Friday, August 7, 2026

সেই হাতখানি

 

এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা মদিনা যেতে পারতাম। সুযোগ এলো। আমাদের আত্মীয়, আমাদের আত্মীয়  ড. আবু তাহের জানালেন, ‘ওমরাহ্‌ ভিসা দিচ্ছে। আপনারা এবার আসেন। ’  তিনি মক্কা শহরেই চাকুরী সুবাদে বসবাস করতেন।

প্রায় ছয় ঘন্টা আকাশযানে  ভ্রমণ করে জেদ্দা বিমান বন্দরে পৌঁছালাম। বন্দর সংলগ্ন এক বিশাল বিল্ডিং-এ প্রবেশ করে দেখি দীর্ঘ লাইন। বাঙ্গালী যাত্রীর সংখ্যা অধিক। একজন বললেন, ঐ যে ওমরাহ্‌ যাত্রীদের লাইন –সকলের পরিধানে ইহরামের পোশাক। সেখানে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হলো।  সামনে  চারটি কাউন্টার। সৌদি ছেলেরা যাত্রীদের পুলসিরাত পার হওয়ার ছাড়পত্র দিচ্ছে। গতি তাদের বেশ মন্থর। আমরা দীর্ঘ লাইনে। তবে আমি আমার স্বামীর পাশে দাঁড়ানো। একটু পর লক্ষ্য করলাম আমার সামনেই একজন  মহিলা তার সঙ্গীর পাশে আমার মতই দাঁড়িয়ে। একটু পর পর আমাকে দেখছেন। আমার ছিল আপাদমস্তক কালো বোরখা এবং হিজাবে আবৃত। তার ছিল কালো বোরখা এবং সাদা হিজাব। সালাম বিনিময় করে জিজ্ঞেস করলাম –where do you come from? 

বললেন, সাউথ আফ্রিকা। 

আমি বললাম, আমার দেশ বাংলাদেশ। নাম শুনেছেন কখনও? 

উনি বললেন, হ্যা শুনেছি। আমরা তো পাকিস্তানে ছিলাম। আমি আগে হজ্ব করে গিয়েছি। এবার এসেছি উমরাহ্‌ করতে।

আমি বললাম, আমরা এবারই প্রথম উমরাহ্‌ করতে এসেছি।

এরকম অল্প–স্বল্প বাক্য বিনিময়ের পর দেখি আমরা লাইনের অনেক পেছনে। তারপর হঠাত্ দেখি বাঁ দিকে একটু দূরে মহিলাদের একটি লাইন।  আমার পাসপোর্ট নিয়ে আমিও  গিয়ে ঐ লাইনে সামিল হই। সাথে সেই ভদ্রমহিলাকে ডাকলাম। তিনিও তার পাসপোর্ট নিয়ে আমার সঙ্গে দাঁড়ালেন। আমার টার্ন এলো ভেতরে ঢুকবার। ঘূর্ণায়মান নাতিউচ্চ গেইট অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। পাসপোর্টটি আমার হাত থেকে নিয়ে সৌদী ছেলে বললো, বেঙ্গালাদেশ? আমি সেই মহিলাকে ইশারায় ঢুকে পড়তে বললাম। আমাকে কাগজ দেওয়া হলো কাউন্টার থেকে। পথ নির্দিষ্ট করা আছে স্টিলের বার দিয়ে। এগিয়ে গেলাম পথ ধরে। পথপ্রান্তে কাগজটি জমা দিয়ে বেরিয়ে এলাম । সেই ভদ্রমহিলাও তার কাগজপত্র জমা দিলেন। আমার আর তাকে দেখবার সুযোগ হয়নি। বিস্তীর্ণ হলরুমের এক জায়গায় মালপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। আমি আমার বড় বাক্স, ছোট বাক্স কুড়িয়ে নিয়ে ট্রলিতে তুলে আবার কাউন্টারের একটু দূরে অপেক্ষা করতে থাকলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর আমার স্বামী মোহাম্মদ হারুন বের হয়ে এলেন। বিমান বন্দরে পুনরায় পাসপোর্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়ে নিতে আরো ঘন্টা খানেক সময় লাগলো।

তারপর আমরা পার্কিং এলাকার দিকে রওনা হই। সঙ্গে ছিলেন আমাদের আত্মীয়  ডা. আবু তাহের। তার গাড়ি অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। পার্কিং এলাকায় নামতেই কে যেন আমার হাত ধরে ফেললো। অবাক হয়ে দেখি সেই ভদ্রমহিলা, যিনি সাউথ আফ্রিকা থেকে এসেছেন। আনন্দে আমার ‘বক্ষ মাঝে চিত্ত আত্মহারা, নাচে রক্তধারা।’ দুজনে হাসতে লাগলাম। বললেন, ‘যাচ্ছেন?’

- হ্যা । মক্কা যাচ্ছি। আগামীকাল উমরাহ্‌  করবো। পরশু বিশ্রাম। তারপরের বুধবার মদিনা শরীফ যাবো। শুক্রবার দিন জুমার নামাজ পড়ে মক্কায় ফিরে আসবো। 

উৎসাহের  সঙ্গে বললেন, আমরাও মদিনায় যাবো। মসজিদে নব্বীতে জুমার নামাজ পড়বো। দেখা হবে আবার।

বললাম, ইনশাল্লাহ্‌, দেখা হবে। বলে হাতে আন্তরিকতার মৃদু চাপ দিয়ে হাতখানি ছেড়ে দিলাম। দ্রুত পায়ে সঙ্গীদের সঙ্গে সামিল হলাম। হাতখানি ছেড়ে দিয়ে কেন জানিনা অন্তরে একটু বেদনার অনুভূতির সঞ্চার হলো। একটু দেখা, দু’চারটি মামুলী কথা! এই তো! তার জন্য এতো মমতা? কি যেন কি হারাবার বেদনায় প্রাণটা আনচান করে উঠলো। ভাবনায় মগ্ন হলাম। মনে হলো এটাই মানুষের ধর্ম। একের অপরের জন্য সহমর্মিতা। মমতা হয়তো একেই বলে।  মানুষ এজন্যই আশরাফুল মখলুকাত। 

উমরাহ্‌ সম্পন্ন করে মদিনা শরীফে চলে  গেলাম। সেখানে দুদিন মসজিদে নব্বীতে নামাজ পড়লাম। নবীজীর  রওজা মোবারক জিয়ারত করলাম। কিন্তু সেই ভদ্রমহিলার দেখা আর পেলাম না। নামাজ ইবাদতে মগ্ন থাকার দরুণ মনেও পড়ে নাই। সেই  বিশাল জনসমুদ্রে কারও দর্শন লাভ করা এক দুর্লভ ঘটনা। 

মক্কায় ফিরে এসে আবারও উমরাহ্‌ করেছি। বিদায়ী তাওয়াফ করেছি। কিন্তু সেই অনামিকার সাক্ষাৎ লাভ আর হয়নি। দুঃখ আমার তার নামটিও জানা হয়নি। নামটি জানা থাকলে অন্ততঃ নাম ধরে তার কথা স্মরণ করতে পারতাম। নিজেকে বড় ক্ষুদ্র মনে হলো। কেন নামটি জিজ্ঞেস করিনি! তবুও সেই ক্ষণিকের ভাল লাগা মানুষটির কথা ঘুরে ফিরে স্মৃতিতে আসে। হাসি মাখা মুখখানি মনে পড়ে। আর একটিবার যদি দেখা পেতাম, নাম ঠিকানা জেনে নিতাম। নাম ধরে চিন্তা করতাম। তার কথা ভাবতাম। ঠিকানা ধরে যোগাযোগ করতাম। এই খেদ আমার কোনদিন ঘুচবে না।  এই মনোবেদনা আমাকে চিরকাল বয়ে বেড়াতে হবে। তিনি তার প্রস্ফুটিত হৃদয় কুসুমের সুবাসটুকু নামহীন, পরিচয়হীন আমার মতো একজনকে দিয়ে ঋণী করে রাখলেন। তাঁর হাতের পরশখানি ভুলতে পারিনা। তাই আমার স্মৃতির বীণায় আজও বাজে সেই প্রথম এবং শেষ দেখার রেশ।


No comments:

Post a Comment

সেই হাতখানি

  এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা ...