Friday, August 7, 2026

একটি ভয়ংকর রাত্রি

 তিমির রাত্রি। গভীর অন্ধকার। শব্দহীন, বর্ণহীন। চারপাশে কি আছে, কি নাই, ঠাহর করা যায় না। কঠিন শৈত্যের হিমশীতল পরশ অস্থিতে কম্পন জাগায়। হৃৎস্পন্দন জানান দিয়ে বলে বেঁচে আছি।

কোয়েটা থেকে ফোর্ট সান্দামানে যাচ্ছিলাম আমরা যুদ্ধ বন্দির দল (Prisoner of War)। তখনও গন্তব্য জানা ছিলনা। দীর্ঘ রেল ভ্রমণের এক পর্যায়ে হিন্দুকুশ পর্বতের একটি শাখা অতিক্রম করতে হয়। তখন রজনী দ্বিযাম অতীত।  হঠাৎ ট্রেনের গতি শ্লথ হয়। দস্যুর ভয়ে নয়। সামনে চড়াই। অর্থাৎ খাড়া পর্বত আরোহণ। খুবই বিপদজনক পরিস্থিতি। রেলগাড়ির পেছনে গার্ডের কামরার সঙ্গে যুক্ত করা আছে আরেকটি এঞ্জিন। যাত্রীবাহি ট্রেনটি যখন উপরের দিকে চলবে তখন পেছনের এঞ্জিনটি তাকে ধীরে ধাক্কা দিবে যেন ভারসাম্য রক্ষা হয়। শত শত চাকার ট্রেনটির সম্মুখের এঞ্জিনটি টানতে থাকে উপর থেকে। নীচেরটি তাকে ধাক্কা দিয়ে সহায়তা করে। গভীর পার্বত্য অঞ্চলে ট্রেনটিকে একটি শতপদী সরীসৃপের মত দেখায়। চারিদিকে গিরিখাত অন্ধকারে দৃশ্যমান নয় বলে সেই আতংকের হাত থেকে রেহাই পেয়েছি। তবুও ট্রেন চলতে থাকে  একমাত্র লাইটটিকে সম্বল করে। ট্রেনের গতি বেশ ধীর। মনে হয় অতিশয় সতর্কতার সঙ্গে চলছে। তারপর শুরু হয় পর্বতের উপরিভাগ অতিক্রম করবার পালা। ট্রেনের অর্ধেক পর্বতের ওপারে, বাকি অর্ধেক এপারে।   

শব্দেরও ভাষা আছে। ট্রেনের লোহালক্কড়ের  আওয়াজের মাধ্যমে তার গতিবিধি কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়। এবার উৎরাইয়ের পালা। ট্রেন নামতে থাকে। পর্বতের ওপারে যখন চলতে শুরু করে তখন পেছনের এঞ্জিনটি তাকে টেনে ধরে রাখে যেন ট্রেনটি নিজের ভারে উল্টে পড়ে না যায়। সামনে এঞ্জিনটির কাজ হলো সতর্কতার সঙ্গে লাইনের উপরে থাকা এবং ধীরে ধীরে চলা। মনে হলো ট্রেনও দম নিচ্ছে, ভয় পাচ্ছে। আমরা যাত্রীরাও ইষ্টনাম জপ করতে লাগলাম। যদি কোনরকমে দুই এঞ্জিনের ব্যালেন্স একটু এদিক ওদিক হয়, তখন ট্রেনটি গিয়ে কোথায় পড়বে এবং কিভাবে পড়বে কেউ তা জানে না। বহির্বিশ্বে কেউ জানতে পারবে না, এই ঘন তমসাচ্ছন্ন ভয়ংকর রাত্রির ভয়ংকর দুর্ঘটনার কথা। কেউ জানতে পারবে না এই যাত্রীদের জীবনের যাত্রা ভংগের কথা। কেউ জানতে পারবে না এইসব  যাত্রীদের নিজের স্বপ্ন ছিল, আশা ছিল, আনন্দ ছিল, আরো কিছুকাল বাঁচার আকাংখা ছিল।     

নিশ্ছিদ্র আন্ধকার, চোখ বন্ধ রাখার কোন অর্থ হয় না। তাই দম বন্ধ করে প্রহর গুনতে লাগলাম আমি এবং আমার স্বামী মেজর হারুন, আর আমাদের শিশু কন্যা।

আমাদের কম্পার্টমেন্টে আছেন কর্নেল রাকিব এবং মিসেস রাকিব এবং তাদের সাত রাজার ধন –সাত সন্তান। দিনের বেলায় তাদেরকে দেখেছিলাম। আঁধার হওয়ার পর আমরা কেউ কারো চেহারা দেখতে পাইনি। এমন ভয়ানক ভ্রমণ, যে কথাবার্তা তো দূরের কথা, এক অদ্ভুত নীরবতা আমদেরকে গ্রাস করে ফেলে। এভাবে ট্রেন হেঁটে হেঁটে চলতে লাগলো।

 এই ট্রেনটি একটি ন্যারো গেজের লাইনের উপর দিয়ে চলে। পথ দুর্গম বলে প্রতিদিন রেল চলাচল করেনা। এই পার্বত্য অঞ্চলে অন্য কোন স্টেশন আছে বলে মনে হয়না। কারণ লোকালয় নেই। সুতরাং রেললাইনের গন্তব্য একটাই। ফোর্ট সান্ডামান। ইরানের  বর্ডারের নিকটবর্তী, পাহাড়ে ঘেরা পাকিস্তানের একটি বিরান পরিত্যক্ত অঞ্চল। বৃক্ষলতাহীন, মনুষ্য বসতিহীন, জীবজন্তুহীন, পশুপাখিহীন। সেইজন্য বিষাক্ত ও নিরীহ সর্প ও পোকা মাকড়েরা এখানে ঘরবসতি করে নির্বিঘ্নে। এই ফোর্ট সান্দামানেই আমাদের যুদ্ধবন্দি করে রাখা হয়।

প্রাকৃতিক দুর্গ। পালাবার উপায় নেই। ব্রিটিশ আমলে এটি একটি ফোর্ট ছিল। এখানে বসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অত্যাচারি শাসকেরা এই দেশীয় রাজ্য শাসন করতো। পাহাড়ের উপর ছিল তাদের আস্তানা। রাতে জ্বালিয়ে রাখতো সার্চ লাইট। ঘুরে ঘুরে সে লাইট চারিপাশে নজরদারি করতো। আমরা ওখানে নির্বাসিত হওয়ার বহু বছর পূর্বে এ স্থান পরিত্যক্ত হয়। চারিপাশের পাহাড় পর্বত পার হয়ে কোন দিকে পালাবার কোন উপায় নেই। তবুও প্রহরা ছিল বড়  কড়া এবং আচরণ ছিল বড় নির্মম, নিষ্ঠুর এবং রুক্ষ।

ন্যারো গেজের লাইনের উপর চলে ছোট ডাব্বা অর্থাৎ ছোট ছোট কামরা। প্রতিটি কামরায় দুইপাশে এবং মাঝখানে লম্বালম্বি ভাবে তিন সারি বেঞ্চ। চওড়া নয় মোটেও। আমরা তিনজন এককোণে । দুই বেঞ্চের মাঝখানে স্যুটকেস রেখে বেঞ্চের সমান উচ্চতায় শিশুকন্যার বিছানা তৈরী করে নিয়েছি। লক্কর ঝক্কর ট্রেনের কামরায় অনেক ফাঁক  ফোকর আছে। সেগুলো দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আর বরফ গলা জল ভিতরে ঢুকছে। সেগুলো রোধ করার জন্য টাওয়েল গুঁজে দিয়েছি। কামরার ভিতরে ডিপ ফ্রিজের চাইতে ঠান্ডা। একটু পর পর হাতের ছোট্ট টর্চ জ্বালিয়ে দেখি আমার শিশু কন্যা ঠিক আছে কি না। ট্রেনের ঝাঁকুনীতে সে তো গভীর ঘুমে।  যত গরম কাপড় সব তার পরিধানে। আমাদেরও একই অবস্থা। তবুও মনে হয় এগুলো কোন গরম কাপড়ই নয়।

এভাবে কাটতে থাকে ভয়ংকর প্রহর। একসময় বোধ হলো অবতরনের পালা সমাপ্ত। ট্রেন সমতলে নেমেছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলাম। বাঁচার প্রথম পর্ব অতিক্রান্ত।

ট্রেন এখন ঝিকঝিক কর থেমে থেমে চলছে। এরকম একবার যখন ট্রেন থেমে থাকে তখন মেজর হারুন ট্রেনের সশস্ত্র পাঞ্জাবী প্রহরীদের নিকট থেকে পারমিশান নিয়ে ইঞ্জিন থেকে গরম পানি আনতে যান। কারণ সঙ্গে রাখা গরম পানি এতক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। তাতে বাচ্চার জন্য দুধ তৈরী করা সম্ভব ছিলনা। তখন  তিনি দেখতে পেলেন রেল লাইন বরফে ঢাকা। বাঙালী বন্দি সিপাহীগণ বরফ কেটে লাইন পরিষ্কার করছে এবং ট্রেন ধীরে ধীরে চলছে। মনে পড়লো মধ্যযুগীয় ক্রীতদাসদের কথা। ‘দি রুটস্‌’ ফিল্মের কুন্তা কিন্তের কথা। আমাদেরকে নির্বাসনে পাঠিয়ে তাদের কি লাভ হচ্ছে বুঝতে পারলাম না। ক্ষমতা এমন জিনিস যা মানুষকে দানবে পরিণত করে। চতুর ইংরেজ, রেলের লাইন বরাবর স্লিপারের নীচে গর্ত করে রেখেছে। পরিষ্কার করা বরফ ঐ গর্তে পড়ে যাচ্ছে। এই কঠিন শীতে গভীর অন্ধকার রাতে বাঙালী সৈনিকদেরকে দিয়ে বরফ পরিষ্কার করানো যেন রূপকথার দৈত্যদানোর কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। বাঁচার  আশায়, কঠিনশাস্তির ভয়ে তারা একাজ করতে বাধ্য। কারণ তাদের আশে পাশেই আছে বন্দুকধারী প্রহরী। তারা অবশ্যই কামরার ভেতরেই অবস্থান করছে। 

মেজর হারুন থার্মোসে করে গরম পানি নিয়ে ফিরে এলেন। গরম দুধ তৈরী করে বাচ্চাকে দিলাম। দেখি বাচ্চা দুধ পান করছে। স্বস্তি পেলাম যে সে ঠিক আছে।

দুঃখের রজনী যেন শেষ হতে চায়না। বাচ্চার পাশে দু’জনে বসে থাকতে থাকতে একসময় রাত পোহালো। পাখির কোলাহল শোনার ভরসা মিছে। চারিদিকে শ্বেতশুভ্র বরফের সাদা আভায় ভরে গিয়েছে। সারা নিশি গভীর অন্ধকারে নিমগ্ন ছিলাম। প্রভাতে সেরকমই সাদা আলোর আভায় চোখ ধাঁধিয়ে গেল। তবে পূর্বদিক কোনদিকে, সূর্য কোথায় কিছুই বুঝা গেল না। ট্রেন ধীরে ধীরে চলতে লাগলো। চতুর্দিক কেবল বরফে ঢাকা পাহাড় আর পাহাড় –ছবির মত। আর কিছুই দেখার ছিল না। এ এক অন্য জগৎ। যেন অন্য গ্রহে। নদী নেই, নালা নেই, গাছ নেই, পালা নেই, মানুষ নেই, পশু নেই, পাখি নেই, জলাশয় নেই, জনপদ নেই। কি বিচিত্র দৃশ্য। তবু ধুরন্ধর ব্রিটিশ এই দুর্গম পথ কোনকালে তৈরী করে রেখেছে, কেন কে জানে! যেখানে শস্য এই, সম্পদ নেই, দুর্বাঘাস পর্যন্ত নেই। বালির স্তুপ আর কঙ্কর পাথর মৃত্তিকার স্তরকে ঢেকে রেখেছে। চতুর ইংরেজ তাদের প্রভুত্ব বজায় রাখার জন্য এই রেলপথ নির্মাণ করেছিল আমাদের মত নিরাপরাধ মানুষকে বন্দি রাখার জন্য। কবে কোথায় কে বা কাহারা, কি অপরাধ করবে, তাদের জন্য কি এই দুর্গ নির্মাণ? মানুষকে শাস্তি দেবার জন্য কত প্রাণের বিনিময়ে, কত অর্থের বিনিময়ে এই এ পথ তৈরী করা হয়েছিল তা তারাই জানে। এই দুর্গম দুর্গ নির্মাণ  তৈরী করে এই পৃথিবীতে   মানুষকে পারত্রিক জীবনের নারকীয় স্বাদ গ্রহণ করিয়ে পৈশাচিক অনন্দ লাভ করা ছাড়া আর কি হতে পারে?

