Sunday, May 31, 2026

শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশে মায়ের ভূমিকা




 

এই আমি


 জীবন অর্থই প্রানের স্পন্দন। প্রাণ যতদিন দেহের আশ্রয়ে থাকে, ততদিনই জীবন হিসেবে গণ্য হয়। দেহকে প্রাসাদ বলতে পারি, মন্দির বলতে পারি, কারাগার বলতে পারি, খাঁচাও বলতে পারি। বলাটা নির্ভর করে কখন আত্মার সঙ্গে দেহের কি সম্পর্ক তার উপরে। আত্মার সঙ্গে দেহের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ।দেহ আঘাত পেলে আত্মা হয় ব্যথিত। আত্মাকে অপমান করলে দেহ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে। আত্মাকে সম্মান প্রদর্শন করলে দেহ তার চেহারায় অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। দেহ মন দুটিতে মিলেই একটি যন্ত্র। দেহ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর বড় হতে থাকে । সেই সঙ্গে বড় হতে থাকে আত্মার ধারণ ক্ষমতা। দেহ শারিরীক পূর্ণতা লাভ করে। কিন্তু আত্মার পূর্ণতা লাভ হয় না। অর্থাৎ দেহের বৃদ্ধির প্রাপ্তি শেষ হয়, আত্মার বিকাশ লাভ শেষ হয় না। বরং উত্তরোত্তর অসীম জ্ঞানের ভান্ডারে আত্মা প্রবেশের প্রয়াস পায়। যে যেমন লোক হোক, যেখানে বাস করুক না কেন, তার জ্ঞান বাড়তেই থাকে। দেহের খাঁচা একদিন জীর্ণ হয়। দেহের দেখাদেখি আত্মা কিন্তু জীর্ণ হয় না। তখনই শরীরের সঙ্গে বাধে তার বিরোধ। তাদের সম্পর্ক নষ্ট হয়। 

রোগগ্রস্ত বা জরাগ্রস্ত শরীরে আত্মা অশান্ত হয়। তখন খাঁচা ছেড়ে পাখিটি কোথায় যেন উধাও হতে চায়। দেহ যখন অথর্ব, অকর্মণ্য, জরাগ্রস্ত হয়, তখন আত্মা নির্যাতিত হতে থাকে। আত্মাকে ধারণ করবার ক্ষমতা দেহের থাকে না। আত্মার উন্নতি বা বিকাশের পথ হয় রুদ্ধ। নিপীড়িত আত্মা দেহের বন্ধন ছিন্ন করতে চায়। চায় মুক্ত বিহংগের মত দেহের কয়েদখানা থেকে মুক্তি পেতে। তাই একদিন সে চির পরিচিত দেহ ত্যাগ করে কোথায় যেন কোন নিঃসীম নীলিমায় হারিয়ে যায়। যে শরীর তার যৌবনের রাজপ্রাসাদ ছিল, প্রৌঢ় বয়সের মন্দির ছিল, তা ত্যাগ করতে দ্বিধা করে না । সে যেন এক অচীন পাখি। খাঁচা ছেড়ে অচীন পুরে চলে যায়। প্রাণহীন দেহ পড়ে থাকে। আর কোনদিন উঠতে পারে না। অন্তহীন কালের জন্য সে শয্যা পাতে। চিরশয্যায় সে শায়িত হয়। দেহ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, লয়প্রাপ্ত হয়। মৃত্তিকায় রূপান্তরিত হয়। তার যা কিছু দৈহিক সম্পদ তা মাটিকে উপহার দেয়। মাটি হয়তো তার তৈল সম্পদ উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করে। 

প্রাণ পাখিটি খোঁজ রাখে না তার দেহ মন্দিরটির। সে যে কতকাল এই শরীরে বসবাস করে গেল, তার জন্য তার কোন মমতা নেই। বড় নিষ্ঠুর সে। বড়ই অকৃতজ্ঞ। ‘আর্শী নগরের পড়শী’ আর পেছন ফিরে তাকায় না। অন্য কোথাও, অন্য কোন সোনার খাঁচার বুলবুলি হয়ে সে হয়তো গান করে।

আমি কে, আমি জানি না। ‘আমি’ বলতে আমার অস্তিত্বকেই বুঝি। যাকে আমি হস্ত দ্বারা স্পর্শ করতে পারি, আর্শীতে অবলোকন করতে পারি, উপলব্ধি করতে পারি আমার শ্বাস প্রশ্বাসের উত্থান পতনে, হৃদয়ের স্পন্দনে। এই আমি চলে যাব এই সুন্দর ভুবন ছেড়ে।  আর আসবো না। আর চেনা মহলে একটি বারও ফিরে গিয়ে বলা হবে না এই যে আমি এসেছি, তোমাদের কাছে, তোমাদের কেউ। এই আমি নাম সর্বস্ব প্রানহীন দেহ মাত্র। নামটি দেহের। প্রাণের নয়।একটি মানুষকে আলাদা করে চিহ্নিত করার জন্য নাম। তাও পরিচিত মহলে। অপরিচিত পরিবেশে তার নামটিরও কোন দাম নেই। তবুও দেহের –ই  নাম থাকে। আত্মার নাম থাকে না। দেহের খাঁচায় যে বুলবুলি বাস করে সে নামহীন, গোত্রহীন, ধর্মহীন, বর্ণহীন।

এই নামটি সংগ্রহ করে আমি ঘুমিয়ে থাকবো কবর গুহায় অনন্তকাল।পরিপাটি নিরাপদ কবর। দস্যু তস্করের ভয় নেই, ক্ষুধা তৃষ্ণার  উপদ্রব নেই, আশা নিরাশার দোলা নেই। শুধু থাকবে আমার অস্তিত্বের মিশ্রণে মৃত্তিকা। হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীর পৃষ্ঠে আজকের মত আসবে বর্ষা, আসবে শীত, গ্রীষ্ম পর্যায়ক্রমে। আমার শেষ আবাসস্থলে কত বারিধারা আঘাত হানবে।

কত ঝড় ঝঞ্ঝার দাপটে ধরণী প্রকম্পিত হবে। কত বন্যা আসবে আমার এই বাংলায়। কত অরি, কত মারি, মানবগোষ্ঠীর প্রাণ সংহার করবে। তারা এসে যোগদান করবে শুভ্র কাফনের সমাজে। প্রকৃতির মঞ্চে নামের ভূমিকায় কাজ করে যাবে মানুষ চিরকাল। কেবল আমারই আর উঠে আসা হবে না আগের মত। দু’চোখ ভরে আর দেখা হবে না রূপসী বাংলাকে। আমার নামও মানুষ ভুলে যাবে একদিন। সমাধিও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। হয়তো তার উপর মানুষ একদিন আবাদ করবে সুস্বাদু ফলবান বৃক্ষ অথবা তুষযুক্ত শস্যদানা। কিম্বা তা হবে মানুষের আবাসিক এলাকা। গড়ে উঠবে সুদৃশ্য ইমারতরাজী অথবা রাজপ্রাসাদ। হয়তো বা আমার সমাধি স্থলে রচিত হবে কারো বাসর। সূচিত হবে নতুন জীবন, অথবা পাতবে কেউ মৃত্যু শয্যা। এমনও হতে পারে আবার কেউ হয়তো এখানেই শেষ শয্যা গ্রহণ করবে। কোন মালি হয়তো রচনা করবে ফুলের বাগান আমার সমাধিতে।‘মোর কবরে ফুটবে যে ফুল। না জানি তা কার তরে।’ 

চির বিস্মরণের পাড়ে চলে যাব আমি। কেউ বলবে না এই বাড়িতে, এই গৃহকোণে, এই নামে কেউ একজন ছিল। হাসি কান্না দিয়ে ভরে রেখেছিল এই নিভৃত গৃহকোন। এই প্রাঙ্গন একদিন কারো পদচারণায় মুখরিত ছিল। এই আমার পরিচর্যায় বৃদ্ধি পেয়েছিল ঐ  বৃক্ষ, ঐ তরুলতা, যার শীতল ছায়া, সুমিষ্ট ফল, আমার স্নেহ মাখা উপহার হয়ে তাদেরকে তুষ্ট করছে। পার হয়ে যাবে শত শত বছর। ভুলে যাবে পরবর্তী বংশধরগণ আমার নাম। এই নামে কাউকে তারা চিনবে না, জানবে না। আমার কর্মফল পড়ে থাকবে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অনন্ত কালের গর্ভে আমি বিলীন হয়ে যাব। আর কোনদিন কোন কালে আমার পদচিহ্ন পড়বে না এই বাটে। আমার আত্মা অর্থাৎ এই আমি বাকহীন, শক্তিহীন পদ্মা, যমুনা বিধৌত বঙ্গ ভূমিতে আরো একটিবার দেহ ধারণের তৃষ্ণা নিয়ে বাতাসের সঙ্গে ঘুরে বেড়াব। 

১লা এপ্রিল, ১৯৯৪

ড্রাম ফ্যাক্টরি, ঢাকা ১২০৬.

ডুলি – প্রাচীন কালের বাহন

 

১৯৫৩ সাল। 

গ্রাম বাংলার গভীরে শিক্ষার আলো প্রবেশ করে নাই। লেখাপড়ার জন্য শহরে যেতে হত। শহরে যাবার পথ ছিল মেঠো পথ। বাড়ী থেকে রেল স্টেশন পাঁচ মাইল দূরে। হাঁটা একেবারেই সম্ভব নয়। পায়ে হাঁটা অপ্রশস্ত রাস্তা। তাই ডুলিতে চড়ে খুব ভোরে রওনা হয়ে ‘ধলা’ রেল স্টেশনে পৌঁছাতে হত। গন্তব্য বিদ্যাময়ী ইংরেজি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়,ময়নসিংহ। দেশের সেরা স্কুল যার ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে আমার প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন শুরু। 

আমাদের অঞ্চলে আমার পিতা –ই  একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন। কলিকাতা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯১৯ সালে এন্ট্রাস পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন যে বছরে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন সে বছরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আমার পিতার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা পাশ করার ফলে এলাকায় বিপুল সাড়া পড়ে যায়। একটি অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে একটি আলোর শিখা যেন প্রজ্জ্বলিত হয়। তিনি নান্দিনা মহারাণী হেমন্ত কুমারী উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। নান্দিনার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ও শিক্ষকদের  সঙ্গে তিনিও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি একজন সুশিক্ষিত, তেজস্বী পুরুষ ছিলেন। নারী শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। তিনি গ্রামে আমাদের বাড়ি সংলগ্ন স্থানে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। আমার হাতে খড়ি আমার মায়ের কাছে। বাড়িতে যেহেতু লেখা পড়ার প্রচলন ছিল, সওগাত, মাসিক মোহাম্মদি, বেগম –এসব ম্যাগাজিন আমাদের বাড়িতে আসতো। আমার জন্য ছিল নানারকম বই। বাংলা, ইংরেজী, ঊর্দু, আরবী, ধারাপাত বই আরও অনেক আমার উপযোগী বই। মক্তবে আমার পড়াশুনা করার মত কিছু ছিলনা। সেজন্য মৌলবী (শিক্ষক) সাহেবের নির্দেশে লম্বা ঘোমটা টানা আট, নয় বছর বয়সের মেয়েদেরকে আমি পড়াতাম। শিক্ষক যেহেতু পুরুষ সেজন্য আমাকেই তাদেরকে পড়াতে হত। আমার পিতার উদ্দেশ্য ছিল আমাকে দেশের সেরা স্কুলে পড়াবেন। সেটি ছিল বিদ্যাময়ী স্কুল, ময়মনসিংহ। ১২ বৎসর না হলে হোস্টেলে সীট পাওয়া যায় না। তিনি তার আগেই ষষ্ঠ শ্রেণীতে আমার ভর্তির ব্যবস্থা করে ফেলেন। আমিই প্রথম ঐ অঞ্চলে, এই ডুলিতে চড়ে শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি । তখন মেয়েদের জন্য ছিল বাঁশের তৈরি ডুলি। স্থানীয় ভাষায় খাট। উৎসবের জন্য ছিল পালকি। কাঠের তৈরী, নকশাদার,ভারী,বড় আকারের। ঘাড়ে বহন করবার জন্য কাঠের দন্ড – কারুকাজ করা। ছয়জন বেহারা বহন করত। ডুলি বহন করতো দুই বেহারা।  ডুলি ছিল বাঁশের তৈরী চারকোণার একটি খাঁচা। যথেষ্ট শক্ত। ভেতরে একজন মানুষ সোজা হয়ে বসতে পারে। তার উপরিভাগে একটি শক্ত মোটা বাঁশ,বেশ লম্বা,যা কিনা বেশ শক্ত করে ঐ খাঁচাটিতে বাঁধা আছে। ছিঁড়ে  পড়ে যাবার কোন সম্ভাবনা নেই। বাহনটি ছিল মূলতঃ মেয়েদের জন্য। মহিলারা এত পথ হাঁটতে পারেনা। কারণ তাদের কোলে থাকে শিশু এবং পর্দা রক্ষারও একটি ব্যাপার আছে। ডুলি একটি শাড়ি বা অন্য যে কোন কাপড় দিয়ে ঘেরা থাকতো। যাত্রী মহিলাটির সঙ্গী বা প্রহরীর পা দু’খানাই সম্বল। বেহারাদের সঙ্গে সে দ্রুত পদসঞ্চারণে পথ চলতো। 

বেহারা, যারা ডুলি বা পালকি বহন করতো তাদেরকে আমরা স্থানীয় ভাষায় ‘মাড়োয়া’ বলতাম। বেহারারা ছিল উড়িয়া। হিন্দি –উর্দু মিশ্রণে একরকম বিচিত্র সুরে কথা বলতো। তাদের গাত্রবর্ণ কৃষ্ণবর্ণও নয়,ফর্সাও নয়। বেশ উঁচা লম্বা গড়ন। মালকোঁচা দেওয়া ধুতি খাটো করে পরা। তাদের সঙ্গে কখনও তাদের পরিবার দেখি নাই। সম্ভবতঃ তারা নিজেদের দেশ হিন্দুস্থানে নিজেদের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতো। আমাদের এদিকে তারা সাধারণতঃ ধনী বাড়ির দিঘির চওড়া পাড়ে ঘর তৈরী করে বসবাস করতো। তারা সবসময়ে দলবদ্ধ হয়ে বাস করতো। অনেকে অনেক সময়ে হাট বাজারের উপকন্ঠে আশ্রয় কেন্দ্র তৈরী করে থাকতো। তাদের দলে একজন সর্দার থাকতো। আমাদের বাড়ির কাছের দলের সর্দারের নাম ছিল ‘আঁউতার’। ছাতু ছিল তাদের প্রিয় খাদ্য। ভাত, রুটিও খেত। আমরা বাঙালীরা সেই সময়ে আটার রুটি চিনতাম না। শুকনো তামাক পাতা হাতের তালুতে কচলিয়ে পাউডার করে মুখের ভেতরে মাড়ির ফাঁকে দিয়ে রাখত। সেটাকে বলা হত ‘খইনি।’ অবসরে বৃক্ষ ছায়ায় বসে তারা খইনি বানাত। কোন সঙ্গী সাথী আসলে তারা তদের নিজেদের ভাষায় জিজ্ঞেস করতো, 

'কা  -হো? (কি কর?) 

খইনি খা –ল –বা ? (খইনি খাবা?)

সওয়ারি বহন করাই ছিল বেহারা বা মাউরাদের একমাত্র কাজ। গ্রাম –গ্রামান্তরে তারা সারাদিন সাওয়ারী বহন করতো। যাত্রী অবশ্যই মহিলা। ডুলি একাধিক যাত্রী বহন করবার উপযুক্ত বাহন নয়। তবে পালকিতে দু’জন বসতে পারতো,যেমন বর –কনে। সেক্ষেত্রে ছয়জন বেহারা থাকতো। হাতে লাঠি। স্কন্ধে গামছা। বেহারাদের পারশ্রমিক ছিল শুকনো খাবার চাউল,চিড়া,মুড়ি,গুড়।   

চলার পথে দ্রুত পদচারনার সাথে সাথে বেহারারা একরকম শব্দ করতো –হুঁম্‌, হুঁম্‌, হুঁম,... একই তালে, একই ছন্দে । দুই বেহারা এগিয়ে চলতো একই তালে একই সুরে। হয়তো এতে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পেত। ভারি বস্তু বহন করবার সময় একটু দৌড়ের প্রয়োজন হয়। তাতে মাল বহন করা এবং গন্তব্যে পৌঁছা সহজতর হয়।

স্টেশনে পৌঁছালে ঝিক ঝিক শব্দ করে রেলগাড়ী আসতো। বেহারাদের পায়ের গতি বৃদ্ধি পেত। আমি তখন ছোট একজন সওয়ারি। দুই বেহারা নৃত্যের তালে তালে অপেক্ষাকৃত কম সময়ের মধ্যে ধলা স্টেশনের নিকটবর্তী হত। একদিকে মায়ের জন্য কান্না, ছায়া সুনিবিড় গ্রামের জন্য বেদনা বোধ, অন্যদিকে পথের পাঁচালীর অপু দুর্গার মত রেলগাড়ি দেখার কৌতূহল আমাকে আন্দোলিত করত। রেলগাড়ি গফরগাঁও স্টেশন ছেড়ে আসার পর পরেই তার হুইসেল এবং শব্দ শোনা যেত। রেল লাইনের ওপারে স্টেশন। ট্রেনের ভারে রেল লাইনেও এক রকম কম্পন অনুভূত হত। আমার বাহন ডুলিও এসে থামতো। এসব স্টেশনে ট্রেন কখনও পূর্ণ বিরতি নেয় না। গতি কম করে মাত্র। আমার ভাইয়েরা আমাকে ডুলি থেকে টেনে বের করে ট্রেনের ‘জেনানা’লেখা কামরায় ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিত। বেহারা, ডুলি আবৃত করে রাখা শাড়িটি খুলে দ্রুত কামরার জানালা দিয়ে ভিতরে ছুঁড়ে দিত। তারপর আমার ভাইয়েরা দ্রুত পাশের কামরায় উঠে পড়তেন ট্রাঙ্ক, স্যুটকেস, বেডিং নিয়ে। দুই বেহারাকে আট আনা অর্থাৎ ৫০ পয়সা দিতেন। কুলিকে দিতেন ২৫ পয়সা। ট্রেনের গতি বৃদ্ধি পেত। ট্রেনের কামরায় মাত্র কয়েকজন যাত্রী থাকত –অবশ্যই মহিলা। ব্যক্তিগত গল্পে তাদের সময় কেটে যেত, যেন তারা কত কালের পরিচিত। গল্প গুজব, পান কিমাম খাওয়ার আদান প্রদানে যত ব্যক্তিগত, পারিবারিক – সব গল্প চলতে থাকতো। আমি রেলগাড়ির ভেতরের চেহারা দেখতাম, আরো দেখতাম বাইরের সব গাছ –পালা, মাঠ –ঘাট, ক্ষেত –খামার উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছে। দেখে স্তম্ভিত হতাম। কি কারণে উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছে তার কোন কারণ বোধগম্য হতো না। 

ডুলি প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলতে হয়। আমার আম্মা তাঁর ছোট বেলায় লাখ্‌নৌ-তে থাকতেন তাঁর ভাইদের সঙ্গে। তিনি বলেছেন,লাখ্‌নৌ শহরের অলিগলি ভরা ছিল  ডুলিতে। এখনকার সময়ে আমাদের দেশের রিকশার মত। যার যখন দরকার ডুলিকে ডেকে নিত এই বলে,'ও ডোলি ওয়ালা,ইধার আও।'ধনী লোকেরা ঘোড়ার গাড়িতে যাতায়াত করতেন। তখন সময় ১৯২০ থেকে ১৯২৬ সাল। অন্য কোন যানবাহন সে সময়ে ওনাদের চোখে পড়েনি। আজকের এই একবিংশ শতাব্দী থেকে সেই সময় কত দূরে!

...............

দাসপ্রথা উচ্ছেদ হয়েছে কি?

 দাস প্রথা একটি প্রাচীন প্রথা। সেই সুদূর অতীত কাল থেকেই যারা স্বচ্ছল মানুষ, তারা সম্পদহীন মানুষের সেবা গ্রহণ করবার নিমিত্তে তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখতো। শুধু তাই নয়, গরু ছাগলের মতো তাদেরকে, খোঁয়াড়ে রাখা হতো এবং শৃংখলিত অবস্থায় বাজারে বিক্রি করা হত। ক্রেতাগণ তাদের দাঁত দেখে, চোখ দেখে, হস্তপদ ঠিক আছে কিনা, অসুখ –বিসুখ আছে কিনা এইসব পরীক্ষা করে দরদাম করে ক্রয় করে বাড়িতে নিয়ে যেত। এরাই ক্রীতদাস। বংশ পরম্পরায় এই সকল দাসেরা অহর্নিশি তাদের মালিকদের খেদমতে নিয়োজিত থাকতো। সামান্য ত্রুটি –বিচ্যুতিতে তাদেরকে চাবুক দিয়ে বেদম প্রহার করতো। তাদের কোন বিশ্রাম ছিল না। নূন্যতম মানুষের মর্যাদা দেওয়া হতনা। জীবন্ত মানুষের অঙ্গ –প্রত্যঙ্গ কেটে ভিতরে কেমন আছে তা দেখতে দ্বিধা করতো না। হজরত রাবেয়া বসরী তার উদাহরণ।

সুদূর আফ্রিকা (কৃষ্ণ মহাদেশ/Dark continent) থেকে চতুর মার্কিনীরা কালো মানুষদেরকে ধরে নিয়ে যেত জাহাজ বোঝাই করে। ফাঁদ পেতে তাদেরকে ধরা হতো। এমনকি পশু পাখির মত জাল ফেলে  তাদেরকে ধরা হত। এটা একটা ব্যবসা ছিল তখনকার দিনে। 

দি রুটস্‌ ছবিটি দেখলে দাস প্রথার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ধনী ব্যক্তিরা দাসদের ঘাড়ে পা রেখে, তাদেরকে অত্যাচারে জর্জরিত করে নিজেরা আরামে, আয়াশে দিন কাটাতো। ক্রীতদাসরা বংশ পরম্পরায় তাদের সেবা করতো।

আমেরিকার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন একজন মহামানব ছিলেন। মানবতার এই অপমান, অমর্যাদা তার অন্তরকে ব্যথিত করে। তিনি আন্দোলনে নামেন। শেষে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ বাঁধে। প্রচন্ড যুদ্ধ হয় ক্রীতদাস প্রথার পক্ষে ও বিপক্ষে। তারপর গেটিসবার্গ এড্রেসে –১৮৬৩ সালের ১লা জানুয়ারি তিনি ঘোষণা করেন যে ক্রীতদাস রূপে যারা বন্দী রয়েছে, তারা এখন থেকে মুক্ত, স্বাধীন।

এতে ধনী সাদা মানুষেরা ক্রুদ্ধ হল। তাদের অন্তর থেকে কালো মানুষের শরীরের কালি কিছুতেই দূর হলো না। কৃষঙ্গরা তাদের দৃষ্টিতে কালো এবং ঘৃণ্যই রয়ে গেল। 

দাস প্রথা আজ নেই। বাজারে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য খোঁয়াড় নেই, ক্রয় বিক্রয় নেই। কিন্তু বাস্তবে প্রথা না থাক, দাসত্ব উচ্ছেদ হয় নাই। শ্রেণী প্রথা অর্থাৎ ধনী দরিদ্রের পার্থক্য অতিশয় প্রকটভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে দরিদ্রের সেবা গ্রহনের প্রচলন খুবই আছে। স্বল্প মূল্যে তাদের শ্রম ক্রয় করে ধনী ব্যক্তিরা। সেই শ্রমলব্ধ ফসল বা উৎপাদিত পণ্য বা দ্রব্যাদি অধিক মূল্যে বিক্রি করে ধনীরা আরো ধনবান হয়। শ্রমদাতাগণ শ্রমিক নাম নিয়ে জীবন ধারণের কঠোর চেষ্টায় লিপ্ত হয়। 

কোথায় সভ্যতা, কোথায় আলো, কোথায় উন্নতি, তারা তার খোঁজ পায় না। রাজপথের সোডিয়াম বাতি আর হাজার গাড়ির বহর দেখে তারা অবাক বিস্ময়ে। রাত্রির কয়েক ঘণ্টা বিরতি বাদে বাকি সময়টুকু ওরা কারখানায় তথাকথিত ‘পোশাক শিল্পের’ ফ্যাক্টরিতে বন্দী থাকে। অনেক কারখানায় রাতেও ছুটি নেই। ওভার টাইম খাটায়। কিন্তু পারিশ্রমিক বাকী থাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। শ্রমিকদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে না মালিকেরা। অশালীন সম্বোধন, অশ্লীল শব্দাবলীর ব্যবহার, এমনকি মারপিট করতেও দ্বিধা করে না। আর ছাটাইয়ের ভয়তো আছেই। যে বেতন পায় তা দিয়ে খেয়ে পরে বেঁচে থাকা বলে না। তাই তাদেরকে মানবেতর জীবন যাপনের গ্লানি বহন করে চলতে হয়। 

সাভারে মাত্র সেদিন ২৪শে এপ্রিল পোশাক কারখানায় হিরোশিমা, নাগাসাকির মত মুহূর্তে যে ঘটনা ঘটে গেল, তা সকলেই অবগত আছেন। এসব ঘটনা দাস প্রথাকে হার মানায়। দফায় দফায় অগ্নিকান্ড, বিল্ডিং ধসে যাওয়া নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা এ দেশে। এইসব শ্রমিকদের প্রাণ রক্ষায় বা স্বার্থ রক্ষায় কোন আইন নেই। মালিকেরা ধরা ছোঁয়ার  বাইরে থেকে যায়। কারণ তারা জানে কিছুদিন পরে এইসব মর্মান্তিক ঘটনার কথা মানুষ ভুলে যাবে। তাই তারা অনেকেই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর ভিতরে সন্ধ্যার পর জরুরী মিটিং করার নামে বসে বসে আনন্দ, আড্ডায় মত্ত হয়, এবং কি করে আরো বেশী টাকা কামাই করতে পারবে এইসব হতদরিদ্র মানুষের রক্ত শোষণের বিনিময়ে সেই উপায় নির্ধারণের কৌশল আবিষ্কার করেন। 

এসব দেখে শুনে মনে হয় দাস প্রথা আজও সমাজে প্রচলিত আছে –পূর্বের চাইতে অধিক পরিমাণে আরো নিষ্ঠুর, আরো মর্মান্তিক ভাবে। দাস প্রথার অবসান হয়নি। মানুষ সরাসরি বাজারে বিক্রয় না হলেও, মানুষের ঘামেভেজা শ্রম বিক্রি হচ্ছে দিবা –রাত্রি!  

........................

জাগিয়া উঠিল প্রাণ

জন্মের পর থেকেই শাকিলার বোনেরা শুনতে পায় তারা সব বোন। ইদানীং তাদের বাড়ির নাম হয়েছে ৭ বোনের বাড়ি। অনেকটা একই রকম ৭ বোন –কৃষ্ণকলি। রোগাটে পাতলা গড়ন। নাক খাড়া। চোখ পিঙ্গল বর্ণের। তার কারণ তাদের মায়ের রঙ ফর্সা এবং চোখের রঙ পিঙ্গল। অন্যদের দৃষ্টিতে ৭ বোন এক অদ্ভুত প্রজাতি, অন্য গ্রহের কেউ। যে কোন একজনকে দেখলে লোকে বলে ৭ বোনের বোন। তাদের নাম জানবার কারো আগ্রহ নেই। বড় হলেও শাকিলার বয়স মাত্র ১২ বছর। সে একটু চিন্তাশীল। অন্য বোনেরা হইচই করে, বকা খেয়ে দিন কাটায়। তাদের মাতা পিতা প্রকাশ্যেই তাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। ভাল পোশাক, ভাল খাবার তারা কোনদিন পায়নি। তাদের মা তাদেরকে বাড়ির সব কাজ ভাগ করে দিয়েছে। ঘর –দোর, আঙ্গিনা পরিষ্কার করা, ঝাড়া –মোছা  করা, রান্নার যোগাড় দেয়া, বয়সে বড় শাকিলাকে রান্নার ভার দেয়া। বাসন –কোসন পুকুর ঘাটে বসে ঘষে –মেজে পরিষ্কার করে আনা। একটা বাসন পানিতে পড়ে গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা ডুব দিয়ে চোখ লাল করে সেটাকে খুঁজে তুলে আনতে হবে। ছেলে নেই বলে গরু ছাগলের পরিচর্যা করা, বাবার জন্য খাবার নিয়ে মাঠে যাওয়া আরও কত কাজ। আর তিন ক্ষুদে বাহিনী মনের সুখে বড় বোনদের সাহায্য করে। খাওয়ার সময় শাক সবজির ভর্তা, কাঁচা লংকা সহযোগে ভক্ষণ করে। সকালের নাস্তা তাদের লবণ দিয়ে তৈরী শুকনো রুটি। তাতেই তারা অমৃতের স্বাদ পায়। 

এমন সময় একদিন সুবেহ্‌  সাদেকের সময় তাদের পরিবারে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে। তাদের ৭  বোনের একটি ভাই জন্মগ্রহন করে। শান্তির দূত, আনন্দের দূত, সাতবোনের ত্রাণকর্তা। এতদিনে পরিবারের কর্ণধারের আবির্ভাব! বাড়িতে আনন্দ জয়জয়কার। সাত বোনের নয়নের মণি। শতকাজের মাঝে তারা ভাইটিকে মাথায় করে রাখে। 

বাবার কাছ থেকে ভাল ব্যবহার তারা কোনদিন পায়নি। এবার শাকিলা একটু বড় হয়েই স্কুলে যায়। পরবর্তীতে ছোট বোনেরা যেত। বাবা খুব রাগ দেখাত। ছোট ভাইটির জন্ম হওয়ার পর বাবার মেজাজটা একটু নমনীয় হয়। 

ওরা সাত বোনই স্কুলে যায়। পড়ে সাত ক্লাসে। তারা সকলের হাসির পাত্র। কিন্তু সেদিকে ৭ বোনের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তাদেরকে সকলে সার্কাস পার্টির লোকের মত দেখে। কিন্তু পড়াশুনায় তাদেরকে কেউ পেছনে ফেলতে পারেনা। এলো বার্ষিক পরীক্ষা। ৭ বোন নিজের নিজের ক্লাসে সকলকে টপকে উপরের ক্লাসে উঠে গেল। ওদের সাফল্যে সবার ঠাট্টা – মসকরা বন্ধ হয়ে গেল।

স্কুল ছুটির পর ওরা বাড়ি এসে সব কাজ করে, ভাইটিকে দেখে, রাতে পড়া তৈরী করে। শাকিলা তাদের গাইড, তাদের মাস্টার। তাদের পিতামাতার সেদিকে খেয়াল নেই। ওদের বই নেই, খাতা নেই, কলম নেই, কাগজ নেই। শাকিলা পুরাতন বই যোগাড় করে বোনদের জন্য। যেটা নেই নিজে লিখে দেয়। নিজের বই –পত্র রাখে পরের বোনটির জন্য। এভাবে সব বোনেরা ছোট বোনের জন্য বই –খাতা রাখে। পড়ার পরিবেশ নেই বাড়িতে। পড়তে দেখলে বাবা বলেন, তেনারা জর্জ –ব্যারিস্টার হবেন। গায়ের রঙ যাদের হাড়ি –পাতিলের মত, তাদের এত পড়ে কোন লাভ হবে না। পরের ঘরে টিকে থাকতে হলে কাজ জানতে হবে। 

মায়ের গায়ের রঙ ফর্সা। তা সত্ত্বেও মেয়েদের গাত্রবর্ণ কৃষ্ণবর্ণের, বাবার মত। নিজের গায়ের কালি মোছার জন্য সপ্তগ্রামের ওপার হতে ফর্সা মেয়ে আমদানী করা হয়েছিল, বিয়ে করে। কিন্তু বিধির বিধান খন্ডায় কে?

শাকিলার নেতৃত্বে বোনেরা সব একে একে স্কুল ফাইনাল পাশ করে চলে যায় উচ্চশিক্ষার পথে। যদিও সে পথ মোটেই মসৃন নয়। গ্রামের স্কুলের এখন খুব নাম কেবল এই ৭ বোনের জন্য। তাদের ভাল পোশাক নেই। তবুও তারাই শ্রেষ্ঠ। 

অন্ধকার কুসংস্কারাছন্ন গ্রামে, পশ্চাদপদ পরিবারে তারাই আলোর মশাল জ্বালায়। যে মেয়েদেরকে পরিবারের এবং সমাজের সকলে অভিশাপ মনে করতো, তারাই এখন সকলের মধ্যমণি। তাদের একমাত্র হাতিয়ার তাদের বুদ্ধি, বিদ্যা এবং মনের দৃঢ়তা। প্রচন্ড দারিদ্র্যের মধ্যে অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে যায় শাকিলা। সঙ্গে নিয়ে যায় তার বোনদেরকে এবং ভাইটিকে। তারা এখন সকলের পুরোভাগে আলোর বর্তিকা হাতে। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শাকিলা সকলকে তাক লাগিয়ে দেয়। সম্মানজনক চাকুরীতে ঢুকে তার পরিবারকে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে চলে, যা কিনা হ্যামিলনের বাশরীওয়ালার মত এক অগ্রযাত্রাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যে গন্তব্য সকলকে আলোচিত মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেবে। ৭ বোন জাগিয়ে তোলে পুরা জনপদকে। গ্রামের লোকেরা তাদের বাবা –মাকে সম্মান করে। এদিকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্য্যয়নকালে শাকিলার পরিচয় হয় একটি ছেলের সঙ্গে। ক্লাসের সেকেন্ড বয়। পড়ার প্রতিযোগিতা শাকিলার সাথে। তাদের প্রতিযোগিতা প্রণয়ে পরিণত হয়। তারপর এক শুভদিনে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয় তারা।

একদিন প্রত্যুষে তারা খিরু নদীর তীর ধরে হাঁটতে থাকে। চারিদিকে পাখপাখালিরা ডানা ঝাপটা দিয়ে জেগে উঠলো। নিজ নিজ কন্ঠের অনুশীলনে প্রভুর জয়গান করতে লাগলো। পূর্ব দিগন্ত নরম লালিমায় ভরে গেল নবারুণ সম্প্রাতে। তারা দুজনে একসঙ্গে গেয়ে উঠে –‘আজি এ প্রভাতে রবির কর/ কেমনে পশিল প্রাণের প’র/ কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত পাখির গান/ না জানি কেনরে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।’           

...............

ছিন্ন বীণা

মাস্টার অব সোশাল সাইন্সে ভর্তির মৌখিক পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছিল নাহিদ। পরীক্ষা শেষ। রেজাল্ট জানার জন্য সকলেই উদগ্রীব। বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় খুব ভীড়। নানা জায়গা থেকে ছেলেমেয়েদের আগমন। অধীর আগ্রহে প্রহর গুনতে গুনতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। এমন সময়ে রেজাল্টের শিট নোটিসবোর্ডে ঝুলিয়ে দিল। সকলেই হুমড়ি খেয়ে পড়লো সফলতার আশায়। লাইট না থাকায় পড়তে কষ্ট হচ্ছিল। অনেকই নিজের নাম দেখে বাইরে বের হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। মেয়েদের তো দেখবার উপায় নেই। এত ভীড়ে ঢোকা সম্ভব নয়। সেজন্য নাহিদ একজন ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে বললো এই যে, ভাই আমার নামটা একটু দেখে দেবেন!, নাহিদ, রোল নম্বর ৫৬৭। ছেলেটি ২০পর্যন্ত নাম দেখেছিল শেষ পর্যন্ত দেখে বললো, কই দেখছি না তো? আমার তো বিশ নাম্বারে নাম আছে। দাঁড়ান, আবার শুরু থেকে দেখি। দেখতে দেখতে হতাশ হলো। হঠাৎ ১৯শে এসে দেখতে পেল নাহিদ নিশাত। yes, your name is there নাহিদ নিশাত! নাহিদ আনন্দের আত্মহারা। তারপর দুজন ওখান থেকে বের হতে চেষ্টা করলো। প্রচন্ড চাপের মুখে ছেলেটি পথ করে নিল। নাহিদ তাকে অনুসরণ করে বের হয়ে এলো। সিড়ির নিকট এসে দেখলো চৈতালী ধূলোর ঝড় উঠেছে। ঝাপটায় দৃষ্টি অস্বচ্ছ। তার সাথে যুক্ত হচ্ছে মেঘের ঘনঘটা। 

নাহিদ থাকে গ্রীনরোডে। সবাই ছুটে চলেছে। ঝড়ো হাওয়া, অন্ধকার, যানবাহন নেই। ছেলেটি নীলক্ষেতের দিকে এসে একটি ধাবমান রিক্সা জোর করে ধরে নাহিদকে তুলে দিল। আর সে নিজে উল্টো দিকে যাত্রা করলো মালিবাগের বাসার উদ্দেশ্যে। 

কয়েকদিন পর ক্লাশ আরম্ভের চিঠি পেল ওরা। দুরু দুরু বক্ষে ছাত্রছাত্রীরা এসে হাজির। অফিস থেকে এসে জেনে নিল কোথায়, কত নম্বর কক্ষে তাদের ক্লাস হবে।

দিন যায়। পড়াশুনার প্রচন্ড চাপ। তারই মাঝে ছেলেটির সঙ্গে নাহিদের দেখা হতে থাকে। নাহিদের রোল নম্বর ১৯, সাজ্জাদ সুমনের ২০, তারা পরপর রোলকলের জবাব দেয়। বেশ মজা পায়। এক সঙ্গে ক্লাসে ঢোকে, এক সঙ্গে বের হয়। পড়াশুনার আলোচনা তো হয়ই। দুজনেই মেধবী। সুতরাং বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন গড়ে উঠে। দীর্ঘ দু’বছরে তাদের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। এখন একজন আরেকজনকে না দেখে থাকতে পারেনা। একসঙ্গে ঘোরাফেরা, লাইব্রেরিতে যাওয়া, ক্যান্টিনে খাওয়া – নিত্যদিনের রুটিন তাদের। এরমধ্যে ফাইনাল পরীক্ষা এসে যায়। দু’জনেই ভালভাবে পাশ করে। এবারও পরীক্ষার প্রাপ্ত নাম্বার কাছাকাছি। সুমন বলে ১৯ কম, তবুও ১৯ –এর  নম্বর বেশী। নাহিদ হেসে বলে সংখ্যা হিসাবে ২০ পরে আসে, সেজন্য তার নাম্বারও কম আসে। এরকম ভাবে ওরা মজাও করে প্রায়ই। সামনে সিএসপি পরীক্ষা। প্রচুর পড়াশুনা। তাদেরকে সবজান্তা হতে হবে। প্রস্তুতি নিতে থাকে দুজনেই। এরই মাঝে নাহিদের বিয়ের কথাবার্তা চলতে থাকে। নাহিদ দেখতে ভাল। সুতরাং বিয়ের প্রস্তাব প্রচুর আসছে। খবর শুনে সুমনের চমক ভাঙ্গে। সে কি যেন হারাতে যাচ্ছে।সে নাহিদকে জিজ্ঞেস করে, তোমার এ বিয়েতে মত আছে? হঠাৎ নাহিদ কেঁদে ফেলে। বলে, না, নেই। 

- তবে  প্রতিবাদ করো না কেন?

-আমার কথার দাম দেয় না কেউ। 

-সিএসপি পরীক্ষাটা দাও তো আগে।

-তারা বলেন যথেষ্ট হয়েছে। তোমার সিএসপি পরীক্ষা আটকাবে না। পড়তে থাক। ভাল পাত্র হাতছাড়া করা যাবে না। 

সুমন বলে তুমি কি আমার কথা ভাববে না? জবাবে নাহিদ কেবলই চোখের জলে ভাসে। সুমন বলে তুমি উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে। বাবা মাকে বুঝিয়ে বল। তারা তোমার কথার গুরুত্ব দেবেন। 

নাহিদ সাহস সঞ্চয় করে তার মনের কথা বাসায় প্রকাশ করে। অভিভাবকগণ সাজ্জাদ সুমনের বাড়ির, পরিবারের খোঁজ খবর সংগ্রহ করে। সুমনের পিতা গ্রামের একজন স্কুল শিক্ষক। সম্ভ্রান্ত বংশ। তবে এখন পূর্বের অবস্থা নেই। অনেক ভাই –বোন। সবাই লেখাপড়া করছে। সুমন সকলের বড়। তার অনেক দায়িত্ব। নাহিদকে গ্রামে যেতে হবে। গ্রাম সে কোনদিন দেখেনি। নাহিদের পিতা সরকারি উচ্চপদস্থ অফিসার। ইপিসিএস (EPCS) সে যুগে। জীবন যাপনের তরিকা উচ্চ পর্যায়ের। 

সুমন দেখতে শুনতে ভাল। ছেলে ভাল। কিন্তু তাদের মতে এ ভাললাগা, বা ভালবাসা স্থায়ী হতে পারেনা। সুমনকে তাদের পর্যায়ে উন্নীত হতে অনেক সময় লাগবে। তাও যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। সুতরাং এ বিয়ে হতে পারেনা। নাহিদ অনেক জেদ করে। অনশন করে। তাতে কোন ফল হয় না। তার মন এতই ভেঙ্গে পড়ে যে তার পক্ষে সিএসপি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হয় না। লেখাপড়ার ইতি তার এখানেই।  

নাহিদের বিয়ে পাকাপাকি হয়ে গেল এক আর্মির ক্যাপ্টেনের সঙ্গে। সুমন সিএসপি পরীক্ষা দিল। রেজাল্ট ভাল হল। ভাল চাকুরী হল। নাহিদের বিয়ে হল। স্বামী পশ্চিম পাকিস্তানে বদলী হয়ে নাহিদকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল। সুমন ‘শূন্য নদীর কূলে রহিল পড়ি।’ তার সোনার ধান অন্য লোকের নৌকায় বোঝাই হয়ে চলে গেল। সুমন সিভিল সার্ভিসে পশ্চিম পাকিস্তানের গোট্‌কি নামক স্থানে পোস্টিং পেল। কিন্তু সে গেলনা সেখানে। চেষ্টা তদবীর করে ইস্ট পাকিস্তানের এক জেলা শহরে ম্যজিস্ট্রেটের চাকুরী গ্রহণ করলো।

সময় চলতে থাকে অবিরাম। সুমনের ‘অন্তর আপনার মনে আপনি পুড়তে থাকে গন্ধ বিধুর’ ধূপের মত। নাহিদের স্মৃতির দীপশিখাটি তাকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে দগ্ধ করে। কাজে ব্যস্ত থাকে। বাকি সময় নাহিদের স্মৃতির সঙ্গে বসবাস করে। অন্যদিকে নাহিদের সংসার চলে স্বাভাবিক নিয়মে। প্রথম প্রথম সুমনের স্মৃতি নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঘোরাফেরা করতো। ভাবতে চাইতো এই –ই তার সুমন। পরপর তার দুটি সন্তান হয়।  একজনের নাম রাখে সাজ্জাদ। আর মেয়েটির নাম রাখে সুমনা। 

এরই মধ্যে বেজে উঠে ঊনসত্তরের দামামা। পাকিস্তানের রাজনৈতিক আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। শেখ মুজিব বিপুল ভোটে জয়ী হয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা তা মেনে নিতে অস্বীকার করে। চরম নির্লজ্জের মত তারা এই নির্বাচনের ফলাফলকে বয়কট করে। যার ফলশ্রুতিতে শুরু হয় ব্যাপক গণ জাগরণ। বাঙ্গালী ছাত্র সমাজ এবং শিক্ষিত সমাজ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সারাদেশ একত্রিত হয়। ’৭১ এর ২৫শে মার্চ  মধ্যরাত্রে যখন পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে, বাঙ্গালী জাতি তখন হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। পরে এক ভয়ংকর যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। বাঙ্গালীর ছেলে আর ঘরে থাকতে পারলো না। সাজ্জাদ সুমন যুদ্ধে যোগ দিল। কখনও দেশের ভেতরে, কখনও দেশের বাইরে কাজ করে। তার যে এত সাহস আর এত শক্তি ছিল তা সে নিজেও জানতো না। এক কাপড়ে মাসের পর মাস, কত ঝড়ে, জলে ভিজেছে। ভিজা কাপড় গায়ে শুকিয়েছে। পোকামাকড়ের কামড়, জোকের রক্ত শোষণের কত না ইতিহাস। কত ক্ষুধা, তৃষ্ণায় কাতর হয়েছে। তবুও অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। 

এটা ছিল ৭১ এর শেষের দিকের ঘটনা। ওরা জামালপুরের বর্ডারে একটি আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তখন জানতে পারলো গ্রামের ভিতরে কয়েকটি বাড়িতে পাক বর্বর বাহিনী আগুন দিয়েছে। তারা দ্রুত এগিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে। খুব সন্তর্পণে ছোট্ট নদীটির ঢাল বেয়ে সুমনরা এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখে একটি মানুষ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ক্রুশে বোনা সাদা টুপিটি পড়ে আছে অদূরে। শ্বেত শুভ্র বস্ত্র তার ক্ষত –বিক্ষত। দেহে আঘাতের চিহ্ন। চাপ চাপ রক্ত তার দেহ ঘিরে। ওরা মুক্তি সেনারা লাশটি উল্টালো। সাজ্জাদ চমকে উঠলো। এ যে নাহিদের পরহেজগার পিতার লাশ। শ্বেত , শুভ্র চুল, দাড়ি, হাতে তসবীহটি তখনও ধরা। তাকে ঐভাবে রেখে অতি সন্তর্পণে উপরে গ্রামে চলে আসে। দেখে নাহিদের বাড়িটি ভস্মীভূত। কয়েকটি গজারী কাঠের খুঁটি তখনও নিভু নিভু জ্বলছে। ওরা তখন উত্তর দিকের জঙ্গলে চলে গেল। সেখানে ক্ষত –বিক্ষত মানুষ পড়ে আছে। ভোরের আলো ফুটে উঠছে দ্রুত। কে যেন পানি চাচ্ছে মৃদু স্বরে। কাছে গিয়ে দেখে এ যে নাহিদ! সেই সাদা মেয়েটি। দুটি বাচ্চা তার বুকের উপর মৃতের মত পড়ে আছে। সুমন টিউবওয়েল থেকে তার কোমরের গামছা ভিজিয়ে পানি নিয়ে নাহিদের মুখে দিল। ডাকলো, নাহিদ, নাহিদ। সে চেতনা ফিরে পেল। বললো, কোথায় আমার সাজ্জাদ, কোথায় আমার সুমনা?

-এই যে তোমার বাচ্চারা। দেখ, চেয়ে দেখ। ওরা ভাল আছে। 

নাহিদ চিৎকার করে উঠলো। কে, কে, কে কথা বলে? 

কে তুমি? 

সুমনরা তাদের সকলকে ধরাধরি করে নাহিদদের রান্নাঘরে নিয়ে এলো। সে ঘরটি একটু দূরে থাকায় দগ্ধীভূত হয়নি। সকলেই মহিলা আর শিশু। তবে জখম আছে সবারই । চুল দাড়ির ভেতরে সুমনকে চেনা সম্ভব ছিল না। তবুও নাহিদ বলে উঠলো, কে আপনি? সুমন বললো, আমরা মুক্তিযোদ্ধা। সাবধানে থাকবেন। আপনার বাবা নদীর ঘাটের কাছেই আছেন। বলেই ওরা নিমেষেই অন্তর্হিত হলো। সূর্য উঠার পূর্বেই যে তাদেরকে ক্যাম্পে পৌঁছাতে হবে। 

যুদ্ধের সময়ে নাহিদ লাহোরে অবস্থান করছিল। অবস্থা খারাপ বুঝে নাহিদকে তার স্বামী মেজর করিম ঢাকায় পাঠিয়ে দিল। সেটাই ছিল ভারতের উপর দিয়ে শেষ বিমান যাত্রা। তারপরই মেজর করিমের ইউনিট বর্ডার ডিউটিতে চলে গেল। নাহিদ ঢাকায় এসে অন্য সকলের সঙ্গে জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। সুমনের মনের অবস্থা খুব খারাপ। ইচ্ছা করছিল, ঝড় হোক, ঝঞ্ঝা হোক, সাইক্লোন হোক -সব তার জীবনের দুঃখ কষ্টকে উড়িয়ে নিয়ে যাক। এ জীবন তার অভিশপ্ত জীবন। যুদ্ধে যদি তার মৃত্যু হয় সেটাই হবে তার জন্য মুক্তি। যেমন গত পরশু তার প্রিয় বন্ধু সাংবাদিক পিন্টু, আহত মুক্তিযোদ্ধাকে পিঠে করে বহন করে আনার সময় পাক সেনাদের পাতা ফাঁদে পড়ে প্রাণ দিল। অদৃষ্ট কেমন নিষ্ঠুর, মানুষ তা জানে না। না হলে নাহিদের সঙ্গে তার এই অবস্থায় সাক্ষাৎ হওয়ার প্রয়োজন ছিল কি? ছিল না। অথচ অতীতের নাহিদ হারানোর দুঃখজনক স্মৃতির সঙ্গে এই মর্মান্তিক দৃশ্য যুক্ত হলো কেন? নাহিদ, আমার প্রিয় নাহিদ, আমার  প্রাণাধিক নাহিদ, আমার জন্ম –জনান্তরের নাহিদ। কেন প্রথম দেখা হয়েছিল, কেন পুনরায় দেখা হলো? 

মুক্তিযোদ্ধাদের এসব চিন্তা করবার সময় নেই। পরবর্তী কমান্ডের আদেশে তারা বেরিয়ে পড়ে অন্য অপারেশনে, একটি ব্রিজের কাছাকাছি যেদিক দিয়ে এক প্লাটুন পাকিস্তানী সৈন্য অন্য একটি গ্রামে ঢুকে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। সেদিন গভীর রাতে তারা বিলের ঠান্ডা পানিতে ঝোপ ঝাড়ের নীচে লুকিয়ে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে অপেক্ষা করছিল। গভীর রাতে পাক হানাদার বাহিনী এলো। মাইন ফিট করা ছিল ব্রিজের দুইপাশে। ব্রিজে উঠার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। অনেক সৈন্য হতাহত হয়। যে সমস্ত যানবাহন পেছনে ছিল, তারা নিজের অস্ত্র দিয়ে চারিদিকে ফায়ার করতে থাকে। মুক্তিসেনারা ডুব দিয়ে দূরে সরে যেতে থাকে। কেউ কেউ আহত হলো। কেউ অন্য পাড়ে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো। আর্মির গাড়ি চলে গেল। চারিদিক সুনসান।

‘সবকিছু একদিন শেষ হয়। যুদ্ধও একদিন থামে। সেই বিরতি কি শান্তি? ’ শান্তি না হোক স্বস্তি তো আনে।  আশাবাদী মানুষ ধ্বংস স্তুপের ওপর আবার ঘর বাঁধে, বাঁচার স্বপ্ন দেখে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ছিনিয়ে আনে একটি লাল সবুজ পতাকা। বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সাজ্জাদ সুমন দেশে ফেরে। বাড়ি – ঘর তাদের অক্ষত আছে। মাতা –পিতাও জীবিত আছেন। ভাই – বোন সকলেই যুদ্ধে গিয়েছিল তারা কেউ ফেরে নাই। যে ভাইবোনদের সংখ্যা দেখে নাহিদের পিতা ভয় পেয়েছিলেন!

সরকারি চাকুরী তো সুমনের আগেই ছিল। এবার রেড ক্রসে তার পোস্টিং হলো। বৃদ্ধ বাবা –মাকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসে সে নিজের কাছে। কারণ গ্রামের শূণ্য ঘরে তারা কেবল কান্নাকাটি করেই দিন কাটান। সাজ্জাদ সুমন অফিসে যাতায়াত করে। তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে। বাকী সময় কোথায় কার কি কি ক্ষতি হয়েছে –সে সব খোঁজ খবর সংগ্রহ করে।  

একদিন যখন সাজ্জাদ খুব ব্যস্ত তখন এক মহিলা দুই বাচ্চার হাত ধরে অফিসে আসে। তার কাছে প্রতিদিন কতশত লোক তাদের প্রিয়জনের খোঁজ খবর নেবার উদ্দেশ্যে আগমন করে। তাদের আশা, কোথাও না কোথাও তাদের লোক আহত অবস্থায় আটকে পড়েছে। একদিন না একদিন আসবেই।

নাহিদ ধীর পদক্ষেপে রেডক্রস অফিসে প্রবেশ করে অফিসারের ডেস্কের সামনে দাঁড়ায়। অফিসার ফাইল থেকে মুখ না তুলেই ইশারায় আগন্তুককে বসতে বলে। বেশ কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে প্রশ্ন রাখলেন, – কি চাই? নাহিদের বুকের ভিতর রক্ত ছলাৎ করে উঠে। সাজ্জাদ ও নাহিদের দৃষ্টি কোন এক চৌম্বক শক্তির কবলে পড়ে স্থির হয়ে রইলো দীর্ঘক্ষণ। কেউ কোন কথা বললো না। হঠাৎ নীরবতা ভঙ্গ করে নাহিদ কম্পিত কন্ঠে বলে উঠলো, মেজর কে. করিম নামের অফিসার এখন কোথায় আছেন? পশ্চিম পাকিস্তানে তার পোস্টিং ছিল পাঞ্জাবে। সাজ্জাদ দ্রুত হস্তে ফাইল বের করে। পাতা উল্টে –পাল্টে দেখতে থাকে পাকিস্তানে আটকে পড়া অফিসারদের নাম। হঠাৎ এক জায়গায় তার চক্ষু স্থির হলো। সাজ্জাদের হৃদপিন্ড কে যেন চেপে ধরলো। সে মাথা নত করে চোখ বন্ধ করে ফেললো। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে, নাহিদের চোখে চোখ রাখলো। দৃষ্টি এতই স্থির এবং শীতল, যে নাহিদ সহ্য করতে না পেরে মাথা নীচু করতে বাধ্য হলো। সাজ্জাদ একটি কালো বর্ডার যুক্ত কাগজ নাহিদের দিকে এগিয়ে দিল। কয়েক সেকেন্ড পর গায়েবী আওয়াজের মত গম্ভীর নিনাদ তুলে এক ভয়ংকর শব্দ উচ্চারিত হলো –  Major K.Karim got killed in the western front during war.


কত অজানারে

ফারাহ্‌ দিবা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এম. এ. ফাইনাল দিবে। এই সময় একদিন রেডিওতে একটি বিশেষ ঘোষণা শুনতে পায়। সোমালিয়ান দস্যু কর্তৃক শ্রীলংকার বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাই। বুকটা কেঁপে উঠলো। কারণ এই জাহাজে ছয়জন বাঙ্গালী তরুণ অফিসার আছেন। তাদের মধ্যে একজন ইমরান। গত চারবছর ধরে সে তার অন্তরঙ্গ বন্ধু। কিংবা তার চাইতেও অধিক কিছু। সে একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে। তবে মেলামেশা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তার আশেপাশে।  

পারস্য উপসাগরকে লোকে গালফ্‌ বলেই জানে। সাধারণত এখানেই ভিনদেশি বাণিজ্য জাহাজগুলি জলদস্যু কবলিত হয়। কৃষ্ণকায়া সোমালিয়ান দুর্ধর্ষ দস্যুরা – যাদের  হাতে থাকে অতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এ. কে.ফরটি সেভেন রাইফেল, তাদের সঙ্গে লড়াই করবার সাহস কারো নেই। মাত্র কয়েকজন জলদস্যু অনেক লোকজন সহ বিরাট বিরাট জাহাজ আটক করে ফেলে। আক্‌শি বাঁধা মোটা রশি জাহাজের উপরে বিশেষ কায়দায় ছুঁড়ে মারে।রাস্তা তৈরী হয়ে যায়। পরে গান পয়েন্ট তাক করে জাহাজের উপরে উঠে আসে। দিনের পর দিন জাহাজের লোকজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, খুন অনাহারে রাখা, পিপাসায় রাখা ইত্যাদি নানাবিধ অত্যাচার করে তাদের জীবন প্রদীপ নিবু নিবু পর্যায়ে নিয়ে আসে। জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে পড়ে আসহায়। ক্যাপ্টেনের মাধ্যমে শুরু করে জাহাজের মালিকের সঙ্গে দর কষাকষি। জাহজ মালিক এক পর্যায়ে মোটা অংকের মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হয়।জিম্মিরা মুক্ত হয়। প্রানে রক্ষা পায় বটে, তবে জীবনের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।    

ফারাহ্‌ দিবা একা একা এই কষ্ট সহ্য করতে পারছিল না। একদিন বাসায় তার মনোবেদনার কথা প্রকাশ করে। সকলের সহমর্মিতা পায়। জাহাজ ছিনতাই এবং সংবাদ শোনার জন্য সকলে সর্বদা উৎকর্ণ হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখে মুক্তিপণ নিয়ে দরদাম হচ্ছে। শত কোটি মুদ্রা পেলে জলদস্যুরা জাহাজ ছেড়ে দেবে। সংকোচ পরিহার করে ফারাহ্‌ ইমরানদের বাসায় যোগাযোগ করে। তারাও ইমরানের জন্য গভীর ব্যাকুলতা প্রকাশ করে। কিন্তু কোন খবরই আসছে না। ফারাহ্‌ দিবার দিনরাত্রি প্রচন্ড যন্ত্রণায় অতিবাহিত হতে থাকে। সর্বদা ইমরানের দেওয়া আংটি তার অনামিকায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। কার্জন হলের পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে বসে একদিন চৈত্রের বিকেলের উতল হাওয়ায় মনের আনন্দে তারা দুজনে তাদের অংগুরীয় বদল করে ফেলেছিল। ইমরানের অনামিকার আংটি ফারাহ্‌র মধ্যমায় আর তার মধ্যমার আংটি, যার উপর এফ অক্ষর মিনা করা, ইমরানের অনামিকায় বদলী হয়ে গেল। দু’জনে একসংগে গেয়ে উঠলো –

  ‘ভালবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে/

  মনে ক'রে সখী, বাঁধিয়া রাখিয়ো আমার হাতের রাখী—তোমার কনককঙ্কণে॥’ 

গান শেষে ওরা বলেছিল, এই –ই ভাল। আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন কি? চল যাই চাংপাই। চাংপাই রেস্টুরেন্টে দুজনে মুখোমুখি বসে চায়নীজ খাদ্য উপভোগ করে তাদের অলিখিত বন্ধন পাকা করে নিয়েছিল। তারপর থেকে দেখা হলেই দুজনে আংটির সংঘর্ষ করে নিতো। মজা পেত খুব। ঐ পুকুর ঘাট ছিল তাদের বৃন্দাবন। 

পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে মন্দ মধুর হাওয়ায় দোল খেয়ে, রবি ঠাকুরের গান গেয়ে, তাদের প্রণয় দৃঢ়তা লাভ করে। একজন বিহনে আরেক জনের জীবন অর্থহীন মনে হয়। সেই প্রিয় মানুষটি আজ দূরদেশে কোন্‌ সাগরের জলে দস্যু কবলিত। হায়রে অদৃষ্ট! মানুষের জীবনে দুর্ভোগ কত ভাবেই না আসে। একসময়ে শুকিয়ে যায় চোখের জল। দুই পরিবারে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। 

হঠাৎ একদিন রেডিও মারফত জানতে পারে শতকোটি টাকার বিনিময়ে জিম্মিরা মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু ইমরান ফিরে এলো না। কেউ তার খবর  দিতে পারলো না। সময় গড়িয়ে গেল। মাস গেল, বছর গেল। সংবাদ সংগ্রহের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। রেড ক্রসও কোন খবর দিতে পারলো না। হতাশাই দুই পরিবারের সম্বল হলো। 

ফারাহ্‌ দিবা চাকুরী করছিল কলেজে। তার মা –বাবা  মেয়ের জন্য  উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। মেয়েকে সংসার গ্রহণ করবার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। ‘মানুষ একা থাকতে পারে না। কার জন্য অপেক্ষা করছ? সময় থাকতে নিজের পথ দেখ। মানুষের  নিজের আশ্রয় এবং অবলম্বন থাকা উচিত।’

এদিকে একই কলেজে এক ভদ্রলোক চাকুরি করেন। জীব বিজ্ঞানের প্রফেসর। বড্ড গম্ভীর। তারও জীবনের ইতিহাস আছে। একটি মেয়েকে তার ও খুব পছন্দ ছিল। সদা হাসি খুশী টিংকু। রঙ্গিন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায়। ইকরাম স্যারকে তার খুব ভাল লাগে। স্যারকে সে বন্ধুর মতো মনে করে। চঞ্চল চপল টিংকু তার হৃদয় –মন জয় করে নিয়েছে। তবে সে চালাকও বটে। ইকরামের পক্ষপুটে থেকে অন্য ফুলের মধুও আহরণ করে। চেখে দেখে কোনটা বেশী মিষ্টি। তাদে সঙ্গে অভিসারে যায় সুন্দর সুন্দর স্পটে। ইকরামকে তার আনন্দের কথা, আহ্লাদের কথা কিছু কিছু বলে। ইকরাম তার সততার মূল্য দেয়। ভাবে মেয়েটি খুব সরল, ছেলে মানুষ!

একদিন হাসতে হাসতে টিংকু তার বিয়ের খবর জানায় ইকরামকে। বাবা –মার প্রচন্ড আগ্রহ উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। কারণ সে তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান। ইকরাম লজ্জার মাথা খেয়ে বলে, পাত্র হিসেবে আমি কম কিসে? ত্বরিত উত্তর দেয় টিংকু। বাবা –মার অবাধ্য হওয়া যায় না। তবে আমি তোমারই থাকবো চিরকাল। এটা তুমি সত্য বলে জেনো। মানুষের অন্তরের প্রাপ্তিই আসল। এ বলে মায়া কান্না জুড়ে দিল। 

এই ছেলেটির কথা টিংকু অনেকবার বলেছে। এটা ছিল তার শেষ খেলা। কিন্তু তবুও ইকরাম ভয়ংকর মনোবিকলনের শিকার হয়। এ কলেজের চাকুরী ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কলিগরা তাকে বাধা প্রদান করে। বলে কোথায় যাবে তুমি? কার জন্য? মানুষ সব কিছু থেকে দূরে চলে যেতে পারে। কেবল পারে না নিজের কাছ থেকে দূরে থাকতে। সুতরাং কোথাও যাবে না। আমাদের কাছে থাক। কষ্ট শেয়ার করবার লোক পাবে। তোমার সংগে যা ঘটেছে তা পরোক্ষে ভালই হয়েছে। তোমার ঘরে যখন তোমার তথাকথিত প্রিয়া অন্য ফুলের মধু আহরণ করতো, তখন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা দাঁড়াত। সবকিছুরই একটা অন্তরর্নিহিত মঙ্গল আছে। সুতরাং যেও না কোথাও, এখানে থাক। 

ইকরাম থেকে গেল। পরিচয় ছিল কলিগ হিসাবে ফারাহ্‌ দিবার সঙ্গে। গল্প  করতে করতে দুজন দুজনার জীবনের ট্র্যাজিডির কথা জানতে পারে। অন্যরা তো জানেই। তারা সকলে মিলে একদিন এই দুই ব্যক্তিকে ধরে বসে। বলে, আমাদের কলেজে কলিগদের মধ্যে কেউ একা নেই। কেবল তোমরা দুজনে সিঙ্গল। দুজনেই চূড়ান্ত ভাল মানুষ। এবার আর কোন কথা নয়। সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হও। উদ্বাহের বন্ধনের আয়োজন করি আমরা। শীঘ্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর। 

কয়েকদিন পর কলিগরা আবার টিফিন পিরিয়ডের ধূমায়িত চায়ের উপর তাদের মতামত জানতে চাইল। তাদের অধোবদন, হাসিমুখ। সকলে ধরে নিল মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ। 

তারা দুই পরিবারের গার্জিয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিয়ের দিন তারিখ ধার্য্য করে ফেলল। ইকরাম আর ফারাহ্‌ দিবা পবিত্র সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হলো। যাত্রা শুরু হলো একটি সুন্দর সাবলীল সংসারের। মানুষের জীবন একটাই। তাকে সার্থক  করে তুলতে হলে একজন আরেকজনের দুখের সুখের সঙ্গী হতে হবে। দু’জন পরস্পরকে গ্রহণ করতে হবে ‘ভাল মন্দ মিলায়ে সকলি।’ আনন্দ, উৎসব, অনুষ্ঠান সবই হলো প্রথানুযায়ী।

দিন চলে যায় নদীর স্রোতের প্রায়। ফারাহ্‌ দিবার দুটি ছেলেমেয়ে। তারা স্কুলে যায় । এমন সময় একদিন ফারাহ্‌ ডি. ভি. পেল। আমেরিকা যাওয়ার ছাড়পত্র। অনেক চিন্তা ভাবনা করে একদিন ওরা পাড়ি জমাল আমেরিকায়। ওরা যেহেতু শিক্ষিত, সেজন্য চাকুরী পেতে অসুবিধা হয়নি। ছেলে মেয়েদেরকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। দেশেও ওরা ইংলিশ মিডিউয়াম স্কুলে পড়াশুনা করছিল। 

বেশ কিছু বছর ওদের এভাবেই কেটে গেল। একবার একটি ভাল চাকুরীর সন্ধান পায় ফারাহ্‌। সব ফরমালিটি পুরা করে সামনা সামনি সাক্ষাত্‌কার দেবার প্রয়োজন পড়ে। ফারাহ্‌ দিবা হাজির হলো সে অফিসে। রিসেপশানে বসা লোকটিকে দেখে মনে হলো ভারতীয়। একটু পর মুখ তুলে লোকটি তাকিয়ে থাকলো ফারাহ্‌ দিবার দিকে। ফারাহ্‌ -ও বিস্ফারিত নেত্রে লোকটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। হঠাত্‌ লোকটি ব্যগ্রস্বরে বলে উঠলো – তুমি? আমি ইমরান।

একটি সূক্ষ্ম যন্ত্রণা এতকাল পরে বক্ষমাঝে আর্তনাদ করে উঠলো। মনটাকে শক্ত করে বেঁধে দ্রুত অফিস কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হলো। মনে হলো আজ সে বড্ড ক্লান্ত। হৃদয় কন্দরে বেজে উঠলো সেই সুর –ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু...।