Friday, March 20, 2026

প্রবন্ধ - অনাদি কালের স্রোতে

 সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। আশরাফুল মখলুকাত। এই মানুষ দুই প্রকারের। একজন নারী অন্যজন পুরুষ। পুরুষ শারীরিক শক্তিতে বলবান। নারী অপেক্ষাকৃত নাজুক। পুরুষ সংগ্রামী। নারী আয়েশী ।পুরুষ ও নারীর জীবন দ্বিমুখী । পুরুষ  বহির্মুখী । নারী অন্তর্মুখী। পুরুষ নারীকে নিরাপদে রাখে। নারী সেই নিরাপত্তা পুরুষের কাছে প্রত্যাশা করে। পুরুষ পিতা হয়ে, ভ্রাতা হয়ে, স্বামী হয়ে, পুত্র হয়ে নারীকে নিরাপদে রাখার সংগ্রাম চালায়। 

সেই সুদূর অতীতে যখন আইন ছিল না, সমাজ ছিল না তখন এই পুরুষ তার গোত্রের নারীদের নিরাপত্তা বিধানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। এমনকি আজকের দিনেও এত উন্নতির যুগে পুরুষের সহযোগিতা না পেলে নারীদের অনেক কর্মকান্ডই ব্যর্থতায় পর্যবাসিত হবে । পুরুষের সহানুভূতি, সাহায্য ব্যতিরেকে  নারীদের একার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব না।  তদ্রূপ নারীদের সাহায্য, সহানুভূতি  ছাড়া পুরুষের একার পক্ষে উন্নতির লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব না । এই দুইয়ের সহস্র বছরের সহযোগিতায় গড়ে  উঠেছে আজকের  সমাজ ব্যবস্থা।  যদি নারীর অবদান না থাকতো তবে মানুষজাত আদিম জীবন যাপন করতো। এই সভ্যতার সুবাতাস আজ নর নারীর জীবনে বইতে পারতো না। পুরুষের শক্ত হাত আদিমতাকে আলিঙ্গন করতো। মেয়েদের কোমল হাত শুধু দাসত্ব করার কাজে নিয়োজিত থাকতো। 

প্রকৃতপক্ষে মেধা ও মননে নারী পুরুষের কোন পার্থক্য নেই। বুদ্ধি ও মেধা আল্লাহর দান। পুরুষের মধ্যে মেধা ও বুদ্ধির তারতম্য লক্ষ্য করা যায় । প্রত্যেক পুরুষ সমান নয়। সেরূপ নারীরাও সকলে সমান বুদ্ধিমতী নয়। কেউ বেশী, কেউ  কম। বুদ্ধি ও বৃত্তি প্রসারের ক্ষেত্র পুরুষের সীমাহীন। সামাজিক ব্যবস্থা পুরুষকে কথা বলার অধিকার দিয়েছে বেশী, জানবার সুযোগ দিয়েছে বেশী। শারীরিক শক্তির বরে তার সাহসও বেশী। এসব কারণে পুরুষের জ্ঞান  বৃদ্ধি পায়  এবং জ্ঞান প্রয়োগের কৌশল তার অভিজ্ঞতার ভান্ডার পূর্ণ করে। অপরদিকে নারী স্বভাবে নমনীয়। সামাজিক ব্যবস্থার ফলে নিজেকে প্রকাশ করবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। গৃহে বন্দি থাকার দরুণ 'বাহির' -কে দেখবার বা শুনবার কোন সুযোগ তার নেই। সুতরাং জ্ঞানের  ভান্ডারে তার শূন্যের ছড়াছড়ি। তার যা কিছু জ্ঞান তা পুরুষের  নিকট থেকে ধার করা। কিন্তু লেখাপড়া  জানা থাকলে বই পুস্তকের মাধ্যমে যা সঞ্চয় করা, বাস্তব জ্ঞান থেকে সেই জ্ঞান অনেক কম।  

আদিম যুগে পৃথিবী বৃক্ষলতার জালে পরিপূর্ণ  ছিল। তার  ভেতরেই অন্যান্য প্রাণীদের সঙ্গে ছিল মানুষের বসবাস। অন্যান্য পশু প্রাণীরা ক্ষিপ্রতায় মানুষের চাইতে অনেক পটু। সেজন্য মানুষ প্রাণ রক্ষার জন্য  বৃক্ষশাখায় রাত কাটাতে শেখে। বৃক্ষশাখায় তারা তাদের অবস্থান স্থায়ী করে। তারপর বুদ্ধির জোরে গাছের ডালে ঘর বাঁধে , অবস্থান দৃঢ়  এবং নিরাপদ করে। এতেও মানুষ থেমে থাকলো না। লক্ষ্য করল তারা দুই ধরণের। একটি আদম, আরেকটি হাওয়া । একটি আদমি - পুরুষ, অন্যটি রমণীয় -রমণী ।  তারা আরো বুঝতে পারলো পুরুষ নারীর সঙ্গ পছন্দ করে। নারী চায় পুরুষের পাশে থাকতে। এভাবেই তারা দিবারাত্রি অতিক্রম করছিল। একদিন এক আদিম মানব কি জানি কি মনে করে একটি জংলী ফুল চয়ন করে তার সঙ্গিনীর এলো খোপায় গুঁজে দেয় । এ কাজটি করে তারা দুজনে স্তম্ভিত হয়ে যায়। এটা কি করে হলো ! সেদিন মনুষ্য জাতি সেই  অরণ্যের  অন্যান্য প্রাণীকুল থেকে পৃথক হয়ে গেল। তাদের বোধোদয় হলো  যে তারা সবার থেকে আলাদা, তারা অসাধারণ । তাদের অনেক কিছুই করার ক্ষমতা আছে। 

আদিম যুগে গৃহ রচিত হয়েছিল নারীদের জন্যই। মেয়েরা কোমল। প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকা তাদের জন্য খুবই কঠিন। তাই  পুরুষকে তার নিজের এবং দলের মেয়েদের নিরাপত্তা বিধানের ভার নিতে হয়। নিরাপদ রাখতে হয় হিংস্র পশুর থাবা থেকে এবং অন্য গোত্রের হিংস্র নরের হাত থেকে। কারণ নারী অপহরণ আজকের মতন আদিম যুগেও ছিল। নারীরা তখনো পুরুষের সম্পত্তির মত ছিল। আজকের যুগেও স্বীকার করতে হয় যে নারী পুরুষের সম্পত্তি। যদিও অনেক মর্যাদা আমরা লাভ করেছি, অনেক অধিকারও পেয়েছি। কিন্তু তা পুরুষের ইচ্ছায়। 

নারীরা প্রাকৃতিক ভাবেই মাতৃত্বের অধিকারী। নারীই মাতা । অন্য কেউ নয়। মাতৃত্ব লাভের সময় তার ক্ষমতা একটু সীমিত থাকে। তখন শত্রুদের হাত হতে রক্ষা করতে হলে সার্বক্ষণিক প্রহরায় পুরুষকে নিয়োজিত থাকতে হয়। সেজন্য পুরুষ অনুভব করে গৃহের প্রয়োজনীয়তা। যেখানে তার নারী নিরাপদে অবস্থান করবে। ঝড়, ঝঞ্ঝা স্পর্শ করবে না, জীব জন্তু আক্রমণ করবে না, শত্রুরা হানা দেবে না। সেই চিন্তা থেকেই পুরুষ নির্মাণ করলো গৃহ - সুরক্ষিত, নিরাপদ আস্তানা তার নারীর জন্য। এই নারীই গৃহলক্ষ্মী, গৃহকর্ত্রী। তাই  নারীর নিরাপত্তা সুরক্ষায় পুরুষের গৃহ নির্মাণে নিত্য নতুন কলাকৌশল আবিষ্কার। এর মূলে যে মন্ত্র কাজ করে তার নাম ভালবাসা।  তাই তার ভালবাসার ধন সুরক্ষিত থাকুক, পুরুষ তাই -ই চায়। 

পুরুষ নারীকে ভালবাসে। এটা প্রাকৃতিক ও চিরন্তণ। একজন নারীও ঠিক একই ভাবে একটি পুরুষকে  তার হৃদয় কুসুম দান করে।  সেই জন্য মানুষ চিন্তা  করতে থাকে এই ভালবাসাকে কিভাবে স্থায়ী করা যায়। একে স্থায়ী করবার জন্য একটি বন্ধন তৈরী  করা প্রয়োজন। এই বন্ধনই বিবাহ। এই বিবাহ নারী পুরুষের ভালবাসাকে চিরস্থায়ী করবার জন্য চালু করা হয়েছে। এ রাখী বন্ধন মানুষের  হাজার বছরের তপস্যার ফসল। সমাজ একে স্বীকার করে  নিয়ে অধিকার দিয়েছে। কেউ এই সম্পর্কের মধ্যে ভাগ বসাতে পারে না। কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত এই বিবাহ বন্ধনই নর - নারীর ভাললাগা ও  ভালবাসার  সম্পর্ককে ধরে রাখার একমাত্র উপায়। যদি তাই না হতো তবে মানুষ এতদিনে এই প্রথা রদ  করে  অন্য কোন প্রথা উদ্ভাবন করতো। 

সকল ধর্মেই বিয়ের প্রথা প্রচলিত আছে। সুতরাং নারী পুরুষের পারস্পরিক অধিকার কারো একার নয়। দুজনেরই সমান। নর নারীর মধুর সম্পর্কের একটি সুন্দর কথা বলে গিয়েছেন  আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, 

'নর বাহে হল, নারী বহে জল,  সেই জল-মাটি   মিশে
ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।'

আরো  বলা যায়, 
'নারীর  বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি প্রাণ
যতকথা তার হইলো কবিতা, শব্দ হইলো গান।'

এই চমৎকার কথাগুলো শুনলে পরান জুড়িয়ে যায় । মনে হয় দুনিয়াতে এর চাইতে মহৎ ও সুন্দর আর কিছুই নেই। স্বর্গ যেন আমাদের কুঁড়ে ঘরে এসে ঠাই নেয় । তবে পুরুষ কর্তৃক নারী যে নির্যাতিত হচ্ছে না তা নয়। শিক্ষিত, অশিক্ষিত নির্বিশেষে মেয়েরা অত্যাচারিত  হচ্ছে।  যেখানে ভালবাসা নেই, স্নেহ মমতা অনুপস্থিত, সেখানে নারী অবশ্যই নির্যাতিত।  নির্যাতনের বা পীড়ণের অন্য একটি দিক আছে। সেটি হচ্ছে, যে সবল সে দুর্বলকে কষ্ট দেয়। দেখা যায় দুর্বল সর্বদাই নিপীড়িত, অত্যাচারিত। এমনকি নারীরা যে ক্ষেত্রে সবল, সেখানে দুর্বল পুরুষ বা দুর্বল মেয়ে, অল্প বয়স্করা অথবা গৃহে কর্তব্যরত গৃহ কর্মীরাও  অত্যাচারিত হচ্ছে। সুতরাং পুরুষ মাত্রেই যে নারীকে নির্যাতন করছে তা নয়।  তাই সবচেয়ে বড়  কথা নারীকে যোগ্য হতে হবে। তাকে অবলা হয়ে ঘরে বসে স্বামীর পায়ের নীচে বেহেশতের সন্ধান করলে চলবে না। তাকে মানুষ হতে হবে। কিন্তু কে নেবে সেই ভার, সেই গুরুদায়িত্ব তাকে মানুষ করে তুলবার? এর উত্তর হল শিক্ষা। 

শিক্ষাই একমাত্রও শক্তি যা মানুষকে মনুষ্যত্ব এবং যোগ্যতা দিতে সক্ষম। মেয়েরা যদি শিক্ষিত হয় তবেই তারা তাদের অধিকার স¤\^ন্ধে সচেতন হবে। তাকে মানুষের  যোগ্যতা অর্জন করতে গিয়ে জানতে হবে তার কর্তব্য কি, দায়িত্ব কি। যদি কর্তব্যজ্ঞান তার ভিতর না জাগ্রত হয়, তবে অধিকার সচেতন নারী ঘরে ঘরে কলহ বিবাদের সূত্রপাত ঘটাবে। সেজন্য দেশের সরকারকে নাগরিকদের সুশিক্ষার ভার নিতে হবে। তাহলেই  পুরুষ ও রমণী সুশিক্ষিত হয়ে নিজের নিজের অবস্থান দৃঢ় ও সুন্দর করতে সক্ষম হবে। শিক্ষিত পুরুষ, নারীকে নির্যাতন করা থেকে বিরত থাকবে। 

ধরে নিই যে সব পুরুষ অত্যাচারী।  তাই তাদের সংস্পর্শ সযত্নে পরিহার করা উচিত। অথবা যদি বলা হয়, 'ওহে সতী সাধ্বী নারী সমাজ, তোমরা পুরুষের নির্যাতনের শিকার  হয়ো না, তাদের পরিত্যাগ করো, নিজেরা  আত্মমর্যাদার অধিকারী হও', তাহলে অবস্থা কি দাঁড়াবে? উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত পৃথিবী নামক গোটা গ্রহটি মহিলাদের ক্রুদ্ধ পদাঘাতে প্রকম্পিত হবে। তারা যে ধর্মের বা যে বর্ণেরই হোক না কেন সকলে একযোগে বিদ্রোহ  করবে, মিছিল করবে, শ্লোগান দেবে, অনশন পর্যন্ত করবে। এমনকি বরফের ঘরে বাস  করে যে এস্কিমো নারী, তারাও অনশন থেকে বাদ যাবে না। তারপর নারীকুল বলবে, 'আমরা একা বাঁচতে চাই না, আমরা পুরুষের সংস্পর্শে বাঁচতে চাই। পুরুষ বিনে জীবন প্রাণহীন দেহের মতোই মূল্যহীন । আমাদেরে পরম প্রিয় পিতা, ভ্রাতা, পতি ও পুত্রকে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিও না।' অন্যদিকে যদি পুরুষকুলকে বলা হয়, 'ওহে পুরুষ প্রবর, তোমরা রাফ্ , তোমারা টাফ্। তোমরা জুলুমকারী, আর তারা শস্যক্ষেত্র নয়, তাদের কাছে যেও না, তাদেরকে মুক্তি দাও।' যদি পুরুষেরা সুবোধ বালকের মত এসব বাণী মেনেও  চলে তবে কি হবে? ঠিক সেই  মুহূর্ত থেকে দুনিয়াতে প্রলয় শুরু হবে। বিধাতার  সৃষ্টি  স্তব্ধ হবে। সেদিন যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হবে সে হবে এ ধরিত্রীর শেষ মানব সন্তান। সেসময় থেকে শতকরা পঁচিশ ভাগ মানুষ, যাদের বয়স পঞ্চাশের বেশী তারা আগামী পঁচিশ বছরেরে মধ্যে এ ধরণীর মায়া ত্যাগ করে মারা যাবে। তারপরে পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছরের মধ্যে আরও পঞ্চাশ ভাগ মানুষ শুধু বয়সের কারণে নয় অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারণে মারা যাবে।   ততদিনে মানব সম্পদ কমে আসবে। অরণ্য সম্পদ বৃদ্ধি পাবে। ভূপৃষ্ঠ অনাবাদী জমিতে পরিণত হবে। সভ্যতার কর্ণধার এই মানবজাতির সংখ্যা নগণ্য হতে হতে যান্ত্রিক সভ্যতা বিকল হয়ে পড়বে। শস্য উৎপাদনের জন্য সক্ষম পুরুষেরা বৃদ্ধ হবে। নগর সভ্যতা পরিচর্যার অভাবে অকার্যকর হবে। পানি, বিদ্যুত ,গ্যাস, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, শিক্ষা মুখ থুবড়ে পড়বে। যে মানব গোষ্ঠী কৃষ্টি ও সভ্যতাকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় তার জন্ম রহিত হবে। তাদের কাজ আর কে করবে? বনজঙ্গল জনপদ গ্রাস করবে। যে কয়জন নারী পুরুষ চরম ঘোষণার শেষদিনে জন্মগ্রহণ করেছিল, তারা যদি শতবর্ষের পরমায়ু নিয়েও জন্মায় তবুও তারা বাঁচতে পারবে না। জীবন ধারণের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে। জরা, ব্যাধি ও  মৃত্যু তাদের নিকটবর্তী হবে। 

মানুষ অরণ্য থেকে সভ্যতায় উত্থান লাভ করতে পারে, কিন্তু সভ্যতা থেকে বের হয়ে অরণ্যে বাঁচতে পারে না। তাই পুরুষ রমণীর সেই ভাল থাকার 'সারমান' বা বাণী ঘোষণার পর থেকে সত্তর পঁচাত্তর বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জীব মানবজাতি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। 'দাও ফিরে সে অরণ্য, লহো এ নগর' -রবিঠাকুরের সেই প্রার্থনা বাস্তবে পরিণত  হবে। সৃষ্টির আদিযুগের মত পৃথিবী গভীর অরণ্যে পরিণত হবে। জীবজন্তুর পদচারণায় বনভূমি মর্মর ধ্বনিতে ভরে উঠবে। পাখির কণ্ঠে প্রভুর জয়গানে অরণ্য মুখরিত হবে। নদীর কলোচ্ছাস বহুদূর হতে শোনা যাবে। যদিও নদীর কলগান শোনার জন্য কেউ কান পেতে থাকবে না। মনুষ্যবিহীন পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। প্রতিদিন সূর্যোদয়  হবে। পশ্চিমাকাশ লালিমায় ঢেলে দিয়ে সূর্য অস্তও  যাবে। বাংলার ছয় ঋতুর পরিক্রমা কাউকে পুলকিত করবে না। কেউ দুঃখ পাবে না, কেউ হাসবে না, কেউ কাঁদবে না। কেউ কবিতা লিখবে না , গান গাইবে না, কেউ আর আনন্দ করবে না। কেউ আর  ভালবাসবে না। নারীকে  আর নির্যাতনের প্রশ্নই উঠবে না। সব শেষ - সব শান্ত।  

1 comment:

  1. সাহিত্য পর্যালোচনা

    বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণ:
    “অনাদি কালের স্রোতে” গল্পটি মানুষের আদি ও চিরন্তন বিষয়—নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, তাদের সামাজিক অবস্থান, নির্ভরতাবোধ এবং সভ্যতার উদ্ভব ও বিকাশকে কেন্দ্র করে রচিত। লেখক মানবসভ্যতার শুরুর দিক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত নারী ও পুরুষের ভূমিকা, পারস্পরিক নির্ভরতা, ভালোবাসা, সংগ্রাম এবং সামাজিক রীতিনীতির (বিশেষত বিয়ের প্রথা) সাংস্কৃতিক প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরেছেন। গল্পের শেষাংশে নারী-পুরুষের বিচ্ছিন্নতার পরিণতি তুলে ধরে মানবসভ্যতার অন্তিম দশার কল্পনা করা হয়েছে।

    ভাষা ও শৈলী:
    গল্পটি সহজ, প্রাঞ্জল ও আবেগঘন ভাষায় লেখা। বর্ণনা রূপক ও উপমায় সমৃদ্ধ—যেমন, “নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল-মাটি মিশে ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।” কবি নজরুলের উক্তি ও রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি গল্পের সাহিত্যিক সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। লেখক গল্পের মধ্যে যুক্তি, উদাহরণ এবং কল্পনা—সবকিছুর ভারসাম্য রক্ষা করেছেন। বিশেষ করে আদিম যুগের প্রেক্ষাপট থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নারী-পুরুষের সম্পর্কের রূপান্তর খুব স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

    মূল বার্তা ও দর্শন:
    গল্পটি মূলত নারী-পুরুষের পারস্পরিক নির্ভরতা, পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাকে প্রতিষ্ঠা করেছে। লেখক দেখিয়েছেন, নারী ও পুরুষ—উভয়ের অবদানেই মানবসভ্যতা গড়ে উঠেছে। কোনো একক লিঙ্গের একাধিপত্য বা বিচ্ছিন্নতা সভ্যতা ও মানবজাতির সংকট ডেকে আনতে পারে। গল্পে নারীকে “গৃহলক্ষ্মী”, “গৃহকর্ত্রী” হিসেবে সম্মান দেখানো হয়েছে, আবার পুরুষের শক্তি ও দায়িত্ববোধকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো একপক্ষের নিপীড়ন বা নির্যাতনকে লেখক সমর্থন করেননি; বরং নারী-পুরুষের সমান অধিকার, সম্মান ও শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। শিক্ষা, দায়িত্ববোধ, ও পারস্পরিক ভালোবাসা—এই তিনটি মূলমন্ত্রকে লেখক সভ্যতার স্থায়িত্ব ও অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য বলে মনে করেছেন।

    সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক দিক:
    গল্পটিতে সমাজ ও মানসিকতার গভীর বিশ্লেষণ রয়েছে। নারী-পুরুষের সম্পর্ককে শুধু জৈবিক বা সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বন্দি না রেখে লেখক তাদের মানসিক, আবেগগত ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্রের কথা বলেছেন। বিশেষত, নারী-পুরুষ ছাড়া সমাজ অচল—এই দৃষ্টিভঙ্গি গল্পের প্রধান দর্শন। লেখক দেখিয়েছেন, মানুষ একা নয়, পুরুষ ও নারী—দুজনের মিলিত চেষ্টাতেই সভ্যতা টিকে থাকে। বিচ্ছিন্নতার কল্পনা দিয়ে তিনি মানবজাতির অস্তিত্ব সংকটের ভয়াবহতা উপলব্ধি করিয়েছেন।

    সমালোচনামূলক দিক:
    গল্পটিতে কিছু প্রচলিত সামাজিক ধারণা যেমন—পুরুষের শক্তি, নারীর কোমলতা, গৃহবন্দি নারীর জ্ঞানহীনতা ইত্যাদি বারবার এসেছে, যা কিছুটা একপেশে বা লিঙ্গ-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ রাখতে পারে। তবে লেখক শেষ পর্যন্ত নারী-পুরুষের সমতা ও শিক্ষার গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

    উপসংহার:
    “অনাদি কালের স্রোতে” গল্পটি নারী-পুরুষের চিরন্তন সম্পর্ক, পারস্পরিক নির্ভরতা ও ভালোবাসার অপরিহার্যতাকে দার্শনিক ও সাহিত্যিক দৃষ্টিতে উপস্থাপিত করেছে। এটি শুধু একটি আখ্যান নয়, বরং সভ্যতার ভিত্তি, সামাজিক মূল্যবোধ, এবং মানবিকতার এক অনন্য দলিল। গল্পটি পাঠককে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে—সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে নারী-পুরুষ উভয়েরই সমান অবদান ও মর্যাদা অপরিহার্য।

    ReplyDelete