Friday, August 7, 2026

সেই হাতখানি

 

এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা মদিনা যেতে পারতাম। সুযোগ এলো। আমাদের আত্মীয়, আমাদের আত্মীয়  ড. আবু তাহের জানালেন, ‘ওমরাহ্‌ ভিসা দিচ্ছে। আপনারা এবার আসেন। ’  তিনি মক্কা শহরেই চাকুরী সুবাদে বসবাস করতেন।

প্রায় ছয় ঘন্টা আকাশযানে  ভ্রমণ করে জেদ্দা বিমান বন্দরে পৌঁছালাম। বন্দর সংলগ্ন এক বিশাল বিল্ডিং-এ প্রবেশ করে দেখি দীর্ঘ লাইন। বাঙ্গালী যাত্রীর সংখ্যা অধিক। একজন বললেন, ঐ যে ওমরাহ্‌ যাত্রীদের লাইন –সকলের পরিধানে ইহরামের পোশাক। সেখানে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হলো।  সামনে  চারটি কাউন্টার। সৌদি ছেলেরা যাত্রীদের পুলসিরাত পার হওয়ার ছাড়পত্র দিচ্ছে। গতি তাদের বেশ মন্থর। আমরা দীর্ঘ লাইনে। তবে আমি আমার স্বামীর পাশে দাঁড়ানো। একটু পর লক্ষ্য করলাম আমার সামনেই একজন  মহিলা তার সঙ্গীর পাশে আমার মতই দাঁড়িয়ে। একটু পর পর আমাকে দেখছেন। আমার ছিল আপাদমস্তক কালো বোরখা এবং হিজাবে আবৃত। তার ছিল কালো বোরখা এবং সাদা হিজাব। সালাম বিনিময় করে জিজ্ঞেস করলাম –where do you come from? 

বললেন, সাউথ আফ্রিকা। 

আমি বললাম, আমার দেশ বাংলাদেশ। নাম শুনেছেন কখনও? 

উনি বললেন, হ্যা শুনেছি। আমরা তো পাকিস্তানে ছিলাম। আমি আগে হজ্ব করে গিয়েছি। এবার এসেছি উমরাহ্‌ করতে।

আমি বললাম, আমরা এবারই প্রথম উমরাহ্‌ করতে এসেছি।

এরকম অল্প–স্বল্প বাক্য বিনিময়ের পর দেখি আমরা লাইনের অনেক পেছনে। তারপর হঠাত্ দেখি বাঁ দিকে একটু দূরে মহিলাদের একটি লাইন।  আমার পাসপোর্ট নিয়ে আমিও  গিয়ে ঐ লাইনে সামিল হই। সাথে সেই ভদ্রমহিলাকে ডাকলাম। তিনিও তার পাসপোর্ট নিয়ে আমার সঙ্গে দাঁড়ালেন। আমার টার্ন এলো ভেতরে ঢুকবার। ঘূর্ণায়মান নাতিউচ্চ গেইট অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। পাসপোর্টটি আমার হাত থেকে নিয়ে সৌদী ছেলে বললো, বেঙ্গালাদেশ? আমি সেই মহিলাকে ইশারায় ঢুকে পড়তে বললাম। আমাকে কাগজ দেওয়া হলো কাউন্টার থেকে। পথ নির্দিষ্ট করা আছে স্টিলের বার দিয়ে। এগিয়ে গেলাম পথ ধরে। পথপ্রান্তে কাগজটি জমা দিয়ে বেরিয়ে এলাম । সেই ভদ্রমহিলাও তার কাগজপত্র জমা দিলেন। আমার আর তাকে দেখবার সুযোগ হয়নি। বিস্তীর্ণ হলরুমের এক জায়গায় মালপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। আমি আমার বড় বাক্স, ছোট বাক্স কুড়িয়ে নিয়ে ট্রলিতে তুলে আবার কাউন্টারের একটু দূরে অপেক্ষা করতে থাকলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর আমার স্বামী মোহাম্মদ হারুন বের হয়ে এলেন। বিমান বন্দরে পুনরায় পাসপোর্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়ে নিতে আরো ঘন্টা খানেক সময় লাগলো।

তারপর আমরা পার্কিং এলাকার দিকে রওনা হই। সঙ্গে ছিলেন আমাদের আত্মীয়  ডা. আবু তাহের। তার গাড়ি অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। পার্কিং এলাকায় নামতেই কে যেন আমার হাত ধরে ফেললো। অবাক হয়ে দেখি সেই ভদ্রমহিলা, যিনি সাউথ আফ্রিকা থেকে এসেছেন। আনন্দে আমার ‘বক্ষ মাঝে চিত্ত আত্মহারা, নাচে রক্তধারা।’ দুজনে হাসতে লাগলাম। বললেন, ‘যাচ্ছেন?’

- হ্যা । মক্কা যাচ্ছি। আগামীকাল উমরাহ্‌  করবো। পরশু বিশ্রাম। তারপরের বুধবার মদিনা শরীফ যাবো। শুক্রবার দিন জুমার নামাজ পড়ে মক্কায় ফিরে আসবো। 

উৎসাহের  সঙ্গে বললেন, আমরাও মদিনায় যাবো। মসজিদে নব্বীতে জুমার নামাজ পড়বো। দেখা হবে আবার।

বললাম, ইনশাল্লাহ্‌, দেখা হবে। বলে হাতে আন্তরিকতার মৃদু চাপ দিয়ে হাতখানি ছেড়ে দিলাম। দ্রুত পায়ে সঙ্গীদের সঙ্গে সামিল হলাম। হাতখানি ছেড়ে দিয়ে কেন জানিনা অন্তরে একটু বেদনার অনুভূতির সঞ্চার হলো। একটু দেখা, দু’চারটি মামুলী কথা! এই তো! তার জন্য এতো মমতা? কি যেন কি হারাবার বেদনায় প্রাণটা আনচান করে উঠলো। ভাবনায় মগ্ন হলাম। মনে হলো এটাই মানুষের ধর্ম। একের অপরের জন্য সহমর্মিতা। মমতা হয়তো একেই বলে।  মানুষ এজন্যই আশরাফুল মখলুকাত। 

উমরাহ্‌ সম্পন্ন করে মদিনা শরীফে চলে  গেলাম। সেখানে দুদিন মসজিদে নব্বীতে নামাজ পড়লাম। নবীজীর  রওজা মোবারক জিয়ারত করলাম। কিন্তু সেই ভদ্রমহিলার দেখা আর পেলাম না। নামাজ ইবাদতে মগ্ন থাকার দরুণ মনেও পড়ে নাই। সেই  বিশাল জনসমুদ্রে কারও দর্শন লাভ করা এক দুর্লভ ঘটনা। 

মক্কায় ফিরে এসে আবারও উমরাহ্‌ করেছি। বিদায়ী তাওয়াফ করেছি। কিন্তু সেই অনামিকার সাক্ষাৎ লাভ আর হয়নি। দুঃখ আমার তার নামটিও জানা হয়নি। নামটি জানা থাকলে অন্ততঃ নাম ধরে তার কথা স্মরণ করতে পারতাম। নিজেকে বড় ক্ষুদ্র মনে হলো। কেন নামটি জিজ্ঞেস করিনি! তবুও সেই ক্ষণিকের ভাল লাগা মানুষটির কথা ঘুরে ফিরে স্মৃতিতে আসে। হাসি মাখা মুখখানি মনে পড়ে। আর একটিবার যদি দেখা পেতাম, নাম ঠিকানা জেনে নিতাম। নাম ধরে চিন্তা করতাম। তার কথা ভাবতাম। ঠিকানা ধরে যোগাযোগ করতাম। এই খেদ আমার কোনদিন ঘুচবে না।  এই মনোবেদনা আমাকে চিরকাল বয়ে বেড়াতে হবে। তিনি তার প্রস্ফুটিত হৃদয় কুসুমের সুবাসটুকু নামহীন, পরিচয়হীন আমার মতো একজনকে দিয়ে ঋণী করে রাখলেন। তাঁর হাতের পরশখানি ভুলতে পারিনা। তাই আমার স্মৃতির বীণায় আজও বাজে সেই প্রথম এবং শেষ দেখার রেশ।


সাহিত্য রস

 সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। স্বর্গ হতে বহিস্কৃত হয়ে আদম এই  বিশ্ব প্রকৃতিকে কেমন দেখেছিলেন জানি না তবে অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন তাতে  কোন সন্দেহ নেই। চারিদিকে সুন্দর আরে সুন্দরের সমারোহ। বৈচিত্র্যে ভরপুর। তারপর দেখা পেলেন হাওয়ার । হৃদয় মন আত্মা তার নেচে উঠেছিল আনন্দে।  তার হৃদয় নিঃসৃত শব্দ কালি – কলমে লেখা না হলেও , সেই আনন্দ নিঃসৃত বাক্যই সাহিত্য। সৌন্দর্য্য মিশ্রিত শব্দ বলেই সেটি সাহিত্য। ঐ সৌন্দর্য্য মিশ্রনই শিল্প। সেদিক থেকে কথাশিল্পী একজন সাহিত্যিক। 

শিল্পবোধের স্থান মানুষের মনে। রসবোধ না থাকলে শিল্প সৃষ্টি হয় না। 

ভাবনাকে ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে সঞ্চারিত করাই সাহিত্য চর্চা। মানুষ মাত্রেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখ ও সৌন্দর্য্যের অনুভূতির পরশ পায়। সেই অনুভূতির প্রকাশ করবার অভিলাষ তাদের আছে। কেউ কেউ অনায়াসে মনের ভাব সৌন্দর্য্য রসে জারিত করে প্রকাশ করে। অনেকেই সাধনা করে হৃদয়ের শিল্পমন্ডিত ভাব প্রকাশ করে । আমরা পাঠকগন সেই সব বাক্য বা সাহিত্য পাঠ করে  আমাদের অন্তরের না বলা কথার বহিঃপ্রকাশ দেখে আনন্দ লাভকরি।  নিজেকে নির্ভার মনে করি। 

‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইলো না কেহ’। না শুধালেও আমরা সাহিত্যের মাধ্যমে সেই শৈল্পিক রসবোধের আস্বাদ পাই – তখন নিজেকে ধন্য মনে করি।  

মনে করি যা বলতে চেয়েছিলাম, তা এই সাহিত্যের মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে।

সাহিত্য বিশ্বের তাবৎ বিষয় নিয়ে লিখিত হয়। মানুষের জীবন বোধকে জাগ্রত করে। জীবনের মানকে উন্নত করে। মানুষকে অন্ধকার হতে আলোতে আনয়ন করে। তার জীবনকে ভালবাসার এবং ভাললাগার অংগনে নিয়ে যায়। জীবনে পুলক অনুভব করে আনন্দ পায় এবং অন্যকে সেই আনন্দ বিলিয়ে, নিজেকে পরিবারকে, সমাজকে সুখী ও কলষমুক্ত রাখে। সেই জন্য সাহিত্য চর্চার মূল্য বা দান অপরিসীম। 

সাহিত্য একটি শিল্প। শিল্পবোধ জাগার ফলে মানুষের জীবন ছন্দময় হয়ে ওঠে। সাহিত্য সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে মানুষ নব নব সৃষ্টির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়।  তখন সে উপলব্ধি করতে পারে, ‘নাল্পে সুখনাস্তি’ – অল্পে সুখ নাই। 

সাহিত্য চর্চা মানুষের নিত্যদিনের সংগী হোক । রাওয়া উদ্যোগে এই সাহিত্য সভা আরো সুন্দর হোক। সাহিত্য পাঠ করে জীবন আনন্দময় হোক - এই কামনা করি।  


নিয়তি

 চম্পা আর বকুল। যমজ বোন। তিন ভাইয়ের পর তাদের একই সঙ্গে আগমন। একই রকম তাদের চেহারা, গায়ের রঙ, স্বভাবে চেতনায়, অসুখে – বিসুখে তারা সমানে সমান। তবে ভাগ্যের লিখনটি ছিল ভিন্ন।

গ্রামের স্কুলে পড়া শেষ করে চলে যায় শহরের হস্টেলে। কে যে চম্পা, কে যে বকুল আলাদা করে চেনা মুস্কিল। লেখাপড়ায়, খেলা ধুলায় দুজনেই ভাল। দুজনেই ফার্স্ট ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাশ করে কলেজে চলে যায়। সেখানেও আই.এ., বি.এ. পাশ করে দুজনেই দ্বিতীয় বিভাগে। পিতামাতার চিন্তা তাদেরকে পাত্রস্থ করবার। যমজ হলেও বকুল ছোট। কারণ সে চম্পার কিছুক্ষণ পরে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। বকুলের স্বাস্থ্য চম্পার চাইতে ভাল। সেজন্য কিনা, বকুলের বিয়ে স্থির হয় আগে। পাত্র বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়তে যাবে। সেজন্য তার পরিবারের লোকেরা ছেলেকে বিয়ে দিয়ে ছাড়তে চায়। সুন্দরী ডিগ্রীধারী বকুলের বিয়ে হয়ে গেল তড়িঘড়ি। কিছুকালের মধ্যে বকুলকে সঙ্গে নিয়ে জামাতা চলে গেল সেই দূর দেশে বিলেতে। ভালই কাটতে  লাগলো তাদের জীবন।

এদিকে চম্পার বিয়ের ফুল কুঁড়িবদ্ধই থাকে। ফুটতে চায় না যেন। অনেক চেষ্টা তদবীর করে কলেজের লেকচারার রাশেদের সাথে তার বিয়ে হয়। দুজনেই চাকুরীজীবী। চম্পা স্কুলে আর রাশেদ কলেজে। আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে তারা সংসার যাত্রা শুরু করে। তাদের সংসারে দুই পুত্র, দুই কন্যা জন্মগ্রহণ করে। 

