Showing posts with label দাসপ্রথা. Show all posts
Showing posts with label দাসপ্রথা. Show all posts

Sunday, May 31, 2026

দাসপ্রথা উচ্ছেদ হয়েছে কি?


দাস প্রথা একটি প্রাচীন প্রথা। সেই সুদূর অতীত কাল থেকেই যারা স্বচ্ছল মানুষ, তারা সম্পদহীন মানুষের সেবা গ্রহণ করবার নিমিত্তে তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখতো। শুধু তাই নয়, গরু ছাগলের মতো তাদেরকে, খোঁয়াড়ে রাখা হতো এবং শৃংখলিত অবস্থায় বাজারে বিক্রি করা হত। ক্রেতাগণ তাদের দাঁত দেখে, চোখ দেখে, হস্তপদ ঠিক আছে কিনা, অসুখ –বিসুখ আছে কিনা এইসব পরীক্ষা করে দরদাম করে ক্রয় করে বাড়িতে নিয়ে যেত। এরাই ক্রীতদাস। বংশ পরম্পরায় এই সকল দাসেরা অহর্নিশি তাদের মালিকদের খেদমতে নিয়োজিত থাকতো। সামান্য ত্রুটি –বিচ্যুতিতে তাদেরকে চাবুক দিয়ে বেদম প্রহার করতো। তাদের কোন বিশ্রাম ছিল না। নূন্যতম মানুষের মর্যাদা দেওয়া হতনা। জীবন্ত মানুষের অঙ্গ –প্রত্যঙ্গ কেটে ভিতরে কেমন আছে তা দেখতে দ্বিধা করতো না। হজরত রাবেয়া বসরী তার উদাহরণ।

সুদূর আফ্রিকা (কৃষ্ণ মহাদেশ -Dark continent) থেকে চতুর মার্কিনীরা কালো মানুষদেরকে ধরে নিয়ে যেত জাহাজ বোঝাই করে। ফাঁদ পেতে তাদেরকে ধরা হতো। এমনকি পশু পাখির মত জাল ফেলে  তাদেরকে ধরা হত। এটা একটা ব্যবসা ছিল তখনকার দিনে। 

দি রুটস্‌ ছবিটি দেখলে দাস প্রথার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ধনী ব্যক্তিরা দাসদের ঘাড়ে পা রেখে, তাদেরকে অত্যাচারে জর্জরিত করে নিজেরা আরামে, আয়াশে দিন কাটাতো। ক্রীতদাসরা বংশ পরম্পরায় তাদের সেবা করতো।

আমেরিকার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন একজন মহামানব ছিলেন। মানবতার এই অপমান, অমর্যাদা তার অন্তরকে ব্যথিত করে। তিনি আন্দোলনে নামেন। শেষে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ বাঁধে। প্রচন্ড যুদ্ধ হয় ক্রীতদাস প্রথার পক্ষে ও বিপক্ষে। তারপর গেটিসবার্গ এড্রেসে –১৮৬৩ সালের ১লা জানুয়ারি তিনি ঘোষণা করেন যে ক্রীতদাস রূপে যারা বন্দী রয়েছে, তারা এখন থেকে মুক্ত, স্বাধীন।

এতে ধনী সাদা মানুষেরা ক্রুদ্ধ হল। তাদের অন্তর থেকে কালো মানুষের শরীরের কালি কিছুতেই দূর হলো না। কৃষঙ্গরা তাদের দৃষ্টিতে কালো এবং ঘৃণ্যই রয়ে গেল। 

দাস প্রথা আজ নেই। বাজারে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য খোঁয়াড় নেই, ক্রয় বিক্রয় নেই। কিন্তু বাস্তবে প্রথা না থাক, দাসত্ব উচ্ছেদ হয় নাই। শ্রেণী প্রথা অর্থাৎ ধনী দরিদ্রের পার্থক্য অতিশয় প্রকটভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে দরিদ্রের সেবা গ্রহনের প্রচলন খুবই আছে। স্বল্প মূল্যে তাদের শ্রম ক্রয় করে ধনী ব্যক্তিরা। সেই শ্রমলব্ধ ফসল বা উৎপাদিত পণ্য বা দ্রব্যাদি অধিক মূল্যে বিক্রি করে ধনীরা আরো ধনবান হয়। শ্রমদাতাগণ শ্রমিক নাম নিয়ে জীবন ধারণের কঠোর চেষ্টায় লিপ্ত হয়। 

কোথায় সভ্যতা, কোথায় আলো, কোথায় উন্নতি, তারা তার খোঁজ পায় না। রাজপথের সোডিয়াম বাতি আর হাজার গাড়ির বহর দেখে তারা অবাক বিস্ময়ে। রাত্রির কয়েক ঘণ্টা বিরতি বাদে বাকি সময়টুকু ওরা কারখানায় তথাকথিত ‘পোশাক শিল্পের’ ফ্যাক্টরিতে বন্দী থাকে। অনেক কারখানায় রাতেও ছুটি নেই। ওভার টাইম খাটায়। কিন্তু পারিশ্রমিক বাকী থাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। শ্রমিকদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে না মালিকেরা। অশালীন সম্বোধন, অশ্লীল শব্দাবলীর ব্যবহার, এমনকি মারপিট করতেও দ্বিধা করে না। আর ছাটাইয়ের ভয়তো আছেই। যে বেতন পায় তা দিয়ে খেয়ে পরে বেঁচে থাকা বলে না। তাই তাদেরকে মানবেতর জীবন যাপনের গ্লানি বহন করে চলতে হয়। 

সাভারে মাত্র সেদিন ২৪শে এপ্রিল পোশাক কারখানায় হিরোশিমা, নাগাসাকির মত মুহূর্তে যে ঘটনা ঘটে গেল, তা সকলেই অবগত আছেন। এসব ঘটনা দাস প্রথাকে হার মানায়। দফায় দফায় অগ্নিকান্ড, বিল্ডিং ধসে যাওয়া নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা এ দেশে। এইসব শ্রমিকদের প্রাণ রক্ষায় বা স্বার্থ রক্ষায় কোন আইন নেই। মালিকেরা ধরা ছোঁয়ার  বাইরে থেকে যায়। কারণ তারা জানে কিছুদিন পরে এইসব মর্মান্তিক ঘটনার কথা মানুষ ভুলে যাবে। তাই তারা অনেকেই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর ভিতরে সন্ধ্যার পর জরুরী মিটিং করার নামে বসে বসে আনন্দ, আড্ডায় মত্ত হয়, এবং কি করে আরো বেশী টাকা কামাই করতে পারবে এইসব হতদরিদ্র মানুষের রক্ত শোষণের বিনিময়ে সেই উপায় নির্ধারণের কৌশল আবিষ্কার করেন। 

এসব দেখে শুনে মনে হয় দাস প্রথা আজও সমাজে প্রচলিত আছে –পূর্বের চাইতে অধিক পরিমাণে আরো নিষ্ঠুর, আরো মর্মান্তিক ভাবে। দাস প্রথার অবসান হয়নি। মানুষ সরাসরি বাজারে বিক্রয় না হলেও, মানুষের ঘামেভেজা শ্রম বিক্রি হচ্ছে দিবা –রাত্রি!  

........................

শিশু শ্রম -১৯৯৭