বঁধুয়া,
ভেবেছি তোমায় কিছু লিখবো। অনেক দিন লিখতেও চেয়েছি। কিন্তু কেন যে লিখিনি তা আর না বলেও পারছিনা । যদিও তুমি নির্বাক শ্রোতা জানি তবুও তোমায় বলে শান্তি, পাব বলেই লিখছি। কারণ আমি এতদিন ধরে কেবল তোমার মতই একজন নির্বাক বন্ধুর সন্ধানে ইতঃস্তত ঘুরেছি। কিন্তু জানতাম না যে তুমি আমারই কাছে আমারই সাথে একান্ত আমারই হয়ে আছো। অন্ধ আমি তাই হয়তো তোমার জন্যই তোমাকে চিনিনি। যাক্, যা বলছিলাম, যা বলার জন্য তোমাকে আমার প্রয়োজন-হ্যাঁ প্রয়োজনই বটে। প্রয়োজনের বন্ধনেই আমরা বাঁধা।
অনন্তকালের মধ্যে ক্ষনিক হলেও আমার জীবনের বহু বছুর আমি পাড়ি দিয়েছি। এক অধ্যায় শেষ করেছি আরো অধ্যায় খুলেছি। জীবনে নূতন সিলেবাস পাঠ করেছি। নূতন পরীক্ষা দিয়েছি। ফল কি পেয়েছি জানি না তবে মনে হয় যা পেয়েছি তা নেহায়েত মন্দ নয়। আর সেটা হলো অভিজ্ঞতা যা বঞ্চিতের মনে জাগায় বিভীষিকা, শিহরণ আর আরেক শ্রেণীর মনে জাগায় আশার আলো, সুখ আর শান্তি। জীবনের অনেকগুলো দিনই আমাকে অনেক কথা বলেছে। কিছু শুনেছি কিছু শুনিনি। আবার হয় তো কিছু শুনেছি ভুলে যাবার জন্যই। কতবার হাসি গানের ভিতর দিয়ে কল কল্লোলে অনন্ত প্রবাহের একটি ছোট ধারাকে মিশিয়ে দিয়ে অজনা পানে চলেছি। আবার হয়তো পথ চলতে চলতে পেয়েছি প্রচন্ড আঘাত। আঘাত কোন এক ভাসমান পদার্থের সাথে। কিন্তু সেটা সেই ক্ষণকালের জন্যই। পর মুহূর্তেই দুজনে দুমুখী হয়েছি। কেননা সেও যে ভাসমান-আমার মত অস্থায়ী আমারই মত দুঃখী অথবা সুখী।
ধাক্কাটা ঘা দিয়ে গেল তা ক্ষণিকের আর ঘা রেখে গেল তা স্থায়ী কালের। ঘা-কে আমরা সাধারণ ভাবে স্মৃতি বলে থাকি যার বিরাট গহ্বরের প্রবল আকর্ষণে প্রতিটি মুহূর্তে-প্রতিটি ক্ষণ ছুটোছুটি করে প্রবেশ করে যাচ্ছে। আমাদের ফেলে আশা দিনগুলিও মধুর হয়ে পড়ে। মনে হয় এই ই ভালো ছিল। ও রকম না হলে আজকের দিনের এই করুণ অথচ আনন্দমুখর দিনটির সাক্ষাত পেতাম না। জীবনের অনেক আনন্দমুখর অনেক বিরহ বিধুর অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। জীবনকে উপলব্ধি করেছি নতুন করে। চিনেছি বিভিন্নরূপে। চিনেছি যেটা দুঃখের সেটাই সুখের। যেটা তিক্ত সেটাই মধুর। যেটা বেদনা দায়ক সেটাই আবার ভবিষ্যতের কোন এক অজানা আনন্দের সম্ভার তৈরী করে আমাকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছে। সংঘাত দ্বন্দ, আনন্দ, বেদনা, বিরহ, মিলন পাওয়া আর হারিয়ে ফেলা এই তো জীবন।
১৩. ৫.১৯৬১
*****
সাহিত্য পর্যালোচনা: “বঁধুয়া”
লেখাটির প্রধান বৈশিষ্ট্য অন্তর্দর্শন ও আত্মকথনের প্রবলতা। এটি একধরনের চিঠির মতো, যেখানে লেখক তার ‘বঁধুয়া’—অর্থাৎ একান্ত নীরব বন্ধুর উদ্দেশ্যে মনের গভীর অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। এখানে “নির্বাক শ্রোতা” এবং “নির্বাক বন্ধু”-র প্রসঙ্গ এসে লেখার একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা ও অন্তর্লোকের আত্মসংলাপকে উন্মোচিত করেছে। লেখক বলেছেন, “তুমি আমারই কাছে আমারই সাথে একান্ত আমারই হয়ে আছো”—এটি আত্ম-অন্বেষণ এবং নিজের সত্তার সঙ্গে বোঝাপড়ার এক অনুপম উদাহরণ।
২. ভাষার সৌন্দর্য ও সাহিত্যিক গুণ
গদ্যটি আবেগময়, সূক্ষ্ম অনুভূতির বর্ণনায় সমৃদ্ধ। ভাষা সহজ, সরল, কিন্তু গভীর; অলংকারের ব্যবহারও লক্ষ্যণীয়—“অন্ধ আমি তাই হয়তো তোমার জন্যই তোমাকে চিনিনি”, “জীবনের বহু বছুর আমি পাড়ি দিয়েছি”, “নূতন সিলেবাস পাঠ করেছি”—এসব বাক্যে রূপক ও উপমার প্রভাব স্পষ্ট। লেখাটি নাতিদীর্ঘ বাক্য আর দীর্ঘশ্বাস-সদৃশ প্রকাশভঙ্গিতে একধরনের স্মৃতিমেদুর মায়া তৈরি করে।
৩. জীবনদর্শন ও অভিজ্ঞতার ব্যঞ্জনা
লেখক জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়, আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। এখানে জীবনকে তিনি এক চলমান যাত্রা ও পরীক্ষার সাথে তুলনা করেছেন—“নূতন পরীক্ষা দিয়েছি”, “ফল কি পেয়েছি জানি না”—এই ধরনের বাক্যে জীবন-দর্শনের সার্বজনীনতা প্রতিফলিত হয়েছে।
লেখক উপলব্ধি করেন, দুঃখ এবং সুখ, বেদনা ও আনন্দ, বিচ্ছেদ ও মিলন—সবই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। “যেটা দুঃখের সেটাই সুখের”—এই উপলব্ধি লেখাটিকে এক গভীর দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
৪. চিত্রকল্প ও স্মৃতিচারণা
গদ্যাংশে স্মৃতিচারণা ও অভিজ্ঞতার বর্ণনা অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে এসেছে। ছোট ছোট দৃশ্য, জানা-অজানা পথ চলার অভিজ্ঞতা, অজানা কারও সঙ্গে ক্ষণিকের সংঘর্ষ, আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া—এসব জীবনের বহমানতা ও অনিশ্চয়তার চিত্র আঁকে।
“ঘা-কে আমরা সাধারণ ভাবে স্মৃতি বলে থাকি”—এখানে অতীতের ব্যথাকে স্মৃতির গভীর গহ্বরে রূপান্তরিত করার একটি চমৎকার চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে।
৫. উপসংহার
গদ্যটি স্বগতোক্তির আদলে লেখা, যেখানে আত্মান্বেষণ, নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি, দুঃখ-সুখের দ্বন্দ্ব এবং জীবনের নানা অভিজ্ঞতা একমিল হয়ে গেছে। ভাষার সাবলীলতা, আবেগের আন্তরিকতা এবং জীবনদর্শনের গভীরতা লেখাটিকে হৃদয়গ্রাহী এবং সাহিত্যিক মানে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।
এটি নিঃসন্দেহে বাংলা আত্মকথনধর্মী গদ্যের এক সুন্দর নিদর্শন, যেখানে প্রতিটি পাঠক নিজের জীবন ও অনুভবকে খুঁজে পেতে পারেন।
*****
No comments:
Post a Comment