি, উর্দুতে পঞ্চাশের মধ্যে চল্লিশ।আর বাকী সাবজেক্ট ইতিহাস, ভূগোল, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ইত্যাদিতে ফেল। প্রোগ্রেস রিপোর্টে সেই সব বিষয়ের নীচে লাল দাগ দেওয়া।মেয়েরা বলল, তোমার পাঁচ বিষয়ে ক্রস (অর্থাৎ পাশ করতে পারনি।)মনে মনে খুশী হলাম।বার্ষিক পরীক্ষায় সব বিষয়ে ক্রস অর্জন করতে পারলে আর হস্টেলে থাকতে হবে না।
ছুটির দিনে আমার বাবা এলেন আমাকে দেখতে। স্কুল বিল্ডিং –এর বারান্দায় বসে ভিজিটররা মেয়েদের সঙ্গে দেখা করতেন। বাবাকে দেখে আমার কান্না থামেনা। যে বাবাকে আমরা বাঘের মত ভয় পাই, তাঁর সামনে নিজেকে সংযত রাখতে পারলাম না। ভাবলাম তিনি ক্রোধে প্রজ্জ্বলিত হয়ে আজই বাড়ি নিয়ে গিয়ে লেখা –পড়া বন্ধ করে দেবেন।কিন্তু কি আশ্চর্য!তিনি একটুও রাগ করলেন না এবং আরো আশচর্য যে তিনি তার বুকের সঙ্গে আমার মাথা ধরে রাখলেন পরম মমতায়া। আমার কঠোর পিতার কোমল অন্তরের পরিচয় পেয়ে মনে মনে স্তম্ভিত হয়েছিলাম।আমি সেদিন যা জানলাম, পরিবারের কেউ তা জানতে পারলো না। আমার কান্না আরো উথলে উঠলো।তিনি আমাকে সান্ত্বনা দিলেন। শেষে অন্য মেয়েদের কাছে ডাকলেন।মমতার সঙ্গে বললেন, মা, তোমরা আমার মেয়েটাকে দেখো।কোনদিন বাড়ির বাইরে যায়নি, মাকে ছাড়া থাকেনি।
কেন জানিনা, মেয়েরা আমাকে খুব স্নেহ করতো। গ্রামের মেয়ে আমি। শহুরে আদব কায়দা সব বুঝিয়ে দিত। সেবার ছুটিতে বাড়ি এলাম। প্রায়ই প্রতিদিনই ক্লাসমেটদের চিঠি পেতে থাকলাম। চিঠি পেয়ে খুব ভাল লাগলো। ভাবলাম, যদি আর না যাই তবে এই বন্ধুদের সঙ্গে কোনদিন আর দেখা হবে না। আর একবার যাই, যদি কান্না পায়, আর যদি ফেল করি তবে আর যাবো না।
দেখতে দেখতে বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেল।আমার সেকশানে ষষ্ঠ স্থান অধিকার করলাম। রেজাল্ট দেখে ক্লাস টিচার খুব খুশী। বললেন। এটি সেই মেয়েটি না, যে প্রথমদিন পরীক্ষার খাতায় নাম লেখে নাই? আসলে পরীক্ষা কেমন করে দিতে হয়, তাই জানতাম না। আমার বড় ভাই হস্টেল থেকে নিয়ে এলেন আমাকে।রেজাল্ট দেখে আমাকে বাহবা দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, সব প্রশ্ন কমন পড়েছিল? কমন পড়া কাকে বলে তখনও জানতাম না। তবুও হাঁ –সূচক উত্তর দিলাম।
ফেল করিনি দেখে ভিতরে ভিতরে মনটা খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু বলতে পারলাম না কাউকে। ভাবলাম ক্লাস সেভেনে ফেল করতে হবে। মন্দ ভাগ্য আমার। ক্লাস সেভেনে দুই সেকশানে মিলে থার্ড হলাম। ততদিনে হস্টেলে আমার মন বসে গেছে। মায়া পড়ে গেছে মেয়েদের জন্য, বড় আপা ও আপাদের জন্য, নাচের ভঙ্গিতে শারি পরা উড়িয়ে মহিলা–পিয়ন সোনিয়া–লখিয়েদের জন্য, যারা ক্লাসরুমের বাইরে বসে আবিরাম পাখা টানে (যাদের কানের লতিতে গহনা পরার জন্য বিশাল ছিদ্র আছে) তাদের জন্য। মহিলা ঘাস কাটনেওয়ালিদের জন্য, খদুর মা, তারার মা, বাবুর্চিদের জন্য, টিফিন প্রস্তুতকারী বিশাল বপু সুধাদির জন্য, কলসীতে করে পানি তুলে ড্রাম ভরে উপরে ও নীচের তলায়, সেই গোপাল–দার জন্য পুইট্যা জমাদার, লম্বু জমাদার -যারা ড্রেন সাফ করে তাদের জন্য। দপ্তরি মামার (দারোয়ান)জন্য। সুতরাং আমার মনোবাঞ্চা পূরণ হওয়ার পথে এখন অনেক অন্তরায়।
এখন আমার বাবা অন্য মেয়েদের বলেন, আমার মেয়েটা আগে হস্টেলে থাকতে চাইতো না, আর এখন বাড়ি যেতেই চায় না।
অবশেষে ১৯৫৮ সালের ৩রা মার্চ ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হই। এতদিনে বিদ্যাময়ী স্কুলের সঙ্গে আমার আত্মার বন্ধন গড়ে উঠে। বিল্ডিং –এর ভিতর – বাইরে, পুকুর ঘাট, বিশাল মাঠ, সুসজ্জিত, সুরভিত, দৃষ্ট নন্দন বাগানের আনাচে –কানাচের সঙ্গে যেন আজও মমতার পরশ লেগে আছে। বিদ্যাময়ীর স্মৃতি আমার জীবনের স্বুর্ণযুগ। সবচেয়ে ভাল লাগার দিনগুলো আজও গর্বভরে স্মরণ করি।
...................
ঢাকা, ২০০৪
সেই হাতখানি
এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা ...
-
জীবন অর্থই প্রানের স্পন্দন। প্রাণ যতদিন দেহের আশ্রয়ে থাকে, ততদিনই জীবন হিসেবে গণ্য হয়। দেহকে প্রাসাদ বলতে পারি, মন্দির বলতে পারি, কারাগার ব...
-
ভূমিকা এই রচনাটি জীবনের জলছবি নয়, সমাজের চালচিত্র নয়, ফেলে আসা অতীতের ঘটনাবলীর স্মৃতিচারণ নয়। এটি হচ্ছে নিজের অবস্থান থেকে একটি দেশের স্বাধ...
-
বঁধুয়া, ভেবেছি তোমায় কিছু লিখবো। অনেক দিন লিখতেও চেয়েছি। কিন্তু কেন যে লিখিনি তা আর না বলেও পারছিনা । যদিও তুমি নির্বাক শ্রোতা জানি তবুও তো...

