হঠাৎ সংবাদ প্রচার হল চীন দেশে এক ভয়ংকর রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, যা দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। আমরা এতটা উৎকন্ঠিত হইনি তখনো। তবে পর্যবেক্ষণ করছি তার গতিবিধি। খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলীয় দেশ সমূহে। দেখতে দেখতে উত্তর কোরিয়া পেরিয়ে খোদ আমেরিকায় তার প্রবেশ। তখন আমাদের টনক নড়ে, আতঙ্কিত হই। বিপুল সংখ্যক মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। ধনী, নির্ধন, ছোট,বড়, কালো, সাদা কোন ভেদাভেদ নাই। সে এক মারাত্মক রোগ, নাম তার করোনা ভাইরাস – ভয়ংকর রুদ্র রূপ ধারণ করেছে। অসংখ্য লোক মৃত্যু মুখে পতিত হচ্ছে। সৎকার করবার কেউ নেই। জীবিতের সংখ্যার চাইতে মৃতের সংখ্যাই বেশি। পৃথিবীর মানুষেরা সব গৃহবন্দি। তবুও কোন ফাঁক ফোকড় দিয়ে যেন মানুষের নাসারন্ধ্রে যেন ভাইরাসটি প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য নানাপ্রকার উপায় আবিষ্কার করার চেষ্টা চলছে।এরকম দুঃসময়ে ২০২১ সালে আমরা পুরো পরিবার আক্রান্ত হই।করোনা ভাইরাস সনাক্ত হওয়ার সাথে সাথে হাসপাতালে আশ্রয় গ্রহণ করি। চিকিৎসকগণ তাদের সাধ্যমত চেষ্টায় নিয়োজিত হন। তা সত্ত্বেও দ্রুত ভয়ানক অবস্থায় পতিত হই। মাঝে মাঝে ঘোরের মাঝে চলে যাই। এরকম অবস্থায় একদিন আমি দেখতে পাই রুমের ফ্লোরে শুয়ে আছি। ফ্লোরটি লাল রঙের এবং সেটি ঘুরছে ধীরে ধীরে। আমি সটান লম্বা হয়ে শীতল মেঝেতে শয়ান। আমার শিয়রের কাছে মস্তক বরাবর একটি গর্ত – একজন মানুষ ঢুকতে পারে এরকম। গর্তটি মাটির তৈরী – কালচে রঙ। এব্ড়ো থেব্ড়ো, মসৃন নয়। আমাকে নিয়ে লাল রঙের ফ্লোরটি ধীরে ধীরে ঘুরছিল। আমার মাথাটিও ঐ গর্তের মধ্যে ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছিল। আমার কোন কষ্ট হচ্ছিল না। এভাবে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে আমার মাথাটি বুক পর্যন্ত অন্ধকার গুহায় প্রবেশ করলো। কিন্তু তাতেও আমার কোন কষ্ট হচ্ছিল না। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে আমি মারা যাচ্ছি। ভাবলাম মৃত্যুর কষ্ট তো অনুভূত হচ্ছে না। এ কেমন মৃত্যু –যন্ত্রণা নেই, কষ্ট নেই। মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় কেন? জীবন আর মৃত্যু তো একইরকম। ভাবনাটা আমার এমন ছিল যে, মৃত্যু কোন আতঙ্কের ঘটনা নয়। জীবন যেমন স্বাভাবিক ছিল, মৃত্যুও তেমনি ‘শান্ত চরণে’ আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি আরামেই ঐ কৃষ্ণ অমসৃণ গহ্বরে প্রবেশ করছি। আমাকে বহনকারী লাল মঞ্চটি ঘুরে চলেছে গর্তটিকে সঙ্গে নিয়ে। একটা প্রশান্তির অনুভব। আমি একা। আমার বলার কিছু নেই। কেবল মনে হচ্ছিল শরীরের সবটুকু একবার পিছলে এই গভীর গহ্বরে পড়ে যাবে। তবুও দুঃখ নেই। শুধু একটি মাত্র কথাই মনে পড়ছিল যে, জীবন মৃত্যু একই সমান্তরালে অবস্থিত। জীবনও সুন্দর। মৃত্যুও সুন্দর।
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দেখি লাল মঞ্চটি এবার আমাকে নিয়ে উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করেছে। গতি আগের মতই মন্থর। আমার শরীর ঐ আঁধার গুহা থেকে উপরের দিকে উঠে আসতে শুরু করলো এবং আগের অবস্থায় ফিরে এলো। মাথার পাশের সেই গর্তটি তখনও দেখা যাচ্ছে। আবার কেন ফিরে আসা? সেই তো ছিল ভাল – মৃত্যুর হিম শীতল পরশখানি। কতক্ষণ এভাবে ছিলাম জানা নেই। লাল ফ্লোরটি তখনও ঘুরে চলেছে। আমি শোয়া অবস্থায়। এমন সময়ে শুনতে পেলাম কারা যেন আমেকে ডাকছে মৃদু স্বরে,
– ‘শুনতে পাচ্ছেন? চোখ খুলুন। কথা বলুন।’
চোখ খোলার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। কথা বলার চেষ্টা করলাম। এবারও ব্যর্থ। আরো মানুষের কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। ধীরে ধীরে আমার নয়ন দুটি একটু উন্মীলিত হলো। দেখি অনেক মুখ আমার মুখের উপর ঝুঁকে আছে। বড় ব্যাকুল আর উদ্বিগ্ন। আমি বিছানায় – বেডে। এতক্ষণ আমার চোখ আসলে বন্ধ ছিল। যদিও আমি সব দেখতে পাচ্ছিলাম বলে মনে হচ্ছিল।
এই আমার স্বপ্নের মত মৃত্যুর দুয়ার হতে ফিরে আসা। সেই দৃশ্যটি আমার অজান্তে ঘটেছিল। তবুও মনে হয় সত্যিই ঘটেছিল।
…………
জুলাই ২১, ২০২১
No comments:
Post a Comment