Friday, July 24, 2026

সুবর্ণ স্মৃতিতে বিদ্যাময়ী -১৯৫৩


সেই কবেকার কথা। কবেকার কথাই বটে।গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়। ১৯৫৩ সাল আমি বিদ্যাময়ী গার্লস হাইস্কুলে ভর্তি হই। হোস্টেলে ফাইভের মেয়েদের জন্য সিট ছিল না বলে আমাকে ক্লাস সিক্সের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে হয়েছিল সেটি ছিল। আমার জীবনের প্রথম স্মরনীয় ঘটনা।

ভর্তি পরীক্ষায় আমি বাংলা, ইংরেজী, উর্দু ও অংকে ভাল নম্বর পাই। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে কোন প্রকার ধারণা না থাকায় সেগুলোতে ভাল করতে পারিনি। হস্টেলে না থাকতে পারলে আমার লেখ-পড়া হবে না। সেজন্য কর্তৃপক্ষ আমাকে ক্লাস সিক্সে ভর্তি করে নিলেন।

তখনকার দিনে ম্যাট্রিক পরীক্ষা শুরু হতো মার্চের প্রথম সোমবারে। পরীক্ষার্থীরা হোস্টেল ত্যাগ করতো মার্চের শেষে। সেজন্য এপ্রিল মাসে আমি হোস্টেলে সিট পেলাম।

আমার পিতা নান্দিনা হাইস্কুলে অংক ও ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। তিনি একদিন বাড়ি এসে আম্মাকে বললেন, ‘ওর তো ভর্তির সব ঠিক হইয়ে গিয়েছে, সিটও বরাদ্দ পেয়েছে হোস্টেলে, আগামী শনিবার  ওকে নিয়ে যেতে হবে।ওর কাপড় – চোপড় সব গুছিয়ে দাও।’ আমি তখন ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছিলাম। এই কথা শুনে প্রচন্ড হৃৎকম্প শুরু হলো। উৎসাহে নয়, ভয়ে। আমি এক চঞ্চল মেয়ে। বনে বাদাড়ে, গাছের আগডালে, মগডালে –সর্বত্র আমার অবাধ বিচরণ। এই বয়স পর্যন্ত কখনও শান্ত পায়ে হাঁটিনি। কেবল ছুটোছুটি আর আনন্দে দিন কাটাই।সেই আমি হঠাৎ শান্ত হয়ে যাই। আবার হোস্টেলে যাবনা বলতেও অহংবোধ লাগে।

যথাসময়ে পৌঁছালাম বিদ্যাময়ী হোস্টেলে। হেডমিস্ট্রেস হাছিনা আপার সঙ্গে দেখা করে আমার বাবা আমাকে রেখে চলে আসেন। তত্ত্বাবধায়কের সাহায্যে বড় মাঠ পেরিয়ে হোস্টেলের ভিতর এসে পৌঁছালাম। শোবার ব্যবস্থা উপর তলায়।স্টাডি নীচের বিরাট হলরুমে। একটি ডেস্ক পেলাম বইপত্র রাখার জন্য, ড্রেসিংরুমে কাপড় চোপড় রাখবার জন্য পেলাম একটি লকার এবং স্যুটকেস রাখবার জায়গা, ট্রাংক চলে গেল বক্সরুমে। মেয়েরা সাহায্য করলো ঠিকমতো শাড়ি পরতে। সুন্দর করে শাড়ি পরা শিখতে আমার অনেকদিন সময় লেগেছিল।   

দিন শেষ। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত এলো। খাওয়া –দাওয়া শেষে লাইন করে উপরে উঠে বিছানায় আশ্রয় নিলাম। এক ডরমিটরিতে দুই সারিতে ত্রিশটি বেড ছিল। এতদিন মায়ের কোলের কাছে ঘুমাতাম সেকথা মনে পড়ে ভীষণ কান্না পেল। মেয়েরা সান্তনা দিল। ভয় দেখাল খালাম্মা (মেট্রন) বকা দিবেন। কিন্তু কিসের কি?  সব ভয়, লজ্জা অতিক্রম করে আমার ক্রন্দন রোদনে পরিণত হলো। খালাম্মা এলেন, প্রথমে ধমক দিলেন। পরে স্নেহার্দ্র স্বরে বুঝালেন, যে লেখা –পড়া শিখতে হলে বাড়ি হতে দূরে থাকতে হয়।অন্য মেয়েরা আছে –তাদের দেখ ইত্যাদি।

পরদিন প্রত্যুষে টুং টুং ঘন্টার শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো। তারপর দেখি বাথরুমের সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনেক মেয়ে। দশটি বাথরুমে এক সারিতে। গোসলেরও একই পদ্ধতি। স্নানাগারে ঢুকে কল খুলে দিলাম। সেই পানি পড়ার শব্দের আড়ালে প্রাণ খুলে জোরে জোরে কান্না শুরু করে দিলাম। এটি ছিল আমার প্রতিদিনের রুটিন। বিকেলটা ভাল কাটাতো যখন মেয়েদের সঙ্গে মাঠে খেলা করতাম।

বাবা বলেছিলেন যদি মন দিয়ে লেখাপড়া কর তবে তুমি এম এ পাশ করবে একদিন। আর যদি ফেল কর, তবে লেখা পড়া বন্ধ। মনে মনে ভাবলাম ফেল আমাকে করতেই হবে। এম এ পাশ করবার কোন প্রয়োজন নাই। এপ্রিল মাসে হস্টেলে এসেছি, মে মাসে হাফ-ইয়য়ার্লি  পরীক্ষা। ইংরেজী, বাংলায় আশির উপর নম্বর পেয়েছি, উর্দুতে পঞ্চাশের মধ্যে চল্লিশ।আর বাকী সাবজেক্ট ইতিহাস, ভূগোল, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ইত্যাদিতে ফেল। প্রোগ্রেস রিপোর্টে সেই সব বিষয়ের নীচে লাল দাগ দেওয়া।মেয়েরা বলল, তোমার পাঁচ বিষয়ে ক্রস (অর্থাৎ পাশ করতে পারনি।)মনে মনে খুশী হলাম।বার্ষিক পরীক্ষায় সব বিষয়ে ক্রস অর্জন করতে পারলে আর হস্টেলে থাকতে হবে না।   

ছুটির দিনে আমার বাবা এলেন আমাকে দেখতে। স্কুল বিল্ডিং –এর বারান্দায় বসে ভিজিটররা মেয়েদের সঙ্গে দেখা করতেন। বাবাকে দেখে আমার কান্না থামেনা। যে বাবাকে আমরা বাঘের মত ভয় পাই, তাঁর সামনে নিজেকে সংযত রাখতে পারলাম না। ভাবলাম তিনি ক্রোধে প্রজ্জ্বলিত হয়ে আজই বাড়ি নিয়ে গিয়ে লেখা –পড়া বন্ধ করে দেবেন।কিন্তু কি আশ্চর্য!তিনি একটুও রাগ করলেন না এবং আরো আশচর্য যে তিনি তার বুকের সঙ্গে আমার মাথা ধরে রাখলেন পরম মমতায়া। আমার কঠোর পিতার কোমল অন্তরের পরিচয় পেয়ে মনে মনে স্তম্ভিত হয়েছিলাম।আমি সেদিন যা জানলাম, পরিবারের কেউ তা জানতে পারলো না। আমার কান্না আরো উথলে উঠলো।তিনি আমাকে সান্ত্বনা দিলেন। শেষে অন্য মেয়েদের কাছে ডাকলেন।মমতার সঙ্গে বললেন, মা, তোমরা আমার মেয়েটাকে দেখো।কোনদিন বাড়ির বাইরে যায়নি, মাকে ছাড়া থাকেনি।

কেন জানিনা, মেয়েরা আমাকে খুব স্নেহ করতো। গ্রামের মেয়ে আমি। শহুরে আদব কায়দা সব বুঝিয়ে দিত। সেবার ছুটিতে বাড়ি এলাম। প্রায়ই প্রতিদিনই ক্লাসমেটদের চিঠি পেতে থাকলাম। চিঠি পেয়ে খুব ভাল লাগলো। ভাবলাম, যদি আর না যাই তবে এই বন্ধুদের সঙ্গে কোনদিন আর দেখা হবে না। আর একবার যাই, যদি কান্না পায়, আর যদি ফেল করি তবে আর যাবো না।

দেখতে দেখতে বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেল।আমার সেকশানে ষষ্ঠ স্থান অধিকার করলাম। রেজাল্ট দেখে ক্লাস টিচার খুব খুশী। বললেন। এটি সেই মেয়েটি না, যে প্রথমদিন পরীক্ষার খাতায় নাম লেখে নাই? আসলে পরীক্ষা কেমন করে দিতে হয়, তাই জানতাম না। আমার বড় ভাই হস্টেল থেকে নিয়ে এলেন আমাকে।রেজাল্ট দেখে আমাকে বাহবা দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, সব প্রশ্ন কমন পড়েছিল? কমন পড়া কাকে বলে তখনও জানতাম না। তবুও হাঁ –সূচক উত্তর দিলাম। 

ফেল করিনি দেখে ভিতরে ভিতরে মনটা খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু বলতে পারলাম না কাউকে। ভাবলাম ক্লাস সেভেনে ফেল করতে হবে। মন্দ ভাগ্য আমার। ক্লাস সেভেনে দুই সেকশানে মিলে থার্ড হলাম। ততদিনে হস্টেলে আমার মন বসে গেছে। মায়া পড়ে গেছে মেয়েদের জন্য, বড় আপা ও আপাদের জন্য, নাচের ভঙ্গিতে শারি পরা উড়িয়ে মহিলা–পিয়ন সোনিয়া–লখিয়েদের জন্য, যারা ক্লাসরুমের বাইরে বসে আবিরাম পাখা টানে (যাদের কানের লতিতে গহনা পরার জন্য বিশাল ছিদ্র আছে) তাদের জন্য। মহিলা ঘাস কাটনেওয়ালিদের জন্য, খদুর মা, তারার মা, বাবুর্চিদের জন্য, টিফিন প্রস্তুতকারী বিশাল বপু সুধাদির জন্য, কলসীতে করে পানি তুলে ড্রাম ভরে উপরে ও নীচের তলায়, সেই গোপাল–দার  জন্য পুইট্যা জমাদার, লম্বু জমাদার -যারা ড্রেন সাফ করে তাদের জন্য। দপ্তরি মামার (দারোয়ান)জন্য। সুতরাং আমার মনোবাঞ্চা পূরণ হওয়ার পথে এখন অনেক অন্তরায়।  

এখন আমার বাবা অন্য মেয়েদের বলেন, আমার মেয়েটা আগে হস্টেলে থাকতে চাইতো না, আর এখন বাড়ি যেতেই চায় না।

অবশেষে ১৯৫৮ সালের ৩রা মার্চ ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হই। এতদিনে বিদ্যাময়ী স্কুলের সঙ্গে আমার আত্মার বন্ধন গড়ে উঠে। বিল্ডিং –এর ভিতর – বাইরে, পুকুর ঘাট, বিশাল মাঠ, সুসজ্জিত, সুরভিত, দৃষ্ট নন্দন বাগানের আনাচে –কানাচের সঙ্গে যেন আজও মমতার পরশ লেগে আছে। বিদ্যাময়ীর স্মৃতি আমার জীবনের স্বুর্ণযুগ। সবচেয়ে ভাল লাগার দিনগুলো আজও গর্বভরে স্মরণ করি। 

...................

ঢাকা, ২০০৪ 

Monday, June 1, 2026

বাদল বরিষণে

গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে  যখন বিশ্ব চরাচর অগ্নিস্নানে দগ্ধিভুত হয়, বর্ষা নামে প্রকৃতির আশীর্বাদ হয়ে। তার শীতল জলধারা সকল তাপ-জ্বালা ধুয়ে মুছে শান্ত করে বিশ্ব চরাচর। বর্ষার শান্তির বারি সিঞ্চনে সিক্ত হয় প্রকৃতি, মানুষ এবং মানুষের চিত্ত। মেঘের ছায়ায় আশ্রয় পায় তৃষিত ধরণী আর তৃষ্ণার্ত মানুষের প্রাণ। এত সুখ আর এত শান্তি যেন কিছুতেই নেই। নবধারায় স্নাত মানুষের হৃদয় বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। কবিত্বে ভর করে তার তনু-মন। ছন্দে, লয়ে আন্দোলিত হয় অন্তর। আনন্দে বিরহে সে হয় উদ্বেলিত। তার নম্রকন্ঠ বলে,

‘এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়
এমন মেঘস্বরে-বাদল ঝরঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়’

প্রিয় মানুষটির জন্য প্রাণ কেঁদে উঠে। বিরহে ব্যাকুল হয় অন্তর। মন বলে এখনি যদি তাকে কাছে পেতাম, খুলে  দিতাম অন্তরের ঝাঁপি; যে কথা কোনদিন তাকে বলতে পারিনি, আজ প্রাণ খুলে এই বর্ষণমুখর অন্ধকারে হৃদয়ের সকল দুয়ার খুলে প্রাণের সকল বারতা তাকে জানিয়ে দিতাম।

বর্ষণ মন্দ্রিত রাতে একা ঘরে, মেঘের গুরু গুরু গর্জনে নূপুর নামের মেয়েটি বারবার কেঁপে উঠে। সে বর্ষা ভালবাসে, মেঘ ভালবাসে। আজ তার বিরহি হৃদয় প্রিয় বিচ্ছেদের বেদনায় ব্যাকুল। বৃষ্টি ভেজা ছোটবেলার খেলার সংগী ছিল পাশের বাসার নিক্বণ। তার সংগে বৃষ্টিতে খেলা করতো। সে ছিল এক অন্তহীন সুখস্মৃতি। ধীরে ধীরে আরো সময় পেরুলো। নিক্বণ চলে এলো দেশের বাইরে।  আজকাল ফোন দূরত্বকে জয় করেছে। ফোনেই তারা দুজন দুজনকে কাছে পায়। আনন্দে সময় কেটে যায়। হঠাত একদিন নিক্বণের সাড়া পাওয়া গেল না। রাস্তায় একটি অ্যাকসিডেন্টে সে জ্ঞান হারায়। নূপুরের  বিশ্বাস হয়না এসব কথা। তারপর সত্যি সত্যি নিক্বণের ফোন এলো। খুব দুর্বল কন্ঠস্বর । নূপুর আশ্বস্ত হয়। কিন্তু কান্না আর থামেনা, বাদল ধারার সংগে পাল্লা দিয়ে চলে। বর্ষার কোন আনন্দের গানই এখন আর ভাল লাগেনা।  শুধু একটি গানই নিক্বণের উদ্দেশে গায়,
'এমনি বরষা ছিল সেদিন
শিয়রে প্রদীপ ছিল মলিন
তব হাতে ছিল অলস বীণ
মনে কি পড়ে প্রিয়! '

এমন সময় একদিন সাত সাগরের ওপার এক পরিষ্কার কন্ঠস্বর ভেসে আসে।

শুভ জন্মদিন নূপুর। আজ তোমার জন্মদিন মনে আছে তো? তুমিও কাছে নেই বর্ষার কদমফুলও নেই। তবে একটি গান শোনাতে পারি। তোমার আপত্তি নেই তো?

নূপুর কেঁদে ফেলে। আবেগ জড়িত কন্ঠে বলে, গাও প্লিজ, গাও লক্ষীটি!

'এসো হে সজল শ্যাম ঘন দেয়া
এসো কুঞ্জ ছায়ায় এসো, তাল তমাল বনে
এসো শ্যামল
ফুটাইয়া যুথি কুন্দ নিপ কেয়া
এসো হে সজল শ্যাম ঘন দেয়া।।
বারিধারে এসো চারিধার ভাসায়ে
বিদ্যুত ইংগিতে দশদিক হাসায়ে
বিরিহিনী মেঘ জ্বালায়ে
আশার আলেয়া
ঘনদেয়া
মোহানীয়া
শ্যামপিয়া
এসো হে সজল শ্যাম ঘন দেয়া'

ইথারের তরংগে সুদুরের ওপার হতে ভেসে আসতে থাকে নিক্বণের ভরাট গলায় মায়া ভরা বর্ষার গান। বৃষ্টির জলে ভিজতে না পারলেও নূপুরের অধীর চিত্ত নিক্বণ ধ্বনিতে সিক্ত হতে থাকে।

জুন,২০১১


Sunday, May 31, 2026

শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশে মায়ের ভূমিকা




 

এই আমি


 জীবন অর্থই প্রানের স্পন্দন। প্রাণ যতদিন দেহের আশ্রয়ে থাকে, ততদিনই জীবন হিসেবে গণ্য হয়। দেহকে প্রাসাদ বলতে পারি, মন্দির বলতে পারি, কারাগার বলতে পারি, খাঁচাও বলতে পারি। বলাটা নির্ভর করে কখন আত্মার সঙ্গে দেহের কি সম্পর্ক তার উপরে। আত্মার সঙ্গে দেহের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ।দেহ আঘাত পেলে আত্মা হয় ব্যথিত। আত্মাকে অপমান করলে দেহ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে। আত্মাকে সম্মান প্রদর্শন করলে দেহ তার চেহারায় অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। দেহ মন দুটিতে মিলেই একটি যন্ত্র। দেহ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর বড় হতে থাকে । সেই সঙ্গে বড় হতে থাকে আত্মার ধারণ ক্ষমতা। দেহ শারিরীক পূর্ণতা লাভ করে। কিন্তু আত্মার পূর্ণতা লাভ হয় না। অর্থাৎ দেহের বৃদ্ধির প্রাপ্তি শেষ হয়, আত্মার বিকাশ লাভ শেষ হয় না। বরং উত্তরোত্তর অসীম জ্ঞানের ভান্ডারে আত্মা প্রবেশের প্রয়াস পায়। যে যেমন লোক হোক, যেখানে বাস করুক না কেন, তার জ্ঞান বাড়তেই থাকে। দেহের খাঁচা একদিন জীর্ণ হয়। দেহের দেখাদেখি আত্মা কিন্তু জীর্ণ হয় না। তখনই শরীরের সঙ্গে বাধে তার বিরোধ। তাদের সম্পর্ক নষ্ট হয়। 

রোগগ্রস্ত বা জরাগ্রস্ত শরীরে আত্মা অশান্ত হয়। তখন খাঁচা ছেড়ে পাখিটি কোথায় যেন উধাও হতে চায়। দেহ যখন অথর্ব, অকর্মণ্য, জরাগ্রস্ত হয়, তখন আত্মা নির্যাতিত হতে থাকে। আত্মাকে ধারণ করবার ক্ষমতা দেহের থাকে না। আত্মার উন্নতি বা বিকাশের পথ হয় রুদ্ধ। নিপীড়িত আত্মা দেহের বন্ধন ছিন্ন করতে চায়। চায় মুক্ত বিহংগের মত দেহের কয়েদখানা থেকে মুক্তি পেতে। তাই একদিন সে চির পরিচিত দেহ ত্যাগ করে কোথায় যেন কোন নিঃসীম নীলিমায় হারিয়ে যায়। যে শরীর তার যৌবনের রাজপ্রাসাদ ছিল, প্রৌঢ় বয়সের মন্দির ছিল, তা ত্যাগ করতে দ্বিধা করে না । সে যেন এক অচিন পাখি। খাঁচা ছেড়ে অচিন পুরে চলে যায়। প্রাণহীন দেহ পড়ে থাকে। আর কোনদিন উঠতে পারে না। অন্তহীন কালের জন্য সে শয্যা পাতে। চিরশয্যায় সে শায়িত হয়। দেহ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, লয়প্রাপ্ত হয়। মৃত্তিকায় রূপান্তরিত হয়। তার যা কিছু দৈহিক সম্পদ তা মাটিকে উপহার দেয়। মাটি হয়তো তার তৈল সম্পদ উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করে। 

