Saturday, April 5, 2025

গল্প-আবর্তন

 পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসই প্রথমে দুর্বল হয়ে জন্মায়। তারপর ক্রমে তার শক্তির বিকাশ হয়। পুনরায় সে শক্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তেমনি প্রতিদিন সূর্যও ভূ–গোলকের একটি স্থানে সূচিভেদ্য অন্ধকারকে তাড়িয়ে তার কোমল আলোর পরশে প্রাণিজগতের ঘুম ভেঙ্গে দেয়। ক্রমে তার আলো বা তাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষকেও সে কর্মচঞ্চল করে তোলে। আবার ঢলে পড়ে, ক্লান্তিতে, পশ্চিম দিগন্তে। হয়ত বা বিশ্রাম নেবার উদ্দেশ্যে। তখন মানুষেরাও ক্লান্ত হয়ে আশ্রয় নেয় তাদের নিরালা শান্তিময় বিরাম কুঞ্জে। তেমনি সেদিনও সূর্যি মামা সারাদিন তার নিয়মিত কাজ সেরে দিনান্তে আশ্রয় নিতে চাচ্ছে। তার রক্তিম আভাটুকু তখনও ধরণীর বুক থেকে মুছে যায়নি। তার রশ্মিগুলো তির্যক ভাবে ধরণীর দিকে তাকিয়ে আছে। হয়ত বা বিদায়ের করুণ ব্যথাই তার বুকে বড় হয়ে বাজছে। এমনি পরিবেশে দ্বিতলের একটি কামরায় বসে ডা. রাশেদ যার ডাকনাম ফুল, মুক্ত বাতায়ন পথে সে চেয়ে আছে মহাশূন্যে। তার দৃষ্টি যেন অসীম অনন্তকে ছাড়িয়ে একটি মাত্র বিন্দুকে লক্ষ্য করছে। তাহলে বুঝা যাচ্ছে সে কোন একটি বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করছে। সে হয়ত তার অতীত স্মৃতিকে রোমন্থন করছে –অমৃত লাভের সন্ধানে। কিন্তু তার ভাগ্যে অমৃত উঠবে না গরল উঠবে তা কে জানে? ফুল আজ সারাদিন কিভাবে কাটালো?  

এই একটি দিনই তার জীবনের চরম মুহূর্ত নিয়ে অপেক্ষা করছিল। মনে পড়ে তার সকালের কথা। জরুরী ডাক পড়েছিল হাসপাতালে। তার নতুন চাকুরি। তবুও লোকের কাছে অল্পদিনেই পরিচিত হয়ে উঠেছে,লোকের আকর্ষণের বস্তু হয়ে উঠেছে। সে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল হাসপাতালে। একখানি লতানো দেহ বিপরীত দিকে মুখ করে শুয়ে আছে ‘বেড’–এ । বুঝা গেল রোগী একজন নারী। ডা. ফুল রোগিনীর সামনের দিকে গেল।। সে রোগিনীর শীর্ণ হাতখানি ধরে ঘড়িতে হৃৎস্পন্দন দেখলো। তারপর মুখের দিকে তাকালো। তখন লক্ষ্য করলে দেখা যেতো ফুলের মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার হৃৎপিন্ড খুব দ্রুত রক্ত সঞ্চালন করছে। মৃত্যু যেন তাকেই পেয়ে বসেছে। এমনি তার ভাবখানা। মুহূর্তে সে নিজেকে সামলে নিয়ে কর্তব্য কাজে মন দিল। বোধহয় তার সারাজীবনের ডাক্তারী বিদ্যা আজ কাজে লাগিয়ে এই অকাল মৃত্যুর গ্রাস হতে রোগিনীকে রক্ষা করতে হবে। কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে ফুল বুঝতে পারলো চেষ্টা বৃথাই মাত্র। আশা নেই। প্রদীপে তৈল নেই। তবুও সে হাল ছেড়ে দিল না। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। এসব চিন্তা করে সে একটি ইনজেকশান দিল। একটু পরেই রোগিনী চোখ মেলে চাইলো। কিন্তু তার দৃষ্টি পলকহীন ভাবে পড়ে আছে ফুলের মুখের উপর। তার ভাব দেখে মনে হলো সে যেন কি সুখের মরণ মরতে যাচ্ছে। সকলেই ভাবছে এই দৃষ্টির অর্থ নেই। কিন্তু ডাক্তার বুঝতে পেরেছে এই দৃষ্টির অর্থ। তারপর রোগিনী অতি কষ্টে মৃদুস্বরে উচ্চারণ করলো,‘ফুল।’  

কেউ বুঝতে পারছিল না তার কথা কেবল মাত্র ডাক্তার ছাড়া।  

-‘চলে যাচ্ছি চিরতরে আমার প্রিয় পৃথিবী ছেড়ে। চলে যাওয়াই উচিত। আরো আগেই যেতে হতো। তবে আজ বড় সুখ পেলাম। সে সুখ মৃত্যু যন্ত্রণাকেও জয় করেছে। দুঃখ করো না এভাবে তোমার সঙ্গে দেখা হলো বলে।’  

শেষের কথাগুলো ভাল বুঝা গেলনা। ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও সে তার শেষ কথা বোধ হয় ডাক্তারকে শুনিয়ে গেল। তার কথা বলার শক্তি ধীরে ধীরে শেষ হয়ে এলো। মেয়েটি সুবোধ বালিকার মত শান্ত হয়ে এলো মেয়েটির স্বামী,আত্মীয়,পরিজন যারা কাছে ছিল, তারা সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সবাই ডাক্তারকে আঁকড়ে ধরতে চায়। কিন্তু ডাক্তার নিরুত্তর। বহু কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক রাখে। মেয়েটি অত্যাধিক চঞ্চল হয়ে উঠলো। কি একটা বললো বোধগম্য হল না। সে তার নিঃশেষিত শক্তির সমস্তটুকু দিয়ে ডাক্তারের হাত ধরে থাকলো। ক্রমে সে নিস্তেজ হলো। তার শিথিল হয়ে যাওয়া হাত খুলে গেল। ডাক্তার আবারও তার নাড়ি দেখলো। উদাস দৃষ্টি মেলে আত্মীয়দের দিকে তাকালো। তাকে আস্তে আস্তে যত্নের সঙ্গে শুইয়ে দিল। তারপর দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আরও দ্রুত পদ সঞ্চালন করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডক্টর্স্ কোয়ার্টাসে তার কামরায় পৌঁছে গেল। তখন দেয়াল ঘড়ি ঘোষণা দিল ঢং ঢং ঢং। ফুল এতক্ষণ পর হাত ঘড়ির দিকে তাকালো। দেখলো সত্যি তিনটা বাজে। সে বসে বসে ভাবতে থাকে তার অতীতকে।         

সময় মানুষের জীবনকে কত বদলে দেয়। মনে পড়ে একসময়ে মালা আর ফুলদের বাসা ছিল পাশাপাশি। প্রথমে পরিচয়,পরে বন্ধুত্ব। তারপর আরো কিছু। দুজন –দুজনকে ভালবাসতো নিবিড় করে গভীর ভাবে। স্কুলের সময় ছাড়া তারা একই সঙ্গে থাকতো। তারা যেমন সরল ছিল, সবাই তাদের সরল চোখেই দেখতো। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব গাঢ় হলো,ভালবাসা প্রেমে পরিণত হতে চললো। কিন্তু তাদের চারপাশ তাদের এই মেলামেশা আর সহজ ভাবে মেনে নিতে পারলো না। চারিদিক থেকে এলো বাধা। সব্বাই বললো, ‘পরিণাম খারাপ হবে। দুজনেই সরে পড়।’ মালার স্কুল জীবন সাঙ্গ হলো। বাধ্য হয়ে তাকে সরে পড়তে হলো। দুজনেই দুই শহরের কলেজে ভর্তি হলো। দুজনে দুজনের চোখের আড়াল হলো বটে,তবে মনের আড়াল হতে পারলো না। পরস্পরেরে আকর্ষণ প্রবল হলো। এরপর আরো বহু বাধা এসেছে। এমনকি পত্রালাপও বন্ধ হয়েছে। মনে পড়ে মালার শেষ চিঠির কথা। সে চিঠিটা সে ‘কাবুলীওয়ালা’-র মত সঙ্গেই রাখে। তার মানিব্যাগের ভেতর ওটা স্থান পেয়েছে। সেই চিঠিটা সে বের করে ফেললো। কম্পিত হস্তে সে খুলে ফেললো চিঠিটা।    

প্রিয় ফুল,   

তোমার চিঠি পেলাম। আর হ্য়তো তোমার লেখা আমার হস্তগত হবে না। তোমার চিঠি পেয়ে খুশী হয়েছি না দুঃখিত হয়েছি বলতে পারবো না। তোমার চিঠি না পেলেও শেষ বারের মতো এই চিঠি আমি লিখতাম। কিন্তু কি লিখবো বলতো? আজ যে আমার জীবনের চরম দিন উপস্থিত হয়েছে। এত যত্নে, এত সাধে গড়া সুখের জীবনের কল্পনা আজ মাটি হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জগতের প্রতিটি পদার্থ এমনকি অপদার্থরাও আমাকে বিদ্রূপ করছে। আমি চলেছি যন্ত্রচালিতের ন্যায়, অনুভূতিহীন। আমার উপর চলছে সামরিক শাসন। হঠাৎ মানুষগুলো কেমন বদলে গেল। তাদেরকে বড় অচেনা মনে হচ্ছে আমার। কেউ আমার আপন নয়। তুমি বিশ্বাস করছো কিনা জানি না।  তুমি লিখেছ,‘দীর্ঘকাল ধরে প্রতি মুহূর্তে ফুলে ফুলে যে মালা তুমি রচনা করেছ,সেটা ছিঁড়ে ফেল। নতুন করে মালা তৈরী করে তোমার প্রিয়তমের গলায় পরিয়ে দিও। মানাবে ভাল। আমাদের ফেলে আসা অতীতকে মনের কোণে ভিড় জমাতে দিও না। আর তাছাড়া আতীত এত বোকা নয়,সেও ভিড় করতে আসবে না। অর্থাৎ তার আর সেখানে ঠাঁই হবে না। সাবধানে থেকো। অতীত যদি মনের পর্দা উন্মোচন করে আসেও তাকে অতি গোপনে তাড়িয়ে দিও। প্রতিবাদ জানাবে না। আদর্শ গৃহিনী হও। তোমার প্রিয়তম ভাগ্যবান হউন।’  

তুমি যা লিখেছ সেজন্য তোমাকে প্রতিঘাত করতে চাইনা। সমাজ সংসারের যে নিয়ম,তুমি তাই অনুসরণ করেছ। তুমি আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পার নাই বা চেষ্টাও কর নাই। তবুও জেনে রেখ, জীবনের প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিদিন তিলে তিলে সমস্ত অনুভূতি দিয়ে ‘ফুলে ফুলে যে মালা’আমি রচনা করেছি,সে মালা আমি তোমাকেই পরিয়ে দিয়েছি। সে মালা পাওয়ার মত ভাগ্যবান অন্য কেউ নেই। হয়তো ভাববে,নেহাৎ মেয়েলী মনের ক্ষণিকের আকুল আবেদন। কিন্তু জেনো আমার মন চিরকাল তোমার জন্যই উন্মুখ হয়ে থাকবে, হয়তো শেষ মিলনের জন্য। আর জেনো একটি মাত্র গ্লাসে সেই আয়তনের দু’গ্লাস জল ধরে না। তোমাকে আর কি বুঝাবো? আজ বাংলাদেশের মেয়েরা গৃহলক্ষী, খুব বাধ্য মেয়ে, একথাই প্রমাণ করতে যাচ্ছি। কিন্তু একটা কথা আছেনা, মেয়েরা ছলনাময়ী। আমি হব তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বলতে লজ্জা নেই, কেননা আমি করতে যাচ্ছি অভিনয়। কেবল অভিনয়। শুধু ফাঁকির বোঝা বয়ে বেড়াবো। অন্তরে অন্তরে পুড়ে ছাই হয়ে যাবো সেই চারুদত্ত আধারকারের মতো। আমি নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে চাই। তবে বিধাতার নিকট আমার প্রার্থনা আমি যেন জীবনের শেষ ক্ষণে তোমার সাক্ষাৎ পাই। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। এটাই আমার শেষ চিঠি। পরম লগ্ন তার বিভিষীকাময় আকুতি নিয়ে কঠিন হাতে লৌহ শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলার জন্য এগিয়ে আসছে। শেষবারের মতো ক্ষমা চাইছি। আর শেষবারের মতো তোমার জন্য রইলো – চিরকাল যা দিয়ে এসেছি – হৃদয় নিংড়ানো প্রীতি, বুক ভরা ভালবাসা। উপহাস করো না লক্ষীটি। তুমি সুখে থেকো ভালো থেকো।                                   

ইতি –                                

তোমারই মালা 

কুমুদিনী কলেজ,টাঙ্গাইল

০৫.০৪.১৯৫৯