Sunday, May 31, 2026

ছিন্ন বীণা


মাস্টার অব সোশাল সাইন্সে ভর্তির মৌখিক পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছিল নাহিদ। পরীক্ষা শেষ। রেজাল্ট জানার জন্য সকলেই উদগ্রীব। বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় খুব ভীড়। নানা জায়গা থেকে ছেলেমেয়েদের আগমন। অধীর আগ্রহে প্রহর গুনতে গুনতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। এমন সময়ে রেজাল্টের শিট নোটিসবোর্ডে ঝুলিয়ে দিল। সকলেই হুমড়ি খেয়ে পড়লো সফলতার আশায়। লাইট না থাকায় পড়তে কষ্ট হচ্ছিল। অনেকই নিজের নাম দেখে বাইরে বের হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। মেয়েদের তো দেখবার উপায় নেই। এত ভীড়ে ঢোকা সম্ভব নয়। সেজন্য নাহিদ একজন ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে বললো এই যে, ভাই আমার নামটা একটু দেখে দেবেন!, নাহিদ, রোল নম্বর ৫৬৭। ছেলেটি ২০পর্যন্ত নাম দেখেছিল শেষ পর্যন্ত দেখে বললো, কই দেখছি না তো? আমার তো বিশ নাম্বারে নাম আছে। দাঁড়ান, আবার শুরু থেকে দেখি। দেখতে দেখতে হতাশ হলো। হঠাৎ ১৯শে এসে দেখতে পেল নাহিদ নিশাত। yes, your name is there নাহিদ নিশাত! নাহিদ আনন্দের আত্মহারা। তারপর দুজন ওখান থেকে বের হতে চেষ্টা করলো। প্রচন্ড চাপের মুখে ছেলেটি পথ করে নিল। নাহিদ তাকে অনুসরণ করে বের হয়ে এলো। সিড়ির নিকট এসে দেখলো চৈতালী ধূলোর ঝড় উঠেছে। ঝাপটায় দৃষ্টি অস্বচ্ছ। তার সাথে যুক্ত হচ্ছে মেঘের ঘনঘটা। 

নাহিদ থাকে গ্রীনরোডে। সবাই ছুটে চলেছে। ঝড়ো হাওয়া, অন্ধকার, যানবাহন নেই। ছেলেটি নীলক্ষেতের দিকে এসে একটি ধাবমান রিক্সা জোর করে ধরে নাহিদকে তুলে দিল। আর সে নিজে উল্টো দিকে যাত্রা করলো মালিবাগের বাসার উদ্দেশ্যে। 

কয়েকদিন পর ক্লাশ আরম্ভের চিঠি পেল ওরা। দুরু দুরু বক্ষে ছাত্রছাত্রীরা এসে হাজির। অফিস থেকে এসে জেনে নিল কোথায়, কত নম্বর কক্ষে তাদের ক্লাস হবে।

দিন যায়। পড়াশুনার প্রচন্ড চাপ। তারই মাঝে ছেলেটির সঙ্গে নাহিদের দেখা হতে থাকে। নাহিদের রোল নম্বর ১৯, সাজ্জাদ সুমনের ২০, তারা পরপর রোলকলের জবাব দেয়। বেশ মজা পায়। এক সঙ্গে ক্লাসে ঢোকে, এক সঙ্গে বের হয়। পড়াশুনার আলোচনা তো হয়ই। দুজনেই মেধবী। সুতরাং বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন গড়ে উঠে। দীর্ঘ দু’বছরে তাদের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। এখন একজন আরেকজনকে না দেখে থাকতে পারেনা। একসঙ্গে ঘোরাফেরা, লাইব্রেরিতে যাওয়া, ক্যান্টিনে খাওয়া – নিত্যদিনের রুটিন তাদের। এরমধ্যে ফাইনাল পরীক্ষা এসে যায়। দু’জনেই ভালভাবে পাশ করে। এবারও পরীক্ষার প্রাপ্ত নাম্বার কাছাকাছি। সুমন বলে ১৯ কম, তবুও ১৯ –এর  নম্বর বেশী। নাহিদ হেসে বলে সংখ্যা হিসাবে ২০ পরে আসে, সেজন্য তার নাম্বারও কম আসে। এরকম ভাবে ওরা মজাও করে প্রায়ই। সামনে সিএসপি পরীক্ষা। প্রচুর পড়াশুনা। তাদেরকে সবজান্তা হতে হবে। প্রস্তুতি নিতে থাকে দুজনেই। এরই মাঝে নাহিদের বিয়ের কথাবার্তা চলতে থাকে। নাহিদ দেখতে ভাল। সুতরাং বিয়ের প্রস্তাব প্রচুর আসছে। খবর শুনে সুমনের চমক ভাঙ্গে। সে কি যেন হারাতে যাচ্ছে।সে নাহিদকে জিজ্ঞেস করে, তোমার এ বিয়েতে মত আছে? হঠাৎ নাহিদ কেঁদে ফেলে। বলে, না, নেই। 

- তবে  প্রতিবাদ করো না কেন?

-আমার কথার দাম দেয় না কেউ। 

-সিএসপি পরীক্ষাটা দাও তো আগে।

-তারা বলেন যথেষ্ট হয়েছে। তোমার সিএসপি পরীক্ষা আটকাবে না। পড়তে থাক। ভাল পাত্র হাতছাড়া করা যাবে না। 

সুমন বলে তুমি কি আমার কথা ভাববে না? জবাবে নাহিদ কেবলই চোখের জলে ভাসে। সুমন বলে তুমি উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে। বাবা মাকে বুঝিয়ে বল। তারা তোমার কথার গুরুত্ব দেবেন। 

নাহিদ সাহস সঞ্চয় করে তার মনের কথা বাসায় প্রকাশ করে। অভিভাবকগণ সাজ্জাদ সুমনের বাড়ির, পরিবারের খোঁজ খবর সংগ্রহ করে। সুমনের পিতা গ্রামের একজন স্কুল শিক্ষক। সম্ভ্রান্ত বংশ। তবে এখন পূর্বের অবস্থা নেই। অনেক ভাই –বোন। সবাই লেখাপড়া করছে। সুমন সকলের বড়। তার অনেক দায়িত্ব। নাহিদকে গ্রামে যেতে হবে। গ্রাম সে কোনদিন দেখেনি। নাহিদের পিতা সরকারি উচ্চপদস্থ অফিসার। ইপিসিএস (EPCS) সে যুগে। জীবন যাপনের তরিকা উচ্চ পর্যায়ের। 

সুমন দেখতে শুনতে ভাল। ছেলে ভাল। কিন্তু তাদের মতে এ ভাললাগা, বা ভালবাসা স্থায়ী হতে পারেনা। সুমনকে তাদের পর্যায়ে উন্নীত হতে অনেক সময় লাগবে। তাও যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। সুতরাং এ বিয়ে হতে পারেনা। নাহিদ অনেক জেদ করে। অনশন করে। তাতে কোন ফল হয় না। তার মন এতই ভেঙ্গে পড়ে যে তার পক্ষে সিএসপি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হয় না। লেখাপড়ার ইতি তার এখানেই।  

নাহিদের বিয়ে পাকাপাকি হয়ে গেল এক আর্মির ক্যাপ্টেনের সঙ্গে। সুমন সিএসপি পরীক্ষা দিল। রেজাল্ট ভাল হল। ভাল চাকুরী হল। নাহিদের বিয়ে হল। স্বামী পশ্চিম পাকিস্তানে বদলী হয়ে নাহিদকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল। সুমন ‘শূন্য নদীর কূলে রহিল পড়ি।’ তার সোনার ধান অন্য লোকের নৌকায় বোঝাই হয়ে চলে গেল। সুমন সিভিল সার্ভিসে পশ্চিম পাকিস্তানের গোট্‌কি নামক স্থানে পোস্টিং পেল। কিন্তু সে গেলনা সেখানে। চেষ্টা তদবীর করে ইস্ট পাকিস্তানের এক জেলা শহরে ম্যজিস্ট্রেটের চাকুরী গ্রহণ করলো।

সময় চলতে থাকে অবিরাম। সুমনের ‘অন্তর আপনার মনে আপনি পুড়তে থাকে গন্ধ বিধুর’ ধূপের মত। নাহিদের স্মৃতির দীপশিখাটি তাকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে দগ্ধ করে। কাজে ব্যস্ত থাকে। বাকি সময় নাহিদের স্মৃতির সঙ্গে বসবাস করে। অন্যদিকে নাহিদের সংসার চলে স্বাভাবিক নিয়মে। প্রথম প্রথম সুমনের স্মৃতি নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঘোরাফেরা করতো। ভাবতে চাইতো এই –ই তার সুমন। পরপর তার দুটি সন্তান হয়।  একজনের নাম রাখে সাজ্জাদ। আর মেয়েটির নাম রাখে সুমনা। 

এরই মধ্যে বেজে উঠে ঊনসত্তরের দামামা। পাকিস্তানের রাজনৈতিক আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। শেখ মুজিব বিপুল ভোটে জয়ী হয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা তা মেনে নিতে অস্বীকার করে। চরম নির্লজ্জের মত তারা এই নির্বাচনের ফলাফলকে বয়কট করে। যার ফলশ্রুতিতে শুরু হয় ব্যাপক গণ জাগরণ। বাঙ্গালী ছাত্র সমাজ এবং শিক্ষিত সমাজ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সারাদেশ একত্রিত হয়। ’৭১ এর ২৫শে মার্চ  মধ্যরাত্রে যখন পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে, বাঙ্গালী জাতি তখন হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। পরে এক ভয়ংকর যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। বাঙ্গালীর ছেলে আর ঘরে থাকতে পারলো না। সাজ্জাদ সুমন যুদ্ধে যোগ দিল। কখনও দেশের ভেতরে, কখনও দেশের বাইরে কাজ করে। তার যে এত সাহস আর এত শক্তি ছিল তা সে নিজেও জানতো না। এক কাপড়ে মাসের পর মাস, কত ঝড়ে, জলে ভিজেছে। ভিজা কাপড় গায়ে শুকিয়েছে। পোকামাকড়ের কামড়, জোকের রক্ত শোষণের কত না ইতিহাস। কত ক্ষুধা, তৃষ্ণায় কাতর হয়েছে। তবুও অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। 

এটা ছিল ৭১ এর শেষের দিকের ঘটনা। ওরা জামালপুরের বর্ডারে একটি আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তখন জানতে পারলো গ্রামের ভিতরে কয়েকটি বাড়িতে পাক বর্বর বাহিনী আগুন দিয়েছে। তারা দ্রুত এগিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে। খুব সন্তর্পণে ছোট্ট নদীটির ঢাল বেয়ে সুমনরা এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখে একটি মানুষ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ক্রুশে বোনা সাদা টুপিটি পড়ে আছে অদূরে। শ্বেত শুভ্র বস্ত্র তার ক্ষত –বিক্ষত। দেহে আঘাতের চিহ্ন। চাপ চাপ রক্ত তার দেহ ঘিরে। ওরা মুক্তি সেনারা লাশটি উল্টালো। সাজ্জাদ চমকে উঠলো। এ যে নাহিদের পরহেজগার পিতার লাশ। শ্বেত , শুভ্র চুল, দাড়ি, হাতে তসবীহটি তখনও ধরা। তাকে ঐভাবে রেখে অতি সন্তর্পণে উপরে গ্রামে চলে আসে। দেখে নাহিদের বাড়িটি ভস্মীভূত। কয়েকটি গজারী কাঠের খুঁটি তখনও নিভু নিভু জ্বলছে। ওরা তখন উত্তর দিকের জঙ্গলে চলে গেল। সেখানে ক্ষত –বিক্ষত মানুষ পড়ে আছে। ভোরের আলো ফুটে উঠছে দ্রুত। কে যেন পানি চাচ্ছে মৃদু স্বরে। কাছে গিয়ে দেখে এ যে নাহিদ! সেই সাদা মেয়েটি। দুটি বাচ্চা তার বুকের উপর মৃতের মত পড়ে আছে। সুমন টিউবওয়েল থেকে তার কোমরের গামছা ভিজিয়ে পানি নিয়ে নাহিদের মুখে দিল। ডাকলো, নাহিদ, নাহিদ। সে চেতনা ফিরে পেল। বললো, কোথায় আমার সাজ্জাদ, কোথায় আমার সুমনা?

-এই যে তোমার বাচ্চারা। দেখ, চেয়ে দেখ। ওরা ভাল আছে। 

নাহিদ চিৎকার করে উঠলো। কে, কে, কে কথা বলে? 

কে তুমি? 

সুমনরা তাদের সকলকে ধরাধরি করে নাহিদদের রান্নাঘরে নিয়ে এলো। সে ঘরটি একটু দূরে থাকায় দগ্ধীভূত হয়নি। সকলেই মহিলা আর শিশু। তবে জখম আছে সবারই । চুল দাড়ির ভেতরে সুমনকে চেনা সম্ভব ছিল না। তবুও নাহিদ বলে উঠলো, কে আপনি? সুমন বললো, আমরা মুক্তিযোদ্ধা। সাবধানে থাকবেন। আপনার বাবা নদীর ঘাটের কাছেই আছেন। বলেই ওরা নিমেষেই অন্তর্হিত হলো। সূর্য উঠার পূর্বেই যে তাদেরকে ক্যাম্পে পৌঁছাতে হবে। 

যুদ্ধের সময়ে নাহিদ লাহোরে অবস্থান করছিল। অবস্থা খারাপ বুঝে নাহিদকে তার স্বামী মেজর করিম ঢাকায় পাঠিয়ে দিল। সেটাই ছিল ভারতের উপর দিয়ে শেষ বিমান যাত্রা। তারপরই মেজর করিমের ইউনিট বর্ডার ডিউটিতে চলে গেল। নাহিদ ঢাকায় এসে অন্য সকলের সঙ্গে জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। সুমনের মনের অবস্থা খুব খারাপ। ইচ্ছা করছিল, ঝড় হোক, ঝঞ্ঝা হোক, সাইক্লোন হোক -সব তার জীবনের দুঃখ কষ্টকে উড়িয়ে নিয়ে যাক। এ জীবন তার অভিশপ্ত জীবন। যুদ্ধে যদি তার মৃত্যু হয় সেটাই হবে তার জন্য মুক্তি। যেমন গত পরশু তার প্রিয় বন্ধু সাংবাদিক পিন্টু, আহত মুক্তিযোদ্ধাকে পিঠে করে বহন করে আনার সময় পাক সেনাদের পাতা ফাঁদে পড়ে প্রাণ দিল। অদৃষ্ট কেমন নিষ্ঠুর, মানুষ তা জানে না। না হলে নাহিদের সঙ্গে তার এই অবস্থায় সাক্ষাৎ হওয়ার প্রয়োজন ছিল কি? ছিল না। অথচ অতীতের নাহিদ হারানোর দুঃখজনক স্মৃতির সঙ্গে এই মর্মান্তিক দৃশ্য যুক্ত হলো কেন? নাহিদ, আমার প্রিয় নাহিদ, আমার  প্রাণাধিক নাহিদ, আমার জন্ম –জনান্তরের নাহিদ। কেন প্রথম দেখা হয়েছিল, কেন পুনরায় দেখা হলো? 

মুক্তিযোদ্ধাদের এসব চিন্তা করবার সময় নেই। পরবর্তী কমান্ডের আদেশে তারা বেরিয়ে পড়ে অন্য অপারেশনে, একটি ব্রিজের কাছাকাছি যেদিক দিয়ে এক প্লাটুন পাকিস্তানী সৈন্য অন্য একটি গ্রামে ঢুকে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। সেদিন গভীর রাতে তারা বিলের ঠান্ডা পানিতে ঝোপ ঝাড়ের নীচে লুকিয়ে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে অপেক্ষা করছিল। গভীর রাতে পাক হানাদার বাহিনী এলো। মাইন ফিট করা ছিল ব্রিজের দুইপাশে। ব্রিজে উঠার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। অনেক সৈন্য হতাহত হয়। যে সমস্ত যানবাহন পেছনে ছিল, তারা নিজের অস্ত্র দিয়ে চারিদিকে ফায়ার করতে থাকে। মুক্তিসেনারা ডুব দিয়ে দূরে সরে যেতে থাকে। কেউ কেউ আহত হলো। কেউ অন্য পাড়ে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো। আর্মির গাড়ি চলে গেল। চারিদিক সুনসান।

‘সবকিছু একদিন শেষ হয়। যুদ্ধও একদিন থামে। সেই বিরতি কি শান্তি? ’ শান্তি না হোক স্বস্তি তো আনে।  আশাবাদী মানুষ ধ্বংস স্তুপের ওপর আবার ঘর বাঁধে, বাঁচার স্বপ্ন দেখে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ছিনিয়ে আনে একটি লাল সবুজ পতাকা। বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সাজ্জাদ সুমন দেশে ফেরে। বাড়ি – ঘর তাদের অক্ষত আছে। মাতা –পিতাও জীবিত আছেন। ভাই – বোন সকলেই যুদ্ধে গিয়েছিল তারা কেউ ফেরে নাই। যে ভাইবোনদের সংখ্যা দেখে নাহিদের পিতা ভয় পেয়েছিলেন!

সরকারি চাকুরী তো সুমনের আগেই ছিল। এবার রেড ক্রসে তার পোস্টিং হলো। বৃদ্ধ বাবা –মাকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসে সে নিজের কাছে। কারণ গ্রামের শূণ্য ঘরে তারা কেবল কান্নাকাটি করেই দিন কাটান। সাজ্জাদ সুমন অফিসে যাতায়াত করে। তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে। বাকী সময় কোথায় কার কি কি ক্ষতি হয়েছে –সে সব খোঁজ খবর সংগ্রহ করে।  

একদিন যখন সাজ্জাদ খুব ব্যস্ত তখন এক মহিলা দুই বাচ্চার হাত ধরে অফিসে আসে। তার কাছে প্রতিদিন কতশত লোক তাদের প্রিয়জনের খোঁজ খবর নেবার উদ্দেশ্যে আগমন করে। তাদের আশা, কোথাও না কোথাও তাদের লোক আহত অবস্থায় আটকে পড়েছে। একদিন না একদিন আসবেই।

নাহিদ ধীর পদক্ষেপে রেডক্রস অফিসে প্রবেশ করে অফিসারের ডেস্কের সামনে দাঁড়ায়। অফিসার ফাইল থেকে মুখ না তুলেই ইশারায় আগন্তুককে বসতে বলে। বেশ কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে প্রশ্ন রাখলেন, – কি চাই? নাহিদের বুকের ভিতর রক্ত ছলাৎ করে উঠে। সাজ্জাদ ও নাহিদের দৃষ্টি কোন এক চৌম্বক শক্তির কবলে পড়ে স্থির হয়ে রইলো দীর্ঘক্ষণ। কেউ কোন কথা বললো না। হঠাৎ নীরবতা ভঙ্গ করে নাহিদ কম্পিত কন্ঠে বলে উঠলো, মেজর কে. করিম নামের অফিসার এখন কোথায় আছেন? পশ্চিম পাকিস্তানে তার পোস্টিং ছিল পাঞ্জাবে। সাজ্জাদ দ্রুত হস্তে ফাইল বের করে। পাতা উল্টে –পাল্টে দেখতে থাকে পাকিস্তানে আটকে পড়া অফিসারদের নাম। হঠাৎ এক জায়গায় তার চক্ষু স্থির হলো। সাজ্জাদের হৃদপিন্ড কে যেন চেপে ধরলো। সে মাথা নত করে চোখ বন্ধ করে ফেললো। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে, নাহিদের চোখে চোখ রাখলো। দৃষ্টি এতই স্থির এবং শীতল, যে নাহিদ সহ্য করতে না পেরে মাথা নীচু করতে বাধ্য হলো। সাজ্জাদ একটি কালো বর্ডার যুক্ত কাগজ নাহিদের দিকে এগিয়ে দিল। কয়েক সেকেন্ড পর গায়েবী আওয়াজের মত গম্ভীর নিনাদ তুলে এক ভয়ংকর শব্দ উচ্চারিত হলো –  Major K.Karim got killed in the western front during war.