এই রেলভ্রমণ এক ভয়ংকর রাত্রির বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা একটি দুঃস্বপ্নের মত। যেন পুনর্জন্ম লাভ করে এ মাটিরে পৃথিবীর মাটির গৃহে ফিরে এলাম।

১৬ই ডিসেম্বর, ২০১০

একাকী একজন - আমার মা

 

মানুষ ভাগ্য নিয়ে জন্মায়। জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘটনার বিবর্তন ঘটে বটে, তবে ভাগ্য তার সঙ্গ ত্যাগ করে না। তিন ভাই বোনের মধ্যে জুবাইদা খাতুন সর্বকনিষ্ঠ। বড় দুজন ভাই। মাত্র দু’বছর বয়সে জুবাইদা খাতুন মাতৃহারা হন। এখান থেকেই তার জীবনের একাকীত্বের শুরু। মায়ের স্নেহ কি তার জানা নেই।

পিতা মোহাম্মদ হানিফ, সুফি দরবেশ। দেশ-দেশান্তর ঘুরে বেড়ান। শেষে আশ্রয় নেন মক্কা মদিনায়। মক্কায় ঘর সংসার পাতেন। দীর্ঘ এগার বছর আর দেশে ফেরেননি। সঙ্গে ছিল তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বালক মোহাম্মদ  সিদ্দিক। সেখানেই লেখাপড়া করতেন। পিতা বিদ্বান ছিলেন। নানা ভাষায় পারদর্শী। কঠোর ধার্মিক। কিন্তু কোমল, উদার মনোবৃত্তির অধিকারী ছিলেন। মানবতার দিকে দৃষ্টি ছিল। স্বল্প ভাষী। ভক্ত সংখা ছিল প্রচুর। তবে তিনি পীর  ছিলেন না। ছিলেন না সংসারীও। বাড়ির অবস্থা ভাল। বিষয় সম্পত্তি যথেষ্ট। জমি বন্ধক দিয়ে টাকা পয়সা নিয়ে  বেরিয়ে পড়তেন।

বিরাট বাড়ি। সুর্য দীঘল নয়। উত্তর দক্ষিণে প্রসারিত। বহু শরীকের বসবাস – একই বংশোদ্ভূত। জুবাইদা খাতুন বাড়িতে বিরাট আট চালা ঘরের একা বাসিন্দা। বাড়িতে লোকের অভাব নেই। কেউ না কেউ তার সঙ্গে  থাকতেন। তার উত্তরের ঘরের জেঠি, দক্ষিণের ঘরের জেঠি, পশ্চিমের ঘরের জেঠিরা খুবই স্নেহ করতেন। মাতৃহারা মেয়েটিকে স্নেহের ছায়া দিয়ে রাখতেন। খাবার দিতেন, নিরাপত্তার খেয়াল রাখতেন। বয়স তখন তাঁর পাঁচ বছর । ১৯১০ সালে তার জন্ম।

তখন ব্রিটিশ আমল। বাড়িতে লেখাপড়ার চর্চা ছিল। তবে মেয়েদের জন্য নয়। জুবাইদা খাতুন ঘুরে ঘুরে সব ঘরেই  লেখাপড়ার আশে পাশেই থাকতেন। তাদের বাদ দেয়া বই নাড়া চাড়া করতেন। তাতে তার পড়াশুনা আয়ত্তে এসে যায়। পরীক্ষা পাশ করা ছাড়াই সরস্বতি তাকে অনেক কৃপা করেন। ধাপে ধাপে সব ক্লাসের বই পড়া  শেষ  হয়। এমনকি ইংলিশ কবিতাও তার শুনে শুনে মুখস্থ ছিল। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ তার অনেকখানি মুখস্থ ছিল।

সেই সময় আমার বড় মামা মোহাম্মদ সিদ্দিক বাড়িতে এসে আমার মা জুবাইদা খাতুনকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিলেন। মাদ্রাসাটি অনেক প্রাচীন কালের। বড় মামা ঘোড়ায় চড়ে তার ছোট বোনটিকে মাদ্রাসায় দিয়ে যেতেন,  আবার এসে নিয়ে যেতেন। তখন বাড়ি বাইরে গিয়ে বিদ্যার্জন মেয়েদের জন্য ছিল এক আশ্চর্য ঘটনা। এই ছিল  তার  প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা। কোরান পাঠ, গুঁলিস্তা, বুস্তা, পুস্তা এসব বই পড়াশুনা কিছুদিন করেছিলেন। ঘোড়ায়  চড়ে  মাদ্রাসায় পড়তে আসা তখনকার দিনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, বিশেষ করে অবরোধ বাসিনীদের  কাছে। মামা লাখনৌ চলে যাওয়ার পর পড়াশুনাও বন্ধ। 

তার কিছুদিন পর দূরদেশী দরবেশ পিতা বাড়িতে এলেন। তিনি ছিলেন উঁচা লম্বা গৌরবর্ণ এক সুন্দর   সুঠাম দেহের অধিকারী। গ্রামের লোকেরা মজাক করে বলতেন “কাবুলিওয়ালা”। এক পুণ্যময় নুরানী আলো যেন  তাকে ঘিরে রাখতো। দেশে ফিরে এসে তিনি জেষ্ঠ্য পুত্র মোহাম্মদ সিদ্দিকের বিবাহ দিলেন, আরেক পরিবারের সম্ভ্রান্ত  সুশ্রী দির্ঘাঙ্গী তরুণীর সঙ্গে। তাদের ছিল সৌন্দর্যের খ্যাতি। বিশেষ করে গাত্রবর্ণ ছিল তাদের বিশেষ   অহংকারের কারণ। চাকুরী নিয়ে মোহাম্মদ সিদ্দিক লক্ষ্ণৌতে পাড়ি জমালেন। সঙ্গে নিলেন ছোট ভাই মোহাম্মদ জাকারিয়াকে। সেখানকার মাদ্রাসায় তাকে ভর্তি করে দিলেন। তারও কিছুকাল পর ছোট বোন জুবাইদা খাতুনকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন।

এটা আমার মায়ের জীবনের আরেকটা বাঁক। এখানেও তিনি একা। ভাবী তার মাতৃহারা হৃদয়ে কোন স্নেহ  মমতার বারি সিঞ্চন করতে পারেননি। এখানে জুবাইদা খাতুনের কাজ ছিল বাচ্চার পরিচর্যা করা, ঘর গেরস্থালীর   কাজ করা। আরবী উর্দু পড়া এবং কথা বলা।

এই লখনৌ শহর ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজধানী। অত্যন্ত অভিজাত শহর। তবে আজকের মত সুযোগ সুবিধা ছিলনা। যানবাহনের মধ্যে ছিল “ডুলি” পালকির সাধারণ সংস্করণ। সম্ভবত কাঠের তৈরি একটি  বাক্সের মত। চারদিক কপড় দিয়ে ঘেরা। দুই বেহারা কাঁধে করে নিয়ে যেত গন্তব্যে। আমাদের রিক্সার মত তারা সর্বত্র ঘুরে বেড়াতো। যার যখন দরকার ডেকে নিত – “এ ডোলি ওয়ালা ইধার আও”। ডুলিতে চড়ে চলে যেতেন বেড়াতে, হাসপাতালে অর্থাৎ যেখানে ইচ্ছা সেখানে। জুবাইদা খাতুনের কাজ ছিল নিয়মিত তার ভাবী সাহেবার জন্য ডুলি ডেকে আনা।

সেই সময় সেই শহরে হাজী আমীর আলী নামে একজন বিখ্যাত পীর সাহেব বাস করতেন। তিনি অত্যান্ত  নেক এবং পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন। আমার বড় মামা হাফেজ ক্বারী মৌলানা মুহাম্মদ সিদ্দিক সাহেব তাঁর একজন  বিশেষ ভক্ত এবং বন্ধু ছিলেন। কথিত আছে পীর সাহেব বিছানার গদি উঠালেই অনেক টাকা বের হতো। তিনি  দয়ালু ছিলেন। নির্ধনকে দান করতেন। তার বাড়িতে অন্দরে কোন রান্নাবান্না হতনা। পাক হত দহলিজে। সেখানে বহুত উমদাহ্‌ খানা তৈয়ার হত। বাড়ির ভেতরের জেনানাগণ এবং অন্য সকলে সেই খানা গ্রহন করতেন। আমার মাতা জুবাইদা খাতুন সেই সময় বালিকা ছিলেন। বড় মামি প্রায়ই সেই বাড়িতে তশরিফ নিতেন। ডুলিতে চড়েই  যাতায়াত। সঙ্গে যেতেন জুবাইদা খাতুন বাচ্চা মেয়ে নূরীকে দেখভাল করবার জন্য।

বড় মামার পাশের বাসার একটি মেয়ের সঙ্গে জুবাইদা খাতুনের পরিচয় হয়। নাম তার রাসুলান। সম বয়সী হলেও একটু বড়। এই ছোট মেয়েটিকে এত কাজকর্ম করতে দেখে তার মায়া হয়। সে বলতো এত কাজ কর কেন?  তোমার ভাবিতো সারাদিন ঘুরে বেড়ান। তুমি ছোট, এত কাজ কর, বাচ্চা সামলাও। তিনি যেমন তোমার ভাই সাহেবের বিবি, তুমিও তো তার বোন। কম কিসে? দেখ আমার কোন কাজ নেই। আমার মা-ই সব করেন। জুবাইদা খাতুনের চোখ ছল ছল করে ওঠে। বুকের ভিতরটা হাহাকার করে। মুখে বলতেন আমার অভ্যাস  হয়ে গেছে। তাছাড়া এ বাচ্চা মেয়েটিও আমার খুব প্রিয়। সে আমাকেই বেশি পছন্দ করে। আর ঘরের কাজ কর্ম তো করতেই হবে।

জুবাইদা খাতুন ঘর সংসার গুছিয়ে রাখতেন। নিজের পড়াশুনা করতেন। তাদের বাড়ির নীচের তলায় ছিল বাজার, দোকানপাট। উপর থেকেই বাজার করতেন। এক আনায় অনেক কিছুই ক্রয় করা যেত। তাছাড়া আসতো ফেরিওয়ালা। তাজা হারে আমরুদ, (পেয়ারা) তাজা হারে আমরুদ বলে হাঁক দিত। এক পয়সায় অনেক পেয়ারা  দিয়ে যেত। হারা মিরিচ (কাচা মরিচ), শাক সবজি, আঙ্গু্‌র, সেভ (আপেল), কিসমিস, মনাক্কা, নানা প্রকার মসলা  দিয়ে যেত। চার আনার বাজারে বাড়ি ভরে যেত এমনকি মিঠাই মন্ডা সহ। 

আমার ছোট মামু মাদ্রাসা থেকে ফিরে এলে তার ছোট বোন জুবাইদা খাতুন নিচে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে আসতেন। একটি ঠিকা মেয়ে বাসার কাজ করে দিয়ে যেত। কোনদিন আসতে দেরি হলে এই জুবাইদা ছাদের উপরে গিয়ে তাকে চিৎকার করে ডেকে আনতেন। তার নাম ছিল মান্নু কি আম্মি। তিনি ডাকতেন, এ মান্নুকি আম্মি, জলদি আও। দের হো রাহা হ্যায়। সম্ভবতঃ তাদের বাসস্থান ইনাদের বাসস্থানের নিকটবর্তী ছিল। সেই মেয়েটি এসে ভারি ভারি কাজ করে দিয়ে যেত।        

এক রাতে মহল্লায় চোর হানা দেয়। গভীর রাতে চোর আসে রাস্তার ওপারের বাসায়। তখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাতিওয়ালা সন্ধ্যায় বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে যেত। সকালে এসে বন্ধ করে দিত। সে আলো কতই বা উজ্জ্বল ছিল। তবুও তো আলো। আজকের দিনের সাথে তার কোন তুলনা চলেনা। সেই বাড়ির গৃহকর্তা বাড়িতে ছিলেন কিনা জানিনা। তবে গৃহকর্ত্রী উচ্চস্বরে চিৎকার করে বললেন, মহল্লা ওয়ালা জাগো, হামারা ঘর মে চোর আয়া।   কেউ এলোনা। শেষে ডাকলেন, ক্বারী সাহাব জাগো, ক্বারী সাহাব জাগো। হাম মুশকিল মে হ্যায়। তখন আমার   বড় মামা সাড়া দিলেন। তিনি দু’নলা বন্দুকটি বারান্দা থেকে তাক করে চোরকে গর্জন কোরে ধমক দিলেন। চোর  ততক্ষন পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলো। কোনো সাহায্যকারী না এলে সে ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে যাবে। বড় মামুর ধমক খেয়ে এবং বন্দুক দেখে লোকটি লাফ দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। মামা সেই মহিলাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,  দরজা বন্ধ রাখেন। আবার যদি আসে তবে আমাকে ডাকবেন। এইভাবে তিনি তস্করের হাত থেকে সেই ভদ্রমহিলাকে রক্ষা করেন।

সেই সময় লখনৌকে আমার আম্মারা হিন্দুস্থান বলতেন। তখন বাংলাদেশও ভারতের অন্তর্গত ছিল। লখনৌ ছিল অনেক দূরের রাস্তা। আম্মার ভষায় তিন দিন তিন রাত থাকতে হতো ট্রেনে। আমার বড় মামা মোঃ  সিদ্দিক একটি কামরা রিজার্ভ করে নিতেন। উনার নিজের পরিবার, ছোট মামা জাকারিয়া, আম্মা জুবাইদা খাতুন। আমাদের এলাকার আরো কয়েকজনকে লখনৌ মাদ্রাসাতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে যাতায়াত করতেন। ট্রেনের কামরার চাবি বড় মামুর হাতেই থাকতো। ট্রেনে যেতে যেতে অনেক দৃশ্য অবলোকন করতেন। পাকশী ব্রিজ বিরাট রেল সেতু অতিক্রম করা, গুম গুম শব্দ অনুভব করা বড় রোমাঞ্চকর মনে হত। কোথাও ট্রেনটি একটি বিশাল মাছের পাজরের দুই পাশের কাঁটার ভিতর দিয়ে চলে যেত। এত বিরাট মাছের কাঁটা, না জানি কত  বিরাট মাছ ছিল সেটি। এটিও পুলক অনুভব করবার মত ঘটনা। এখন আর সে সবের চিহ্নও নেই। কেউ জানেও  না। ট্রেনে যেতে যেতে নানান প্রাকৃতিক দৃশ্য, নানান জনপদ , নানা প্রকার বেশ ভূষা, জীবন যাত্রার ধরণ, ভাষা  চেহারা দেখতে দেখতে অবশেষে সবুজ শ্যামল বাংলা এলাকা ছেড়ে রুক্ষ ধূসর দেশে উত্তর প্রদেশে গিয়ে  পৌঁছাতেন। গার্ড এসে চাবি নিয়ে যেতেন। মামারা অবতরণ করে গন্তব্যে পৌঁছে যেতেন। জুবাইদা খতুন ঘর সংসারের কাজ করতেন, পড়াশুনা করতেন এবং মামার মেয়েদের ছবক দিতেন। বড়মামার পড়াশুনার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। তিনি পড়াশুনার জন্য জুবাইদা খাতুন এবং তার মেয়েদের খুব উৎসাহ দিতেন। আমার আম্মা জুবাইদা খাতুন বিদুষী মহিলা ছিলেন। মজার বিষয় ছিল তিনি লিখতে জানতেন না। প্রচুর পড়াশুনা করতেন বাংলায় যেমন, উর্দুতে তেমন। আর হাদিস কোরান তো কথাই ছিলনা। আমরা ছোট বেলায় দেখেছি অবসর সময়ে মানচিত্র ছিল তার সঙ্গী। পৃথিবীর সব সাগর, মহাসাগর, মহাদেশ, দেশ, রেলপথ, নৌপথ, আকাশপথ, কোথা হতে কোন গন্তব্যে পৌঁছায় সব ছিল তার নখদর্পণে। কোন কিছু জানতে চাইলে পরম যত্নের সঙ্গে আমাদের তা বুঝিয়ে দিতেন। শিল্প  সাহিত্য সম্বন্ধে তার জ্ঞান ছিল প্রচুর। নবী কাহিনী, আসমানী  কিতাব, তাদের শানে নজুল তাঁর মুখস্থ ছিল। যত পুঁথি ছিল তাঁর কন্ঠস্থ এবং সুরেলা কন্ঠে তা পাঠ করতে পারতেন। ইংরেজী পড়তে পারতেন না তবে অনেক গল্প জানতেন শেক্সপীয়রের। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা না থাকলেও তিনি একজন স্বশিক্ষিত এবং সুশিক্ষিত মহিলা ছিলেন। আমাদের গ্রামে আজ পর্যন্ত তার সমকক্ষ আর কেউ নেই। যদিও মেয়েরা বি.এ. পাশ করছে। তবুও তাঁর তুলনা  তিনি নিজেই।

লখনৌতে থাকতে থাকতে তার বয়স বেড়ে যায় ১৩/১৪ তে। তখনকার বিধান অনুযায়ী বিবাহের বয়স। সুতরাং কোন ছুটীতে মামারা বাড়ি এসে তার বিবাহের ব্যবস্থা করে ফেলেন। আমাদের গ্রামের এক গ্রাম পরেই দক্ষিণে নিঘুরকান্দা গ্রাম। দুই ক্রোশ হয়তবা হবে। 

আমাদের গ্রামের নাম হরিরামপুর। আমার পিতা আব্দুস সোবহান বিশ্বাস ১৯১৯ সালে এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ছাত্র ছিলেন তুখোড়। তিনি গল্প করতেন, প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর যখন  ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন। তাদের সময় মিডিয়াম অব ইন্সট্রাকশন ছিল ইংলিশ। পরীক্ষায় ভালভাবে পাশ করার দরুণ দূর দূরান্ত হতে লোকেরা তাকে দেখতে আসেন। তিনি ছিলেন এক অদম্য এবং নির্ভিক পুরুষ। তাঁর শিশু কালেই পিতৃবিয়োগ হয়। তাঁর মায়ের সহায়তায়, নিজের অসম সাহসে এগিয়ে যান। আর্থিক অনটনে কলেজের লেখাপড়া ত্যাগ করতে বাধ্য হন। কারো পরামর্শ ছাড়াই, নিজের সাহসে ভর করে গিয়েছিলেন মুক্তাগাছা এলাকার প্রবল পরাক্রমশালী জমিদার রাজা জগৎ কিশোরের নিকট। তিনি তরুণের বক্তব্য  শুনে মন্তব্য করলেন, Look, higher education is not for the poor. জমিজমা যা আছে দেখেশুনে চালাও, তাতেই চলে যাবে।  

বিফল মনোরথ হয়ে পিতা আমার ফিরে এলেন। ঘুষের চাকুরী করবেন না বলে দারোগার চাকুরী  প্রত্যাখ্যান করলেন। সাব রেজিস্ট্রারের চাকুরিও নিলেন না। শেষে নান্দিনা স্কুলের টিচার হিসেবে যোগ দেন। তার বিষয় ছিল অংক আর ইংলিশ। এই স্কুল প্রতিষ্ঠায় নলিনী মোহন দাস (মাখন বাবু), রিয়াজ মাস্টার, জয়েন মৌলবি সাহেবদের সঙ্গে তারও অবদান ছিল। এই স্কুল অল্প সময়ের মধ্যেই একটি বিখ্যাত স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর সব কৃতিত্ব শিক্ষকদের। এই নান্দিনা স্কুলেই আমাদের সব ভাইয়েরা লেখাপড়া করেন। তখনকার দিনে ১৯৪৩ সালে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নাজির আহমেদ undivided বেঙ্গলের শিক্ষা বোর্ডে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। পরবর্তীতে কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে, পরে কলকাতা ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারী পাশ করেন। পরে ইংল্যান্ড থেকে এফ এফ এ তার সি এস পাশ করেন, কম সময়ে কৃতিত্বের সঙ্গে।

বিবাহের সময় আমার আম্মা কিশোরী মাত্র। মা নেই। বাবা বিদেশে বসবাস করেন। একা একা আমাদের বাড়িতে একটি সংসারের দায়িত্ব গ্রহন করেন। শাশুড়ি রায় বাঘিনী। তবে ননদিনী অন্যান্যরা বড়ই স্নেহের চক্ষে দেখতেন। আমার মা বড়ই ধৈর্য্যশীলা সহিষ্ণু রমণী ছিলেন। তিনি বাড়িতেই থাকতেন বিরাট আটচালা ঘরে একাই  থাকতেন। আমার এখন মনে আছে ঘরের উপরের কাঠের পাড়ে বড় করে খোদাই করে লেখা ছিল ১৩৩০ সাল।

আম্মা ভয়ে ভয়ে একাই থাকতেন। তার কষ্টের কথা বলার জায়গা ছিলোনা। বাবা ছিলেন রাগী মানুষ, তাকেও কিছু বলার উপায় ছিলনা। যাই হোক। সংসার বড় হলো। এই প্রথম তিনি তাঁর প্রথম সন্তানকে নিজের মত করে পেলেন। সম্পূর্ণ নিজের কেউ। তাকে লালন পালন করা, শয়নে স্বপনে বুকের কাছে রাখা, অক্ষর জ্ঞান দান করা সব কিছুই নিজের মত করলেন। কয়েক বছর পর তাকে ছাড়তে হলো। ভর্তি করা হলো নন্দিনা স্কুলে।  ছাড়তে খুব কষ্ট হতো। তিনিও তাকে ছেড়ে যেতে চাইতেন না। আম্মা লুকিয়ে তাকে একটি টাকা দিতেন। বুঝিয়ে সুঝিয়ে স্কুলে পাঠাতেন। তিনি ছিলেন দূরন্ত প্রকৃতির ছেলে। অত্যন্ত মেধাবী। নতুন বই কয়েক দিনে মুখস্থ করে    ছিড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিতেন। বলতেন আমার সব মুখস্থ। বই নিয়ে স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন কি? অংকও তার  নখদর্পণে ছিল।

সে প্রসঙ্গ থাক এখন মায়ের প্রসঙ্গ বলি। মা তখন পরবর্তী সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত হতেন। এইভাবে তিনটি  ভাইয়ের পর আমার জন্ম। বাড়িতে আনন্দের জোয়ার এলো। হাঁটি হাঁটি পা পা যখন আমার মা আমার হাতে শিশুতোষ বই তুলে দিলেন। বইটির নাম “কমল কলি”। শেখালেন অসংখ্য ছড়া, ছড়া গান, কবিতা। ভোর হল দোর  খোলো, খুকু মণি উঠরে.....। গাছে বসে ডাকে পাখি উঠ, উঠ, উঠ বলে, নয়ন মেলরে শিশু জয় জগদীশ বলে।  আরো অনেক কবিতা শুনিয়ে ঘুম ভাঙ্গাতেন। আমার বাবা আমার বড় ভাইদের জন্মের পর গ্রামে একটি মক্তব (প্রাইমারী স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। সেটি আজও বর্তমান আছে। সেই স্কুলেই আমাদের সকলের হাতে খড়ি। সেখান থেকে আমরা একে একে বেরিয়ে এসে শহরের হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করে, প্রত্যেকে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করি। একদিন রাতে আমরা যখন ঘুমে, বাবা মাকে বললেন, ফিরোজার ভর্তির ব্যাবস্থা করে এসেছি। বিদ্যাময়ী গার্লস  স্কুলে। আগামী সকালে তাকে নিয়ে যাবো। তাকে তৈরি করে দাও। ৬ টি ব্লাউজ, ৬ টি শাড়ি, ৬ টি পেটিকোট ইত্যাদি খুটিনাটি, সব কিছু লেখা একটি প্রোসপেক্টাস আম্মার হাতে দিলেন। আমার চোখের ঘুম উধাও। আমি মাকে ছেড়ে কি করে থাকবো? আমার প্রিয় বন্ধুরা, প্রিয় পেয়ারা গাছ, কুল গাছের আগডালে মগডালে চড়া, সারাদিন টো টো করে গ্রাম শুদ্ধ ঘুরে বেড়ানো, এসবের কি হবে? আমি সেখানে হোস্টেলে থাকতে পারবোনা। কিন্তু আমার প্রচন্ড রাগী বাবার সঙ্গে এমন কথা বলা অসম্ভব। সুতরাং এক বুক কান্না নিয়ে পরদিন প্রত্যুষে বাড়ি হতে বের হয়ে গেলাম। সব গুছিয়ে দিলেন আম্মা, হাতে দিলেন একটি টাকা।

তখনকার দিনে গ্রামাঞ্চলে যানবাহন ছিলনা। ছিল দুই বেহারার ডুলি। তাতে চড়ে ধলা রেল স্টেশনে  পৌঁছালাম। কারণ ঐ বয়সে পদব্রজে ৫ মাইল পথ অতিক্রম করা সম্ভব ছিলনা। আম্মা এদিকে রিক্ত হলেন। সারাদিনের শতকাজের মধ্যেও তাঁর চোখের জল শুকায় না। কয়েক বছর পর আমার বাবা আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা আজিজ আহমেদকে নান্দিনা স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। আমার মা এবার সম্পুর্ণ শুন্যতার মধ্যে পড়ে গেলেন। তার  শৈশবের একাকীত্ব আবার তার কাছে ফিরে এলো। সপ্তাহান্তে একটি চিঠির অপেক্ষায় থাকতেন তিনি। বড় ভাইয়েরা তখন স্কুল কলেজের গন্ডি পেরিয়ে অনেক দূরে। কেউ প্রেসিডেন্সি কলেজে, কলকাতা মেডিকেল কলেজে, কেউ অন্যান্য কলেজে ভর্তি হয়ে পুরোদমে লেখাপড়া করছে। ছুটিতে আমরা বাড়িতে এলে মায়ের খুব আনন্দ হত। খুব যত্ন করতেন আমাদেরকে, যেন অতিথি, মেহমান!

একবার শীতের সময় বার্ষিক পরীক্ষার পর বাড়ি এসে দেখি তিনি ভয়ানক অসুস্থ। তার শ্বাস কষ্ট অ্যাজমা হয়েছে। ব্রংকিয়াল অ্যাজমা। শ্বাস প্রশ্বাসের কষ্ট যে এত ভয়ংকর হতে পারে, তা কল্পনার বাইরে ছিল। একটি দম শেষ হতে না হতেই আরেকটি দম এসে শ্বাস টেনে ধরে। উপর্যুপরি শ্বাস টানার ফলে ব্যক্তিটি হাঁপিয়ে ওঠেন। সেজন্য হয়ত এর আরেক নাম হাঁপানি রোগ। আমার মায়ের এহেন কষ্ট দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। এতই কষ্ট যে কথা বলারও সময় দেয় না। এই অ্যাজমা রোগ বাকি জীবনের সঙ্গী হয়ে রইল। তিনি কিছুটা সুস্থ হলেন। আমার ছুটীও শেষ হল। আমরা একে একে বাড়ি থেকে যার যার হোস্টেলে চলে গেলাম। উনার একাকীত্বের সঙ্গী হয়ে রয়ে গেল ঐ ভয়ানক ব্যাধি। জীবনের বাকি ত্রিশটি বছর তিনি এই নিষ্ঠুর ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে জীবন কাটিয়েছেন। আমরা কেউ তাকে সঙ্গ দিতে পারিনি। তিনি কাউকে তার সঙ্গে থাকার জন্য অনুরোধ বা জোর করেননি। কত ঝড় ঝঞ্ঝা, কত গ্রীষ্ম, কত বর্ষা একা ঘরে একাকী অবস্থায় দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী অতিক্রম   করেছেন। যতক্ষণ ভাল থেকেছেন, ততক্ষণ সংসারের কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।

আমার মা জুবাইদা খাতুন পরম দয়ালু ছিলেন। মানুষের কষ্ট দূর করার চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে খাবার  দিয়ে খুব সাহায্য করতেন। কেউ অভুক্ত দরজায় এসেছে তাকে ফিরাতেন না। “মাফ কর” কখনও বলেননি। খাদ্য দিয়ে, চাউল দিয়ে, টাকা দিয়ে সাধ্যমত সাহায্য করতেন। তার হাতের রান্না ছিল উৎকৃষ্ট। অনেকেই অসুস্থ হলে উনার হাতের রান্না করা বিশেষ খাবারের আবদার করে পাঠাতেন। আমার মা সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যাবস্থা করে পাঠিয়ে দিতেন। তারা বলতেন, তোমার মায়ের হাতের রান্না যে খেয়েছে তার জীবন সার্থক।

বাড়িতে মাহে নাও, সওগাত, মাসিক মোহাম্মদী ম্যাগাজিন আসতো। আমার বাবা, ভাইয়েরা বাড়িতে  আসার সময় খবরের কাগজ নিয়ে আসতেন। সেগুলো তিনি পুংখানুপুংখ রূপে পড়তেন এবং সংরক্ষণ করতেন।  সেজন্য সমসাময়িক পৃথিবীতে কোথায় কি ঘটছে সব জানতেন। তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ দেখেছেন, খবর রেখেছেন। উনার নিকট থেকে পরবর্তী কালে আমরা এসব যুদ্ধের অনেক তথ্য জানতে পারি। জাপানীদের রেঙ্গুন আক্রমনের পুরো ঘটনা তার কাছ থেকেই শুনেছি। ইতিহাসে যা পড়েছি তার চেয়েও বেশী। কারণ আমার ছোট মামু মোহাম্মদ জাকারিয়া তখন রেঙ্গুনে চাকুরী করতেন। আক্রমনের সময় বাংকারে চলে যান। পরে সেখান থেকে বের হয়ে ৯ দিন ৯ রাত আসামের জঙ্গলের ভিতরে হেঁটে সিলেটের সীমান্তে এসে পৌঁছান।

জুবাইদা খাতুন মুগলদের ইতিহাস পড়তেন। নবাব সিরাজুদ্দৌলার কথা, পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কথা সব যুদ্ধের গল্প আমাদেরকে বলতেন। ধর্মের সকল পুস্তক তার কন্ঠস্থ ছিল। কোরান হাদিসের কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। পুঁথি সাহিত্যে তার দখল ছিল। সুন্দর সুললিত কণ্ঠে পুঁথি পাঠ করতেন। গ্রামে তাকে সকলেই ভালবাসতো। মেয়েরা যে কোন সমস্যা নিয়ে সর্বদা তার কাছে আসতেন। ধর্মীয় পরামর্শ ও শিক্ষা তার কাছ হতেই নিতেন।

আমার মায়ের রাগ ছিলনা। ছিলনা কারো বিরুদ্ধে বিদ্বেষ। তিনি ছিলেন সহনশীলতার প্রতীক। একটি আলোর প্রদীপ। যে আলো মানুষকে পথ দেখায়, দহন করেনা। পরবর্তীতে রেডিও আসার পর নিয়মিত খবর শুনতেন। তিনি গ্রামের মেয়েদের পথ প্রদর্শক ছিলেন।

আমার পিতা অত্যন্ত প্রতাপশালী এবং দাপটের লোক ছিলেন। সমাজ সেবা তার জীবনের আদর্শ। আজকালকার যুগে যেমন স্বামী স্ত্রীরা একসঙ্গে পরামর্শ করে ঘর-সংসার পরিচালনা করেন, সে যুগে তেমনটি ছিলনা। তখন গৃহকর্তা ছিলেন সকলেরই গার্জিয়ান। তার নাম হুকুম আর বাকীদের নাম তামিল। এই হুকুমের  নড়চড় নেই। সেই কারণেই আমার পরিশিলিত হৃদয়বান, সংস্কৃতিবান মাতা জুবাইদা খাতুন নিঃসঙ্গ ছিলেন। বই –পত্র পত্রিকা, কবিতা, ছড়া, গজল, এসবকে সঙ্গী করে নিমগ্ন থাকতেন। অবসর সময়ে আলস্যে ব্যয় করতেন না।  তবে তার কোন আফসোস ছিলনা। একাকীত্বের মাঝেও তিনি পূর্ণতা লাভ করেছেন বইয়ের মধ্যে। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। অনুযোগ নেই।

পিতা আব্দুস সোবহান বিশ্বাস রাগী হলেও আমার মায়ের উপর ছিল অগাধ বিশ্বাস আর পরম নির্ভরতা। কোন সিদ্ধান্ত নেবার আগে মাকে জানাতেন। লেখাপড়া শেষে আমরা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লাম। পিতা অবসর নিলেন। বাড়িতে এলেন। ধর্ম-কর্ম, সমাজসেবায় আরো মনোযোগী হলেন। মাতা ঘর-সংসার আর শ্বাস কষ্টকে সঙ্গী করে চলতে লাগলেন। সবকিছুই একদিন শেষ হয়। তাই তিনিও ১৯৮২ সালের ২৬ শে জুলাই সকল মমতার বন্ধন ছিন্ন করে জান্নাতবাসী হলেন।

মা শব্দটি কত না মধুর। কতই না সুন্দর। অনেক ভাষায় আমার জানামতে, মা শব্দের সঙ্গে ‘ম’ শব্দটি জড়িত এবং ‘ম’ তেই মধু। মাতা একটি পরিবারের পত্তন। পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু। সন্তানের জননী। সন্তানের চাইতে প্রিয় ধনসম্পদ মায়ের কাছে আর কিছুই নেই। দিবা রাত্রি অষ্টপ্রহর মা বক্ষে জড়িয়ে তার সন্তানের সেবা –যত্ন আর নিরাপত্তা রক্ষা করে থাকেন। তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি থেকে শুরু করে মানুষের মত মানুষ করবার প্রয়াসে নিয়োজিত থাকেন।

আমাদের মা আমাদেরকে সৎ এবং সুশীল মানুষ হবার দীক্ষা দিয়েছেন। পরম সতর্কতার সঙ্গে আমাদের মানসিক বিকাশের পথ সুগম করে দিয়েছেন। তাই তাঁর সন্তানেরা আজ নিজের নিজের জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। পরের জন্য তাদের হৃদয় কুসুমকে প্রস্ফুটিত করেছেন। এমন মায়ের সন্তান হয়ে আমরা গর্বিত। সার্থক জনম মাগো জন্মেছি তোমার কোলে। তোমার আত্মা পরম শান্তি লাভ করুক অনন্তকাল – এই প্রার্থনা আমার।

অমোঘ বিধান

 মানুষ মৃত্যুর অধীন। জন্ম, মৃত্যু মানুষের নিজের ইচ্ছামতো হয় না। মানুষ ইচ্ছা করে জন্মগ্রহণ করতে পারে না, আবার ইচ্ছা করে মরেও যেতে চায়না। অমর কবি ওমর খৈয়াম তার চতুষ্পদী কবিতার একটিতে এই সত্যটি বয়ান করেছেনঃ

‘স্রষ্টা যদি মত নিত মোর আসতাম না প্রাণান্তেও,

এই ধরাতে এসে আবার যাবার ইচ্ছা নেই মোটেও।’

(কাজী নজরুল ইসলামের ‘রুবাইয়াৎ’ অনুবাদ)

ধার্মিক ব্যক্তিরা বলেন, মৃত্যু যখন আসে, তখন ‘সে’ চলে যায় পারাপারে। তার এক পল আগেও নয় কিংবা এক দন্ড পরেও নয়। যখন যার আয়ুর বরাদ্দ শেষ হয়, তার শেষ নিঃশ্বাস পড়ে, তখনই তার জীবনাবসান ঘটে। এই–ই বিধাতার বিধান, অনিবার্য, অমোঘ। দীর্ঘ কর্মময় জীবনের সমাপ্তি টানার পূর্বেই যার ডাক এসে যায় তাকে যেতেই হয়। কর্মহীন যার জীবন,তাকেও সময় হলে চলে যেতে হয়।

মৃত্যুর হীমশীতল পরশ থেকে রাজারও নিস্তার নাই। মহাজ্ঞানী, মহাজন, মহা শক্তিধর সম্রাট, দরবেশ, সংসার ত্যাগী সন্ন্যাসী, দীনহীন জন –সকলকেই একদিন ভূতলে পতিত হতে হয়। আর উঠে দাঁড়াতে পারেনা। মৃত্যুই একমাত্র শক্তি যে সকলকে সমান করে দেয়। ‘ডেথ ইজ দ্যা লেভেলার।‘ সকল অহংকার, শান শওকত ধূলায় লুন্ঠিত হয়। একবারও আর উঠে বলতে পারে না, ‘এই যে আমি আছি, থাকবো তোমাদের কেউ হয়ে, তোমাদের মাঝে।’ জীবিত যারা তারা যেতে দিতে চায় না। তবুও সে চলে যায়, কে জানে কোথায়!

‘জন্মিলে মরিতে হবে/ অমর কে কোথা কবে।

চির স্থির কবে নীর/ হায়রে জীবন নদে।’


মরণ মানুষের অবধারিত পরিণতি। তার্কিকগণ বলেন যদি তাই হয় যে, যার যখন মৃত্যু লেখা থাকে তখনই তাকে যেতে হবে, আগেও নয় পরেও নয় তবে মানুষের এত সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন কি? তার গৃহের অর্গল বন্ধ করবার দরকার কি? সাবধানতার সাথে পথ চলবার, রাস্তা অতিক্রম করবার, দস্যু তস্করকে ভয় করবার কোন কারণ থাকে না। নির্ভাবনায় সে পথ চলবে কি দিবসে, কি নিশীথে, কি লোকালয়ে, কি জঙ্গলে, কি ঝড়ে, কি জলে, কি ট্রাকের সম্মুখে, কি রেল লাইনে। সৃষ্টিকর্তার হুকুম না হলে তো তার মৃত্যু ঘটবে না। সুতরাং নিশ্চিন্তে কেটে যাবে তার সারাটি জীবন।

মানুষের যত ভয় আছে তার মধ্যে মৃত্যু ভয় প্রধান। জন্মের পরমুহূর্ত হতে সে বাঁচার চেষ্টায় নিজেকে ব্যাপৃত রাখে। এটা এক সহজাত প্রবৃত্তি। অবোধ শিশু, নির্বোধ – সকলেই এই সহজাত আবেগের অধীন। ‘মরিতে চাহিনা এই সুন্দর ভুবনে’ – এ কথাটি চরম সত্য। রবিনসন ক্রুশো জাহাজ ডুবির পর এক নির্জন শ্বাপদ সংকুল অরণ্যে এসে আশ্রয় লাভ করে। তাকে বেঁচে থাকার জন্য, নিরাপদ থাকার জন্য কতই না উপায় অবলম্বন করতে হয় এবং সেসব কর্ম কতই না কঠিন।

অসুখে বিসুখে আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে যে ভয়টি লুকিয়ে থাকে তা হলো মৃত্যুভয়। কেবলমাত্র আরোগ্য লাভের জন্য আমরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই তা নয় মৃত্যুর দরজায় যেন না পৌঁছাই তার জন্য একটি প্রয়াস এই চিকিৎসা। রোগ ব্যাধি ছাড়াও দস্যু –তস্কর, ঝড় – ঝঞ্ঝা, ভূকম্পন, দুর্ঘটনা ইত্যাদি নানাপ্রকার বিপদ থেকে ত্রাণ পাওয়ার জন্য আমরা সদা সতর্ক থাকি। আমরা দিবস রজনী একটি সংগ্রামে লিপ্ত থাকি সেটি হলো বাঁচার সংগ্রাম, মরে যাওয়ার সংগ্রাম নয়। যার ধনসম্পদ নেই, শরীরের অংগ প্রত্যঙ্গের হানি হয়েছে কোন কারণে, তারও বাঁচার আকাঙ্ক্ষা অন্যদের তুলনায় কম নয়। তাদের সংগ্রামও বাঁচার সংগ্রাম। মানুষের চারিদিকে যেন মৃত্যুকূপ। একটু আসাবধান হলেই তার চোখের সামনে আজরাইল ফেরেশতা এসে হাজির হবে। 

কিন্তু কেন, কেন মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবার এত কৌশল অবলম্বন করে? কেন নিশ্চিন্ত থাকতে পারেনা, সে কেন নির্ভয় হতে পারেনা, কেন নিজেকে প্রকৃতির হাতে সৃষ্টিকর্তার হাতে সঁপে দিতে পারেনা? তার উত্তর হলো মানুষ বাঁচতে চায় – অন্য যে কোন প্রাণীর মতোই। মানুষ জীবনকে খুব ভালবাসে। প্রাণের চাইতে অধিক প্রিয় আর কিছুই নয়। মৃত্যু আছে বলেই বাঁচার আকাঙ্খা এত প্রবল। মরণ না থাকলে মানুষের বেঁচে থাকার মজাটাই নষ্ট হয়ে যেত। পৃথিবী এত সুন্দর হতো না তার কাছে। প্রিয়জনেরা এত প্রিয় হতোনা। পারস্পরিক মধুর সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়তো। মানুষের প্রধান আকর্ষণ যে মানুষের ভালবাসা পাওয়া সেটার প্রয়োজন যেত ফুরিয়ে। মানুষ এক ছন্নছাড়া দিশেহারা ভবঘুরে প্রাণীতে পরিণত হতো। ‘আশরাফুল মখলুকাত’ হতে পারতো না। 

যা বলছিলাম তর্ক–বাগীশদের যুক্তির কথা। তারা বলেন আত্মরক্ষার প্রয়োজন কি? লাভ নেই। ডাক আসলেই চলে যাবে – ঠিক সময়ে। ঘর দরজার দরকার নেই। পুলিশ বাহিনী, সেনা বাহিনী, সীমান্ত রক্ষী বাহিনী সব অর্থহীন।  আত্মরক্ষার জন্য, দেশ রক্ষার জন্য অশ্ত্র - শস্ত্র তৈরী অর্থহীন। কারণ ভাগ্যে যখন মরণ লেখা আছে, তার বিরুদ্ধে তো যাওয়া যাবেনা। উজির নাজির রাজা বাদশাদের সশস্ত্র প্রহরী সংগে নিয়ে চলার কোন অর্থ নেই। অদৃষ্টের লিখন তারা খন্ডাতে পারবে না। কথায় বলে, ‘মৃত্যু আছে যেখানে, নাও ভাড়া করে যায় সেখানে।’ সুতরাং এ বিষয়টি বিধাতার হস্তে ন্যস্ত করাই বুদ্ধিমানের কাজ। উদ্বিগ্ন হয়ে লাভ নেই। হজরত ওমর (রাঃ), হজরত ওসমান (রাঃ), হজরত আলী (রাঃ)- এরা সকলেই ঘাতকের হাতে প্রাণ দিয়েছেন। বিধির লিখন ছিল বলেই। হযরত আলীর দুই পুত্র ইমাম হাসান,ইমাম হুসেইন যথাক্রমে বিষ প্রয়োগে এবং কুখ্যাত কারবালা মরু প্রান্তরে শত্রুর হাতে নিহত হয়েছিলেন। ভাগ্যে লেখা ছিল বলেই।  

এই যে মানুষের নিরন্তন আত্মরক্ষার প্রয়াস, তার প্রধান কারণ হচ্ছে মনুষ্য প্রাণ সর্বাপেক্ষা মূল্যবান। ‘মানব জনম সার/ এমন পাবেনা আর।’ মৃত্যু সামনে আছে বলেই বাঁচার বাসনা এত প্রবল। জন্ম মৃত্যুর মাঝখানের অংশটুকুই জীবন। এই জীবনটুকু যতখানি দীর্ঘায়িত করা যায়, এইই মানুষের চিরন্তন চাওয়া। আদম (আঃ) এর সময়  হতে কেয়ামতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা সমান থাকবে।

মৃত্যু কখন দরজার করাঘাত করবে জানিনা। তবুও ইচ্ছা করে মৃত্যু দূরে থাকুক – বিলম্বে দেখা দিক। পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ সব উপভোগ করি। সেইজন্য নিজেকে প্রতি মুহূর্তে সুরক্ষিত রাখতে সচেষ্ট হই। পরিবারের, সমাজের, দেশের সকলে ভাল  থাকি। ভালবাসার বন্ধনে সুখের সন্ধান করি, শান্তি লাভ করি, আনন্দ পাই, জীবন সার্থক করি, হিংসা – দ্বেষ ভুলে গিয়ে আনন্দের সেতু বন্ধন গড়ে তুলি। ‘গলায়ে গলায়ে বাসনার সোনা’ দিয়ে প্রতিদিন আমরা জীবনকে নিত্য নব নব আনন্দ সম্ভারে সাজিয়ে তুলবার প্রয়াস পাই।  

বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন। তা সত্বেও পৃথিবীতে কিছু লোক আছে যাদের অন্তর কোন না কারণে বেদনায়, যন্ত্রণায় কিংবা আঘাতে আঘাতে জর্জরিত। পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ সব তার কাছে ম্লান হয়ে গিয়েছে। জীবন তাদের নিবিড় ঘন আঁধারে আচ্ছন্ন। প্রিয়জন কিংবা সমাজ  তাকে দুঃখ  দিয়েছে। দিয়েছে চরম বঞ্চনা। তাদের কেউ হয়তো নক্ষত্রের পানে চেয়ে মৃত্যুকে আহ্বান জানায়। সে ভাবে মৃত্যুই একমাত্র শরণ, যে তার জীবনের জ্বালা জুড়াতে সক্ষম। মানুষের উপর তার আস্থা হারায়, ভালবাসার বন্ধন ছিন্ন হয়, সে বিদায় নিতে চায় অকালে, আত্ম হননের পথে। স্বেচ্ছায় বরণ করে মৃত্যুকে। পুনরায় সেই কথাই মনে পড়ে  - ‘এ ভাবেই লেখা ছিল তার মরণ।’  তাই আত্মহত্যার পথ তাকে বেছে নিতে হল।    

লোকে বলে, যে আত্মহত্যা করে তার জন্য শাস্তির বিধান কেন? শাস্তির বিধান ধর্মে আছে, দেশের আইনেও রয়েছে। কারণ মানুষের প্রাণের চাইতে মূল্যবান আর কিছু নেই। সেই অমূল্য সম্পদ এভাবে অপঘাতে, ইচ্ছাপূর্বক ইতি টানুক ত্যা বাঞ্ছনীয় নয়। প্রাণ হরণ পাপ, অপরাধ, তা পরের হোক আর নিজের হোক। সে হত্যাকারী। তবে নিজের প্রাণ হননের পর তাকে শাস্তি দেয়া যায় না। তবু যদি বেঁচে যায় তবে তাকে শাস্তি পেতে হয়। মরে যাওয়ার পরও সৎকারে স্বাভাবিক সম্মানজনক নিয়ম পালন করা হয় না। এটাও সেই মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদানের পর্যায়ে পড়ে। এই সুন্দর পৃথিবীতে আর ফিরে আসা যাবে না। সুতরাং একবারই মানুষের মানব জন্ম, দুর্লভ জন্ম, সার্থক হোক। 

মানুষের কাজ হলো বেঁচে থাকবার প্রয়াস চালানো। নিজে বাঁচবে, অন্যকে বাঁচতে সাহায্য করবে। ধরণীর ফুল, ফল, মাটি, জল, শস্য, নিসর্গ – সব উপভোগ করে ধন্য হবে। তারপর যখন মরণ আসবে তখন হাসিমুখে চলে যাবে। তখন যেন বলতে পারে আমার জন্ম সার্থক, জীবন ধন্য, মরণ  সুখের হলো। ‘মরণরে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান।’

‘যে মাটি হতে আমার উত্থান, সেই মাটিতেই আমার পতন, আবার সে মাটিতেই আমি মিশে যাব।’ সেই আমার সুখ, সেই আমার শান্তি।

আমার শৈশব

বসন্তের বিকাল। বসে ছিলাম দ্বিতলের বারান্দায়। একখানি বই হাতে। নামে মাত্র পড়ার ভান করে তাকিয়ে ছিলাম সম্মুখপানে। সারাদিন ভ্রমন করে সূর্যি মামা ক্লান্তিতে ঝিমিয়ে পড়েছে। ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে দীপ্তি। নিভে যাওয়ার পূর্বে সে তার এই তেজহীন আভাকে রূপান্তরিত করেছে সোনালী আলোতে। আর সেই সোনালী আলো মাখিয়ে দিয়েছে সকল প্রকার মানুষের মনে। এরকম ভালো লাগার আমেজে সকলেই উৎফুল্ল। বেশী উৎসাহীরা খেলছে, নিরুৎসাহীরা খেলা দেখছে। সেই নিরুৎসাহীদের দলে আমি একজন। সামনের মাঠে ছেলেমেয়েরা খেলা করছে। তাই দেখছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম যদি ওদের সঙ্গে মিশে খেলা করতে পারতাম। আমি আসলে স্বার্থপর। অন্যকে আনন্দ দেবার চেয়ে নিজে আনন্দ উপভোগ করতে ভালবাসি। খেলোয়াড়গণ প্রাণপণ খেলে দর্শকদের দেয় অনাবিল আনন্দ। আর আমরা অনেক সময় তা দেখতেও যাইনা। এসব কথা ভাবতে ভাবতে সহসা মনে পড়ে গেল অতীতকে। আমরাও তো একদিন এমনি ছোটাছুটি করতাম। সব কাজে আগ্রহ ছিল প্রবল। আনন্দ পেতাম প্রচুর। এমনি ভাবে অতীতের প্রতিটি ঘটনা আজ মনের কোণে স্মৃতি হয়ে ভিড় করেছে। তারা যেন দীর্ঘকালের অদর্শণীয় প্রিয়জনকে পেয়ে কে কার আগে অভ্যররথনা জানাবে সেজন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। তাই হারিয়ে যাওয়া মধুর অতীতকে কৃত্রিম ভাবে পাওয়ার আশায় স্মৃতির খাতার পাতা উল্টাতে শুরু করলাম।  
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘প্রকৃতি ছিল মুক্ত, আমি ছিলাম বন্দী। তাই মুক্তর প্রতি বন্দীর আকর্ষণ স্বভাবতঃই প্রবল ছিল।’ কিন্তু আমার বেলায় প্রকৃতিও মুক্ত ছিল, আমিও ছিলাম মুক্ত। কাজেই বন্দি হিসেবে মুক্ত প্রকৃতির  প্রতি কতটুকু আকর্ষণ থাকতে পারে, সেরকম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার নেই। আমি মুক্ত বিহংগের ন্যায় ডানা মেলে সীমাহীন প্রকৃতির কোলে স্বাধীনভাবে বিচরণ করেছি।

যদ্দূর মনে পড়ে তখন আমার বয়স ছিল তিন বৎসর। বেশীর ভাগ সময়েই মায়ের কাছে থাকতাম। বাকী সময় আমার সমবয়সীদের  সঙ্গে মিলে মিশে খেলা করতাম। সেই ছোটবেলা থেকে আমি আমাদের দলের সর্দারি করতাম। ওরা সবাই আমার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতো। এভাবেই কেটে গেল আরো কিছু কাল। মায়ের নিকট থেকে বাধ্য হয়ে সরে আসতে হলো। আমাদের আশেপাশে কোন প্রকার স্কুল ছিলনা। আমাদের পড়াশুনার সুবিধার জন্য আমার পিতা বাড়ির পাশে একটি ঘর তৈরী করেন। তিনি নিজের সাধ্যমতো স্কুলের আসবাবপত্র ক্রয় করেন। তারপরেই একজন সুযোগ্য মৌলভী সাহেবকে শিক্ষক হিসাবে নিযুক্তি প্রদান করেন। তার নাম ছিল মোহর আলী। আমার বাবা গ্রামের প্রত্যেকের ঘরে ঘরে গিয়ে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ছাত্রী জোগাড় করে এই স্কুল আরম্ভ করেন। ক্রমেই এই স্কুলে পড়াশুনা করবার পালা পড়লো আমাদের দলের।  আমরাও স্কুলে গেলাম। ভর্তি হওয়ার কোন রেওয়াজ ছিলা না সেই সময়ে। আমি খুব ছোট থেকেই স্কুলে যেতাম। কারণ স্কুলটি ছিল বাড়ির পাশেই। পড়াশুনা করতাম কি না মনে নেই। তবে ইংরেজী বর্ণ পরিচয়ের কথা মনে আছে। ছোট একটি বই টানা টানা বড় বড় অক্ষরে পূর্ণ ছিল। তাদের নীচে আবার বাংলায় উচ্চারণ লেখা ছিল। যেমন ‘C’ এর নীচে ‘ক’, ‘G’  এর নীচে ‘গ’ ইত্যাদি। উর্দূ বর্ণ পরিচয়ের কথাও বেশ মনে আছে। আরবী থেকে একটু আলাদা। নিজেরা কালো কালি্ প্রস্তুত করে বাঁশের কঞ্চির কলম অথবা পাখির পালকের কলম দ্বারা কলা পাতায় মোটা মোটা করে যথাসাধ্য সুন্দর উর্দু অক্ষর তৈরী করতাম। তখন আমার লেখাই সবচেয়ে সুন্দর হতো। তাছাড়া পড়াশুনার দিক দিয়ে আমি অন্যদের চাইতে ভাল ছিলাম। আমাদের বাড়ির সকলেই পড়াশুনা জানতো। কিন্তু অন্যদের বাড়ির সবাই লেখাপড়া জানতো না। কেবল স্কুল ছাড়া ওদের পড়া লেখাপড়ার চর্চা ছিল না। আমি বাড়িতে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতাম না। স্কুলের বই নিয়ে পড়াশুনা করতাম। সেজন্য আমার সমবয়সীরা আমাকে তাদের চেয়ে বড় করে দেখতো এবং আমাকে খুব ভালবাসতো। আমিও প্রতিদান দিতে কার্পণ্য করতাম না। পড়ালেখায় সাহায্য করতাম। স্কুলের শিক্ষক মৌলবী সাহেব আমাকে খুব স্নেহ করতেন। শহর থেকে যারা স্কুল পরিদর্শন করতে আসতেন তারাও আমার খুব প্রশংসা করে যেতেন। মোটামুটি এই ছিল আমার একদম ছোটবেলার স্কুল জীবনের কথা।

শৈশবের বেশীর ভাগ সময় কাটতো খেলাধুলায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে  কাপড় জামা পরে নিতাম। যদি বাবা কিম্বা আমার ভাইয়েরা কেউ বাড়িতে থাকতেন, তাহলে খুব চিৎকার করে ছোট ছোট গল্প পড়ে ফেলতাম। ছড়া ও কবিতাও সুর করে আবৃত্তি করতাম। আর যদি শাসক শ্রেণীর কেউ বাড়িতে না থাকতো, তবে আমি রাম রাজত্ব পেয়ে যেতাম। সকালেই সব বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে যেতাম। আমাদের আড্ডা হতো ঐ স্কুল ঘরে। তাছাড়া স্কুলের পেছনে বাগানের আনাচে কানাচে ছিল আমাদের খেলা ঘর। ছোট ছোট ঘর। সেখানে আমরা সর্বপ্রকার বিদ্যা – যতরকম খেলাধুলা সম্ভব – সব অনুশীলন করতাম। আমরা সব কাজে পাকা হয়ে উঠেছিলাম। পনের ষোলজন মেয়ে দিনের বেশীর ভাগ সময়ে একত্রে কাটাতাম। আমাদের পাড়া থেকে যারা একটু দূরে থাকতো তারা মাঝে মাঝে আমাদের দর্শন দিয়ে আনন্দ দিয়ে যেত।  

আমরা সেখানে ধুলাবালি দিয়ে ছোট ছোট মাটির হাঁড়ি বাসন যোগাড় করে ভাত রান্না করতাম। রাঙ্গা মাটি দিয়ে হলুদ, নানাপ্রকার ঘাসফুল দিয়ে লবঙ্গ, কাঁচামরিচ, গুলমরিচ তৈরী করতাম। মান্দারের লালফুল শুকিয়ে শুকনামরিচ তৈরী করে রাখতাম। মান্দারের গাছে যে ফল হয় তা শিম হিসাবে রান্না করা হতো। কলা পাতার ডাঁটা দিয়ে গরু, ছাগল বানিয়ে সেগুলো জবাই করে নানাপ্রকার মশলার মিশ্রণে কোরমা, কালিয়া তৈরী করতাম। হলুদ মাটি জলের সঙ্গে মিশিয়ে সেটা ডাল হিসাবে রান্না করা হতো। ঘৃতকুমারী পাতার ঘন রস দিয়ে সবুজ দই তৈরী হতো। তারপর গৃহিনীপনা শেষ করে সব্বাই গোসল করতে যেতাম, জলহীন ঢালু জমিকে পুকুর কল্পনা করে।   মনের সুখে আমরা সেখানে কল্পনা–সাগরে  সাঁতার কেটে আনন্দ পেতাম। স্নান সমাপনান্তে সুন্দর পোশাক পরে খাবার খেতে বসতাম। একপ্রকার অদ্ভুত শব্দ করে পরম তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়া দাওয়া শেষ করে খুব তাড়াহুড়ো করে আমাদের কৃত্রিম স্কুলে হাজির হতাম। ঐ স্কুলের মাস্টার ছিলাম আমি। ওরা আম, কাঁঠাল আর তালের পাতা নিয়ে পড়া শিখতে বসে যেত। পড়া না পারলে খুব করে আমাদের মৌলবী সাহেবের মতো শাসাতাম। ঐ ক্ষুদে মাস্টার সেজে আমি খুব গম্ভীর হয়ে বসতাম। ওরা আমাকে সত্যিকারের মাস্টারের মতো মেনে নিত। তারপরে খুব জোরে জোরে ‘শতকিয়া, কড়াকিয়া’ পড়িয়ে ছুটি দিয়ে দিতাম।

ছুটি পেয়ে সবাই যার যার বাড়ি গিয়ে খাওয়া দাওয়া করে হরিরামপুর ভাটিপাড়া বালিকা মক্তবে এসে হাজির হতো। মক্তবটি ছিলা আমদের বাড়ির পাশেই। আমিও ওদের সঙ্গী। ওদের তুল্নায় আমার বই–খাতা বেশী ছিল। সবগুলো বই–খাতা, শ্লেট–পেন্সিল স্কুলে নিয়ে যেতাম।  আমার বই–পত্র আমার বন্ধুরাই রোজ নিয়ে যেত। আমি কেবল কোরান শরীফখানি বুকে চেপে ধরে নিয়ে যেতাম। স্কুল ছুটি হলে ওরা আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে নিজেদের বাড়ি চলে যেত। খুব দ্রুত দক্ষিণ হস্তের কর্ম সমাপন করে আমাদের বাড়ি চলে আসতো। আমাদের বহির্বাটির উঠোনে পুরোদ্যমে আমাদের খেলাধুলার কার্যক্রম শুরু হয়ে যেত। আমাদের ছোট ছোট ক্ষেত ছিল। সেই ক্ষেতে চাষ করে নানারকম শস্য লাগাতাম। অন্যন্য চাষীরা যেরকম শস্য রোপণ করে আমরাও তাই করতাম। ছোট পুকুর বানাতাম। কলার খোলের দোন দিয়ে পুকুর থেকে পানি তুলে সেখানে মাছ ছেড়ে দিতাম। যদিও ছোট ছোট মাছ।
বিকেল বেলায় খেলাধুলায় মেতে থাকতাম। প্রতিদিন বিকেলে পাড়ার সব ছেলেমেয়েরা খেলার মাঠে হাজির থাকতো। দাড়িয়া –বান্দা, গোল্লাছুট, হাডু-ডু, লুকোচুরি ইত্যাদি অনেক খেলাই আমরা খেলতাম। অনেকদিন ফুটবলও খেলতাম। ছোট রবারের বল দিয়ে ফুটবল খেলার আনন্দ পেতাম। ব্যথাও পেয়েছি পড়ে গিয়ে। নানারকম বিচিত্র খেলা, খেলা হতো। সেগুলো ছিল আমাদের নিজেদের আবিষ্কার। অনেক সময় খেলতে খেলতে মিছেমিছি রাত হয়ে যেত। তখন আমরা কলাপাতা বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম।   

আমাদের খেলাঘরটি ছিল তখন বিরাট এক কাঁঠাল গাছের গোড়ায়। বড় বড় শিকড়ের দু’পাশে সে সব খুব সুন্দর করে লেপে পরিষ্কার করে রাখতাম। আমরা যখন ঘুমাতাম আমাদের  সংগীদের  কেউ চোর সেজে শিকড়ের নীচ দিয়ে সিঁদ কেটে পুতুলের কাপড় –চোপড়, থালা বাসন চুরি করে  নিয়ে যেত। আমরা যথাসময়ে ‘চোর চোর’ বলে  চিৎকার করে ছুটে যেতাম। অনেক আয়াশে বেচারাকে ধরে নিয়ে আসতাম। তখন আমি হতাম দারোগা। আমার কাছে চোরকে ধরে নিয়ে আসতো। আমি ওদেরকে কাঠগড়ায় কোন গাছের শিকড়ের গোড়ায় দাঁড় করিয়ে  সাক্ষী  নিতাম। তারপর ন্যায় বিচার করে অপরাধীকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিতাম  বা দীপান্তরে পাঠাতাম বা কমপক্ষে বিশ বছরের জেল খাটার ঘোষণা দিতাম। সকলে মিলে ওকে অর্থাৎ চোরকে ধরে  বাড়ির উত্তর দিকের জঙ্গলে রেখে আসতাম। কতক্ষণ সে শাস্তি ভোগ করতো  তারা, সেটাও মজার বিষয় ছিল। কারণ চোরের সঙ্গে চৌকিদারের ও সাজা হতো।  ঘুমন্ত পুরীর শান্তি রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য তারও নিস্তার ছিলনা।

আমরা ডাক্তারীও করতাম। ‘জিগার’ গাছের আঠা অনেক সময় সিরিঞ্জের আকারে গাছ থেকে পড়তো। সেগুলো সংগ্রহ করে গ্রামে সকলকে মিছেমিছি কলেরার ইনিজেকশান, বসন্তের টিকা দিয়ে দিতাম। সকলেই বলতো ‘উহ্‌ কি ব্যথা।’ আমাদের দোকানও ছিল। ভাঙ্গা কাঁচ চিনামাটির টুকরা দ্রব্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হতো। মাটির বাসনের টুকরাগুলো এক পয়সা ধরে নিতাম। পুতুলের শাড়ি, জামা, আমসত্ত্ব, কাঁচা আম আর লবণ, নানারকম মসলা, লাল মাটির গুড় প্রভৃতি বিক্রির দ্রব্য ছিল। লাভ হতো প্রচুর! গ্রামের লোকেরা আমাদেরকে গুড়, মুড়ি, পিঠে দিয়ে আপ্যায়ন করতো। আমরা বিদেশের সাথেও ব্যবসা করতাম। কাগজের নৌকা, কলার খোলের নৌকা তৈরী করে তাতে নানাপ্রকার দ্রব্যাদি দিয়ে ধান, চাউল, পাট, মসলা প্রভৃতি বিদেশে রপ্তানী করতাম। বৈদেশিক বাণিজ্য আমাদের ভালই চলতো। কারণ পুকুরের অপর পাড় থেকে আরেকদল মেয়ে আমাদেরকে তাদের মালামাল পাঠাতো।

কৃষকের বাড়ির উদ্বৃত্ত ছন, খড় দিয়ে ছোট ছোট ঘর তৈরী করতাম। পাট খড়ি দিয়ে ঘরের বেড়া দেওয়া হতো। চূন দিয়ে ঘরের মেঝেতে নানারকম কারুকাজ করা হতো। পাটের তৈরী শিকা ঝুলিয়ে তাতে হাড়িপাতিল  সাজিয়ে রাখতাম। পুতুলের জন্য খাট প্রস্তুত করে সেখানে সুসজ্জিত শয্যা পাতা হতো। চিকন তার দিয়ে পুতুলের অলংকার  এবং শাড়ি কাপড় বানিয়ে তাদেরকে মনের মতো সাজাতাম। সোনার খাটের পুতুলেরা সম্ভবত মনের সুখে ঘুমের দেশের স্বপ্ন দেখতো। মৌচাক থেকে মোম সংগ্রহ করে সেগুলো দিয়ে ওদের ঘরে প্রদীপ জ্বেলে দিয়ে আসতাম। পুতুলের জন্য পালকি ছিল। এবাড়ীর পুতুল ও বাড়ীতে বিয়ে দিয়ে আত্মীয়তা স্থাপন করতাম।
আমরা হাট বসাতাম। সেখানে  জিনিসপত্র বেচাকেনা হতো। আমরাই ক্রেতা, আমরাই বিক্রেতা।  পুতুলের জন্য সুন্দর সুন্দর শাড়ী, অলংকার বাজার থেকে কিনে আনতাম। আমাদের যানবাহনের অভাব ছিল না। আমরা সুপারীর খোলে অথবা কলা গাছের খোলে পালকি তৈরী করতে পারতাম। সুপারীর খোলে একেক জন উপবেশন করতো এবং বাকীরা খোলের পাতার গুচ্ছ ধরে টেনে পাড়াময় ঘুরে আসতো। আমরাই যাত্রী আমরাই বেহারা। বাদল দিনে কখনো গাছ পড়ে যেত ঝড়ে। সেই গাছকে ট্রেন বানিয়ে ফেলতাম। সেই ট্রেনে চড়ে আমরা ঢাকা অথবা ময়মনসিংহ চলে যেতাম। গাছের ডালে ঝাকুনী দিয়ে দিয়ে সকলে মিলে ঝিক ঝিক শব্দ করে শহরে বেড়াতে যেতাম।     আরো বলতাম ‘ঢাকা যাব টাকা পাব, যতই যাব, ততই পাব।’ আনন্দের আতিশয্যে নাচানাচি করতে করতে কেউ কেউ গাছ থেকে ছিটকে পড়েও যেত। ডাক্তার সেজে আমরা তার চিকিৎসা ও সেবা দিতাম। আমাদের সকলেরই ঘুড়ি ছিল। প্রতিদিন বিকেলে আমরা ঘুড়ি উড়াতাম। ঘুড়িতে সুন্দর সুন্দর করে নাম লিখে রাখতাম। খুব আনন্দের সঙ্গে ঘুড়ি সূতার সঙ্গে প্যাচ লাগিয়ে বকাট্টা করে চিৎকার করে উঠতাম। এত আনন্দ আর আনন্দ –রাখবো কোথায়!

আমরা যেখানে থাকতাম সেখানকার ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ প্রতিটি বস্তুর সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল। সর্বপ্রকার পাখির বাসায় আমাদের যাতায়াত ছিল। পাখির ডিম থেকে শুরু করে যে পর্যন্ত বাচ্চা না উড়তে পারে, সে পর্যন্ত প্রত্যেক দিন আমরা দল বেঁধে গিয়ে চুপিচুপি পাহারা দিয়ে আসতাম। টুনটুনি পাখিরা গাছ গাছালীর ঝোপের আড়ালে দুটি বড় পাতা একসঙ্গে করে তূলা দিয়ে আটকিয়ে বাসা তৈরী করতো। এই পাখির ইংরেজী নাম টেইলার বার্ড। এই পাখির ডিম হালকা সবুজ রঙের। ছোট ছোট ডিম। দেখতে খুব সুন্দর। একবার একটি ঘুঘু পাখির ছানা ধরে নিয়ে এসেছিলাম। কয়েকদিন রাখার পর আমার আসর্তকতার দরুণ উড়ে গিয়েছিল। সেদিন পাখিটার জন্য খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। যত্নের কোন ত্রুটি ছিল না। তবুও সে চলে গেল। ভেবেছিলাম ছানাটির কথা জীবনেও ভুলবো না। কিন্তু সেই মুক্ত ধর্মীয় পাখি শাবককে বন্দী করে রাখলে, তার কি দুঃখ হতো, তা তিলে তিলে উপলব্ধি করেছি। বনের পাখিকে খাঁচায় বন্দি করে রাখা উচিৎ নয় । তার জগৎ আকাশ, বাতাস, বৃক্ষরাজি। আমার গৃহের সুদর্শন খাঁচা নয়। এ সত্যটি অনুধাবন করে আমার সারাজীবনের জন্য একটি শিক্ষা লাভ হলো –বন্যেরা বনে সুন্দর।

আমার গাছে চড়ার ঝোঁক ছিল বেশী রকম। বাড়ির আশে পাশে এমন কোন গাছ নেই, যে গাছের শিরে আমি হাত দিয়ে আশীর্বাদ করিনি।  ঝড় বৃষ্টির দিনে যখন মৌলবী সাহেব ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়তেন, তখন আমরা সেই ফাঁকে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতাম। আম, জাম, কুল, তেঁতুল ইত্যাদি নিয়ে ফিরে আসতাম। অন্য মেয়েরা মৌলবী সাহেবকে বলে দিত। কিন্তু মৌলবী সাহেব আমাদেরকে মৃদু তিরস্কার ছাড়া আর কিছুই করতেন না। আমরা তখন শান্তশিষ্ট অথচ লেজ বিশিষ্ট প্রাণী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। সেদিন বাড়ি ফিরে মায়ের বকুনিওঃ খেতে হতো নির্ঘাৎ। বৃষ্টির দিন ব্যতীত দোলনা তৈরী করে আমরা পালাক্রমে দোল খেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেতাম।

এই তো গেল স্কুলে আধিপত্যের বিবরণ। এবার এলাম জলে। জলের নীচে প্রাণীরাও আমাদের খেলার শিকার হতো। মাছ ধরতে আমি খুব ভালবাসতাম। আমার  বড়শিতে বেশী মাছ ধরে বলে আমার তখন খুব সুনাম। কারো বড়শিতে মাছ না ধরলেও আমার বড়শিতে একটি হলেও মাছ ধরা পড়তো। মৎস্য শিকারে ব্যক্তি বিশেষের কোন গুণ থাকতে পারে বলে আমি আজও বুঝতে  পারিনা। তবে মাছ ধরার আনন্দ আছে।
সাঁতারেও আমি ছিলাম পটু। সন্তরণ প্রতিযোগিতায় আমি ছিলাম সকলের অগ্রভাগে। সেজন্য আমাদের মনের তৃপ্তি আর দর্শকদের হাত তালি মিলতো প্রচুর। ডুবের বেলায়ও আমি আগে। আমার সঙ্গে কেউ পেরে উঠতো না। প্রস্থের দিক দিয়ে এক ডুবেই পুকুর পার হতে পারতাম। কি যে রোমাঞ্চকর ছিল সেই সব ডুব সাঁতার খেলা। আজ তা কল্পনার অতীত মনে হয়।
অনেক সময়ে ব্যাঙ ধরে নিয়ে আসতাম। সেগুলোকে সিঁদুর পরিয়ে বিয়ে দিতাম। লোকে বলে ব্যাঙের বিয়ে দিলে বৃষ্টি হয়। আমরা সমস্বরে গান গাইতাম –আল্লা মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই আল্লা মেঘ দে...। এই বিয়ের অনুষ্ঠানে গ্রামের লোকের জড়ো হয়ে আনন্দ উপভোগ করতো। একদিন হঠাৎ গুরু গুরু গরজনে আকাশ কালো করে বৃষ্টি নেমেছিল। সেদিন মনের আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলাম সবাই। এ যেন ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে – আমাদেরও ঠিক তাই হয়েছিল।

এসব কর্মকান্ড ছাড়াও আমরা সুদক্ষ তীরন্দাজ ছিলাম। কিন্তু সুখের বিষয় কখনোও পাখি শিকার করিনি। কারণ ওসব হত্যা – চেষ্টা আমাদের ধাতে সইতো না। তীরের নিশানা ঠিক হলেই আনন্দ পেতাম। কলাপাতার ডাঁটা দিয়ে, দড়ি বেঁধে ঘোড়া তৈরী করে প্রতিযোগিতা চলতো। হার জিতের কোন ব্যাপার ছিল না। নিছক মজা কুড়ানোই উদ্দেশ্য ছিল।
বিকালে বাড়ী ফিরে পুকুরে হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসতে হতো। চিৎকার করে পড়তাম। ছড়া, কবিতা সুর করে পাঠ করতাম। খুব মজা করে মুখস্থ করে ফেলতাম। আনন্দের দিনটি শীঘ্র শেষ হয়ে যেত। রাত কখন শেষ হবে, কখন আবার সংগী – সাথীদের নিয়ে কর্মব্যস্ত হয়ে পড়বো সেই অপেক্ষায়, সেই আশায় ঘুমিয়ে পড়তাম।   

এমনি করে পৃথিবী নিজের কক্ষে ঘুরে ঘুরে সূর্যকে চার পাঁচবার প্রদক্ষিণ করে ফেললো। চেয়ে দেখি আমিও পৃথিবীর চক্রে পড়ে খানিকটা দূরে চলে এসেছি। সুতরাং সেই চিরমধুর সংগীদের ত্যাগ করে বেদনা বিধুর হৃদয় নিয়ে চলে এলাম শহরে,উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে। বান্ধবীরা পড়ে রইলো আমা হতে দূরে, বহু দূরে, সুদূর পল্লীতে। তাদের নেতা না থাকায় তারাও ক্রমে হয়ে পড়লো নিস্তেজ। তারা যে মণিহারা ফণী। ডানপিটে, দুরন্ত, গেছো মেয়ে ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ উপাধি স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে বাংলাদেশের গৃহলক্ষী হিসাবে গৃহকোণে আশ্রয় নিল। এদিকে আমার অবস্থা হলো, ‘ফিশ আউট অব ওয়াটার।‘ অথবা বলতে পারি রবীন্দ্রনাথের ছুটি গল্পের ফটিকের অবস্থা।

এই দুর্দিন কেটে উঠতে আমার বেশ সময় লেগেছিল। স্কুলের এবং হস্টেলের মেয়েরা আমাকে খুব স্নেহ করতো। নতুন পরিবেশ। বলতে পারি উন্নত পরিবেশ তবুও আমার মন পড়ে রইলো সুদূর পল্লীতে। মায়ের কাছে, বান্ধবীদের কাছে। এই হস্টেলে এসে পড়লাম মাসীর হাতে। গ্রামের স্মৃতি পুরানো হয়ে এলো। কত সুখ –দুঃখের মধুর অতীত মনের মণিকোঠায় সঞ্চিত রইলো। আজ আমি উঁচু ক্লাসে পড়ি। পেছনে চেয়ে দেখি বাল্যসখীরা সব রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে। তাদের শৈশবের আনন্দ, চাঞ্চল্য মরে গিয়েছে অলক্ষ্যে। তারা এখন পরের ঘর আলো করে সোনার বৌ। স্নেহময়ী জননী। সংসারের কর্ত্রী হিসাবে আঁচলে চাবির গোছা। অতীত তাদের হৃদয়ের কতখানি অংশ দখল করে আছে, তা আমার জানা নেই। আজিকার সাথে সেদিনের তুলনা করে দেখলাম মাঝে রয়েছে বিরাট ব্যবধান। কেবল কালের ব্যবধানই নয়, সবকিছু হতে ওদের থেকে  আমি অনেক দূরে চলে এসেছি। আর কোনদিন ফিরে গিয়ে বলা হবেনা, এইযে, আমি, আমি তোমাদের মাঝে ফিরে এসেছি, তোমাদের কেউ। ‘এ পথ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়!’

আমার অতীত ‘সব পেয়েছির দেশে।’ সেখানে ধন ধান্যে পূর্ণ ধরিত্রীর কোন কিছুরই অভাব নেই। অতীতকে কল্পনার রঙ্গিন তুলিতে রঞ্জিত করতে হয়না। সে আপনা হতেই রাঙা। আমার শৈশব স্মৃতির মনিমঞ্জুষা আমার হৃদয়ে। যদি কেউ আমার এ রঙিন স্বর্ণালী কাহিনী শুনতে চাও, তবে কোন এক গোধূলী লগ্নে আমার এই দ্বিতলের অলিন্দে আসার নিমন্ত্রণ রইল।

অনুবাদ


 

পুস্তক সমালোচনা

পুস্তক সমালোচনা – জীবনেরে কে রাখিতে পারে, লেখক ফিরোজা হারুন

মহিলা বিষয়ক অনুষ্ঠান – অংগনা, বাংলাদেশ বেতার,ঢাকা

পাঠক – নাজনীন তৌহিদ

রেকর্ডিং ১৬/১১/২০১১, প্রচার ১৮/১১/২০১১

 

মানুষ কেবল যাপিত জীবন নিয়েই ব্যস্ত হয়। হাস-ফাস করা জীবনেও কখনো তার মন গেয়ে ওঠে, নেচে ওঠে। নিজের ভুবনে সে একাকী বিচরণ করতে চায় কিছুক্ষণ।এই ‘একান্ত কিছুক্ষণ’ সময়টাতে সে কোন এক নিঃস্বার্থ বন্ধুকে সাথী হিসাবে খুঁজে নিতে পারে, যে কেবল নিজেকে বিলিয়ে দিতেই জানে। ধারণা করতে পারেন এমন বন্ধু কে? হ্যা, আমি সেই বন্ধুটির কথা বলছিলাম – বই!

বই– ই  আমাদের নিত্যসংগী।আমাদের বন্ধু!

বই-ই হতে পারে নিরানন্দ জীবনের এতটুকু আনন্দের উপকরণ। আর এক্ষেত্রে  সময়োপযোগী বই পারে মনের ক্ষুধা নিবারণ করতে। শ্রোতা বন্ধুদের সবার মনের অবস্থা যেহেতু আমার অজানা,তাই নিত্যকার মতো আমার পছন্দের একটি বই নিয়ে এলাম আজকের আলোচনায়। এটি একটি উপন্যাস।উপন্যাসটির নাম ‘জীবনের কে রাখিতে পারে।’ লিখেছেন ফিরোজা হারুন।

বইটি প্রকাশিত হয়েছে মম প্রকাশনা থেকে।এর প্রচ্ছদ এঁকেছেন রফিক উল্লাহ্‌। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা –৬০ এবং এর মূল্য হাতের নাগালে, মাত্র ৪৫ টাকা।

বইটির ভেতরকার বিষয়বস্তু জানবার আগে জেনে নেয়া যাক লেখকের পরিচিতি।

লেখিকা ফিরোজা হারুনের জন্ম ময়মনসিংহ জেলার, ত্রিশাল উপজেলার, হরিরামপুর গ্রামে।লেখাপড়া প্রথমে ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয় এবং কুমুদিনী কলেজ টাঙ্গাইল হতে।এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হতে ইতিহাসে এম.এ.সম্পন্ন করেন।তারপর ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ফর উইমেন থেকে বি.এড. ডিগ্রী অর্জন করেন।পরবর্তীতে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে সিনিয়র জিওগ্রাফি টিচার হিসাবে শিক্ষকতা করলেও তিনি লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাঁর লেখা বেশ ক’টি উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ, ৭১ এর স্মৃতিকথা, গল্প ও প্রবন্ধ সংকলন ও শিশু–কিশোর সংকলন  ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে এবং পাঠক মহলে বেশ সাড়া জাগিয়েছে লেখিকার প্রথম উপন্যাস ‘জীবনেরে কে রাখিতে পারে।’

ফেরা যাক এই উপন্যাসটির বিষয়বস্তুর দিকে। এখানে দু’টি গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। একটির প্রধান চরিত্র একজন নারী যিনি একজন স্ত্রী। অন্য গল্পটির প্রধান চরিত্র একজন পুরুষ, যিনি প্রথম গল্পের নায়িকার স্বামী।লেখিকার ভাষায় গল্পের চরিত্র দু’টি কল্পনা ভিত্তিক তবে বাস্তবতা নির্ভর।  

নায়িকা নীলা সংসার জীবনে আবদ্ধে থেকেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আবিষ্কার করে গেছে মানুষ কখনোই পরিপূর্ণ নয়।জীবনে অনেক পাওয়ার মাঝেও থাকে না পাওয়ার হা হা–কার, যা তাকে কুড়ে কুড়ে ছিঁড়ে ফেলে। তবে এ না পাওয়াকে যে জয় করতে পারে, সেই জয়ী । সেই-ই জীবনের সত্যিকারের স্বাদ পায়।কল্পনা ভিত্তিক গল্প ছেড়ে যদি বাস্তব জীবনে তাকাই,তবু কি দেখব না সুখ খুঁজতে খুঁজতে একসময় অসুখের অসুখে ভুগে জীবনের যবনিকার পতন হয় !এখানেও তাই। সুখ হাতের নাগালে পেয়েও তাকে ছুঁতে পারেনি নীলা। এক হা হা–কার নিয়ে জীবন শেষ হয়ে যায় তার।অন্যদিকে তার স্বামী ইলিয়াস খান স্ত্রীর প্রতি অবিচার করেননি। ভালবেসেছেন। অথচ ভালবাসার কথা বলে তাকে প্রতারিত করতে চাননি। এই অভিব্যক্তি তার দ্বিতীয় গল্পে ফুটে উঠেছে।

উপন্যাসে স্বামী স্ত্রী আর সংসার জীবনের এক জটিল বিষয় ফুটে উঠেছে।যেখানে বিশ্বাস, অবিশ্বাস, মান–অভিমান, পরস্পর বোঝাপড়া কিংবা ভালবাসা, দুঃখবোধ সব কিছুই রয়েছে, যা হয়তো কারো কারো জীবনে চরম বিপর্যয় বয়ে আনে।তবে বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে একে জয় করাই এর মুখ্য বিষয়।গল্পের নীলা চরিত্র খুবই বুদ্ধিদীপ্ত এক নারী চরিত্র। একটি পরিচ্ছন্ন গল্প হিসেবে পাঠক হৃদয়ে গেঁথে যাবে অনায়াসে। হয়ত অনেকে এ গল্পের মাঝে জীবনের সমাধানও খুঁজে পাবেন। আর সে ক্ষেত্রে লেখক তার লেখনিতে সার্থক হবেন তখনই।     

উপন্যাসের লিংক https://www.saveourenvironment.ca/EBook/jeebonere-ke-rakhite-pare/jebonere.htm


     

শিশু শ্রম -১৯৯৭