Tuesday, July 20, 2021

মৃত্যুর মুখোমুখি

হঠাৎ সংবাদ প্রচার হল চীন দেশে এক ভয়ংকর রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, যা দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। আমরা এতটা  উৎকন্ঠিত হইনি তখনো। তবে পর্যবেক্ষণ করছি তার গতিবিধি। খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলীয় দেশ সমূহে। দেখতে দেখতে উত্তর কোরিয়া পেরিয়ে খোদ আমেরিকায় তার প্রবেশ। তখন আমাদের টনক নড়ে, আতঙ্কিত হই। বিপুল সংখ্যক মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। ধনী, নির্ধন, ছোট,বড়, কালো, সাদা কোন ভেদাভেদ নাই। সে এক মারাত্মক রোগ, নাম তার করোনা ভাইরাস – ভয়ংকর রুদ্র রূপ ধারণ করেছে।  অসংখ্য লোক মৃত্যু মুখে পতিত হচ্ছে। সৎকার করবার কেউ নেই। জীবিতের সংখ্যার চাইতে মৃতের সংখ্যাই বেশি। পৃথিবীর মানুষেরা সব গৃহবন্দি। তবুও কোন ফাঁক ফোকড় দিয়ে যেন মানুষের নাসারন্ধ্রে যেন ভাইরাসটি প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য নানাপ্রকার উপায় আবিষ্কার করার চেষ্টা চলছে।এরকম দুঃসময়ে ২০২১ সালে আমরা পুরো পরিবার আক্রান্ত হই।করোনা ভাইরাস সনাক্ত হওয়ার সাথে সাথে হাসপাতালে আশ্রয় গ্রহণ করি। চিকিৎসকগণ তাদের সাধ্যমত চেষ্টায় নিয়োজিত হন। তা সত্ত্বেও দ্রুত ভয়ানক অবস্থায় পতিত হই। মাঝে মাঝে ঘোরের মাঝে চলে যাই। এরকম অবস্থায় একদিন আমি দেখতে পাই রুমের ফ্লোরে শুয়ে আছি। ফ্লোরটি লাল রঙের এবং সেটি ঘুরছে ধীরে ধীরে। আমি সটান লম্বা হয়ে শীতল মেঝেতে শয়ান। আমার শিয়রের কাছে মস্তক বরাবর একটি গর্ত – একজন মানুষ ঢুকতে পারে এরকম। গর্তটি মাটির তৈরী – কালচে রঙ। এব্‌ড়ো থেব্‌ড়ো, মসৃন নয়। আমাকে নিয়ে লাল রঙের ফ্লোরটি ধীরে ধীরে ঘুরছিল। আমার মাথাটিও ঐ গর্তের মধ্যে ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছিল। আমার কোন কষ্ট হচ্ছিল না। এভাবে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে আমার মাথাটি বুক পর্যন্ত অন্ধকার গুহায় প্রবেশ করলো। কিন্তু তাতেও আমার কোন কষ্ট হচ্ছিল না। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে আমি মারা যাচ্ছি। ভাবলাম মৃত্যুর কষ্ট তো অনুভূত হচ্ছে না। এ কেমন মৃত্যু –যন্ত্রণা নেই, কষ্ট নেই। মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় কেন? জীবন আর মৃত্যু তো একইরকম। ভাবনাটা আমার এমন ছিল যে, মৃত্যু কোন আতঙ্কের ঘটনা নয়। জীবন যেমন স্বাভাবিক ছিল, মৃত্যুও তেমনি ‘শান্ত চরণে’ আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি আরামেই ঐ কৃষ্ণ অমসৃণ গহ্বরে প্রবেশ করছি। আমাকে বহনকারী লাল মঞ্চটি ঘুরে চলেছে গর্তটিকে সঙ্গে নিয়ে। একটা প্রশান্তির অনুভব। আমি একা। আমার বলার কিছু নেই। কেবল মনে হচ্ছিল শরীরের সবটুকু একবার পিছলে এই গভীর গহ্বরে পড়ে যাবে। তবুও দুঃখ নেই। শুধু একটি মাত্র কথাই মনে পড়ছিল যে, জীবন মৃত্যু একই সমান্তরালে অবস্থিত। জীবনও সুন্দর। মৃত্যুও সুন্দর।

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দেখি লাল মঞ্চটি এবার আমাকে নিয়ে উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করেছে। গতি আগের মতই মন্থর। আমার শরীর ঐ আঁধার গুহা থেকে উপরের দিকে উঠে আসতে শুরু করলো এবং আগের অবস্থায় ফিরে এলো। মাথার পাশের সেই গর্তটি তখনও দেখা যাচ্ছে। আবার কেন ফিরে আসা? সেই তো ছিল ভাল – মৃত্যুর হিম শীতল পরশখানি। কতক্ষণ এভাবে ছিলাম জানা নেই। লাল ফ্লোরটি তখনও ঘুরে চলেছে। আমি শোয়া অবস্থায়। এমন সময়ে শুনতে পেলাম কারা যেন আমেকে ডাকছে মৃদু স্বরে,

– ‘শুনতে পাচ্ছেন? চোখ খুলুন। কথা বলুন।’

চোখ খোলার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। কথা বলার চেষ্টা করলাম। এবারও ব্যর্থ। আরো মানুষের কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। ধীরে ধীরে আমার নয়ন দুটি একটু উন্মীলিত হলো। দেখি অনেক মুখ আমার মুখের উপর ঝুঁকে আছে। বড় ব্যাকুল আর উদ্বিগ্ন। আমি বিছানায় – বেডে। এতক্ষণ আমার চোখ আসলে বন্ধ ছিল। যদিও আমি সব দেখতে পাচ্ছিলাম বলে মনে হচ্ছিল।

এই আমার স্বপ্নের মত মৃত্যুর দুয়ার হতে ফিরে আসা। সেই দৃশ্যটি আমার অজান্তে ঘটেছিল। তবুও মনে হয় সত্যিই ঘটেছিল।   

…………

জুলাই ২১, ২০২১


Friday, May 28, 2021

কবিতা - 'করোনা' সমাচার

 কোথায় আল্লাহ্,কোথায় যীশু,

        কোথায় ভগবান?

কোথায় খোদা,কোথায় স্রষ্টা 

        কোথায় শয়তান?

কোথায় ইবলিশ,কোথায় নমরুদ

        কোথায় কামান,কোথায় বারুদ!

কোথায় জ্বীন,কোথায় পরী?

        কোথায় বাদশাহ্,কোথায় সম্রাট?

