১৯৫৩ সাল।
গ্রাম বাংলার গভীরে শিক্ষার আলো প্রবেশ করে নাই। লেখাপড়ার জন্য শহরে যেতে হত। শহরে যাবার পথ ছিল মেঠো পথ। বাড়ী থেকে রেল স্টেশন পাঁচ মাইল দূরে। হাঁটা একেবারেই সম্ভব নয়। পায়ে হাঁটা অপ্রশস্ত রাস্তা। তাই ডুলিতে চড়ে খুব ভোরে রওনা হয়ে ‘ধলা’ রেল স্টেশনে পৌঁছাতে হত। গন্তব্য বিদ্যাময়ী ইংরেজি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়,ময়নসিংহ। দেশের সেরা স্কুল যার ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে আমার প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন শুরু।
আমাদের অঞ্চলে আমার পিতা –ই একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন। কলিকাতা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯১৯ সালে এন্ট্রাস পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন যে বছরে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন সে বছরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আমার পিতার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা পাশ করার ফলে এলাকায় বিপুল সাড়া পড়ে যায়। একটি অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে একটি আলোর শিখা যেন প্রজ্জ্বলিত হয়। তিনি নান্দিনা মহারাণী হেমন্ত কুমারী উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। নান্দিনার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ও শিক্ষকদের সঙ্গে তিনিও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি একজন সুশিক্ষিত, তেজস্বী পুরুষ ছিলেন। নারী শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। তিনি গ্রামে আমাদের বাড়ি সংলগ্ন স্থানে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। আমার হাতে খড়ি আমার মায়ের কাছে। বাড়িতে যেহেতু লেখা পড়ার প্রচলন ছিল, সওগাত, মাসিক মোহাম্মদি, বেগম –এসব ম্যাগাজিন আমাদের বাড়িতে আসতো। আমার জন্য ছিল নানারকম বই। বাংলা, ইংরেজী, ঊর্দু, আরবী, ধারাপাত বই আরও অনেক আমার উপযোগী বই। মক্তবে আমার পড়াশুনা করার মত কিছু ছিলনা। সেজন্য মৌলবী (শিক্ষক) সাহেবের নির্দেশে লম্বা ঘোমটা টানা আট, নয় বছর বয়সের মেয়েদেরকে আমি পড়াতাম। শিক্ষক যেহেতু পুরুষ সেজন্য আমাকেই তাদেরকে পড়াতে হত। আমার পিতার উদ্দেশ্য ছিল আমাকে দেশের সেরা স্কুলে পড়াবেন। সেটি ছিল বিদ্যাময়ী স্কুল, ময়মনসিংহ। ১২ বৎসর না হলে হোস্টেলে সীট পাওয়া যায় না। তিনি তার আগেই ষষ্ঠ শ্রেণীতে আমার ভর্তির ব্যবস্থা করে ফেলেন। আমিই প্রথম ঐ অঞ্চলে, এই ডুলিতে চড়ে শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি । তখন মেয়েদের জন্য ছিল বাঁশের তৈরি ডুলি। স্থানীয় ভাষায় খাট। উৎসবের জন্য ছিল পালকি। কাঠের তৈরী, নকশাদার,ভারী,বড় আকারের। ঘাড়ে বহন করবার জন্য কাঠের দন্ড – কারুকাজ করা। ছয়জন বেহারা বহন করত। ডুলি বহন করতো দুই বেহারা। ডুলি ছিল বাঁশের তৈরী চারকোণার একটি খাঁচা। যথেষ্ট শক্ত। ভেতরে একজন মানুষ সোজা হয়ে বসতে পারে। তার উপরিভাগে একটি শক্ত মোটা বাঁশ,বেশ লম্বা,যা কিনা বেশ শক্ত করে ঐ খাঁচাটিতে বাঁধা আছে। ছিঁড়ে পড়ে যাবার কোন সম্ভাবনা নেই। বাহনটি ছিল মূলতঃ মেয়েদের জন্য। মহিলারা এত পথ হাঁটতে পারেনা। কারণ তাদের কোলে থাকে শিশু এবং পর্দা রক্ষারও একটি ব্যাপার আছে। ডুলি একটি শাড়ি বা অন্য যে কোন কাপড় দিয়ে ঘেরা থাকতো। যাত্রী মহিলাটির সঙ্গী বা প্রহরীর পা দু’খানাই সম্বল। বেহারাদের সঙ্গে সে দ্রুত পদসঞ্চারণে পথ চলতো।
বেহারা, যারা ডুলি বা পালকি বহন করতো তাদেরকে আমরা স্থানীয় ভাষায় ‘মাড়োয়া’ বলতাম। বেহারারা ছিল উড়িয়া। হিন্দি –উর্দু মিশ্রণে একরকম বিচিত্র সুরে কথা বলতো। তাদের গাত্রবর্ণ কৃষ্ণবর্ণও নয়,ফর্সাও নয়। বেশ উঁচা লম্বা গড়ন। মালকোঁচা দেওয়া ধুতি খাটো করে পরা। তাদের সঙ্গে কখনও তাদের পরিবার দেখি নাই। সম্ভবতঃ তারা নিজেদের দেশ হিন্দুস্থানে নিজেদের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতো। আমাদের এদিকে তারা সাধারণতঃ ধনী বাড়ির দিঘির চওড়া পাড়ে ঘর তৈরী করে বসবাস করতো। তারা সবসময়ে দলবদ্ধ হয়ে বাস করতো। অনেকে অনেক সময়ে হাট বাজারের উপকন্ঠে আশ্রয় কেন্দ্র তৈরী করে থাকতো। তাদের দলে একজন সর্দার থাকতো। আমাদের বাড়ির কাছের দলের সর্দারের নাম ছিল ‘আঁউতার’। ছাতু ছিল তাদের প্রিয় খাদ্য। ভাত, রুটিও খেত। আমরা বাঙালীরা সেই সময়ে আটার রুটি চিনতাম না। শুকনো তামাক পাতা হাতের তালুতে কচলিয়ে পাউডার করে মুখের ভেতরে মাড়ির ফাঁকে দিয়ে রাখত। সেটাকে বলা হত ‘খইনি।’ অবসরে বৃক্ষ ছায়ায় বসে তারা খইনি বানাত। কোন সঙ্গী সাথী আসলে তারা তদের নিজেদের ভাষায় জিজ্ঞেস করতো,
'কা -হো? (কি কর?)
খইনি খা –ল –বা ? (খইনি খাবা?)
সওয়ারি বহন করাই ছিল বেহারা বা মাউরাদের একমাত্র কাজ। গ্রাম –গ্রামান্তরে তারা সারাদিন সাওয়ারী বহন করতো। যাত্রী অবশ্যই মহিলা। ডুলি একাধিক যাত্রী বহন করবার উপযুক্ত বাহন নয়। তবে পালকিতে দু’জন বসতে পারতো,যেমন বর –কনে। সেক্ষেত্রে ছয়জন বেহারা থাকতো। হাতে লাঠি। স্কন্ধে গামছা। বেহারাদের পারশ্রমিক ছিল শুকনো খাবার চাউল,চিড়া,মুড়ি,গুড়।
চলার পথে দ্রুত পদচারনার সাথে সাথে বেহারারা একরকম শব্দ করতো –হুঁম্, হুঁম্, হুঁম,... একই তালে, একই ছন্দে । দুই বেহারা এগিয়ে চলতো একই তালে একই সুরে। হয়তো এতে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পেত। ভারি বস্তু বহন করবার সময় একটু দৌড়ের প্রয়োজন হয়। তাতে মাল বহন করা এবং গন্তব্যে পৌঁছা সহজতর হয়।
স্টেশনে পৌঁছালে ঝিক ঝিক শব্দ করে রেলগাড়ী আসতো। বেহারাদের পায়ের গতি বৃদ্ধি পেত। আমি তখন ছোট একজন সওয়ারি। দুই বেহারা নৃত্যের তালে তালে অপেক্ষাকৃত কম সময়ের মধ্যে ধলা স্টেশনের নিকটবর্তী হত। একদিকে মায়ের জন্য কান্না, ছায়া সুনিবিড় গ্রামের জন্য বেদনা বোধ, অন্যদিকে পথের পাঁচালীর অপু দুর্গার মত রেলগাড়ি দেখার কৌতূহল আমাকে আন্দোলিত করত। রেলগাড়ি গফরগাঁও স্টেশন ছেড়ে আসার পর পরেই তার হুইসেল এবং শব্দ শোনা যেত। রেল লাইনের ওপারে স্টেশন। ট্রেনের ভারে রেল লাইনেও এক রকম কম্পন অনুভূত হত। আমার বাহন ডুলিও এসে থামতো। এসব স্টেশনে ট্রেন কখনও পূর্ণ বিরতি নেয় না। গতি কম করে মাত্র। আমার ভাইয়েরা আমাকে ডুলি থেকে টেনে বের করে ট্রেনের ‘জেনানা’লেখা কামরায় ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিত। বেহারা, ডুলি আবৃত করে রাখা শাড়িটি খুলে দ্রুত কামরার জানালা দিয়ে ভিতরে ছুঁড়ে দিত। তারপর আমার ভাইয়েরা দ্রুত পাশের কামরায় উঠে পড়তেন ট্রাঙ্ক, স্যুটকেস, বেডিং নিয়ে। দুই বেহারাকে আট আনা অর্থাৎ ৫০ পয়সা দিতেন। কুলিকে দিতেন ২৫ পয়সা। ট্রেনের গতি বৃদ্ধি পেত। ট্রেনের কামরায় মাত্র কয়েকজন যাত্রী থাকত –অবশ্যই মহিলা। ব্যক্তিগত গল্পে তাদের সময় কেটে যেত, যেন তারা কত কালের পরিচিত। গল্প গুজব, পান কিমাম খাওয়ার আদান প্রদানে যত ব্যক্তিগত, পারিবারিক – সব গল্প চলতে থাকতো। আমি রেলগাড়ির ভেতরের চেহারা দেখতাম, আরো দেখতাম বাইরের সব গাছ –পালা, মাঠ –ঘাট, ক্ষেত –খামার উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছে। দেখে স্তম্ভিত হতাম। কি কারণে উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছে তার কোন কারণ বোধগম্য হতো না।
ডুলি প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলতে হয়। আমার আম্মা তাঁর ছোট বেলায় লাখ্নৌ-তে থাকতেন তাঁর ভাইদের সঙ্গে। তিনি বলেছেন,লাখ্নৌ শহরের অলিগলি ভরা ছিল ডুলিতে। এখনকার সময়ে আমাদের দেশের রিকশার মত। যার যখন দরকার ডুলিকে ডেকে নিত এই বলে,'ও ডোলি ওয়ালা,ইধার আও।'ধনী লোকেরা ঘোড়ার গাড়িতে যাতায়াত করতেন। তখন সময় ১৯২০ থেকে ১৯২৬ সাল। অন্য কোন যানবাহন সে সময়ে ওনাদের চোখে পড়েনি। আজকের এই একবিংশ শতাব্দী থেকে সেই সময় কত দূরে!

No comments:
Post a Comment