রাস্তার পাশের বাড়িতে বসবাস করবার উপকারিতা আছে, মজাও আছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একই লোক একই সময়ে ঐ রাস্তায় চলাচল করে। প্রায় প্রতিদিনই দেখতাম একটি লোক ধীরে ধীরে হেঁটে এসে রিক্সায় উঠতো। পরিধানে তার লাল কালো অথবা নীল রঙের পোশাক। আপাদমস্তক। অর্থাৎ তার লুংগি, কুর্তা, পাগড়ি একই রঙের। লম্বা, ফর্সা, বৃদ্ধ, শীর্ণকায়া লোকটি। দীর্ঘদিন একই দৃশ্য অন্তরে কৌতূহল জাগায়। একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে, সে একজন কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি। বহুকাল ধরে এই কবরস্থানের পাশে এই দীঘির ঘাটে বাস করে। দীঘির ঘাটটি শান বাঁধানো। গম্বুজ বিশিষ্ট একটি স্নানঘর আছে, সুদৃশ্য। বিরাট পুকুরটি অতীতের কোন ধনবান ব্যক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কেবল ঘাটই নয়, পুকুরটির চারপাশ নক্সা করা দেয়ালে ঘেরা –সুরক্ষিত ও বটে। পুকুরটির তিন দিকে কবরস্থান। সম্প্রতি কবরস্থান উঠে যাওয়ায় পুকুরের অপর পাশে ঐ বিরাট বটবৃক্ষের গোঁড়ায় তাকে থাকতে দেয়া হয়েছে। লোকটি এখন রোগমুক্ত। লোকটির নাম করম আলী শাহ্।
ভূমিষ্ঠ হয়েছিল মুষ্টিবদ্ধ হাতে বাঁচার অংগীকার নিয়ে। সেদিন সমারোহ না হোক, অনন্দ হয়েছিল তাদের গৃহে। কারণ সে ছিল পিতামাতার পুত্র সন্তান। আশার আলো জ্বলবে ঘরে, সংসারে আনয়ন করবে সমৃদ্ধি আর উন্নতি।
করম আলী শাহ্ বাঁচার জন্য এসেছিল। বেঁচেও ছিল অনেকদিন। কিন্তু সে বাঁচা কেমন বাঁচা, আমার গল্পে তাই –ই ব্যক্ত হয়েছে। করম আলী শাহ্ এক অভিশপ্ত ব্যাধির শিকার হয়। যার নাম কুষ্ঠ। টগবগে যুবকের আলোক লতার মতন ঝলমলে জীবন। শক্তিতে, আবেগে, আনন্দে, উচ্ছ্বাসে ভরপুর যৌবনে, জীবন তরী বেয়ে যায় সে। হঠাৎই একখন্ড কালো মেঘ কোথা হতে উড়ে এসে তার উপর ছায়া ফেলে। করম আলী শাহ্’র অসুখ ধরা পড়ে। ঘনঘোর অন্ধকারে এক ঘূর্ণিঝড় তার জীবন নৌকাখানিকে প্রচন্ড বেগে কয়েক পাক ঘুরিয়ে জলদেশের অতলে কোথায় নিয়ে গেল, কে জানে! তারপর শুরু হল তার দুর্বিষহ জীবন। আপন গৃহ, আপন পরিবার হতে বিতাড়িত হয় সে। প্রথমে নির্জন নদী তীরে পর্ণকুটিরে বন্য পশু পাখিদের সঙ্গে বসবাস। পরে সেখান হতে বহিষ্কৃত হয়ে পরবাস অর্থাৎ গ্রাম ছেড়ে শহরে। যেখানে সবাই পর, কেউ আপন নয়। অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তান হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন। ভিক্ষা গ্রহণ করবার মত ঘৃণ্য কাজ যে আর নাই –তা সে কল্পনাও করতে পারে নাই। কাজটি বড় কঠিন কাজ। মানুষ বড় নির্দয়, ভিক্ষা দিতে চায় না। তবুও পেটের দায় বড় দায়।
