জীবন অর্থই প্রানের স্পন্দন। প্রাণ যতদিন দেহের আশ্রয়ে থাকে, ততদিনই জীবন হিসেবে গণ্য হয়। দেহকে প্রাসাদ বলতে পারি, মন্দির বলতে পারি, কারাগার বলতে পারি, খাঁচাও বলতে পারি। বলাটা নির্ভর করে কখন আত্মার সঙ্গে দেহের কি সম্পর্ক তার উপরে। আত্মার সঙ্গে দেহের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ।দেহ আঘাত পেলে আত্মা হয় ব্যথিত। আত্মাকে অপমান করলে দেহ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে। আত্মাকে সম্মান প্রদর্শন করলে দেহ তার চেহারায় অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। দেহ মন দুটিতে মিলেই একটি যন্ত্র। দেহ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর বড় হতে থাকে । সেই সঙ্গে বড় হতে থাকে আত্মার ধারণ ক্ষমতা। দেহ শারিরীক পূর্ণতা লাভ করে। কিন্তু আত্মার পূর্ণতা লাভ হয় না। অর্থাৎ দেহের বৃদ্ধির প্রাপ্তি শেষ হয়, আত্মার বিকাশ লাভ শেষ হয় না। বরং উত্তরোত্তর অসীম জ্ঞানের ভান্ডারে আত্মা প্রবেশের প্রয়াস পায়। যে যেমন লোক হোক, যেখানে বাস করুক না কেন, তার জ্ঞান বাড়তেই থাকে। দেহের খাঁচা একদিন জীর্ণ হয়। দেহের দেখাদেখি আত্মা কিন্তু জীর্ণ হয় না। তখনই শরীরের সঙ্গে বাধে তার বিরোধ। তাদের সম্পর্ক নষ্ট হয়।
রোগগ্রস্ত বা জরাগ্রস্ত শরীরে আত্মা অশান্ত হয়। তখন খাঁচা ছেড়ে পাখিটি কোথায় যেন উধাও হতে চায়। দেহ যখন অথর্ব, অকর্মণ্য, জরাগ্রস্ত হয়, তখন আত্মা নির্যাতিত হতে থাকে। আত্মাকে ধারণ করবার ক্ষমতা দেহের থাকে না। আত্মার উন্নতি বা বিকাশের পথ হয় রুদ্ধ। নিপীড়িত আত্মা দেহের বন্ধন ছিন্ন করতে চায়। চায় মুক্ত বিহংগের মত দেহের কয়েদখানা থেকে মুক্তি পেতে। তাই একদিন সে চির পরিচিত দেহ ত্যাগ করে কোথায় যেন কোন নিঃসীম নীলিমায় হারিয়ে যায়। যে শরীর তার যৌবনের রাজপ্রাসাদ ছিল, প্রৌঢ় বয়সের মন্দির ছিল, তা ত্যাগ করতে দ্বিধা করে না । সে যেন এক অচীন পাখি। খাঁচা ছেড়ে অচীন পুরে চলে যায়। প্রাণহীন দেহ পড়ে থাকে। আর কোনদিন উঠতে পারে না। অন্তহীন কালের জন্য সে শয্যা পাতে। চিরশয্যায় সে শায়িত হয়। দেহ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, লয়প্রাপ্ত হয়। মৃত্তিকায় রূপান্তরিত হয়। তার যা কিছু দৈহিক সম্পদ তা মাটিকে উপহার দেয়। মাটি হয়তো তার তৈল সম্পদ উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করে।
প্রাণ পাখিটি খোঁজ রাখে না তার দেহ মন্দিরটির। সে যে কতকাল এই শরীরে বসবাস করে গেল, তার জন্য তার কোন মমতা নেই। বড় নিষ্ঠুর সে। বড়ই অকৃতজ্ঞ। ‘আর্শী নগরের পড়শী’ আর পেছন ফিরে তাকায় না। অন্য কোথাও, অন্য কোন সোনার খাঁচার বুলবুলি হয়ে সে হয়তো গান করে।
আমি কে, আমি জানি না। ‘আমি’ বলতে আমার অস্তিত্বকেই বুঝি। যাকে আমি হস্ত দ্বারা স্পর্শ করতে পারি, আর্শীতে অবলোকন করতে পারি, উপলব্ধি করতে পারি আমার শ্বাস প্রশ্বাসের উত্থান পতনে, হৃদয়ের স্পন্দনে। এই আমি চলে যাব এই সুন্দর ভুবন ছেড়ে। আর আসবো না। আর চেনা মহলে একটি বারও ফিরে গিয়ে বলা হবে না এই যে আমি এসেছি, তোমাদের কাছে, তোমাদের কেউ। এই আমি নাম সর্বস্ব প্রানহীন দেহ মাত্র। নামটি দেহের। প্রাণের নয়।একটি মানুষকে আলাদা করে চিহ্নিত করার জন্য নাম। তাও পরিচিত মহলে। অপরিচিত পরিবেশে তার নামটিরও কোন দাম নেই। তবুও দেহের –ই নাম থাকে। আত্মার নাম থাকে না। দেহের খাঁচায় যে বুলবুলি বাস করে সে নামহীন, গোত্রহীন, ধর্মহীন, বর্ণহীন।
এই নামটি সংগ্রহ করে আমি ঘুমিয়ে থাকবো কবর গুহায় অনন্তকাল।পরিপাটি নিরাপদ কবর। দস্যু তস্করের ভয় নেই, ক্ষুধা তৃষ্ণার উপদ্রব নেই, আশা নিরাশার দোলা নেই। শুধু থাকবে আমার অস্তিত্বের মিশ্রণে মৃত্তিকা। হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীর পৃষ্ঠে আজকের মত আসবে বর্ষা, আসবে শীত, গ্রীষ্ম পর্যায়ক্রমে। আমার শেষ আবাসস্থলে কত বারিধারা আঘাত হানবে।
কত ঝড় ঝঞ্ঝার দাপটে ধরণী প্রকম্পিত হবে। কত বন্যা আসবে আমার এই বাংলায়। কত অরি, কত মারি, মানবগোষ্ঠীর প্রাণ সংহার করবে। তারা এসে যোগদান করবে শুভ্র কাফনের সমাজে। প্রকৃতির মঞ্চে নামের ভূমিকায় কাজ করে যাবে মানুষ চিরকাল। কেবল আমারই আর উঠে আসা হবে না আগের মত। দু’চোখ ভরে আর দেখা হবে না রূপসী বাংলাকে। আমার নামও মানুষ ভুলে যাবে একদিন। সমাধিও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। হয়তো তার উপর মানুষ একদিন আবাদ করবে সুস্বাদু ফলবান বৃক্ষ অথবা তুষযুক্ত শস্যদানা। কিম্বা তা হবে মানুষের আবাসিক এলাকা। গড়ে উঠবে সুদৃশ্য ইমারতরাজী অথবা রাজপ্রাসাদ। হয়তো বা আমার সমাধি স্থলে রচিত হবে কারো বাসর। সূচিত হবে নতুন জীবন, অথবা পাতবে কেউ মৃত্যু শয্যা। এমনও হতে পারে আবার কেউ হয়তো এখানেই শেষ শয্যা গ্রহণ করবে। কোন মালি হয়তো রচনা করবে ফুলের বাগান আমার সমাধিতে।‘মোর কবরে ফুটবে যে ফুল। না জানি তা কার তরে।’
চির বিস্মরণের পাড়ে চলে যাব আমি। কেউ বলবে না এই বাড়িতে, এই গৃহকোণে, এই নামে কেউ একজন ছিল। হাসি কান্না দিয়ে ভরে রেখেছিল এই নিভৃত গৃহকোন। এই প্রাঙ্গন একদিন কারো পদচারণায় মুখরিত ছিল। এই আমার পরিচর্যায় বৃদ্ধি পেয়েছিল ঐ বৃক্ষ, ঐ তরুলতা, যার শীতল ছায়া, সুমিষ্ট ফল, আমার স্নেহ মাখা উপহার হয়ে তাদেরকে তুষ্ট করছে। পার হয়ে যাবে শত শত বছর। ভুলে যাবে পরবর্তী বংশধরগণ আমার নাম। এই নামে কাউকে তারা চিনবে না, জানবে না। আমার কর্মফল পড়ে থাকবে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অনন্ত কালের গর্ভে আমি বিলীন হয়ে যাব। আর কোনদিন কোন কালে আমার পদচিহ্ন পড়বে না এই বাটে। আমার আত্মা অর্থাৎ এই আমি বাকহীন, শক্তিহীন পদ্মা, যমুনা বিধৌত বঙ্গ ভূমিতে আরো একটিবার দেহ ধারণের তৃষ্ণা নিয়ে বাতাসের সঙ্গে ঘুরে বেড়াব।
১লা এপ্রিল, ১৯৯৪
ড্রাম ফ্যাক্টরি, ঢাকা ১২০৬.

No comments:
Post a Comment