কালের চক্র ঘোরে। তারা বড় হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিতও হয়। তারপর বিদেশে পাড়ি জমায় উন্নত জীবনের প্রত্যাশায়। ছোট ছেলেটি দেশে থেকে যায়। চম্পা আর রাশেদ চাকুরী শেষে কনিষ্ঠ পুত্রের সঙ্গে ধানমন্ডিতে নিজের বাড়িত বসবাস করে।

বিলেতে বকুলের স্বামী ব্যারিস্টারি পাশ করে ভাল চাকুরী গ্রহণ করে। সলিসিটরের চাকুরী। একটি মাত্র কন্যা তাদের বেশ ভাল্ভাবেই মানুষ হচ্ছে। মেয়ের যখন আঠারো বছর বয়স একদিন তার সুস্থ বাবা অকস্মাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। বিদেশ বিভূঁয়ে একা। তার চেয়ে দেশে আত্মীয়দের সঙ্গে থাকা ভাল। 

বকুলের দুই ভাই বহু পূর্বেই সুইডেনের অধিবাসী। এক ভাই ঢাকার বাড়িতে থাকে মাকে এবং তার নিজের পরিবারের দুই পুত্র আর এক কন্যাকে নিয়ে। বকুল আসাতে তাদের ড্রইংরুম, থাকার ঘরে পরিণত হয়। বকুলের মেয়ে এলিজা কলেজে ভর্তি হয়। কিন্তু খাপ খাওয়ানো তার জন্য বড় কষ্টকর হয়ে পড়ে। তবে ভাগ্য ভাল যে সেই সময় ইংলিশ মিডিয়ামে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার রীতি প্রচলিত হয়েছিল। কিন্তু সে প্রাণ খুলে কারো সাথে মিশতে পারে না। ভর্তি হলো বি.এ. ক্লাশে। কিন্তু বাসায় বসার জায়গা নেই। সুতরাং পড়াশুনা শিকেয় তুলে রেখে তাকে বিয়ে দিতে বাধ্য হলেন তার পরিবার। সেখানেও তার অপরিচিত পরিবেশে বনিবনা বা মানিয়ে চলার ব্যাপারটি সামনে এসে দাঁড়ালো। তবুও তার চেষ্টার অন্ত নেই। স্বামী তার ভাল চাকুরী করে। কিন্তু কি করবে স্ত্রীর জন্য বুঝতে পারে না। দিন যায়। একদিন একটি পুত্র সন্তান জন্মদান কালে তার ভীত প্রাণপাখি খাঁচা ছেড়ে উড়ে যায়। নবজাতক অনাথ হয়, সঙ্গে অনাথ হয় এক অসহায় নারী –নাম তার বকুল। বকুল বাচ্চাটিকে লালন পালন করতে থাকে। অচিরেই তা সংঘাতে পরিণত হয়। বকুল বাধ্য হয়ে তাদের বাচ্চাটি ফেরৎ দিয়ে আসে। তারপর আর কোনদিন তার সন্ধান করেনি।

নিরুপায় বকুল বাসায় একজন অনাকাংখিত ব্যক্তি। সে চম্পার সহায়তায় একটি বেসরকারী স্কুলে চাকুরী গ্রহণ করে। শুরু হয় নতুন জীবন। বাসার কাজ আর স্কুলের কাজ সব তাকে সামলাতে হয়। বাসার সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে। জায়গার সংকুলান হচ্ছে না। বকুল তার মাকে নিয়ে বারান্দার কোণে আশ্রয় পাতে। সাত সকালে সে প্রতিদিন শয্যা ত্যাগ করে। বাসার সকলের সব কাজ করে কোন প্রকারে নিজে একটু কিছু মুখে গুজে স্কুলে যায়। এদিকে ভাই ভাবী নেহায়েত দরকার না হলে একটি কথাও বলে না। এমনি সময়ে তার বৃদ্ধা মা ইহলোকে ত্যাগ করেন। বকুলের অসহায়ত্ব বৃদ্ধি পায়। সে তো এ বাড়ীর মেয়ে ছিল। এখন কারো কেউ নয়। কেউ তার সঙ্গে কথা বলে না। এভাবে সময়ের সিঁড়ি বেয়ে চাকুরী শেষ হলো একদিন। স্কুলের ছাত্রীরা ফুলের মালা দিল, ভালবাসা দিল, জায়নামাজ, তসবীহ্‌ , বুখারী শরীফ, মস্তক আবৃত করার জন্য একটি হিজাব দিল। মেয়েরা, কলিগরা কাঁদলো বিচ্ছেদের বেদনায়। বকুল কাঁদে তার অবলম্বন হারাবার বেদনায়। ভগ্ন হৃদয়ে বকুল বাড়ি এলো। বারান্দায় তার হাতের দ্রব্যাদি বিছানায় রেখে চোখের জল মুছতে লাগলো। তারই মাঝে শুনতে পাচ্ছে সে, সময়কার চা –নাস্তা সময়ে তৈরী হয়নি। তাই বিরক্তি প্রকাশ করছে সকলেই। উঠে দাঁড়ালো বকুল। দেয়ালে আটকানো আয়নায় চোখ পড়লো। দেখলো তার বৃদ্ধ মুখ, বিধ্বস্ত চেহারা। রান্নাঘরে গিয়ে দ্রুত হাত লাগালো। সকলের চাহিদা পূরণ করে হাত মুখ ধুয়ে মাগরিবের নামাজে দাঁড়ালো। এমন সময় এলো একদল মেহমান। তারা নব প্রজন্মের আত্মীয় –কুটুম। কোনদিন বকুলের সাথে তারা কুশল বিনিময় পর্যন্ত করেনি যদিও তার তৈরী খাবার তারা আনন্দের সাথে উপভোগ করে। প্রশংশা কোনদিন কেউ করেনি। এদেরই কেউ খবরের কাগজের ঠোঙ্গায় করে চিনা বাদাম নিয়ে এসেছিল। কাজ শেষ করে ঠোঙ্গাটি যখন ফেলতে যাবে এই সময়ে চোখ আটকে গেল একটি বিজ্ঞাপনে। গাজীপুরের হোতাপাড়ায় বৃদ্ধদের জন্য আশ্রম। কোন খরচ লাগবে না। ষাট বছর বয়স,নিরাশ্রয়, অসহায়, মস্তিষ্ক বিকৃত নয় এমন মহিলাদের থাকা খাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এতদিন পর বকুল যেন অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে একটু আলোর আভাস দেখতে পেল। পরদিন সকালে কাজ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লো। বাসে চড়ে গেল গাজীপুরের কুড়িবাড়ী হোতাপাড়ায়। গভীর গজারী বনের অভ্যন্তরে এক আশ্রম। নাম তার বয়স্ক ও শিশু পূনর্বাসন কেন্দ্র। সংক্ষেপে ‘বশিপুক’। প্রতিষ্ঠাতা এক মহান ব্যক্তি। নাম খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল। যিনি নিজের খরচে এই অসহায় বৃদ্ধ –বৃদ্ধাদের অতি আপনজন হয়ে আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছেন এবং সবদিকে খেয়াল রাখছেন।            

   বকুল মেয়েদের এলাকায় গেল। লম্বা টানা বারান্দাওয়ালা ব্যারাক। সুপ্রশস্ত কামরা। সঙ্গে প্রশস্ত বাথরুম। প্রতি রুমে দুই সারিতে পাঁচজন করে দশজন থাকে। ডাইনিং রুম, টিভি রুম, নামাজের ঘর, রান্না ঘরের বিরাট এলাকা, আর আছে অফিস রুম সমূহ।

বকুল ঘুরে ঘুরে সব দেখলো। প্রত্যেক রুমের সামনে বসার জন্য বেঞ্চ পাতা আছে। বকুলের মন চলে গেল অতীতে। তারা দুই বোন হস্টেলে থাকতো। দলবেঁধে গান গাইতো , নাচতো, ফাংশান করতো, কবিতা আবৃত্তি করতো।  বকুল একটা কবিতা খুব গাইতো –

Row row row your boat,Gently down the stream 

Merrily merrily merrily, Life is but a dream. সব মেয়েরা একসঙ্গে গেয়ে উঠতো। মেট্রন খালাম্মা কত বকা দিতেন। আজ কোথায় গেল সেসব সোনাঝরা দিন। আবার ফিরে এলো হস্টেলে।  ছোট বেলার স্বপ্ন ছিল সুখের স্বপ্ন। এখন আছে ফেলে আসা অতীতের ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন। দরজায় বসে আছে জরা ,ব্যাধি আর মৃত্যু। সামনে শেষ বিকেলের অন্ধকার, নিঃশব্দ রাত্রির সেই কবরস্থানের আহ্বান।  

আবার কান্না এলো বকুলের। বুক ভাঙ্গা কান্না! বাসায় তো কান্নার স্বাধীনতাটুকুও  ছিল না। এখানে সে কাঁদতে পারবে, হাসতে পারবে শান্তি না থাক স্বস্তি থাকবে। বকুলের মনে পড়ে গেল অদৃষ্টের কথা। হায়রে অদৃষ্ট। কি অনিষ্ট করেছিলাম আমি তোর? এত বড় বিশ্বে আমার কত বড় ঠাঁই এর প্রয়োজন ছিল। How much land does a man require? আমার যমজ বোন চম্পা, সে তো মহাসুখে আছে, আদরে, মমতায় সকলের মা হয়েছে। আমার গুণ তার চাইতে কম কিসের! সেও আমা হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আমার খোঁজ রাখে না। পাছে তার সুখে ভাগ বসাই। এক জোড়া কাপড় আর যত সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে আমি এ আশ্রমে এসেছি। টাকা পয়সা যা কিছু ছিল সব ফেলে রেখে এসেছি।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আনমনা হয়ে ভাবছিল বকুল। হঠাৎ দেখে বারান্দার নীচে অনেক শিউলি গাছে। শরতের সকালের ঝরা ফুলে ছেয়ে আছে চারিদিক। দেখবার কেউ নেই। মনে পড়ে গেল স্কুলের স্টেলের কথা। লুকিয়ে লুকিয়ে ভোর বেলায় ফুল কুড়িয়ে মালা গেঁথে বন্ধুদের দিত। অদূরে দেখা যাচ্ছে বাগানে একটা দোলনা। পুরানো সেই দিনের কথা স্মরণে এলো।

‘মোরা ভোরের বেলা ফুল তুলেছি, দুলেছি দোলায়-

বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি বকুলের তলায়।’

যমজ বোনের কথাই বকুলের মনে পড়ছে বেশী। সেই তাকে দেখেশুনে রাখতো। তার জ্বর হলে নিজের জ্বর উপেক্ষা করে চম্পার শুশ্রূষার দিকে ছিল তার সকল মনোযোগ। বোন ছিল তার প্রান প্রিয়। অথচ আজ মনে হচ্ছে মানুষ একাই জন্ম গ্রহণ করে। তার কী প্রয়োজন ছিল চম্পার সঙ্গে জন্মাবার।  কেন এসেছিল সে? কেন পেয়েছিল এত আদর, সোহাগ, মায়া মমতা, স্বামী সন্তান, সুখ সমৃদ্ধ –কি দরকার ছিল? কোনো মহাভারত কি অশুদ্ধ হতো তার জন্ম না হলে? কেন হারালো সব? কেন পরাশ্রিত হলো? নিজের উপার্জন, কর্মদক্ষতা থাকা সত্বেও কেন অন্যের  গলগ্রহ হয়েও অপমানিত হলো? কি দোষ ছিল তার? তবুও হয়েছে। এই তার নিয়তি। তার তকদীর । তার কপালের লিখন! 

বৃদ্ধাশ্রমে সব বুক ভাঙ্গা, মন ভাঙ্গা, দুঃখী মানুষের বসবাস। যারা জীবনের বৃন্ত হতে বিচ্ছিন হয়েছে, বাড়িতে থেকে পরিত্যক্ত হয়েছে, তারাই এখানে আশ্রয় পেয়েছে। জীবনের শেষ আশ্রয়। ঘাটের পাড়ে নিজের নৌকা খানির অপেক্ষায়। এখানকার সকলের সঙ্গে বকুল সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নেবে। সকলকে ভালবাসবে। দুঃখে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার দুঃখ কিসের। কি পেয়েছি, কি পাইনি, সে হিসাব আর কোনদিন করবে না। আর ভবিষ্যত? সে তো সেই আলেমুল গায়েব –তারই হাতে ন্যস্ত। ভাগ্যবান, ভাগ্যহত সকলেই যার কাছে সমর্পিত।

 

 সমাপ্ত


নারী


 অনাদি কালের স্রোতে নারী পুরুষ মিলেই সৃষ্টির ধারা প্রবাহিত। স্বর্গ উদ্যান হতে যদি আদম হাওয়া একসঙ্গে বহিস্কৃত না হতেন, তবে আদম একা একা বনে বাঁদাড়ে জীবন কাটিয়ে দিতেন। গৃহ বা সংসার হতো না। অন্য জীব জন্তুর ন্যায় তার জীবন অতিবাহিত হতো। 

নারী পুরুষ একজন আরেকজনের পরিপূরক। ‘বিশ্বে যা মহান চির কল্যাণকর/ অর্ধের তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’    

নারী – মাতা, ভগ্নি, বধূ, কন্যারূপে সংসারে মায়ার বন্ধন সৃষ্টি করে । তার হৃদয় স্নেহ ভালবাসার মনি মঞ্জুষা। তার  মমতার ঝর্ণাধারা একের সঙ্গে অপরের সম্পর্ক মধুর করে। নারী মিষ্টভাষী। কথার জালে পরিবারের এবং সমাজের সঙ্গে সকলকে সম্পৃক্ত করে। সন্তানের মাতা হিসাবে তার তুলনা নেই। সন্তানকে স্নেহ ভালবাসা দিয়ে, সাহস দিয়ে সকল বিপদ আপদ থেকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো আগলে রাখে। সন্তানকে মানুষ হতে দেখে জগতের সব যন্ত্রণা ভুলে যায় এই মহীয়সী নারী – এই মা।

মা শব্দটি যেন মধুর , বন্ধনও তেমনি নিবিড়। দেশ কাল পাত্র ভেদে পাহাড়ে অরণ্যে কিম্বা মরু অথবা মেরু অঞ্চলে – সর্বত্র মা একজন মা –ই । সে যে তুলনা রহিত –সন্তানের মাতা। 

একটি বিদেশী গল্প প্রচলিত আছে। নাম তার ‘মাদার ট্রি’ যার বাংলা নাম ‘গাছ –মা।’ এই বৃক্ষমাতার একটি সন্তান ছিল। সে বড় হয়ে তাকে ছেড়ে চলে গেল নিজের জীবনের সন্ধানে। একদিন সে মায়ের নিকট এসে বলে, 

- মা, আমার টাকার প্রয়োজন। 

মা বললেন, 

- কি দিই বাছা! আমার পত্র পল্লব ছিন্ন করে নিয়ে যাও। তোমার চাহিদা   পূরণ হবে। 

পুত্র চলে গেল। কিছুকাল পর আবার সে মায়ের কাছে এলো। একই আবদার। মা বললেন, এবার তুমি আমার ডালপালা কেটে নিয়ে যাও। তাতে প্রয়োজন মিটবে। তাই হলো। বেশ কিছুদিন পর আবারও এলো সে। বললো, এবার কি দিতে পারো?

