Showing posts with label স্মৃতিকথা লাহোর খান. Show all posts
Showing posts with label স্মৃতিকথা লাহোর খান. Show all posts

Thursday, December 16, 1971

লাহোর খান


 ভূমিকা

এই রচনাটি জীবনের জলছবি নয়, সমাজের চালচিত্র নয়, ফেলে আসা অতীতের ঘটনাবলীর স্মৃতিচারণ নয়। এটি হচ্ছে নিজের অবস্থান থেকে একটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করবার ভয়ংকর বাস্তব অভিজ্ঞিতার বর্ণনা। এ সংগ্রাম ছিল পাকিস্তান সরকারের দীর্ঘদিনের অবহেলা, অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চনা ও কুশাসনের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করবার সংগ্রাম। ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়ের মায়া ত্যাগ করে কিশোর, তরুণ, যুবা এক মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। যার জন্য মূল্য দিতে হয়েছিল এক সাগর রক্ত। অর্জিত হয়েছিল এক লাল সূর্য খচিত অমূল্য রত্ন -সবুজ পতাকা। তাই আজ বিশ্বের দরবারে স্থান করে নিয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমরা পাকিস্তানে ছিলাম। সে অবস্থান থেকে আমি নিজে চোখে যা দেখেছি, যা শুনেছি এবং উপলব্ধি করেছি, তারই একটি অংশ এই কথিকাটিতে তুলে ধরবার প্রয়াস পেয়েছি। অবশেষে পাকিস্তানিরা মারাত্মক যুদ্ধে পরাজিত হয়। আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এই দিনিটিকে আমরা বলি বিজয় দিবস। পাকিস্তানিরা বলে Fall of Dhaka.. 

তাদের পরাজয়ের দিনটির একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা, এই গল্পের মূল চরিত্র, যার নাম লাহোর খান।

স্থান - কোয়েটা, ১৯৭১  

ই.এম.ই. মেসে আসার পর আমাদেরকে একজন ব্যাটম্যান দেওয়া হল। ব্যাটম্যানরা সাধারণত অফিসারের ইউনিফর্ম ইত্যাদি দেখাশুনা করে, সবসময় তৈয়ার রাখে আর ঘরের ছোটখাট কাজে সহায়তা করে। এই লোকটির নাম লাহোর খান। জাতিতে পাঠান। নামটি যেমন অদ্ভুত, স্বভাবটিও তেমনি একরোখা, রাগী। আমি মনে মনে তাকে ভয় করতাম।

হারুন সাহেব তার ফিল্ড  অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে অন্যত্র বদলি হয়ে যান। চলে যাওয়ার পূর্বে লাহোর খানকে ব্যাটম্যান হিসাবে মনোনীত করে যান। আমি আমার ভয়ের কথাটি ব্যক্ত করলাম। তিনি বললেন, আমরা বাঙ্গালী, আমাদের জীবন বিপন্ন। যে কোন মুহূর্তে, যে কোন বিপদ এসে আমাদের জীবন পর্যুদস্ত করতে পারে। আমাদের কিছুই করবার নেই। এই একরোখা পাঠান তোমাদেরকে নিরাপদ রাখবে। তার জিম্মায় যখন তোমরা থাকবে, তখন সে তার নিজের জীবন বাজি রেখে তোমাদেরকে বাঁচাবে। এই কথাটি বিশ্বাস কর। বাকি আল্লাহ্ ভরসা। 

ই.এম.ই. অফিসার্স  মেসে আমি দুটি স্যুইট নিয়ে বসবাস করতাম। যুদ্ধের সময় সন্ধ্যার পর Black Out থাকতো। সমগ্র এলাকা নিঃশব্দ, গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। আলো জ্বালাবার উপায় ছিলনা। বাচ্চার খাবার সূর্যাস্তের পূর্বেই তৈরী করে রাখতে হতো। টর্চ বা কোন প্রকার আলো জ্বালাতে পারতাম না। কারণ ঐ আলোর অজুহাতে হয়ত আমাকের নাজেহাল করবে, শত্রু পক্ষকে সহায়তা করার অপরাধ বলে। যখন লাহোর খান বিকালে কাজ করে চলে যেতো, তখন সে সকল জানালা-দরজা বন্ধ করে দিয়ে যেতো। যতক্ষণ না আমি ভিতর থেকে দরজা ভালমত বন্ধ করতাম ততক্ষণ সে দাঁড়িয়ে থাকতো। বারবার সাবধান করে যেতো যেন কোন কারণে দরজা না খুলি। যাওয়ার আগে সে দরজা ধাক্কা দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতো আমি দরজার সব ছিটকিনি লাগিয়েছি কিনা। লাহোর খান চলে যাওয়ার পর আমি দরজার সামনে একটি চেয়ার রেখে দিতাম। যদিও অর্থহীন তবুও আমি দুটি দরজার সামনেই চেয়ার রেখে দিতাম। একদিন সকালে ব্যাটম্যান এসে এ ব্যাপারটি লক্ষ্য করে। সেদিন থেকে সে নিজেই দরজার সামনে চেয়ার রেখে দিয়ে বাইরে যেতো। সন্ধ্যার পর জানালা বন্ধ করা খুব ভয়ঙ্কর ব্যাপার ছিল আমার জন্য, কারণ জানালার নেট ছিল, কিন্তু গ্রীল ছিলনা। সে দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও আমার গা ছমছম করে। তখন কি করে যে আমি একটি ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে ঐ বিদেশে শত্রুপক্ষের লোক হয়ে একাকী একটি মেসে যেখানে আর কোন মহিলা নেই,  দিবারাত্রি অতিক্রম করেছিলাম, তা আজও বিস্ময় জাগায়। 

একটি ক্রিশ্চিয়ান মহিলা এসে আমার সকালের কাজ করে দিয়ে যেত। নাম তার শিলা। সে একটি অতিশয় ভদ্র মেয়ে। আমার শিশুকন্যাকে খুব আদর করতো। আরেকজন ছিল পুরুষ সুইপার। সেও মসীহ্-ক্রিশ্চিয়ান। বৃদ্ধই বলা চলে। সাইকেলে চড়ে আসতো। রাজনীতির গল্প করতো প্রায়ই। পাকিস্তানীরা যে বাঙ্গালীদেরকে বঞ্চিত করছে, শোষণ করছে, এ যেন তার নিজের চোখে দেখা। আমি মনে মনে সতর্ক থাকতাম। লোকটি স্পাই নয় তো? হতেই পারে যুদ্ধের সময় স্পাইদের কাজ বেড়ে যায়। যে কেউ স্পাইং এর কাজে নামে। সে বলতো, পাঞ্জাবীরা কখনও বাঙ্গালীদেরকে উচ্চপদ দেয় না; কি সিভিলে, কি মিলিটারীতে! 

-‘কই, আপকা নাজমুদ্দিন কো জেন্রেল বানায়া? সুকরাবর্দীকো (সোহরোয়ার্দী) জেন্রেল বানায়া? নেহি বানায়া।’ আপনাদের বাঙ্গালী জেনারেল কতজন আছেন? উর্দুতে সে ভাষণ দিতে থাকে। সব সুযোগ-সুবিধা, প্রমোশন তারা নিজেরাই ভোগ করছে? ওর কথা শুনে আমি একটা নিরপেক্ষ উত্তর দিতাম। তারপরেও সে বলতো, 'আপকা বাঙ্গাল আজাদ হো যায়েগা।'

কোয়েটা শহর ইরানের কাছাকাছি। পাকভারত রণাঙ্গন থেকে অনেক দূরে। পাঞ্জাবের বর্ডারে তখন প্রচন্ড লড়াই। সেখানকার যুদ্ধাহতদেরকে ট্রেন বোঝাই করে কোয়েটায় নিয়ে আসতো। প্রতিদিন শত শত রক্তাক্ত সৈনিককে কোয়েটার হাসপাতালগুলোতে প্রেরণ করছিল। আর্মির ইউনিটের সুইপার, হাসপাতালেও ডিউটি করে। আহত জওয়ানদের অবস্থা দেখে প্রতিদিন সে আমাকে এ সব সংবাদ বলে। একদিন সে বলছিল এত ‘জখমী আদমী’ হাসপাতালে আসছে যে, সেখানে তিল ধারনের ঠাঁই নেই। একটা কিছু বলতে হয় বলেই আমি বললাম, ‘বহুত আফসোস কি বাত হ্যায়।’  এতলোক মরে যাওয়া, আহত হওয়ার সংবাদে সমবেদনার ভাব জানাতে হয়। এত লোক মরে যাচ্ছে বলে আর্শ্চয বোধ করলাম। সে তৎক্ষণাত বলে উঠলো, সিপাহীদেরকে মরতেই হবে। ‘সারা সাল ইসকো খিলাতে হ্যায়, পিলাতে হ্যায়, সব কুছ করতে হ্যায়, মরনেকা ওয়াক্ত নেহি মরেগা?’ মমার্থ হলো যে, সিপাইদেরকে সারা বছর খাদ্য, পানীয় দেওয়া হয়, যা কিছু প্রয়োজন সব দেওয়া হয়, আর মরবার সময় তারা মরবেনা? তারা অন্যায় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, মরতে তাদের হবেই। লোকটির মন্তব্য শুনে মনে মনে অবাক হলাম। কি অদ্ভুত মানুষের চিন্তাধারা। 

লাহোর খানের প্রসঙ্গে আবার আসতে হয়। তার বড় দুঃখ ছিল যে, তার কোন পুত্র সন্তান নেই। পুত্র সন্তানই পাঠান সমাজে বংশের ধারা বহন করে,  কন্যা  নয়। পুত্র না জন্মালে তাদের বংশের ধারা মরুপথে হারিয়ে যাবে। তাদের গৃহে জ্বলবেনা সাঁঝের প্রদীপ। সে আমার শিশু কন্যাকে খুব পছন্দ করতো। বলতো ‘মেরা ভি এয়ছা হ্যায়, কৈ আওলাদ নেহি হ্যায়। মেরা স্রেফ এক বেটি হ্যায়।’ অর্থাৎ -আমারও বংশধর নেই, কেবল একটি কন্যা! আপনার কন্যার মতই ছোট। বৃদ্ধ বয়সে আমিও একা হয়ে যাবো, মেয়ে চলে যাবে পরের ঘরে! আমার মৃত্যুর পর আমার ঘর আঁধার হবে,কেউ বাতি জ্বালাবে না! 

পাঠানদের গ্রাম আমাদের বাংলাদেশের গ্রামের মত নয়। আমাদের গ্রামগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি গা ঘেঁষাঘেষি করে থাকে। নিবিড় বনজঙ্গল, শস্যক্ষেত্র, খামার, গ্রামগুলোকে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। সেদেশে ছায়াঘন বৃক্ষরাজি নেই। খাঁ খাঁ মরু প্রান্তর। বৃক্ষলতাহীন সমতল ভূমি। মাঠের পর শূন্য মাঠ দিগন্তে হয়ত কোন পাহাড়ে গিয়ে কূল পেয়েছে। সেখানে মাঠে ঘাটে দুর্বাঘাস জন্মায় না। মাটি বড় রুক্ষ। কাঁকড়, পাথর, শুকনো মাটি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। মাঠের মাঝখানে প্রাচীর বেষ্টিত একেকটি গ্রাম। চারিদিকে মাটির দেয়াল অথবা কঠিন শিলাময় পাথরের প্রাচীর। গ্রামটির চারপাশই খোলা প্রান্তর। বিশেষ মৌসুমে তারা গম, ভুট্টা, যব অথবা অন্য ফসল ফলায়। বেশীর ভাগই সেচ ব্যবস্থার কল্যাণে। বৃক্ষ যেগুলো আছে সেগুলো পত্র-পল্লবহীন দাঁড়িয়ে থাকে। শীতের পর যখন একটু বৃষ্টিপাত হয় তখন বৃক্ষলতার শাখা-প্রশাখা প্রাণ ফিরে পায়। হঠাৎ করেই পাতা গজিয়ে তর তর করে বেড়ে উঠে। তারপর তাদের জাত অনুযায়ী ফুলে ফলে ভরে উঠে। ফুল ফলের মৌসুম শেষ হলে আবার উর্দ্ধমুখী হয়ে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তবে বেশীর ভাগ গ্রামেই গাছপালা নেই। একেবারে নিরেট। আমাদের দৃষ্টিতে প্রাণ ধারণ সম্ভব নয়। কিন্তু ওরা বেশ আছে। কুয়ার পানি অথবা ইরিগেশনের ক্যানেলের পানি ব্যবহার করে। আমাদের ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামখানি মেঘে ঢাকা, এরকমটি কোথাও নেই। এরা প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। সেজন্য পরিশ্রমী, কঠোর এবং রাগী। 

লাহোর খানের পরিবারটি বড়। পিতা, পিতৃব্য ও তাদের সন্তান-সন্ততি এক বাড়িতে বাস করে। রক্ষণশীল পরিবার। তবে একটু বেশীই। তারা ধর্মপ্রাণ। তারা যে যেখানে থাকে, সেখানেই নামাজ আদায় করে। লাহোর খানের পরিবার ও আত্মীয়দের মধ্যে চৌদ্দজন লোক আর্মিতে চাকুরী করে। দুর্ভাগ্যবশতঃ তারা সকলেই পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত। 

নভেম্বরে কোয়েটায় প্রচন্ড শীত পড়ে। ডিসেম্বরে পুরো কোয়েটা শহর বরফের নীচে থাকে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মত বরফ কুচি আকাশ থেকে পড়তে থাকে অনবরত। দেখতে দেখতে মাঠ ভরে যায় শুভ্র তুষারে। পত্র পল্লবহীন বৃক্ষশাখাও তাদের সাধ্যমত বরফ ধারণ করে। বাড়ির ছাদ, কার্নিশ সব সাদা। বরফগলা জল ছাদের কার্নিশ বেয়ে যখন নীচের দিকে পড়তে থাকে তখন সেগুলো জমে যায়। সরু কাঠির মত নীচের দিকে সারিবদ্ধভাবে ঝুলে থাকে। বরফ পড়া যখন বন্ধ হয় তখন সম্মুখে দৃষ্টি প্রসারিত করা সম্ভব হয়। যতদূর দৃষ্টি যায় কেবল তুষারবৃত রাস্তা, মাঠ, ঘাট, প্রান্তর আর দিগন্তে আছে পাহাড় পর্বত। সব যেন সাদা টুপি পরে আছে। 

কোয়েটা শহরের চারিদিকে পাহাড়। যখন কোন বরফ মুক্ত দিনে পূর্ব দিগন্তে র্সূযোদয়  হয়, তখন এক অপরূপ দৃশ্য চোখে পড়ে। বরফের চূড়ায় এক নয়ন ভোলানো চোখ ধাঁধানো রূপালী রেখা ফুটে উঠে। ছবিতে যেমন দেখা যায় পিরামিডের ন্যায় পাহাড়, একটির পিছনে আরেকটি, তার পিছনে আরেকটি। ঠিক সেরকম ভাবে রূপালী রেখাটি পর্বত শ্রেণীর উপরিভাগে এক অপূর্ব সৌন্দর্য্যের অবতারণা করে। এরকম হাড় কাঁপানো শীতে আগুন ছাড়া বাঁচা সম্ভব নয়। হাঁড় কাঁপানো শব্দটি কথার গুরুত্ব বোঝাবার জন্য নয়। বস্তুতই হাড়ে কাঁপুনি ধরে। তাই আগুন জ্বালাবার জন্য উদ্ভাবিত হয়েছে ‘কোয়েটা স্টোভ।‘ একটি মাঝারি সাইজের ড্রামের ভিতরে কয়লা ভরে, তাকে ২৪ ঘন্টা জ্বালিয়ে রাখা হয়। তাতেই ঘরখানি গরম থাকে। এই কাজটি করতে হতো লাহোর খানকে। সে কয়লা সংগ্রহ করে কোয়েটা স্টোভটি জ্বালাতো এবং মাঝে মাঝে আরও কয়লা দিয়ে ইন্ধন যোগাতো। গনগনে লাল হয়ে থাকতো স্টোভটি। দেখলেই দোজখের আগুনের কথা মনে পড়তো, কল্পনায় যেমন দেখি। ঘর গরম থাকতো সারাক্ষণ। এই স্টোভের উপরেই পাত্রে পানি গরম হত। ঘর মোছার কাজ, কাপড় ধোয়ার কাজ, সব কাজই এই গরম পানি দ্বারা করা হতো। বাচ্চাকে সন্ধ্যার পর গোসল করিয়ে একেবারে লেপের নীচে ঢুকিয়ে দিতাম। 

বাইরে এত ঠান্ডা যে দরজা খুলে কারো সঙ্গে বেশীক্ষণ কথা বলা সম্ভব হতো না। বাজার থেকে আনা শাক-সবজিগুলো বরফ জমে একসঙ্গে শক্ত হয়ে লেগে থাকতো। কাপড় শুকিয়ে যাওয়ার পর ক্লিপের ভেতরের অংশে বরফ জমে যেত। ফলে দুটি কাপড়ের কোনা টেনে পৃথক করতে হতো। সেজন্য সে দেশের বাড়ির দখিন দিকে তৈরী করা হত একটি সানরুম, কাঁচের ঘর, যার ভেতর রোদ ঢোকে, কিন্তু বাতাস ঢোকেনা। ঐ রুমটি বাসায় সবচেয়ে প্রিয় স্থান দিনের বেলায়। বড় কোজি, আরামদায়ক। 

আমাদের ব্যাটম্যান লাহোর খান একেক দিন একেক সংবাদ নিয়ে আসতো আমার জন্য। সে বলে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানদের উপর হিন্দুরা খুব জুলুম করছে। মুসলমান মেয়েদের ইজ্জত তারা লুটে নিচ্ছে। আমি জানতে চাইলাম, কোন কাগজে বেরিয়েছে এ খবরটি? সে বললো, যারা ওখান থেকে হাত, পা, নাক, কান, চোখ হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছে, তারা বলেছে। তারা স্বচক্ষে দেখে এসেছে। আর প্রশ্ন করা ঠিক হবে না বলে চুপ করে রইলাম। সে বলে, শুনেছি ওখানকার জবান (ভাষা) হিন্দুদের জবান। মুসলমানদের নিজের ভাষা উর্দু তারা বলতেই জানে না। সেখানে মুসলমানেরা মাছলি খায়, গোস্ত খায় না। ভাত খায়, রুটি খায় না। ওরা হিন্দুদের মত চলে। 

সে আরো বলতো, চিন্তা করবেন না, আল্লাহ্ মুসলমানদের জিতিয়ে দেবেন। এদেশ পাক দেশ, পবিত্র দেশ। এখানে বোমা ফেললে, সব বোমা সাদা পোশাক পরিহিত ফেরেশতারা লুফে নেয়। বুজুর্গ লোকেরা এসব দেখতে পান। আমাদের কোন চিন্তা নেই, আখেরি ফাতাহ্ আমাদের হবে। শেষ বিজয় আমাদেরই হবে। এটাই আল্লাহ্-র ইচ্ছা। 

দৃঢ় অন্ধবিশ্বাস নিয়ে সেদেশের আপামর জনগণ সময় কাটাচ্ছিল। যেদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হলো আমি সে খবর পেয়েছিলাম রেডিও মারফত্। কিন্তু লাহোর খানকে সে কথা বলার সাহস হলো না। ভয়ে বক্ষ আমার দুরু দুরু। এই লাহোর খানই হয়ত ক্ষেপে গিয়ে এক্ষুণি আমাকে আমার বাচ্চাসহ কেটে ফেলবে। পাঠানদের রাগ সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মত।

১৭ই ডিসেম্বর কয়েকজন তরুণ অফিসার ক্যাপ্টেন জহির, ক্যাপ্টেন আলম, আরেকজন আমাদের ঘরে এসে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হলো। তারা লাফিয়ে লাফিয়ে ঘরের ছাদ স্পর্শ করতে লাগলো। বললো, মিষ্টি খাবো ভাবী, মিষ্টি তৈরী করেন। তাদের আনন্দ দেখে আমি আবেগ আপ্লুত  হয়ে পড়লাম। আমি বললাম, আপনারা এবার থামেন; কেউ এই আনন্দ-শব্দ শুনতে পেলে বিপদ  হতে পারে। তারা অনেক আনন্দ  করে, অনেক কথা বলে চলে গেলেন। আমার মনে মনে একটু ভয় করতে লাগলো। পাকিস্তানীরা এবার বাঙ্গালীদের উপর হয়ত প্রতিশোধ নেবে। 

দুপুরের দিকে লাহোর খান এলো। এসেই বললো, জানেন কি হয়েছে মাশরেকি (পূর্ব) পাকিস্তানে? বললাম, জানি, খবরের কাগজে লিখেছে। সে খুবই উত্তেজিত। বললো, আপনি বিশ্বাস করেন? এসব কথা? আমি বললাম, না, হতেই পারেনা। 

সে ভীষণ মর্মাহত এবং রাগান্বিত। আমি চেহারা যত করুণ করা যায় ততই করুণ হয়ে রইলাম। সে অনেক কথা বলতে লাগলো। .......পাকিস্তানী ফৌজ কাফিরদের কাছে হেরে গেল.....? 

বললাম, অপেক্ষা কর। আরও খবর হয়ত আগামীকাল পাওয়া যাবে। 

সে বললো, ‘নেহিজী, আওর কেয়া খবর? এ খবর ছাহি হ্যায়’ বলে হাত তালি দিয়ে দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে থাকলো - ‘কেয়া হো গিয়া! কেয়া হো গিয়া!’ 

সে দেশে ধীরলয়ে হাত তালি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। মৃত্যু শোকে বা অন্য কোন গভীর বিপদের সংবাদে তারা হাতে হাতে করঘাত করে হৃদয়ের বেদনা ভার লাঘব করার প্রয়াস পায়। লাহোর খান বড় মর্মান্তিকভাবে আহাজারি করতে লাগলো, আমাদের ভাষায় যাকে বিলাপ করা বলে। তার খাওয়া বন্ধ হল, চা খেতে ভালবাসে, তাও বন্ধ হল। যেন তার বাড়ি শুদ্ধ লোকের অপাঘাতে মৃত্যু হয়েছে। 

একজন সাধারণ সৈনিক, একজন মানুষ নিজের দেশকে কত ভালবাসে! এই দেখে আমি স্তম্ভিত হলাম। মনে মনে আমি ভেবেছিলাম, লাহোর খান ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করবে। বাস্তবে হলো বিপরীত। একটু সাহস সঞ্চয় করে বললাম, খানা খাও। ভগ্ন স্বরে বললো, দেশ যেখানে ভেঙ্গে গেছে, সেখানে জীবন বাঁচিয়ে রেখে আর কি লাভ? সেদিন সে আর কোন কাজে হাত দিল না। খাবারও খেলনা। চলে গেল ব্যারাকে। 

আমার মনে একটি প্রশ্নের উদয় হলো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, যে ইয়াহিয়া খান বা ভুট্টো সাহেব কিংবা পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের, দেশের জন্য এই রকম মমত্ব বোধ নেই - যে মমত্ববোধ যে দেশপ্রেম একজন সৈনিক কিংবা একজন সাধারণ নাগরিকের মধ্যে আছে। যুগে যুগে, দেশে দেশে এই সব তথাকথিত নেতারা সভ্যতার পতন ঘটাচ্ছে এবং মানুষের প্রাণ ও সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে। 

পরদিন লাহোর খান এলো। বড় বিষন্ন! কোয়েটা স্টোভ ধরাচ্ছিল। কয়লা দিয়ে আগুনের তেজ বাড়াবার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ করে সে বলতে শুরু করলো,  ‘আব্ আপ কেয়া কারেঙ্গে?’ (এখন আপনি কি করবেন)? কাঁহা জায়েঙ্গে?’  

বিব্রত বোধ করলাম আমি। সতর্ক উত্তর দিলাম। বললাম, ‘ইঁহাই রাহেঙ্গে।’ 

উৎসাহের সঙ্গে সে বললো, ‘আপ মাৎ যাইয়ে ওধার। ওঁহা সব খতম হো গিয়া। হিন্দুও নে সব্ কব্জা কার লিয়া। ওঁহা আপকা কেয়া হ্যায়?’ 

বললাম, ‘কুছ নেহি।’ 


সে বললো, ‘আপ পাকিস্তান মে রাহে। ম্যায় আপকো জমিন দেঙ্গে। হামারা গাঁও মে বহুত জমিন হ্যায়। আপ হামারা গাঁওমে রাহেঙ্গে। পাঠান জো কওম হ্যায়, ও বহুত কমিন হ্যায়। ও আপকো বাঙ্গাল মে নেহি যানে দেঙ্গে।’ 

আমি একটু ভীত হলাম। লোকটা কি বলতে চায়? পরে বললাম, ‘হাম নেহি যায়েঙ্গে। ইঁহা মেরা ভাইকা পিন্ডিমে মাকান হ্যায়, করাচীকা ক্লিফটন বীচমে জামিন হ্যায়। হাম ইস্ মুলক্মে রাহেঙ্গে। তুম ফিকির মাৎ কারো।’ 

লাহোর খান আরো বললো, ‘যব সাহাব জংছে ঘর ওয়াপাস আয়েঙ্গে তব ম্যায় উনকো সামঝায়েঙ্গে।’ 

আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি শত্রু কবল থেকে মুক্তি লাভ করার কিছুকাল আগে একদিন এক পাঞ্জাবী অফিসার আমাদের দরজায় করাঘাত করে। ভাবলাম হয়তবা কোন হয়রানী করবার পরোয়ানা নিয়ে এসেছে। অর্গল খুলে জানতে চাইলাম, তিনি কি উদ্দেশ্যে এসেছেন। তিনি জানতে চাইলেন, ‘ডক্টর সাহাব ঘর মে হ্যায়?’ হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলাম। তিনি আগেই হয়ত জানতে পেরেছেন যে ইনি মেডিকেল কোরের অফিসার। হারুন সাহেবকে আগন্তুকের আগমন বার্তা পৌঁছে দিলাম। স্বাভাবিক অভিবাদন বিনিময়ের পর তিনি বললেন, তিনি গতকালই পূর্ব পাকিস্তান হতে ফিরেছেন। ওখানকার পুরো পরিস্থিতি তার অবগত। তিনি অনেক কথা বললেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাংলাদেশে তিনি পাকিস্তানীদের যুদ্ধ দেখেছেন, অত্যাচার দেখেছেন। অন্যদিকে তিনি বাঙ্গালীদের সাহস, এবং রুখে দাঁড়াবার কৌশল দেখেছেন। ‘সেখানে ভয়ঙ্কর এক শ্বাস রুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে আপনাদের বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। এ যুদ্ধ অন্যায় যুদ্ধ! এ যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল না। বাঙ্গালীরা জয়ী হবে। আমি এখানে এসেই শুনেছি যে এই মেসে একটি বাঙ্গালী পরিবার আছে। তাই দেখা করতে এসেছি । এই কথাগুলো বলার জন্য। একটি কথা স্মরণ রাখবেন এবং অন্যদেরকে বলবেন যে, সব পাকিস্তানী খারাপ লোক নয়। পাকিস্তানেও বিবেকবান, হৃদয়বান লোক আছেন, যারা এ যুদ্ধ চায় না, নিষ্ঠুরতা  চায় না। এই আমার অনুরোধ আপনার কাছে।'

উপসংহার

বাংলার দামাল ছেলেদের এক কঠিন, প্রাণপণ রক্তক্ষয়ী লড়াই- এ এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই সংগ্রামের প্রত্যক্ষদর্শীরা এখনো জীবিত আছেন। মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, তাদের প্রতি আমার অন্তরের অন্তঃস্থল হতে উৎসারিত অকুন্ঠ ভালোবাসা, মমতা ও শ্রদ্ধা বয়ে যাবে নিরন্তর। তাঁদের কাছে আমাদের ঋণ জন্ম জন্মান্তরেও শোধ হবে না। প্রতিজন মুক্তিসংগ্রামী অমর হোক। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। বাঙ্গালীর জয়রথ শান্তির পথে, সমৃদ্ধির পথে, বিশ্বের রাজপথে এগিয়ে চলুক।

...........

শিশু শ্রম -১৯৯৭