Sunday, November 25, 2001

সংলাপ

 পন্ডিত ব্যক্তিরা বলেন, অনন্তকালের মাঝে মহাসমুদ্রের বুদবুদের মত নাকি মানুষের জীবন। জন্ম এবং মৃত্যুর মধ্যবর্তী ব্যপ্তিকালকে জীবন বলা হয়। মহাকালের যাত্রাপথে প্রকৃতপক্ষেই মানুষের স্থিতি অতিশয় অল্প সময়ের। এই অল্পকাল জীবনটুকু একজন মানুষের সারাজীবন, দীর্ঘজীবন, চিরকাল। শৈশব, কৈশর, যৌবন, বার্ধক্য, মোটামুটি এই কয়টি জীবনের পর্ব । ধাপে ধাপে মানব সন্তান এসব পর্ব অতিক্রম করে তার আয়ুষ্কালের নাটকের যবনিকা টানে।

সৌরজগতে গ্রহনক্ষত্র সতত সঞ্চরমান। দিবাবসনে রাত্রি নামে। নিশি অবসানে ঊষার অভ্যুদয় ঘটে। এরই মাঝে মানবসন্তান জন্ম লাভ করতে থাকে। মহাশূন্যে জড়বস্তুরা কে কোথায় তখন অবস্থান করে, কে জানে? তবুও সেই জড় পদার্থ গ্রহনক্ষত্রই নাকি মানুষের জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যুর দিনক্ষণও স্থির করে দেয়। অর্থাৎ তার আয়ু, স্থিতিকাল রচিত হয় । 

এই আয়ু বা স্থিতিকালের মধ্যে মানুষ কি চায়? সুখ চায়, শান্তি চায়, ভালবাসা চায়, দীর্ঘদিন বাঁচতে চায়। বাঁচতে গিয়ে প্রতি পদক্ষেপেই অসুখ, অশান্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয়। লড়াই করে কেউ জয়ী হয়, কেউ হেরে যায়। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে একজন মানুষ হেরে যায় বা জয়ী হয় তা নয়। আর প্রতি মুহূর্তে জয়ী হয় তাও নয়।

Life is a pendulum between joys and sorrows, distress and happiness, hopes and despair. সুখ দুঃখ, শান্তি অশান্তি, জয় –পরাজয়, আশা –নিরাশা এসব পর্যায়ক্রমে মানুষের জীবনে আসে। সুখের পরে দুঃখ, দুঃখের পরে সুখ –এভাবেই জীবন কাটে। কারো সুখের পাল্লা ভারী, কারো বা দুঃখের। সেইদিক দিয়ে কেউ ভাগ্যবান, কেউ ভাগ্যহত। 

জন্মের পর মাতৃক্রোড় এক পরম সুখের স্থান। যারা মায়ের কোল পায় তারা পরম ভাগ্যবান। পরম স্নেহে, পরম নির্ভরতায় স্বর্গীয় বিমল আনন্দে কাটে তাদের শিশুকাল। হাঁটি হাঁটি পা পা করে মাতৃ ক্রোড় ছেড়ে নেমে আসে মাটিতে। তারপর বাটির অঙ্গন ছেড়ে প্রাঙ্গনে। তারপর বাল্যকাল, হাসি আর আনন্দ, খেলাধুলা, অক্ষরজ্ঞান লাভ, বিদ্যালয়ে প্রবেশ। পরে শুরু হয় মহাযজ্ঞ। জ্ঞান অর্জনের তপস্যায় ছাত্রজীবন গ্রহণ। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাপ অতিক্রম করে অগ্রসর হতে থাকে। পদার্পণ করে যৌবনে। যৌবন হচ্ছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। ‘এখন যৌবন যার/সময় হচ্ছে তার যুদ্ধে যাবার।’ জীবনে যা কিছু অর্জন, এই যৌবনকালেই সম্ভব। যে যেমনই ব্যক্তি হোক, তার কিছু প্রাপ্তি –ভাল হোক, মন্দ হোক, সফলতা ব্যর্থতা – সব এই সময়ে অর্জিত হয়।

সুশীল তরুণ, জীবনের একটি লক্ষ্য স্থির করে। সেই লক্ষ্যে সে অগ্রসর হয়। নিজেকে প্রস্তুত করে। বিশেষ কোন লক্ষ্য না থাকলে সেই যুবক পথ হারায়। লক্ষ্য না থাকলে গন্তব্যে পৌঁছাবে কি করে? ধরা যাক কেউ শিক্ষক হতে চায়। তাকে মনদিয়ে বিদ্যা উপার্জন করতে হবে। পাঠ্য বহির্ভূত পুস্তকাদিতে মনোনিবেশ করতে হবে। নিজের অধীত জ্ঞান অন্যকে দান করবার ক্ষমতা আয়ত্ত করতে হবে। ‘যতই করিবে দান, তত যাবে বেড়ে।’ বিদ্যা দান করার মধ্য দিয়ে নিজের জ্ঞানের পরিধি বিস্তার লাভ করে। এভাবে একদিন সে সুশিক্ষক হওয়ার গৌরব লাভ করে।   

অন্যদিকে যদি সেই যুবক কোন রকমে পরীক্ষা পাশ করে আর কোন উপায় নেই বলে শিক্ষকের পেশা গ্রহন করে, তবে তার ফল হবে বিপরীত। জ্ঞানের ভান্ডার তার অপূর্ণ। সুতরাং দান করবে কি? পাঠ্যপুস্তকের একই সিলেবাস সারাজীবন ধরে আউরে তিনি নিঃস্ব হবেন। শিক্ষকতার আনন্দ বা গৌরব লাভ তার কোনদিন হবে না। রিক্ততাই তার জীবনের শেষ পাওয়া হবে। 

এরকম সকল পেশায় মানুষকে দক্ষ ও পারদর্শী হতে হবে। নচেৎ সফলতা আসবে না। সফলতাই জীবনের সুখ। নিজের ও পরের কল্যাণ সাধনই জীবনের সন্তুষ্টি আনয়ন করে। এই সন্তুষ্টিই আনন্দ। আনন্দই সফলতার বার্তা বহন করে। 

অনেকে বলেন গ্রহ, নক্ষত্রই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে। যা ভাগ্যে আছে তাই হবে। সুতরাং সে ব্যক্তির করবার তেমন কিছু নেই। গ্রহ নক্ষত্র আসলেই ভাগ্য স্থির করে কিনা তা জ্যোতিষীরা জানেন। তবে এটি একটি বিতর্কিত বিদ্যা। 

অনাদিকাল থেকে মহাশূন্যে গ্রহ নক্ষত্র নিজেরাই অবিরত ঘুরপাক খাচ্ছে, তাদের কেন্দ্রের মহাশক্তিকে ঘিরে। আবর্তনের নিজস্ব ও নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। ভূ-পৃষ্ঠে ২৪ ঘন্টায় যত মানুষ জন্মগ্রহন করে তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণে এসব গ্রহ নক্ষত্রের কোন ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে হয়না। একই সময়ে জন্মগ্রহনকারী সকল জাতকের ভাগ্য একই রকম হয়না। সেইরকম একই ঘটনার শিকার সকল মানুষের জন্ম একই সময় হয়নি। তবুও অনেকে এসব গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থানের সময়ের সঙ্গে মানুষের জন্মের একটা সম্পর্ক স্থাপন করে দীর্ঘকাল গবেষণা করে তারা এক যোগসূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করে। এরকম একটি চিন্তার চর্চা করে তারা হয়তো একটি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। তবে কবে আসবে সেইদিন যেদিন জ্যোতিষিরা হস্তরেখা দ্বারা অনাগত ভবিষ্যতের সকল তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারবে। সকল বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে মানুষকে, সে আশা সুদূর পরাহত।

ভাগ্যের হস্তে সব সমর্পণ করে কেউ সাফল্যের পথে অগ্রসর হতে পারেনা। যে তরী যাত্রীকে তীরে ভিড়ায় সে তরীকেও চালনা করতে হয়। ভাগ্যে যাই থাকুক, মানুষকে তার অন্বেষণ করতে হয়। God has created food for the birds. But they are to fly for it. জীবনের পথকে নির্মাণ করতে হয়। তবেই সে পথে সে হাঁটতে পারবে তার গন্তব্যে পৌঁছার জন্য। একদিন পথের শেষে এসে দেখবে, ‘বেলা যে পড়ে এলো, জলকে চল।’ সময় শেষ। জীবনের অপরাহ্ন সামনে গোধূলী লগ্নের ম্লান আলো। জল নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা তার হিসাব কষতে হবে। হিসাব বরাবরই ভুল হবে, মিলবে না আর। চুপি চুপি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসবে বক্ষপিঞ্জরের ওপার হতে। তারপর একদিন নিজের চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক, হস্ত –পদ সব বিদ্রোহ করবে। মালিকের কথা আর শুনতে চাইবে না। অধীনস্তদের অধীনে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে। সকল কর্ম সমাপ্ত। চুকিয়ে দিতে হবে সকল লেনা দেনা। তামাম শোধ। বিচরণের পরিধি সীমিত। ক্রমে গৃহকোণ, তারপর শয্যা। পদচিহ্ন আর কোথাও পড়েনা। অপেক্ষা করতে হয় জীবন নাটকের শেষ দৃশ্যের।

‘জন্মিলে মরিতে হবে/অমর কে কোথা কবে,
চিরস্থির কবে নীর/ হায়রে জীবন নদে।’

এ যে চিরন্তন বাণী। অনন্ত কালের ধারায় ক্ষণিকের জীবন। কত সুখ, কত দুঃখ, কত বিচিত্রতার ভিতর দিয়ে অতিক্রম করতে হয়।  একটু সুখের জন্য কত না সংগ্রাম করতে হয়। কঠোর পরিশ্রমে তৃপ্ত হয় এই ভেবে যে একদিন তার পরিশ্রমের সোনার ফসল তার গোলা ভরে দেবে। 

‘জীবন যেন পদ্মপত্রে নীড়।’ মৃদু সমীরণে কত না সহজে ঘটে তার পতন! এ যে অমোঘ, এ যে বিধান। জন্ম, জরা, মরণ!   

     

২০০১