মা বললেন, 

- গোড়া থেকে করাত দিয়ে কেটে নাও। তাতে অনেক মুদ্রা পাবে। তোমার অনেক অভাব ঘুচে যাবে।

পুত্রের দুরবস্থা দেখে বৃক্ষ মাতা চোখের জল রোধ করতে পারে না। দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হলো। পুত্রের দেখা নেই। হয়তো ভাল আছে। অকস্মাৎ একদিন পুত্র এসে হাজির। বিধ্বস্ত, বিমর্ষ, বয়স্ক। খুঁজে পায় না কোথায় তার মা? যে নাকি মায়া দিয়ে, ছায়া দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে নিজের সব উজাড় করে দিয়েছিলেন। হঠাৎ মায়ের কন্ঠ শুনতে পেল ছেলে। 

- কি জন্য এসেছ বাছা?

- মা, আমার তো কিছুই নেই। 

মা বললেন, 

- আমারও কিছুই নেই বাছা। তুমি তো বড্ড ক্লান্ত। শুকনো পাত আর শুকনো বালি সরিয়ে দেখ, এইখানে আমি। আমার গুড়িটিতে বস। একটু জিরিয়ে নাও। তোমার ক্লান্তি দূর হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে রুশ আগ্রাসনে আজ লক্ষ লক্ষ মানুষ ইউক্রেইন থেকে প্রাণ রক্ষার্থে আশ্রয়ের সন্ধানে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ছুটে চলছে। সেখানে আবহাওয়া কতই না প্রতিকূল, কতই না ভয়ানক ঠাণ্ডা। সেখানে প্রতিটি মা তার এক সন্তানের হাত ধরে আরেক সন্তানকে কোলে নিয়ে হেঁটে চলছে মাইলের পর মাইল। আহার নেই, নিদ্রা নেই, নিশ্চিন্ত গন্তব্য নেই। এরকম একজন মায়ের ছবি দেখলাম পত্রিকায়। প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যে রেল স্টেশনে ভারি গরম পোশাক পরিহিত আতঙ্কিত মা বেঞ্চে বসে  অপেক্ষা করছেন। ক্রোড়ে তার শিশু সন্তান ভারি গরম কাপড়ে তারও আপাদমস্তক ঢাকা। ঘুমাচ্ছে নির্ভয়ে। এ দৃশ্য দেখে আমার চোখের কোল বেয়ে অশ্রু নেমে এলো। এই –ই  তো আদি থেকে অনন্ত কালের মা!   

 


নারী ভগ্নি – ভ্রাতা, ভগ্নির সম্পর্ক তুলনাহীন। স্নেহ মমতায় পূর্ণ মণিমাণিক্যের মতো দামী, উজ্জ্বল। এ সংসারে ভাই বোনের ন্যায় আর আপন কেউ নেই। এ সম্পর্ক কেবল বোনই তৈরী করে এবং ধরে রাখে চিরকাল। ভাইয়ের মঙ্গল চিন্তায় বোন সারাজীবন ব্যাকুল থাকে। 

‘কত মাতা দিল হৃদয় উপাড়ি, কত বোন দিল সেবা

বীরের স্মৃতি স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কে বা।’

নারী বধূ – কেবল বধূই নহে বন্ধুও বটে। এই পৃথিবীর আকাশ – বাতাস, পাহাড় – নদী, ঝর্ণা, ফুল –ফল, শস্য শ্যামল বিস্তীর্ণ অঞ্চল – এসবই নারী তার পুরুষ সংগীকে নিয়ে উপভোগ করবার জন্যই প্রকৃতি সৃষ্টি করেছেন। পাখির কন্ঠে জেগে উঠে প্রভুর সুমধুর জয়গান। পুরুষ রমণী মিলে এই জয়গান, নদীর কলতান, সাগরের বিরহি গর্জন – অন্তর হতে অন্তরে সঞ্চারিত করে।  তারা হারিয়ে যায় অন্য কোন মোহময় জগতে, অন্য কোথাও মহামিলনের অন্তঃপুরে।

নারী কন্যা – বিধাতার এক অপূর্ব উপহার। একটি কন্য সন্তানের সঙ্গে হীরা, মতি, জহরতের তুলনা চলে না। সে যে আঁধার ঘরের আলো। স্নেহ মমতার উৎস। তার জাদুকরী হাসি, আনন্দ পদচারণা, সবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়া – সে এক অপূর্ব  মধুময় অনুভূতির সঞ্চার করে। 

সভ্যতার অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে নারীর অগ্রযাত্রা থেমে নেই। ঘর, সংসার রক্ষা করা সন্তান লালন, পালন করা, মনুষ্যত্বের শিক্ষা দান করা, অফিস আদালতে দক্ষতার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করা – কোনদিকে নয়?  সর্বদিকে আজ নারীর জয়জয়কার। তবুও স্বীকার করতেই হয় আজও নারী নিগৃহীত, নির্যাতিত। এই নির্যাতনের কারণ নারীর অশিক্ষা। অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং অন্য নারীদের সহযোগিতার অভাব। নারী পুরুষ উভয়কেই নিপীড়িত নারীদের রক্ষা করবার দায়িত্ব নিতে হবে। তাদেরকে সামনে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। 

প্রকৃতিগত ভাবে নারী দুর্বল। অনেক বর্বর পুরুষ এই দুর্বলতার সুযোগ গ্রহন করে। নারীর উপর তাদের বাহুবল প্রয়োগ করে। মেয়েদেরকে শারিরীক ও মানসিক অত্যাচারেরে হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য পিতা, ভ্রাতা, স্বামী ও পুত্র হিসাবে পুরুষদেরকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

সাম্প্রতিক কালে CEDAW  নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরী হয়েছে। এটি হচ্ছে Convention on Elimination of all forms of Discrimination Against Woman. এই প্রতিষ্ঠানটি নারী নির্যাতন নিবারনের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। আশাকরি দিনে দিনে নারীরা একটি সুন্দর, সুশীল সামাজিক পরিবেশে সম্মানজনক জীবন কাটাতে পারবে। 

কাজীনজরুল ইসলাম রচিত ‘নারী’ কবিতা পাঠ করলে আর কিছু বলবার বাকী থাকে না। তবুও দু’চারট পংক্তি বলা প্রয়োজন মনে করি। কবি বলেছেন, “পুরুষ হৃদয়হীন –  মানুষ করিতে নারী দিল তারে আধেক হৃদয় ঋণ।”

“নারীর বিরহে, নারীর মিলনে নর পেল কবি প্রাণ,
যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইলো গান।”
“এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল,
নারী দিল তাহে রূপ –রস –মধু –গন্ধ  সুনির্মল। 
জ্ঞানের লক্ষী, গানের লক্ষী, শস্য – লক্ষী নারী,
সুষমা –লক্ষী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি। ”
কবি আরো বলেছেন,
“সেদিন সুদূর নয় –
যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়।”

আজ লক্ষ্য করা যাচ্ছে নারীর অগ্রযাত্রা। পুরুষের চাইতে নারীর যোগ্যতা ও দক্ষতা কোন অংশেই কম নয়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে ঘরে অথবা বাইরে নারী আজ পুরুষের সঙ্গে সমান তালে তার নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রাখছে। নারী ধৈর্য্যশীল, বিশ্বস্ত। ক্ষমাশীলও বটে। আজ চারিদিকে নারীর জয়জয়কার। জীবন যাত্রার মানও উন্নত করছে। পরিবার ও সমাজে নারী সসম্মানে অগ্রসরমান।       

  

   


মধ্যরাতের কড়চা

 লেখার খুব ইচ্ছা। কিন্তু কি লিখবো বুঝে উঠতে পারছি না। একবার ভাবি কবিতা লিখি। আবার ভাবি গল্প লেখাই শ্রেয়। তাতে মনের ভাবটি যথাযথ প্রকাশ করা সম্ভব। কিন্তু কোনোটি হয়ে উঠে না। কবিতার ছন্দ মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাই। একটি শব্দ ধরে এনে আরেকটির পাশে বসাই। যেন জোর করে বিয়ের পিড়িতে বসানো। কনের মুখ অধোবদন। বরের উচ্চশীর। কারণ বাহাদুর সে। বৌ নিয়ে বাড়ি যাবে। যেমন আলেকজান্ডার দিগবিজয় করে দেশে ফিরে যেতেন।  কিন্তু কনের সে বাহাদুরি নেই। কারণ আজ প্রাপ্তির চাইতে হারাবার দিন। এত আনন্দ উৎসবের ভিতর দিয়ে তার আজন্মের আশ্রয় থেকে উচ্ছেদ করা হলো। সে হতে যাচ্ছে পরবাসী, পরাশ্রয়ী – যে আশ্রয়ের কোন নিশ্চয়তা নেই। যে কোন ঝড়ে বুলবুলির বাসার ন্যায় তার আশ্রয়টি দমকা হাওয়ায় কোথায় উড়ে যাবে সে তা জানে না। তার একূল ওকূল – দুকূলই অস্থায়ী হল। সেজন্য কাব্যচর্চা একটি সাধনারই বিষয়। অন্ত মিলের শব্দটি পছন্দসই না হলে তাকে বাদ দিয়ে আরেকটি শব্দ চয়ন করতে হয়। সেটি জুতসই না হলে আরেকটি। মন মতো পেয়ে গেলে তবে সে শব্দটি টিকে থাকে। সুতরাং কাব্য সাধনা সরস্বতির দান। কসরত করেই তবে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করা । পরক্ষণে মনে করি প্রবন্ধ রচনাই উত্তম। কোন কিছু হারাবার ভয় নেই। যা বাস্তব তাই ব্যক্ত করা। তার ভাল ভাল দিক , মন্দ দিক, ক্ষতিকর দিক, শোধরানোর দিক সব ব্যাখ্যা করা যায়। তাতে কারো না কারো জ্ঞান পিপাসিত হৃদয়ে কিছু না কিছু বারিসিঞ্চন করা সম্ভব হয়। এতে জোর করে ধরে এনে বরকনের পদ্য লেখার প্রয়োজন পড়েনা। আর গদ্য কাব্যের মত বেসুরো তানপুরার তাল– লয়হীন ধ্বনির আঘাতে কানেরও বারোটা বাজাতে হয় না।গদ্য কবিতা সত্যিকার অর্থে রচনা করা খুবই কঠিন। যদিও মনে হয় পত্রিকার বিজ্ঞাপন অথবা যে কোন মজার খবর হ্রস্ব–দীর্ঘ  লাইনে খাড়া করে দিলেই কবিতা হয়ে গেল। আসলে তা মোটেই না। তাল, লয়, ছন্দ, অর্থ ঠিক রেখে তবেই গদ্য কবিতায় হাত দিতে হয়। নচেৎ নির্ঘাত তার মরুপথে যাত্রা করতে হয়। সে আর গতি খুঁজে পায় না। যথেষ্ট দক্ষতার এবং মুন্সিয়ানার প্রয়োজন হয় গদ্য কাব্য রচনায়। আর আমরা যারা পাঠক, তাদের ঠকারই সম্ভবনা বেশী। খুঁজে খুঁজে পথ হারাই। ক্ষ্যাপার মত। ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দিবে তাই।’ ছাই উড়াতে গিয়ে জীবনের অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। তবুও একটি স্বরবৃত্ত বা মাত্রাবৃত্তের ছন্দোবদ্ধ সুখপাঠ্য গদ্য কবিতা খুঁজে পেতে সময় চলে যায় অনেক।

এখন বাকী রইলো গল্প বলা। গল্প বলাতো সহজ কাজ। মনের যত কথা গড়গড় করে বলে বলে যাওয়াই তো গল্প। সে কথা আংশিক সত্য। তবে প্রকৃত পক্ষে গল্প পরিপক্ক হাতের লেখা বটে। একটি মনোমুগ্ধকর গল্প লেখার জন্য প্রয়োজন হয় উচ্চ শ্রেণীর সৃজনী শক্তি। অনেকটা প্রকৃতি প্রদত্ত, অনেকটা চর্চা। পড়াশুনা করে জ্ঞান অর্জন, স্বতঃস্ফুর্ত আগ্রহ, প্রখর দৃষ্টি , সর্বোপরি মানবতা বোধ। এসব গুণাবলীর সমন্বয়ে একটি হৃদয়গ্রাহী গল্প রচনা সম্ভব।