.........


কত অজানারে

ফারাহ্‌ দিবা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এম. এ. ফাইনাল দিবে। এই সময় একদিন রেডিওতে একটি বিশেষ ঘোষণা শুনতে পায়। সোমালিয়ান দস্যু কর্তৃক শ্রীলংকার বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাই। বুকটা কেঁপে উঠলো। কারণ এই জাহাজে ছয়জন বাঙ্গালী তরুণ অফিসার আছেন। তাদের মধ্যে একজন ইমরান। গত চারবছর ধরে সে তার অন্তরঙ্গ বন্ধু। কিংবা তার চাইতেও অধিক কিছু। সে একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে। তবে মেলামেশা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তার আশেপাশে।  

পারস্য উপসাগরকে লোকে গালফ্‌ বলেই জানে। সাধারণত এখানেই ভিনদেশি বাণিজ্য জাহাজগুলি জলদস্যু কবলিত হয়। কৃষ্ণকায়া সোমালিয়ান দুর্ধর্ষ দস্যুরা – যাদের  হাতে থাকে অতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এ. কে.ফরটি সেভেন রাইফেল, তাদের সঙ্গে লড়াই করবার সাহস কারো নেই। মাত্র কয়েকজন জলদস্যু অনেক লোকজন সহ বিরাট বিরাট জাহাজ আটক করে ফেলে। আক্‌শি বাঁধা মোটা রশি জাহাজের উপরে বিশেষ কায়দায় ছুঁড়ে মারে।রাস্তা তৈরী হয়ে যায়। পরে গান পয়েন্ট তাক করে জাহাজের উপরে উঠে আসে। দিনের পর দিন জাহাজের লোকজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, খুন অনাহারে রাখা, পিপাসায় রাখা ইত্যাদি নানাবিধ অত্যাচার করে তাদের জীবন প্রদীপ নিবু নিবু পর্যায়ে নিয়ে আসে। জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে পড়ে আসহায়। ক্যাপ্টেনের মাধ্যমে শুরু করে জাহাজের মালিকের সঙ্গে দর কষাকষি। জাহজ মালিক এক পর্যায়ে মোটা অংকের মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হয়।জিম্মিরা মুক্ত হয়। প্রানে রক্ষা পায় বটে, তবে জীবনের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।    

ফারাহ্‌ দিবা একা একা এই কষ্ট সহ্য করতে পারছিল না। একদিন বাসায় তার মনোবেদনার কথা প্রকাশ করে। সকলের সহমর্মিতা পায়। জাহাজ ছিনতাই এবং সংবাদ শোনার জন্য সকলে সর্বদা উৎকর্ণ হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখে মুক্তিপণ নিয়ে দরদাম হচ্ছে। শত কোটি মুদ্রা পেলে জলদস্যুরা জাহাজ ছেড়ে দেবে। সংকোচ পরিহার করে ফারাহ্‌ ইমরানদের বাসায় যোগাযোগ করে। তারাও ইমরানের জন্য গভীর ব্যাকুলতা প্রকাশ করে। কিন্তু কোন খবরই আসছে না। ফারাহ্‌ দিবার দিনরাত্রি প্রচন্ড যন্ত্রণায় অতিবাহিত হতে থাকে। সর্বদা ইমরানের দেওয়া আংটি তার অনামিকায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। কার্জন হলের পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে বসে একদিন চৈত্রের বিকেলের উতল হাওয়ায় মনের আনন্দে তারা দুজনে তাদের অংগুরীয় বদল করে ফেলেছিল। ইমরানের অনামিকার আংটি ফারাহ্‌র মধ্যমায় আর তার মধ্যমার আংটি, যার উপর এফ অক্ষর মিনা করা, ইমরানের অনামিকায় বদলী হয়ে গেল। দু’জনে একসংগে গেয়ে উঠলো –

  ‘ভালবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে/

  মনে ক'রে সখী, বাঁধিয়া রাখিয়ো আমার হাতের রাখী—তোমার কনককঙ্কণে॥’ 

গান শেষে ওরা বলেছিল, এই –ই ভাল। আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন কি? চল যাই চাংপাই। চাংপাই রেস্টুরেন্টে দুজনে মুখোমুখি বসে চায়নীজ খাদ্য উপভোগ করে তাদের অলিখিত বন্ধন পাকা করে নিয়েছিল। তারপর থেকে দেখা হলেই দুজনে আংটির সংঘর্ষ করে নিতো। মজা পেত খুব। ঐ পুকুর ঘাট ছিল তাদের বৃন্দাবন। 

পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে মন্দ মধুর হাওয়ায় দোল খেয়ে, রবি ঠাকুরের গান গেয়ে, তাদের প্রণয় দৃঢ়তা লাভ করে। একজন বিহনে আরেক জনের জীবন অর্থহীন মনে হয়। সেই প্রিয় মানুষটি আজ দূরদেশে কোন্‌ সাগরের জলে দস্যু কবলিত। হায়রে অদৃষ্ট! মানুষের জীবনে দুর্ভোগ কত ভাবেই না আসে। একসময়ে শুকিয়ে যায় চোখের জল। দুই পরিবারে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। 

হঠাৎ একদিন রেডিও মারফত জানতে পারে শতকোটি টাকার বিনিময়ে জিম্মিরা মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু ইমরান ফিরে এলো না। কেউ তার খবর  দিতে পারলো না। সময় গড়িয়ে গেল। মাস গেল, বছর গেল। সংবাদ সংগ্রহের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। রেড ক্রসও কোন খবর দিতে পারলো না। হতাশাই দুই পরিবারের সম্বল হলো। 

ফারাহ্‌ দিবা চাকুরী করছিল কলেজে। তার মা –বাবা  মেয়ের জন্য  উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। মেয়েকে সংসার গ্রহণ করবার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। ‘মানুষ একা থাকতে পারে না। কার জন্য অপেক্ষা করছ? সময় থাকতে নিজের পথ দেখ। মানুষের  নিজের আশ্রয় এবং অবলম্বন থাকা উচিত।’

এদিকে একই কলেজে এক ভদ্রলোক চাকুরি করেন। জীব বিজ্ঞানের প্রফেসর। বড্ড গম্ভীর। তারও জীবনের ইতিহাস আছে। একটি মেয়েকে তার ও খুব পছন্দ ছিল। সদা হাসি খুশী টিংকু। রঙ্গিন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায়। ইকরাম স্যারকে তার খুব ভাল লাগে। স্যারকে সে বন্ধুর মতো মনে করে। চঞ্চল চপল টিংকু তার হৃদয় –মন জয় করে নিয়েছে। তবে সে চালাকও বটে। ইকরামের পক্ষপুটে থেকে অন্য ফুলের মধুও আহরণ করে। চেখে দেখে কোনটা বেশী মিষ্টি। তাদে সঙ্গে অভিসারে যায় সুন্দর সুন্দর স্পটে। ইকরামকে তার আনন্দের কথা, আহ্লাদের কথা কিছু কিছু বলে। ইকরাম তার সততার মূল্য দেয়। ভাবে মেয়েটি খুব সরল, ছেলে মানুষ!

একদিন হাসতে হাসতে টিংকু তার বিয়ের খবর জানায় ইকরামকে। বাবা –মার প্রচন্ড আগ্রহ উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। কারণ সে তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান। ইকরাম লজ্জার মাথা খেয়ে বলে, পাত্র হিসেবে আমি কম কিসে? ত্বরিত উত্তর দেয় টিংকু। বাবা –মার অবাধ্য হওয়া যায় না। তবে আমি তোমারই থাকবো চিরকাল। এটা তুমি সত্য বলে জেনো। মানুষের অন্তরের প্রাপ্তিই আসল। এ বলে মায়া কান্না জুড়ে দিল। 

এই ছেলেটির কথা টিংকু অনেকবার বলেছে। এটা ছিল তার শেষ খেলা। কিন্তু তবুও ইকরাম ভয়ংকর মনোবিকলনের শিকার হয়। এ কলেজের চাকুরী ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কলিগরা তাকে বাধা প্রদান করে। বলে কোথায় যাবে তুমি? কার জন্য? মানুষ সব কিছু থেকে দূরে চলে যেতে পারে। কেবল পারে না নিজের কাছ থেকে দূরে থাকতে। সুতরাং কোথাও যাবে না। আমাদের কাছে থাক। কষ্ট শেয়ার করবার লোক পাবে। তোমার সংগে যা ঘটেছে তা পরোক্ষে ভালই হয়েছে। তোমার ঘরে যখন তোমার তথাকথিত প্রিয়া অন্য ফুলের মধু আহরণ করতো, তখন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা দাঁড়াত। সবকিছুরই একটা অন্তরর্নিহিত মঙ্গল আছে। সুতরাং যেও না কোথাও, এখানে থাক। 

ইকরাম থেকে গেল। পরিচয় ছিল কলিগ হিসাবে ফারাহ্‌ দিবার সঙ্গে। গল্প  করতে করতে দুজন দুজনার জীবনের ট্র্যাজিডির কথা জানতে পারে। অন্যরা তো জানেই। তারা সকলে মিলে একদিন এই দুই ব্যক্তিকে ধরে বসে। বলে, আমাদের কলেজে কলিগদের মধ্যে কেউ একা নেই। কেবল তোমরা দুজনে সিঙ্গল। দুজনেই চূড়ান্ত ভাল মানুষ। এবার আর কোন কথা নয়। সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হও। উদ্বাহের বন্ধনের আয়োজন করি আমরা। শীঘ্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর। 

কয়েকদিন পর কলিগরা আবার টিফিন পিরিয়ডের ধূমায়িত চায়ের উপর তাদের মতামত জানতে চাইল। তাদের অধোবদন, হাসিমুখ। সকলে ধরে নিল মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ। 

তারা দুই পরিবারের গার্জিয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিয়ের দিন তারিখ ধার্য্য করে ফেলল। ইকরাম আর ফারাহ্‌ দিবা পবিত্র সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হলো। যাত্রা শুরু হলো একটি সুন্দর সাবলীল সংসারের। মানুষের জীবন একটাই। তাকে সার্থক  করে তুলতে হলে একজন আরেকজনের দুখের সুখের সঙ্গী হতে হবে। দু’জন পরস্পরকে গ্রহণ করতে হবে ‘ভাল মন্দ মিলায়ে সকলি।’ আনন্দ, উৎসব, অনুষ্ঠান সবই হলো প্রথানুযায়ী।

দিন চলে যায় নদীর স্রোতের প্রায়। ফারাহ্‌ দিবার দুটি ছেলেমেয়ে। তারা স্কুলে যায় । এমন সময় একদিন ফারাহ্‌ ডি. ভি. পেল। আমেরিকা যাওয়ার ছাড়পত্র। অনেক চিন্তা ভাবনা করে একদিন ওরা পাড়ি জমাল আমেরিকায়। ওরা যেহেতু শিক্ষিত, সেজন্য চাকুরী পেতে অসুবিধা হয়নি। ছেলে মেয়েদেরকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। দেশেও ওরা ইংলিশ মিডিউয়াম স্কুলে পড়াশুনা করছিল। 

বেশ কিছু বছর ওদের এভাবেই কেটে গেল। একবার একটি ভাল চাকুরীর সন্ধান পায় ফারাহ্‌। সব ফরমালিটি পুরা করে সামনা সামনি সাক্ষাত্‌কার দেবার প্রয়োজন পড়ে। ফারাহ্‌ দিবা হাজির হলো সে অফিসে। রিসেপশানে বসা লোকটিকে দেখে মনে হলো ভারতীয়। একটু পর মুখ তুলে লোকটি তাকিয়ে থাকলো ফারাহ্‌ দিবার দিকে। ফারাহ্‌ -ও বিস্ফারিত নেত্রে লোকটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। হঠাত্‌ লোকটি ব্যগ্রস্বরে বলে উঠলো – তুমি? আমি ইমরান।

একটি সূক্ষ্ম যন্ত্রণা এতকাল পরে বক্ষমাঝে আর্তনাদ করে উঠলো। মনটাকে শক্ত করে বেঁধে দ্রুত অফিস কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হলো। মনে হলো আজ সে বড্ড ক্লান্ত। হৃদয় কন্দরে বেজে উঠলো সেই সুর –ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু...। 


Wednesday, May 27, 2026

এলো খুশীর ঈদ

রমজান মাস শেষ। আগামীকাল ঈদ। আকাশে ঈদের বাঁকা চাঁদ মুচকি হেসে খোশ আমদেদ জানালো আমাদেরকে। আর কয়েক ঘন্টা মাত্র বাকী। নগরীর গৃহবাসী সব গভীর নিদ্রায় মগ্ন।স্বপ্ন দেখছে আসছে খুশীর দিনের, যার যার মনের মত শখের পোশাক, অলংকার, পাদুকা, ফিতা, চুল সাজাবার যাবতীয় দ্রাব্যাদি, অর্থাৎ কেশাগ্র থেকে পায়ের নখাগ্র পর্যন্ত সজ্জিত করবার যত উপকরণ সব ক্রয় করে নিয়েছে। খাদ্য দ্রব্যেরও ঘাটতি নেই। সব এখন ঘরে মজুদ। ভোর হওয়ার অপেক্ষায় গভীর ঘুমে স্বপ্ন দেখছে আনন্দের। 

আজকাল আনন্দ কোথায়? আনন্দ ছুটি নিয়ে চলে গেছে দূর দেশে। বেশীর ভাগ মানুষের বিষন্ন মুখ, মন খারাপ, মারামারি, হানাহানি করে দিন কাটায়। তাই আগামী দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে সারাটি মাস এ বাজার, সে বাজার ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে যার যার সাধ্যের মধ্যে পছন্দমতো সবকিছু খরিদ করেছে। এ আনন্দ ঢেউ লেগেছে সুদূর পল্লী অঞ্চলে। সেখানেও কেনাকাটার ভিড়ে প্রাণ অতিষ্ঠ। তবুও খুশীর স্রোতে তারা তাদের ঝাঁপি পূর্ণ করে নিয়ে গিয়েছে ঘরে। সকলেই খুশীতে হাসিতে জীবনের ক্ষয়ে যাওয়া সুখগুলিকে ফিরে পেতে চায়। নেই কোন ভেদাভেদ, নেই কোন বিতরাগ। সকলে এক কাতারে দাঁড়ায়, সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করে। ধন্যবাদ জানায়, কৃতজ্ঞতা জানায়। তারপর শুরু করে ঈদের আনন্দ।    

সুস্বাদু খাদ্য গ্রহণের চাইতে জীবনে আনন্দের আর কিছু নেই। ঘরে ঘরে রান্নার খুশবু।সেমাই, জরদা, পোলাও, কোরমা আরও কত কি? ভোজন পর্ব শেষ করে এবাড়ি, ওবাড়ি বেড়াতে যাওয়া, দেখা সাক্ষাৎ করা, বুকে বুক মিলানো, অন্তরের ধরকন অনুভব করা। সে এক অনির্বচনীয় সুখ! মনে হয় প্রতিদিন যদি এমন দিন হতো! কেন হয় না? একটি শিশু বলে, মা রোজ রোজ ঈদ হয় না কেন? মা হেসে বলেন, রোজ রোজ ঈদ হলে এত আমোদ ফুর্তি হত না। স্কুলে যেতে হবে, হোমওয়ার্ক করতে হবে, আরও কত কাজ! ঈদের খুশী কখন করবে। সেজন্য ঈদ একদিনই ভাল। আনন্দ বেশী হয়। অপেক্ষা করে যে আনন্দ পাওয়া যায়, সেই আনন্দই মজার হয়, সুখের হয়। অনেকদিন মনে থাকে। সে ঈদের চাইতে পরের ঈদ আরো মধুময় হয়। ধৈর্য্য ধর। আবার ঈদ আসবে। 

এত হর্ষ, এত পুলকের আয়োজনের মধ্যে আজ রাতে দুইবার ভূকম্পন অনুভূত হলো। পূর্ব হতে পশ্চিম দিকে ধাক্কা দিয়েছে। সবাই ছুটে বেরিয়ে পড়েছে ঘর ছেড়ে। চেয়ার টেবিল একটার সঙ্গে আরেকটা ধাক্কা খাচ্ছিল। কি না হতে পারতো কয়েক সেকেন্ডে! এ যেন হরিষে বিষাদ। চোখের পলকে সব তছনছ হয়ে যেতে পারতো! আল্লাহ্‌র অশেষ দয়া যে তিনি এই ভয়াবহ বিপদ থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন।

মানুষ যে ধর্মের হোক, যে বিশ্বাসের হোক, উৎসব পছন্দ করে। সে উৎসব হয় নানা ধরণের। ঈদ, পূজা-পার্বন, খৃস্টের জন্মদিন, ব্যক্তির জন্মদিন, পুত্র –কন্যার জন্মদিন। সবই খুশীর দিন। এসবই হর্ষ উৎপাদন বা আনন্দ দান করে। এর বাইরে উৎসব আছে। বন্ধু, আত্মীয়দের ডেকে তাদেরকে আপ্যায়ন করা, সুখ –দুঃখের অংশীদার করা – এসবই সম্যক তৃপ্তিদায়ক।      

ইচ্ছে থাকলে উপলক্ষ্যের অভাব হয় না। আয়োজন বিরাট হতে হবে এমন কোন কথা নেই। সাধ্যের মধ্যে মাঝে মাঝে হালকা নাচ –গান, কবিতা আবৃত্তি, গল্প, আড্ডাছলে উৎসবের আয়োজন করা যায়। না হলে মানুষের মন মরে যায়। জীবন বিষাদ্গ্রস্ত হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকার নানান প্রশ্ন মনে আসে। উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। আত্মীয়, বন্ধুদের বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ে। বন্ধুরা দূরে চলে যায়। একাকীত্ব ভর করে। অন্তর উদাস হয়। জীবন শূন্য মনে হয়। মনে হয় আমার কেউ নেই, কোথাও নেই! অবসাদ্গ্রস্ত জীবন নিজের ও পরিবারের বোঝা স্বরূপ। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এটাই সত্য? না, এটা সত্য নয়। সুখ, আনন্দ, খুশী, শান্তি, তৃপ্তি তৈরী করবার নিজেরও ভূমিকা আছে। নিজের উৎসাহই আসল। নিজেকে সেভাবে সকলের মাঝে স্থাপন করতে হবে। পরের তরে নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে। পরের পাশে দাঁড়াতে হবে। তবেই অন্যের হাত ধরা সহজ হয়। 

মানুষ একা বাঁচতে পারে না। নিজের সুখের জন্য মানুষে মানুষে মেলবন্ধন তৈরী করতে হয়। এটা সকলের জন্য সত্য। কারো একার কাজ নয়। যেহেতু আমরা ‘আশরাফুল মুখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব এবং বুদ্ধিমান জীব, সেজন্য আমাদেরকে একাজটি করতে হবে।‘প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’  মানুষের প্রতি, জীবের প্রতি, প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শনই আমাদেরকে সুখ, শান্তির পথে নিয়ে যাবে। আমাদের মানব জনম সার্থক হবে। ঈদ এবং অন্যান্য উৎসব আমাদের জীবনকে সুখ, শান্তি এবং সমৃদ্ধির সম্ভারে পূর্ণ করে রাখুক। আজকের এই ঈদের প্রক্কালে আমার এই একটি প্রার্থনা। 




 

Tuesday, March 24, 2026

এক টুকরো হাসি

 কি বলছো? আমি ডাক্তার? হ্যা, আমি ডাক্তার। ডাক্তারই তো! আমি তো লোকের কাছে চিকিৎসক হিসেবেই পরিচিত। মৃত্যু যখন অন্ধের মত আবাল –বৃদ্ধ –বনিতা, সকলকেই ভূ-স্বর্গের কানন থেকে নিষ্ঠুর রসিকের মত ছিনিয়ে নিতে আসে, তখনই ডাক্তার তার প্রতিরোধ করবার প্রয়াস পায়। মনে হয় বিধাতা যমদূতকে দু’টি চোখ দান করলেই ভাল করতেন। 

এমন এক বসন্ত কাল। সে আজ থেকে কুড়ি বৎসর আগের কথা। বয়স ছিল তরুণ, মন ছিল নবীন, দৃষ্টি ছিল রঙ্গিন, জগৎ ছিল মধুময় আর জীবন ছিল কল –কাকলীতে  মুখরিত। গাছে গাছে পাতা ছিল, বৃন্তে বৃন্তে মুকুল ছিল, ফুলে ফুলে গন্ধ ছিল, ফলে ফলে মধু ছিল আর চিত্তে ছিল প্রচুর রস। তখন আকাশ ছিল রঙিন, সূর্য ছিল মিতা, উদয়ে জানাতো আভিনন্দন আর অস্তে জানাতো শুভাশীষ, আগামী ভোরের তরে। বাতাস বয়ে আনত কোন অজানা রাজ্যের সবুজ কন্যার মায়াবাণী, প্রাণে জাগাতো মৃদু শিহরণ, মনে লাগাতো হালকা খুশীর ছোঁয়া, দেহে জাগাতো খুশীর ঢেউ আর আলতো ভাবে চিবুকটি নেড়ে চলে যেত। আকৃষ্ট হতাম ভোরের পাখির কলতানে। জেগেও উঠতাম। তবে মায়াবিনী নিদ্রার হাত থেকে বিশেষ মুক্তি পেতাম না। অনেকটা তন্দ্রাছন্ন হয়ে কাটাতাম আর অনুভব করতে চেষ্টা করতাম, ভোরের পাখি কি বাণী প্রচার করে সদ্য নিদ্রোত্থিত জগতের কাছে। ভাবতাম তারা আমারই জন্য মেতে উঠেছে। তারাই আমার মনের মিতা, তারাই অন্তহীন সুখের সাথী। তারা আমার জীবনে চাঞ্চল্য জাগায়, কাজে উৎসাহ দেয়, কাব্যে প্রেরণা জোগায়। আমার পৃথিবীকে রংধনুর সপ্তরঙে সজ্জিত করে আমার সম্মুখে ধরে রাখে। 

এমন সময়ে এমনি পরিবেশে আমি চিকিৎসা বিদ্যায় সনদ লাভ করেছিলাম। ‘ডাক্তার’ এই একটি মাত্র শব্দের উপর নির্ভর করে আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ছবি অতি সুন্দর সুষ্ঠুভাবে কল্পনা করতাম। সেদিন দেখেছিলাম খ্যাতি, যশ, টাকা আর স্ত্রী –পুত্র –কন্যাসহ সুখী পরিবার। যেখানে দুঃখ দৈন্য প্রবেশ করবার ভিসা কোনদিন পাবে না। 

কিন্তু আজ? 

আজ আমি নামকরা ডাঃ মাহবুব চৌধুরী। বাড়ি, গাড়ি, টাকা, কড়ি কোন কিছুরই অভাব নেই। কিন্তু এসব যেন তুচ্ছাতিতুচ্ছ মনে হচ্ছে। সব থেকেও আজ আমার কিছুই নেই। আমি সুখী বটে, আমার শান্তি নেই। জীবনে যা চেয়েছি, তাই পেয়েছি। এর বেশী যে মানুষের কিছু চাওয়ার আছে, তা আমার রঙিন মনের অগোচরে ছিল। তাই হয়তো বিধাতার কাছে শান্তির জন্য কোন প্রার্থনা করিনি।

জীবনে তেতাল্লিশটা বসন্ত আমি পাড়ি দিয়ে এসেছি। দিনগুলো কেমন করে কেটে গেল তা আর নাই বা বললাম। তবে গত বসন্তের একটি দিনে জগতের সমস্ত আলো নিভে গিয়েছিল। কেবল অন্ধকারের অতল তলে তলিয়ে গিয়েছি, কোন অবলম্বন আজও পাইনি। জীবনে কখনও পাব বলে আশাও করিনে। কারণ আশার আরেক নাম মরীচিকা। কোথা দিয়ে কি হয়ে গেল বুঝতে পারিনি। 

এমনি এক সকালে অসময়ে হাসপাতালে যেতে হল। কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কৌতুহল নিয়েই গিয়েছিলাম। যেয়ে দেখি একটি তরুণ নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। হয়তো তার যন্ত্রণা প্রকাশ করবার ক্ষমতা আর নাই। সুন্দর, বলিষ্ঠ, স্বাস্থ্যবান যুবা। গ্রীষ্মের প্রখর তাপে বৃক্ষলতা যেমন খানিকটা নিরস হয়ে নেতিয়ে পড়ে, একেও অসহ্য যন্ত্রণায় কাবু করে ফেলেছে। রোগটা বিপদজনক –অ্যাপিন্ডিসাইটিস। হাতে সময় ছিলনা। কাজেই তাড়াতাড়ি করতে হলো। নির্দিষ্ট সময়ে সব যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করে সকলের অনুমতি নিয়েই অস্ত্রোপ্রচারে মন দিলাম। বিষয়টা খুবই গুরুতর। আরো আগে আসলে হয়তো রোগটি এত জটিল আকার ধারণ করতে পারতো না। অতি সাবধানে হাত চালাচ্ছিলাম। ওকে বাঁচাবার দায়িত্ব যে আমিই নিয়েছিলাম। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, বিধাতা করেন আরেক। এত সতর্কতা সত্ত্বেও কখন হাত পিছলে হৃদপিন্ডের পরমাত্মীয় একটি ধমণী কেটে গেল। আমি নার্ভাস হয়ে পড়লাম। কোন রকমে রক্ত বন্ধ করা গেল। আসল চিতিৎসা ঠিকই হলো। আমার অভ্যস্ত হাতে কোন প্রকার ত্রুটি হলো না। যথাসময়ে অপারেশন শেষ হলো। রোগী পৃথিবীর আলো বাতাসের স্পর্শ পেল। সবাই বেশ আশ্বস্ত হলো। কিন্তু আমার চিত্তে কোন স্বস্তি ছিল না। আমি প্রতি মুহূর্তে একটা কিছুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। 

পরের দিকে রোগীটিকে তার বেডে ফিরিয়ে আনা হলো। খাণিকক্ষণ বাদে একটি তরুণী রোগীর দর্শন প্রার্থী হয়। মেয়েটি অপরূপ লাবণ্যময়ী। শান্ত মুখশ্রী। উজ্জ্বল দীপ্তি তার চোখে। এগিয়ে যেতে লাগলো ১৩ নম্বর বেডের দিকে। এদিকে ছেলেটির হঠাৎ ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হয়েছে। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তার পরিণতিও বুঝে গিয়েছিলাম। শেষ মুহূর্ত উপস্থিত। এই সময়ে মেয়েটি চাপা উৎকন্ঠা নিয়ে মৃদু  অথচ দ্রুত পদক্ষেপে প্রবেশ করলো। রোগীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। ছেলেটি শেষবারের মত একটু হাসলো। কোনরকমে উচ্চারণ করলো, 

- ‘তুমি এসেছ, রুমু?’ 

রুমু জবাব দিল, ছোট্ট এক টুকরো হাসি দিয়ে। টলে গেল তার গাম্ভীর্য, ছিঁড়ে গেল তার আবরণ, ভুলে গেল বাস্তব দুনিয়া, ঢলে পড়লো মৃতপথ যাত্রীর উপর। আমি আর পরের খবর রাখিনি। তবে অভিভূত হয়েছিলাম, স্তম্ভিত হয়েছিলাম মেয়েটির হাসির কথা স্মরণ করে। হাসির ভেতর দিয়ে যে মানুষের হৃদয়ের গভীর বেদনাকে এত করুণ, এত হৃদয় বিদারক ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, তা আমি কোনদিন দেখিনি, চিন্তাও করিনি। কেবল এক টুকরো হাসি –আর কিছুই নয়! শুনেছি মেয়েটি ও এই ছেলেটি একই পত্রিকায় কাজ করতো। তাদের লেখা প্রায়ই একই দিনে বের হতো। সেই সূত্র ধরে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। মেয়েটি শহরের হস্টেলে থাকে। তাকে এই ছেলেটিই দেখাশুনা করতো।     

গত এক বছর ধরে প্রতিটি মুহূর্তে সেই মেয়েটির এক টুকরো হাসি আমার  স্মৃতিতে আসা যাওয়া করছে। যে হাসি কেবল সর্বহারাদের মুখে ফুটে ওঠে। আর কেউ সে হাসি হাসতে জানে না। কেবলই মনে হয়, সে এসেছিলো আমার কাছে বাঁচতে –এসেছিল মৃত্যুর হিমশীতল পরশ এড়িয়ে এই মাটির পৃথিবীতে আবার শ্বাস প্রশ্বাস নিতে। কিন্তু অদৃষ্টের কি পরিহাস!  আমার জন্য তা হলো না। নব পল্লবিত, মুকুলিত শাখাটি ঝড়ের দাপটে নুইয়ে পড়েছিল আমারই কোলে। নিষ্ঠুর আমি, তাই তাকে আশ্রয় দিতে পারিনি। তাকে আমি নিজ হাতে উড়িয়ে দিয়েছি। 

আশা উদ্দামে পূর্ণ একটি টগবগে যুবকের আমি হন্তা। নীড়হারা পাখির নীড় আমি ভেঙেছি। চকোরীর চকোর, বন্ধুর বন্ধু, মিতার মিতা, প্রিয়ার প্রিয়া, দুর্বলের অবলম্বন আমি নিজ হাতে নষ্ট করে দিয়েছি। 

মানুষ কী ভরসা করে আসে আমার কাছে? বাঁচবে বলে। না, বাঁচানো আমার কাজ নয়। আমি ডাক্তার নই। কে বলে আমি ডাক্তার? 

আমি নরঘাতক! 

আমি যমদূত। 

পাপী, তাপী, খুনী! 

ও নামে কলঙ্ক দিও না। ও নাম কলঙ্কিত করো না। 

আমি খুনী, ছেড়ে দাও, যেতে দাও আমাকে। শাস্তি দাও! আমি খুন করেছি। কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার! কেবল একজন মানুষকেই নয়, আরেকজনের আশা, আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যত জীবনকে!

.............

২৫.০৩.১৯৬১

কুমুদিনী কলেজ, টাঙ্গাইল         


Friday, March 20, 2026

প্রবন্ধ - অনাদি কালের স্রোতে

 সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। আশরাফুল মখলুকাত। এই মানুষ দুই প্রকারের। একজন নারী অন্যজন পুরুষ। পুরুষ শারীরিক শক্তিতে বলবান। নারী অপেক্ষাকৃত নাজুক। পুরুষ সংগ্রামী। নারী আয়েশী ।পুরুষ ও নারীর জীবন দ্বিমুখী । পুরুষ  বহির্মুখী । নারী অন্তর্মুখী। পুরুষ নারীকে নিরাপদে রাখে। নারী সেই নিরাপত্তা পুরুষের কাছে প্রত্যাশা করে। পুরুষ পিতা হয়ে, ভ্রাতা হয়ে, স্বামী হয়ে, পুত্র হয়ে নারীকে নিরাপদে রাখার সংগ্রাম চালায়। 

সেই সুদূর অতীতে যখন আইন ছিল না, সমাজ ছিল না তখন এই পুরুষ তার গোত্রের নারীদের নিরাপত্তা বিধানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। এমনকি আজকের দিনেও এত উন্নতির যুগে পুরুষের সহযোগিতা না পেলে নারীদের অনেক কর্মকান্ডই ব্যর্থতায় পর্যবাসিত হবে । পুরুষের সহানুভূতি, সাহায্য ব্যতিরেকে  নারীদের একার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব না।  তদ্রূপ নারীদের সাহায্য, সহানুভূতি  ছাড়া পুরুষের একার পক্ষে উন্নতির লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব না । এই দুইয়ের সহস্র বছরের সহযোগিতায় গড়ে  উঠেছে আজকের  সমাজ ব্যবস্থা।  যদি নারীর অবদান না থাকতো তবে মানুষজাত আদিম জীবন যাপন করতো। এই সভ্যতার সুবাতাস আজ নর নারীর জীবনে বইতে পারতো না। পুরুষের শক্ত হাত আদিমতাকে আলিঙ্গন করতো। মেয়েদের কোমল হাত শুধু দাসত্ব করার কাজে নিয়োজিত থাকতো। 

প্রকৃতপক্ষে মেধা ও মননে নারী পুরুষের কোন পার্থক্য নেই। বুদ্ধি ও মেধা আল্লাহর দান। পুরুষের মধ্যে মেধা ও বুদ্ধির তারতম্য লক্ষ্য করা যায় । প্রত্যেক পুরুষ সমান নয়। সেরূপ নারীরাও সকলে সমান বুদ্ধিমতী নয়। কেউ বেশী, কেউ  কম। বুদ্ধি ও বৃত্তি প্রসারের ক্ষেত্র পুরুষের সীমাহীন। সামাজিক ব্যবস্থা পুরুষকে কথা বলার অধিকার দিয়েছে বেশী, জানবার সুযোগ দিয়েছে বেশী। শারীরিক শক্তির বরে তার সাহসও বেশী। এসব কারণে পুরুষের জ্ঞান  বৃদ্ধি পায়  এবং জ্ঞান প্রয়োগের কৌশল তার অভিজ্ঞতার ভান্ডার পূর্ণ করে। অপরদিকে নারী স্বভাবে নমনীয়। সামাজিক ব্যবস্থার ফলে নিজেকে প্রকাশ করবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। গৃহে বন্দি থাকার দরুণ 'বাহির' -কে দেখবার বা শুনবার কোন সুযোগ তার নেই। সুতরাং জ্ঞানের  ভান্ডারে তার শূন্যের ছড়াছড়ি। তার যা কিছু জ্ঞান তা পুরুষের  নিকট থেকে ধার করা। কিন্তু লেখাপড়া  জানা থাকলে বই পুস্তকের মাধ্যমে যা সঞ্চয় করা, বাস্তব জ্ঞান থেকে সেই জ্ঞান অনেক কম।  

আদিম যুগে পৃথিবী বৃক্ষলতার জালে পরিপূর্ণ  ছিল। তার  ভেতরেই অন্যান্য প্রাণীদের সঙ্গে ছিল মানুষের বসবাস। অন্যান্য পশু প্রাণীরা ক্ষিপ্রতায় মানুষের চাইতে অনেক পটু। সেজন্য মানুষ প্রাণ রক্ষার জন্য  বৃক্ষশাখায় রাত কাটাতে শেখে। বৃক্ষশাখায় তারা তাদের অবস্থান স্থায়ী করে। তারপর বুদ্ধির জোরে গাছের ডালে ঘর বাঁধে , অবস্থান দৃঢ়  এবং নিরাপদ করে। এতেও মানুষ থেমে থাকলো না। লক্ষ্য করল তারা দুই ধরণের। একটি আদম, আরেকটি হাওয়া । একটি আদমি - পুরুষ, অন্যটি রমণীয় -রমণী ।  তারা আরো বুঝতে পারলো পুরুষ নারীর সঙ্গ পছন্দ করে। নারী চায় পুরুষের পাশে থাকতে। এভাবেই তারা দিবারাত্রি অতিক্রম করছিল। একদিন এক আদিম মানব কি জানি কি মনে করে একটি জংলী ফুল চয়ন করে তার সঙ্গিনীর এলো খোপায় গুঁজে দেয় । এ কাজটি করে তারা দুজনে স্তম্ভিত হয়ে যায়। এটা কি করে হলো ! সেদিন মনুষ্য জাতি সেই  অরণ্যের  অন্যান্য প্রাণীকুল থেকে পৃথক হয়ে গেল। তাদের বোধোদয় হলো  যে তারা সবার থেকে আলাদা, তারা অসাধারণ । তাদের অনেক কিছুই করার ক্ষমতা আছে। 

আদিম যুগে গৃহ রচিত হয়েছিল নারীদের জন্যই। মেয়েরা কোমল। প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকা তাদের জন্য খুবই কঠিন। তাই  পুরুষকে তার নিজের এবং দলের মেয়েদের নিরাপত্তা বিধানের ভার নিতে হয়। নিরাপদ রাখতে হয় হিংস্র পশুর থাবা থেকে এবং অন্য গোত্রের হিংস্র নরের হাত থেকে। কারণ নারী অপহরণ আজকের মতন আদিম যুগেও ছিল। নারীরা তখনো পুরুষের সম্পত্তির মত ছিল। আজকের যুগেও স্বীকার করতে হয় যে নারী পুরুষের সম্পত্তি। যদিও অনেক মর্যাদা আমরা লাভ করেছি, অনেক অধিকারও পেয়েছি। কিন্তু তা পুরুষের ইচ্ছায়। 

নারীরা প্রাকৃতিক ভাবেই মাতৃত্বের অধিকারী। নারীই মাতা । অন্য কেউ নয়। মাতৃত্ব লাভের সময় তার ক্ষমতা একটু সীমিত থাকে। তখন শত্রুদের হাত হতে রক্ষা করতে হলে সার্বক্ষণিক প্রহরায় পুরুষকে নিয়োজিত থাকতে হয়। সেজন্য পুরুষ অনুভব করে গৃহের প্রয়োজনীয়তা। যেখানে তার নারী নিরাপদে অবস্থান করবে। ঝড়, ঝঞ্ঝা স্পর্শ করবে না, জীব জন্তু আক্রমণ করবে না, শত্রুরা হানা দেবে না। সেই চিন্তা থেকেই পুরুষ নির্মাণ করলো গৃহ - সুরক্ষিত, নিরাপদ আস্তানা তার নারীর জন্য। এই নারীই গৃহলক্ষ্মী, গৃহকর্ত্রী। তাই  নারীর নিরাপত্তা সুরক্ষায় পুরুষের গৃহ নির্মাণে নিত্য নতুন কলাকৌশল আবিষ্কার। এর মূলে যে মন্ত্র কাজ করে তার নাম ভালবাসা।  তাই তার ভালবাসার ধন সুরক্ষিত থাকুক, পুরুষ তাই -ই চায়। 

পুরুষ নারীকে ভালবাসে। এটা প্রাকৃতিক ও চিরন্তণ। একজন নারীও ঠিক একই ভাবে একটি পুরুষকে  তার হৃদয় কুসুম দান করে।  সেই জন্য মানুষ চিন্তা  করতে থাকে এই ভালবাসাকে কিভাবে স্থায়ী করা যায়। একে স্থায়ী করবার জন্য একটি বন্ধন তৈরী  করা প্রয়োজন। এই বন্ধনই বিবাহ। এই বিবাহ নারী পুরুষের ভালবাসাকে চিরস্থায়ী করবার জন্য চালু করা হয়েছে। এ রাখী বন্ধন মানুষের  হাজার বছরের তপস্যার ফসল। সমাজ একে স্বীকার করে  নিয়ে অধিকার দিয়েছে। কেউ এই সম্পর্কের মধ্যে ভাগ বসাতে পারে না। কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত এই বিবাহ বন্ধনই নর - নারীর ভাললাগা ও  ভালবাসার  সম্পর্ককে ধরে রাখার একমাত্র উপায়। যদি তাই না হতো তবে মানুষ এতদিনে এই প্রথা রদ  করে  অন্য কোন প্রথা উদ্ভাবন করতো। 

সকল ধর্মেই বিয়ের প্রথা প্রচলিত আছে। সুতরাং নারী পুরুষের পারস্পরিক অধিকার কারো একার নয়। দুজনেরই সমান। নর নারীর মধুর সম্পর্কের একটি সুন্দর কথা বলে গিয়েছেন  আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, 

'নর বাহে হল, নারী বহে জল,  সেই জল-মাটি   মিশে
ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।'

আরো  বলা যায়, 
'নারীর  বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি প্রাণ
যতকথা তার হইলো কবিতা, শব্দ হইলো গান।'

এই চমৎকার কথাগুলো শুনলে পরান জুড়িয়ে যায় । মনে হয় দুনিয়াতে এর চাইতে মহৎ ও সুন্দর আর কিছুই নেই। স্বর্গ যেন আমাদের কুঁড়ে ঘরে এসে ঠাই নেয় । তবে পুরুষ কর্তৃক নারী যে নির্যাতিত হচ্ছে না তা নয়। শিক্ষিত, অশিক্ষিত নির্বিশেষে মেয়েরা অত্যাচারিত  হচ্ছে।  যেখানে ভালবাসা নেই, স্নেহ মমতা অনুপস্থিত, সেখানে নারী অবশ্যই নির্যাতিত।  নির্যাতনের বা পীড়ণের অন্য একটি দিক আছে। সেটি হচ্ছে, যে সবল সে দুর্বলকে কষ্ট দেয়। দেখা যায় দুর্বল সর্বদাই নিপীড়িত, অত্যাচারিত। এমনকি নারীরা যে ক্ষেত্রে সবল, সেখানে দুর্বল পুরুষ বা দুর্বল মেয়ে, অল্প বয়স্করা অথবা গৃহে কর্তব্যরত গৃহ কর্মীরাও  অত্যাচারিত হচ্ছে। সুতরাং পুরুষ মাত্রেই যে নারীকে নির্যাতন করছে তা নয়।  তাই সবচেয়ে বড়  কথা নারীকে যোগ্য হতে হবে। তাকে অবলা হয়ে ঘরে বসে স্বামীর পায়ের নীচে বেহেশতের সন্ধান করলে চলবে না। তাকে মানুষ হতে হবে। কিন্তু কে নেবে সেই ভার, সেই গুরুদায়িত্ব তাকে মানুষ করে তুলবার? এর উত্তর হল শিক্ষা। 

শিক্ষাই একমাত্রও শক্তি যা মানুষকে মনুষ্যত্ব এবং যোগ্যতা দিতে সক্ষম। মেয়েরা যদি শিক্ষিত হয় তবেই তারা তাদের অধিকার স¤\^ন্ধে সচেতন হবে। তাকে মানুষের  যোগ্যতা অর্জন করতে গিয়ে জানতে হবে তার কর্তব্য কি, দায়িত্ব কি। যদি কর্তব্যজ্ঞান তার ভিতর না জাগ্রত হয়, তবে অধিকার সচেতন নারী ঘরে ঘরে কলহ বিবাদের সূত্রপাত ঘটাবে। সেজন্য দেশের সরকারকে নাগরিকদের সুশিক্ষার ভার নিতে হবে। তাহলেই  পুরুষ ও রমণী সুশিক্ষিত হয়ে নিজের নিজের অবস্থান দৃঢ় ও সুন্দর করতে সক্ষম হবে। শিক্ষিত পুরুষ, নারীকে নির্যাতন করা থেকে বিরত থাকবে। 

ধরে নিই যে সব পুরুষ অত্যাচারী।  তাই তাদের সংস্পর্শ সযত্নে পরিহার করা উচিত। অথবা যদি বলা হয়, 'ওহে সতী সাধ্বী নারী সমাজ, তোমরা পুরুষের নির্যাতনের শিকার  হয়ো না, তাদের পরিত্যাগ করো, নিজেরা  আত্মমর্যাদার অধিকারী হও', তাহলে অবস্থা কি দাঁড়াবে? উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত পৃথিবী নামক গোটা গ্রহটি মহিলাদের ক্রুদ্ধ পদাঘাতে প্রকম্পিত হবে। তারা যে ধর্মের বা যে বর্ণেরই হোক না কেন সকলে একযোগে বিদ্রোহ  করবে, মিছিল করবে, শ্লোগান দেবে, অনশন পর্যন্ত করবে। এমনকি বরফের ঘরে বাস  করে যে এস্কিমো নারী, তারাও অনশন থেকে বাদ যাবে না। তারপর নারীকুল বলবে, 'আমরা একা বাঁচতে চাই না, আমরা পুরুষের সংস্পর্শে বাঁচতে চাই। পুরুষ বিনে জীবন প্রাণহীন দেহের মতোই মূল্যহীন । আমাদেরে পরম প্রিয় পিতা, ভ্রাতা, পতি ও পুত্রকে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিও না।' অন্যদিকে যদি পুরুষকুলকে বলা হয়, 'ওহে পুরুষ প্রবর, তোমরা রাফ্ , তোমারা টাফ্। তোমরা জুলুমকারী, আর তারা শস্যক্ষেত্র নয়, তাদের কাছে যেও না, তাদেরকে মুক্তি দাও।' যদি পুরুষেরা সুবোধ বালকের মত এসব বাণী মেনেও  চলে তবে কি হবে? ঠিক সেই  মুহূর্ত থেকে দুনিয়াতে প্রলয় শুরু হবে। বিধাতার  সৃষ্টি  স্তব্ধ হবে। সেদিন যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হবে সে হবে এ ধরিত্রীর শেষ মানব সন্তান। সেসময় থেকে শতকরা পঁচিশ ভাগ মানুষ, যাদের বয়স পঞ্চাশের বেশী তারা আগামী পঁচিশ বছরেরে মধ্যে এ ধরণীর মায়া ত্যাগ করে মারা যাবে। তারপরে পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছরের মধ্যে আরও পঞ্চাশ ভাগ মানুষ শুধু বয়সের কারণে নয় অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারণে মারা যাবে।   ততদিনে মানব সম্পদ কমে আসবে। অরণ্য সম্পদ বৃদ্ধি পাবে। ভূপৃষ্ঠ অনাবাদী জমিতে পরিণত হবে। সভ্যতার কর্ণধার এই মানবজাতির সংখ্যা নগণ্য হতে হতে যান্ত্রিক সভ্যতা বিকল হয়ে পড়বে। শস্য উৎপাদনের জন্য সক্ষম পুরুষেরা বৃদ্ধ হবে। নগর সভ্যতা পরিচর্যার অভাবে অকার্যকর হবে। পানি, বিদ্যুত ,গ্যাস, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, শিক্ষা মুখ থুবড়ে পড়বে। যে মানব গোষ্ঠী কৃষ্টি ও সভ্যতাকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় তার জন্ম রহিত হবে। তাদের কাজ আর কে করবে? বনজঙ্গল জনপদ গ্রাস করবে। যে কয়জন নারী পুরুষ চরম ঘোষণার শেষদিনে জন্মগ্রহণ করেছিল, তারা যদি শতবর্ষের পরমায়ু নিয়েও জন্মায় তবুও তারা বাঁচতে পারবে না। জীবন ধারণের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে। জরা, ব্যাধি ও  মৃত্যু তাদের নিকটবর্তী হবে। 

মানুষ অরণ্য থেকে সভ্যতায় উত্থান লাভ করতে পারে, কিন্তু সভ্যতা থেকে বের হয়ে অরণ্যে বাঁচতে পারে না। তাই পুরুষ রমণীর সেই ভাল থাকার 'সারমান' বা বাণী ঘোষণার পর থেকে সত্তর পঁচাত্তর বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জীব মানবজাতি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। 'দাও ফিরে সে অরণ্য, লহো এ নগর' -রবিঠাকুরের সেই প্রার্থনা বাস্তবে পরিণত  হবে। সৃষ্টির আদিযুগের মত পৃথিবী গভীর অরণ্যে পরিণত হবে। জীবজন্তুর পদচারণায় বনভূমি মর্মর ধ্বনিতে ভরে উঠবে। পাখির কণ্ঠে প্রভুর জয়গানে অরণ্য মুখরিত হবে। নদীর কলোচ্ছাস বহুদূর হতে শোনা যাবে। যদিও নদীর কলগান শোনার জন্য কেউ কান পেতে থাকবে না। মনুষ্যবিহীন পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। প্রতিদিন সূর্যোদয়  হবে। পশ্চিমাকাশ লালিমায় ঢেলে দিয়ে সূর্য অস্তও  যাবে। বাংলার ছয় ঋতুর পরিক্রমা কাউকে পুলকিত করবে না। কেউ দুঃখ পাবে না, কেউ হাসবে না, কেউ কাঁদবে না। কেউ কবিতা লিখবে না , গান গাইবে না, কেউ আর আনন্দ করবে না। কেউ আর  ভালবাসবে না। নারীকে  আর নির্যাতনের প্রশ্নই উঠবে না। সব শেষ - সব শান্ত।  

জল পড়ে পাতা নড়ে -ফিরোজা হারুন

 

ছন্দের হাত ধরে দাঁড়ালো দু’জন।
ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে পাতায় পাতায়
নৃত্যের তালে তালে পাতা দোল খায়।

বৃষ্টির ধারা নামে বাগানের আঙিনায়
জলকেলি করে রাধা, শ্যাম পিছু ধায়।
রিমঝিম বাদলের নূপুরের ছন্দে
চঞ্চলা পায়ে নাচে প্রকৃতি আনন্দে।

বাগিচার এককোণে, 
কে যে বসে বাতায়নে
দেখেছিল বরষার রূপ রস গন্ধ
তন্ময় হয়েছিল মগ্ন দু’দন্ড।