ইচ্ছে করে মানুষ মরতে পারে না। করম আলী শাহ্ এই রোগগ্রস্ত দেহ ত্যাগ করবার জন্য প্রস্তুত ছিল। যমদূত অন্যদিকে ব্যস্ত থাকায় তার কথা ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু জীবন তাকে ছাড় দেয়নি, মৃতের চাইতে অধম করে রেখেছিল। দীর্ঘকাল রোগ ভোগের পর রোগমুক্তি হয়েছিল তার। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া হস্তপদের অনেকাংশ ফেরৎ পায়নি সে। হয়নি তার মনুষ্য সমাজে পুনর্বাসন। মানুষ হিসাবে সে আর স্বীকৃতি পায়নি। পরিত্যক্ত মনুষ্যরূপী প্রাণী হিসাবে খাদ্যের অন্বেষণে দিন কাটাতো। রাতে কবরস্থানের এক কোণে মৃতদের পাশেই নিদ্রার আবেশে ফেলে আসা অতীতের স্বপ্নীল জীবনে ঘুরে বেড়াত। সেই সুদূর অতীতে প্রায় ৭৫ বৎসর পূর্বে সে লিখতে পড়তে শিখেছিল। সন্ধ্যায় দোকানে বসে কন্ঠের দরদ দিয়ে পুঁথি পাঠ করতো। গ্রামের লোকদের চিঠি পড়ে দিত। তার কন্ঠে মধু ছিল, হৃদয়ে আবেগ ছিল, চেহারায় সৌন্দর্য্য ছিল, অন্তরে সৃজনশীলতা ছিল। কোথায় গেল সব!
আমার বাসস্থান হতে প্রায় ৫০০ গজ দূরেই ছিল তার জীর্ণ কুটির। সেই কবরস্থানের পাশে সেই বিরাট রাজকীয় দীঘি। তার অপর পাশে এক কোণে আছে এক বিরাট বট বৃক্ষ। শতবর্ষের প্রাচীন তো বটেই। বিশাল এলাকা জুড়ে তার শাখা প্রশাখা বিস্তৃত। তার গুড়িটির পরিধিও খুব বড়। তার বৃহৎ মূল মৃত্তিকার বহু গভীরে প্রোথিত। বৃক্ষের গোঁড়া ঘেঁষে ছিল করম আলী শাহের ক্ষুদ্র নিবাস। ঘরের ভেতর একটি টিনের মাঝারি সাইজের ট্রাংক। আর তার দৈনন্দিন ব্যবহার্য দ্রব্যাদি। আর ছিল গাঢ় নীল, গাঢ় লাল আর কালো বর্ণের লুঙ্গি,পাঞ্জাবী,পাগড়ির সেট। প্রতিক্ষণের সঙ্গী একখানি লাঠি, ঝোলা আর পানীয় জলের ছোট একটি ক্যান।
তারপর বেশ কিছুদিন আর তাকে রাস্তায় যাতায়াত করতে দেখিনা। যে লোকটি আমাকে করম আলী শাহের খবর দিত তাকে জিজ্ঞেস করায় সে উত্তর দিল, সে তো বহুদিন আগে, বছরখানেকের উপরে হবে, চলে গেছে। বললাম, চলে গেছে মানে?
- কোথায় চলে গেল?
- তিনি তো মারা গেছেন!
- মারা গেছেন? কই শুনিনি তো?
- শুনবেন কি করে। গরীব মানুষ, অসুস্থ, বয়সের ভার। উঠতে বসতে পারছিলেন না। তারপর একদিন...।
- আমার কন্ঠের ব্যাকুলতা দেখে লোকটি আর কিছু বললো না।
করম আলী শাহ্ যে জনমানবহীন কবরস্থানের পাশে আস্তানা গড়েছিল, সেখানে এখন একটি পীরের মাজার ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। মৃতের সমাধিস্থলে এখন গড়ে উঠেছে জীবন্ত মানুষের আধুনিক সুদৃশ্য আবাসিক অট্টালিকা। সেজন্য আবাসিক এলাকা পাহারা দেবার জন্য করম আলী শাহের আস্তানার অদূরেই ছিল সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা রক্ষীদের ব্যারাক। ওরাও তার খোঁজ খবর রাখতো। একটি লোক নিয়োগ করেছিল করম আলী শাহ্ নিজেই। সেই তাকে দেখাশুনা করতো, রান্না বান্না করে দিত। তখন করম আলী শাহ্’র চলাফেরার ক্ষমতা ছিলনা। বাইরেও যেতে পারতো না।
লোকটি আরোও বললো, তার কেউ ছিলনা। সরকারি কবরস্থানে তার দাফন হয়েছে। মৃত্যু যাকে দয়া করে নাই, জীবন তাকে মেরে রেখে দিয়েছিল।
‘জিসে মওত নে না পুছা
উসে জিন্দেগি নে মারা।’
জানিনা তার আত্মা এই মনুষ্য দেহ থেকে মুক্ত হয়ে কেমন আছে!
মানুষের থাকে বাঁচার শখ। করম আলী শাহের ছিল মরবার শখ। রাস্তার পাশে বসে থাকতো মানুষের একটু দানের আশায়। মানুষেরা বড় নিষ্ঠুর, ভিক্ষা দিতে চায় না। করম আলী শাহ্ কত তরতাজা মানুষকে মরতে দেখেছে এই রাজপথে। কতজনকে দেখেছে প্রিয় স্বজন পরিবৃত্ত হয়ে সমাধিস্থলে যেতে। আজ এতদিন পরে আজরাঈলের সময় হলো। সে করম আলী শাহের দরজায় আঘাত করলো। ইচ্ছে ছিল যমদূতকে দেখবে। একবার –শেষবার। কিন্তু সে সুযোগ যে পায়নি। কেমন যেন ঘনঘোর অন্ধকার তার চোখের আলো কেড়ে নিল। প্রথম কুষ্ঠ রোগের সংবাদ শুনে যেমন তার চেতনার অবলুপ্তি ঘটেছিল, এবারও যেন তাই হলো। সেজন্য মৃত্যুর হীমশীতল পরশখানি তার উপলব্ধির বাইরে থেকে গেল। জীবন এবং মৃত্যুর কোন আশাই পূরণ হলো না। সবই সেই অচেনা, অজানা, অদৃষ্টের হাতে তোলা রইলো। নিঃসংগ করম আলী শাহ্ নিভৃতে, নিশীথে, নীরবে, নিঃশব্দে, নির্জন কুটিরে তার জীর্ণ, শীর্ণ, দীর্ঘ দেহখানি ফেলে রেখে চলে গেল।
করম আলী শাহ্র ছোট্ট কুটিরের কি অবস্থা জানতে চাইলাম। লোকটি বললো, সে তো কবেই আর্মি এসে ভেঙ্গে পরিষ্কার করে রেখে গেছে। এটা আর্মির জায়গা তো! করম আলী শাহ্কে থাকতে দেওয়া হয়েছিল তার আশ্রয় ছিলনা বলে।
অন্তরে বেদনা অনুভব করলাম। একজন মানুষের জীবন কি? দীর্ঘকাল এই পৃথিবীর আলো বাতাসে জীবন সংগ্রাম করে অন্তিম মুহূর্ত অতিক্রম করে চলে গেছে। কেউ আজ জানবে না –এখানে কেউ ছিল! এই প্রাচীন বৃক্ষ তাকে আশ্রয় দিয়েছিল, ছায়া দিয়েছিল, বাতাস দিয়ে তার দেহমন শীতল করেছিল। সেই আশ্রয়দাতা বিরাট বটবৃক্ষই আজ করম আলী শহের জীবন –মরণের নীরব সাক্ষী। তারই দীর্ঘশ্বাস তার পত্র –পল্লবে মর্মরিত হয়।
০৪.০১.২০১৪