নানা আকারের গল্প পড়ি আমরা। অনেক সময় একটি ছোট গল্পও হৃদয়, মন, আত্মাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে যায়। কয়েকদিন তা ভুলতে পারিনা। অনেক সময় শ্বাস রুদ্ধকর অবস্থায় পড়া শেষ করি। অবাক হয়ে ভাবি, কি করে লেখক এমন একটি বিষয় চয়ন করলেন? কি করে এমন চমৎকার ভাবে বর্ণনা করলেন। উপমা, উপস্থাপনার সৌন্দর্য্য স্টাইল কেমন করে পেলেন। যেমন মার্ক টোয়াইনের গল্পগুলো এমন দমবন্ধকর অবস্থায় পড়ে শেষ করতে হয়। সে এক অপূর্ব অনুভূতির সঞ্চার করে। আমি এখানে খুব উচ্চ  শ্রেণীর লেখক কবিদের কথা বলছি না। যারা কাব্য সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত রাখেন নিজেদেরকে, তাদের কথাই বলছি। গল্প মানুষের উর্বর মস্তিষ্কের ফসল। চর্চা করতে করতে একদিন তা ‘সোনালী ধানের শীষে ফলিয়া উঠিবে’ –সন্দেহ নেই।

যদি অর্ধেক পরিমাণে গল্প পঠন, কবিতা আবৃত্তি, প্রবন্ধ পর্যালোচনা করি, তবেই আমরা –সাধারণ পাঠকরা, অনেক মানিক–রতন  কুড়াইয়া পাইতে পারি। লিখতে না পারি, পড়তে তো পারি। পাঠ করে যদি মধু মক্ষীকার মতো মধুরস আহরণ করতে পারি, তবে অতৃপ্তি কোথায়? তৃপ্তিই তো জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ।

‘ছোট প্রাণ ছোট কথা,
ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা, 
নিতান্তই সজহ সরল
অজস্র বিস্মৃতি রাশি
প্রত্যহ যেতেছে ভাসি,
তারই দু’চারটি অশ্রুজল!’

এই উপলব্ধিই তো আমাদের বড় প্রাপ্তি। 

ঘড়ির কাঁটার হেরফের

 ঢাল নেই তলোয়ার নেই, নিধিরাম সরদার। দেশে আইন নেই, শৃংখলা নেই, বিদ্যুৎ নেই, চাকুরী নেই তবুও ভীনদেশী নিয়ম কানুন প্রচলন করে উন্নতির বুলি উচ্চারণ করি। সবকিছু ধ্বংসের পথে। উন্নতির ক্ষেত্র কোনটি তা গবেষণার বিষয়। বিদেশের সময় পরিবর্তনের ঘটনা  দেখে আমাদের মত দেশের সাধ জাগে বছরে দু’রকম সময়ের ঘোড়া চালাতে। তাতে নাকি দেশের উন্নতি হবে। বিদ্যুতের উৎপাদন সময়ের হেরফেরে কিভাবে সম্ভব এবং কতটুকু সম্ভব সেটা ভাববার বিষয়। বিষয়টি জুতা আবিষ্কারের মতই সহজ। এতোদিন মনে ছিলা। এই যা।

সত্যিই তুঘলকি কান্ডই বটে! নইলে একই দেশের standard time কোন এক বিশিষ্ট ব্যক্তির খামখেয়ালীপনার উপর নির্ভর করে কি করে! বর্তমান যুগ একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক। এত অগ্রসরমান কালে কি করে দেশের ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা এগিয়ে যায়! ঘড়ির কাঁটা চলর নির্ণয় করার করবার মালিক হচ্ছে ভূ-মন্ডলের উপর উত্তর দক্ষিণে প্রলম্বিত কল্পিত রেখা যার নাম দ্রাঘিমা। সূর্য্য যখন দেশের মধ্যাংশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দ্রাঘিমার ঊপর অবস্থান করে তখনই সেদেশের ‘সময়’ নির্ধারণ হয় এবং তখনই সে দেশে দুপুর বারোটা বাজে। এই ‘বারোটা’ বাজাই সময়ের খুঁটি। দেশটি ছোট হলে এই একই সময় সারা দেশের লোকেরা মেনে চলে। যদিও লক্ষ্য করবেন, দ্রাঘিমার পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের সময়ের কিছুটা তারতম্য দেখা যায়। আর দেশ যদি আমেরিকার মতো বিরাট হয়, তখন দেশে দু’রকম সময় বজায় রাখতে হয়। একটি standard time আরেকটি local time. কারণ দেশের দুই দিকে সূর্যের অবস্থানের কারণে সময়ের অনেক ব্যবধান দেখা যায়।

সুতরাং দেশের সময় নির্ধারণ একটি প্রকৃতিগত ব্যাপার, ভৌগলিক ব্যাপার। রাজা বাদশার ইচ্ছা বা আবদারের উপর ভিত্তি করে স্থির করা যায় না। অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আদিকাল থেকে বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যাক্তিগণ সময়কে নির্দ্দিষ্ট করে গিয়েছেন। নিজেদের খামখেয়ালীপনা চরিতার্থ করবার জন্য নয়। এদেশের বাসিন্দাদের জন্য যা প্রাকৃতিক ভাবে ধার্য্য করা হয়েছে তাই ঠিক। এর ব্যতিক্রম ঘটানো কোন বুদ্ধিমান গোষ্ঠীর বা দলের উচিৎ নয়। এতে জাতির মানহানি হয়। দেশের সম্মান ক্ষুণ্ণ হয় । সারা বিশ্বের সময়ের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে অংক কষে চলতে হয়। অংক কেবল আমাদেরকে কষতে হবে। অন্য কোন দেশকে নয়। তাদের মস্তিষ্কে বিদ্যা বুদ্ধি ও জনগণের সুযোগ সুবিধার বাস্তব ধারণ আছে।

এই ‘সময়’ এগিয়ে নেওয়াতে আরেকটি অপরাধ হয়েছে। পরের দিন এবং তারিখ থেকে আমরা এক ঘন্টা চুরি করছি বা দখল করে নিচ্ছি। যেমন শুক্রবার রাত বারোটায় ধরা যাক ২০ তারিখ শেষ হবে। নতুন (পরিবর্তিত) সময় তখনও ১১ টা। নতুন সময় যখন রাত ১২টা বাজবে, তখন পুরাতন দিনের শনিবারের ১ ঘন্টা সময় দখল  হয়ে যাবে।এভাবে শনিবারও পরের রাতের অন্ধকারে রবিবারের ১ ঘন্টা চুরি করে নেবে। অর্থাৎ শনিবারের শুরুর ১ ঘন্টাকে আমরা শুক্রবার বলবো। তদ্রুপ রবিবারের প্রথম ঘন্টাকে আমরা শনিবার বলবো। এভাবে দিন ও তারিখ দুটোকেই চুরি করা হচ্ছে। এটি খারাপ কাজ নয়কি? আমরা নাগরিকরা নিরুপায় হয়ে সরকারের এরকম একটি অন্যায় আদেশ পালন করছি। প্রকৃতি, সূর্য, সকালসন্ধ্যা, নামাজের ওয়াক্ত, ইফতারের সময়,পশু পাখির জীবন যাপন এসব কিন্তু ভূগোলের নিয়ম মেনেই চলছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের চলা উচিৎ হচ্ছে কি?

একটি ভয়ংকর রাত্রি

 তিমির রাত্রি। গভীর অন্ধকার। শব্দহীন, বর্ণহীন। চারপাশে কি আছে, কি নাই, ঠাহর করা যায় না। কঠিন শৈত্যের হিমশীতল পরশ অস্থিতে কম্পন জাগায়। হৃৎস্পন্দন জানান দিয়ে বলে বেঁচে আছি।

কোয়েটা থেকে ফোর্ট সান্দামানে যাচ্ছিলাম আমরা যুদ্ধ বন্দির দল (Prisoner of War) তখনও গন্তব্য জানা ছিলনা। দীর্ঘ রেল ভ্রমণের এক পর্যায়ে হিন্দুকুশ পর্বতের একটি শাখা অতিক্রম করতে হয়। তখন রজনী দ্বিযাম অতীত।  হঠাৎ ট্রেনের গতি শ্লথ হয়। দস্যুর ভয়ে নয়। সামনে চড়াই। অর্থাৎ খাড়া পর্বত আরোহণ। খুবই বিপদজনক পরিস্থিতি। রেলগাড়ির পেছনে গার্ডের কামরার সঙ্গে যুক্ত করা আছে আরেকটি এঞ্জিন। যাত্রীবাহি ট্রেনটি যখন উপরের দিকে চলবে তখন পেছনের এঞ্জিনটি তাকে ধীরে ধাক্কা দিবে যেন ভারসাম্য রক্ষা হয়। শত শত চাকার ট্রেনটির সম্মুখের এঞ্জিনটি টানতে থাকে উপর থেকে। নীচেরটি তাকে ধাক্কা দিয়ে সহায়তা করে। গভীর পার্বত্য অঞ্চলে ট্রেনটিকে একটি শতপদী সরীসৃপের মত দেখায়। চারিদিকে গিরিখাত অন্ধকারে দৃশ্যমান নয় বলে সেই আতংকের হাত থেকে রেহাই পেয়েছি। তবুও ট্রেন চলতে থাকে  একমাত্র লাইটটিকে সম্বল করে। ট্রেনের গতি বেশ ধীর। মনে হয় অতিশয় সতর্কতার সঙ্গে চলছে। তারপর শুরু হয় পর্বতের উপরিভাগ অতিক্রম করবার পালা। ট্রেনের অর্ধেক পর্বতের ওপারে, বাকি অর্ধেক এপারে।   

শব্দেরও ভাষা আছে। ট্রেনের লোহালক্কড়ের  আওয়াজের মাধ্যমে তার গতিবিধি কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়। এবার উৎরাইয়ের পালা। ট্রেন নামতে থাকে। পর্বতের ওপারে যখন চলতে শুরু করে তখন পেছনের এঞ্জিনটি তাকে টেনে ধরে রাখে যেন ট্রেনটি নিজের ভারে উল্টে পড়ে না যায়। সামনে এঞ্জিনটির কাজ হলো সতর্কতার সঙ্গে লাইনের উপরে থাকা এবং ধীরে ধীরে চলা। মনে হলো ট্রেনও দম নিচ্ছে, ভয় পাচ্ছে। আমরা যাত্রীরাও ইষ্টনাম জপ করতে লাগলাম। যদি কোনরকমে দুই এঞ্জিনের ব্যালেন্স একটু এদিক ওদিক হয়, তখন ট্রেনটি গিয়ে কোথায় পড়বে এবং কিভাবে পড়বে কেউ তা জানে না। বহির্বিশ্বে কেউ জানতে পারবে না, এই ঘন তমসাচ্ছন্ন ভয়ংকর রাত্রির ভয়ংকর দুর্ঘটনার কথা। কেউ জানতে পারবে না এই যাত্রীদের জীবনের যাত্রা ভংগের কথা। কেউ জানতে পারবে না এইসব  যাত্রীদের নিজের স্বপ্ন ছিল, আশা ছিল, আনন্দ ছিল, আরো কিছুকাল বাঁচার আকাংখা ছিল।     

নিশ্ছিদ্র আন্ধকার, চোখ বন্ধ রাখার কোন অর্থ হয় না। তাই দম বন্ধ করে প্রহর গুনতে লাগলাম আমি এবং আমার স্বামী মেজর হারুন, আর আমাদের শিশু কন্যা।

আমাদের কম্পার্টমেন্টে আছেন কর্নেল রাকিব এবং মিসেস রাকিব এবং তাদের সাত রাজার ধন –সাত সন্তান। দিনের বেলায় তাদেরকে দেখেছিলাম। আঁধার হওয়ার পর আমরা কেউ কারো চেহারা দেখতে পাইনি। এমন ভয়ানক ভ্রমণ, যে কথাবার্তা তো দূরের কথা, এক অদ্ভুত নীরবতা আমদেরকে গ্রাস করে ফেলে। এভাবে ট্রে হেঁটে হেঁটে চলতে লাগলো

 এই ট্রেনটি একটি ন্যারো গেজের লাইনের উপর দিয়ে চলে। পথ দুর্গম বলে প্রতিদিন রেল চলাচল করেনা। এই পার্বত্য অঞ্চলে অন্য কোন স্টেশন আছে বলে মনে হয়না। কারণ লোকালয় নেই। সুতরাং রেললাইনের গন্তব্য একটাই। ফোর্ট সান্ডামান। ইরানের  বর্ডারের নিকটবর্তী, পাহাড়ে ঘেরা পাকিস্তানের একটি বিরান পরিত্যক্ত অঞ্চল। বৃক্ষলতাহীন, মনুষ্য বসতিহীন, জীবজন্তুহীন, পশুপাখিহীন। সেইজন্য বিষাক্ত ও নিরীহ সর্প ও পোকা মাকড়েরা এখানে ঘরবসতি করে নির্বিঘ্নে। এই ফোর্ট সান্দামানেই আমাদের যুদ্ধবন্দি করে রাখা হয়।

