কি বলছো? আমি ডাক্তার? হ্যা, আমি ডাক্তার। ডাক্তারই তো! আমি তো লোকের কাছে চিকিৎসক হিসেবেই পরিচিত। মৃত্যু যখন অন্ধের মত আবাল –বৃদ্ধ –বনিতা, সকলকেই ভূ-স্বর্গের কানন থেকে নিষ্ঠুর রসিকের মত ছিনিয়ে নিতে আসে, তখনই ডাক্তার তার প্রতিরোধ করবার প্রয়াস পায়। মনে হয় বিধাতা যমদূতকে দু’টি চোখ দান করলেই ভাল করতেন।
এমন এক বসন্ত কাল। সে আজ থেকে কুড়ি বৎসর আগের কথা। বয়স ছিল তরুণ, মন ছিল নবীন, দৃষ্টি ছিল রঙ্গিন, জগৎ ছিল মধুময় আর জীবন ছিল কল –কাকলীতে মুখরিত। গাছে গাছে পাতা ছিল, বৃন্তে বৃন্তে মুকুল ছিল, ফুলে ফুলে গন্ধ ছিল, ফলে ফলে মধু ছিল আর চিত্তে ছিল প্রচুর রস। তখন আকাশ ছিল রঙিন, সূর্য ছিল মিতা, উদয়ে জানাতো আভিনন্দন আর অস্তে জানাতো শুভাশীষ, আগামী ভোরের তরে। বাতাস বয়ে আনত কোন অজানা রাজ্যের সবুজ কন্যার মায়াবাণী, প্রাণে জাগাতো মৃদু শিহরণ, মনে লাগাতো হালকা খুশীর ছোঁয়া, দেহে জাগাতো খুশীর ঢেউ আর আলতো ভাবে চিবুকটি নেড়ে চলে যেত। আকৃষ্ট হতাম ভোরের পাখির কলতানে। জেগেও উঠতাম। তবে মায়াবিনী নিদ্রার হাত থেকে বিশেষ মুক্তি পেতাম না। অনেকটা তন্দ্রাছন্ন হয়ে কাটাতাম আর অনুভব করতে চেষ্টা করতাম, ভোরের পাখি কি বাণী প্রচার করে সদ্য নিদ্রোত্থিত জগতের কাছে। ভাবতাম তারা আমারই জন্য মেতে উঠেছে। তারাই আমার মনের মিতা, তারাই অন্তহীন সুখের সাথী। তারা আমার জীবনে চাঞ্চল্য জাগায়, কাজে উৎসাহ দেয়, কাব্যে প্রেরণা জোগায়। আমার পৃথিবীকে রংধনুর সপ্তরঙে সজ্জিত করে আমার সম্মুখে ধরে রাখে।
এমন সময়ে এমনি পরিবেশে আমি চিকিৎসা বিদ্যায় সনদ লাভ করেছিলাম। ‘ডাক্তার’ এই একটি মাত্র শব্দের উপর নির্ভর করে আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ছবি অতি সুন্দর সুষ্ঠুভাবে কল্পনা করতাম। সেদিন দেখেছিলাম খ্যাতি, যশ, টাকা আর স্ত্রী –পুত্র –কন্যাসহ সুখী পরিবার। যেখানে দুঃখ দৈন্য প্রবেশ করবার ভিসা কোনদিন পাবে না।
কিন্তু আজ?
আজ আমি নামকরা ডাঃ মাহবুব চৌধুরী। বাড়ি, গাড়ি, টাকা, কড়ি কোন কিছুরই অভাব নেই। কিন্তু এসব যেন তুচ্ছাতিতুচ্ছ মনে হচ্ছে। সব থেকেও আজ আমার কিছুই নেই। আমি সুখী বটে, আমার শান্তি নেই। জীবনে যা চেয়েছি, তাই পেয়েছি। এর বেশী যে মানুষের কিছু চাওয়ার আছে, তা আমার রঙিন মনের অগোচরে ছিল। তাই হয়তো বিধাতার কাছে শান্তির জন্য কোন প্রার্থনা করিনি।
জীবনে তেতাল্লিশটা বসন্ত আমি পাড়ি দিয়ে এসেছি। দিনগুলো কেমন করে কেটে গেল তা আর নাই বা বললাম। তবে গত বসন্তের একটি দিনে জগতের সমস্ত আলো নিভে গিয়েছিল। কেবল অন্ধকারের অতল তলে তলিয়ে গিয়েছি, কোন অবলম্বন আজও পাইনি। জীবনে কখনও পাব বলে আশাও করিনে। কারণ আশার আরেক নাম মরীচিকা। কোথা দিয়ে কি হয়ে গেল বুঝতে পারিনি।
এমনি এক সকালে অসময়ে হাসপাতালে যেতে হল। কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কৌতুহল নিয়েই গিয়েছিলাম। যেয়ে দেখি একটি তরুণ নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। হয়তো তার যন্ত্রণা প্রকাশ করবার ক্ষমতা আর নাই। সুন্দর, বলিষ্ঠ, স্বাস্থ্যবান যুবা। গ্রীষ্মের প্রখর তাপে বৃক্ষলতা যেমন খানিকটা নিরস হয়ে নেতিয়ে পড়ে, একেও অসহ্য যন্ত্রণায় কাবু করে ফেলেছে। রোগটা বিপদজনক –অ্যাপিন্ডিসাইটিস। হাতে সময় ছিলনা। কাজেই তাড়াতাড়ি করতে হলো। নির্দিষ্ট সময়ে সব যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করে সকলের অনুমতি নিয়েই অস্ত্রোপ্রচারে মন দিলাম। বিষয়টা খুবই গুরুতর। আরো আগে আসলে হয়তো রোগটি এত জটিল আকার ধারণ করতে পারতো না। অতি সাবধানে হাত চালাচ্ছিলাম। ওকে বাঁচাবার দায়িত্ব যে আমিই নিয়েছিলাম। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, বিধাতা করেন আরেক। এত সতর্কতা সত্ত্বেও কখন হাত পিছলে হৃদপিন্ডের পরমাত্মীয় একটি ধমণী কেটে গেল। আমি নার্ভাস হয়ে পড়লাম। কোন রকমে রক্ত বন্ধ করা গেল। আসল চিতিৎসা ঠিকই হলো। আমার অভ্যস্ত হাতে কোন প্রকার ত্রুটি হলো না। যথাসময়ে অপারেশন শেষ হলো। রোগী পৃথিবীর আলো বাতাসের স্পর্শ পেল। সবাই বেশ আশ্বস্ত হলো। কিন্তু আমার চিত্তে কোন স্বস্তি ছিল না। আমি প্রতি মুহূর্তে একটা কিছুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
পরের দিকে রোগীটিকে তার বেডে ফিরিয়ে আনা হলো। খাণিকক্ষণ বাদে একটি তরুণী রোগীর দর্শন প্রার্থী হয়। মেয়েটি অপরূপ লাবণ্যময়ী। শান্ত মুখশ্রী। উজ্জ্বল দীপ্তি তার চোখে। এগিয়ে যেতে লাগলো ১৩ নম্বর বেডের দিকে। এদিকে ছেলেটির হঠাৎ ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হয়েছে। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তার পরিণতিও বুঝে গিয়েছিলাম। শেষ মুহূর্ত উপস্থিত। এই সময়ে মেয়েটি চাপা উৎকন্ঠা নিয়ে মৃদু অথচ দ্রুত পদক্ষেপে প্রবেশ করলো। রোগীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। ছেলেটি শেষবারের মত একটু হাসলো। কোনরকমে উচ্চারণ করলো,
- ‘তুমি এসেছ, রুমু?’
রুমু জবাব দিল, ছোট্ট এক টুকরো হাসি দিয়ে। টলে গেল তার গাম্ভীর্য, ছিঁড়ে গেল তার আবরণ, ভুলে গেল বাস্তব দুনিয়া, ঢলে পড়লো মৃতপথ যাত্রীর উপর। আমি আর পরের খবর রাখিনি। তবে অভিভূত হয়েছিলাম, স্তম্ভিত হয়েছিলাম মেয়েটির হাসির কথা স্মরণ করে। হাসির ভেতর দিয়ে যে মানুষের হৃদয়ের গভীর বেদনাকে এত করুণ, এত হৃদয় বিদারক ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, তা আমি কোনদিন দেখিনি, চিন্তাও করিনি। কেবল এক টুকরো হাসি –আর কিছুই নয়! শুনেছি মেয়েটি ও এই ছেলেটি একই পত্রিকায় কাজ করতো। তাদের লেখা প্রায়ই একই দিনে বের হতো। সেই সূত্র ধরে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। মেয়েটি শহরের হস্টেলে থাকে। তাকে এই ছেলেটিই দেখাশুনা করতো।
গত এক বছর ধরে প্রতিটি মুহূর্তে সেই মেয়েটির এক টুকরো হাসি আমার স্মৃতিতে আসা যাওয়া করছে। যে হাসি কেবল সর্বহারাদের মুখে ফুটে ওঠে। আর কেউ সে হাসি হাসতে জানে না। কেবলই মনে হয়, সে এসেছিলো আমার কাছে বাঁচতে –এসেছিল মৃত্যুর হিমশীতল পরশ এড়িয়ে এই মাটির পৃথিবীতে আবার শ্বাস প্রশ্বাস নিতে। কিন্তু অদৃষ্টের কি পরিহাস! আমার জন্য তা হলো না। নব পল্লবিত, মুকুলিত শাখাটি ঝড়ের দাপটে নুইয়ে পড়েছিল আমারই কোলে। নিষ্ঠুর আমি, তাই তাকে আশ্রয় দিতে পারিনি। তাকে আমি নিজ হাতে উড়িয়ে দিয়েছি।
আশা উদ্দামে পূর্ণ একটি টগবগে যুবকের আমি হন্তা। নীড়হারা পাখির নীড় আমি ভেঙেছি। চকোরীর চকোর, বন্ধুর বন্ধু, মিতার মিতা, প্রিয়ার প্রিয়া, দুর্বলের অবলম্বন আমি নিজ হাতে নষ্ট করে দিয়েছি।
মানুষ কী ভরসা করে আসে আমার কাছে? বাঁচবে বলে। না, বাঁচানো আমার কাজ নয়। আমি ডাক্তার নই। কে বলে আমি ডাক্তার?
আমি নরঘাতক!
আমি যমদূত।
পাপী, তাপী, খুনী!
ও নামে কলঙ্ক দিও না। ও নাম কলঙ্কিত করো না।
আমি খুনী, ছেড়ে দাও, যেতে দাও আমাকে। শাস্তি দাও! আমি খুন করেছি। কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার! কেবল একজন মানুষকেই নয়, আরেকজনের আশা, আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যত জীবনকে!
.............
২৫.০৩.১৯৬১
কুমুদিনী কলেজ, টাঙ্গাইল
No comments:
Post a Comment