Showing posts with label Poetry. Show all posts
Showing posts with label Poetry. Show all posts

Friday, March 20, 2026

জল পড়ে পাতা নড়ে -ফিরোজা হারুন

 

ছন্দের হাত ধরে দাঁড়ালো দু’জন।
ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে পাতায় পাতায়
নৃত্যের তালে তালে পাতা দোল খায়।

বৃষ্টির ধারা নামে বাগানের আঙিনায়
জলকেলি করে রাধা, শ্যাম পিছু ধায়।
রিমঝিম বাদলের নূপুরের ছন্দে
চঞ্চলা পায়ে নাচে প্রকৃতি আনন্দে।

বাগিচার এককোণে, 
কে যে বসে বাতায়নে
দেখেছিল বরষার রূপ রস গন্ধ
তন্ময় হয়েছিল মগ্ন দু’দন্ড।

বৃষ্টির গান আর বাতাসের বাদ্য,
বীণাখানি দিয়ে বলে সুর তোল সদ্য।
ছন্দের শিহরণে পুলকিত ‘রবি’
জল পড়ে পাতা নড়ে বলে ওঠে কবি।

ছন্দ নূপুর পরে বাণী পেল প্রাণ,
তালে তালে বেজে ওঠে কবিতার গান।
কাব্যের পরশ পেল কবির অন্তর,
জন্ম লভিল কবিগুরু জাদুকর।

********

 সাহিত্য পর্যালোচনা ১ঃ “জল পড়ে পাতা নড়ে”

“জল পড়ে পাতা নড়ে”—এই বিখ্যাত ছন্দোবদ্ধ পংক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শৈশবকালের প্রথম রচিত পদ্য। বাংলা কাব্য সাহিত্যে এই পংক্তিটি এক বিশেষ ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব বহন করে। ফিরোজা হারুন-এর “জল পড়ে পাতা নড়ে” কবিতাটি ঠিক এই ছন্দ ও পংক্তিকে ভিত্তি করে রচিত, ফলে এতে রবীন্দ্র-ঐতিহ্য ও আধুনিক অনুভবের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে।

সাহিত্যিক গুরুত্ব ও বিশ্লেষণঃ

১. রবীন্দ্রনাথের ছন্দবোধ ও কবিতার জন্ম

রবীন্দ্রনাথের “জল পড়ে পাতা নড়ে” পংক্তিটি বাংলা শিশুসাহিত্যে কাব্যময়তা, ছন্দ ও সংগীতের এক সহজ অথচ অমোঘ প্রকাশ। এটি ছিল তাঁর সৃষ্টিশীলতার সূচনা, যা পরবর্তীকালে বাংলা কাব্যের গতিপথকেই বদলে দেয়।

ফিরোজা হারুন এই ঐতিহ্যবাহী ছন্দ ও ভাবনাকে আধুনিক প্রসঙ্গে টেনে এনে কাব্যিক ব্যঞ্জনা দিয়েছেন এবং শিশুসুলভ সহজতা ও প্রকৃতির মায়া ধরে রেখেছেন।

২. রবীন্দ্র-প্রভাবের শিল্পিত পুনর্নির্মাণ

ফিরোজা হারুনের কবিতায় ছন্দ, প্রকৃতি ও সংগীত—এই তিনটি উপাদান রবীন্দ্র-কবিতার মতোই প্রবলভাবে উপস্থিত।

মূল পংক্তির (“জল পড়ে পাতা নড়ে”) সুর ও চিত্রকল্পকে কেন্দ্র করে তিনি পুরো কবিতায় বর্ষা, পাতার দোলা, বৃষ্টির নৃত্য, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও ছন্দময়তা তুলে ধরেছেন।

রবীন্দ্রনাথের প্রথম পদ্য ছিল সরল এবং স্বতঃস্ফূর্ত; ঠিক তেমনি এই কবিতাতেও সহজতা, স্বাভাবিকতা এবং প্রকৃতির মায়াময়তা বিদ্যমান।

৩. ছন্দের ঐতিহ্য ও আধুনিক সম্প্রসারণ

মূল পংক্তিটি বাংলা ছন্দের এক সহজ উদাহরণ, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে কাব্যের মেলবন্ধন হয়েছে। ফিরোজা হারুন সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক কাব্যভাষায় রূপ দিয়েছেন। তিনি জল ও পাতার মিতালী, বর্ষার আনন্দ, বৃষ্টির সুর, এবং কবিতার জন্মের কাহিনি সাজিয়েছেন ছন্দোবদ্ধ ভাষায়।

এভাবে রবীন্দ্রনাথের ছন্দ-উন্মেষের ঐতিহ্য বাংলার নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন আঙ্গিকে পৌঁছে যায়।

৪. কবিতার আত্মপরিচয় ও কাব্যিক অর্জন

শেষ স্তবকে, “কাব্যের পরশ পেল কবির অন্তর, / জন্ম লভিল কবিগুরু জাদুকর”—এই সরল স্বীকারোক্তি বাংলা কবিতার ইতিহাসে রবীন্দ্র-উন্মেষের মাহাত্ম্য স্মরণ করিয়ে দেয়।

ফিরোজা হারুন বুঝিয়ে দিয়েছেন — ছোট্ট একটি ছন্দ, প্রকৃতির সহজ দৃশ্য, এবং শিশুমনের কল্পনা—সবই মিলেমিশে বাংলা কাব্যের চিরন্তন ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে।

উপসংহার

ফিরোজা হারুন-এর “জল পড়ে পাতা নড়ে” শুধুমাত্র প্রকৃতিবিষয়ক কবিতা নয়, এটি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। মূল পংক্তির সহজ ছন্দ, শিশুসুলভ অনুভূতি, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং কাব্যিক প্রাণ—সবকিছু এই কবিতায় নতুনভাবে ধ্বনিত হয়েছে।

এভাবে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পদ্য ও তার সাহিত্যিক তাৎপর্যকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থ ও আবেগে উপস্থাপন করার জন্য এই কবিতাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

*****

সাহিত্য পর্যালোচনা ২ঃ “জল পড়ে পাতা নড়ে”


Friday, May 28, 2021

কবিতা - 'করোনা' সমাচার

 কোথায় আল্লাহ্,কোথায় যীশু,

        কোথায় ভগবান?

কোথায় খোদা,কোথায় স্রষ্টা 

        কোথায় শয়তান?

কোথায় ইবলিশ,কোথায় নমরুদ

        কোথায় কামান,কোথায় বারুদ!

কোথায় জ্বীন,কোথায় পরী?

        কোথায় বাদশাহ্,কোথায় সম্রাট?

কোথায় কালাপাহাড়,কোথায় লুকিয়ে 

              বিখ্যাত চেঙ্গিস!

কেউ কি পারে না করতে বিনাশ 

            কভিড ১৯-বিশ?

কোথায় ফেরেশতা,জ্বীনের বাদশাহ্

         কাজ করে কিছু দেখাও তোমরা 

            হাজার বছরের প্রতি –শ্রুত সুরক্ষা।

কেউ আছে কি –

        কেউ কি আদৌ 

              ছিল কোনদিন?

সবদিকে চেয়ে,দেখি আজ যেন

          ব্যর্থ ট্রাম্প ও পুতিন।

নির্মম ভারী,নিষ্ঠুর মারি, 

        বড়ই কঠোর,বড়ই কঠিন, 

সুচতুর তারা আনতে ব্যস্ত  

        ফলস্ ভ্যাকসিন। 

কেউ থাকবেনা আর অসহায়,মানুষের পাশে দাঁড়াবার।                             

          চারিদিকে কেবলই মৃত্যুর হাহাকার!

কেউ নেই কোনখানে,

       কেউ ছিলনা 

          কখনো কোনদিন

শুধু আছে প্যানডেমিক

        বধিবারে প্রাণ,নির্বিঘ্নে নিশ্চিত।

করোনার করুণা চেয়ে 

        লাভ নেই আর,

        মৃত্যুর আঁধার ঢাকে চারিধার।

বিধাতার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ

        আশরাফুল মখলুকাত, 

             হতবাক আজ ! 

তাদের পৃথিবী কেড়ে নিল কারা –

             কোন মহারাজ?

এই ধ্বংসের জবাব 

        জানা নেই কারো আজ

বড়ই নির্মম,বড়ই নিঠুর,বড়ই নিলাজ,

উন্মত্ত নৃত্যে মত্ত আজিকে আজরাইল 

                   যমরাজ।

‘করোনা কভিড’ হবে সেই দিন শান্ত

রইবেনা যখন এ গ্রহে 

       একটি মানুষও জীবন্ত।


২৮শে মে, ২০২১


Friday, April 16, 2021

কবিতা - কোভিড 19

 এসেছ করোনা ভাই রুদ্র বেশ ধরি

 কেন এত ত্বরা তব, কেন কড়াকড়ি 

ধরায় ফেলিছ জাল টর্নেডোর বেগে 

বধিছ সৃষ্টির সেরা মানবেরে  

কঠোর আবেগে। 

কেন এত ক্রোধ, কেন এত দ্রোহ 

মানব জাতির পরে। 

নিঠুর নির্মমতা দূর করে আন আনুরাগ 

মানুষ জাতিরে করো ক্ষমা, ওগো ভাইরাস। 

ত্যাগ করো ক্রোধ, হে রুদ্র ‘করোনা’ 

বাঁচাও মনুষ্য জাতি, করোনা বঞ্চনা।   


মুখ তুলে চেয়ে দেখ এই সুন্দর পৃথ্বি 

রোদ্র ঝলমল, আকাশ বাতাস, সবুজ বনবীথি। 

মানবজাতির কীর্তি যত, বিধাতার ইঙ্গিত 

তুমিও করো না ভাই , ধরো সুখ সঙ্গীত। 

বাঁচাও মনুষ্য প্রাণ, বাঁচাও জল স্থল অন্তরীক্ষ 

এবার ঘুরে দেখ সৃষ্টির সেরা মানুষের দুঃখ।   


হে নীরব ঘাতক ‘করোনা’, কোরো না বিনাশ 

এবার ফিরে যাও তুমি, যেথা তব বাস। 

আর ফেলিও না জাল, আর বধিও না প্রাণ 

বিধাতার কাছে এই মোর চাওয়া  

প্রাণ খুলে করি তার ধ্যান।


৩রা বৈশাখ, ১৪২৭
১৬.০৪.২০২১

Saturday, March 20, 2021

স্বপ্নের শবাধার - ফিরোজা হারুন

 ১. কবিতা পর্যালোচনাঃ

“স্বপ্নের শবাধার” একটি গভীর ভাবনাসমৃদ্ধ এবং চিত্রকল্পে পরিপূর্ণ আধুনিক বাংলা কবিতা। কবিতাটি মূলত স্বপ্ন, আত্মচেতনা, এবং জীবনের অন্তর্নিহিত সংকটকে উপজীব্য করেছে। কবি স্বপ্নের ভেতর এক রহস্যময় ও প্রতীকধর্মী যাত্রার চিত্র এঁকেছেন, যেখানে চাঁদের আলো, শবাধার, ও আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব মিলেমিশে গেছে।
 
ভাব ও বিষয়
কবিতার শুরুতে কবি স্বপ্নে ডাক শুনে জেগে ওঠেন—রাতের শেষে, চাঁদের নরম আলোয় ভেসে থাকা এক অদ্ভুত পরিবেশে। এই পরিবেশে ‘শবাধার’ বহনকারী এক পথিকের আবির্ভাব হয়, যার পরিচয় নিয়ে কবির মনে দ্বিধা ও কৌতূহল জন্মায়। শুভ্র চাঁদনি রাত, নিস্তব্ধ প্রকৃতি, আর সাদা শবাধারের উপস্থিতি কবিতাটিকে অলৌকিক এবং গা ছমছমে আবহ দেয়।
 
প্রতীক ও চিত্রকল্প
‘শবাধার’ এখানে জীবন-মৃত্যুর চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কবি যখন শবাধারের মুখাবয়ব দেখার সুযোগ পান না, তখন তা এক অজানা ভবিষ্যৎ বা নিজের অজানা দিককেই ইঙ্গিত করে। কিন্তু শেষে, শবাধার খুলে দেখা যায়, সেখানে চেনা মুখ—নিজের মুখ। এখানেই কবিতার গভীরতা ও দর্শন নিহিত। কবি বুঝতে পারেন, তিনি নিজেই নিজের শবাধার বহন করছেন—অর্থাৎ প্রতিটি মানুষ নিজের জীবন ও মৃত্যুর ভার নিজেই বহন করে চলে।

 ভাষা ও কাঠামো
কবিতার ভাষা সহজ, সুরেলা এবং বিমূর্ততায় ভরা। শব্দচয়ন ও বাক্যের গঠন কবিতার রহস্যময় আবহকে আরও তীব্র করেছে। চাঁদের আলো ও সাদা শবাধার বারবার ফিরে এসে একধরনের ঐক্যতান সৃষ্টি করেছে, যা স্বপ্ন ও বাস্তবতার সীমারেখাকে ঝাপসা করে দেয়।

 দার্শনিক তাৎপর্য
শেষ অংশে “আমিই তুমি, তুমি যে আমি”—এই উপলব্ধি আত্মপরিচয়ের গভীর সংকট ও দর্শনের কথা বলে। কবি উপলব্ধি করেন, মানুষের জীবনের যাত্রা আসলে নিজের মধ্যেই ঘুরে ফিরে আসে। মৃত্যু ও জীবন, সুখ ও দুঃখ—সবকিছুরই ভার সে নিজেই বহন করে।

 উপসংহার

“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটি গভীর দর্শন, চিত্রকল্প এবং আত্মসংকটের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এটি পাঠকের চিন্তাজগতে নাড়া দেয় এবং আত্মঅনুসন্ধানের পথ দেখায়। কবিতার প্রতিটি স্তবক পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগায়—কে আমি? কোথায় যাচ্ছি?—এবং সেই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানের ইঙ্গিত দেয়। এ কারণেই কবিতাটি সমসাময়িক বাংলা কবিতার ধারায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

*****

২. “স্বপ্নের শবাধার” কবিতার বিশ্লেষণঃ

“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটি রহস্যময়, গভীর দর্শন ও আত্মঅনুসন্ধানমূলক এক অনবদ্য আধুনিক কবিতা। এতে কবি স্বপ্ন, মৃত্যু, আত্মপরিচয় এবং জীবনের অন্তর্যাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং চিত্রকল্পের মাধ্যমে পাঠককে এক অন্যতর জগতে নিয়ে গেছেন।

 কবিতার প্রধান ভাব
কবিতার শুরুতেই দেখা যায়, কবি স্বপ্ন দেখছেন—রাতের শেষে কেউ যেন তাঁকে ডাকছে। নরম চাঁদের আলোয় চারপাশের কালো অন্ধকার দূর হয়ে গেছে। এই পরিবেশে একজন পথিকের আবির্ভাব, যার পিঠে রয়েছে সাদা শবাধার। এখানে ‘শবাধার’ বা কফিন প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—এটি স্বপ্ন, জীবন কিংবা অতীতের স্মৃতি বহনের প্রতীক।

 প্রতীক ও চিত্রকল্প
“সাদা শবাধার”, “শুভ্র চাঁদনী রাত”, “নিস্তব্ধ চারিধার”—এসব চিত্রকল্প কবিতার আবহে রহস্য ও বিষণ্ণতা এনেছে। যখন কবি পথিককে প্রশ্ন করেন, সে কোথায় যাচ্ছে, কী নিয়ে যাচ্ছে—তখন উত্তর আসে, “উন্মুক্ত করিয়া দেখ কে যায় কোথায়!” এরপর দেখা যায়, শবাধারের ভেতরে শুয়ে আছে চেনা মুখ—নিজের মুখ। এখানে কবি উপলব্ধি করেন, তিনি নিজেই নিজের শবাধার বহন করছেন; অর্থাৎ মানুষ নিজের স্বপ্ন, বেদনা, সুখ-দুঃখ, জীবন-মৃত্যুর ভার নিজেই বহন করে বেড়ায়।

 ভাষা ও কাঠামো
কবিতার ভাষা সরল, সুরেলা এবং বর্ণনামূলক। “চাঁদের আলো”, “সাদা শবাধার”, “নিস্তব্ধ চারিধার” শব্দগুচ্ছ কবিতাটিকে এক অলৌকিক পরিবেশে নিয়ে যায়। কবিতার ছন্দ ধীর, যেন গভীর রাতে স্বপ্নের মতোই নিস্তব্ধ এবং রহস্যময়।

 দর্শন ও তাৎপর্য
শেষ স্তবকে কবি উপলব্ধি করেন—“আমিই তুমি, তুমি যে আমি”—এটি আত্মপরিচয়ের গভীর সংকট ও উপলব্ধিকে প্রকাশ করে। জীবন-জগতের প্রত্যেকটি মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজেরই ছায়া, নিজের স্মৃতি, স্বপ্ন ও বেদনাকে বহন করে চলে। স্বপ্নের শবাধার বহন মানে, নিজের অতীত ও আত্মপরিচয়কে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলা।

 উপসংহার
“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটি পাঠককে স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংযোগস্থলে দাঁড় করিয়ে দেয়। এটি আত্ম-অনুসন্ধান, বেদনাবোধ এবং জীবনের অন্তর্গত রহস্যকে তুলে ধরে। কবিতার গভীরতা, প্রতীকী ভাষা ও চিত্রকল্প পাঠককে ভাবনার গভীরে ডুবিয়ে দেয় এবং জীবনের মৌল সত্যের মুখোমুখি করে তোলে।

এ কারণেই কবিতাটি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান পায়।

*****

৩. কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্যঃ

“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ও বহুমাত্রিক। নিচে বিভিন্ন দিক থেকে এর দার্শনিক তাৎপর্যের বিশ্লেষণ প্রদান করা হলো—

 ১. আত্ম-অনুসন্ধান ও আত্মপরিচয়
এই কবিতার কেন্দ্রীয় দর্শন হলো আত্ম-অনুসন্ধান। কবিতার শেষ অংশে যখন কবি আবিষ্কার করেন, শবাধারের ভেতরে শায়িত মুখটি আসলে নিজেরই মুখ—তখন তিনি উপলব্ধি করেন, মানুষ সারাজীবন নিজের অস্তিত্ব, পরিচয়, এবং অন্তর্নিহিত সত্যকে খুঁজে ফেরে।
“আমিই তুমি, তুমি যে আমি, চিনিলে না মোরে?” —এটি আত্মপরিচয়ের সংকট ও চরম উপলব্ধিকে প্রকাশ করে। এখানে কবি দেখান, নিজের ভেতরেই রয়েছে চরম সত্য—শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজের কাছেই ফিরে আসে।

 ২. জীবন-মৃত্যুর দর্শন
‘শবাধার’ বা কফিন এখানে শুধু মৃত্যুর প্রতীক নয়; এটি মানবজীবনের নানা স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি, এবং ব্যর্থতাও বহন করে। কবিতায় স্বপ্ন ও মৃত্যুর ছায়া একাকার হয়ে গেছে।
কবি দেখান,  যে স্বপ্নগুলো একসময় প্রাণবন্ত ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা মরে যায়
মানুষ নিজের অতীত, ব্যর্থতা, স্বপ্নভঙ্গ, এবং অবচেতনের ভার নিজের মধ্যেই বহন করে
এভাবে জীবন ও মৃত্যু, সৃষ্টি ও বিলয়, স্বপ্ন ও ভাঙন—সবই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

৩. স্বপ্ন ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
কবিতার শুরুতেই স্বপ্নের প্রসঙ্গ এসেছে—“স্বপন দেখিনু এক”—এটি মানুষের মনের গোপন আকাঙ্ক্ষা ও অজানার প্রতি টানকে বোঝায়। কিন্তু স্বপ্ন দেখা ও স্বপ্ন ভঙ্গ, এই দুইয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্বও এখানে স্পষ্ট।
চাঁদের আলোয় অন্ধকার দূর হলেও, সেই আলোয় দেখা যায় শবাধার—স্বপ্নের মৃত্যু বা অবসানের চিহ্ন।
তবে শেষ পর্যন্ত, যারা স্বপ্ন দেখে, তারাই সেই স্বপ্নের ভারও বইতে বাধ্য হয়।

 ৪. অস্তিত্ববাদী (Existential) ভাবনা
এই কবিতায় রয়েছে গভীর অস্তিত্ববাদী দর্শন।
 মানুষ কে?
সে কোথা থেকে এলো, কোথায় যাচ্ছে?
তার জীবনের অর্থ কী?
কবিতার প্রশ্ন—“কে তুমি? / কেন তারে নিয়ে যাও কোন সুদূরে?”—এই অস্তিত্ববাদী সংকটকে তুলে ধরে।
শেষ পর্যন্ত, কবি আবিষ্কার করেন, সে নিজেই নিজের শবাধার বহন করছে, নিজেই নিজের মৃত্যু ও অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

৫. সময় ও অনিত্যতার উপলব্ধি
কবিতায় সময়ের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং জীবনের অনিত্যতা স্পষ্ট।
শবাধার বহন, চেনা মুখের মৃত্যু, অস্তাচলের দেশে যাত্রা—এসব ইঙ্গিত দেয়, জীবন আসলে ক্ষণিক, সবকিছু একদিন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু শেষ হওয়া মানেই শূন্যতা নয়—বরং, আত্মপরিচয়ের এক নতুন স্তরে পৌঁছানো।

৬.উপসংহার
“স্বপ্নের শবাধার” কবিতার দার্শনিক তাৎপর্য এই যে,
মানুষ নিজের স্বপ্ন, স্মৃতি, বেদনা, এবং চরম সত্যের ভার নিজেই বহন করে চলে। জীবনের অর্থ, পরিচয়, মৃত্যু—সবকিছুর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে সে একসময় আবিষ্কার করে, নিজেই তার চরম সত্য ও চূড়ান্ত গন্তব্য।

এই উপলব্ধি কবিতাটিকে শুধু ব্যক্তিগত নয়, বিশ্বজনীন এক দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে যায়।

*****

৪. পঙতি বিশ্লেষণঃ

'আমার শব,আমিই বইছি,
অস্তাচলের দেশে।'
 
“আমার শব, আমিই বইছি,
অস্তাচলের দেশে।” — এই দুটি পঙ্‌ক্তি “স্বপ্নের শবাধার” কবিতার অন্যতম গভীর ও দার্শনিক অংশ। নিচে এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলোঃ

 ১. আত্মপরিচয় ও আত্মবহন
এখানে কবি উপলব্ধি করেন, শবাধারে শায়িত মৃতদেহটি আসলে তাঁর নিজেরই। অর্থাৎ, মানুষের জীবনের সমস্ত আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন-ভঙ্গ, সাফল্য-ব্যর্থতা — সবকিছুর ভার সে নিজেই বহন করে।
“আমার শব, আমিই বইছি”— এই কথার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, প্রত্যেক মানুষ নিজের অতীত, স্মৃতি, অপরাধবোধ, ব্যর্থতা, স্বপ্নভঙ্গ, এমনকি নিজের মৃত্যু-চেতনা পর্যন্ত নিজের ভেতরেই বহন করে চলে।

 ২. অস্তিত্ববাদী সংকট
এখানে রয়েছে গভীর অস্তিত্ববাদী (existential) দর্শন। মানুষ নিজের সত্তা, তার সীমাবদ্ধতা এবং শেষ পরিণতির সঙ্গে সারাক্ষণ যুদ্ধ করে।
“শব” এখানে শুধু শারীরিক মৃত্যু নয়, বরং আত্মার মৃত অবস্থা, স্বপ্নের মৃত্যু, অথবা জীবনের নিরর্থকতা বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়েছে।
নিজের শব নিজে বহন করার মধ্য দিয়ে কবি বুঝিয়েছেন, প্রত্যেকের জীবন ও মৃত্যুর দায়, অর্থ এবং গন্তব্য সে নিজেই।

 ৩. অস্তাচলের দেশ
“অস্তাচল” মানে যেখানে সূর্য অস্ত যায়—অর্থাৎ, জীবনের শেষ প্রান্ত, মৃত্যুর দিকে যাত্রা।
এটি কেবল শারীরিক মৃত্যুর রূপক নয়, বরং জীবনের শেষপথ, স্বপ্নের অবসান, অথবা চরম সত্যের মুখোমুখি হওয়ার প্রতীক।
কবি দেখান, সময়ের প্রবাহে মানুষ একা, নিজের সমস্ত স্মৃতি, স্বপ্ন ও বেদনা নিয়ে নিঃসঙ্গভাবে অস্তাচলের দিকে এগিয়ে চলে।

 ৪. সারমর্ম
এই দুই পঙ্‌ক্তি মানুষের একাকীত্ব, আত্ম-অনুসন্ধান, এবং নিজের ভার নিজে বহনের চরম উপলব্ধি প্রকাশ করে।
এখানে কবি আমাদেরকে শেখান—জীবনের শেষ যাত্রায়, কেউ কারও ভার নেয় না; প্রত্যেকেই নিজের স্বপ্ন, ব্যর্থতা, এবং জীবনের শেষ সত্যকে নিজেই বহন করে, নিজেই চলে যায় অস্তিত্বর শেষ প্রান্তে।

 উপসংহার:
“আমার শব, আমিই বইছি, অস্তাচলের দেশে”—এই বাক্যে জীবনের অন্তিম উপলব্ধি, আত্মজ্ঞানের গভীরতা ও মানুষের চিরন্তন একাকীত্বের অনুভূতি এক অনবদ্য কবিত্বে প্রকাশ পেয়েছে।

*****
 

Monday, February 21, 2011

একুশে ফেব্রুয়ারি

২১ শে ফেব্রুয়ারি
৮ ই ফাল্গুনে এসেছিলে তুমি
পলাশের মালা পরি’।

সেই কবে
’৫২–র পড়ন্ত বিকেলে
রমনার মাঠে জড়ো হয়েছিলে
বাংলার দামাল ছেলে।

দস্যু করে ধন লুন্ঠন, তস্কর করে
সামান চুরি
ভাষা লুন্ঠন?
শুনিনি কখনো
এ জগতে নেই জুড়ি!

ভাষার জন্য প্রাণ দিল যারা
অকৃপণ অকাতরে
সাহসের বীজ বুনে দিল তারা
শহীদ মিনারে।

বাংলার ছেলে প্রাণ দিয়ে গেল
মায়ের ভাষার তরে
সোনার আঁখরে লেখা রবে নাম
বাংলার ঘরে ঘরে।

সালাম বরকত রফিক জব্বার
শফিক আরো কতজনা
দিনে দিনে কত রক্ত দিয়েছে
নাম তার নাই জানা।
ত্যাগের শীর্ষে উচ্চে উঠিল
বাঙ্গালী বীর সেনা
(আজ) শুধিতে হচ্ছে রক্তের ঋণ
আরো ছিল যত দেনা।

মায়ের মুখের ভাষার জন্য
দিয়ে গেল যারা প্রাণ,
গাইবো তাঁদের গৌরব গাথা
রাখবো ভাষার মান।

Thursday, January 1, 2009

ফারহিন মণির জন্মদিন

ডিসেম্বরে বয়ে যায় শীতের বাতাস,

কুয়াশায় ভরা ছিল ঢাকার আকাশ।

২০০৮ সালের দোসরা ডিসেম্বর,

আমাদের ঘরে এলো অনিন্দ্য সুন্দর।

১৪১৫ সালের অগ্রহায়ণ মাসে

১৮ তারিখ পড়ে মঙ্গলবারে এসে।

১৪২৯ হিজরী সালের শেষ চাঁদ এলো,

৩রা জিলহজ্জ্ব দিনে খুকু জন্ম নিলো।

প্রথম ক্রন্দন ধ্বনি পশিল কর্ণকুহরে,

সেই ধ্বনি শুনে সবে দোয়া দরূদ পড়ে।

হেমন্তের ঘুম ভাঙা প্রথম প্রহরে,

ঘড়ির কাঁটা তখন দশটার ঘরে।

খুকুমণি কেঁদে বলে আমি এসেছি,

সকলের সাথে মোর রাখি বেঁধেছি।

এসো এসো খুকুসোনা এসো মোর ঘরে,

স্বাগত জানাই সবে আবেগে আদরে।

তোমার কান্না,কান্না তো নয় সুখের বারতা বলে,

চেয়ে দেখি খুকুমণি দোলে বাবার কোলে।


ফুলের কুঁড়ির মতন মুখখানি তার দেখে,

আশীর্বাদের পরশ দিয়ে কোলে নিলাম ঢেকে।

কুয়াশার চাদর তুলে দেখি তার মুখ,

অপার আনন্দে মোর ভরে গেল বুক।

একয়টি মাস, খুকু ছিল মায়ের সঙ্গে মিশে,

এবার যে এসে গেল নতুন একটি দেশে।

বড় হয়ে শুনতে পাবে জন্মকথা তার,

বুঝতে পারবে কি সম্পর্ক মায়ের সাথে তার।

কদিন পরে এলো সময় নামকরণের দিন,

মা বলেন তার কন্যার নাম হবে ফারহিন ।

নামটি তার বড়ই মধুর অর্থটিও ভাল,

সুখ সমৃদ্ধির আলো দিয়ে ঘর করবে আলো।

তোমরা সবাই প্রাণ ভরে করো আশীর্বাদ,

ফারহিন যেন সারা জীবন পায় সাধুবাদ।

জন্ম হোক ধন্য ফারহিন, জীবন হোক অনন্য,

নিজেকে ফুটিয়ে তোল সকলের জন্য ।।

 


ফিরোজা হারুন (দাদী)

ফারহিনের একমাস পূর্তি উপলক্ষ্যে রচিত

২রা জানুয়ারি,২০০৯ , ভোর ৩টা৩০


Monday, March 28, 1988

জীবন যেমন - ফিরোজা হারুন

 ‘জীবন যেমন’ কবিতার বিষয়বস্তু, ভাষা, অলংকার, ছন্দ, প্রতিপাদ্য ও শিল্পমূল্য বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা —

কবিতার সারাংশ ও বিষয়বস্তু

‘জীবন যেমন’ কবিতায় কবি শৈশবের সরলতা ও আনন্দ থেকে জীবনের জটিল, অজানা যাত্রায় প্রবেশের রূপক চিত্র তুলে ধরেছেন। নদীর ধারে রান্নাবাটি খেলার মাধ্যমে শুরু হয় জীবনের সহজ সময়, যেখানে নানা দেশের নৌকা, নানা পণ্য, নানা মুখ এসে ঘাটে ভিড় করে। এখানে বৈচিত্র্যময় জীবন, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা—সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

প্রতীক ও রূপক

নদী এবং নৌকা এখানে জীবনের প্রতীক। নদী প্রবাহিত—এভাবেই জীবনও চলমান। রান্নাবাটি খেলা শৈশবের নিষ্পাপ সময়ের প্রতীক। নানা দেশের নৌকা ঘাটে ভিড় করা বোঝায় জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, মানুষের আগমন-প্রস্থান। কেউ আনে সুখ (শাড়ি, সিঁদুর), কেউ দুঃখ (বিষের বাঁশি), কেউবা সংগ্রাম (অগ্নিবীণা)।

‘অচিনপুরে গেলাম চলে ভাসিয়ে আপন ভেলা’— এখানে অচিনপুর মানে অজানা গন্তব্য, অর্থাৎ মৃত্যু বা ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তা।

ভাষা ও অলংকার

কবিতায় ভাষা সহজ, সাবলীল ও চিত্রময়। রূপক ও প্রতীকী ভাষা ব্যবহার করে কবি জীবনের নানা পর্যায় তুলে ধরেছেন। ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’—এখানে অনুপ্রাস ও রূপক অলংকার লক্ষণীয়। ‘ঘাটের পাড়ে পাগলি মেয়ে কেঁদেই হল সারা’—এটি জীবনের বেদনা ও অসহায়ত্বের চিত্রায়ণ।

ছন্দ ও কাঠামো

কবিতাটি ছন্দোবদ্ধ হলেও মুক্ত ছন্দের অনুরণন রয়েছে। প্রতি চরণে চিত্রকল্প ও শব্দের ছন্দময় বিন্যাস কবিতার আবেগকে গভীরতা দিয়েছে।

প্রতিপাদ্য

জীবন এক অবিরাম যাত্রা, যেখানে শৈশবের খেলা, নানা অভিজ্ঞতা, সুখ-দুঃখ, বিচ্ছেদ, কষ্ট—সব কিছুই মিলেমিশে থাকে। সময়ের স্রোতে শৈশব হারিয়ে যায়, মানুষ অজানার পথে এগিয়ে চলে—এটাই জীবনের স্বাভাবিকতা।

শিল্পমূল্য

‘জীবন যেমন’ কবিতায় কবি ফিরোজা হারুন অত্যন্ত সংবেদনশীল ভাষায় জীবনের বহুমাত্রিকতা ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রতীকী উপস্থাপন, চিত্রকল্প ও আবেগঘন বর্ণনা কবিতাটিকে শিল্পগুণে ঋদ্ধ করেছে।

উপসংহার

এই কবিতার মূল বক্তব্য—জীবন কখনোই একরৈখিক নয়। এখানে রয়েছে বৈচিত্র্য, পরিবর্তন, অজানা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলা। কবিতা পাঠকের মনে গভীর ভাবনার জন্ম দেয় এবং জীবনের গতিময়তাকে উপলব্ধি করতে সহায়তা করে।

*****


নিম্নোক্ত পঙ্‌ক্তি দুটির —

‘কোথায় রইলো রান্নাবাটি কোথায় রইল খেলা

অচিনপুরে গেলাম চলে ভাসিয়ে আপন ভেলা।’

বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা

এখানে কবি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে জীবনের পরিবর্তন ও অজানা যাত্রার কথা প্রকাশ করেছেন। নিচে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো—

১. শৈশবের সরলতা ও হারিয়ে যাওয়া সময়

‘কোথায় রইলো রান্নাবাটি কোথায় রইল খেলা’—এই চরণে কবি শৈশবের নিষ্কলুষ আনন্দ, সরলতা ও খেলার দিনগুলোর কথা স্মরণ করেছেন। একসময় নদীর ধারে রান্নাবাটি খেলা ছিল তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেছে। এখানে ‘রান্নাবাটি’ ও ‘খেলা’ শৈশবের প্রতীক, যা সময়ের স্রোতে আর ফিরে আসে না।

২. জীবনের অজানা পথে যাত্রা

‘অচিনপুরে গেলাম চলে ভাসিয়ে আপন ভেলা’—এই চরণে কবি জীবনের অজানা, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ‘অচিনপুর’ মানে অজানা দেশ বা গন্তব্য, যা জীবনের শেষপ্রান্ত বা মৃত্যুর প্রতীকও হতে পারে। ‘আপন ভেলা’ বলতে বোঝায় নিজের জীবন, নিজের নিয়তি। জীবনের স্রোতে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে কবি অজানার পথে যাত্রা করছেন।

৩. রূপক ও প্রতীক

এই দুই চরণে কবি নদী ও ভেলার প্রতীকী ব্যবহার করেছেন। নদী জীবনের প্রবাহ, আর ভেলা নিজের নিয়ন্ত্রণ, যাকে সময়ের স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। শৈশবের আনন্দ (রান্নাবাটি ও খেলা) সময়ের ব্যবধানে অদৃশ্য হয়ে যায়; মানুষ এগিয়ে চলে ভবিষ্যতের অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে।

৪. মানবজীবনের সার্বজনীন সত্য

এই পঙ্‌ক্তিগুলো দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন—শৈশব, আনন্দ ও খেলা একদিন ফুরিয়ে যায়; সবাইকেই জীবনের অজানা পথে এগিয়ে যেতে হয়। এটাই মানবজীবনের চিরন্তন বাস্তবতা।

উপসংহার:

এই দুইটি পঙ্‌ক্তি শুধুমাত্র শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রবেশ নয়, বরং সময়ের প্রবাহে হারিয়ে যাওয়া আনন্দ ও জীবনের অনিশ্চিত যাত্রার গভীর রূপক চিত্র। কবি অনন্য দক্ষতায় জীবনের এই রূপান্তর ও অনিবার্য যাত্রাকে প্রকাশ করেছেন।

*****

শিশু শ্রম -১৯৯৭