বৃষ্টির গান আর বাতাসের বাদ্য,
বীণাখানি দিয়ে বলে সুর তোল সদ্য।
ছন্দের শিহরণে পুলকিত ‘রবি’
জল পড়ে পাতা নড়ে বলে ওঠে কবি।

ছন্দ নূপুর পরে বাণী পেল প্রাণ,
তালে তালে বেজে ওঠে কবিতার গান।
কাব্যের পরশ পেল কবির অন্তর,
জন্ম লভিল কবিগুরু জাদুকর।

********

 সাহিত্য পর্যালোচনা ১ঃ “জল পড়ে পাতা নড়ে”

“জল পড়ে পাতা নড়ে”—এই বিখ্যাত ছন্দোবদ্ধ পংক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শৈশবকালের প্রথম রচিত পদ্য। বাংলা কাব্য সাহিত্যে এই পংক্তিটি এক বিশেষ ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব বহন করে। ফিরোজা হারুন-এর “জল পড়ে পাতা নড়ে” কবিতাটি ঠিক এই ছন্দ ও পংক্তিকে ভিত্তি করে রচিত, ফলে এতে রবীন্দ্র-ঐতিহ্য ও আধুনিক অনুভবের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে।

সাহিত্যিক গুরুত্ব ও বিশ্লেষণঃ

১. রবীন্দ্রনাথের ছন্দবোধ ও কবিতার জন্ম

রবীন্দ্রনাথের “জল পড়ে পাতা নড়ে” পংক্তিটি বাংলা শিশুসাহিত্যে কাব্যময়তা, ছন্দ ও সংগীতের এক সহজ অথচ অমোঘ প্রকাশ। এটি ছিল তাঁর সৃষ্টিশীলতার সূচনা, যা পরবর্তীকালে বাংলা কাব্যের গতিপথকেই বদলে দেয়।

ফিরোজা হারুন এই ঐতিহ্যবাহী ছন্দ ও ভাবনাকে আধুনিক প্রসঙ্গে টেনে এনে কাব্যিক ব্যঞ্জনা দিয়েছেন এবং শিশুসুলভ সহজতা ও প্রকৃতির মায়া ধরে রেখেছেন।

২. রবীন্দ্র-প্রভাবের শিল্পিত পুনর্নির্মাণ

ফিরোজা হারুনের কবিতায় ছন্দ, প্রকৃতি ও সংগীত—এই তিনটি উপাদান রবীন্দ্র-কবিতার মতোই প্রবলভাবে উপস্থিত।

মূল পংক্তির (“জল পড়ে পাতা নড়ে”) সুর ও চিত্রকল্পকে কেন্দ্র করে তিনি পুরো কবিতায় বর্ষা, পাতার দোলা, বৃষ্টির নৃত্য, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও ছন্দময়তা তুলে ধরেছেন।

রবীন্দ্রনাথের প্রথম পদ্য ছিল সরল এবং স্বতঃস্ফূর্ত; ঠিক তেমনি এই কবিতাতেও সহজতা, স্বাভাবিকতা এবং প্রকৃতির মায়াময়তা বিদ্যমান।

৩. ছন্দের ঐতিহ্য ও আধুনিক সম্প্রসারণ

মূল পংক্তিটি বাংলা ছন্দের এক সহজ উদাহরণ, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে কাব্যের মেলবন্ধন হয়েছে। ফিরোজা হারুন সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক কাব্যভাষায় রূপ দিয়েছেন। তিনি জল ও পাতার মিতালী, বর্ষার আনন্দ, বৃষ্টির সুর, এবং কবিতার জন্মের কাহিনি সাজিয়েছেন ছন্দোবদ্ধ ভাষায়।

এভাবে রবীন্দ্রনাথের ছন্দ-উন্মেষের ঐতিহ্য বাংলার নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন আঙ্গিকে পৌঁছে যায়।

৪. কবিতার আত্মপরিচয় ও কাব্যিক অর্জন

শেষ স্তবকে, “কাব্যের পরশ পেল কবির অন্তর, / জন্ম লভিল কবিগুরু জাদুকর”—এই সরল স্বীকারোক্তি বাংলা কবিতার ইতিহাসে রবীন্দ্র-উন্মেষের মাহাত্ম্য স্মরণ করিয়ে দেয়।

ফিরোজা হারুন বুঝিয়ে দিয়েছেন — ছোট্ট একটি ছন্দ, প্রকৃতির সহজ দৃশ্য, এবং শিশুমনের কল্পনা—সবই মিলেমিশে বাংলা কাব্যের চিরন্তন ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে।

উপসংহার

ফিরোজা হারুন-এর “জল পড়ে পাতা নড়ে” শুধুমাত্র প্রকৃতিবিষয়ক কবিতা নয়, এটি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। মূল পংক্তির সহজ ছন্দ, শিশুসুলভ অনুভূতি, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং কাব্যিক প্রাণ—সবকিছু এই কবিতায় নতুনভাবে ধ্বনিত হয়েছে।

এভাবে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পদ্য ও তার সাহিত্যিক তাৎপর্যকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থ ও আবেগে উপস্থাপন করার জন্য এই কবিতাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

*****

সাহিত্য পর্যালোচনা ২ঃ “জল পড়ে পাতা নড়ে”


Thursday, March 5, 2026

প্রলাপ

সর্বশক্তিমান স্রষ্টার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। সেই মানুষ কখনও এমন পর্যায়ে পড়ে যা সে নিজেই বুঝে উঠতে পারে না। বিংশ শতাব্দীতে মানুষ প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব চালাচ্ছে, মানুষের মনের উপর প্রভুত্ব চালাচ্ছে। একে অন্যের মনও জয় করছে। নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধির বলে অপরের মনের অবস্থা  হৃদয়ঙ্গম করতেও সক্ষম হচ্ছে। জীবনের সকল ক্ষেত্রেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিচ্ছে। অথচ এই বুদ্ধিমান মানবেরও এমন অবস্থা আসে যখন সে নিজে কোথায় আছে, কি ভাবছে, কি করা উচিৎ, কিছুই বুঝতে পারে না। তার অন্তরে সুখ থাকেনা, শান্তিও থাকে না। সে সর্বদা অস্বস্তি অনুভব করে। কিন্তু কেন, কি কারণে সে অপ্রার্থণীয় ‘মনো বেদনা’ তাকে পেয়ে বসে তা সে নিজে বুঝতে পারেনা। মন কি চায় তা সে খোলাখুলি বলতে পারেনা। আত্মার সেই অব্যক্ত ক্রন্দন  কেউ তো শুনতে পায়না। কেবল শুনতে পায় সে নিজে।

কিন্তু কই? সে শোনারও তো কোন অর্থ নেই। সেতো তার কোন অর্থ করতে পারেনা, সেই বেদনার ভাবকে ভাষায় রূপ দিতে পারেনা। কেন পারেনা? সেই কেন পারেনা-র দলে আমিও তো একজন। ধিক!। 

নিজেকে শতধিক! 

কেন আমি আমার মনের অব্যক্ত কথা প্রকাশ করতে পারিনা। আমি তো পাষাণ নই। আমি মানুষ। আমি এই ব্যাধিগ্রস্ত মানুষ হতে নিজেকে পৃথক করে নিতে চাই, কেবল নিজের মনকে দেখার জন্য।

কি সে?

কি চায় সে?

কেনই বা চায়? 

হয়তো তার প্রশ্নের যথার্থ জবাব খুঁজে না পেলেও ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। অনেক সময় বন্ধুদের কাছে আবোল তাবোল বকে যাই। তাদের তা অপ্রিয় লাগে তা জানি। তা জেনেও কেন এমন ভাবে নিজের মনকে সান্ত্বনা দেবার প্রয়াসে কেন অন্যকে উৎপীড়ন করতে যাই? যার কাছে মনের ভাব প্রকাশ করবো, সেই যদি প্রচন্ড মুষ্ঠাঘাত করে, আমার চঞ্চল, কম্পমান, দিশেহারা হৃদয়কে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয়, তবে আমি কি করবো? এমনভাবে বহুদিন আহত হয়েছি। কিন্তু কেন? আর নয়। এবার আমার মানসিক শান্তি, আনন্দ অক্ষুণ্ণ রাখার দায় আমাকেই নিতে হবে। নিজের সুখ, নিজের শান্তির ব্যাঘাত কেন ঘটাব?

হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমিও না সৃষ্টির সেরা জীবদের একজন। তবে কেন এই অন্যায়ের প্রশ্রয় দেব? তাই মনে পড়লো আমার কাগজ আছে, কলম আছে, কালি আছে। তবে কেন আর অন্যের নিকট ব্যর্থ আব্দার করে ব্যথার বোঝা বড় করা? নীরব শ্রোতা হয়ে কাগজের সাদা, পরিষ্কার, পবিত্র বুকে এঁকে যাব আপন মনে। আসবেনা কোন প্রতিবাদ, না আসুক সহানুভূতি।

তাই আজ কাগজ কলমকেই একমাত্র অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করলাম। সে ভুলে যাবে না কিছুই। যেদিন অতীতকে জানতে চাইবো, ঠিকঠিক কথাগুলো সে জানিয়ে দেবে। মিথ্যে বলবে না একটুও। আমার খুব ভাল লাগবে। আজ সারাটা দিনই কেমন মনমরা হয়ে কাটালাম।কোন বিশেষ কাজ করিনি। সময়ের অপচয় বললে দোষ হবে না। নিছক আকাশ কুসুম কল্পনা করেই কাটিয়েছি। আর ভেবেছি মানুষের মন কতই না বিচিত্র। 

কেটেছে একেলা বিরহের বেলা
            আকাশ কুসুম চয়নে
সব কথা এসে শেষ হলো শেষে
          তোমারই দু’খানি নয়নে, নয়নে...

.............................

০৬/০৩/১৯৫৯   

সেই হাতখানি

  এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা ...