Tuesday, August 19, 2025

এক কৌটা কেরোসিন

 ঝন ঝন ঝনাত –গভীর নিশিথের অখন্ড নীরবতা খান খান করে পিক্‌দানির উল্টো পিঠে রক্ষিত পিতলের কুপিটা বিকট আর্তনাদ করে উঠলো। কুপিটা ছিটকে পড়েছে। পাশের ঘর থেকে শ্বশুর –শাশুড়ি ও একটি শিশু তাল মিলিয়ে পরিবেশটাকে আরো জমকালো করে তুললো। তারপর সমস্বরে ভেসে এলো, 

–‘কি অইছে বউ? কি হইছে? রাইতেও তোমরা একটু শান্তিতে থাকতে দিবা না? কোন কুক্ষণে যে তোমার মত অলক্ষী বউ ঘরে আনছিলাম, তা আল্লাই জানেন।’ ভীত সন্ত্রস্ত বধুটি যথাস্থানে দিয়াশলাই না পেয়ে স্বামীর বালিশের নীচ থেকে তা আবিষ্কার করলো। আলো জ্বালালো। দেখলো আর বুঝতে পারলো যে ঘুমের ঘোরে যে বিড়ালটিকে আঘাত করেছিল, তারই প্রতিঘাতে এই ভীষণ কান্ডের সৃষ্টি। খানিকটা কেরোসিন তৈল গড়িয়ে পড়েছে মাটিতে। প্রকৃত ঘটনা কি তা জানার জন্য পাশের ঘর থেকে বিষমাখা অজস্র প্রশ্নবাণ ছুটে আসছে। শরাহত বধুটি ভীত কন্ঠে ছোট্ট জবাব দিল, ‘কিছু তৈল পইড়া গেছে, মা –জান!’ কিন্তু কথা শেষ হতে না হতেই শ্বাশুড়ীর বেশ কিছুদিনের পুঞ্জিভূত কথার বাণগুলো রুদ্ধমুখ নির্ঝরের মত বাঁধনহারা হয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে ধ্যানী –মৌনী রাত্রির সুগভীর স্তব্ধতাকে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ইথারের তরঙ্গে তরঙ্গে ছড়িয়ে পড়লো। ‘তোমার মত পোড়া কপালী আর কেউ নাই। তোমার কপালের বাতাসে এই কয়মাসেই আমার সংসারের সব ধুইয়া যাইতাছে গা। এই তো সেই দিনকা, কোলের পোলাডার লগে তামাশা কইরা সাড়ে চার টাকা দামের নতুন হারিকেনের চিমনিটা ফাটাইয়া ফেলাইছ। চাইল –ডাইল ধুইবার সময় সের খানিক পানির লগেই থাইক্যা যায়। নবাব সিরাজুদ্দোলার মাইয়া কিনা, হের লিগা কিছু গায়ে লাগেনা।’

তরুণী বধু রাহেলা শুধুই ভাবে আল্লাহ্‌ যদি তার ভাগ্যে তাই –ই লিখেছেন তবে কেন তাকে বধির করে সৃষ্টি করেন নি? আবার ভাবে, বধির হয়ে জন্মগ্রহন করলে, সে যাদেরকে ভালবাসে তাদের আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত থাকতো। তার অতি প্রিয় মানুষটিও বোধহয় শ্বশুর –শাশুড়ির দলে ভিড়ে যেত। না, ঠিক আছে। এমন বকাঝকা শাশুড়িরা বউদের করেই থাকে। তাতে রাগ করবার কি আছে? অনেক রকম চিন্তা করে নিজের মনকে সে বুঝিয়ে বললো, যে, স্বামীর কাছে থাকতে হলে তাকে সবই সইতে হবে। তাই সে রাত্রে স্বামীর ভাষাহীন নীরব সহানুভূতি নিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো।

নিরব পৃথিবী আবার জেগে উঠলো পরদিন প্রভাতে। চোখ মেলে চাইলো।  মুচকি হাসিতে পূর্বাকাশে রাঙা হয়ে উঠলো। ফুল ফুটলো। কিন্তু ঘুম কাতুরে দুটো কুঁড়ি যেন আজ সহসা ফুটতে চাইছে না। ওসমান, রাহেলার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো –শিগগির ওঠো। মা তো অহনাই উইঠা পড়বো। উঠ্‌, উঠ্‌। পাশের ঘর থেকে শিশুর ক্রন্দন ধ্বনি  ভেসে এলো। ধড়মড় করে উঠে বসলো রাহেলা। ওসমান বেরিয়ে গেল। গত রাতের ঘটনা স্মরণ করে রাহেলা শিউরে উঠলো। এত দীর্ঘ দিনটা যে আজ কেমন করে পাড়ি দেবে। পিতৃহীন দুলালী, মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে। তার মা তো তাকে কোনদিনও বকে না। ওসমানও বকে না। তবে ওসমানের মা –বাবা কেন তার ভুল ধরে। 

ক্রমে সূর্যিদেব তার আলোর রথ ছুটিয়ে সব মানুষকে কর্মচঞ্চল করে তুললো। রাহেলার শাশুড়িও জড়তা কাটানোর জন্য বৌকে একই কথা পুনঃ পুনঃ বলতে লাগলো। এক কুপি তেলের দাম দুই আনা। তোমার নবাব বাপের বাড়ি থেইকা আইন্যা ঢালবার পারনা? পরের জিনিসের তো দরদ নাই। এইডা খুব হস্তা! আমার কপালের দোষ। নাইলে এমন অভাগা বউ আইলো আমার ঘরে? খালি খাইবার যম। তোমারে আর রাখতাম না। তোমারে পাঠাইয়া দিমু। 

শেষের বাক্য দুটি রাহেলাকে প্রচন্ড ভাবে আঘাত করলো। দিনের পর দিন যদি তার অপরাধের বোঝা এমনিভাবে বেড়ে যায় –তবে সে কি করবে? তাই সে নিজের ভাগ্যকে বারবার ধিক্কার দিতে লাগলো। যদি তাই না হবে ওসমানের মতো স্বামী কে হারাতে চায়? অজ্ঞানেই হোক আর সজ্ঞানেই হোক, যেখানে একবার ফাটল ধরেছে, তা আর জোড়া দেবার নয়। কাজেই রাহেলা তার ভবিষ্যত চিন্তা করে আকুল হয়ে পড়লো।

দিনান্তে ওসমান বাড়ি ফিরলো। তখন ওসমানের কাছে বউ এর একদফা নালিশ পেশ করা হলো। চঞ্চল পৃথিবী আবার নীরব হলো। রাত্রি নামলো। সে তার সন্তানদের তার ক্রোড়ে আশ্রয় দান করলো। ওসমান আর রাহেলা মিলিত হলো। তারা যেন ক্ষণিকের জন্য দুঃখ ভুলে গেল। অন্যদিনের মত আজও তেমনি জোৎস্না প্লাবিত ছোট্ট আঙ্গিনা পেরিয়ে দিঘীর ঘাটে তারা উপস্থিত হলো। নিত্যকারের মত আলাপ হলো না। শুধু মনের কাছে মন ভীত হলো। কাছে আসতে পারলো না। রাহেলা কেবলই শুনতে পায় –তোমারে আর রাখতাম না। ওসমান বলে, আমি রাখলে তোমারে ছাড়ে কেডা? কিন্ত রাহেলা জানে পারিবারিক ব্যাপারে ওসমানের কোন ক্ষমতা নেই। রাহেলা কোনদিন তার স্বামীর কাছে কোন অভিযোগ জানাতো না। কিন্তু ওসমান সবই অনুমান করতে পারতো। এমনি ভাবে কিছুদিন চলে যায়। কালের পাতায় লেখা ঘটনা মুছে যায় অনেক। কিন্তু শাশুড়ির অন্তর থেকে আধা ছটাক কেরোসিনের দাগ আর শুকায় না। দিনের পর দিন এই বেদনা তাকে পাগল করে তোলে। তাছাড়া প্রতিদিন অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ঘটনা নিয়েও সে এটার আয়তন বৃদ্ধি করে চলছে। রাহেলার কচি মন দিনে দিনে অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে অকেজো হয়ে পড়লো। সে আর কোন রকমেই নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারলো না সেই পরিবেশে। এই অপরাধে অপরাধী হয়ে তাকে পরের দিনই মায়ের বাড়িতে চলে যেতে হয়। যাবার পূর্ব রাত্রিটি তার জীবনের চরম ও পরম রাত্রি হয়ে ধরা দেয়। সেই রাত আর সেই চাঁদ তাদের দুজনার জন্যই যেন সৃষ্ট। ব্যথিত, মথিত, বিক্ষুব্ধ দুটি চিত্তের সেতু বন্ধন। একজনকে আরেকজনের কাছে সমর্পণ করবার উপযুক্ত সময়। অন্তরে অন্তরে আলিঙ্গন। চোখে চোখ আর হাতে হাত রেখে কেবল নিবিড় করে গভীর ভাবে অনুভব করবার এই –ই সময় –এই মহিমাময়ী মৌনা রজনী। অনেক কিছুই বলার ছিল। কিন্তু কিছুই তো মনে আসছে না। তবে হ্যা, নিতান্ত ভাবেই তাকে দু’একটা কথা আজ বলতেই হবে। তাই রাহেলা ভাব বিহ্বল জগতের বাইরে এসে বললো, ‘আমাকে তো কাইল মায়ের কাছে পাঠাইয়া দিব, তুমি তো জানই। আমি তোমার কাছে চিঠি লিখুম। তুমি তো লিখতে জান না, কেবল পড়তেই শিখছো। চিঠির উত্তর চাইনা। আমার চিঠি পাইয়া তুমি যাইও। চিঠির কথা কেউর কাছে কইও না।’ উত্তরে ওসমান বলেছিল, ‘অত ভাইঙ্গা পড়ছ ক্যা? তুমি কাইল যাও। কয়েকদিন পরেই আমি তোমারে লইয়া আসবো। পরে দেখবা সব ঠিক হইয়া যাইব।’ আরো তার কথা বলার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু বাবা –মা যে রকমই হোক না কেন, তারা তো মুরুব্বী। তাই চুপ করে থাকলো। রাহেলা শেষ বারের মত নয়নের জলে ওসমানকে সিক্ত করে দিল। 

রজনী প্রভাত হলো। কিন্তু অন্যদিনের মত রাহেলা তার মায়ের কাছে যাবার আনন্দে আত্মহারা হলনা। যথাসময়ে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হল। মা মেয়েকে কাছে পেয়ে খুব খুশী হল। আদর করে ভরিয়ে দিল। 

গেল বেশ কিছুদিন। রাহেলা ক্রমে ক্রমে অসুস্থ হতে চলল। কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না! অবস্থা খারাপ হতে খারাপতর হতে লাগলো। রাহেলার মা ব্যস্ত হল। রাহেলা স্বামীর স্মরণে স্মারক লিপি রচনা করলো। কোন একটা হিতাকাংখী কর্তৃক পত্রখানি ওসমানের নিকট প্রেরিত হল। 

দুপুর গড়িয়ে গেল। ওসমান লাঙ্গল তুলে গরু ছেড়ে বাড়ির দিকে রওনা হল। আজ তার মনটা ভাল নেই। কোন কাজেই মন বসছে না। তাছাড়া একটা কাক তার মাথার উপর দিয়ে কা –কা কর্কশ রবে উড়ে গেল। ওসমানের অন্তর আর্তনাদ করে উঠলো। সকালে ঘর থেকে বের হবার সময় তার মাথাটা  চালের সঙ্গে ঠুকে গিয়েছিল। এ সমস্ত মোটেই ভাল লক্ষণ নয়। তবে কি তার রাহেলার অসুখ করেছে! তার তো চিঠি পাঠানোর কথা ছিল। আর চিঠি লিখলেই বা এত তাড়াতাড়ি চিঠি নিয়ে কেউ আসবে না। এসব ভাবতে ভাবতে একবার হোঁচট খেয়ে কোনক্রমে টাল সামলে নেয়। এমন সময় একটা লোক এদিক ওদিক তাকিয়ে তার হাতে একটি পত্র গুঁজে দিল। ওসমানের বুকটা ধড়াস করে উঠল। সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিঠি নিয়ে বসে পড়লো। কাঁচা বড় বড় হরফে লেখা সে পড়তে শুরু করলো। 

প্রিয়তম, 

সারা জীবন তোমাকে যাহা দিয়া আসিয়াছে আজ তাহার ব্যতিক্রম হইবে না। আমি জানি তুমি আজও তাহাই গ্রহণ করিবে। তোমাকে ছাড়িয়া আসিতে খুব কষ্ট হইয়াছে। আমি দিনরাত কিছুই চিন্তা করিনা। কেবল পূর্ণিমা রাতের সেই হাসিমাখা মুখটার দিকে চাহিয়া থকি। তুমি এখানে আসিলে তোমার সাথে প্রাণ খুলিয়া কথা বলিতাম। তুমি যে ছল করিয়া আমার হাসি দেখিবার জন্য রান্না ঘরে বার বার আগুন আনিতে যাইতে তাহা আমার মনে পড়ে। এখানে তোমাকে, হাসিয়া কথা বলিলে কেহ তিরস্কার করিবে না।

আমার শরীর অত্যন্ত দুর্বল। তোমাকে দেখিতে খুব ইচ্ছা হয়। হাতের লেখা দেখিলেই বুঝিতে পারিবে আমার শরীর কত খারাপ। অনেক সময় মনে হয় বাঁচিব না। আর না বাঁচলেই বা কি? আমার জীবনের দাম এক কুপি কেরোসিন তেলের চেয়েও কম। আমি মরিয়া গেলে মনে করিও আধা ছটাক কেরোসিন তৈল দৈবক্রমে মাটিতে পড়িয়ে গেল। আর তোমাদের যা কিছু আমার সঙ্গে ছিল, এখান হইতে লইয়া যাইও। দুঃখ করিও না। তোমার জীবনে সুখ আসুক আমি তাই কামনা করি। আর শেষবারের মত যা দেবার ছিল, তা কাছে পাইলাম না বলিয়া বাকী রহিল। 

ইতি –ভাগ্যহীনা রাহেলা


চিঠি পড়া শেষ হল। ওসমানের মাথাটা যেন একবার ঘুরে উঠলো। সে বাহ্যিক জ্ঞানহারা হয়ে পড়লো। উর্ধ্বশ্বাসে রাহেলার কাছে ছুটে চললো। অনেক দূর দৌড়াবার পর সে রাহেলার বাড়ির কাছে এসে হঠাৎ থেমে গেল। দেখলো অনেক লোক জড়ো হয়ে কার যেন জানাজা পড়ছে!

.............

২০.০৮.১৯৬১

No comments:

Post a Comment