প্রাকৃতিক দুর্গ। পালাবার উপায় নেই। ব্রিটিশ আমলে এটি একটি ফোর্ট ছিল এখানে বসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অত্যাচারি শাসকেরা এই দেশীয় রাজ্য শাসন করতো। পাহাড়ের উপর ছিল তাদের আস্তানা। রাতে জ্বালিয়ে রাখতো সার্চ লাইট। ঘুরে ঘুরে সে লাইট চারিপাশে নজরদারি করতো। আমরা ওখানে নির্বাসিত হওয়ার বহু বছর পূর্বে এ স্থান পরিত্যক্ত হয়। চারিপাশের পাহাড় পর্বত পার হয়ে কোন দিকে পালাবার কোন উপায় নেই। তবুও প্রহরা ছিল বড়  কড়া এবং আচরণ ছিল বড় নির্মম, নিষ্ঠুর এবং রুক্ষ।

ন্যারো গেজের লাইনের উপর চলে ছোট ডাব্বা অর্থাৎ ছোট ছোট কামরা। প্রতিটি কামরায় দুইপাশে এবং মাঝখানে লম্বালম্বি ভাবে তিন সারি বেঞ্চ। চওড়া নয় মোটেও। আমরা তিনজন এককোণে । দুই বেঞ্চের মাঝখানে স্যুটকেস রেখে বেঞ্চের সমান উচ্চতায় শিশুকন্যার বিছানা তৈরী করে নিয়েছি। লক্কর ঝক্কর ট্রেনের কামরায় অনেক ফাঁক  ফোকর আছে। সেগুলো দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আর বরফ গলা জল ভিতরে ঢুকছে। সেগুলো রোধ করার জন্য টাওয়েল গুঁজে দিয়েছি। কামরার ভিতরে ডিপ ফ্রিজের চাইতে ঠান্ডা। একটু পর পর হাতের ছোট্ট টর্চ জ্বালিয়ে দেখি আমার শিশু কন্যা ঠিক আছে কি না। ট্রেনের ঝাঁকুনীতে সে তো গভীর ঘুমে।  যত গরম কাপড় সব তার পরিধানে। আমাদেরও একই অবস্থা। তবুও মনে হয় এগুলো কোন গরম কাপড়ই নয়।

এভাবে কাটতে থাকে ভয়ংকর প্রহর। একসময় বোধ হলো অবতরনের পালা সমাপ্ত। ট্রেন সমতলে নেমেছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলাম। বাঁচার প্রথম পর্ব অতিক্রান্ত।

ট্রেন এখন ঝিকঝিক কর থেমে থেমে চলছে। এরকম কবার যখন ট্রেন থেমে থাকে তখন মেজর হারুন ট্রেনের সশস্ত্র পাঞ্জাবী প্রহরীদের নিকট থেকে পারমিশান নিয়ে ইঞ্জিন থেকে গরম পানি আনতে যান। কারণ সঙ্গে রাখা গরম পানি এতক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। তাতে বাচ্চার জন্য দুধ তৈরী করা সম্ভব ছিলনা। তখন  তিনি দেখতে পেলেন রেল লাইন বরফে ঢাকা। বাঙালী বন্দি সিপাহীগণ বরফ কেটে লাইন পরিষ্কার করছে এবং ট্রেন ধীরে ধীরে চলছে। মনে পড়লো মধ্যযুগীয় ক্রীতদাসদের কথা। ‘দি রুটস্‌’ ফিল্মের কুন্তা কিন্তের কথা। আমাদেরকে নির্বাসনে পাঠিয়ে তাদের কি লাভ হচ্ছে বুঝতে পারলাম না। ক্ষমতা এমন জিনিস যা মানুষকে দানবে পরিণত করে। চতুর ইংরেজ, রেলের লাইন বরাবর স্লিপারের নীচে গর্ত করে রেখেছে। পরিষ্কার করা বরফ ঐ গর্তে পড়ে যাচ্ছে। এই কঠিন শীতে গভীর অন্ধকার রাতে বাঙালী সৈনিকদেরকে দিয়ে বরফ পরিষ্কার করানো যেন রূপকথার দৈত্যদানোর কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। বাঁচার  আশায়, কঠিনশাস্তির ভয়ে তারা একাজ করতে বাধ্য। কারণ তাদের আশে পাশেই আছে বন্দুকধারী প্রহরী। তারা অবশ্যই কামরার ভেতরেই অবস্থান করছে। 

মেজর হারুন থার্মোসে করে গরম পানি নিয়ে ফিরে এলেন। গরম দুধ তৈরী করে বাচ্চাকে দিলাম। দেখি বাচ্চা দুধ পান করছে। স্বস্তি পেলাম যে সে ঠিক আছে।

দুঃখের রজনী যেন শেষ হতে চায়না। বাচ্চার পাশে দুজনে বসে থাকতে থাকতে একসময় রাত পোহালো। পাখির কোলাহল শোনার ভরসা মিছে। চারিদিকে শ্বেতশুভ্র বরফের সাদা আভায় ভরে গিয়েছে। সারা নিশি গভীর অন্ধকারে নিমগ্ন ছিলাম। প্রভাতে সেরকমই সাদা আলোর আভায় চোখ ধাঁধিয়ে গেল। তবে পূর্বদিক কোনদিকে, সূর্য কোথায় কিছুই বুঝা গেল না। ট্রেন ধীরে ধীরে চলতে লাগলো। চতুর্দিক কেবল বরফে ঢাকা পাহাড় আর পাহাড় ছবির মত। আর কিছুই দেখার ছিল না। এ এক অন্য জগৎ। যেন অন্য গ্রহে। নদী নেই, নালা নেই, গাছ নেই, পালা নেই, মানুষ নেই, পশু নেই, পাখি নেই, জলাশয় নেই, জনপদ নেই। কি বিচিত্র দৃশ্য। তবু ধুরন্ধর ব্রিটিশ এই দুর্গম পথ কোনকালে তৈরী করে রেখেছে, কেন কে জানে! যেখানে শস্য এই, সম্পদ নেই, দুর্বাঘাস পর্যন্ত নেই। বালির স্তুপ আর কঙ্কর পাথর মৃত্তিকার স্তরকে ঢেকে রেখেছে। চতুর ইংরেজ তাদের প্রভুত্ব বজায় রাখার জন্য এই রেলপথ নির্মাণ করেছিল আমাদের মত নিরাপরাধ মানুষকে বন্দি রাখার জন্য। কবে কোথায় কে বা কাহারা, কি অপরাধ করবে, তাদের জন্য কি এই দুর্গ নির্মাণ? মানুষকে শাস্তি দেবার জন্য কত প্রাণের বিনিময়ে, কত অর্থের বিনিময়ে এই এ পথ তৈরী করা হয়েছিল তা তারাই জানে। এই দুর্গম দুর্গ নির্মাণ  তৈরী করে এই পৃথিবীতে   মানুষকে পারত্রিক জীবনের নারকীয় স্বাদ গ্রহণ করিয়ে পৈশাচিক অনন্দ লাভ করা ছাড়া আর কি হতে পারে?

এই রেলভ্রমণ এক ভয়ংকর রাত্রির বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা একটি দুঃস্বপ্নের মত। যেন পুনর্জন্ম লাভ করে এ মাটিরে পৃথিবীর মাটির গৃহে ফিরে এলাম।

১৬ই ডিসেম্বর, ২০১০

একাকী একজন - আমার মা

 

মানুষ ভাগ্য নিয়ে জন্মায়। জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘটনার বিবর্তন ঘটে বটে, তবে ভাগ্য তার সঙ্গ ত্যাগ করে না। তিন ভাই বোনের মধ্যে জুবাইদা খাতুন সর্বকনিষ্ঠ। বড় দুজন ভাই। মাত্র দুবছর বয়সে জুবাইদা খাতুন মাতৃহারা হন। এখান থেকেই তার জীবনের একাকীত্বের শুরু। মায়ের স্নেহ কি তার জানা নেই।

পিতা মোহাম্মদ হানিফ, সুফি দরবেশ। দেশ-দেশান্তর ঘুরে বেড়ান। শেষে আশ্রয় নেন মক্কা মদিনায়। মক্কায় ঘর সংসার পাতেন। দীর্ঘ এগার বছর আর দেশে ফেরেননি। সঙ্গে ছিল তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বালক মোহাম্মদ  সিদ্দিক। সেখানেই লেখাপড়া করতেন। পিতা বিদ্বান ছিলেন। নানা ভাষায় পারদর্শী। কঠোর ধার্মিক। কিন্তু কোমল, উদার মনোবৃত্তির অধিকারী ছিলেন। মানবতার দিকে দৃষ্টি ছিল। স্বল্প ভাষী। ভক্ত সংখা ছিল প্রচুর। তবে তিনি পীর  ছিলেন না। ছিলেন না সংসারীও। বাড়ির অবস্থা ভাল। বিষয় সম্পত্তি যথেষ্ট। জমি বন্ধক দিয়ে টাকা পয়সা নিয়ে  বেরিয়ে পড়তেন।

বিরাট বাড়ি। সুর্য দীঘল নয়। উত্তর দক্ষিণে প্রসারিত। বহু শরীকের বসবাস একই বংশোদ্ভূত। জুবাইদা খাতুন বাড়িতে বিরাট আট চালা ঘরের একা বাসিন্দা। বাড়িতে লোকের অভাব নেইকেউ না কেউ তার সঙ্গে  থাকতেন। তার উত্তরের ঘরের জেঠি, দক্ষিণের ঘরের জেঠি, পশ্চিমের ঘরের জেঠিরা খুবই স্নেহ করতেন। মাতৃহারা মেয়েটিকে স্নেহের ছায়া দিয়ে রাখতেন। খাবার দিতেন, নিরাপত্তার খেয়াল রাখতেন। বয়স তখন তাঁর পাঁচ বছর । ১৯১০ সালে তার জন্ম।

তখন ব্রিটিশ আমল। বাড়িতে লেখাপড়ার চর্চা ছিল। তবে মেয়েদের জন্য নয়। জুবাইদা খাতুন ঘুরে ঘুরে সব ঘরেই  লেখাপড়ার আশে পাশেই থাকতেন। তাদের বাদ দেয়া বই নাড়া চাড়া করতেন। তাতে তার পড়াশুনা আয়ত্তে এসে যাপরীক্ষা পাশ করা ছাড়াই সরস্বতি তাকে অনেক কৃপা করেন। ধাপে ধাপে সব ক্লাসের বই পড়া  শেষ  হয়। এমনকি ইংলিশ কবিতাও তার শুনে শুনে মুখস্থ ছিল। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রম তার অনেকখানি মুখস্থ ছিল।

সেই সময় আমার বড় মামা মোহাম্মদ সিদ্দিক বাড়িতে এসে আমার মা জুবাইদা খাতুনকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিলেন। মাদ্রাসাটি অনেক প্রাচীন কালের। বড় মামা ঘোড়ায় চড়ে তার ছোট বোনটিকে মাদ্রাসায় দিয়ে যেতেন,  আবার এসে নিয়ে যেতেন। তখন বাড়ি বাইরে গিয়ে বিদ্যার্জন মেয়েদের জন্য ছিল এক আশ্চর্য ঘটনা। এই ছিল  তার  প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা। কোরান পাঠ, গুঁলিস্তা, বুস্তা, পুস্তা এসব বই পড়াশুনা কিছুদিন করেছিলেন। ঘোড়ায়  চড়ে  মাদ্রাসায় পড়তে আসা তখনকার দিনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, বিশেষ করে অবরোধ বাসিনীদের  কাছে। মামা লাখনৌ চলে যাওয়ার পর পড়াশুনাও বন্ধ। 

তার কিছুদিন পর দূরদেশী দরবেশ পিতা বাড়িতে এলেন। তিনি ছিলেন উঁচা লম্বা গৌরবর্ণ এক সুন্দর   সুঠাম দেহের অধিকারী। গ্রামের লোকেরা মজাক করে বলতেন কাবুলিওয়ালাএক পুণ্যময় নুরানী আলো যেন  তাকে ঘিরে রাখতো। দেশে ফিরে এসে তিনি জেষ্ঠ্য পুত্র মোহাম্মদ সিদ্দিকের বিবাহ দিলেন, আরেক পরিবারের সম্ভ্রান্ত  সুশ্রী দির্ঘাঙ্গী তরুণীর সঙ্গে। তাদের ছিল সৌন্দর্যের খ্যাতি। বিশেষ করে গাত্রবর্ণ ছিল তাদের বিশেষ   অহংকারের কারণ। চাকুরী নিয়ে মোহাম্মদ সিদ্দিক লক্ষ্ণৌতে পাড়ি জমালেন। সঙ্গে নিলেন ছোট ভাই মোহাম্মদ জাকারিয়াকে। সেখানকার মাদ্রাসায় তাকে ভর্তি করে দিলেন। তারও কিছুকাল পর ছোট বোন জুবাইদা খাতুনকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন।

এটা আমার মায়ের জীবনের আরেকটা বাঁক। এখানেও তিনি একা। ভাবী তার মাতৃহারা হৃদয়ে কোন স্নেহ  মমতার বারি সিঞ্চন করতে পারেননি। এখানে জুবাইদা খাতুনের কাজ ছিল বাচ্চার পরিচর্যা করা, ঘর গেরস্থালীর   কাজ করা। আরবী উর্দু পড়া এবং কথা বলা।

এই লখনৌ শহর ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজধানী। অত্যন্ত অভিজাত শহর। তবে আজকের মত সুযোগ সুবিধা ছিলনা। যানবাহনের মধ্যে ছিল ডুলিপালকির সাধারণ সংস্করণ। সম্ভবত কাঠের তৈরি একটি  বাক্সের মত। চারদিক কপড় দিয়ে ঘেরা। দুই বেহারা কাঁধে করে নিয়ে যেত গন্তব্যে। আমাদের রিক্সার মত তারা সর্বত্র ঘুরে বেড়াতো। যার যখন দরকার ডেকে নিত এ ডোলি ওয়ালা ইধার আওডুলিতে চড়ে চলে যেতেন বেড়াতে, হাসপাতালে অর্থাৎ যেখানে ইচ্ছা সেখানে। জুবাইদা খাতুনের কাজ ছিল নিয়মিত তার ভাবী সাহেবার জন্য ডুলি ডেকে আনা।

সেই সময় সেই শহরে হাজী আমীর আলী নামে একজন বিখ্যাত পীর সাহেব বাস করতেন। তিনি অত্যান্ত  নেক এবং পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন। আমার বড় মামা হাফেজ ক্বারী মৌলানা মুহাম্মদ সিদ্দিক সাহেব তাঁর একজন  বিশেষ ভক্ত এবং বন্ধু ছিলেন। কথিত আছে পীর সাহেব বিছানার গদি উঠালেই অনেক টাকা বের হতো। তিনি  দয়ালু ছিলেন। নির্ধনকে দান করতেন। তার বাড়িতে অন্দরে কোন রান্নাবান্না হতনা। পাক হত দহলিজে। সেখানে বহুত উমদাহ্‌ খানা তৈয়ার হত। বাড়ির ভেতরের জেনানাগণ এবং অন্য সকলে সেই খানা গ্রহন করতেন। আমার মাতা জুবাইদা খাতুন সেই সময় বালিকা ছিলেন। বড় মামি প্রায়ই সেই বাড়িতে তশরিফ নিতেন। ডুলিতে চড়েই  যাতায়াত। সঙ্গে যেতেন জুবাইদা খাতুন বাচ্চা মেয়ে নূরীকে দেখভাল করবার জন্য

বড় মামার পাশের বাসার একটি মেয়ের সঙ্গে জুবাইদা খাতুনের পরিচয় হয়। নাম তার রাসুলান। সম বয়সী হলেও একটু বড়। এই ছোট মেয়েটিকে এত কাজকর্ম করতে দেখে তার মায়া হয়। সে বলতো এত কাজ কর কেন?  তোমার ভাবিতো সারাদিন ঘুরে বেড়ান। তুমি ছোট, এত কাজ কর, বাচ্চা সামলাও। তিনি যেমন তোমার ভাই সাহেবের বিবি, তুমিও তো তার বোন। কম কিসে? দেখ আমার কোন কাজ নেই। আমার মা-ই সব করেন। জুবাইদা খাতুনের চোখ ছল ছল করে ওঠে। বুকের ভিতরটা হাহাকার করে। মুখে বলতেন আমার অভ্যাস  হয়ে গেছে। তাছাড়া এ বাচ্চা মেয়েটিও আমার খুব প্রিয়। সে আমাকেই বেশি পছন্দ করেআর ঘরের কাজ কর্ম তো করতেই হবে।

জুবাইদা খাতুন ঘর সংসার গুছিয়ে রাখতেন। নিজের পড়াশুনা করতেন। তাদের বাড়ির নীচের তলায় ছিল বাজার, দোকানপাট। উপর থেকেই বাজার করতেন। এক আনায় অনেক কিছুই ক্রয় করা যেত। তাছাড়া আসতো ফেরিওয়ালা। তাজা হারে আমরুদ, (পেয়ারা) তাজা হারে আমরুদ বলে হাঁক দিত। এক পয়সায় অনেক পেয়ারা  দিয়ে যেত। হারা মিরিচ (কাচা মরিচ), শাক সবজি, আঙ্গু্‌র, সেভ (আপেল), কিসমিস, মনাক্কা, নানা প্রকার মসলা  দিয়ে যেত। চার আনার বাজারে বাড়ি ভরে যেত এমনকি মিঠাই মন্ডা সহ। 

আমার ছোট মামু মাদ্রাসা থেকে ফিরে এলে তার ছোট বোন জুবাইদা খাতুন নিচে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে আসতেন। একটি ঠিকা মেয়ে বাসার কাজ করে দিয়ে যেত। কোনদিন আসতে দেরি হলে এই জুবাইদা ছাদের উপরে গিয়ে তাকে চিৎকার করে ডেকে আনতেন। তার নাম ছিল মান্নু কি আম্মি। তিনি ডাকতেন, এ মান্নুকি আম্মি, জলদি আও। দের হো রাহা হ্যায়। সম্ভবতঃ তাদের বাসস্থান ইনাদের বাসস্থানের নিকটবর্তী ছিল। সেই মেয়েটি এসে ভারি ভারি কাজ করে দিয়ে যেত।        

এক রাতে মহল্লায় চোর হানা দেয়। গভীর রাতে চোর আসে রাস্তার ওপারের বাসায়। তখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাতিওয়ালা সন্ধ্যায় বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে যেত। সকালে এসে বন্ধ করে দিত। সে আলো কতই বা উজ্জ্বল ছিল। তবুও তো আলো। আজকের দিনের সাথে তার কোন তুলনা চলেনা। সেই বাড়ির গৃহকর্তা বাড়িতে ছিলেন কিনা জানিনা। তবে গৃহকর্ত্রী উচ্চস্বরে চিৎকার করে বললেন, মহল্লা ওয়ালা জাগো, হামারা ঘর মে চোর আয়া।   কেউ এলোনা। শেষে ডাকলেন, ক্বারী সাহাব জাগো, ক্বারী সাহাব জাগো। হাম মুশকিল মে হ্যায়। তখন আমার   বড় মামা সাড়া দিলেন। তিনি দুনলা বন্দুকটি বারান্দা থেকে তাক করে চোরকে গর্জন কোরে ধমক দিলেন। চোর  ততক্ষন পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলো। কোনো সাহায্যকারী না এলে সে ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে যাবে। বড় মামুর ধমক খেয়ে এবং বন্দুক দেখে লোকটি লাফ দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। মামা সেই মহিলাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,  দরজা বন্ধ রাখেন। আবার যদি আসে তবে আমাকে ডাকবেন। এইভাবে তিনি তস্করের হাত থেকে সেই ভদ্রমহিলাকে রক্ষা করেন।

সেই সময় লখনৌকে আমার আম্মারা হিন্দুস্থান বলতেন। তখন বাংলাদেশও ভারতের অন্তর্গত ছিল। লখনৌ ছিল অনেক দূরের রাস্তা। আম্মার ভষায় তিন দিন তিন রাত থাকতে হতো ট্রেনে। আমার বড় মামা মোঃ  সিদ্দিক একটি কামরা রিজার্ভ করে নিতেন। উনার নিজের পরিবার, ছোট মামা জাকারিয়া, আম্মা জুবাইদা খাতুন। আমাদের এলাকার আরো কয়েকজনকে লখনৌ মাদ্রাসাতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে যাতায়াত করতেন। ট্রেনের কামরার চাবি বড় মামুর হাতেই থাকতো। ট্রেনে যেতে যেতে অনেক দৃশ্য অবলোকন করতেন। পাকশী ব্রিজ বিরাট রেল সেতু অতিক্রম করা, গুম গুম শব্দ অনুভব করা বড় রোমাঞ্চকর মনে হত। কোথাও ট্রেনটি একটি বিশাল মাছের পাজরের দুই পাশের কাঁটার ভিতর দিয়ে চলে যেত। এত বিরাট মাছের কাঁটা, না জানি কত  বিরাট মাছ ছিল সেটি। এটিও পুলক অনুভব করবার মত ঘটনা। এখন আর সে সবের চিহ্নও নেই। কেউ জানেও  না। ট্রেনে যেতে যেতে নানান প্রাকৃতিক দৃশ্য, নানান জনপদ , নানা প্রকার বেশ ভূষা, জীবন যাত্রার ধরণ, ভাষা  চেহারা দেখতে দেখতে অবশেষে সবুজ শ্যামল বাংলা এলাকা ছেড়ে রুক্ষ ধূসর দেশে উত্তর প্রদেশে গিয়ে  পৌঁছাতেন। গার্ড এসে চাবি নিয়ে যেতেন। মামারা অবতর করে গন্তব্যে পৌঁছে যেতেন। জুবাইদা খতুন ঘর সংসারের কাজ করতেন, পড়াশুনা করতেন এবং মামার মেয়েদের ছবক দিতেন। বড়মামার পড়াশুনার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। তিনি পড়াশুনার জন্য জুবাইদা খাতুন এবং তার মেয়েদের খুব উৎসাহ দিতেন। আমার আম্মা জুবাইদা খাতুন বিদুষী মহিলা ছিলেন। মজার বিষয় ছিল তিনি লিখতে জানতেন না। প্রচুর পড়াশুনা করতেন বাংলায় যেমন, উর্দুতে তেমন। আর হাদিস কোরান তো কথাই ছিলনা। আমরা ছোট বেলায় দেখেছি অবসর সময়ে মানচিত্র ছিল তার সঙ্গী। পৃথিবীর সব সাগর, মহাসাগর, মহাদেশ, দেশ, রেলপথ, নৌপথ, আকাশপথ, কোথা হতে কোন গন্তব্যে পৌঁছায় সব ছিল তার নখদর্পণে। কোন কিছু জানতে চাইলে পরম যত্নের সঙ্গে আমাদের তা বুঝিয়ে দিতেন। শিল্প  সাহিত্য সম্বন্ধে তার জ্ঞান ছিল প্রচুর। নবী কাহিনী, আসমানী  কিতাব, তাদের শানে নজুল তাঁর মুখস্থ ছিল। যত পুঁথি ছিল তাঁর কন্ঠস্থ এবং সুরেলা কন্ঠে তা পাঠ করতে পারতেন। ইংরেজী পড়তে পারতেন না তবে অনেক গল্প জানতেন শেক্সপীয়রের। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা না থাকলেও তিনি একজন স্বশিক্ষিত এবং সুশিক্ষিত মহিলা ছিলেন। আমাদের গ্রামে আজ পর্যন্ত তার সমকক্ষ আর কেউ নেই। যদিও মেয়েরা বি.এ. পাশ করছে। তবুও তাঁর তুলনা  তিনি নিজেই।

লখনৌতে থাকতে থাকতে তার বয়স বেড়ে যা ১৩/১৪ তে। তখনকার বিধান অনুযায়ী বিবাহের বয়স। সুতরাং কোন ছুটীতে মামারা বাড়ি এসে তার বিবাহের ব্যবস্থা করে ফেলেন। আমাদের গ্রামের এক গ্রাম পরেই দক্ষিণে নিঘুরকান্দা গ্রাম। দুই ক্রোশ হয়তবা হবে। 

আমাদের গ্রামের নাম হরিরামপুর। আমার পিতা আব্দুস সোবহান বিশ্বাস ১৯১৯ সালে এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ছাত্র ছিলেন তুখোড়। তিনি গল্প করতেন, প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর যখন  ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন। তাদের সময় মিডিয়াম অব ইন্সট্রাকশন ছিল ইংলিশ। পরীক্ষায় ভালভাবে পাশ করার দরুণ দূর দূরান্ত হতে লোকেরা তাকে দেখতে আসেন। তিনি ছিলেন এক অদম্য এবং নির্ভিক পুরুষ। তাঁর শিশু কালেই পিতৃবিয়োগ হয়। তাঁর মায়ের সহায়তায়, নিজের অসম সাহসে এগিয়ে যান। আর্থিক অনটনে কলেজের লেখাপড়া ত্যাগ করতে বাধ্য হন। কারো পরামর্শ ছাড়াই, নিজের সাহসে ভর করে গিয়েছিলেন মুক্তাগাছা এলাকার প্রবল পরাক্রমশালী জমিদার রাজা জগৎ কিশোরের নিকট। তিনি তরুণের বক্তব্য  শুনে মন্তব্য করলেন, Look, higher education is not for the poor. জমিজমা যা আছে দেখেশুনে চালাও, তাতেই চলে যাবে।  

বিফল মনোরথ হয়ে পিতা আমার ফিরে এলেন। ঘুষের চাকুরী করবেন না বলে দারোগার চাকুরী  প্রত্যাখ্যান করলেন। সাব রেজিস্ট্রারের চাকুরিও নিলেন না। শেষে নান্দিনা স্কুলের টিচার হিসেবে যোগ দেন। তার বিষয় ছিল অংক আর ইংলিশ। এই স্কুল প্রতিষ্ঠায় নলিনী মোহন দাস (মাখন বাবু), রিয়াজ মাস্টার, জয়েন মৌলবি সাহেবদের সঙ্গে তারও অবদান ছিল। এই স্কুল অল্প সময়ের মধ্যেই একটি বিখ্যাত স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর সব কৃতিত্ব শিক্ষকদের। এই নান্দিনা স্কুলেই আমাদের সব ভাইয়েরা লেখাপড়া করেন। তখনকার দিনে ১৯৪৩ সালে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নাজির আহমেদ undivided বেঙ্গলের শিক্ষা বোর্ডে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। পরবর্তীতে কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে, পরে কলকাতা ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারী পাশ করেন। পরে ইংল্যান্ড থেকে এফ এফ এ তার সি এস পাশ করেন, কম সময়ে কৃতিত্বের সঙ্গে।

বিবাহের সময় আমার আম্মা কিশোরী মাত্র। মা নেই। বাবা বিদেশে বসবাস করেন। একা একা আমাদের বাড়িতে একটি সংসারের দায়িত্ব গ্রহন করেন। শাশুড়ি রায় বাঘিনী। তবে ননদিনী অন্যান্যরা বড়ই স্নেহের চক্ষে দেখতেন। আমার মা বড়ই ধৈর্য্যশীলা সহিষ্ণু রমণী ছিলেন। তিনি বাড়িতেই থাকতেন বিরাট আটচালা ঘরে একাই  থাকতেন। আমার এখন মনে আছে ঘরের উপরের কাঠের পাড়ে বড় করে খোদাই করে লেখা ছিল ১৩৩০ সাল।

আম্মা ভয়ে ভয়ে একাই থাকতেন। তার কষ্টের কথা বলার জায়গা ছিলোনা। বাবা ছিলেন রাগী মানুষ, তাকেও কিছু বলার উপায় ছিলনা। যাই হোক। সংসার বড় হলোএই প্রথম তিনি তাঁর প্রথম সন্তানকে নিজের মত করে পেলেন। সম্পূর্ণ নিজের কেউ। তাকে লালন পালন করা, শয়নে স্বপনে বুকের কাছে রাখা, অক্ষর জ্ঞান দান করা সব কিছুই নিজের মত করলেন। কয়েক বছর পর তাকে ছাড়তে হলো। ভর্তি করা হলো নন্দিনা স্কুলে।  ছাড়তে খুব কষ্ট হতো। তিনিও তাকে ছেড়ে যেতে চাইতেন না। আম্মা লুকিয়ে তাকে একটি টাকা দিতেন। বুঝিয়ে সুঝিয়ে স্কুলে পাঠাতেন। তিনি ছিলেন দূরন্ত প্রকৃতির ছেলে। অত্যন্ত মেধাবী। নতুন বই কয়েক দিনে মুখস্থ করে    ছিড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিতেন। বলতেন আমার সব মুখস্থ। বই নিয়ে স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন কি? অংকও তার  নখদর্পণে ছিল।

সে প্রসঙ্গ থাক এখন মায়ের প্রসঙ্গ বলি। মা তখন পরবর্তী সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত হতেন। এইভাবে তিনটি  ভাইয়ের পর আমার জন্ম। বাড়িতে আনন্দের জোয়ার এলো। হাঁটি হাঁটি পা পা যখন আমার মা আমার হাতে শিশুতোষ বই তুলে দিলেন। বইটির নাম কমল কলি শেখালেন অসংখ্য ছড়া, ছড়া গান, কবিতা। ভোর হল দোর  খোলো, খুকু মণি উঠরে.....। গাছে বসে ডাকে পাখি উঠ, উঠ, উঠ বলে, নয়ন মেলরে শিশু জয় জগদীশ বলে।  আরো অনেক কবিতা শুনিয়ে ঘুম ভাঙ্গাতেন। আমার বাবা আমার বড় ভাইদের জন্মের পর গ্রামে একটি মক্তব (প্রাইমারী স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। সেটি আজও বর্তমান আছে। সেই স্কুলেই আমাদের সকলের হাতে খড়ি। সেখান থেকে আমরা একে একে বেরিয়ে এসে শহরের হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করে, প্রত্যেকে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করি। একদিন রাতে আমরা যখন ঘুমে, বাবা মাকে বললেন, ফিরোজার ভর্তির ব্যাবস্থা করে এসেছি। বিদ্যাময়ী গার্লস  স্কুলে। আগামী সকালে তাকে নিয়ে যাবো। তাকে তৈরি করে দাও। ৬ টি ব্লাউজ, ৬ টি শাড়ি, ৬ টি পেটিকোট ইত্যাদি খুটিনাটি, সব কিছু লেখা একটি প্রোসপেক্টাস আম্মার হাতে দিলেন। আমার চোখের ঘুম উধাও। আমি মাকে ছেড়ে কি করে থাকবো? আমার প্রিয় বন্ধুরা, প্রিয় পেয়ারা গাছ, কুল গাছের আগডালে মগডালে চড়া, সারাদিন টো টো করে গ্রাম শুদ্ধ ঘুরে বেড়ানো, এসবের কি হবে? আমি সেখানে হোস্টেলে থাকতে পারবোনা। কিন্তু আমার প্রচন্ড রাগী বাবার সঙ্গে এমন কথা বলা অসম্ভব। সুতরাং এক বুক কান্না নিয়ে পরদিন প্রত্যুষে বাড়ি হতে বের হয়ে গেলাম। সব গুছিয়ে দিলেন আম্মা, হাতে দিলেন একটি টাকা।

তখনকার দিনে গ্রামাঞ্চলে যানবাহন ছিলনা। ছিল দুই বেহারার ডুলি। তাতে চড়ে ধলা রেল স্টেশনে  পৌঁছালাম। কারণ ঐ বয়সে পদব্রজে ৫ মাইল পথ অতিক্রম করা সম্ভব ছিলনা। আম্মা এদিকে রিক্ত হলেন। সারাদিনের শতকাজের মধ্যেও তাঁর চোখের জল শুকায় না। কয়েক বছর পর আমার বাবা আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা আজিজ আহমেদকে নান্দিনা স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। আমার মা এবার সম্পুর্ণ শুন্যতার মধ্যে পড়ে গেলেন। তার  শৈশবের একাকীত্ব আবার তার কাছে ফিরে এলো। সপ্তাহান্তে একটি চিঠির অপেক্ষায় থাকতেন তিনি। বড় ভাইয়েরা তখন স্কুল কলেজের গন্ডি পেরিয়ে অনেক দূরে। কেউ প্রেসিডেন্সি কলেজে, কলকাতা মেডিকেল কলেজে, কেউ অন্যান্য কলেজে ভর্তি হয়ে পুরোদমে লেখাপড়া করছে। ছুটিতে আমরা বাড়িতে এলে মায়ের খুব আনন্দ হত। খুব যত্ন করতেন আমাদেরকে, যেন অতিথি, মেহমান!

একবার শীতের সময় বার্ষিক পরীক্ষার পর বাড়ি এসে দেখি তিনি ভয়ানক অসুস্থ। তার শ্বাস কষ্ট অ্যাজমা হয়েছে। ব্রংকিয়াল অ্যাজমা। শ্বাস প্রশ্বাসের কষ্ট যে এত ভয়ংকর হতে পারে, তা কল্পনার বাইরে ছিল। একটি দম শেষ হতে না হতেই আরেকটি দম এসে শ্বাস টেনে ধরেউপর্যুপরি শ্বাস টানার ফলে ব্যক্তিটি হাঁপিয়ে ওঠেন। সেজন্য হয়ত এর আরেক নাম হাঁপানি রোগ। আমার মায়ের এহেন কষ্ট দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। এতই কষ্ট যে কথা বলারও সময় দেয় না। এই অ্যাজমা রোগ বাকি জীবনের সঙ্গী হয়ে রইল। তিনি কিছুটা সুস্থ হলেন। আমার ছুটীও শেষ হল। আমরা একে একে বাড়ি থেকে যার যার হোস্টেলে চলে গেলাম। উনার একাকীত্বের সঙ্গী হয়ে রয়ে গেল ঐ ভয়ানক ব্যাধি। জীবনের বাকি ত্রিশটি বছর তিনি এই নিষ্ঠুর ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে জীবন কাটিয়েছেন। আমরা কেউ তাকে সঙ্গ দিতে পারিনি। তিনি কাউকে তার সঙ্গে থাকার জন্য অনুরোধ বা জোর করেননি। কত ঝড় ঝঞ্ঝা, কত গ্রীষ্ম, কত বর্ষা একা ঘরে একাকী অবস্থায় দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী অতিক্রম   করেছেন। যতক্ষ ভাল থেকেছেন, ততক্ষ সংসারের কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।

আমার মা জুবাইদা খাতুন পরম দয়ালু ছিলেন। মানুষের কষ্ট দূর করার চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে খাবার  দিয়ে খুব সাহায্য করতেন। কেউ অভুক্ত দরজায় এসেছে তাকে ফিরাতেন না। মাফ করকখনও বলেননি। খাদ্য দিয়ে, চাউল দিয়ে, টাকা দিয়ে সাধ্যমত সাহায্য করতেন। তার হাতের রান্না ছিল উৎকৃষ্ট। অনেকেই অসুস্থ হলে উনার হাতের রান্না করা বিশেষ খাবারের আবদার করে পাঠাতেন। আমার মা সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যাবস্থা করে পাঠিয়ে দিতেন। তারা বলতেন, তোমার মায়ের হাতের রান্না যে খেয়েছে তার জীবন সার্থক।

বাড়িতে মাহে নাও, সওগাত, মাসিক মোহাম্মদী ম্যাগাজিন আসতো। আমার বাবা, ভাইয়েরা বাড়িতে  আসার সময় খবরের কাগজ নিয়ে আসতেন। সেগুলো তিনি পুংখানুপুংখ রূপে পড়তেন এবং সংরক্ষণ করতেন।  সেজন্য সমসাময়িক পৃথিবীতে কোথায় কি ঘটছে সব জানতেন। তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ দেখেছেন, খবর রেখেছেন। উনার নিকট থেকে পরবর্তী কালে আমরা এসব যুদ্ধের অনেক তথ্য জানতে পারি। জাপানীদের রেঙ্গুন আক্রমনের পুরো ঘটনা তার কাছ থেকেই শুনেছি। ইতিহাসে যা পড়েছি তার চেয়েও বেশী। কারণ আমার ছোট মামু মোহাম্মদ জাকারিয়া তখন রেঙ্গুনে চাকুরী করতেন। আক্রমনের সময় বাংকারে চলে যান। পরে সেখান থেকে বের হয়ে ৯ দিন ৯ রাত আসামের জঙ্গলের ভিতরে হেঁটে সিলেটের সীমান্তে এসে পৌঁছান।

জুবাইদা খাতুন মুগলদের ইতিহাস পড়তেন। নবাব সিরাজুদ্দৌলার কথা, পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কথা সব যুদ্ধের গল্প আমাদেরকে বলতেন। ধর্মের সকল পুস্তক তার কন্ঠস্থ ছিল। কোরান হাদিসের কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। পুঁথি সাহিত্যে তার দখল ছিল। সুন্দর সুললিত কণ্ঠে পুঁথি পাঠ করতেন। গ্রামে তাকে সকলেই ভালবাসতো। মেয়েরা যে কোন সমস্যা নিয়ে সর্বদা তার কাছে আসতেন। ধর্মীয় পরামর্শ ও শিক্ষা তার কাছ হতেই নিতেন।

আমার মায়ের রাগ ছিলনা। ছিলনা কারো বিরুদ্ধে বিদ্বেষ। তিনি ছিলেন সহনশীলতার প্রতীক। একটি আলোর প্রদীপ। যে আলো মানুষকে পথ দেখা, দহন করেনা। পরবর্তীতে রেডিও আসার পর নিয়মিত খবর শুনতেন। তিনি গ্রামের মেয়েদের পথ প্রদর্শক ছিলেন।

আমার পিতা অত্যন্ত প্রতাপশালী এবং দাপটের লোক ছিলেন। সমাজ সেবা তার জীবনের আদর্শ। আজকালকার যুগে যেমন স্বামী স্ত্রীরা একসঙ্গে পরামর্শ করে ঘর-সংসার পরিচালনা করেন, সে যুগে তেমনটি ছিলনা। তখন গৃহকর্তা ছিলেন সকলেরই গার্জিয়ান। তার নাম হুকুম আর বাকীদের নাম তামিল। এই হুকুমের  নড়চড় নেই। সেই কারণেই আমার পরিশিলিত হৃদয়বান, সংস্কৃতিবান মাতা জুবাইদা খাতুন নিঃসঙ্গ ছিলেন। বই পত্র পত্রিকা, কবিতা, ছড়া, গজল, এসবকে সঙ্গী করে নিমগ্ন থাকতেন। অবসর সময়ে আলস্যে ব্যয় করতেন না।  তবে তার কোন আফসোস ছিলনা। একাকীত্বের মাঝেও তিনি পূর্ণতা লাভ করেছেন বইয়ের মধ্যে। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। অনুযোগ নেই।

পিতা আব্দুস সোবহান বিশ্বাস রাগী হলেও আমার মায়ের উপর ছিল অগাধ বিশ্বাস আর পরম নির্ভরতা। কোন সিদ্ধান্ত নেবার আগে মাকে জানাতেন। লেখাপড়া শেষে আমরা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লাম। পিতা অবসর নিলেন। বাড়িতে এলেন। ধর্ম-কর্ম, সমাজসেবায় আরো মনোযোগী হলেন। মাতা ঘর-সংসার আর শ্বাস কষ্টকে সঙ্গী করে চলতে লাগলেন। সবকিছুই একদিন শেষ হয়। তাই তিনিও ১৯৮২ সালের ২৬ শে জুলাই সকল মমতার বন্ধন ছিন্ন করে জান্নাতবাসী হলেন।

মা শব্দটি কত না মধুর। কতই না সুন্দর। অনেক ভাষায় আমার জানামতে, মা শব্দের সঙ্গে শব্দটি জড়িত এবং তেই মধু। মাতা একটি পরিবারের পত্তন। পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। সন্তানের জননী। সন্তানের চাইতে প্রিয় ধনসম্পদ মায়ের কাছে আর কিছুই নেই। দিবা রাত্রি অষ্টপ্রহর মা বক্ষে জড়িয়ে তার সন্তানের সেবা যত্ন আর নিরাপত্তা রক্ষা করে থাকেন। তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি থেকে শুরু করে মানুষের মত মানুষ করবার প্রয়াসে নিয়োজিত থাকেন।

আমাদের মা আমাদেরকে সৎ এবং সুশীল মানুষ হবার দীক্ষা দিয়েছেন। পরম সতর্কতার সঙ্গে আমাদের মানসিক বিকাশের পথ সুগম করে দিয়েছেন। তাই তাঁর সন্তানেরা আজ নিজের নিজের জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। পরের জন্য তাদের হৃদয় কুসুমকে প্রস্ফুটিত করেছেন। এমন মায়ের সন্তান হয়ে আমরা গর্বিত। সার্থক জনম মাগো জন্মেছি তোমার কোলে। তোমার আত্মা পরম শান্তি লাভ করুক অনন্তকাল এই প্রার্থনা আমার।

অমোঘ বিধান

 মানুষ মৃত্যুর অধীন। জন্ম, মৃত্যু মানুষের নিজের ইচ্ছামতো হয় না। মানুষ ইচ্ছা করে জন্মগ্রহণ করতে পারে না, আবার ইচ্ছা করে মরেও যেতে চায়না। অমর কবি ওমর খৈয়াম তার চতুষ্পদী কবিতার একটিতে এই সত্যটি বয়ান করেছেনঃ

‘স্রষ্টা যদি মত নিত মোর আসতাম না প্রাণান্তেও,

এই ধরাতে এসে আবার যাবার ইচ্ছা নেই মোটেও।’

(কাজী নজরুল ইসলামের ‘রুবাইয়াৎ’ অনুবাদ)

ধার্মিক ব্যক্তিরা বলেন, মৃত্যু যখন আসে, তখন ‘সে’ চলে যায় পারাপারে। তার এক পল আগেও নয় কিংবা এক দন্ড পরেও নয়। যখন যার আয়ুর বরাদ্দ শেষ হয়, তার শেষ নিঃশ্বাস পড়ে, তখনই তার জীবনাবসান ঘটে। এই–ই বিধাতার বিধান, অনিবার্য, অমোঘ। দীর্ঘ কর্মময় জীবনের সমাপ্তি টানার পূর্বেই যার ডাক এসে যায় তাকে যেতেই হয়। কর্মহীন যার জীবন,তাকেও সময় হলে চলে যেতে হয়।

মৃত্যুর হীমশীতল পরশ থেকে রাজারও নিস্তার নাই। মহাজ্ঞানী, মহাজন, মহা শক্তিধর সম্রাট, দরবেশ, সংসার ত্যাগী সন্ন্যাসী, দীনহীন জন –সকলকেই একদিন ভূতলে পতিত হতে হয়। আর উঠে দাঁড়াতে পারেনা। মৃত্যুই একমাত্র শক্তি যে সকলকে সমান করে দেয়। ‘ডেথ ইজ দ্যা লেভেলার।‘ সকল অহংকার, শান শওকত ধূলায় লুন্ঠিত হয়। একবারও আর উঠে বলতে পারে না, ‘এই যে আমি আছি, থাকবো তোমাদের কেউ হয়ে, তোমাদের মাঝে।’ জীবিত যারা তারা যেতে দিতে চায় না। তবুও সে চলে যায়, কে জানে কোথায়!

‘জন্মিলে মরিতে হবে/ অমর কে কোথা কবে।

চির স্থির কবে নীর/ হায়রে জীবন নদে।’


মরণ মানুষের অবধারিত পরিণতি। তার্কিকগণ বলেন যদি তাই হয় যে, যার যখন মৃত্যু লেখা থাকে তখনই তাকে যেতে হবে, আগেও নয় পরেও নয় তবে মানুষের এত সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন কি? তার গৃহের অর্গল বন্ধ করবার দরকার কি? সাবধানতার সাথে পথ চলবার, রাস্তা অতিক্রম করবার, দস্যু তস্করকে ভয় করবার কোন কারণ থাকে না। নির্ভাবনায় সে পথ চলবে কি দিবসে, কি নিশীথে, কি লোকালয়ে, কি জঙ্গলে, কি ঝড়ে, কি জলে, কি ট্রাকের সম্মুখে, কি রেল লাইনে। সৃষ্টিকর্তার হুকুম না হলে তো তার মৃত্যু ঘটবে না। সুতরাং নিশ্চিন্তে কেটে যাবে তার সারাটি জীবন।

মানুষের যত ভয় আছে তার মধ্যে মৃত্যু ভয় প্রধান। জন্মের পরমুহূর্ত হতে সে বাঁচার চেষ্টায় নিজেকে ব্যাপৃত রাখে। এটা এক সহজাত প্রবৃত্তি। অবোধ শিশু, নির্বোধ – সকলেই এই সহজাত আবেগের অধীন। ‘মরিতে চাহিনা এই সুন্দর ভুবনে’ – এ কথাটি চরম সত্য। রবিনসন ক্রুশো জাহাজ ডুবির পর এক নির্জন শ্বাপদ সংকুল অরণ্যে এসে আশ্রয় লাভ করে। তাকে বেঁচে থাকার জন্য, নিরাপদ থাকার জন্য কতই না উপায় অবলম্বন করতে হয় এবং সেসব কর্ম কতই না কঠিন।

অসুখে বিসুখে আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে যে ভয়টি লুকিয়ে থাকে তা হলো মৃত্যুভয়। কেবলমাত্র আরোগ্য লাভের জন্য আমরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই তা নয় মৃত্যুর দরজায় যেন না পৌঁছাই তার জন্য একটি প্রয়াস এই চিকিৎসা। রোগ ব্যাধি ছাড়াও দস্যু –তস্কর, ঝড় – ঝঞ্ঝা, ভূকম্পন, দুর্ঘটনা ইত্যাদি নানাপ্রকার বিপদ থেকে ত্রাণ পাওয়ার জন্য আমরা সদা সতর্ক থাকি। আমরা দিবস রজনী একটি সংগ্রামে লিপ্ত থাকি সেটি হলো বাঁচার সংগ্রাম, মরে যাওয়ার সংগ্রাম নয়। যার ধনসম্পদ নেই, শরীরের অংগ প্রত্যঙ্গের হানি হয়েছে কোন কারণে, তারও বাঁচার আকাঙ্ক্ষা অন্যদের তুলনায় কম নয়। তাদের সংগ্রামও বাঁচার সংগ্রাম। মানুষের চারিদিকে যেন মৃত্যুকূপ। একটু আসাবধান হলেই তার চোখের সামনে আজরাইল ফেরেশতা এসে হাজির হবে। 

কিন্তু কেন, কেন মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবার এত কৌশল অবলম্বন করে? কেন নিশ্চিন্ত থাকতে পারেনা, সে কেন নির্ভয় হতে পারেনা, কেন নিজেকে প্রকৃতির হাতে সৃষ্টিকর্তার হাতে সঁপে দিতে পারেনা? তার উত্তর হলো মানুষ বাঁচতে চায় – অন্য যে কোন প্রাণীর মতোই। মানুষ জীবনকে খুব ভালবাসে। প্রাণের চাইতে অধিক প্রিয় আর কিছুই নয়। মৃত্যু আছে বলেই বাঁচার আকাঙ্খা এত প্রবল। মরণ না থাকলে মানুষের বেঁচে থাকার মজাটাই নষ্ট হয়ে যেত। পৃথিবী এত সুন্দর হতো না তার কাছে। প্রিয়জনেরা এত প্রিয় হতোনা। পারস্পরিক মধুর সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়তো। মানুষের প্রধান আকর্ষণ যে মানুষের ভালবাসা পাওয়া সেটার প্রয়োজন যেত ফুরিয়ে। মানুষ এক ছন্নছাড়া দিশেহারা ভবঘুরে প্রাণীতে পরিণত হতো। ‘আশরাফুল মখলুকাত’ হতে পারতো না। 

যা বলছিলাম তর্ক–বাগীশদের যুক্তির কথা। তারা বলেন আত্মরক্ষার প্রয়োজন কি? লাভ নেই। ডাক আসলেই চলে যাবে – ঠিক সময়ে। ঘর দরজার দরকার নেই। পুলিশ বাহিনী, সেনা বাহিনী, সীমান্ত রক্ষী বাহিনী সব অর্থহীন।  আত্মরক্ষার জন্য, দেশ রক্ষার জন্য অশ্ত্র - শস্ত্র তৈরী অর্থহীন। কারণ ভাগ্যে যখন মরণ লেখা আছে, তার বিরুদ্ধে তো যাওয়া যাবেনা। উজির নাজির রাজা বাদশাদের সশস্ত্র প্রহরী সংগে নিয়ে চলার কোন অর্থ নেই। অদৃষ্টের লিখন তারা খন্ডাতে পারবে না। কথায় বলে, ‘মৃত্যু আছে যেখানে, নাও ভাড়া করে যায় সেখানে।’ সুতরাং এ বিষয়টি বিধাতার হস্তে ন্যস্ত করাই বুদ্ধিমানের কাজ। উদ্বিগ্ন হয়ে লাভ নেই। হজরত ওমর (রাঃ), হজরত ওসমান (রাঃ), হজরত আলী (রাঃ)- এরা সকলেই ঘাতকের হাতে প্রাণ দিয়েছেন। বিধির লিখন ছিল বলেই। হযরত আলীর দুই পুত্র ইমাম হাসান,ইমাম হুসেইন যথাক্রমে বিষ প্রয়োগে এবং কুখ্যাত কারবালা মরু প্রান্তরে শত্রুর হাতে নিহত হয়েছিলেন। ভাগ্যে লেখা ছিল বলেই।  

এই যে মানুষের নিরন্তন আত্মরক্ষার প্রয়াস, তার প্রধান কারণ হচ্ছে মনুষ্য প্রাণ সর্বাপেক্ষা মূল্যবান। ‘মানব জনম সার/ এমন পাবেনা আর।’ মৃত্যু সামনে আছে বলেই বাঁচার বাসনা এত প্রবল। জন্ম মৃত্যুর মাঝখানের অংশটুকুই জীবন। এই জীবনটুকু যতখানি দীর্ঘায়িত করা যায়, এইই মানুষের চিরন্তন চাওয়া। আদম (আঃ) এর সময়  হতে কেয়ামতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা সমান থাকবে।

মৃত্যু কখন দরজার করাঘাত করবে জানিনা। তবুও ইচ্ছা করে মৃত্যু দূরে থাকুক – বিলম্বে দেখা দিক। পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ সব উপভোগ করি। সেইজন্য নিজেকে প্রতি মুহূর্তে সুরক্ষিত রাখতে সচেষ্ট হই। পরিবারের, সমাজের, দেশের সকলে ভাল  থাকি। ভালবাসার বন্ধনে সুখের সন্ধান করি, শান্তি লাভ করি, আনন্দ পাই, জীবন সার্থক করি, হিংসা – দ্বেষ ভুলে গিয়ে আনন্দের সেতু বন্ধন গড়ে তুলি। ‘গলায়ে গলায়ে বাসনার সোনা’ দিয়ে প্রতিদিন আমরা জীবনকে নিত্য নব নব আনন্দ সম্ভারে সাজিয়ে তুলবার প্রয়াস পাই।  

বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন। তা সত্বেও পৃথিবীতে কিছু লোক আছে যাদের অন্তর কোন না কারণে বেদনায়, যন্ত্রণায় কিংবা আঘাতে আঘাতে জর্জরিত। পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ সব তার কাছে ম্লান হয়ে গিয়েছে। জীবন তাদের নিবিড় ঘন আঁধারে আচ্ছন্ন। প্রিয়জন কিংবা সমাজ  তাকে দুঃখ  দিয়েছে। দিয়েছে চরম বঞ্চনা। তাদের কেউ হয়তো নক্ষত্রের পানে চেয়ে মৃত্যুকে আহ্বান জানায়। সে ভাবে মৃত্যুই একমাত্র শরণ, যে তার জীবনের জ্বালা জুড়াতে সক্ষম। মানুষের উপর তার আস্থা হারায়, ভালবাসার বন্ধন ছিন্ন হয়, সে বিদায় নিতে চায় অকালে, আত্ম হননের পথে। স্বেচ্ছায় বরণ করে মৃত্যুকে। পুনরায় সেই কথাই মনে পড়ে  - ‘এ ভাবেই লেখা ছিল তার মরণ।’  তাই আত্মহত্যার পথ তাকে বেছে নিতে হল।    

লোকে বলে, যে আত্মহত্যা করে তার জন্য শাস্তির বিধান কেন? শাস্তির বিধান ধর্মে আছে, দেশের আইনেও রয়েছে। কারণ মানুষের প্রাণের চাইতে মূল্যবান আর কিছু নেই। সেই অমূল্য সম্পদ এভাবে অপঘাতে, ইচ্ছাপূর্বক ইতি টানুক ত্যা বাঞ্ছনীয় নয়। প্রাণ হরণ পাপ, অপরাধ, তা পরের হোক আর নিজের হোক। সে হত্যাকারী। তবে নিজের প্রাণ হননের পর তাকে শাস্তি দেয়া যায় না। তবু যদি বেঁচে যায় তবে তাকে শাস্তি পেতে হয়। মরে যাওয়ার পরও সৎকারে স্বাভাবিক সম্মানজনক নিয়ম পালন করা হয় না। এটাও সেই মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদানের পর্যায়ে পড়ে। এই সুন্দর পৃথিবীতে আর ফিরে আসা যাবে না। সুতরাং একবারই মানুষের মানব জন্ম, দুর্লভ জন্ম, সার্থক হোক। 

মানুষের কাজ হলো বেঁচে থাকবার প্রয়াস চালানো। নিজে বাঁচবে, অন্যকে বাঁচতে সাহায্য করবে। ধরণীর ফুল, ফল, মাটি, জল, শস্য, নিসর্গ – সব উপভোগ করে ধন্য হবে। তারপর যখন মরণ আসবে তখন হাসিমুখে চলে যাবে। তখন যেন বলতে পারে আমার জন্ম সার্থক, জীবন ধন্য, মরণ  সুখের হলো। ‘মরণরে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান।’

‘যে মাটি হতে আমার উত্থান, সেই মাটিতেই আমার পতন, আবার সে মাটিতেই আমি মিশে যাব।’ সেই আমার সুখ, সেই আমার শান্তি।

সেই হাতখানি

  এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা ...