জন্মের পর থেকেই শাকিলার বোনেরা শুনতে পায় তারা সব বোন। ইদানীং তাদের বাড়ির নাম হয়েছে ৭ বোনের বাড়ি। অনেকটা একই রকম ৭ বোন –কৃষ্ণকলি। রোগাটে পাতলা গড়ন। নাক খাড়া। চোখ পিঙ্গল বর্ণের। তার কারণ তাদের মায়ের রঙ ফর্সা এবং চোখের রঙ পিঙ্গল। অন্যদের দৃষ্টিতে ৭ বোন এক অদ্ভুত প্রজাতি, অন্য গ্রহের কেউ। যে কোন একজনকে দেখলে লোকে বলে ৭ বোনের বোন। তাদের নাম জানবার কারো আগ্রহ নেই। বড় হলেও শাকিলার বয়স মাত্র ১২ বছর। সে একটু চিন্তাশীল। অন্য বোনেরা হইচই করে, বকা খেয়ে দিন কাটায়। তাদের মাতা পিতা প্রকাশ্যেই তাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। ভাল পোশাক, ভাল খাবার তারা কোনদিন পায়নি। তাদের মা তাদেরকে বাড়ির সব কাজ ভাগ করে দিয়েছে। ঘর –দোর, আঙ্গিনা পরিষ্কার করা, ঝাড়া –মোছা করা, রান্নার যোগাড় দেয়া, বয়সে বড় শাকিলাকে রান্নার ভার দেয়া। বাসন –কোসন পুকুর ঘাটে বসে ঘষে –মেজে পরিষ্কার করে আনা। একটা বাসন পানিতে পড়ে গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা ডুব দিয়ে চোখ লাল করে সেটাকে খুঁজে তুলে আনতে হবে। ছেলে নেই বলে গরু ছাগলের পরিচর্যা করা, বাবার জন্য খাবার নিয়ে মাঠে যাওয়া আরও কত কাজ। আর তিন ক্ষুদে বাহিনী মনের সুখে বড় বোনদের সাহায্য করে। খাওয়ার সময় শাক সবজির ভর্তা, কাঁচা লংকা সহযোগে ভক্ষণ করে। সকালের নাস্তা তাদের লবণ দিয়ে তৈরী শুকনো রুটি। তাতেই তারা অমৃতের স্বাদ পায়।
এমন সময় একদিন সুবেহ্ সাদেকের সময় তাদের পরিবারে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে। তাদের ৭ বোনের একটি ভাই জন্মগ্রহন করে। শান্তির দূত, আনন্দের দূত, সাতবোনের ত্রাণকর্তা। এতদিনে পরিবারের কর্ণধারের আবির্ভাব! বাড়িতে আনন্দ জয়জয়কার। সাত বোনের নয়নের মণি। শতকাজের মাঝে তারা ভাইটিকে মাথায় করে রাখে।
বাবার কাছ থেকে ভাল ব্যবহার তারা কোনদিন পায়নি। এবার শাকিলা একটু বড় হয়েই স্কুলে যায়। পরবর্তীতে ছোট বোনেরা যেত। বাবা খুব রাগ দেখাত। ছোট ভাইটির জন্ম হওয়ার পর বাবার মেজাজটা একটু নমনীয় হয়।
ওরা সাত বোনই স্কুলে যায়। পড়ে সাত ক্লাসে। তারা সকলের হাসির পাত্র। কিন্তু সেদিকে ৭ বোনের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তাদেরকে সকলে সার্কাস পার্টির লোকের মত দেখে। কিন্তু পড়াশুনায় তাদেরকে কেউ পেছনে ফেলতে পারেনা। এলো বার্ষিক পরীক্ষা। ৭ বোন নিজের নিজের ক্লাসে সকলকে টপকে উপরের ক্লাসে উঠে গেল। ওদের সাফল্যে সবার ঠাট্টা – মসকরা বন্ধ হয়ে গেল।
স্কুল ছুটির পর ওরা বাড়ি এসে সব কাজ করে, ভাইটিকে দেখে, রাতে পড়া তৈরী করে। শাকিলা তাদের গাইড, তাদের মাস্টার। তাদের পিতামাতার সেদিকে খেয়াল নেই। ওদের বই নেই, খাতা নেই, কলম নেই, কাগজ নেই। শাকিলা পুরাতন বই যোগাড় করে বোনদের জন্য। যেটা নেই নিজে লিখে দেয়। নিজের বই –পত্র রাখে পরের বোনটির জন্য। এভাবে সব বোনেরা ছোট বোনের জন্য বই –খাতা রাখে। পড়ার পরিবেশ নেই বাড়িতে। পড়তে দেখলে বাবা বলেন, তেনারা জর্জ –ব্যারিস্টার হবেন। গায়ের রঙ যাদের হাড়ি –পাতিলের মত, তাদের এত পড়ে কোন লাভ হবে না। পরের ঘরে টিকে থাকতে হলে কাজ জানতে হবে।
মায়ের গায়ের রঙ ফর্সা। তা সত্ত্বেও মেয়েদের গাত্রবর্ণ কৃষ্ণবর্ণের, বাবার মত। নিজের গায়ের কালি মোছার জন্য সপ্তগ্রামের ওপার হতে ফর্সা মেয়ে আমদানী করা হয়েছিল, বিয়ে করে। কিন্তু বিধির বিধান খন্ডায় কে?
শাকিলার নেতৃত্বে বোনেরা সব একে একে স্কুল ফাইনাল পাশ করে চলে যায় উচ্চশিক্ষার পথে। যদিও সে পথ মোটেই মসৃন নয়। গ্রামের স্কুলের এখন খুব নাম কেবল এই ৭ বোনের জন্য। তাদের ভাল পোশাক নেই। তবুও তারাই শ্রেষ্ঠ।
অন্ধকার কুসংস্কারাছন্ন গ্রামে, পশ্চাদপদ পরিবারে তারাই আলোর মশাল জ্বালায়। যে মেয়েদেরকে পরিবারের এবং সমাজের সকলে অভিশাপ মনে করতো, তারাই এখন সকলের মধ্যমণি। তাদের একমাত্র হাতিয়ার তাদের বুদ্ধি, বিদ্যা এবং মনের দৃঢ়তা। প্রচন্ড দারিদ্র্যের মধ্যে অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে যায় শাকিলা। সঙ্গে নিয়ে যায় তার বোনদেরকে এবং ভাইটিকে। তারা এখন সকলের পুরোভাগে আলোর বর্তিকা হাতে। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শাকিলা সকলকে তাক লাগিয়ে দেয়। সম্মানজনক চাকুরীতে ঢুকে তার পরিবারকে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে চলে, যা কিনা হ্যামিলনের বাশরীওয়ালার মত এক অগ্রযাত্রাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যে গন্তব্য সকলকে আলোচিত মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেবে। ৭ বোন জাগিয়ে তোলে পুরা জনপদকে। গ্রামের লোকেরা তাদের বাবা –মাকে সম্মান করে। এদিকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্য্যয়নকালে শাকিলার পরিচয় হয় একটি ছেলের সঙ্গে। ক্লাসের সেকেন্ড বয়। পড়ার প্রতিযোগিতা শাকিলার সাথে। তাদের প্রতিযোগিতা প্রণয়ে পরিণত হয়। তারপর এক শুভদিনে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয় তারা।
একদিন প্রত্যুষে তারা খিরু নদীর তীর ধরে হাঁটতে থাকে। চারিদিকে পাখপাখালিরা ডানা ঝাপটা দিয়ে জেগে উঠলো। নিজ নিজ কন্ঠের অনুশীলনে প্রভুর জয়গান করতে লাগলো। পূর্ব দিগন্ত নরম লালিমায় ভরে গেল নবারুণ সম্প্রাতে। তারা দুজনে একসঙ্গে গেয়ে উঠে –‘আজি এ প্রভাতে রবির কর/ কেমনে পশিল প্রাণের প’র/ কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত পাখির গান/ না জানি কেনরে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।’
No comments:
Post a Comment