প্রাণ পাখিটি খোঁজ রাখে না তার দেহ মন্দিরটির। সে যে কতকাল এই শরীরে বসবাস করে গেল, তার জন্য তার কোন মমতা নেই। বড় নিষ্ঠুর সে। বড়ই অকৃতজ্ঞ। ‘আর্শী নগরের পড়শী’ আর পেছন ফিরে তাকায় না। অন্য কোথাও, অন্য কোন সোনার খাঁচার বুলবুলি হয়ে সে হয়তো গান করে।

আমি কে, আমি জানি না। ‘আমি’ বলতে আমার অস্তিত্বকেই বুঝি। যাকে আমি হস্ত দ্বারা স্পর্শ করতে পারি, আর্শীতে অবলোকন করতে পারি, উপলব্ধি করতে পারি আমার শ্বাস প্রশ্বাসের উত্থান পতনে, হৃদয়ের স্পন্দনে। এই আমি চলে যাব এই সুন্দর ভুবন ছেড়ে।  আর আসবো না। আর চেনা মহলে একটি বারও ফিরে গিয়ে বলা হবে না এই যে আমি এসেছি, তোমাদের কাছে, তোমাদের কেউ। এই আমি নাম সর্বস্ব প্রানহীন দেহ মাত্র। নামটি দেহের। প্রাণের নয়।একটি মানুষকে আলাদা করে চিহ্নিত করার জন্য নাম। তাও পরিচিত মহলে। অপরিচিত পরিবেশে তার নামটিরও কোন দাম নেই। তবুও দেহের –ই  নাম থাকে। আত্মার নাম থাকে না। দেহের খাঁচায় যে বুলবুলি বাস করে সে নামহীন, গোত্রহীন, ধর্মহীন, বর্ণহীন।

এই নামটি সংগ্রহ করে আমি ঘুমিয়ে থাকবো কবর গুহায় অনন্তকাল।পরিপাটি নিরাপদ কবর। দস্যু তস্করের ভয় নেই, ক্ষুধা তৃষ্ণার  উপদ্রব নেই, আশা নিরাশার দোলা নেই। শুধু থাকবে আমার অস্তিত্বের মিশ্রণে মৃত্তিকা। হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীর পৃষ্ঠে আজকের মত আসবে বর্ষা, আসবে শীত, গ্রীষ্ম পর্যায়ক্রমে। আমার শেষ আবাসস্থলে কত বারিধারা আঘাত হানবে।

কত ঝড় ঝঞ্ঝার দাপটে ধরণী প্রকম্পিত হবে। কত বন্যা আসবে আমার এই বাংলায়। কত অরি, কত মারি, মানবগোষ্ঠীর প্রাণ সংহার করবে। তারা এসে যোগদান করবে শুভ্র কাফনের সমাজে। প্রকৃতির মঞ্চে নামের ভূমিকায় কাজ করে যাবে মানুষ চিরকাল। কেবল আমারই আর উঠে আসা হবে না আগের মত। দু’চোখ ভরে আর দেখা হবে না রূপসী বাংলাকে। আমার নামও মানুষ ভুলে যাবে একদিন। সমাধিও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। হয়তো তার উপর মানুষ একদিন আবাদ করবে সুস্বাদু ফলবান বৃক্ষ অথবা তুষযুক্ত শস্যদানা। কিম্বা তা হবে মানুষের আবাসিক এলাকা। গড়ে উঠবে সুদৃশ্য ইমারতরাজী অথবা রাজপ্রাসাদ। হয়তো বা আমার সমাধি স্থলে রচিত হবে কারো বাসর। সূচিত হবে নতুন জীবন, অথবা পাতবে কেউ মৃত্যু শয্যা। এমনও হতে পারে আবার কেউ হয়তো এখানেই শেষ শয্যা গ্রহণ করবে। কোন মালি হয়তো রচনা করবে ফুলের বাগান আমার সমাধিতে।‘মোর কবরে ফুটবে যে ফুল। না জানি তা কার তরে।’ 

চির বিস্মরণের পাড়ে চলে যাব আমি। কেউ বলবে না এই বাড়িতে, এই গৃহকোণে, এই নামে কেউ একজন ছিল। হাসি কান্না দিয়ে ভরে রেখেছিল এই নিভৃত গৃহকোন। এই প্রাঙ্গন একদিন কারো পদচারণায় মুখরিত ছিল। এই আমার পরিচর্যায় বৃদ্ধি পেয়েছিল ঐ  বৃক্ষ, ঐ তরুলতা, যার শীতল ছায়া, সুমিষ্ট ফল, আমার স্নেহ মাখা উপহার হয়ে তাদেরকে তুষ্ট করছে। পার হয়ে যাবে শত শত বছর। ভুলে যাবে পরবর্তী বংশধরগণ আমার নাম। এই নামে কাউকে তারা চিনবে না, জানবে না। আমার কর্মফল পড়ে থাকবে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অনন্ত কালের গর্ভে আমি বিলীন হয়ে যাব। আর কোনদিন কোন কালে আমার পদচিহ্ন পড়বে না এই বাটে। আমার আত্মা অর্থাৎ এই আমি বাকহীন, শক্তিহীন পদ্মা, যমুনা বিধৌত বঙ্গ ভূমিতে আরো একটিবার দেহ ধারণের তৃষ্ণা নিয়ে বাতাসের সঙ্গে ঘুরে বেড়াব। 

১লা এপ্রিল, ১৯৯৪

ড্রাম ফ্যাক্টরি, ঢাকা ১২০৬.

ডুলি – প্রাচীন কালের বাহন

 

১৯৫৩ সাল। 

গ্রাম বাংলার গভীরে শিক্ষার আলো প্রবেশ করে নাই। লেখাপড়ার জন্য শহরে যেতে হত। শহরে যাবার পথ ছিল মেঠো পথ। বাড়ী থেকে রেল স্টেশন পাঁচ মাইল দূরে। হাঁটা একেবারেই সম্ভব নয়। পায়ে হাঁটা অপ্রশস্ত রাস্তা। তাই ডুলিতে চড়ে খুব ভোরে রওনা হয়ে ‘ধলা’ রেল স্টেশনে পৌঁছাতে হত। গন্তব্য বিদ্যাময়ী ইংরেজি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়,ময়নসিংহ। দেশের সেরা স্কুল যার ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে আমার প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন শুরু। 

আমাদের অঞ্চলে আমার পিতা –ই  একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন। কলিকাতা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯১৯ সালে এন্ট্রাস পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন যে বছরে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন সে বছরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আমার পিতার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা পাশ করার ফলে এলাকায় বিপুল সাড়া পড়ে যায়। একটি অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে একটি আলোর শিখা যেন প্রজ্জ্বলিত হয়। তিনি নান্দিনা মহারাণী হেমন্ত কুমারী উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। নান্দিনার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ও শিক্ষকদের  সঙ্গে তিনিও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি একজন সুশিক্ষিত, তেজস্বী পুরুষ ছিলেন। নারী শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। তিনি গ্রামে আমাদের বাড়ি সংলগ্ন স্থানে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। আমার হাতে খড়ি আমার মায়ের কাছে। বাড়িতে যেহেতু লেখা পড়ার প্রচলন ছিল, সওগাত, মাসিক মোহাম্মদি, বেগম –এসব ম্যাগাজিন আমাদের বাড়িতে আসতো। আমার জন্য ছিল নানারকম বই। বাংলা, ইংরেজী, ঊর্দু, আরবী, ধারাপাত বই আরও অনেক আমার উপযোগী বই। মক্তবে আমার পড়াশুনা করার মত কিছু ছিলনা। সেজন্য মৌলবী (শিক্ষক) সাহেবের নির্দেশে লম্বা ঘোমটা টানা আট, নয় বছর বয়সের মেয়েদেরকে আমি পড়াতাম। শিক্ষক যেহেতু পুরুষ সেজন্য আমাকেই তাদেরকে পড়াতে হত। আমার পিতার উদ্দেশ্য ছিল আমাকে দেশের সেরা স্কুলে পড়াবেন। সেটি ছিল বিদ্যাময়ী স্কুল, ময়মনসিংহ। ১২ বৎসর না হলে হোস্টেলে সীট পাওয়া যায় না। তিনি তার আগেই ষষ্ঠ শ্রেণীতে আমার ভর্তির ব্যবস্থা করে ফেলেন। আমিই প্রথম ঐ অঞ্চলে, এই ডুলিতে চড়ে শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি । তখন মেয়েদের জন্য ছিল বাঁশের তৈরি ডুলি। স্থানীয় ভাষায় খাট। উৎসবের জন্য ছিল পালকি। কাঠের তৈরী, নকশাদার,ভারী,বড় আকারের। ঘাড়ে বহন করবার জন্য কাঠের দন্ড – কারুকাজ করা। ছয়জন বেহারা বহন করত। ডুলি বহন করতো দুই বেহারা।  ডুলি ছিল বাঁশের তৈরী চারকোণার একটি খাঁচা। যথেষ্ট শক্ত। ভেতরে একজন মানুষ সোজা হয়ে বসতে পারে। তার উপরিভাগে একটি শক্ত মোটা বাঁশ,বেশ লম্বা,যা কিনা বেশ শক্ত করে ঐ খাঁচাটিতে বাঁধা আছে। ছিঁড়ে  পড়ে যাবার কোন সম্ভাবনা নেই। বাহনটি ছিল মূলতঃ মেয়েদের জন্য। মহিলারা এত পথ হাঁটতে পারেনা। কারণ তাদের কোলে থাকে শিশু এবং পর্দা রক্ষারও একটি ব্যাপার আছে। ডুলি একটি শাড়ি বা অন্য যে কোন কাপড় দিয়ে ঘেরা থাকতো। যাত্রী মহিলাটির সঙ্গী বা প্রহরীর পা দু’খানাই সম্বল। বেহারাদের সঙ্গে সে দ্রুত পদসঞ্চারণে পথ চলতো। 

বেহারা, যারা ডুলি বা পালকি বহন করতো তাদেরকে আমরা স্থানীয় ভাষায় ‘মাড়োয়া’ বলতাম। বেহারারা ছিল উড়িয়া। হিন্দি –উর্দু মিশ্রণে একরকম বিচিত্র সুরে কথা বলতো। তাদের গাত্রবর্ণ কৃষ্ণবর্ণও নয়,ফর্সাও নয়। বেশ উঁচা লম্বা গড়ন। মালকোঁচা দেওয়া ধুতি খাটো করে পরা। তাদের সঙ্গে কখনও তাদের পরিবার দেখি নাই। সম্ভবতঃ তারা নিজেদের দেশ হিন্দুস্থানে নিজেদের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতো। আমাদের এদিকে তারা সাধারণতঃ ধনী বাড়ির দিঘির চওড়া পাড়ে ঘর তৈরী করে বসবাস করতো। তারা সবসময়ে দলবদ্ধ হয়ে বাস করতো। অনেকে অনেক সময়ে হাট বাজারের উপকন্ঠে আশ্রয় কেন্দ্র তৈরী করে থাকতো। তাদের দলে একজন সর্দার থাকতো। আমাদের বাড়ির কাছের দলের সর্দারের নাম ছিল ‘আঁউতার’। ছাতু ছিল তাদের প্রিয় খাদ্য। ভাত, রুটিও খেত। আমরা বাঙালীরা সেই সময়ে আটার রুটি চিনতাম না। শুকনো তামাক পাতা হাতের তালুতে কচলিয়ে পাউডার করে মুখের ভেতরে মাড়ির ফাঁকে দিয়ে রাখত। সেটাকে বলা হত ‘খইনি।’ অবসরে বৃক্ষ ছায়ায় বসে তারা খইনি বানাত। কোন সঙ্গী সাথী আসলে তারা তদের নিজেদের ভাষায় জিজ্ঞেস করতো, 

'কা  -হো? (কি কর?) 

খইনি খা –ল –বা ? (খইনি খাবা?)

সওয়ারি বহন করাই ছিল বেহারা বা মাউরাদের একমাত্র কাজ। গ্রাম –গ্রামান্তরে তারা সারাদিন সাওয়ারী বহন করতো। যাত্রী অবশ্যই মহিলা। ডুলি একাধিক যাত্রী বহন করবার উপযুক্ত বাহন নয়। তবে পালকিতে দু’জন বসতে পারতো,যেমন বর –কনে। সেক্ষেত্রে ছয়জন বেহারা থাকতো। হাতে লাঠি। স্কন্ধে গামছা। বেহারাদের পারশ্রমিক ছিল শুকনো খাবার চাউল,চিড়া,মুড়ি,গুড়।   

চলার পথে দ্রুত পদচারনার সাথে সাথে বেহারারা একরকম শব্দ করতো –হুঁম্‌, হুঁম্‌, হুঁম,... একই তালে, একই ছন্দে । দুই বেহারা এগিয়ে চলতো একই তালে একই সুরে। হয়তো এতে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পেত। ভারি বস্তু বহন করবার সময় একটু দৌড়ের প্রয়োজন হয়। তাতে মাল বহন করা এবং গন্তব্যে পৌঁছা সহজতর হয়।

স্টেশনে পৌঁছালে ঝিক ঝিক শব্দ করে রেলগাড়ী আসতো। বেহারাদের পায়ের গতি বৃদ্ধি পেত। আমি তখন ছোট একজন সওয়ারি। দুই বেহারা নৃত্যের তালে তালে অপেক্ষাকৃত কম সময়ের মধ্যে ধলা স্টেশনের নিকটবর্তী হত। একদিকে মায়ের জন্য কান্না, ছায়া সুনিবিড় গ্রামের জন্য বেদনা বোধ, অন্যদিকে পথের পাঁচালীর অপু দুর্গার মত রেলগাড়ি দেখার কৌতূহল আমাকে আন্দোলিত করত। রেলগাড়ি গফরগাঁও স্টেশন ছেড়ে আসার পর পরেই তার হুইসেল এবং শব্দ শোনা যেত। রেল লাইনের ওপারে স্টেশন। ট্রেনের ভারে রেল লাইনেও এক রকম কম্পন অনুভূত হত। আমার বাহন ডুলিও এসে থামতো। এসব স্টেশনে ট্রেন কখনও পূর্ণ বিরতি নেয় না। গতি কম করে মাত্র। আমার ভাইয়েরা আমাকে ডুলি থেকে টেনে বের করে ট্রেনের ‘জেনানা’লেখা কামরায় ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিত। বেহারা, ডুলি আবৃত করে রাখা শাড়িটি খুলে দ্রুত কামরার জানালা দিয়ে ভিতরে ছুঁড়ে দিত। তারপর আমার ভাইয়েরা দ্রুত পাশের কামরায় উঠে পড়তেন ট্রাঙ্ক, স্যুটকেস, বেডিং নিয়ে। দুই বেহারাকে আট আনা অর্থাৎ ৫০ পয়সা দিতেন। কুলিকে দিতেন ২৫ পয়সা। ট্রেনের গতি বৃদ্ধি পেত। ট্রেনের কামরায় মাত্র কয়েকজন যাত্রী থাকত –অবশ্যই মহিলা। ব্যক্তিগত গল্পে তাদের সময় কেটে যেত, যেন তারা কত কালের পরিচিত। গল্প গুজব, পান কিমাম খাওয়ার আদান প্রদানে যত ব্যক্তিগত, পারিবারিক – সব গল্প চলতে থাকতো। আমি রেলগাড়ির ভেতরের চেহারা দেখতাম, আরো দেখতাম বাইরের সব গাছ –পালা, মাঠ –ঘাট, ক্ষেত –খামার উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছে। দেখে স্তম্ভিত হতাম। কি কারণে উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছে তার কোন কারণ বোধগম্য হতো না। 

ডুলি প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলতে হয়। আমার আম্মা তাঁর ছোট বেলায় লাখ্‌নৌ-তে থাকতেন তাঁর ভাইদের সঙ্গে। তিনি বলেছেন,লাখ্‌নৌ শহরের অলিগলি ভরা ছিল  ডুলিতে। এখনকার সময়ে আমাদের দেশের রিকশার মত। যার যখন দরকার ডুলিকে ডেকে নিত এই বলে,'ও ডোলি ওয়ালা,ইধার আও।'ধনী লোকেরা ঘোড়ার গাড়িতে যাতায়াত করতেন। তখন সময় ১৯২০ থেকে ১৯২৬ সাল। অন্য কোন যানবাহন সে সময়ে ওনাদের চোখে পড়েনি। আজকের এই একবিংশ শতাব্দী থেকে সেই সময় কত দূরে!

...............

দাসপ্রথা উচ্ছেদ হয়েছে কি?


দাস প্রথা একটি প্রাচীন প্রথা। সেই সুদূর অতীত কাল থেকেই যারা স্বচ্ছল মানুষ, তারা সম্পদহীন মানুষের সেবা গ্রহণ করবার নিমিত্তে তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখতো। শুধু তাই নয়, গরু ছাগলের মতো তাদেরকে, খোঁয়াড়ে রাখা হতো এবং শৃংখলিত অবস্থায় বাজারে বিক্রি করা হত। ক্রেতাগণ তাদের দাঁত দেখে, চোখ দেখে, হস্তপদ ঠিক আছে কিনা, অসুখ –বিসুখ আছে কিনা এইসব পরীক্ষা করে দরদাম করে ক্রয় করে বাড়িতে নিয়ে যেত। এরাই ক্রীতদাস। বংশ পরম্পরায় এই সকল দাসেরা অহর্নিশি তাদের মালিকদের খেদমতে নিয়োজিত থাকতো। সামান্য ত্রুটি –বিচ্যুতিতে তাদেরকে চাবুক দিয়ে বেদম প্রহার করতো। তাদের কোন বিশ্রাম ছিল না। নূন্যতম মানুষের মর্যাদা দেওয়া হতনা। জীবন্ত মানুষের অঙ্গ –প্রত্যঙ্গ কেটে ভিতরে কেমন আছে তা দেখতে দ্বিধা করতো না। হজরত রাবেয়া বসরী তার উদাহরণ।

সুদূর আফ্রিকা (কৃষ্ণ মহাদেশ -Dark continent) থেকে চতুর মার্কিনীরা কালো মানুষদেরকে ধরে নিয়ে যেত জাহাজ বোঝাই করে। ফাঁদ পেতে তাদেরকে ধরা হতো। এমনকি পশু পাখির মত জাল ফেলে  তাদেরকে ধরা হত। এটা একটা ব্যবসা ছিল তখনকার দিনে। 

দি রুটস্‌ ছবিটি দেখলে দাস প্রথার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ধনী ব্যক্তিরা দাসদের ঘাড়ে পা রেখে, তাদেরকে অত্যাচারে জর্জরিত করে নিজেরা আরামে, আয়াশে দিন কাটাতো। ক্রীতদাসরা বংশ পরম্পরায় তাদের সেবা করতো।

আমেরিকার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন একজন মহামানব ছিলেন। মানবতার এই অপমান, অমর্যাদা তার অন্তরকে ব্যথিত করে। তিনি আন্দোলনে নামেন। শেষে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ বাঁধে। প্রচন্ড যুদ্ধ হয় ক্রীতদাস প্রথার পক্ষে ও বিপক্ষে। তারপর গেটিসবার্গ এড্রেসে –১৮৬৩ সালের ১লা জানুয়ারি তিনি ঘোষণা করেন যে ক্রীতদাস রূপে যারা বন্দী রয়েছে, তারা এখন থেকে মুক্ত, স্বাধীন।

এতে ধনী সাদা মানুষেরা ক্রুদ্ধ হল। তাদের অন্তর থেকে কালো মানুষের শরীরের কালি কিছুতেই দূর হলো না। কৃষঙ্গরা তাদের দৃষ্টিতে কালো এবং ঘৃণ্যই রয়ে গেল। 

দাস প্রথা আজ নেই। বাজারে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য খোঁয়াড় নেই, ক্রয় বিক্রয় নেই। কিন্তু বাস্তবে প্রথা না থাক, দাসত্ব উচ্ছেদ হয় নাই। শ্রেণী প্রথা অর্থাৎ ধনী দরিদ্রের পার্থক্য অতিশয় প্রকটভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে দরিদ্রের সেবা গ্রহনের প্রচলন খুবই আছে। স্বল্প মূল্যে তাদের শ্রম ক্রয় করে ধনী ব্যক্তিরা। সেই শ্রমলব্ধ ফসল বা উৎপাদিত পণ্য বা দ্রব্যাদি অধিক মূল্যে বিক্রি করে ধনীরা আরো ধনবান হয়। শ্রমদাতাগণ শ্রমিক নাম নিয়ে জীবন ধারণের কঠোর চেষ্টায় লিপ্ত হয়। 

কোথায় সভ্যতা, কোথায় আলো, কোথায় উন্নতি, তারা তার খোঁজ পায় না। রাজপথের সোডিয়াম বাতি আর হাজার গাড়ির বহর দেখে তারা অবাক বিস্ময়ে। রাত্রির কয়েক ঘণ্টা বিরতি বাদে বাকি সময়টুকু ওরা কারখানায় তথাকথিত ‘পোশাক শিল্পের’ ফ্যাক্টরিতে বন্দী থাকে। অনেক কারখানায় রাতেও ছুটি নেই। ওভার টাইম খাটায়। কিন্তু পারিশ্রমিক বাকী থাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। শ্রমিকদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে না মালিকেরা। অশালীন সম্বোধন, অশ্লীল শব্দাবলীর ব্যবহার, এমনকি মারপিট করতেও দ্বিধা করে না। আর ছাটাইয়ের ভয়তো আছেই। যে বেতন পায় তা দিয়ে খেয়ে পরে বেঁচে থাকা বলে না। তাই তাদেরকে মানবেতর জীবন যাপনের গ্লানি বহন করে চলতে হয়। 

সাভারে মাত্র সেদিন ২৪শে এপ্রিল পোশাক কারখানায় হিরোশিমা, নাগাসাকির মত মুহূর্তে যে ঘটনা ঘটে গেল, তা সকলেই অবগত আছেন। এসব ঘটনা দাস প্রথাকে হার মানায়। দফায় দফায় অগ্নিকান্ড, বিল্ডিং ধসে যাওয়া নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা এ দেশে। এইসব শ্রমিকদের প্রাণ রক্ষায় বা স্বার্থ রক্ষায় কোন আইন নেই। মালিকেরা ধরা ছোঁয়ার  বাইরে থেকে যায়। কারণ তারা জানে কিছুদিন পরে এইসব মর্মান্তিক ঘটনার কথা মানুষ ভুলে যাবে। তাই তারা অনেকেই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর ভিতরে সন্ধ্যার পর জরুরী মিটিং করার নামে বসে বসে আনন্দ, আড্ডায় মত্ত হয়, এবং কি করে আরো বেশী টাকা কামাই করতে পারবে এইসব হতদরিদ্র মানুষের রক্ত শোষণের বিনিময়ে সেই উপায় নির্ধারণের কৌশল আবিষ্কার করেন। 

এসব দেখে শুনে মনে হয় দাস প্রথা আজও সমাজে প্রচলিত আছে –পূর্বের চাইতে অধিক পরিমাণে আরো নিষ্ঠুর, আরো মর্মান্তিক ভাবে। দাস প্রথার অবসান হয়নি। মানুষ সরাসরি বাজারে বিক্রয় না হলেও, মানুষের ঘামেভেজা শ্রম বিক্রি হচ্ছে দিবা –রাত্রি!  

........................

জাগিয়া উঠিল প্রাণ

জন্মের পর থেকেই শাকিলার বোনেরা শুনতে পায় তারা সব বোন। ইদানীং তাদের বাড়ির নাম হয়েছে ৭ বোনের বাড়ি। অনেকটা একই রকম ৭ বোন –কৃষ্ণকলি। রোগাটে পাতলা গড়ন। নাক খাড়া। চোখ পিঙ্গল বর্ণের। তার কারণ তাদের মায়ের রঙ ফর্সা এবং চোখের রঙ পিঙ্গল। অন্যদের দৃষ্টিতে ৭ বোন এক অদ্ভুত প্রজাতি, অন্য গ্রহের কেউ। যে কোন একজনকে দেখলে লোকে বলে ৭ বোনের বোন। তাদের নাম জানবার কারো আগ্রহ নেই। বড় হলেও শাকিলার বয়স মাত্র ১২ বছর। সে একটু চিন্তাশীল। অন্য বোনেরা হইচই করে, বকা খেয়ে দিন কাটায়। তাদের মাতা পিতা প্রকাশ্যেই তাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। ভাল পোশাক, ভাল খাবার তারা কোনদিন পায়নি। তাদের মা তাদেরকে বাড়ির সব কাজ ভাগ করে দিয়েছে। ঘর –দোর, আঙ্গিনা পরিষ্কার করা, ঝাড়া –মোছা  করা, রান্নার যোগাড় দেয়া, বয়সে বড় শাকিলাকে রান্নার ভার দেয়া। বাসন –কোসন পুকুর ঘাটে বসে ঘষে –মেজে পরিষ্কার করে আনা। একটা বাসন পানিতে পড়ে গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা ডুব দিয়ে চোখ লাল করে সেটাকে খুঁজে তুলে আনতে হবে। ছেলে নেই বলে গরু ছাগলের পরিচর্যা করা, বাবার জন্য খাবার নিয়ে মাঠে যাওয়া আরও কত কাজ। আর তিন ক্ষুদে বাহিনী মনের সুখে বড় বোনদের সাহায্য করে। খাওয়ার সময় শাক সবজির ভর্তা, কাঁচা লংকা সহযোগে ভক্ষণ করে। সকালের নাস্তা তাদের লবণ দিয়ে তৈরী শুকনো রুটি। তাতেই তারা অমৃতের স্বাদ পায়। 

এমন সময় একদিন সুবেহ্‌  সাদেকের সময় তাদের পরিবারে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে। তাদের ৭  বোনের একটি ভাই জন্মগ্রহন করে। শান্তির দূত, আনন্দের দূত, সাতবোনের ত্রাণকর্তা। এতদিনে পরিবারের কর্ণধারের আবির্ভাব! বাড়িতে আনন্দ জয়জয়কার। সাত বোনের নয়নের মণি। শতকাজের মাঝে তারা ভাইটিকে মাথায় করে রাখে। 

বাবার কাছ থেকে ভাল ব্যবহার তারা কোনদিন পায়নি। এবার শাকিলা একটু বড় হয়েই স্কুলে যায়। পরবর্তীতে ছোট বোনেরা যেত। বাবা খুব রাগ দেখাত। ছোট ভাইটির জন্ম হওয়ার পর বাবার মেজাজটা একটু নমনীয় হয়। 

ওরা সাত বোনই স্কুলে যায়। পড়ে সাত ক্লাসে। তারা সকলের হাসির পাত্র। কিন্তু সেদিকে ৭ বোনের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তাদেরকে সকলে সার্কাস পার্টির লোকের মত দেখে। কিন্তু পড়াশুনায় তাদেরকে কেউ পেছনে ফেলতে পারেনা। এলো বার্ষিক পরীক্ষা। ৭ বোন নিজের নিজের ক্লাসে সকলকে টপকে উপরের ক্লাসে উঠে গেল। ওদের সাফল্যে সবার ঠাট্টা – মসকরা বন্ধ হয়ে গেল।

স্কুল ছুটির পর ওরা বাড়ি এসে সব কাজ করে, ভাইটিকে দেখে, রাতে পড়া তৈরী করে। শাকিলা তাদের গাইড, তাদের মাস্টার। তাদের পিতামাতার সেদিকে খেয়াল নেই। ওদের বই নেই, খাতা নেই, কলম নেই, কাগজ নেই। শাকিলা পুরাতন বই যোগাড় করে বোনদের জন্য। যেটা নেই নিজে লিখে দেয়। নিজের বই –পত্র রাখে পরের বোনটির জন্য। এভাবে সব বোনেরা ছোট বোনের জন্য বই –খাতা রাখে। পড়ার পরিবেশ নেই বাড়িতে। পড়তে দেখলে বাবা বলেন, তেনারা জর্জ –ব্যারিস্টার হবেন। গায়ের রঙ যাদের হাড়ি –পাতিলের মত, তাদের এত পড়ে কোন লাভ হবে না। পরের ঘরে টিকে থাকতে হলে কাজ জানতে হবে। 

মায়ের গায়ের রঙ ফর্সা। তা সত্ত্বেও মেয়েদের গাত্রবর্ণ কৃষ্ণবর্ণের, বাবার মত। নিজের গায়ের কালি মোছার জন্য সপ্তগ্রামের ওপার হতে ফর্সা মেয়ে আমদানী করা হয়েছিল, বিয়ে করে। কিন্তু বিধির বিধান খন্ডায় কে?

শাকিলার নেতৃত্বে বোনেরা সব একে একে স্কুল ফাইনাল পাশ করে চলে যায় উচ্চশিক্ষার পথে। যদিও সে পথ মোটেই মসৃন নয়। গ্রামের স্কুলের এখন খুব নাম কেবল এই ৭ বোনের জন্য। তাদের ভাল পোশাক নেই। তবুও তারাই শ্রেষ্ঠ। 

অন্ধকার কুসংস্কারাছন্ন গ্রামে, পশ্চাদপদ পরিবারে তারাই আলোর মশাল জ্বালায়। যে মেয়েদেরকে পরিবারের এবং সমাজের সকলে অভিশাপ মনে করতো, তারাই এখন সকলের মধ্যমণি। তাদের একমাত্র হাতিয়ার তাদের বুদ্ধি, বিদ্যা এবং মনের দৃঢ়তা। প্রচন্ড দারিদ্র্যের মধ্যে অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে যায় শাকিলা। সঙ্গে নিয়ে যায় তার বোনদেরকে এবং ভাইটিকে। তারা এখন সকলের পুরোভাগে আলোর বর্তিকা হাতে। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শাকিলা সকলকে তাক লাগিয়ে দেয়। সম্মানজনক চাকুরীতে ঢুকে তার পরিবারকে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে চলে, যা কিনা হ্যামিলনের বাশরীওয়ালার মত এক অগ্রযাত্রাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যে গন্তব্য সকলকে আলোচিত মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেবে। ৭ বোন জাগিয়ে তোলে পুরা জনপদকে। গ্রামের লোকেরা তাদের বাবা –মাকে সম্মান করে। এদিকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্য্যয়নকালে শাকিলার পরিচয় হয় একটি ছেলের সঙ্গে। ক্লাসের সেকেন্ড বয়। পড়ার প্রতিযোগিতা শাকিলার সাথে। তাদের প্রতিযোগিতা প্রণয়ে পরিণত হয়। তারপর এক শুভদিনে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয় তারা।

একদিন প্রত্যুষে তারা খিরু নদীর তীর ধরে হাঁটতে থাকে। চারিদিকে পাখপাখালিরা ডানা ঝাপটা দিয়ে জেগে উঠলো। নিজ নিজ কন্ঠের অনুশীলনে প্রভুর জয়গান করতে লাগলো। পূর্ব দিগন্ত নরম লালিমায় ভরে গেল নবারুণ সম্প্রাতে। তারা দুজনে একসঙ্গে গেয়ে উঠে –‘আজি এ প্রভাতে রবির কর/ কেমনে পশিল প্রাণের প’র/ কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত পাখির গান/ না জানি কেনরে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।’           

...............

সেই হাতখানি

  এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা ...