মাস্টার অব সোশাল সাইন্সে ভর্তির মৌখিক পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছিল নাহিদ। পরীক্ষা শেষ। রেজাল্ট জানার জন্য সকলেই উদগ্রীব। বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় খুব ভীড়। নানা জায়গা থেকে ছেলেমেয়েদের আগমন। অধীর আগ্রহে প্রহর গুনতে গুনতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। এমন সময়ে রেজাল্টের শিট নোটিসবোর্ডে ঝুলিয়ে দিল। সকলেই হুমড়ি খেয়ে পড়লো সফলতার আশায়। লাইট না থাকায় পড়তে কষ্ট হচ্ছিল। অনেকই নিজের নাম দেখে বাইরে বের হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। মেয়েদের তো দেখবার উপায় নেই। এত ভীড়ে ঢোকা সম্ভব নয়। সেজন্য নাহিদ একজন ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে বললো এই যে, ভাই আমার নামটা একটু দেখে দেবেন!, নাহিদ, রোল নম্বর ৫৬৭। ছেলেটি ২০পর্যন্ত নাম দেখেছিল শেষ পর্যন্ত দেখে বললো, কই দেখছি না তো? আমার তো বিশ নাম্বারে নাম আছে। দাঁড়ান, আবার শুরু থেকে দেখি। দেখতে দেখতে হতাশ হলো। হঠাৎ ১৯শে এসে দেখতে পেল নাহিদ নিশাত। yes, your name is there নাহিদ নিশাত! নাহিদ আনন্দের আত্মহারা। তারপর দুজন ওখান থেকে বের হতে চেষ্টা করলো। প্রচন্ড চাপের মুখে ছেলেটি পথ করে নিল। নাহিদ তাকে অনুসরণ করে বের হয়ে এলো। সিড়ির নিকট এসে দেখলো চৈতালী ধূলোর ঝড় উঠেছে। ঝাপটায় দৃষ্টি অস্বচ্ছ। তার সাথে যুক্ত হচ্ছে মেঘের ঘনঘটা।
নাহিদ থাকে গ্রীনরোডে। সবাই ছুটে চলেছে। ঝড়ো হাওয়া, অন্ধকার, যানবাহন নেই। ছেলেটি নীলক্ষেতের দিকে এসে একটি ধাবমান রিক্সা জোর করে ধরে নাহিদকে তুলে দিল। আর সে নিজে উল্টো দিকে যাত্রা করলো মালিবাগের বাসার উদ্দেশ্যে।
কয়েকদিন পর ক্লাশ আরম্ভের চিঠি পেল ওরা। দুরু দুরু বক্ষে ছাত্রছাত্রীরা এসে হাজির। অফিস থেকে এসে জেনে নিল কোথায়, কত নম্বর কক্ষে তাদের ক্লাস হবে।
দিন যায়। পড়াশুনার প্রচন্ড চাপ। তারই মাঝে ছেলেটির সঙ্গে নাহিদের দেখা হতে থাকে। নাহিদের রোল নম্বর ১৯, সাজ্জাদ সুমনের ২০, তারা পরপর রোলকলের জবাব দেয়। বেশ মজা পায়। এক সঙ্গে ক্লাসে ঢোকে, এক সঙ্গে বের হয়। পড়াশুনার আলোচনা তো হয়ই। দুজনেই মেধবী। সুতরাং বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন গড়ে উঠে। দীর্ঘ দু’বছরে তাদের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। এখন একজন আরেকজনকে না দেখে থাকতে পারেনা। একসঙ্গে ঘোরাফেরা, লাইব্রেরিতে যাওয়া, ক্যান্টিনে খাওয়া – নিত্যদিনের রুটিন তাদের। এরমধ্যে ফাইনাল পরীক্ষা এসে যায়। দু’জনেই ভালভাবে পাশ করে। এবারও পরীক্ষার প্রাপ্ত নাম্বার কাছাকাছি। সুমন বলে ১৯ কম, তবুও ১৯ –এর নম্বর বেশী। নাহিদ হেসে বলে সংখ্যা হিসাবে ২০ পরে আসে, সেজন্য তার নাম্বারও কম আসে। এরকম ভাবে ওরা মজাও করে প্রায়ই। সামনে সিএসপি পরীক্ষা। প্রচুর পড়াশুনা। তাদেরকে সবজান্তা হতে হবে। প্রস্তুতি নিতে থাকে দুজনেই। এরই মাঝে নাহিদের বিয়ের কথাবার্তা চলতে থাকে। নাহিদ দেখতে ভাল। সুতরাং বিয়ের প্রস্তাব প্রচুর আসছে। খবর শুনে সুমনের চমক ভাঙ্গে। সে কি যেন হারাতে যাচ্ছে।সে নাহিদকে জিজ্ঞেস করে, তোমার এ বিয়েতে মত আছে? হঠাৎ নাহিদ কেঁদে ফেলে। বলে, না, নেই।
- তবে প্রতিবাদ করো না কেন?
-আমার কথার দাম দেয় না কেউ।
-সিএসপি পরীক্ষাটা দাও তো আগে।
-তারা বলেন যথেষ্ট হয়েছে। তোমার সিএসপি পরীক্ষা আটকাবে না। পড়তে থাক। ভাল পাত্র হাতছাড়া করা যাবে না।
সুমন বলে তুমি কি আমার কথা ভাববে না? জবাবে নাহিদ কেবলই চোখের জলে ভাসে। সুমন বলে তুমি উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে। বাবা মাকে বুঝিয়ে বল। তারা তোমার কথার গুরুত্ব দেবেন।
নাহিদ সাহস সঞ্চয় করে তার মনের কথা বাসায় প্রকাশ করে। অভিভাবকগণ সাজ্জাদ সুমনের বাড়ির, পরিবারের খোঁজ খবর সংগ্রহ করে। সুমনের পিতা গ্রামের একজন স্কুল শিক্ষক। সম্ভ্রান্ত বংশ। তবে এখন পূর্বের অবস্থা নেই। অনেক ভাই –বোন। সবাই লেখাপড়া করছে। সুমন সকলের বড়। তার অনেক দায়িত্ব। নাহিদকে গ্রামে যেতে হবে। গ্রাম সে কোনদিন দেখেনি। নাহিদের পিতা সরকারি উচ্চপদস্থ অফিসার। ইপিসিএস (EPCS) সে যুগে। জীবন যাপনের তরিকা উচ্চ পর্যায়ের।
সুমন দেখতে শুনতে ভাল। ছেলে ভাল। কিন্তু তাদের মতে এ ভাললাগা, বা ভালবাসা স্থায়ী হতে পারেনা। সুমনকে তাদের পর্যায়ে উন্নীত হতে অনেক সময় লাগবে। তাও যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। সুতরাং এ বিয়ে হতে পারেনা। নাহিদ অনেক জেদ করে। অনশন করে। তাতে কোন ফল হয় না। তার মন এতই ভেঙ্গে পড়ে যে তার পক্ষে সিএসপি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হয় না। লেখাপড়ার ইতি তার এখানেই।
নাহিদের বিয়ে পাকাপাকি হয়ে গেল এক আর্মির ক্যাপ্টেনের সঙ্গে। সুমন সিএসপি পরীক্ষা দিল। রেজাল্ট ভাল হল। ভাল চাকুরী হল। নাহিদের বিয়ে হল। স্বামী পশ্চিম পাকিস্তানে বদলী হয়ে নাহিদকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল। সুমন ‘শূন্য নদীর কূলে রহিল পড়ি।’ তার সোনার ধান অন্য লোকের নৌকায় বোঝাই হয়ে চলে গেল। সুমন সিভিল সার্ভিসে পশ্চিম পাকিস্তানের গোট্কি নামক স্থানে পোস্টিং পেল। কিন্তু সে গেলনা সেখানে। চেষ্টা তদবীর করে ইস্ট পাকিস্তানের এক জেলা শহরে ম্যজিস্ট্রেটের চাকুরী গ্রহণ করলো।
সময় চলতে থাকে অবিরাম। সুমনের ‘অন্তর আপনার মনে আপনি পুড়তে থাকে গন্ধ বিধুর’ ধূপের মত। নাহিদের স্মৃতির দীপশিখাটি তাকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে দগ্ধ করে। কাজে ব্যস্ত থাকে। বাকি সময় নাহিদের স্মৃতির সঙ্গে বসবাস করে। অন্যদিকে নাহিদের সংসার চলে স্বাভাবিক নিয়মে। প্রথম প্রথম সুমনের স্মৃতি নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঘোরাফেরা করতো। ভাবতে চাইতো এই –ই তার সুমন। পরপর তার দুটি সন্তান হয়। একজনের নাম রাখে সাজ্জাদ। আর মেয়েটির নাম রাখে সুমনা।
এরই মধ্যে বেজে উঠে ঊনসত্তরের দামামা। পাকিস্তানের রাজনৈতিক আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। শেখ মুজিব বিপুল ভোটে জয়ী হয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা তা মেনে নিতে অস্বীকার করে। চরম নির্লজ্জের মত তারা এই নির্বাচনের ফলাফলকে বয়কট করে। যার ফলশ্রুতিতে শুরু হয় ব্যাপক গণ জাগরণ। বাঙ্গালী ছাত্র সমাজ এবং শিক্ষিত সমাজ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সারাদেশ একত্রিত হয়। ’৭১ এর ২৫শে মার্চ মধ্যরাত্রে যখন পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে, বাঙ্গালী জাতি তখন হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। পরে এক ভয়ংকর যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। বাঙ্গালীর ছেলে আর ঘরে থাকতে পারলো না। সাজ্জাদ সুমন যুদ্ধে যোগ দিল। কখনও দেশের ভেতরে, কখনও দেশের বাইরে কাজ করে। তার যে এত সাহস আর এত শক্তি ছিল তা সে নিজেও জানতো না। এক কাপড়ে মাসের পর মাস, কত ঝড়ে, জলে ভিজেছে। ভিজা কাপড় গায়ে শুকিয়েছে। পোকামাকড়ের কামড়, জোকের রক্ত শোষণের কত না ইতিহাস। কত ক্ষুধা, তৃষ্ণায় কাতর হয়েছে। তবুও অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে।
এটা ছিল ৭১ এর শেষের দিকের ঘটনা। ওরা জামালপুরের বর্ডারে একটি আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তখন জানতে পারলো গ্রামের ভিতরে কয়েকটি বাড়িতে পাক বর্বর বাহিনী আগুন দিয়েছে। তারা দ্রুত এগিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে। খুব সন্তর্পণে ছোট্ট নদীটির ঢাল বেয়ে সুমনরা এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখে একটি মানুষ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ক্রুশে বোনা সাদা টুপিটি পড়ে আছে অদূরে। শ্বেত শুভ্র বস্ত্র তার ক্ষত –বিক্ষত। দেহে আঘাতের চিহ্ন। চাপ চাপ রক্ত তার দেহ ঘিরে। ওরা মুক্তি সেনারা লাশটি উল্টালো। সাজ্জাদ চমকে উঠলো। এ যে নাহিদের পরহেজগার পিতার লাশ। শ্বেত , শুভ্র চুল, দাড়ি, হাতে তসবীহটি তখনও ধরা। তাকে ঐভাবে রেখে অতি সন্তর্পণে উপরে গ্রামে চলে আসে। দেখে নাহিদের বাড়িটি ভস্মীভূত। কয়েকটি গজারী কাঠের খুঁটি তখনও নিভু নিভু জ্বলছে। ওরা তখন উত্তর দিকের জঙ্গলে চলে গেল। সেখানে ক্ষত –বিক্ষত মানুষ পড়ে আছে। ভোরের আলো ফুটে উঠছে দ্রুত। কে যেন পানি চাচ্ছে মৃদু স্বরে। কাছে গিয়ে দেখে এ যে নাহিদ! সেই সাদা মেয়েটি। দুটি বাচ্চা তার বুকের উপর মৃতের মত পড়ে আছে। সুমন টিউবওয়েল থেকে তার কোমরের গামছা ভিজিয়ে পানি নিয়ে নাহিদের মুখে দিল। ডাকলো, নাহিদ, নাহিদ। সে চেতনা ফিরে পেল। বললো, কোথায় আমার সাজ্জাদ, কোথায় আমার সুমনা?
-এই যে তোমার বাচ্চারা। দেখ, চেয়ে দেখ। ওরা ভাল আছে।
নাহিদ চিৎকার করে উঠলো। কে, কে, কে কথা বলে?
কে তুমি?
সুমনরা তাদের সকলকে ধরাধরি করে নাহিদদের রান্নাঘরে নিয়ে এলো। সে ঘরটি একটু দূরে থাকায় দগ্ধীভূত হয়নি। সকলেই মহিলা আর শিশু। তবে জখম আছে সবারই । চুল দাড়ির ভেতরে সুমনকে চেনা সম্ভব ছিল না। তবুও নাহিদ বলে উঠলো, কে আপনি? সুমন বললো, আমরা মুক্তিযোদ্ধা। সাবধানে থাকবেন। আপনার বাবা নদীর ঘাটের কাছেই আছেন। বলেই ওরা নিমেষেই অন্তর্হিত হলো। সূর্য উঠার পূর্বেই যে তাদেরকে ক্যাম্পে পৌঁছাতে হবে।
যুদ্ধের সময়ে নাহিদ লাহোরে অবস্থান করছিল। অবস্থা খারাপ বুঝে নাহিদকে তার স্বামী মেজর করিম ঢাকায় পাঠিয়ে দিল। সেটাই ছিল ভারতের উপর দিয়ে শেষ বিমান যাত্রা। তারপরই মেজর করিমের ইউনিট বর্ডার ডিউটিতে চলে গেল। নাহিদ ঢাকায় এসে অন্য সকলের সঙ্গে জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। সুমনের মনের অবস্থা খুব খারাপ। ইচ্ছা করছিল, ঝড় হোক, ঝঞ্ঝা হোক, সাইক্লোন হোক -সব তার জীবনের দুঃখ কষ্টকে উড়িয়ে নিয়ে যাক। এ জীবন তার অভিশপ্ত জীবন। যুদ্ধে যদি তার মৃত্যু হয় সেটাই হবে তার জন্য মুক্তি। যেমন গত পরশু তার প্রিয় বন্ধু সাংবাদিক পিন্টু, আহত মুক্তিযোদ্ধাকে পিঠে করে বহন করে আনার সময় পাক সেনাদের পাতা ফাঁদে পড়ে প্রাণ দিল। অদৃষ্ট কেমন নিষ্ঠুর, মানুষ তা জানে না। না হলে নাহিদের সঙ্গে তার এই অবস্থায় সাক্ষাৎ হওয়ার প্রয়োজন ছিল কি? ছিল না। অথচ অতীতের নাহিদ হারানোর দুঃখজনক স্মৃতির সঙ্গে এই মর্মান্তিক দৃশ্য যুক্ত হলো কেন? নাহিদ, আমার প্রিয় নাহিদ, আমার প্রাণাধিক নাহিদ, আমার জন্ম –জনান্তরের নাহিদ। কেন প্রথম দেখা হয়েছিল, কেন পুনরায় দেখা হলো?
মুক্তিযোদ্ধাদের এসব চিন্তা করবার সময় নেই। পরবর্তী কমান্ডের আদেশে তারা বেরিয়ে পড়ে অন্য অপারেশনে, একটি ব্রিজের কাছাকাছি যেদিক দিয়ে এক প্লাটুন পাকিস্তানী সৈন্য অন্য একটি গ্রামে ঢুকে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। সেদিন গভীর রাতে তারা বিলের ঠান্ডা পানিতে ঝোপ ঝাড়ের নীচে লুকিয়ে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে অপেক্ষা করছিল। গভীর রাতে পাক হানাদার বাহিনী এলো। মাইন ফিট করা ছিল ব্রিজের দুইপাশে। ব্রিজে উঠার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। অনেক সৈন্য হতাহত হয়। যে সমস্ত যানবাহন পেছনে ছিল, তারা নিজের অস্ত্র দিয়ে চারিদিকে ফায়ার করতে থাকে। মুক্তিসেনারা ডুব দিয়ে দূরে সরে যেতে থাকে। কেউ কেউ আহত হলো। কেউ অন্য পাড়ে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো। আর্মির গাড়ি চলে গেল। চারিদিক সুনসান।
‘সবকিছু একদিন শেষ হয়। যুদ্ধও একদিন থামে। সেই বিরতি কি শান্তি? ’ শান্তি না হোক স্বস্তি তো আনে। আশাবাদী মানুষ ধ্বংস স্তুপের ওপর আবার ঘর বাঁধে, বাঁচার স্বপ্ন দেখে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ছিনিয়ে আনে একটি লাল সবুজ পতাকা। বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সাজ্জাদ সুমন দেশে ফেরে। বাড়ি – ঘর তাদের অক্ষত আছে। মাতা –পিতাও জীবিত আছেন। ভাই – বোন সকলেই যুদ্ধে গিয়েছিল তারা কেউ ফেরে নাই। যে ভাইবোনদের সংখ্যা দেখে নাহিদের পিতা ভয় পেয়েছিলেন!
সরকারি চাকুরী তো সুমনের আগেই ছিল। এবার রেড ক্রসে তার পোস্টিং হলো। বৃদ্ধ বাবা –মাকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসে সে নিজের কাছে। কারণ গ্রামের শূণ্য ঘরে তারা কেবল কান্নাকাটি করেই দিন কাটান। সাজ্জাদ সুমন অফিসে যাতায়াত করে। তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে। বাকী সময় কোথায় কার কি কি ক্ষতি হয়েছে –সে সব খোঁজ খবর সংগ্রহ করে।
একদিন যখন সাজ্জাদ খুব ব্যস্ত তখন এক মহিলা দুই বাচ্চার হাত ধরে অফিসে আসে। তার কাছে প্রতিদিন কতশত লোক তাদের প্রিয়জনের খোঁজ খবর নেবার উদ্দেশ্যে আগমন করে। তাদের আশা, কোথাও না কোথাও তাদের লোক আহত অবস্থায় আটকে পড়েছে। একদিন না একদিন আসবেই।
নাহিদ ধীর পদক্ষেপে রেডক্রস অফিসে প্রবেশ করে অফিসারের ডেস্কের সামনে দাঁড়ায়। অফিসার ফাইল থেকে মুখ না তুলেই ইশারায় আগন্তুককে বসতে বলে। বেশ কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে প্রশ্ন রাখলেন, – কি চাই? নাহিদের বুকের ভিতর রক্ত ছলাৎ করে উঠে। সাজ্জাদ ও নাহিদের দৃষ্টি কোন এক চৌম্বক শক্তির কবলে পড়ে স্থির হয়ে রইলো দীর্ঘক্ষণ। কেউ কোন কথা বললো না। হঠাৎ নীরবতা ভঙ্গ করে নাহিদ কম্পিত কন্ঠে বলে উঠলো, মেজর কে. করিম নামের অফিসার এখন কোথায় আছেন? পশ্চিম পাকিস্তানে তার পোস্টিং ছিল পাঞ্জাবে। সাজ্জাদ দ্রুত হস্তে ফাইল বের করে। পাতা উল্টে –পাল্টে দেখতে থাকে পাকিস্তানে আটকে পড়া অফিসারদের নাম। হঠাৎ এক জায়গায় তার চক্ষু স্থির হলো। সাজ্জাদের হৃদপিন্ড কে যেন চেপে ধরলো। সে মাথা নত করে চোখ বন্ধ করে ফেললো। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে, নাহিদের চোখে চোখ রাখলো। দৃষ্টি এতই স্থির এবং শীতল, যে নাহিদ সহ্য করতে না পেরে মাথা নীচু করতে বাধ্য হলো। সাজ্জাদ একটি কালো বর্ডার যুক্ত কাগজ নাহিদের দিকে এগিয়ে দিল। কয়েক সেকেন্ড পর গায়েবী আওয়াজের মত গম্ভীর নিনাদ তুলে এক ভয়ংকর শব্দ উচ্চারিত হলো – Major K.Karim got killed in the western front during war.
No comments:
Post a Comment