নদীর স্রোতের মত মানুষের জীবন। মহাকালের পথে সতত বহমান, সঞ্চরমান। মানুষের জন্ম হয় বিধাতার ইচ্ছায়। শুরু হয় যাত্রা। ব্যক্তি পর্যায়ে তার যাত্রার বিরতি আসে। কিন্তু মহাকালের যাত্রায় নিত্য নব নব যাত্রী এসে সেই যাত্রায় যোগদান করে। এ যাত্রা অগণিত মানুষের যাত্রা চলছে তো চলছে, যেন কাফেলা। তীর্থ যাত্রীর দল। মানুষ মরে যায়, চলে যায়, না জানে কোথায়! তবুও চলতে থাকে বিয়ামহীন। তাতে কাফেলার কলেবর বিন্দুমাত্র হ্রাস পায় না। এই চলার পথের পথিকেরা কেউ সুস্থ, সবল, কেউ অবলা দুর্বল, অসুস্থ। তবুও বাধ্য হয়ে তাকে চলতে হচ্ছে। আর তো উপায় নেই, আর তো পথ নেই।
মানুষের জীবনে ঘাত –প্রতিঘাত আসে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জীবন হয় জর্জরিত। ক্রমাগত জীবন সংগ্রাম জীবনকে করে পর্যদুস্ত। মানুষের মধ্যে ষড়রিপু বাস করে। তার মধ্যে আছে মাৎসর্য নামে এক রিপু। সেজন্য দুর্বল যারা, দরিদ্র্য যারা, তারা সবলের হস্তে হয় নিপীড়িত, নির্যাতিত। অনাদিকাল হতে আজ পর্যন্ত এবং ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া চলে আসছে, চলতে থাকবে।
এই যাত্রী দল ‘দুর্গম গিরি, কান্তার মরু’ পার হয়ে চলতে থাকে সমুখ পানে। পেছনে ফেরার উপায় নেই। যাত্রীদের ধারণা পথ চলায় যত শ্রম, যত ক্লেশ, ততই পূণ্য অর্জন। পূণ্য অর্জন যদি নাই হবে, পহ চলা যে বৃথা হবে। অর্জনের ঝুলি থাকবে শূন্যতায় ভরা। সময়ের পথ চলতে চলতে অনেকে অবসাদ গ্রস্ত হয়। মিছিলের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনা। কারো গতি হয় শ্লথ, কেউ পড়ে যায়। কেউ আর উঠে দাঁড়াতে পারে না।
যাত্রীদের কাউ হয়তো তার সুহৃদের জন্য ক্ষণিক দাঁড়ায়। কিন্তু স্রোতের টানে তিষ্ঠাতে পারেনা। ‘মোছাফির মোছ রে আঁখিজল, ফিরে চল আপনারে নিয়া।’ চোখের জল মুছে পথ চলতে থাকে সে। পথের ধূলিতে কে পড়ে রইল, কে চলে গেল চিরতরে, তার খোঁজ রাখতে পারেনা।
পুরাতন চলে যায়। নতুন আসে। বিশ্ব বিধাতা সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষার জন্য এ বিধান তৈরী করেছেন। বিধাতার সংসারে সকলে তার সৃষ্ট জীব। সেখানে মাতা নেই, পিতা নেই, পুত্র নেই, কন্যা নেই। সকলেই আল্লাহ্র বান্দা। সৃষ্টি লীলার অংশ। যাদেরকে আমরা মাতা –পিতা বলি তাদের মাধ্যমে তিনি তার সৃষ্টির ধারা বজায় রাখেন। সন্তান প্রকৃত পক্ষে পিতামাতার নিকট আল্লাহ্ তায়ালার আমানত। মা –বাবা মমতার বন্ধন দিয়ে সন্তানকে আল্লাহ্ তায়ালার অনুগত বান্দা হিসাবে গড়ে তোলেন। কি সমতলে, কি পাহাড় –পর্বতের পাদদেশে মানুষের সাধনা হয়ে দাঁড়ায় সন্তানকে সুশীল মানুষ হিসাবে গড়ে তুলবার। পরবর্তীকালে এই ছেলেমেয়েরাই ভবিষ্যতের মানুষ জন্ম দিয়ে যাবে বংশানুক্রমে। তারাও এ তীর্থ যাত্রীদের কাফেলায় শরীক হবে। সারা পৃথিবী জুড়ে এই কাফেলা চলতে থাকবে নিরবচ্ছিন্ন, নিরলস গতিতে। তারা কারও জন্য অপেক্ষা করবে না। কারো জন্য থেমে থাকবে না।‘Let the dog bark and the caravan pass.’এ প্রসঙ্গে কাহলিল জিবরান তাঁর The Prophet গ্রন্থে বলেছেন, ‘তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়। তারা প্রবাহিত জীবনের আকুল প্রত্যাশার পুত্র –কন্যা। তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, কিন্তু তোমাদের ভেতর জন্ম নেয় না। তারা যদিও তোমাদের সাথে থাকে, তারা তোমার সম্পদ নয়।’ পিতা মাতার মাধ্যমে তারা আসে, তারা চলে যায়। তাদের বংশধরেরা একই পথ অনুসরণ করে তাদের প্রতিনিধি রেখে যায়। তাদেরো সেই একি পরিণতি। ওমর খৈয়াম তাঁর রুবাইয়াতের এক জায়গায় বলেছেন, ‘যদি নিয়ে নাও প্রভু তোমার বান্দাকে, তবে সৃষ্টি করবার কি প্রয়োজন ছিল? ’ বংশ পরম্পরায় সকল বান্দা মৃত্যুর অধীন। তবে জন্মানো কেন? বিশ্ব বিধাতার লীলা খেলা অংশ মানুষের জন্ম –মৃত্যু। আর তা একজন ব্যক্তি মানুষের সমগ্র জীবন।
জীবনে কাছে এবং দূরে বহু মানুষ দেখেছি। তাদের জীবনের সুখের কথা, দুখের কথা শুনেছি। হাতে হাত রেখেছি, কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়েছি, অনেক পথ হেঁটেছি একসাথে, ফুল তুলেছি, গান গেয়েছি। পথ চলতে চলতে একজন, একজন, করে কে যে কোথায় হারিয়ে গেল! জানতে পারিনি। যারা একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তারা অনেকে আজ নেই।
কোথায় তারা?
যেদিকে তাকাই কেবল নতুন মুখ, অচেনা, নামহীন, পরিচয়হীন জনতা। তবুও আঁখি কেবল খুঁজে ফেরে সেই পুরাতন সহযাত্রীদের মুখ। যদি কখনও দু’একজনের সাক্ষাৎ পাই, একে অপরকে শুধাই কোথায় তারা? সেই প্রশ্নের উত্তরে ওই সমুখের গোধূলি লগ্নের সন্ধ্যাতারার দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে বলে, নাই নাই সে পথিক নাই। ঐ আকাশের তারাদের মাঝে ভীড় করে আছে। রেখে গেছে কেবল পদচিহ্ন – তাদের কীর্তি জীবনের বালুকা বেলায়।
এই অভিযাত্রীদের মিছিল, এই কাফেলা তার পরিপূর্ণ দলবল নিয়ে ধীরে ধীরে সমুদ্র স্রোতের ন্যায় চলতে থাকে। কে গেলো, কে এলো; তার খোঁজ রাখে না। প্রতিদিন কত মানুষ –এই কাফেলা যাত্রী – মরে গিয়ে পথের ধূলায় লীণ হয়ে যাচ্ছে! আবার কতজনা জন্মগ্রহন করে এই কাফেলায় শরীক হচ্ছে। এটাই নিয়ম। এই দীর্ঘ মিছিলের যেমন শুরু নেই, তেমন শেষও নেই।
কোন্ সাগরের তীরে মানুষের তীর্থ তা সে জানে না। তবুও পুণ্য লাভের আশায় মানুষ ঐ তীর্থ যাত্রী পথিকের দলে ভিড়ে যায়। তারপর একদিন বৃক্ষের হরিদ্রাভ পত্রের ন্যায়, পরিপক্ক ফলের ন্যায়, বৃন্ত হতে বিচ্যুত হয়ে ভূতলে পতিত হয়। সহযাত্রীর নয়ন ভরে উঠে জলে। ‘যেতে নাহি দেব –তবু চলে যায় ।’ আর আসে নাকো ফিরে। এভাবেই চলবে। একদল এই কাফেলায় যোগদান করবে, অন্যদল ঝরে পড়বে। কাফেলায় যাত্রীরা কেউ চিরস্থায়ী নয়। কেউ আসে, কেউ যায়। কাফেলার কলেবর ঠিক থাকে। সে চলবে চিরকাল।
‘এ পথ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়।’ থেমে যাবার পথও নয়। জীবনের যা কিছু অর্জন, তার কষ্টার্জিত সম্পদ, যক্ষের মত বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল, সব ছেড়ে সে চলে যায়। ক্লান্ত, শ্রান্ত পথিক আক্ষেপ করে বলে,
‘হায়রে হৃদয়, তোমার সঞ্চয়,
দিনান্তে, নিশান্তে, শুধু পথপ্রান্তে,
ফেলে যেতে হয়।
নাই, নাই, নাই যে সময়।’
............
১১.১.১১