ফারাহ্ দিবা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এম. এ. ফাইনাল দিবে। এই সময় একদিন রেডিওতে একটি বিশেষ ঘোষণা শুনতে পায়। সোমালিয়ান দস্যু কর্তৃক শ্রীলংকার বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাই। বুকটা কেঁপে উঠলো। কারণ এই জাহাজে ছয়জন বাঙ্গালী তরুণ অফিসার আছেন। তাদের মধ্যে একজন ইমরান। গত চারবছর ধরে সে তার অন্তরঙ্গ বন্ধু। কিংবা তার চাইতেও অধিক কিছু। সে একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে। তবে মেলামেশা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তার আশেপাশে।
পারস্য উপসাগরকে লোকে গালফ্ বলেই জানে। সাধারণত এখানেই ভিনদেশি বাণিজ্য জাহাজগুলি জলদস্যু কবলিত হয়। কৃষ্ণকায়া সোমালিয়ান দুর্ধর্ষ দস্যুরা – যাদের হাতে থাকে অতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এ. কে.ফরটি সেভেন রাইফেল, তাদের সঙ্গে লড়াই করবার সাহস কারো নেই। মাত্র কয়েকজন জলদস্যু অনেক লোকজন সহ বিরাট বিরাট জাহাজ আটক করে ফেলে। আক্শি বাঁধা মোটা রশি জাহাজের উপরে বিশেষ কায়দায় ছুঁড়ে মারে।রাস্তা তৈরী হয়ে যায়। পরে গান পয়েন্ট তাক করে জাহাজের উপরে উঠে আসে। দিনের পর দিন জাহাজের লোকজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, খুন অনাহারে রাখা, পিপাসায় রাখা ইত্যাদি নানাবিধ অত্যাচার করে তাদের জীবন প্রদীপ নিবু নিবু পর্যায়ে নিয়ে আসে। জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে পড়ে আসহায়। ক্যাপ্টেনের মাধ্যমে শুরু করে জাহাজের মালিকের সঙ্গে দর কষাকষি। জাহজ মালিক এক পর্যায়ে মোটা অংকের মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হয়।জিম্মিরা মুক্ত হয়। প্রানে রক্ষা পায় বটে, তবে জীবনের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।
ফারাহ্ দিবা একা একা এই কষ্ট সহ্য করতে পারছিল না। একদিন বাসায় তার মনোবেদনার কথা প্রকাশ করে। সকলের সহমর্মিতা পায়। জাহাজ ছিনতাই এবং সংবাদ শোনার জন্য সকলে সর্বদা উৎকর্ণ হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখে মুক্তিপণ নিয়ে দরদাম হচ্ছে। শত কোটি মুদ্রা পেলে জলদস্যুরা জাহাজ ছেড়ে দেবে। সংকোচ পরিহার করে ফারাহ্ ইমরানদের বাসায় যোগাযোগ করে। তারাও ইমরানের জন্য গভীর ব্যাকুলতা প্রকাশ করে। কিন্তু কোন খবরই আসছে না। ফারাহ্ দিবার দিনরাত্রি প্রচন্ড যন্ত্রণায় অতিবাহিত হতে থাকে। সর্বদা ইমরানের দেওয়া আংটি তার অনামিকায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। কার্জন হলের পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে বসে একদিন চৈত্রের বিকেলের উতল হাওয়ায় মনের আনন্দে তারা দুজনে তাদের অংগুরীয় বদল করে ফেলেছিল। ইমরানের অনামিকার আংটি ফারাহ্র মধ্যমায় আর তার মধ্যমার আংটি, যার উপর এফ অক্ষর মিনা করা, ইমরানের অনামিকায় বদলী হয়ে গেল। দু’জনে একসংগে গেয়ে উঠলো –
‘ভালবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে/
মনে ক'রে সখী, বাঁধিয়া রাখিয়ো আমার হাতের রাখী—তোমার কনককঙ্কণে॥’
গান শেষে ওরা বলেছিল, এই –ই ভাল। আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন কি? চল যাই চাংপাই। চাংপাই রেস্টুরেন্টে দুজনে মুখোমুখি বসে চায়নীজ খাদ্য উপভোগ করে তাদের অলিখিত বন্ধন পাকা করে নিয়েছিল। তারপর থেকে দেখা হলেই দুজনে আংটির সংঘর্ষ করে নিতো। মজা পেত খুব। ঐ পুকুর ঘাট ছিল তাদের বৃন্দাবন।
পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে মন্দ মধুর হাওয়ায় দোল খেয়ে, রবি ঠাকুরের গান গেয়ে, তাদের প্রণয় দৃঢ়তা লাভ করে। একজন বিহনে আরেক জনের জীবন অর্থহীন মনে হয়। সেই প্রিয় মানুষটি আজ দূরদেশে কোন্ সাগরের জলে দস্যু কবলিত। হায়রে অদৃষ্ট! মানুষের জীবনে দুর্ভোগ কত ভাবেই না আসে। একসময়ে শুকিয়ে যায় চোখের জল। দুই পরিবারে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়।
হঠাৎ একদিন রেডিও মারফত জানতে পারে শতকোটি টাকার বিনিময়ে জিম্মিরা মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু ইমরান ফিরে এলো না। কেউ তার খবর দিতে পারলো না। সময় গড়িয়ে গেল। মাস গেল, বছর গেল। সংবাদ সংগ্রহের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। রেড ক্রসও কোন খবর দিতে পারলো না। হতাশাই দুই পরিবারের সম্বল হলো।
ফারাহ্ দিবা চাকুরী করছিল কলেজে। তার মা –বাবা মেয়ের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। মেয়েকে সংসার গ্রহণ করবার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। ‘মানুষ একা থাকতে পারে না। কার জন্য অপেক্ষা করছ? সময় থাকতে নিজের পথ দেখ। মানুষের নিজের আশ্রয় এবং অবলম্বন থাকা উচিত।’
এদিকে একই কলেজে এক ভদ্রলোক চাকুরি করেন। জীব বিজ্ঞানের প্রফেসর। বড্ড গম্ভীর। তারও জীবনের ইতিহাস আছে। একটি মেয়েকে তার ও খুব পছন্দ ছিল। সদা হাসি খুশী টিংকু। রঙ্গিন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায়। ইকরাম স্যারকে তার খুব ভাল লাগে। স্যারকে সে বন্ধুর মতো মনে করে। চঞ্চল চপল টিংকু তার হৃদয় –মন জয় করে নিয়েছে। তবে সে চালাকও বটে। ইকরামের পক্ষপুটে থেকে অন্য ফুলের মধুও আহরণ করে। চেখে দেখে কোনটা বেশী মিষ্টি। তাদে সঙ্গে অভিসারে যায় সুন্দর সুন্দর স্পটে। ইকরামকে তার আনন্দের কথা, আহ্লাদের কথা কিছু কিছু বলে। ইকরাম তার সততার মূল্য দেয়। ভাবে মেয়েটি খুব সরল, ছেলে মানুষ!
একদিন হাসতে হাসতে টিংকু তার বিয়ের খবর জানায় ইকরামকে। বাবা –মার প্রচন্ড আগ্রহ উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। কারণ সে তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান। ইকরাম লজ্জার মাথা খেয়ে বলে, পাত্র হিসেবে আমি কম কিসে? ত্বরিত উত্তর দেয় টিংকু। বাবা –মার অবাধ্য হওয়া যায় না। তবে আমি তোমারই থাকবো চিরকাল। এটা তুমি সত্য বলে জেনো। মানুষের অন্তরের প্রাপ্তিই আসল। এ বলে মায়া কান্না জুড়ে দিল।
এই ছেলেটির কথা টিংকু অনেকবার বলেছে। এটা ছিল তার শেষ খেলা। কিন্তু তবুও ইকরাম ভয়ংকর মনোবিকলনের শিকার হয়। এ কলেজের চাকুরী ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কলিগরা তাকে বাধা প্রদান করে। বলে কোথায় যাবে তুমি? কার জন্য? মানুষ সব কিছু থেকে দূরে চলে যেতে পারে। কেবল পারে না নিজের কাছ থেকে দূরে থাকতে। সুতরাং কোথাও যাবে না। আমাদের কাছে থাক। কষ্ট শেয়ার করবার লোক পাবে। তোমার সংগে যা ঘটেছে তা পরোক্ষে ভালই হয়েছে। তোমার ঘরে যখন তোমার তথাকথিত প্রিয়া অন্য ফুলের মধু আহরণ করতো, তখন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা দাঁড়াত। সবকিছুরই একটা অন্তরর্নিহিত মঙ্গল আছে। সুতরাং যেও না কোথাও, এখানে থাক।
ইকরাম থেকে গেল। পরিচয় ছিল কলিগ হিসাবে ফারাহ্ দিবার সঙ্গে। গল্প করতে করতে দুজন দুজনার জীবনের ট্র্যাজিডির কথা জানতে পারে। অন্যরা তো জানেই। তারা সকলে মিলে একদিন এই দুই ব্যক্তিকে ধরে বসে। বলে, আমাদের কলেজে কলিগদের মধ্যে কেউ একা নেই। কেবল তোমরা দুজনে সিঙ্গল। দুজনেই চূড়ান্ত ভাল মানুষ। এবার আর কোন কথা নয়। সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হও। উদ্বাহের বন্ধনের আয়োজন করি আমরা। শীঘ্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর।
কয়েকদিন পর কলিগরা আবার টিফিন পিরিয়ডের ধূমায়িত চায়ের উপর তাদের মতামত জানতে চাইল। তাদের অধোবদন, হাসিমুখ। সকলে ধরে নিল মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ।
তারা দুই পরিবারের গার্জিয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিয়ের দিন তারিখ ধার্য্য করে ফেলল। ইকরাম আর ফারাহ্ দিবা পবিত্র সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হলো। যাত্রা শুরু হলো একটি সুন্দর সাবলীল সংসারের। মানুষের জীবন একটাই। তাকে সার্থক করে তুলতে হলে একজন আরেকজনের দুখের সুখের সঙ্গী হতে হবে। দু’জন পরস্পরকে গ্রহণ করতে হবে ‘ভাল মন্দ মিলায়ে সকলি।’ আনন্দ, উৎসব, অনুষ্ঠান সবই হলো প্রথানুযায়ী।
দিন চলে যায় নদীর স্রোতের প্রায়। ফারাহ্ দিবার দুটি ছেলেমেয়ে। তারা স্কুলে যায় । এমন সময় একদিন ফারাহ্ ডি. ভি. পেল। আমেরিকা যাওয়ার ছাড়পত্র। অনেক চিন্তা ভাবনা করে একদিন ওরা পাড়ি জমাল আমেরিকায়। ওরা যেহেতু শিক্ষিত, সেজন্য চাকুরী পেতে অসুবিধা হয়নি। ছেলে মেয়েদেরকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। দেশেও ওরা ইংলিশ মিডিউয়াম স্কুলে পড়াশুনা করছিল।
বেশ কিছু বছর ওদের এভাবেই কেটে গেল। একবার একটি ভাল চাকুরীর সন্ধান পায় ফারাহ্। সব ফরমালিটি পুরা করে সামনা সামনি সাক্ষাত্কার দেবার প্রয়োজন পড়ে। ফারাহ্ দিবা হাজির হলো সে অফিসে। রিসেপশানে বসা লোকটিকে দেখে মনে হলো ভারতীয়। একটু পর মুখ তুলে লোকটি তাকিয়ে থাকলো ফারাহ্ দিবার দিকে। ফারাহ্ -ও বিস্ফারিত নেত্রে লোকটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। হঠাত্ লোকটি ব্যগ্রস্বরে বলে উঠলো – তুমি? আমি ইমরান।
একটি সূক্ষ্ম যন্ত্রণা এতকাল পরে বক্ষমাঝে আর্তনাদ করে উঠলো। মনটাকে শক্ত করে বেঁধে দ্রুত অফিস কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হলো। মনে হলো আজ সে বড্ড ক্লান্ত। হৃদয় কন্দরে বেজে উঠলো সেই সুর –ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু...।
No comments:
Post a Comment