শেষ পর্যন্ত মালিহার পোস্টিং অর্ডার এলো। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক পল্লী গ্রামের কলেজে। মালিহা ইচ্ছে করেই এরকম একটি অদ্ভুত স্থানে চলে এলো। এই কলেজে কয়েকটি মাত্র মেয়ে পড়ে। আর বাকী ছাত্ররা সব আশে পাশের কয়েক গ্রামের। মেয়েদের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ কম্পাউন্ডের ভেতরেই দু’টি রুম নির্দিষ্ট করে রেখেছে। সেই মেয়েদের কামরাতেই মালিহার থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এ কলেজটি সরকারি কলেজ। অনেক সুযোগ দিয়েছে সরকার। কিন্তু শিক্ষকের বড়ই অভাব। এই পাড়াগাঁয়ে কেউ থাকতে চায় না। মালিহার মন্দ লাগে না। গ্রামীণ পরিবেশ। গাছপালার মর্মর ধ্বনি, চারিদিকে সবুজ শ্যামল শস্যক্ষেত্র। অনেকে ভাবে এ মহিলা এখানে কেন? কিন্তু কেউ জানে না মালিহা তার পরিচিত জগৎ থেকে পালিয়ে এসেছে।
কাজে দক্ষ বলে মালিহাকে সকলে সমীহ করে। এখানে একজন অংকের প্রফেসর আছেন, তিনি অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য তদবীর করেন না। তিনি কলেজের জন্য খুব পরিশ্রম করেন। কলেজে প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপাল নেই।। কারণ এখানে শহরের কোলাহল নেই, বিজলী বাতির চমক নেই। সেই কাক ডাকা ভোরে মালিহার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুরে ঘুরে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে। ‘ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে’- দিনের সূর্যোদয় দেখে। আর দেখা হয়, ‘একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিশির বিন্দু!’
কালক্রমে দেখা যায় অংক স্যার নাসিরুদ্দিন আর মালিহাই কলেজ চালান। অন্য বিষয়ও তাদেরকে পড়াতে হয়। শিক্ষক যায় বদলি হয়ে, নতুন শিক্ষক আসে। ছাত্র ছাত্রীরা পরীক্ষা দিয়ে চলে যায়, নতুন ছাত্র ছাত্রী আসে। স্থায়ী থাকে দু’জন মাত্র। মালিহা আপা, নাসিরুদ্দিন স্যার। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।
মজার বিষয় এরা দুজন দুজনকে চেনে। কিন্তু পরিচয় জানে না। একদিন নাসিরুদ্দিন বললেন, আপা, আপনার পরিচয় জানা হয়নি। মালিহা বলেন, পরিচয় আমার আহামরি কিছু নয়। ঐ চাকুরীর খাতায় যা লেখা আছে তাই।
– তবুও আরো কথা থাকে।
– আমার সবকিছু থাকা সত্ত্বেও আমি এক নীড়হারা পাখি।এই জন–অরণ্যে আমি একা। পথ হারিয়ে এই নিভৃত পল্লীর কোলে ঠাঁই খুঁজে পেয়েছি।
– আপনি এত হাসি –খুশী, এত কাজ করেন, দেখে মনে হয় না আপনার কোন দুঃখ আছে।
– দুঃখ আমার নেই। তবে অপমান বোধ আছে। একজনকে আশ্রয় – প্রশ্রয় দিয়ে আমি প্রতারিত হয়েছি।
– যদি আপনার আপত্তি না থাকে তবে আমাকে বলতে পারেন।
– আপনাকে বলে আমার কি লাভ? আপনি কি আমার মনের ভার লাঘব করতে পারবেন? আপনার পরিচয় তো আমার জানা নেই। আগ্রহও জাগেনি। মনে হয় যারা একা থাকে তাদের একটা অতীত আছে।
– নাসিরুদ্দিন চুপ করে থাকে। নিজের মগ্ন চৈতন্যে কোথায় যেন বেদনার সুর বেজে উঠে। তারপর বলে, আপা, যদি অজান্তে আপনাকে কষ্ট দিয়ে থাকি তার জন্য ক্ষমা চাই।
– ক্ষমা চাওয়ার মত অপরাধ করেন নি। স্বাভাবিক জীবন যাদের, তাদের গল্প –সল্প আলাদা। তারা জীবনের সুখ –দুঃখের কথা আপনা থেকে অনর্গল বলে যায়। আপনার আমার মত দরজায় অর্গল এঁটে রাখে না। আমার জীবনে অনেক কথা নেই, অনেক ঘটনা নেই। তবে যা ঘটেছে তা মর্মান্তিক। আমি ছোটবেলা থেকে একজনকে চিনতাম। স্কুলের নীচের ক্লাস থেকে। তারপর বহুদিন গত হয়েছে। ইউনিভার্সিটিতে পড়বার সময়ে আবার তার সঙ্গে দেখা হয়। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে মেলা –মেশা একটু বেশী হয়ে গেল। ভাবলাম প্রেমে পড়েছি। সেও তাই ভাবলো। আমার চাইতে তার আগ্রহই অধিক। আমি তা সত্য বলে মেনে নিলাম। পাশ করে বের হলাম উভয়েই। ভাল রেজাল্ট বলে তার ভাল চাকুরী হল। আমি পেলাম শিক্ষকতা। তার আর বিলম্ব সইছে না। সুতরাং পরিবারের দ্বারস্থ হতে হল। উভয় পরিবারের সম্মতি ক্রমে আমাদের সাজানো গোছানো ঘর –সংসার হলো। সুখে, আনন্দে, শান্তিতে দিন যেতে লাগলো। বছর দুয়েক কেটে গেল স্বপ্নের ঘোরে। এবার পরিবারের কলেবর বৃদ্ধির চিন্তায় আমরা বিভোর। সব কাজে তারই উৎসাহ অন্তহীন।
– আমরা ক্লাবে, পার্টিতে যাই। খুব মজা করি। একবার পরীক্ষার খাতা নিয়ে খুব ব্যস্ত। বেশ কিছুদিন যে কোথা দিয়ে গেল! এই সময় তাকে বেশ উদাসীন মনে হতে লাগলো। প্রশ্ন করলে উড়িয়ে দেয়। অল্পদিনের মধ্যে তার আমার দূরত্ব বৃদ্ধি পায়। আমি নিজের দোষ খুঁজে বেড়াই। হঠাৎ একদিন বলে, আমার পোস্টিং হয়ে গেছে।
– বদলি হয়েছ, কোথায় ?
– চট্টগ্রামে।
– হঠাৎ বদলি কেন?
– আমি আর এখানে থাকবো না। কালই চলে যাব।
মনে পড়লো সেদিন সে বাসায়ই ছিল। অফিসে যায়নি। আমি ছিলাম কলেজে। এরই মাঝে তার যা কিছু সব গুছিয়ে রেখেছে। আগে কোনদিন কাপড় –চোপড় , বাক্স গোছাতে জানতো না। এবার খুব ভালভাবে পেরেছে। অবাক হয়ে বললাম, এত তড়িঘড়ি পোস্টিং অর্ডার এলো কেন? কি করেছ অফিসে?
- কিছুই করিনি। আমি যেতে চেয়েছি, তাই যাচ্ছি।
আরো বিস্মিত হয়ে বললাম, কেন? কি বলছো এসব?
পরে তোমার সব কথার উত্তর দেবো, আজ নয়। বলে ঘুমিয়ে পড়লো। পরদিন সে চলে যাওয়ার পর আমি আমার টেবিলের উপর ডিভোর্স লেটার পেলাম। বিশ্বাস করতে পারিনি। ঘটনার আকস্মিকতায় জ্ঞান হারালাম।সেদিন ছিল ছুটির দিন। দুপুরে আমাদের বাড়ির লোকজনদের ডেকেছিলাম একসংগে লাঞ্চ করবো বলে। তারা এসে আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় আবিষ্কার করে। শুশ্রূষা করে। জ্ঞান ফেরে আমার। বিকেলে অবস্থার উন্নতি হলে ইকবাল কোথায় তারা জানতে চায়। আমার মনে পড়ে গেল সব কথা। আমি তাদেরকে চিঠিটি দেখতে বললাম।তারাও বিস্ময়ে নির্বাক। কি করে বুঝাই যে কিছুই হয়নি, কোন ঘটনা ঘটেনি। আমার ভাইয়েরা ইকবালের অফিসে খোঁজ নিতে গেল। এক অবিশ্বাস্য সংবাদ সংগ্রহ করে আনলো।ইকবাল কারো বাগদত্তাকে নিয়ে পালিয়ে গেছে দেশের বাইরে। চট্টগ্রামে নয়। চাকরীতে সে বেশ কিছুদিন আগেই ইস্তফা দিয়েছে। আমি আবার মূর্ছিত হয়ে পড়লাম।
একটানা এত কথা বলে মালিহা থামলো। নাসিরুদ্দিন ও এরকম একটি গল্পের আকস্মিকতায় নির্বাক। মনে মনে খুবই বিব্রত বোধ করল। ভাবলো, এরকম প্রশ্ন করা মোটেই উচিত হয়নি। কেউ আর কোন কথা না বলে উঠে যার যার গন্তব্যে চলে গেল। কেন যেন অনেকদিন পর মালিহার চোখে অশ্রু এলো। বঞ্চনার যন্ত্রণায় অধীর হলো। মেয়েদের হোস্টেলে এসে হাতমুখ ধূয়ে শয্যায় আশ্রয় নিল। ছাত্রী রুমমেটরা আপার বিষন্নতায় বিস্মিত। তারা চা-নাস্তা তৈরী করে নিয়ে এলো। জানতে চাইলো আপার শরীর খারাপ কিনা। জবাবে বললেন, তেমন কিছু নয়। বাড়ির কথা মনে পড়ছে। একমেয়ে সাহস দিয়ে বললো, সামনে তো রমজানের ছুটি আছে, তখন বাড়ি যাবেন। চা পান করলো মালিহা। মেয়েদের খোঁজ –খবর নিল।
মেয়েদের সর্বপ্রকার তত্ত্বাবধান মালিহা করে থাকেন। কারণ প্রিন্সিপাল, ভাইস –প্রিন্সিপাল ক্ষণস্থায়ী। বদলী হয়ে এ কলেজে আসার পর পরই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দরজায় ধর্না দিতে থাকেন অন্যত্র চলে যাবার জন্য। মালিহার মনে হয় এ কাজটি খুবই খারাপ। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। এ দিকটিতে কারো মনোযোগ নেই। যে কিছুদিন থাকেন, কলেজে না পড়িয়ে প্রাইভেট টিউশানী করে চলে যান।
সপ্তাহখানেক পর। নাসিরুদ্দিন আর মালিহা কলেজ শেষে গল্প করছিলেন। নাসিরুদ্দিন বললেন, আপা, সেদিন আপনার সঙ্গে কথা বলে সারারাত ঘুমাতে পারিনি। কেবলই মনে পড়ছিল, কোথায় যেন আপনার ঘটনার সঙ্গে আমার জীবনের ঘটনার মিল রয়েছে। আপনার অনুমতি পেলে বলতে পারি। মালিহা বলেন, অনুমতি দিলাম।
নাসিরুদ্দিন বলতে লাগলেন, আমার জীবনের ঘটনাও খুব মর্মান্তিক। আমি যখন অনার্স পড়ি তখন ট্রেনে একদিন ইডেন কলেজের একটি ছাত্রীও ভ্রমণ করছিল। আলাপ হলো। জানতে পারলাম আমরা একই গন্তব্যের যাত্রী। স্টেশনে নামবার পর মেয়েটির গার্জিয়ান বললো, আপনি যখন আমার এলাকার ছেলে, এরপর নুসরাত আপনার সংগেই আসা যাওয়া করবে। নুসরাত আমার অনেক জুনিয়র। কয়েক বছর ধরে তাকে নিয়ে যাতায়াত করতে হলো নিজের বড় ভাইয়ের মত। সে দেখতে শুনতে ভাল, হাসিখুশী। ঝর্ণার মত চঞ্চল, উদ্দাম, উচ্ছ্বল। আমি চুপচাপ বলে প্রায়ই সে অভিযোগ করে। ঢাকায় আমি তার লোকাল গার্জিয়ান। আমার পড়াশুনা শেষ। সে তখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। তাকে নিউমার্কেট নিয়ে যাওয়ার বায়না ধরে। আমার অস্বস্তি বোধ হয়। শেষ পর্যন্ত আমাদের মেলামেশা শুরু হয়। সে বলে, আমার পড়াশুনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি কোথাও যাবেন না। বললাম, চাকুরী করতে হবে না?
- চাকুরী করবেন, বিয়ে করবেন না?
- চাকুরী না থাকলে বিয়ে করবে কে?
- আগে চেষ্টা করে দেখেন, তারপর বলবেন।
- বৃথা চেষ্টায় কাজ নেই। মেয়ে খোঁজার চাইতে চাকুরী খোঁজার প্রয়োজন অধিক। পাত্রী তো পথে ঘাটে পড়ে থাকে না।
- পড়ে থাকে। দেখতে পান না আপনি? দেখার চোখ থাকতে হয়।
- একদিন ও না দেখিলাম তারে। কোথায় আছে সে?
- আমার চোখের দিকে তাকান। সেখানে যার ছায়া ভেসে উঠবে সেই হবে আপনার পাত্রী। আপনি তাকে খুব চেনেন।
- কই দেখছিনা তো? চোখের মণি দেখা যাচ্ছে।
- কেন আমাকে দেখছেন না? আমি কি অদৃশ্য, অশরীরি?
- তুমি?
- হ্যা আমি। এবং আমিই, আর কেউ নয়, কোন ভাবেই নয়, কোনদিন নয়, কোন কালেই নয়। চিরকালের আমি! কোনদিন যদি আমাকে ছেড়ে গেছ!
সে আমাকে জড়িয়ে ধরে রইলো। তার বক্ষের হৃদস্পন্দন আমার বক্ষে সঞ্চারিত হলো। আমি সুপ্তিমগ্ন থেকে জেগে উঠলাম। দেখলাম নুসরাতের চোখে পানি।
- কাঁদছো কেন?
- কাঁদবো না, আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। আমি মরে যাব, আমার পড়াশুনা হবে না, জীবন নষ্ট হবে। আমি কি ভাল মেয়ে নই? খারাপ কোনদিক?
- নিশ্চয়ই ভাল মেয়ে। কোনদিন কিছু বলেছি?
- তবে কেন আমার সঙ্গে ভাইগিরি কর?
চিন্তায় পড়ে গেলাম। লোকে কি ভাববে? ওর গার্জিয়ান হয়ে ওকে দখল করে নিয়েছি! কিন্তু বেশী চিন্তা করবার সুযোগ পেলাম না। সে আমাক এত কথা বলতে লাগলো, এত আব্দার করতে লাগলো, যে আমার সকল বাধা চূর্ণ –বিচূর্ণ হয়ে বন্যার স্রোতে ভেসে গেল। সে নিজে উদ্যোগী হয়ে বিয়ে ঠিক করে ফেললো। দুই পরিবারের সম্পর্ক দেখলাম বেশ জমে উঠেছে। ইতিমধ্যে তারও ইউনিভার্সিটির চৌকাঠ অতিক্রম করা হয়ে গেছে। আমি একটি কলেজে চাকুরী করি। বাসা ভাড়া করে থাকি। সে আমার বাসায় আসে প্রতিদিন বিকেলে। গোছগাছ করে। চা তৈরী করে নিজে খায়, আমাকে দেয়। সে তখনও হোস্টেলে থাকে। চাকুরীর খোঁজে অফিসে এবং অন্যান্য স্থানে ধর্না দেয়। এভাবে সম্ভবতঃ তখনই কারো সাথে তার পরিচয় ঘটে। সে কথা বলে প্রচুর। সাহসী মেয়ে। ছিনিয়ে নিতেও জানে, মারিয়ে যেতেও পারে। আমি তা পারিনা। শেষের দিকে তার কি যেন ব্যস্ততা থাকতো। আমার কাছে তেমন আসতো না। বলতো একটু বিরহ সহ্য কর। না চাইতে জল পেলে তেষ্টা মিটে যায়।
তার সাজগোজের সখ। দুই পক্ষের কেনাকাটা হয়েছে প্রচুর। বিয়ের অনুষ্ঠান ঢাকায় হোক, তাই তার পছন্দ। সুতরাং সেভাবেই বন্দোবস্ত করা হয়। বিয়ের দিন বিবাহ –বাসরে অতিথিরা সবাই হাজির। কনের দেখা নেই। তিনি গিয়েছেন বিউটি পার্লারে। অভ্যাগতদের আর কত বসিয়ে রাখা যায়। খাবার পরিবেশন করা হয়। খাওয়া শেষে সবাই প্রায় নববধূকে না দেখেই চলে যায়। সময়টা ছিল দুপুরে। দুই পরিবারের লোকেরা কনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এমন সময়ে হন্তদত হয়ে তিন মেয়ে ছুটে এলো। তারা নুসরাতের সংগেই ছিল। তারা যে সংবাদ পরিবেশন করলো, তা অবিশ্বাস্য, মর্মান্তিক। তাদের বক্তব্য হচ্ছে নুসরাত সাজগোজ করতে অনেক সময় নেয়। তারপর ঘড়ি দেখে নেমে আসে নীচে। একটি বেবি ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল। সে তার ভিতর ঢুকে পড়ে তার স্যুটকেস সহ। সঙ্গীদের বলে তোমরা অন্য বেবি ট্যাক্সি ভাড়া করে আস। তিন মেয়ে হতভম্ব। একটু দূরে গিয়ে ট্যাক্সি থামে। কাকে যেন ত্বরিত তুলে নেয়। তিন মেয়ের কাঁপুনি শুরু হয়। তারাও দ্রুত এসে বিবাহ আসরে উপস্থিত হয়। প্রথমে দেখে নুসরাত পৌঁছেছে কি না। তারপর বরকে প্রশ্ন করলো সে কিছু জানে কিনা। কোথায় যেতে পারে, কোথায় গেল। সঙ্গে অনেক গহনা, টাকাপয়সা আর কাপড় চোপড়। কিড্ন্যাপড্ হয়েছে কিনা। তিন মেয়ের কান্না আর সকলের বিমর্ষ ভাবে ক্যমিউনিটি সেন্টারে এক বেদনা বিধুর পরিবেশের সৃষ্টি হলো। সব বিল শোধ করে ওরা সবাই বাসায় ফিরে এলো। এমন সময় একটা ফোন এলো। এক অপরিচিত লোকের কন্ঠ। আমি নুসরাতকে নিয়ে ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছি। নুসরাতের বাবা নুসরাতের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। নুসরাত বললো, আপনারা আমাকে চেনেন। আমি স্বেচ্ছায় ইকবালের সঙ্গে সহযাত্রী হয়েছি। ঐ মুখচোরা নাসিরুদ্দিনের সাথে নিরানন্দ জীবন কাটানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এ লোক আমারই মত, আমার উপযুক্ত। আমার পথ আমি খুঁজে পেয়েছি। আমার সিদ্ধান্তে আমি অটল। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের ফ্লাইট।
শুনে সকলের প্রাণবায়ু বহির্গত হওয়ার উপক্রম। কান্নার রোল পড়ে গেল। বিশেষ করে কনের মা ও বোনেরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো। নাসিরুদ্দিন বরের পোশাক খুলে ফেললো। নুসরাতের বাবা মাকে সান্ত্বনা দিল। বললো, আপনারা আজকের ঘটনার জন্য দায়ী নন। তারা বললো, নুসরাত বাটপারের পাল্লায় পড়েছে। তোমার মত ছেলে সে কোথায় পাবে। নাসিরুদ্দিনের আত্মীয়েরা সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে গ্রামে ফিরে গেল। বলে গেল তোমার কোন চিন্তা নাই। কবুল তো ভাগ্যিস পড়া হয়নি। যে যাই বলুক, নাসিরুদ্দিন জানে গত পাঁচ বছরে তাদের কত কথা, কত স্বপ্ন, কত স্মৃতি। কেউ জানে না ভুলে যাওয়া এত সহজ নয়। ‘ভুলে যাওয়ার কঠিন সংকল্পই মনে রাখার প্রবল সহায়ক।’ নাসিরুদ্দিনের মনে পড়লো, অতীতের ঘটনা আমি ঘটাই নি। স্মৃতির আগুনে দগ্ধ হতে হবে চিরকাল। চিরকুমার থাকবো। বৌ খুঁজতে আর যাব না কোনদিন। ‘দৃষ্টিপাত’ –এর আধারকারের কথাগুলো তার জীবনে সত্য হলো, ‘প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে মহিমা। কিন্তু প্রবঞ্চিতকে দেয় কি? তাকে দেয় দাহ। যে আগুন আলো দেয় না, অথচ দহন করে।’ এই পাড়াগাঁয়ে বেশ আছি। ঐ বাঁশ বনের ধারে লেকচারারদের জন্য দুটি কুড়ে ঘর বাঁধা আছে। একটি উঠান, একটি ইঁদারা, একটি রন্ধনশালা। রাতে যখন ঐ বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ ওঠে তখন মনে হয়, স্বর্গের বাগানে বিরাজ করছি। বসে বসে তার রূপসুধা পান করি। স্বপ্নের ঘোরে চলে যাই। অন্য প্রফেসাররা থাকলে তাদের সঙ্গে আনন্দলোকের গল্প করে সময় কাটাই।
নাসিরুদ্দিন থামলেন। শ্রোতা মালিহা নির্বাক। এই তো সেই ব্যক্তি যে তাকে প্রতারনা করেছে। তার ক্ষেত্রে ইকবাল প্রচন্ড উৎসাহী, উদ্দাম। মালিহা শান্ত, স্নিগ্ধ, বিশ্বাসী। ভাগ্য যাকে মারে তাকে রক্ষা করে কে?
মালিহা, নাসিরুদ্দিন দুজনেই শান্ত, সৎ, কর্তব্যপরায়ণ।কাজ করতে ভালবাসেন। সারা বছর কলেজের কাজে ব্যস্ত থাকেন। দুজনের জীবনের প্রতারণা আর বঞ্চনার গল্প শুনে তাদের পরস্পরের জন্য কেমন একটা সহানুভূতির মমতা জাগে। নাসিরুদ্দিন একদিন বলেন, মালিহা আপা, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেন না? মালিহা নীরব থাকেন। তারপর বলেন, ভবিষ্যৎ চিন্তা করে কি লাভ? এইসব ইতিহাস নিয়ে নতুন করে পাত্র খোঁজা, ভাল মন্দের পরীক্ষা দেয়া এসবে আর রুচি নেই। আআর মন আমারই থাক।কারো কাছে বন্দক রাখার দরকার কি? নির্ঝঞ্ঝাট জীবন, শান্ত নদীটির মত –যেমন আপনার।
- উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমারও নেই, আপনারও নেই। তবুও পাশাপাশি বন্ধুর মত থাকলে মন্দ কি? না হয় বন্ধুর মত দুঃখ সুখ ভাগ করে নিলাম। জীবন কাটিয়ে দিলাম নদীর আপন স্রোতের মত।
- তাকে কি জীবন বলে? এক সঙ্গে থাকলে অনেক স্বার্থ, অনেক আশা, অনেক পাওয়া –না পাওয়ার প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। তখন আনন্দ বেদনার জীবন তরী বাইতে গিয়ে বৈঠা হয়ে দাঁড়ায় অস্ত্র –একে অপরকে ঘায়েল করতে দ্বিধা করে না। আপনার আমার অতীতে কোন টানা পোড়েন ছিলনা। বিনা মেঘে নীলাকাশের কোল থেকে বজ্র পড়ে সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে গেল। ওরা তো সুখেই আছে – আমার ইকবাল, আপনার নুসরাত। আপনি আমি নির্বাসিত জীবন যাপন করছি। আগেকার দিন হলে আন্দামান অথবা নিকোবরে গিয়ে আশ্রয় নিতে হতো!
- আমার তো বলার কিছু নেই। আপনি চিন্তা করে দেখেন। আমাদের তো এখানে অনেকদিন থাকা হলো। আমরা অন্য কোথাও বদলী হতে পারি। এ জীবন থেকে অন্য জীবনে পলায়ন।‘হেথা নয়, অন্য কোথাও অন্য কোনখানে।’
মালিহা গভীর ভাবনার মধ্যে পড়ে গেল। ইকবাল কত ভাল ছেলে ছিল। সেই তাকে ত্যাগ করলো। আর একে তো চেনেই না। কেমন ভবিষ্যৎ? আবার যদি দুঃখ আসে, রাখবে কোথায়? তবে লোকটিকে তার পছন্দ। একসঙ্গে জীবন যাপন করতে গেলে যে জিনিসের প্রয়োজন হয়, তার নাম সহমর্মিতা, বিশ্বাস আর ধৈর্য। নাসিরুদ্দিনের তা আছে। নাসিরুদ্দিনের চিন্তা, ভাবনা কম নয়। সে মালিহাকে সুখে রাখতে পারবে কিনা। মালিহা শান্ত মেয়ে। বঞ্চনার বেদনায় তার অন্তর নীল হয়ে আছে। সে যন্ত্রণা সে লাঘব করতে পারবে কিনা। বেশ কিছুদিন এভাবে গত হলো। একদিন মালিহা বললো, ঠিক আছে, চলেন সামনের গ্রীষ্মের ছুটিতে আমাদের বাড়িতে যাই। তার আগে পোস্টিং চেয়ে দরখাস্ত দিয়ে যাই। এখানে প্রিন্সিপাল, ভাইস –প্রিন্সিপাল, আরেকজন প্রফেসর বদলী হয়ে আসছেন। আমাদের এখন আগের মত দায়িত্ব নেই।
সে ভাবেই পরিকল্পনা করা হল। ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে আড়ম্বর না করে উদ্বাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। দুই পরিবারের পরিচয় হলো। দুটি প্রাণের গভীর অন্ধকার জীবনে যেন একটি আলোর মশাল জ্বলে উঠলো। ছুটি শেষে তারা কলেজে ফিরে এলেন। থাকলেন আগের মতই। যেহেতু তারা এখানে বহুদিন ধরে চাকুরী করছিলেন, সুতরাং তাদের পোস্টিং আসতে বিলম্ব হল না। একই শহরে। একজন মেয়েদের কলেজে, অন্যজন ছেলেদের কলেজে। যথাসময়ে তাদের বিদায় সম্বর্ধনা এবং নতুন কলেজে যোগদান। এখানে একটি বাসা ভাড়া করে তাদের সংসার জীবন শুরু। অনেকদিন পর মালিহার কেমন জানি অস্বস্তি বোধ হতে থাকে।তবুও তাদের যাত্রা শুরু হয় ভালভাবেই। কলেজের কাজও ভাল চলছে। এর কিছুকাল পরেই তাদের সংসারে নতুন মুখের আগমন ঘটে। একটি পুত্র সন্তান তাদের কোলে আসে। মুখখানা তার অবিকল মায়ের মত। দেখতে দেখতে সে বড় হয়ে উঠে। স্কুল, কলেজ অতিক্রম করে সে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। ইতিমধ্যে মালিহা, নাসিরুদ্দিন নানা স্থানে বদলী হয়েছে।এবার সিনিয়র হিসাবে ঢাকায় বদলী হয়ে আসে। ছেলে আশীস অর্থপেডিক সার্জারিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান করছে। ছোট টি মেয়ে। সে পড়ে বাবার মত অংক।
ছেলে প্রতিদিন তার রোগীদের কষ্টের কথা বলে, তাদের মানবিক আচরণের কথা বলে।একদিন বললো, একজন পেশেন্ট এসেছে মাল্টিপল্ ফ্র্যাকচার নিয়ে। থাকেন বিদেশে। ত্রিশ বছর পর দেশে এসেছেন বেড়াতে।একদিন সড়ক দুর্ঘটনায় শিকার হন হাইওয়েতে। সঙ্গে থাকা স্ত্রী নিহত হন। ইনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। হাসপাতালে আছেন কয়েক মাস ধরে। খুব কষ্ট তার। আশীসকে তার খুব পছন্দ।তিনি আশীসের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। আশীস তাকে একবার দেখে গেলে তার কষ্ট অনেক উপশম হয়। প্রায়দিনই সে এই অদ্ভুত চঞ্চল রোগীর গল্প বাসায় বলে।রোগী চায় কোন দৈব বলে উঠে দাঁড়াতে। তবে তার অবস্থার এখন উন্নতি হয়েছে। হাঁটতে শিখেছে ক্র্যাচে ভর করে।বাড়ি গিয়ে দেখবে তার শূন্য ঘর। কান্নায় তার চোখ ছল ছল করে ওঠে। তার একমাত্র পুত্র সাত সাগর পারের নীল নয়নার হাত ধরে আলাদা জীবন যাপন করে। সেই শ্বেতাঙ্গিনী দক্ষিণ এশিয়া লোকদেরকে দু’চক্ষে দেখতে পারেনা।ছেলের সাথে ফোনেই বাতচিত হয়। চেহারা দেখবার সৌভাগ্য আর হয় না। তাদের ইচ্ছা ছিল দেশ থেকে বেড়িয়ে গিয়ে নিজের বাড়িতেই দুজনে জীবন কাটাবে। মাঝে মাঝে এদেশ ওদেশ ঘুরতে যাবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। There is a slip between the cup and the lip. কিন্তু এখন কি হবে? বিলেতে একাকী জীবন যাপন বড় দুঃসহ। দেশে যারা আছে তারা আন্য জেনারেশান। আদর যত্ন করে তারা। তবে ভার নেবার মত কেউ নেই।
সেদিন ভদ্রলোকের প্লাস্টার খোলার দিন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোগী ভদ্রলোক বলেন, আমি গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। একমাত্র তোমার মুখখানা আমার অনন্দের উৎস। মনে হয় তুমি আমার জন্ম জন্মান্তরের চেনা। স্ত্রী নেই, স্বজন নেই। এই বিশ্বসংসারে কোথায় গিয়ে পড়বো! কি পাপ করেছিলাম। আমার কেন এমন হলো? তোমার মুখখানা স্মরণ করে যেন আমার দিনগুল শেষ হয়। তোমার জন্য আমার অশেষ দোয়া থাকবে।
আশীসের মা এই পথে বাড়ি ফিরছিলেন। ছেলের দেরী দেখে ফোন করলেন। জানতে পারলেন আশীস এখনই বাড়ি ফিরবে। মা বললে, চল তোমাকে নিয়ে যাই, তোমার রোগীটিকেও একবার দেখে যাই। মালিহা হাসপাতালে প্রবেশ করলেন। পায়ে পায়ে গিয়ে হাজির হলেন সেই রোগীর কেবিনে। দরজায় নক্ করায় আশীস এসে দরজা খুলে দিল। বললো, মা এই আমার পেশেন্ট। একবার দেখে যাও। ইনার নাম মিস্টার ইকবাল। বড় কষ্ট পেলেন তিনি।
মালিহা একদৃষ্টিতে পেশেন্টের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন –ইকবাল! এতকাল পরে চেহারা চিনতে একটুও দেরী হয়নি। অন্তরের অন্তঃস্থলে ইকবালের চেহারা একটুও ম্লান হয়নি। যদিও বয়সের চিহ্ন ধারণ করেছে। ইকবালেরও তাই। তারও ইচ্ছা করছিল সেই বহুকাল পূর্বের মত মালিহা বলে চিৎকার করে ওঠতে।
আশীস ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত। কেউ কোন কথা বললেন না! কোন সাধারণ কুশল বিনিময় পর্যন্ত নয়। দুজনেরই কন্ঠ রুদ্ধ। তাদের মধ্যে কোন অমিল বা বিরোধ ছিলনা। তবুও ভাগ্য তাদের টেনে দুদিকে দুজনকে ছিনিয়ে নিল। এর কি নাম কে জানে? হয়তো বা নিয়তি! তারপর সম্ভাষণ বিনিময় ব্যতিরেকেই মালিহা কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হলেন। ইকবাল আশীসকে ডেকে বললো, তোমার মা কে আমার সালাম দিও। মায়ের সঙ্গে তোমার চেহারার বড্ড মিল। এবার তুমি আস। অনেক রাত হলো। তোমার মা অপেক্ষা করছেন। আশীস বেরিয়ে গেল। ইকবালের চোখে অশ্রুর বান এলো। মনে পড়তে লাগলো অতীতের সেই সোনাঝরা দিনগুলো। তবুও এতবড় অন্যায় কাজটি করেছিল একটি উদ্ভ্রান্ত উচ্ছৃঙ্খল মেয়ের জন্য। কি জানি কি ছিল বিধাতার মনে! তারই পাপের ফল তাকে বাকী জীবন ভোগ করতে হবে।
মালিহা বাসায় ফেরে। বাধ ভাঙ্গা কান্নার স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অচিন গাঙ্গের স্রোতে। অশীস কম্পিউটার নিয়ে বসে তার কাজে। নাসিরুদ্দিন লক্ষ্য করে মালিহার বিষন্নতা। জানতে চায় কোথায় কোন বিভ্রাট ঘটেছে কিনা। মালিহা ব্যালকনিতে গিয়ে বসে। নাসিরুদ্দিন তার পাশে। মালিহা ব্যক্ত করে তার অগ্নিদগ্ধ হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কথা। কেমন করে দুজন প্রতারক দুটি ভাল মানুষকে প্রবঞ্চিত করে অনায়াসে আরেকটি নৌকায় উঠে চলে গেল। পিছনে পড়ে রইলো দুজন আধারকার, যারা সেই ‘দিপ্তীহীন অগ্নির নির্দয় দহনে পলে পলে দগ্ধ হলেন।’
বিধাতা বড় নাট্যকার। মালিহা নাসিরুদ্দিনের মিলন, আর আজকের এই নাটকীয় সাক্ষাৎ একেবারেই অপ্রত্যাশিত। নাসিরুদ্দিনের বক্ষ পিঞ্জরে সেই একই ঝড়। তার নুসরাত এখন পরলোকে চলে গেছে। বলার মত আর কিছুই ছিল না। দুজনে উদাস দৃষ্টি মেলে সুনসান শূন্য গলির দিকে তাকিয়ে রইল।
.......
১৬.১২.২০০৯
No comments:
Post a Comment