Tuesday, March 24, 2026

এক টুকরো হাসি

 কি বলছো? আমি ডাক্তার? হ্যা, আমি ডাক্তার। ডাক্তারই তো! আমি তো লোকের কাছে চিকিৎসক হিসেবেই পরিচিত। মৃত্যু যখন অন্ধের মত আবাল –বৃদ্ধ –বনিতা, সকলকেই ভূ-স্বর্গের কানন থেকে নিষ্ঠুর রসিকের মত ছিনিয়ে নিতে আসে, তখনই ডাক্তার তার প্রতিরোধ করবার প্রয়াস পায়। মনে হয় বিধাতা যমদূতকে দু’টি চোখ দান করলেই ভাল করতেন। 

এমন এক বসন্ত কাল। সে আজ থেকে কুড়ি বৎসর আগের কথা। বয়স ছিল তরুণ, মন ছিল নবীন, দৃষ্টি ছিল রঙ্গিন, জগৎ ছিল মধুময় আর জীবন ছিল কল –কাকলীতে  মুখরিত। গাছে গাছে পাতা ছিল, বৃন্তে বৃন্তে মুকুল ছিল, ফুলে ফুলে গন্ধ ছিল, ফলে ফলে মধু ছিল আর চিত্তে ছিল প্রচুর রস। তখন আকাশ ছিল রঙিন, সূর্য ছিল মিতা, উদয়ে জানাতো আভিনন্দন আর অস্তে জানাতো শুভাশীষ, আগামী ভোরের তরে। বাতাস বয়ে আনত কোন অজানা রাজ্যের সবুজ কন্যার মায়াবাণী, প্রাণে জাগাতো মৃদু শিহরণ, মনে লাগাতো হালকা খুশীর ছোঁয়া, দেহে জাগাতো খুশীর ঢেউ আর আলতো ভাবে চিবুকটি নেড়ে চলে যেত। আকৃষ্ট হতাম ভোরের পাখির কলতানে। জেগেও উঠতাম। তবে মায়াবিনী নিদ্রার হাত থেকে বিশেষ মুক্তি পেতাম না। অনেকটা তন্দ্রাছন্ন হয়ে কাটাতাম আর অনুভব করতে চেষ্টা করতাম, ভোরের পাখি কি বাণী প্রচার করে সদ্য নিদ্রোত্থিত জগতের কাছে। ভাবতাম তারা আমারই জন্য মেতে উঠেছে। তারাই আমার মনের মিতা, তারাই অন্তহীন সুখের সাথী। তারা আমার জীবনে চাঞ্চল্য জাগায়, কাজে উৎসাহ দেয়, কাব্যে প্রেরণা জোগায়। আমার পৃথিবীকে রংধনুর সপ্তরঙে সজ্জিত করে আমার সম্মুখে ধরে রাখে। 

এমন সময়ে এমনি পরিবেশে আমি চিকিৎসা বিদ্যায় সনদ লাভ করেছিলাম। ‘ডাক্তার’ এই একটি মাত্র শব্দের উপর নির্ভর করে আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ছবি অতি সুন্দর সুষ্ঠুভাবে কল্পনা করতাম। সেদিন দেখেছিলাম খ্যাতি, যশ, টাকা আর স্ত্রী –পুত্র –কন্যাসহ সুখী পরিবার। যেখানে দুঃখ দৈন্য প্রবেশ করবার ভিসা কোনদিন পাবে না। 

কিন্তু আজ? 

আজ আমি নামকরা ডাঃ মাহবুব চৌধুরী। বাড়ি, গাড়ি, টাকা, কড়ি কোন কিছুরই অভাব নেই। কিন্তু এসব যেন তুচ্ছাতিতুচ্ছ মনে হচ্ছে। সব থেকেও আজ আমার কিছুই নেই। আমি সুখী বটে, আমার শান্তি নেই। জীবনে যা চেয়েছি, তাই পেয়েছি। এর বেশী যে মানুষের কিছু চাওয়ার আছে, তা আমার রঙিন মনের অগোচরে ছিল। তাই হয়তো বিধাতার কাছে শান্তির জন্য কোন প্রার্থনা করিনি।

জীবনে তেতাল্লিশটা বসন্ত আমি পাড়ি দিয়ে এসেছি। দিনগুলো কেমন করে কেটে গেল তা আর নাই বা বললাম। তবে গত বসন্তের একটি দিনে জগতের সমস্ত আলো নিভে গিয়েছিল। কেবল অন্ধকারের অতল তলে তলিয়ে গিয়েছি, কোন অবলম্বন আজও পাইনি। জীবনে কখনও পাব বলে আশাও করিনে। কারণ আশার আরেক নাম মরীচিকা। কোথা দিয়ে কি হয়ে গেল বুঝতে পারিনি। 

এমনি এক সকালে অসময়ে হাসপাতালে যেতে হল। কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কৌতুহল নিয়েই গিয়েছিলাম। যেয়ে দেখি একটি তরুণ নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। হয়তো তার যন্ত্রণা প্রকাশ করবার ক্ষমতা আর নাই। সুন্দর, বলিষ্ঠ, স্বাস্থ্যবান যুবা। গ্রীষ্মের প্রখর তাপে বৃক্ষলতা যেমন খানিকটা নিরস হয়ে নেতিয়ে পড়ে, একেও অসহ্য যন্ত্রণায় কাবু করে ফেলেছে। রোগটা বিপদজনক –অ্যাপিন্ডিসাইটিস। হাতে সময় ছিলনা। কাজেই তাড়াতাড়ি করতে হলো। নির্দিষ্ট সময়ে সব যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করে সকলের অনুমতি নিয়েই অস্ত্রোপ্রচারে মন দিলাম। বিষয়টা খুবই গুরুতর। আরো আগে আসলে হয়তো রোগটি এত জটিল আকার ধারণ করতে পারতো না। অতি সাবধানে হাত চালাচ্ছিলাম। ওকে বাঁচাবার দায়িত্ব যে আমিই নিয়েছিলাম। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, বিধাতা করেন আরেক। এত সতর্কতা সত্ত্বেও কখন হাত পিছলে হৃদপিন্ডের পরমাত্মীয় একটি ধমণী কেটে গেল। আমি নার্ভাস হয়ে পড়লাম। কোন রকমে রক্ত বন্ধ করা গেল। আসল চিতিৎসা ঠিকই হলো। আমার অভ্যস্ত হাতে কোন প্রকার ত্রুটি হলো না। যথাসময়ে অপারেশন শেষ হলো। রোগী পৃথিবীর আলো বাতাসের স্পর্শ পেল। সবাই বেশ আশ্বস্ত হলো। কিন্তু আমার চিত্তে কোন স্বস্তি ছিল না। আমি প্রতি মুহূর্তে একটা কিছুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। 

পরের দিকে রোগীটিকে তার বেডে ফিরিয়ে আনা হলো। খাণিকক্ষণ বাদে একটি তরুণী রোগীর দর্শন প্রার্থী হয়। মেয়েটি অপরূপ লাবণ্যময়ী। শান্ত মুখশ্রী। উজ্জ্বল দীপ্তি তার চোখে। এগিয়ে যেতে লাগলো ১৩ নম্বর বেডের দিকে। এদিকে ছেলেটির হঠাৎ ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হয়েছে। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তার পরিণতিও বুঝে গিয়েছিলাম। শেষ মুহূর্ত উপস্থিত। এই সময়ে মেয়েটি চাপা উৎকন্ঠা নিয়ে মৃদু  অথচ দ্রুত পদক্ষেপে প্রবেশ করলো। রোগীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। ছেলেটি শেষবারের মত একটু হাসলো। কোনরকমে উচ্চারণ করলো, 

- ‘তুমি এসেছ, রুমু?’ 

রুমু জবাব দিল, ছোট্ট এক টুকরো হাসি দিয়ে। টলে গেল তার গাম্ভীর্য, ছিঁড়ে গেল তার আবরণ, ভুলে গেল বাস্তব দুনিয়া, ঢলে পড়লো মৃতপথ যাত্রীর উপর। আমি আর পরের খবর রাখিনি। তবে অভিভূত হয়েছিলাম, স্তম্ভিত হয়েছিলাম মেয়েটির হাসির কথা স্মরণ করে। হাসির ভেতর দিয়ে যে মানুষের হৃদয়ের গভীর বেদনাকে এত করুণ, এত হৃদয় বিদারক ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, তা আমি কোনদিন দেখিনি, চিন্তাও করিনি। কেবল এক টুকরো হাসি –আর কিছুই নয়! শুনেছি মেয়েটি ও এই ছেলেটি একই পত্রিকায় কাজ করতো। তাদের লেখা প্রায়ই একই দিনে বের হতো। সেই সূত্র ধরে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। মেয়েটি শহরের হস্টেলে থাকে। তাকে এই ছেলেটিই দেখাশুনা করতো।     

গত এক বছর ধরে প্রতিটি মুহূর্তে সেই মেয়েটির এক টুকরো হাসি আমার  স্মৃতিতে আসা যাওয়া করছে। যে হাসি কেবল সর্বহারাদের মুখে ফুটে ওঠে। আর কেউ সে হাসি হাসতে জানে না। কেবলই মনে হয়, সে এসেছিলো আমার কাছে বাঁচতে –এসেছিল মৃত্যুর হিমশীতল পরশ এড়িয়ে এই মাটির পৃথিবীতে আবার শ্বাস প্রশ্বাস নিতে। কিন্তু অদৃষ্টের কি পরিহাস!  আমার জন্য তা হলো না। নব পল্লবিত, মুকুলিত শাখাটি ঝড়ের দাপটে নুইয়ে পড়েছিল আমারই কোলে। নিষ্ঠুর আমি, তাই তাকে আশ্রয় দিতে পারিনি। তাকে আমি নিজ হাতে উড়িয়ে দিয়েছি। 

আশা উদ্দামে পূর্ণ একটি টগবগে যুবকের আমি হন্তা। নীড়হারা পাখির নীড় আমি ভেঙেছি। চকোরীর চকোর, বন্ধুর বন্ধু, মিতার মিতা, প্রিয়ার প্রিয়া, দুর্বলের অবলম্বন আমি নিজ হাতে নষ্ট করে দিয়েছি। 

মানুষ কী ভরসা করে আসে আমার কাছে? বাঁচবে বলে। না, বাঁচানো আমার কাজ নয়। আমি ডাক্তার নই। কে বলে আমি ডাক্তার? 

আমি নরঘাতক! 

আমি যমদূত। 

পাপী, তাপী, খুনী! 

ও নামে কলঙ্ক দিও না। ও নাম কলঙ্কিত করো না। 

আমি খুনী, ছেড়ে দাও, যেতে দাও আমাকে। শাস্তি দাও! আমি খুন করেছি। কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার! কেবল একজন মানুষকেই নয়, আরেকজনের আশা, আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যত জীবনকে!

.............

২৫.০৩.১৯৬১

কুমুদিনী কলেজ, টাঙ্গাইল         


Friday, March 20, 2026

প্রবন্ধ - অনাদি কালের স্রোতে

 সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। আশরাফুল মখলুকাত। এই মানুষ দুই প্রকারের। একজন নারী অন্যজন পুরুষ। পুরুষ শারীরিক শক্তিতে বলবান। নারী অপেক্ষাকৃত নাজুক। পুরুষ সংগ্রামী। নারী আয়েশী ।পুরুষ ও নারীর জীবন দ্বিমুখী । পুরুষ  বহির্মুখী । নারী অন্তর্মুখী। পুরুষ নারীকে নিরাপদে রাখে। নারী সেই নিরাপত্তা পুরুষের কাছে প্রত্যাশা করে। পুরুষ পিতা হয়ে, ভ্রাতা হয়ে, স্বামী হয়ে, পুত্র হয়ে নারীকে নিরাপদে রাখার সংগ্রাম চালায়। 

সেই সুদূর অতীতে যখন আইন ছিল না, সমাজ ছিল না তখন এই পুরুষ তার গোত্রের নারীদের নিরাপত্তা বিধানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। এমনকি আজকের দিনেও এত উন্নতির যুগে পুরুষের সহযোগিতা না পেলে নারীদের অনেক কর্মকান্ডই ব্যর্থতায় পর্যবাসিত হবে । পুরুষের সহানুভূতি, সাহায্য ব্যতিরেকে  নারীদের একার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব না।  তদ্রূপ নারীদের সাহায্য, সহানুভূতি  ছাড়া পুরুষের একার পক্ষে উন্নতির লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব না । এই দুইয়ের সহস্র বছরের সহযোগিতায় গড়ে  উঠেছে আজকের  সমাজ ব্যবস্থা।  যদি নারীর অবদান না থাকতো তবে মানুষজাত আদিম জীবন যাপন করতো। এই সভ্যতার সুবাতাস আজ নর নারীর জীবনে বইতে পারতো না। পুরুষের শক্ত হাত আদিমতাকে আলিঙ্গন করতো। মেয়েদের কোমল হাত শুধু দাসত্ব করার কাজে নিয়োজিত থাকতো। 

প্রকৃতপক্ষে মেধা ও মননে নারী পুরুষের কোন পার্থক্য নেই। বুদ্ধি ও মেধা আল্লাহর দান। পুরুষের মধ্যে মেধা ও বুদ্ধির তারতম্য লক্ষ্য করা যায় । প্রত্যেক পুরুষ সমান নয়। সেরূপ নারীরাও সকলে সমান বুদ্ধিমতী নয়। কেউ বেশী, কেউ  কম। বুদ্ধি ও বৃত্তি প্রসারের ক্ষেত্র পুরুষের সীমাহীন। সামাজিক ব্যবস্থা পুরুষকে কথা বলার অধিকার দিয়েছে বেশী, জানবার সুযোগ দিয়েছে বেশী। শারীরিক শক্তির বরে তার সাহসও বেশী। এসব কারণে পুরুষের জ্ঞান  বৃদ্ধি পায়  এবং জ্ঞান প্রয়োগের কৌশল তার অভিজ্ঞতার ভান্ডার পূর্ণ করে। অপরদিকে নারী স্বভাবে নমনীয়। সামাজিক ব্যবস্থার ফলে নিজেকে প্রকাশ করবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। গৃহে বন্দি থাকার দরুণ 'বাহির' -কে দেখবার বা শুনবার কোন সুযোগ তার নেই। সুতরাং জ্ঞানের  ভান্ডারে তার শূন্যের ছড়াছড়ি। তার যা কিছু জ্ঞান তা পুরুষের  নিকট থেকে ধার করা। কিন্তু লেখাপড়া  জানা থাকলে বই পুস্তকের মাধ্যমে যা সঞ্চয় করা, বাস্তব জ্ঞান থেকে সেই জ্ঞান অনেক কম।  

আদিম যুগে পৃথিবী বৃক্ষলতার জালে পরিপূর্ণ  ছিল। তার  ভেতরেই অন্যান্য প্রাণীদের সঙ্গে ছিল মানুষের বসবাস। অন্যান্য পশু প্রাণীরা ক্ষিপ্রতায় মানুষের চাইতে অনেক পটু। সেজন্য মানুষ প্রাণ রক্ষার জন্য  বৃক্ষশাখায় রাত কাটাতে শেখে। বৃক্ষশাখায় তারা তাদের অবস্থান স্থায়ী করে। তারপর বুদ্ধির জোরে গাছের ডালে ঘর বাঁধে , অবস্থান দৃঢ়  এবং নিরাপদ করে। এতেও মানুষ থেমে থাকলো না। লক্ষ্য করল তারা দুই ধরণের। একটি আদম, আরেকটি হাওয়া । একটি আদমি - পুরুষ, অন্যটি রমণীয় -রমণী ।  তারা আরো বুঝতে পারলো পুরুষ নারীর সঙ্গ পছন্দ করে। নারী চায় পুরুষের পাশে থাকতে। এভাবেই তারা দিবারাত্রি অতিক্রম করছিল। একদিন এক আদিম মানব কি জানি কি মনে করে একটি জংলী ফুল চয়ন করে তার সঙ্গিনীর এলো খোপায় গুঁজে দেয় । এ কাজটি করে তারা দুজনে স্তম্ভিত হয়ে যায়। এটা কি করে হলো ! সেদিন মনুষ্য জাতি সেই  অরণ্যের  অন্যান্য প্রাণীকুল থেকে পৃথক হয়ে গেল। তাদের বোধোদয় হলো  যে তারা সবার থেকে আলাদা, তারা অসাধারণ । তাদের অনেক কিছুই করার ক্ষমতা আছে। 

আদিম যুগে গৃহ রচিত হয়েছিল নারীদের জন্যই। মেয়েরা কোমল। প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকা তাদের জন্য খুবই কঠিন। তাই  পুরুষকে তার নিজের এবং দলের মেয়েদের নিরাপত্তা বিধানের ভার নিতে হয়। নিরাপদ রাখতে হয় হিংস্র পশুর থাবা থেকে এবং অন্য গোত্রের হিংস্র নরের হাত থেকে। কারণ নারী অপহরণ আজকের মতন আদিম যুগেও ছিল। নারীরা তখনো পুরুষের সম্পত্তির মত ছিল। আজকের যুগেও স্বীকার করতে হয় যে নারী পুরুষের সম্পত্তি। যদিও অনেক মর্যাদা আমরা লাভ করেছি, অনেক অধিকারও পেয়েছি। কিন্তু তা পুরুষের ইচ্ছায়। 

নারীরা প্রাকৃতিক ভাবেই মাতৃত্বের অধিকারী। নারীই মাতা । অন্য কেউ নয়। মাতৃত্ব লাভের সময় তার ক্ষমতা একটু সীমিত থাকে। তখন শত্রুদের হাত হতে রক্ষা করতে হলে সার্বক্ষণিক প্রহরায় পুরুষকে নিয়োজিত থাকতে হয়। সেজন্য পুরুষ অনুভব করে গৃহের প্রয়োজনীয়তা। যেখানে তার নারী নিরাপদে অবস্থান করবে। ঝড়, ঝঞ্ঝা স্পর্শ করবে না, জীব জন্তু আক্রমণ করবে না, শত্রুরা হানা দেবে না। সেই চিন্তা থেকেই পুরুষ নির্মাণ করলো গৃহ - সুরক্ষিত, নিরাপদ আস্তানা তার নারীর জন্য। এই নারীই গৃহলক্ষ্মী, গৃহকর্ত্রী। তাই  নারীর নিরাপত্তা সুরক্ষায় পুরুষের গৃহ নির্মাণে নিত্য নতুন কলাকৌশল আবিষ্কার। এর মূলে যে মন্ত্র কাজ করে তার নাম ভালবাসা।  তাই তার ভালবাসার ধন সুরক্ষিত থাকুক, পুরুষ তাই -ই চায়। 

পুরুষ নারীকে ভালবাসে। এটা প্রাকৃতিক ও চিরন্তণ। একজন নারীও ঠিক একই ভাবে একটি পুরুষকে  তার হৃদয় কুসুম দান করে।  সেই জন্য মানুষ চিন্তা  করতে থাকে এই ভালবাসাকে কিভাবে স্থায়ী করা যায়। একে স্থায়ী করবার জন্য একটি বন্ধন তৈরী  করা প্রয়োজন। এই বন্ধনই বিবাহ। এই বিবাহ নারী পুরুষের ভালবাসাকে চিরস্থায়ী করবার জন্য চালু করা হয়েছে। এ রাখী বন্ধন মানুষের  হাজার বছরের তপস্যার ফসল। সমাজ একে স্বীকার করে  নিয়ে অধিকার দিয়েছে। কেউ এই সম্পর্কের মধ্যে ভাগ বসাতে পারে না। কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত এই বিবাহ বন্ধনই নর - নারীর ভাললাগা ও  ভালবাসার  সম্পর্ককে ধরে রাখার একমাত্র উপায়। যদি তাই না হতো তবে মানুষ এতদিনে এই প্রথা রদ  করে  অন্য কোন প্রথা উদ্ভাবন করতো। 

সকল ধর্মেই বিয়ের প্রথা প্রচলিত আছে। সুতরাং নারী পুরুষের পারস্পরিক অধিকার কারো একার নয়। দুজনেরই সমান। নর নারীর মধুর সম্পর্কের একটি সুন্দর কথা বলে গিয়েছেন  আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, 

'নর বাহে হল, নারী বহে জল,  সেই জল-মাটি   মিশে
ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।'

আরো  বলা যায়, 
'নারীর  বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি প্রাণ
যতকথা তার হইলো কবিতা, শব্দ হইলো গান।'

এই চমৎকার কথাগুলো শুনলে পরান জুড়িয়ে যায় । মনে হয় দুনিয়াতে এর চাইতে মহৎ ও সুন্দর আর কিছুই নেই। স্বর্গ যেন আমাদের কুঁড়ে ঘরে এসে ঠাই নেয় । তবে পুরুষ কর্তৃক নারী যে নির্যাতিত হচ্ছে না তা নয়। শিক্ষিত, অশিক্ষিত নির্বিশেষে মেয়েরা অত্যাচারিত  হচ্ছে।  যেখানে ভালবাসা নেই, স্নেহ মমতা অনুপস্থিত, সেখানে নারী অবশ্যই নির্যাতিত।  নির্যাতনের বা পীড়ণের অন্য একটি দিক আছে। সেটি হচ্ছে, যে সবল সে দুর্বলকে কষ্ট দেয়। দেখা যায় দুর্বল সর্বদাই নিপীড়িত, অত্যাচারিত। এমনকি নারীরা যে ক্ষেত্রে সবল, সেখানে দুর্বল পুরুষ বা দুর্বল মেয়ে, অল্প বয়স্করা অথবা গৃহে কর্তব্যরত গৃহ কর্মীরাও  অত্যাচারিত হচ্ছে। সুতরাং পুরুষ মাত্রেই যে নারীকে নির্যাতন করছে তা নয়।  তাই সবচেয়ে বড়  কথা নারীকে যোগ্য হতে হবে। তাকে অবলা হয়ে ঘরে বসে স্বামীর পায়ের নীচে বেহেশতের সন্ধান করলে চলবে না। তাকে মানুষ হতে হবে। কিন্তু কে নেবে সেই ভার, সেই গুরুদায়িত্ব তাকে মানুষ করে তুলবার? এর উত্তর হল শিক্ষা। 

শিক্ষাই একমাত্রও শক্তি যা মানুষকে মনুষ্যত্ব এবং যোগ্যতা দিতে সক্ষম। মেয়েরা যদি শিক্ষিত হয় তবেই তারা তাদের অধিকার স¤\^ন্ধে সচেতন হবে। তাকে মানুষের  যোগ্যতা অর্জন করতে গিয়ে জানতে হবে তার কর্তব্য কি, দায়িত্ব কি। যদি কর্তব্যজ্ঞান তার ভিতর না জাগ্রত হয়, তবে অধিকার সচেতন নারী ঘরে ঘরে কলহ বিবাদের সূত্রপাত ঘটাবে। সেজন্য দেশের সরকারকে নাগরিকদের সুশিক্ষার ভার নিতে হবে। তাহলেই  পুরুষ ও রমণী সুশিক্ষিত হয়ে নিজের নিজের অবস্থান দৃঢ় ও সুন্দর করতে সক্ষম হবে। শিক্ষিত পুরুষ, নারীকে নির্যাতন করা থেকে বিরত থাকবে। 

ধরে নিই যে সব পুরুষ অত্যাচারী।  তাই তাদের সংস্পর্শ সযত্নে পরিহার করা উচিত। অথবা যদি বলা হয়, 'ওহে সতী সাধ্বী নারী সমাজ, তোমরা পুরুষের নির্যাতনের শিকার  হয়ো না, তাদের পরিত্যাগ করো, নিজেরা  আত্মমর্যাদার অধিকারী হও', তাহলে অবস্থা কি দাঁড়াবে? উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত পৃথিবী নামক গোটা গ্রহটি মহিলাদের ক্রুদ্ধ পদাঘাতে প্রকম্পিত হবে। তারা যে ধর্মের বা যে বর্ণেরই হোক না কেন সকলে একযোগে বিদ্রোহ  করবে, মিছিল করবে, শ্লোগান দেবে, অনশন পর্যন্ত করবে। এমনকি বরফের ঘরে বাস  করে যে এস্কিমো নারী, তারাও অনশন থেকে বাদ যাবে না। তারপর নারীকুল বলবে, 'আমরা একা বাঁচতে চাই না, আমরা পুরুষের সংস্পর্শে বাঁচতে চাই। পুরুষ বিনে জীবন প্রাণহীন দেহের মতোই মূল্যহীন । আমাদেরে পরম প্রিয় পিতা, ভ্রাতা, পতি ও পুত্রকে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিও না।' অন্যদিকে যদি পুরুষকুলকে বলা হয়, 'ওহে পুরুষ প্রবর, তোমরা রাফ্ , তোমারা টাফ্। তোমরা জুলুমকারী, আর তারা শস্যক্ষেত্র নয়, তাদের কাছে যেও না, তাদেরকে মুক্তি দাও।' যদি পুরুষেরা সুবোধ বালকের মত এসব বাণী মেনেও  চলে তবে কি হবে? ঠিক সেই  মুহূর্ত থেকে দুনিয়াতে প্রলয় শুরু হবে। বিধাতার  সৃষ্টি  স্তব্ধ হবে। সেদিন যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হবে সে হবে এ ধরিত্রীর শেষ মানব সন্তান। সেসময় থেকে শতকরা পঁচিশ ভাগ মানুষ, যাদের বয়স পঞ্চাশের বেশী তারা আগামী পঁচিশ বছরেরে মধ্যে এ ধরণীর মায়া ত্যাগ করে মারা যাবে। তারপরে পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছরের মধ্যে আরও পঞ্চাশ ভাগ মানুষ শুধু বয়সের কারণে নয় অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারণে মারা যাবে।   ততদিনে মানব সম্পদ কমে আসবে। অরণ্য সম্পদ বৃদ্ধি পাবে। ভূপৃষ্ঠ অনাবাদী জমিতে পরিণত হবে। সভ্যতার কর্ণধার এই মানবজাতির সংখ্যা নগণ্য হতে হতে যান্ত্রিক সভ্যতা বিকল হয়ে পড়বে। শস্য উৎপাদনের জন্য সক্ষম পুরুষেরা বৃদ্ধ হবে। নগর সভ্যতা পরিচর্যার অভাবে অকার্যকর হবে। পানি, বিদ্যুত ,গ্যাস, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, শিক্ষা মুখ থুবড়ে পড়বে। যে মানব গোষ্ঠী কৃষ্টি ও সভ্যতাকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় তার জন্ম রহিত হবে। তাদের কাজ আর কে করবে? বনজঙ্গল জনপদ গ্রাস করবে। যে কয়জন নারী পুরুষ চরম ঘোষণার শেষদিনে জন্মগ্রহণ করেছিল, তারা যদি শতবর্ষের পরমায়ু নিয়েও জন্মায় তবুও তারা বাঁচতে পারবে না। জীবন ধারণের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে। জরা, ব্যাধি ও  মৃত্যু তাদের নিকটবর্তী হবে। 

মানুষ অরণ্য থেকে সভ্যতায় উত্থান লাভ করতে পারে, কিন্তু সভ্যতা থেকে বের হয়ে অরণ্যে বাঁচতে পারে না। তাই পুরুষ রমণীর সেই ভাল থাকার 'সারমান' বা বাণী ঘোষণার পর থেকে সত্তর পঁচাত্তর বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জীব মানবজাতি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। 'দাও ফিরে সে অরণ্য, লহো এ নগর' -রবিঠাকুরের সেই প্রার্থনা বাস্তবে পরিণত  হবে। সৃষ্টির আদিযুগের মত পৃথিবী গভীর অরণ্যে পরিণত হবে। জীবজন্তুর পদচারণায় বনভূমি মর্মর ধ্বনিতে ভরে উঠবে। পাখির কণ্ঠে প্রভুর জয়গানে অরণ্য মুখরিত হবে। নদীর কলোচ্ছাস বহুদূর হতে শোনা যাবে। যদিও নদীর কলগান শোনার জন্য কেউ কান পেতে থাকবে না। মনুষ্যবিহীন পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। প্রতিদিন সূর্যোদয়  হবে। পশ্চিমাকাশ লালিমায় ঢেলে দিয়ে সূর্য অস্তও  যাবে। বাংলার ছয় ঋতুর পরিক্রমা কাউকে পুলকিত করবে না। কেউ দুঃখ পাবে না, কেউ হাসবে না, কেউ কাঁদবে না। কেউ কবিতা লিখবে না , গান গাইবে না, কেউ আর আনন্দ করবে না। কেউ আর  ভালবাসবে না। নারীকে  আর নির্যাতনের প্রশ্নই উঠবে না। সব শেষ - সব শান্ত।  

জল পড়ে পাতা নড়ে -ফিরোজা হারুন

 

ছন্দের হাত ধরে দাঁড়ালো দু’জন।
ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে পাতায় পাতায়
নৃত্যের তালে তালে পাতা দোল খায়।

বৃষ্টির ধারা নামে বাগানের আঙিনায়
জলকেলি করে রাধা, শ্যাম পিছু ধায়।
রিমঝিম বাদলের নূপুরের ছন্দে
চঞ্চলা পায়ে নাচে প্রকৃতি আনন্দে।

বাগিচার এককোণে, 
কে যে বসে বাতায়নে
দেখেছিল বরষার রূপ রস গন্ধ
তন্ময় হয়েছিল মগ্ন দু’দন্ড।

বৃষ্টির গান আর বাতাসের বাদ্য,
বীণাখানি দিয়ে বলে সুর তোল সদ্য।
ছন্দের শিহরণে পুলকিত ‘রবি’
জল পড়ে পাতা নড়ে বলে ওঠে কবি।

ছন্দ নূপুর পরে বাণী পেল প্রাণ,
তালে তালে বেজে ওঠে কবিতার গান।
কাব্যের পরশ পেল কবির অন্তর,
জন্ম লভিল কবিগুরু জাদুকর।

********

 সাহিত্য পর্যালোচনা ১ঃ “জল পড়ে পাতা নড়ে”

“জল পড়ে পাতা নড়ে”—এই বিখ্যাত ছন্দোবদ্ধ পংক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শৈশবকালের প্রথম রচিত পদ্য। বাংলা কাব্য সাহিত্যে এই পংক্তিটি এক বিশেষ ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব বহন করে। ফিরোজা হারুন-এর “জল পড়ে পাতা নড়ে” কবিতাটি ঠিক এই ছন্দ ও পংক্তিকে ভিত্তি করে রচিত, ফলে এতে রবীন্দ্র-ঐতিহ্য ও আধুনিক অনুভবের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে।

সাহিত্যিক গুরুত্ব ও বিশ্লেষণঃ

১. রবীন্দ্রনাথের ছন্দবোধ ও কবিতার জন্ম

রবীন্দ্রনাথের “জল পড়ে পাতা নড়ে” পংক্তিটি বাংলা শিশুসাহিত্যে কাব্যময়তা, ছন্দ ও সংগীতের এক সহজ অথচ অমোঘ প্রকাশ। এটি ছিল তাঁর সৃষ্টিশীলতার সূচনা, যা পরবর্তীকালে বাংলা কাব্যের গতিপথকেই বদলে দেয়।

ফিরোজা হারুন এই ঐতিহ্যবাহী ছন্দ ও ভাবনাকে আধুনিক প্রসঙ্গে টেনে এনে কাব্যিক ব্যঞ্জনা দিয়েছেন এবং শিশুসুলভ সহজতা ও প্রকৃতির মায়া ধরে রেখেছেন।

২. রবীন্দ্র-প্রভাবের শিল্পিত পুনর্নির্মাণ

ফিরোজা হারুনের কবিতায় ছন্দ, প্রকৃতি ও সংগীত—এই তিনটি উপাদান রবীন্দ্র-কবিতার মতোই প্রবলভাবে উপস্থিত।

মূল পংক্তির (“জল পড়ে পাতা নড়ে”) সুর ও চিত্রকল্পকে কেন্দ্র করে তিনি পুরো কবিতায় বর্ষা, পাতার দোলা, বৃষ্টির নৃত্য, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও ছন্দময়তা তুলে ধরেছেন।

রবীন্দ্রনাথের প্রথম পদ্য ছিল সরল এবং স্বতঃস্ফূর্ত; ঠিক তেমনি এই কবিতাতেও সহজতা, স্বাভাবিকতা এবং প্রকৃতির মায়াময়তা বিদ্যমান।

৩. ছন্দের ঐতিহ্য ও আধুনিক সম্প্রসারণ

মূল পংক্তিটি বাংলা ছন্দের এক সহজ উদাহরণ, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে কাব্যের মেলবন্ধন হয়েছে। ফিরোজা হারুন সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক কাব্যভাষায় রূপ দিয়েছেন। তিনি জল ও পাতার মিতালী, বর্ষার আনন্দ, বৃষ্টির সুর, এবং কবিতার জন্মের কাহিনি সাজিয়েছেন ছন্দোবদ্ধ ভাষায়।

এভাবে রবীন্দ্রনাথের ছন্দ-উন্মেষের ঐতিহ্য বাংলার নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন আঙ্গিকে পৌঁছে যায়।

৪. কবিতার আত্মপরিচয় ও কাব্যিক অর্জন

শেষ স্তবকে, “কাব্যের পরশ পেল কবির অন্তর, / জন্ম লভিল কবিগুরু জাদুকর”—এই সরল স্বীকারোক্তি বাংলা কবিতার ইতিহাসে রবীন্দ্র-উন্মেষের মাহাত্ম্য স্মরণ করিয়ে দেয়।

ফিরোজা হারুন বুঝিয়ে দিয়েছেন — ছোট্ট একটি ছন্দ, প্রকৃতির সহজ দৃশ্য, এবং শিশুমনের কল্পনা—সবই মিলেমিশে বাংলা কাব্যের চিরন্তন ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে।

উপসংহার

ফিরোজা হারুন-এর “জল পড়ে পাতা নড়ে” শুধুমাত্র প্রকৃতিবিষয়ক কবিতা নয়, এটি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। মূল পংক্তির সহজ ছন্দ, শিশুসুলভ অনুভূতি, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং কাব্যিক প্রাণ—সবকিছু এই কবিতায় নতুনভাবে ধ্বনিত হয়েছে।

এভাবে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পদ্য ও তার সাহিত্যিক তাৎপর্যকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থ ও আবেগে উপস্থাপন করার জন্য এই কবিতাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

*****

সাহিত্য পর্যালোচনা ২ঃ “জল পড়ে পাতা নড়ে”


Thursday, March 5, 2026

প্রলাপ

সর্বশক্তিমান স্রষ্টার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। সেই মানুষ কখনও এমন পর্যায়ে পড়ে যা সে নিজেই বুঝে উঠতে পারে না। বিংশ শতাব্দীতে মানুষ প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব চালাচ্ছে, মানুষের মনের উপর প্রভুত্ব চালাচ্ছে। একে অন্যের মনও জয় করছে। নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধির বলে অপরের মনের অবস্থা  হৃদয়ঙ্গম করতেও সক্ষম হচ্ছে। জীবনের সকল ক্ষেত্রেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিচ্ছে। অথচ এই বুদ্ধিমান মানবেরও এমন অবস্থা আসে যখন সে নিজে কোথায় আছে, কি ভাবছে, কি করা উচিৎ, কিছুই বুঝতে পারে না। তার অন্তরে সুখ থাকেনা, শান্তিও থাকে না। সে সর্বদা অস্বস্তি অনুভব করে। কিন্তু কেন, কি কারণে সে অপ্রার্থণীয় ‘মনো বেদনা’ তাকে পেয়ে বসে তা সে নিজে বুঝতে পারেনা। মন কি চায় তা সে খোলাখুলি বলতে পারেনা। আত্মার সেই অব্যক্ত ক্রন্দন  কেউ তো শুনতে পায়না। কেবল শুনতে পায় সে নিজে।

কিন্তু কই? সে শোনারও তো কোন অর্থ নেই। সেতো তার কোন অর্থ করতে পারেনা, সেই বেদনার ভাবকে ভাষায় রূপ দিতে পারেনা। কেন পারেনা? সেই কেন পারেনা-র দলে আমিও তো একজন। ধিক!। 

নিজেকে শতধিক! 

কেন আমি আমার মনের অব্যক্ত কথা প্রকাশ করতে পারিনা। আমি তো পাষাণ নই। আমি মানুষ। আমি এই ব্যাধিগ্রস্ত মানুষ হতে নিজেকে পৃথক করে নিতে চাই, কেবল নিজের মনকে দেখার জন্য।

কি সে?

কি চায় সে?

কেনই বা চায়? 

হয়তো তার প্রশ্নের যথার্থ জবাব খুঁজে না পেলেও ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। অনেক সময় বন্ধুদের কাছে আবোল তাবোল বকে যাই। তাদের তা অপ্রিয় লাগে তা জানি। তা জেনেও কেন এমন ভাবে নিজের মনকে সান্ত্বনা দেবার প্রয়াসে কেন অন্যকে উৎপীড়ন করতে যাই? যার কাছে মনের ভাব প্রকাশ করবো, সেই যদি প্রচন্ড মুষ্ঠাঘাত করে, আমার চঞ্চল, কম্পমান, দিশেহারা হৃদয়কে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয়, তবে আমি কি করবো? এমনভাবে বহুদিন আহত হয়েছি। কিন্তু কেন? আর নয়। এবার আমার মানসিক শান্তি, আনন্দ অক্ষুণ্ণ রাখার দায় আমাকেই নিতে হবে। নিজের সুখ, নিজের শান্তির ব্যাঘাত কেন ঘটাব?

হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমিও না সৃষ্টির সেরা জীবদের একজন। তবে কেন এই অন্যায়ের প্রশ্রয় দেব? তাই মনে পড়লো আমার কাগজ আছে, কলম আছে, কালি আছে। তবে কেন আর অন্যের নিকট ব্যর্থ আব্দার করে ব্যথার বোঝা বড় করা? নীরব শ্রোতা হয়ে কাগজের সাদা, পরিষ্কার, পবিত্র বুকে এঁকে যাব আপন মনে। আসবেনা কোন প্রতিবাদ, না আসুক সহানুভূতি।

তাই আজ কাগজ কলমকেই একমাত্র অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করলাম। সে ভুলে যাবে না কিছুই। যেদিন অতীতকে জানতে চাইবো, ঠিকঠিক কথাগুলো সে জানিয়ে দেবে। মিথ্যে বলবে না একটুও। আমার খুব ভাল লাগবে। আজ সারাটা দিনই কেমন মনমরা হয়ে কাটালাম।কোন বিশেষ কাজ করিনি। সময়ের অপচয় বললে দোষ হবে না। নিছক আকাশ কুসুম কল্পনা করেই কাটিয়েছি। আর ভেবেছি মানুষের মন কতই না বিচিত্র। 

কেটেছে একেলা বিরহের বেলা
            আকাশ কুসুম চয়নে
সব কথা এসে শেষ হলো শেষে
          তোমারই দু’খানি নয়নে, নয়নে...

.............................

০৬/০৩/১৯৫৯