কোথায় কালাপাহাড়,কোথায় লুকিয়ে 

              বিখ্যাত চেঙ্গিস!

কেউ কি পারে না করতে বিনাশ 

            কভিড ১৯-বিশ?

কোথায় ফেরেশতা,জ্বীনের বাদশাহ্

         কাজ করে কিছু দেখাও তোমরা 

            হাজার বছরের প্রতি –শ্রুত সুরক্ষা।

কেউ আছে কি –

        কেউ কি আদৌ 

              ছিল কোনদিন?

সবদিকে চেয়ে,দেখি আজ যেন

          ব্যর্থ ট্রাম্প ও পুতিন।

নির্মম ভারী,নিষ্ঠুর মারি, 

        বড়ই কঠোর,বড়ই কঠিন, 

সুচতুর তারা আনতে ব্যস্ত  

        ফলস্ ভ্যাকসিন। 

কেউ থাকবেনা আর অসহায়,মানুষের পাশে দাঁড়াবার।                             

          চারিদিকে কেবলই মৃত্যুর হাহাকার!

কেউ নেই কোনখানে,

       কেউ ছিলনা 

          কখনো কোনদিন

শুধু আছে প্যানডেমিক

        বধিবারে প্রাণ,নির্বিঘ্নে নিশ্চিত।

করোনার করুণা চেয়ে 

        লাভ নেই আর,

        মৃত্যুর আঁধার ঢাকে চারিধার।

বিধাতার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ

        আশরাফুল মখলুকাত, 

             হতবাক আজ ! 

তাদের পৃথিবী কেড়ে নিল কারা –

             কোন মহারাজ?

এই ধ্বংসের জবাব 

        জানা নেই কারো আজ

বড়ই নির্মম,বড়ই নিঠুর,বড়ই নিলাজ,

উন্মত্ত নৃত্যে মত্ত আজিকে আজরাইল 

                   যমরাজ।

‘করোনা কভিড’ হবে সেই দিন শান্ত

রইবেনা যখন এ গ্রহে 

       একটি মানুষও জীবন্ত।


২৮শে মে, ২০২১


Friday, April 16, 2021

কবিতা - কোভিড 19

 এসেছ করোনা ভাই রুদ্র বেশ ধরি

 কেন এত ত্বরা তব, কেন কড়াকড়ি 

ধরায় ফেলিছ জাল টর্নেডোর বেগে 

বধিছ সৃষ্টির সেরা মানবেরে  

কঠোর আবেগে। 

কেন এত ক্রোধ, কেন এত দ্রোহ 

মানব জাতির পরে। 

নিঠুর নির্মমতা দূর করে আন আনুরাগ 

মানুষ জাতিরে করো ক্ষমা, ওগো ভাইরাস। 

ত্যাগ করো ক্রোধ, হে রুদ্র ‘করোনা’ 

বাঁচাও মনুষ্য জাতি, করোনা বঞ্চনা।   


মুখ তুলে চেয়ে দেখ এই সুন্দর পৃথ্বি 

রোদ্র ঝলমল, আকাশ বাতাস, সবুজ বনবীথি। 

মানবজাতির কীর্তি যত, বিধাতার ইঙ্গিত 

তুমিও করো না ভাই , ধরো সুখ সঙ্গীত। 

বাঁচাও মনুষ্য প্রাণ, বাঁচাও জল স্থল অন্তরীক্ষ 

এবার ঘুরে দেখ সৃষ্টির সেরা মানুষের দুঃখ।   


হে নীরব ঘাতক ‘করোনা’, কোরো না বিনাশ 

এবার ফিরে যাও তুমি, যেথা তব বাস। 

আর ফেলিও না জাল, আর বধিও না প্রাণ 

বিধাতার কাছে এই মোর চাওয়া  

প্রাণ খুলে করি তার ধ্যান।


৩রা বৈশাখ, ১৪২৭
১৬.০৪.২০২১

Saturday, March 20, 2021

স্বপ্নের শবাধার - ফিরোজা হারুন

 ১. কবিতা পর্যালোচনাঃ

“স্বপ্নের শবাধার” একটি গভীর ভাবনাসমৃদ্ধ এবং চিত্রকল্পে পরিপূর্ণ আধুনিক বাংলা কবিতা। কবিতাটি মূলত স্বপ্ন, আত্মচেতনা, এবং জীবনের অন্তর্নিহিত সংকটকে উপজীব্য করেছে। কবি স্বপ্নের ভেতর এক রহস্যময় ও প্রতীকধর্মী যাত্রার চিত্র এঁকেছেন, যেখানে চাঁদের আলো, শবাধার, ও আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব মিলেমিশে গেছে।
 
ভাব ও বিষয়
কবিতার শুরুতে কবি স্বপ্নে ডাক শুনে জেগে ওঠেন—রাতের শেষে, চাঁদের নরম আলোয় ভেসে থাকা এক অদ্ভুত পরিবেশে। এই পরিবেশে ‘শবাধার’ বহনকারী এক পথিকের আবির্ভাব হয়, যার পরিচয় নিয়ে কবির মনে দ্বিধা ও কৌতূহল জন্মায়। শুভ্র চাঁদনি রাত, নিস্তব্ধ প্রকৃতি, আর সাদা শবাধারের উপস্থিতি কবিতাটিকে অলৌকিক এবং গা ছমছমে আবহ দেয়।
 
প্রতীক ও চিত্রকল্প
‘শবাধার’ এখানে জীবন-মৃত্যুর চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কবি যখন শবাধারের মুখাবয়ব দেখার সুযোগ পান না, তখন তা এক অজানা ভবিষ্যৎ বা নিজের অজানা দিককেই ইঙ্গিত করে। কিন্তু শেষে, শবাধার খুলে দেখা যায়, সেখানে চেনা মুখ—নিজের মুখ। এখানেই কবিতার গভীরতা ও দর্শন নিহিত। কবি বুঝতে পারেন, তিনি নিজেই নিজের শবাধার বহন করছেন—অর্থাৎ প্রতিটি মানুষ নিজের জীবন ও মৃত্যুর ভার নিজেই বহন করে চলে।

 ভাষা ও কাঠামো
কবিতার ভাষা সহজ, সুরেলা এবং বিমূর্ততায় ভরা। শব্দচয়ন ও বাক্যের গঠন কবিতার রহস্যময় আবহকে আরও তীব্র করেছে। চাঁদের আলো ও সাদা শবাধার বারবার ফিরে এসে একধরনের ঐক্যতান সৃষ্টি করেছে, যা স্বপ্ন ও বাস্তবতার সীমারেখাকে ঝাপসা করে দেয়।

 দার্শনিক তাৎপর্য
শেষ অংশে “আমিই তুমি, তুমি যে আমি”—এই উপলব্ধি আত্মপরিচয়ের গভীর সংকট ও দর্শনের কথা বলে। কবি উপলব্ধি করেন, মানুষের জীবনের যাত্রা আসলে নিজের মধ্যেই ঘুরে ফিরে আসে। মৃত্যু ও জীবন, সুখ ও দুঃখ—সবকিছুরই ভার সে নিজেই বহন করে।

 উপসংহার

“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটি গভীর দর্শন, চিত্রকল্প এবং আত্মসংকটের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এটি পাঠকের চিন্তাজগতে নাড়া দেয় এবং আত্মঅনুসন্ধানের পথ দেখায়। কবিতার প্রতিটি স্তবক পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগায়—কে আমি? কোথায় যাচ্ছি?—এবং সেই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানের ইঙ্গিত দেয়। এ কারণেই কবিতাটি সমসাময়িক বাংলা কবিতার ধারায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

*****

২. “স্বপ্নের শবাধার” কবিতার বিশ্লেষণঃ

“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটি রহস্যময়, গভীর দর্শন ও আত্মঅনুসন্ধানমূলক এক অনবদ্য আধুনিক কবিতা। এতে কবি স্বপ্ন, মৃত্যু, আত্মপরিচয় এবং জীবনের অন্তর্যাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং চিত্রকল্পের মাধ্যমে পাঠককে এক অন্যতর জগতে নিয়ে গেছেন।

 কবিতার প্রধান ভাব
কবিতার শুরুতেই দেখা যায়, কবি স্বপ্ন দেখছেন—রাতের শেষে কেউ যেন তাঁকে ডাকছে। নরম চাঁদের আলোয় চারপাশের কালো অন্ধকার দূর হয়ে গেছে। এই পরিবেশে একজন পথিকের আবির্ভাব, যার পিঠে রয়েছে সাদা শবাধার। এখানে ‘শবাধার’ বা কফিন প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—এটি স্বপ্ন, জীবন কিংবা অতীতের স্মৃতি বহনের প্রতীক।

 প্রতীক ও চিত্রকল্প
“সাদা শবাধার”, “শুভ্র চাঁদনী রাত”, “নিস্তব্ধ চারিধার”—এসব চিত্রকল্প কবিতার আবহে রহস্য ও বিষণ্ণতা এনেছে। যখন কবি পথিককে প্রশ্ন করেন, সে কোথায় যাচ্ছে, কী নিয়ে যাচ্ছে—তখন উত্তর আসে, “উন্মুক্ত করিয়া দেখ কে যায় কোথায়!” এরপর দেখা যায়, শবাধারের ভেতরে শুয়ে আছে চেনা মুখ—নিজের মুখ। এখানে কবি উপলব্ধি করেন, তিনি নিজেই নিজের শবাধার বহন করছেন; অর্থাৎ মানুষ নিজের স্বপ্ন, বেদনা, সুখ-দুঃখ, জীবন-মৃত্যুর ভার নিজেই বহন করে বেড়ায়।

 ভাষা ও কাঠামো
কবিতার ভাষা সরল, সুরেলা এবং বর্ণনামূলক। “চাঁদের আলো”, “সাদা শবাধার”, “নিস্তব্ধ চারিধার” শব্দগুচ্ছ কবিতাটিকে এক অলৌকিক পরিবেশে নিয়ে যায়। কবিতার ছন্দ ধীর, যেন গভীর রাতে স্বপ্নের মতোই নিস্তব্ধ এবং রহস্যময়।

 দর্শন ও তাৎপর্য
শেষ স্তবকে কবি উপলব্ধি করেন—“আমিই তুমি, তুমি যে আমি”—এটি আত্মপরিচয়ের গভীর সংকট ও উপলব্ধিকে প্রকাশ করে। জীবন-জগতের প্রত্যেকটি মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজেরই ছায়া, নিজের স্মৃতি, স্বপ্ন ও বেদনাকে বহন করে চলে। স্বপ্নের শবাধার বহন মানে, নিজের অতীত ও আত্মপরিচয়কে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলা।

 উপসংহার
“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটি পাঠককে স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংযোগস্থলে দাঁড় করিয়ে দেয়। এটি আত্ম-অনুসন্ধান, বেদনাবোধ এবং জীবনের অন্তর্গত রহস্যকে তুলে ধরে। কবিতার গভীরতা, প্রতীকী ভাষা ও চিত্রকল্প পাঠককে ভাবনার গভীরে ডুবিয়ে দেয় এবং জীবনের মৌল সত্যের মুখোমুখি করে তোলে।

এ কারণেই কবিতাটি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান পায়।

*****

৩. কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্যঃ

“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ও বহুমাত্রিক। নিচে বিভিন্ন দিক থেকে এর দার্শনিক তাৎপর্যের বিশ্লেষণ প্রদান করা হলো—

 ১. আত্ম-অনুসন্ধান ও আত্মপরিচয়
এই কবিতার কেন্দ্রীয় দর্শন হলো আত্ম-অনুসন্ধান। কবিতার শেষ অংশে যখন কবি আবিষ্কার করেন, শবাধারের ভেতরে শায়িত মুখটি আসলে নিজেরই মুখ—তখন তিনি উপলব্ধি করেন, মানুষ সারাজীবন নিজের অস্তিত্ব, পরিচয়, এবং অন্তর্নিহিত সত্যকে খুঁজে ফেরে।
“আমিই তুমি, তুমি যে আমি, চিনিলে না মোরে?” —এটি আত্মপরিচয়ের সংকট ও চরম উপলব্ধিকে প্রকাশ করে। এখানে কবি দেখান, নিজের ভেতরেই রয়েছে চরম সত্য—শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজের কাছেই ফিরে আসে।

 ২. জীবন-মৃত্যুর দর্শন
‘শবাধার’ বা কফিন এখানে শুধু মৃত্যুর প্রতীক নয়; এটি মানবজীবনের নানা স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি, এবং ব্যর্থতাও বহন করে। কবিতায় স্বপ্ন ও মৃত্যুর ছায়া একাকার হয়ে গেছে।
কবি দেখান,  যে স্বপ্নগুলো একসময় প্রাণবন্ত ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা মরে যায়
মানুষ নিজের অতীত, ব্যর্থতা, স্বপ্নভঙ্গ, এবং অবচেতনের ভার নিজের মধ্যেই বহন করে
এভাবে জীবন ও মৃত্যু, সৃষ্টি ও বিলয়, স্বপ্ন ও ভাঙন—সবই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

৩. স্বপ্ন ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
কবিতার শুরুতেই স্বপ্নের প্রসঙ্গ এসেছে—“স্বপন দেখিনু এক”—এটি মানুষের মনের গোপন আকাঙ্ক্ষা ও অজানার প্রতি টানকে বোঝায়। কিন্তু স্বপ্ন দেখা ও স্বপ্ন ভঙ্গ, এই দুইয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্বও এখানে স্পষ্ট।
চাঁদের আলোয় অন্ধকার দূর হলেও, সেই আলোয় দেখা যায় শবাধার—স্বপ্নের মৃত্যু বা অবসানের চিহ্ন।
তবে শেষ পর্যন্ত, যারা স্বপ্ন দেখে, তারাই সেই স্বপ্নের ভারও বইতে বাধ্য হয়।

 ৪. অস্তিত্ববাদী (Existential) ভাবনা
এই কবিতায় রয়েছে গভীর অস্তিত্ববাদী দর্শন।
 মানুষ কে?
সে কোথা থেকে এলো, কোথায় যাচ্ছে?
তার জীবনের অর্থ কী?
কবিতার প্রশ্ন—“কে তুমি? / কেন তারে নিয়ে যাও কোন সুদূরে?”—এই অস্তিত্ববাদী সংকটকে তুলে ধরে।
শেষ পর্যন্ত, কবি আবিষ্কার করেন, সে নিজেই নিজের শবাধার বহন করছে, নিজেই নিজের মৃত্যু ও অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

৫. সময় ও অনিত্যতার উপলব্ধি
কবিতায় সময়ের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং জীবনের অনিত্যতা স্পষ্ট।
শবাধার বহন, চেনা মুখের মৃত্যু, অস্তাচলের দেশে যাত্রা—এসব ইঙ্গিত দেয়, জীবন আসলে ক্ষণিক, সবকিছু একদিন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু শেষ হওয়া মানেই শূন্যতা নয়—বরং, আত্মপরিচয়ের এক নতুন স্তরে পৌঁছানো।

৬.উপসংহার
“স্বপ্নের শবাধার” কবিতার দার্শনিক তাৎপর্য এই যে,
মানুষ নিজের স্বপ্ন, স্মৃতি, বেদনা, এবং চরম সত্যের ভার নিজেই বহন করে চলে। জীবনের অর্থ, পরিচয়, মৃত্যু—সবকিছুর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে সে একসময় আবিষ্কার করে, নিজেই তার চরম সত্য ও চূড়ান্ত গন্তব্য।

এই উপলব্ধি কবিতাটিকে শুধু ব্যক্তিগত নয়, বিশ্বজনীন এক দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে যায়।

*****

৪. পঙতি বিশ্লেষণঃ

'আমার শব,আমিই বইছি,
অস্তাচলের দেশে।'
 
“আমার শব, আমিই বইছি,
অস্তাচলের দেশে।” — এই দুটি পঙ্‌ক্তি “স্বপ্নের শবাধার” কবিতার অন্যতম গভীর ও দার্শনিক অংশ। নিচে এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলোঃ

 ১. আত্মপরিচয় ও আত্মবহন
এখানে কবি উপলব্ধি করেন, শবাধারে শায়িত মৃতদেহটি আসলে তাঁর নিজেরই। অর্থাৎ, মানুষের জীবনের সমস্ত আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন-ভঙ্গ, সাফল্য-ব্যর্থতা — সবকিছুর ভার সে নিজেই বহন করে।
“আমার শব, আমিই বইছি”— এই কথার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, প্রত্যেক মানুষ নিজের অতীত, স্মৃতি, অপরাধবোধ, ব্যর্থতা, স্বপ্নভঙ্গ, এমনকি নিজের মৃত্যু-চেতনা পর্যন্ত নিজের ভেতরেই বহন করে চলে।

 ২. অস্তিত্ববাদী সংকট
এখানে রয়েছে গভীর অস্তিত্ববাদী (existential) দর্শন। মানুষ নিজের সত্তা, তার সীমাবদ্ধতা এবং শেষ পরিণতির সঙ্গে সারাক্ষণ যুদ্ধ করে।
“শব” এখানে শুধু শারীরিক মৃত্যু নয়, বরং আত্মার মৃত অবস্থা, স্বপ্নের মৃত্যু, অথবা জীবনের নিরর্থকতা বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়েছে।
নিজের শব নিজে বহন করার মধ্য দিয়ে কবি বুঝিয়েছেন, প্রত্যেকের জীবন ও মৃত্যুর দায়, অর্থ এবং গন্তব্য সে নিজেই।

 ৩. অস্তাচলের দেশ
“অস্তাচল” মানে যেখানে সূর্য অস্ত যায়—অর্থাৎ, জীবনের শেষ প্রান্ত, মৃত্যুর দিকে যাত্রা।
এটি কেবল শারীরিক মৃত্যুর রূপক নয়, বরং জীবনের শেষপথ, স্বপ্নের অবসান, অথবা চরম সত্যের মুখোমুখি হওয়ার প্রতীক।
কবি দেখান, সময়ের প্রবাহে মানুষ একা, নিজের সমস্ত স্মৃতি, স্বপ্ন ও বেদনা নিয়ে নিঃসঙ্গভাবে অস্তাচলের দিকে এগিয়ে চলে।

 ৪. সারমর্ম
এই দুই পঙ্‌ক্তি মানুষের একাকীত্ব, আত্ম-অনুসন্ধান, এবং নিজের ভার নিজে বহনের চরম উপলব্ধি প্রকাশ করে।
এখানে কবি আমাদেরকে শেখান—জীবনের শেষ যাত্রায়, কেউ কারও ভার নেয় না; প্রত্যেকেই নিজের স্বপ্ন, ব্যর্থতা, এবং জীবনের শেষ সত্যকে নিজেই বহন করে, নিজেই চলে যায় অস্তিত্বর শেষ প্রান্তে।

 উপসংহার:
“আমার শব, আমিই বইছি, অস্তাচলের দেশে”—এই বাক্যে জীবনের অন্তিম উপলব্ধি, আত্মজ্ঞানের গভীরতা ও মানুষের চিরন্তন একাকীত্বের অনুভূতি এক অনবদ্য কবিত্বে প্রকাশ পেয়েছে।

*****
 

Wednesday, January 22, 2020

সাহিত্য ও শিল্পবোধ

 

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। স্বর্গ হতে বহিস্কৃত হয়ে আদম এই  বিশ্ব প্রকৃতিকে কেমন দেখেছিলেন জানি না তবে অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন তাতে  কোন সন্দেহ নেই। চারিদিকে সুন্দর আরে সুন্দরের সমারোহ। বৈচিত্র্যে ভরপুর। তারপর দেখা পেলেন হাওয়ার । হৃদয় মন আত্মা তার নেচে উঠেছিল আনন্দে।  তার হৃদয় নিঃসৃত শব্দ কালি – কলমে লেখা না হলেও , সেই আনন্দ নিঃসৃত বাক্যই সাহিত্য। সৌন্দর্য্য মিশ্রিত শব্দ বলেই সেটি সাহিত্য। ঐ সৌন্দর্য্য মিশ্রনই শিল্প। সেদিক থেকে কথাশিল্পী একজন সাহিত্যিক।

শিল্পবোধের স্থান মানুষের মনে। রসবোধ না থাকলে শিল্প সৃষ্টি হয় না।

ভাবনাকে ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে সঞ্চারিত করাই সাহিত্য চর্চা। মানুষ মাত্রেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখ ও সৌন্দর্য্যের অনুভূতির পরশ পায়। সেই অনুভূতির প্রকাশ করবার অভিলাষ তাদের আছে। কেউ কেউ অনায়াসে মনের ভাব সৌন্দর্য্য রসে জারিত করে প্রকাশ করে। অনেকেই সাধনা করে হৃদয়ের শিল্পমন্ডিত ভাব প্রকাশ করে । আমরা পাঠকগন সেই সব বাক্য বা সাহিত্য পাঠ করে  আমাদের অন্তরের না বলা কথার বহিঃপ্রকাশ দেখে আনন্দ লাভকরি।  নিজেকে নির্ভার মনে করি।

‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইলো না কেহ’। না শুধালেও আমরা সাহিত্যের মাধ্যমে সেই শৈল্পিক রসবোধের আস্বাদ পাই – তখন নিজেকে ধন্য মনে করি।  

মনে করি যা বলতে চেয়েছিলাম, তা এই সাহিত্যের মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে।

সাহিত্য বিশ্বের তাবৎ বিষয় নিয়ে লিখিত হয়। মানুষের জীবন বোধকে জাগ্রত করে। জীবনের মানকে উন্নত করে। মানুষকে অন্ধকার হতে আলোতে আনয়ন করে। তার জীবনকে ভালবাসার এবং ভাললাগার অংগনে নিয়ে যায়। জীবনে পুলক অনুভব করে আনন্দ পায় এবং অন্যকে সেই আনন্দ বিলিয়ে, নিজেকে পরিবারকে, সমাজকে সুখী ও কলষমুক্ত রাখে। সেই জন্য সাহিত্য চর্চার মূল্য বা দান অপরিসীম।

সাহিত্য একটি শিল্প। শিল্পবোধ জাগার ফলে মানুষের জীবন ছন্দময় হয়ে ওঠে। সাহিত্য সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে মানুষ নব নব সৃষ্টির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়।  তখন সে উপলব্ধি করতে পারে, ‘নাল্পে সুখনাস্তি’ – অল্পে সুখ নাই।

সাহিত্য চর্চা মানুষের নিত্যদিনের সংগী হোক । রাওয়া উদ্যোগে এই সাহিত্য সভা আরো সুন্দর হোক। সাহিত্য পাঠ করে জীবন আনন্দময় হোক - এই কামনা করি। 

০০০০০০০০

সাহিত্য একটি শিল্প। শিল্পবোধের স্থান মানুষের মনে। রসবোধ না থাকলে শিল্প সৃষ্টি হয় না। শিল্পবোধ জাগার ফলে মানুষের জীবন ছন্দময় হয়ে ওঠে। সাহিত্য সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে মানুষ নব নব সৃষ্টির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়। তখন সে উপলব্ধি করতে পারে, ‘নাল্পে সুখনাস্তি’ – অল্পে সুখ নাই।

ভাবনাকে ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে সঞ্চারিত করাই সাহিত্য চর্চা।

মানুষ মাত্রেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখ ও সৌন্দর্য্যের অনুভূতির পরশ পায়। সেই অনুভূতির প্রকাশ করবার অভিলাষ তাদের আছে। কেউ কেউ অনায়াসে মনের ভাব সৌন্দর্য্য রসে জারিত করে প্রকাশ করে। অনেকেই সাধনা করে হৃদয়ের শিল্পমন্ডিত ভাব প্রকাশ করে ।

আমরা পাঠকগন সেই সব বাক্য বা সাহিত্য পাঠ করে  আমাদের অন্তরের না বলা কথার বহিঃপ্রকাশ দেখে আনন্দ লাভকরি।  নিজেকে নির্ভার মনে করি।

সাহিত্য বিশ্বের তাবৎ বিষয় নিয়ে লিখিত হয়। মানুষের জীবন বোধকে জাগ্রত করে। জীবনের মানকে উন্নত করে। মানুষকে অন্ধকার হতে আলোতে আনয়ন করে। তার জীবনকে ভালবাসার এবং ভাললাগার অংগনে নিয়ে যায়। জীবনে পুলক অনুভব করে আনন্দ পায় এবং অন্যকে সেই আনন্দ বিলিয়ে, নিজেকে পরিবারকে, সমাজকে সুখী ও কলুষমুক্ত রাখে। সেই জন্য সাহিত্য চর্চার মূল্য  অপরিসীম।

সাহিত্য চর্চা মানুষের নিত্যদিনের সংগী হোক । রাওয়া উদ্যোগে এই সাহিত্য সভা আরো সুন্দর হোক।

সাহিত্য পাঠ করে জীবন আনন্দময় হোক - এই কামনা করি।  ধন্যবাদ।

0000000000000000000

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। স্বর্গ হতে বহিস্কৃত হয়ে আদম এই  বিশ্ব প্রকৃতিকে কেমন দেখেছিলেন জানি না তবে অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন তাতে  কোন সন্দেহ নেই। চারিদিকে সুন্দর আরে সুন্দরের সমারোহ। বৈচিত্র্যে ভরপুর। তারপর দেখা পেলেন হাওয়ার । হৃদয় মন আত্মা তার নেচে উঠেছিল আনন্দে।  তার হৃদয় নিঃসৃত সেই শব্দ এই শূন্য পৃথিবীতে  বলাকার গতির ঝংকারের মতো দিক থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই শব্দতরংগ ভাষা না হলেও , কালি কলমে লেখা না হলেও, তাই –ই সুর, তাই –ই আনন্দ, শিল্প এবং সাহিত্য । সেই সুরের ধ্বনি একদিন ভাষায় রূপ নেয়।

অযুত বরষের পরে আমরা মানুষেরা নানান ভাষায় কথা বলি, গান গাই, অলংকৃত করে সাহিত্যে রূপ দান করি।

 সাহিত্য কেবল কথার সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করা নয়, নান্দনিকতাই নয়, মানুষের জীবনবোধকে উপলব্ধি করা তার বিশেষ একটি দিক। সাহিত্যের প্রধান কাজ মানুষের আত্মাকে অজ্ঞানতার অন্ধকার হতে বাইরে বের করে আনা, তার উপলব্ধিকে জাগ্রত করা, ভালমন্দের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। মানুষকে সুন্দর এবং শান্তির স্বপ্ন দেখানো।

আজকের বিশ্ব যখন হতাশা, অস্থিরতা, অন্যায়, অবিচারে অশান্ত, তখন সাহিত্য  মানুষকে পথ দেখায়। মানুষের এই স্বপ্ন শান্তির পক্ষে, সুন্দরের পক্ষে, অসুন্দর এবং বিনাশের বিপক্ষে।

মানুষের অন্তর যখন দুঃখে কষ্টে বিষাদে ম্রিয়মান হয় তখন মানুষ আশ্রয় খোঁজে সাহিত্যে, সংগীতে এবং কবিতায়। সৌন্দর্য্য মিশ্রিত শব্দ বলেই সেটি সাহিত্য। ঐ সৌন্দর্য্য মিশ্রনই শিল্প। সেদিক থেকে কথাশিল্পী একজন সাহিত্যিক।

শিল্পবোধের স্থান মানুষের মনে। রসবোধ না থাকলে শিল্প সৃষ্টি হয় না। ভাবনাকে ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে সঞ্চারিত করাই সাহিত্য চর্চা। মানুষ মাত্রেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখ ও সৌন্দর্য্যের অনুভূতির পরশ পায়। সেই অনুভূতির প্রকাশ করবার অভিলাষ তাদের আছে। কেউ কেউ অনায়াসে মনের ভাব সৌন্দর্য্য রসে জারিত করে প্রকাশ করে। অনেকেই সাধনা করে হৃদয়ের শিল্পমন্ডিত ভাব প্রকাশ করেন । আমরা পাঠকগন, সেই সব বাক্য বা সাহিত্য পাঠ করে  আমাদের অন্তরের না বলা কথার বহিঃপ্রকাশ দেখে আনন্দ লাভকরি।  নিজেকে নির্ভার মনে করি।

‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইলো না কেহ’। না শুধালেও আমরা সাহিত্যের মাধ্যমে সেই শৈল্পিক রসবোধের আস্বাদ পাই – তখন নিজেকে ধন্য মনে করি। 

মনে করি যা বলতে চেয়েছিলাম, তা এই সাহিত্যের মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে।

সাহিত্য বিশ্বের তাবৎ বিষয় নিয়ে লিখিত হয়। মানুষের জীবন বোধকে জাগ্রত করে। জীবনের মানকে উন্নত করে। মানুষকে অন্ধকার হতে আলোতে আনয়ন করে। তার জীবনকে ভালবাসার এবং ভাললাগার অংগনে নিয়ে যায়। জীবনে পুলক অনুভব করে আনন্দ পায় এবং অন্যকে সেই আনন্দ বিলিয়ে, নিজেকে পরিবারকে, সমাজকে সুখী ও কলষমুক্ত রাখে। সেই জন্য সাহিত্য চর্চার মূল্য বা দান অপরিসীম।

সাহিত্য একটি শিল্প। শিল্পবোধ জাগার ফলে মানুষের জীবন ছন্দময় হয়ে ওঠে। সাহিত্য সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে মানুষ নব নব সৃষ্টির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়।  তখন সে উপলব্ধি করতে পারে, ‘নাল্পে সুখনাস্তি’ – অল্পে সুখ নাই।

সাহিত্য চর্চা মানুষের নিত্যদিনের সংগী হোক ।

মহাখালী DOHS COUNCIL এর উদ্যোগে এই সাহিত্য সভা আরো সুন্দর হোক।

সাহিত্য পাঠ করে জীবন আনন্দময় হোক - এই কামনা করি। 

ধন্যবাদ।

 

 

 

 

Friday, January 3, 2014

বেদনার কালিদহে

 রাস্তার পাশের বাড়িতে বসবাস করবার উপকারিতা আছে, মজাও আছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একই লোক একই  সময়ে ঐ রাস্তায় চলাচল করে। প্রায় প্রতিদিনই দেখতাম একটি লোক ধীরে ধীরে হেঁটে এসে রিক্সায় উঠতো। পরিধানে তার লাল কালো অথবা নীল রঙের পোশাক। আপাদমস্তক। অর্থাৎ তার লুংগি, কুর্তা, পাগড়ি একই রঙের। লম্বা, ফর্সা, বৃদ্ধ, শীর্ণকায়া লোকটি। দীর্ঘদিন একই দৃশ্য অন্তরে কৌতূহল জাগায়। একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে, সে একজন কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি। বহুকাল ধরে এই কবরস্থানের পাশে এই দীঘির ঘাটে বাস করে। দীঘির ঘাটটি শান বাঁধানো। গম্বুজ বিশিষ্ট একটি স্নানঘর আছে, সুদৃশ্য। বিরাট পুকুরটি অতীতের কোন ধনবান ব্যক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কেবল ঘাটই নয়, পুকুরটির চারপাশ নক্সা করা দেয়ালে ঘেরা –সুরক্ষিত ও বটে। পুকুরটির তিন দিকে কবরস্থান। সম্প্রতি কবরস্থান উঠে যাওয়ায় পুকুরের অপর পাশে ঐ বিরাট বটবৃক্ষের গোঁড়ায় তাকে থাকতে দেয়া হয়েছে। লোকটি এখন রোগমুক্ত। লোকটির নাম করম আলী শাহ্‌।           

ভূমিষ্ঠ হয়েছিল মুষ্টিবদ্ধ হাতে বাঁচার অংগীকার নিয়ে। সেদিন সমারোহ না হোক, অনন্দ হয়েছিল তাদের গৃহে। কারণ সে ছিল পিতামাতার পুত্র সন্তান। আশার আলো জ্বলবে ঘরে, সংসারে আনয়ন করবে সমৃদ্ধি আর উন্নতি।

করম আলী শাহ্‌ বাঁচার জন্য এসেছিল। বেঁচেও ছিল অনেকদিন। কিন্তু সে বাঁচা কেমন বাঁচা, আমার গল্পে তাই –ই ব্যক্ত হয়েছে। করম আলী শাহ্‌ এক অভিশপ্ত ব্যাধির শিকার হয়। যার নাম কুষ্ঠ। টগবগে যুবকের আলোক লতার মতন ঝলমলে জীবন। শক্তিতে, আবেগে, আনন্দে, উচ্ছ্বাসে ভরপুর যৌবনে, জীবন তরী বেয়ে যায় সে। হঠাৎই একখন্ড কালো মেঘ কোথা হতে উড়ে এসে তার উপর ছায়া ফেলে। করম আলী শাহ্‌’র অসুখ ধরা পড়ে। ঘনঘোর অন্ধকারে এক ঘূর্ণিঝড় তার জীবন নৌকাখানিকে প্রচন্ড বেগে কয়েক পাক ঘুরিয়ে জলদেশের অতলে কোথায় নিয়ে গেল, কে জানে! তারপর শুরু হল তার দুর্বিষহ জীবন। আপন গৃহ, আপন পরিবার হতে বিতাড়িত হয় সে। প্রথমে নির্জন নদী তীরে পর্ণকুটিরে বন্য পশু পাখিদের সঙ্গে বসবাস। পরে সেখান হতে বহিষ্কৃত হয়ে পরবাস অর্থাৎ গ্রাম ছেড়ে শহরে। যেখানে সবাই পর, কেউ আপন নয়। অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তান হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন। ভিক্ষা গ্রহণ করবার মত ঘৃণ্য কাজ যে আর নাই –তা সে কল্পনাও করতে পারে নাই। কাজটি বড় কঠিন কাজ। মানুষ বড় নির্দয়, ভিক্ষা দিতে চায় না। তবুও পেটের দায় বড় দায়। 

ইচ্ছে করে মানুষ মরতে পারে না। করম আলী শাহ্‌ এই রোগগ্রস্ত দেহ ত্যাগ করবার জন্য প্রস্তুত ছিল। যমদূত অন্যদিকে ব্যস্ত থাকায় তার কথা ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু জীবন তাকে ছাড় দেয়নি, মৃতের চাইতে অধম করে রেখেছিল। দীর্ঘকাল রোগ ভোগের পর রোগমুক্তি হয়েছিল তার। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া হস্তপদের অনেকাংশ ফেরৎ পায়নি সে। হয়নি তার মনুষ্য সমাজে পুনর্বাসন। মানুষ হিসাবে সে আর স্বীকৃতি পায়নি। পরিত্যক্ত মনুষ্যরূপী প্রাণী হিসাবে খাদ্যের অন্বেষণে দিন কাটাতো। রাতে কবরস্থানের এক কোণে মৃতদের পাশেই নিদ্রার আবেশে ফেলে আসা অতীতের স্বপ্নীল জীবনে ঘুরে বেড়াত। সেই সুদূর অতীতে প্রায় ৭৫ বৎসর পূর্বে সে লিখতে পড়তে শিখেছিল। সন্ধ্যায় দোকানে বসে কন্ঠের দরদ দিয়ে পুঁথি পাঠ করতো। গ্রামের লোকদের চিঠি পড়ে দিত। তার কন্ঠে মধু ছিল, হৃদয়ে আবেগ ছিল, চেহারায় সৌন্দর্য্য ছিল, অন্তরে সৃজনশীলতা ছিল। কোথায় গেল সব!

আমার বাসস্থান হতে প্রায় ৫০০ গজ দূরেই ছিল তার জীর্ণ কুটির। সেই কবরস্থানের পাশে সেই বিরাট রাজকীয় দীঘি। তার অপর পাশে এক কোণে আছে এক বিরাট বট বৃক্ষ। শতবর্ষের প্রাচীন তো বটেই। বিশাল এলাকা জুড়ে তার শাখা প্রশাখা বিস্তৃত। তার গুড়িটির পরিধিও খুব বড়। তার বৃহৎ মূল মৃত্তিকার বহু গভীরে প্রোথিত। বৃক্ষের গোঁড়া ঘেঁষে ছিল করম আলী শাহের ক্ষুদ্র নিবাস। ঘরের ভেতর একটি টিনের মাঝারি সাইজের ট্রাংক। আর তার দৈনন্দিন ব্যবহার্য দ্রব্যাদি। আর ছিল গাঢ় নীল, গাঢ় লাল আর কালো বর্ণের লুঙ্গি,পাঞ্জাবী,পাগড়ির সেট। প্রতিক্ষণের সঙ্গী একখানি লাঠি, ঝোলা আর পানীয় জলের ছোট একটি ক্যান।

তারপর বেশ কিছুদিন আর তাকে রাস্তায় যাতায়াত করতে দেখিনা। যে লোকটি আমাকে করম আলী শাহের খবর দিত তাকে জিজ্ঞেস করায় সে উত্তর দিল, সে তো বহুদিন আগে, বছরখানেকের উপরে হবে, চলে গেছে। বললাম, চলে গেছে মানে? 

- কোথায় চলে গেল?

- তিনি তো মারা গেছেন!

- মারা গেছেন? কই শুনিনি তো?

- শুনবেন কি করে। গরীব মানুষ, অসুস্থ, বয়সের ভার। উঠতে বসতে পারছিলেন না। তারপর একদিন...।

- আমার কন্ঠের ব্যাকুলতা দেখে লোকটি আর কিছু বললো না। 

করম আলী শাহ্‌ যে জনমানবহীন কবরস্থানের পাশে আস্তানা গড়েছিল, সেখানে এখন একটি পীরের মাজার ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। মৃতের সমাধিস্থলে এখন গড়ে উঠেছে জীবন্ত মানুষের আধুনিক সুদৃশ্য আবাসিক অট্টালিকা। সেজন্য আবাসিক এলাকা পাহারা দেবার জন্য করম আলী শাহের আস্তানার অদূরেই ছিল সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা রক্ষীদের ব্যারাক। ওরাও তার খোঁজ খবর রাখতো। একটি লোক নিয়োগ করেছিল করম আলী শাহ্‌ নিজেই। সেই তাকে দেখাশুনা করতো, রান্না বান্না করে দিত। তখন করম আলী শাহ্‌’র চলাফেরার ক্ষমতা ছিলনা। বাইরেও যেতে পারতো না। 

লোকটি আরোও বললো, তার কেউ ছিলনা। সরকারি কবরস্থানে তার দাফন হয়েছে। মৃত্যু যাকে দয়া করে নাই, জীবন তাকে মেরে রেখে দিয়েছিল। 

‘জিসে মওত নে  না পুছা

উসে জিন্দেগি নে মারা।’

জানিনা তার আত্মা এই মনুষ্য দেহ থেকে মুক্ত হয়ে কেমন আছে! 

মানুষের থাকে বাঁচার শখ। করম আলী শাহের ছিল মরবার শখ। রাস্তার পাশে বসে থাকতো মানুষের একটু দানের আশায়। মানুষেরা বড় নিষ্ঠুর, ভিক্ষা দিতে চায় না। করম আলী শাহ্‌ কত তরতাজা মানুষকে মরতে দেখেছে এই রাজপথে। কতজনকে দেখেছে প্রিয় স্বজন পরিবৃত্ত হয়ে সমাধিস্থলে যেতে। আজ এতদিন পরে আজরাঈলের সময় হলো। সে করম আলী শাহের দরজায় আঘাত করলো। ইচ্ছে ছিল যমদূতকে দেখবে। একবার –শেষবার। কিন্তু সে সুযোগ যে পায়নি। কেমন যেন ঘনঘোর অন্ধকার তার চোখের আলো কেড়ে নিল। প্রথম কুষ্ঠ রোগের সংবাদ শুনে যেমন তার চেতনার অবলুপ্তি ঘটেছিল, এবারও যেন তাই হলো। সেজন্য মৃত্যুর হীমশীতল পরশখানি তার উপলব্ধির বাইরে থেকে গেল। জীবন এবং মৃত্যুর কোন আশাই পূরণ হলো না। সবই সেই অচেনা, অজানা, অদৃষ্টের হাতে তোলা রইলো। নিঃসংগ করম আলী শাহ্‌ নিভৃতে, নিশীথে, নীরবে, নিঃশব্দে, নির্জন কুটিরে তার জীর্ণ, শীর্ণ, দীর্ঘ দেহখানি ফেলে রেখে চলে গেল। 

করম আলী শাহ্‌র ছোট্ট কুটিরের কি অবস্থা জানতে চাইলাম। লোকটি বললো, সে তো কবেই আর্মি এসে ভেঙ্গে পরিষ্কার করে রেখে গেছে। এটা আর্মির জায়গা তো! করম আলী শাহ্‌কে থাকতে দেওয়া হয়েছিল তার আশ্রয় ছিলনা বলে। 

অন্তরে বেদনা অনুভব  করলাম। একজন মানুষের জীবন কি? দীর্ঘকাল এই পৃথিবীর আলো বাতাসে জীবন সংগ্রাম করে অন্তিম মুহূর্ত অতিক্রম করে চলে গেছে। কেউ আজ জানবে না –এখানে কেউ ছিল! এই প্রাচীন বৃক্ষ তাকে আশ্রয় দিয়েছিল, ছায়া দিয়েছিল, বাতাস দিয়ে তার দেহমন শীতল করেছিল। সেই আশ্রয়দাতা বিরাট বটবৃক্ষই আজ করম আলী শহের জীবন –মরণের নীরব সাক্ষী। তারই দীর্ঘশ্বাস তার পত্র –পল্লবে মর্মরিত হয়।

..............

৪.১.২০১৪     

Tuesday, April 23, 2013

রানা প্লাজা

 ২৪শে এপ্রিল। ২০১৩ সাল। সকাল ৯ ঘটিকার দিকে ঘটে এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা সাভারের রানা প্লাজায়। জরাজীর্ণ ৯ তলা ভবন। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ নেই। ভগ্ন পিলারগুলো তার ভার বহন করতে পারছিল না। কয়েক হাজার লোক তখন সেই গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে কাজে ব্যস্ত ছিল। বিকট শব্দ করে ধ্বসে পড়লো সেই বিল্ডিংটি। ৯টি ঢালাই করা ছাদ।একটির উপর আরেকটি পড়ে গেল, যেন পাউরুটির স্লাইস! নিহত হলো, আহত হলো, আটকা পড়লো কয়েক হাজার মানুষ! তাদের সেই আঘাত ও যন্ত্রণা বর্ণনা করবার ভাষা আমার জানা নেই। এই ভয়ঙ্কর মর্মান্তিক ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। পম্পাই –এর ভূমিকম্পের ঘটনা, উড়িষ্যার দ্বারভাঙ্গার ভূমিকম্পের প্রাকৃতিক মর্মস্পর্শী ঘটনাও যেন এর কাছে হার মানে।

উদ্ধারকর্মে যারা নিজের জীবন বাজি রেখে নিয়োজিত হয়েছিলেন তাদের সাহস ও মানবতাবোধ তুলনা রহিত। নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যারা আটকে পড়া শ্রমিকদেরকে উদ্ধার করেছেন তারা মনুষ্য সমাজে শ্রেষ্ঠ মানুষ। যারা দিনরাত একাকার করে সংবাদ পরিবেশন ও চিত্রধারণ করেছেন দেশের জনগণের জন্য তাদের তুলনা নেই। একেই বলে, ‘মানুষ মানুষের জন্য।’

দেশে দুর্ঘটনার অন্ত নেই। যদি রানা প্লাজার নিদারুণ ঘটনাবলী, ভগ্নস্তুপ, উদ্ধারকাজ, দৃশ্যাবলী, সংবাদ পরিবেশন, চলচ্চিত্র আকারে সংরক্ষিত হয় তবে এটি একটি জীবন্ত মহাট্র্যাজেডি রূপে সমগ্র পৃথিবীর মনুষ্যকে কাঁদাবে। এই হৃদয় বিদারক বাস্তব ঘটনা কল্প কাহিনীকেও হার মানায়। পরবর্তী প্রজন্মের মানুষেরা এই দৃশ্য দেখে সচকিত হবে। এরকম ভয়ংকর দুর্ঘটনা আর না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখবে এবং সচেতন থাকবে।

এই চলচ্চিত্র যদি প্রতি বৎসর ২৪শে এপ্রিল প্রচার করা হয়, তবে যারা মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেছেন, পেছনে ফেলে রেখে গেছেন তাদের চিরদুখী পরিবার, তারা এবং অন্য সকলে তাদের অকালে ঝরে যাওয়া আত্মার জন্য জন্য প্রার্থনা করতে পারেন। এই ঘটনাবলীর দৃশ্য প্রচার করে এ বিশ্বের তথাকথিত ধনী মানুষেরা যেন দরিদ্র জনগণের জীবন নিয়ে খেলা করতে না পারে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

২৪/০৪/২০১৩

সেই হাতখানি

  এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা ...