Friday, August 7, 2026

অমোঘ বিধান

 মানুষ মৃত্যুর অধীন। জন্ম, মৃত্যু মানুষের নিজের ইচ্ছামতো হয় না। মানুষ ইচ্ছা করে জন্মগ্রহণ করতে পারে না, আবার ইচ্ছা করে মরেও যেতে চায়না। অমর কবি ওমর খৈয়াম তার চতুষ্পদী কবিতার একটিতে এই সত্যটি বয়ান করেছেনঃ

‘স্রষ্টা যদি মত নিত মোর আসতাম না প্রাণান্তেও,

এই ধরাতে এসে আবার যাবার ইচ্ছা নেই মোটেও।’

(কাজী নজরুল ইসলামের ‘রুবাইয়াৎ’ অনুবাদ)

ধার্মিক ব্যক্তিরা বলেন, মৃত্যু যখন আসে, তখন ‘সে’ চলে যায় পারাপারে। তার এক পল আগেও নয় কিংবা এক দন্ড পরেও নয়। যখন যার আয়ুর বরাদ্দ শেষ হয়, তার শেষ নিঃশ্বাস পড়ে, তখনই তার জীবনাবসান ঘটে। এই–ই বিধাতার বিধান, অনিবার্য, অমোঘ। দীর্ঘ কর্মময় জীবনের সমাপ্তি টানার পূর্বেই যার ডাক এসে যায় তাকে যেতেই হয়। কর্মহীন যার জীবন,তাকেও সময় হলে চলে যেতে হয়।

মৃত্যুর হীমশীতল পরশ থেকে রাজারও নিস্তার নাই। মহাজ্ঞানী, মহাজন, মহা শক্তিধর সম্রাট, দরবেশ, সংসার ত্যাগী সন্ন্যাসী, দীনহীন জন –সকলকেই একদিন ভূতলে পতিত হতে হয়। আর উঠে দাঁড়াতে পারেনা। মৃত্যুই একমাত্র শক্তি যে সকলকে সমান করে দেয়। ‘ডেথ ইজ দ্যা লেভেলার।‘ সকল অহংকার, শান শওকত ধূলায় লুন্ঠিত হয়। একবারও আর উঠে বলতে পারে না, ‘এই যে আমি আছি, থাকবো তোমাদের কেউ হয়ে, তোমাদের মাঝে।’ জীবিত যারা তারা যেতে দিতে চায় না। তবুও সে চলে যায়, কে জানে কোথায়!

‘জন্মিলে মরিতে হবে/ অমর কে কোথা কবে।

চির স্থির কবে নীর/ হায়রে জীবন নদে।’


মরণ মানুষের অবধারিত পরিণতি। তার্কিকগণ বলেন যদি তাই হয় যে, যার যখন মৃত্যু লেখা থাকে তখনই তাকে যেতে হবে, আগেও নয় পরেও নয় তবে মানুষের এত সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন কি? তার গৃহের অর্গল বন্ধ করবার দরকার কি? সাবধানতার সাথে পথ চলবার, রাস্তা অতিক্রম করবার, দস্যু তস্করকে ভয় করবার কোন কারণ থাকে না। নির্ভাবনায় সে পথ চলবে কি দিবসে, কি নিশীথে, কি লোকালয়ে, কি জঙ্গলে, কি ঝড়ে, কি জলে, কি ট্রাকের সম্মুখে, কি রেল লাইনে। সৃষ্টিকর্তার হুকুম না হলে তো তার মৃত্যু ঘটবে না। সুতরাং নিশ্চিন্তে কেটে যাবে তার সারাটি জীবন।

মানুষের যত ভয় আছে তার মধ্যে মৃত্যু ভয় প্রধান। জন্মের পরমুহূর্ত হতে সে বাঁচার চেষ্টায় নিজেকে ব্যাপৃত রাখে। এটা এক সহজাত প্রবৃত্তি। অবোধ শিশু, নির্বোধ – সকলেই এই সহজাত আবেগের অধীন। ‘মরিতে চাহিনা এই সুন্দর ভুবনে’ – এ কথাটি চরম সত্য। রবিনসন ক্রুশো জাহাজ ডুবির পর এক নির্জন শ্বাপদ সংকুল অরণ্যে এসে আশ্রয় লাভ করে। তাকে বেঁচে থাকার জন্য, নিরাপদ থাকার জন্য কতই না উপায় অবলম্বন করতে হয় এবং সেসব কর্ম কতই না কঠিন।

অসুখে বিসুখে আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে যে ভয়টি লুকিয়ে থাকে তা হলো মৃত্যুভয়। কেবলমাত্র আরোগ্য লাভের জন্য আমরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই তা নয় মৃত্যুর দরজায় যেন না পৌঁছাই তার জন্য একটি প্রয়াস এই চিকিৎসা। রোগ ব্যাধি ছাড়াও দস্যু –তস্কর, ঝড় – ঝঞ্ঝা, ভূকম্পন, দুর্ঘটনা ইত্যাদি নানাপ্রকার বিপদ থেকে ত্রাণ পাওয়ার জন্য আমরা সদা সতর্ক থাকি। আমরা দিবস রজনী একটি সংগ্রামে লিপ্ত থাকি সেটি হলো বাঁচার সংগ্রাম, মরে যাওয়ার সংগ্রাম নয়। যার ধনসম্পদ নেই, শরীরের অংগ প্রত্যঙ্গের হানি হয়েছে কোন কারণে, তারও বাঁচার আকাঙ্ক্ষা অন্যদের তুলনায় কম নয়। তাদের সংগ্রামও বাঁচার সংগ্রাম। মানুষের চারিদিকে যেন মৃত্যুকূপ। একটু আসাবধান হলেই তার চোখের সামনে আজরাইল ফেরেশতা এসে হাজির হবে। 

কিন্তু কেন, কেন মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবার এত কৌশল অবলম্বন করে? কেন নিশ্চিন্ত থাকতে পারেনা, সে কেন নির্ভয় হতে পারেনা, কেন নিজেকে প্রকৃতির হাতে সৃষ্টিকর্তার হাতে সঁপে দিতে পারেনা? তার উত্তর হলো মানুষ বাঁচতে চায় – অন্য যে কোন প্রাণীর মতোই। মানুষ জীবনকে খুব ভালবাসে। প্রাণের চাইতে অধিক প্রিয় আর কিছুই নয়। মৃত্যু আছে বলেই বাঁচার আকাঙ্খা এত প্রবল। মরণ না থাকলে মানুষের বেঁচে থাকার মজাটাই নষ্ট হয়ে যেত। পৃথিবী এত সুন্দর হতো না তার কাছে। প্রিয়জনেরা এত প্রিয় হতোনা। পারস্পরিক মধুর সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়তো। মানুষের প্রধান আকর্ষণ যে মানুষের ভালবাসা পাওয়া সেটার প্রয়োজন যেত ফুরিয়ে। মানুষ এক ছন্নছাড়া দিশেহারা ভবঘুরে প্রাণীতে পরিণত হতো। ‘আশরাফুল মখলুকাত’ হতে পারতো না। 

যা বলছিলাম তর্ক–বাগীশদের যুক্তির কথা। তারা বলেন আত্মরক্ষার প্রয়োজন কি? লাভ নেই। ডাক আসলেই চলে যাবে – ঠিক সময়ে। ঘর দরজার দরকার নেই। পুলিশ বাহিনী, সেনা বাহিনী, সীমান্ত রক্ষী বাহিনী সব অর্থহীন।  আত্মরক্ষার জন্য, দেশ রক্ষার জন্য অশ্ত্র - শস্ত্র তৈরী অর্থহীন। কারণ ভাগ্যে যখন মরণ লেখা আছে, তার বিরুদ্ধে তো যাওয়া যাবেনা। উজির নাজির রাজা বাদশাদের সশস্ত্র প্রহরী সংগে নিয়ে চলার কোন অর্থ নেই। অদৃষ্টের লিখন তারা খন্ডাতে পারবে না। কথায় বলে, ‘মৃত্যু আছে যেখানে, নাও ভাড়া করে যায় সেখানে।’ সুতরাং এ বিষয়টি বিধাতার হস্তে ন্যস্ত করাই বুদ্ধিমানের কাজ। উদ্বিগ্ন হয়ে লাভ নেই। হজরত ওমর (রাঃ), হজরত ওসমান (রাঃ), হজরত আলী (রাঃ)- এরা সকলেই ঘাতকের হাতে প্রাণ দিয়েছেন। বিধির লিখন ছিল বলেই। হযরত আলীর দুই পুত্র ইমাম হাসান,ইমাম হুসেইন যথাক্রমে বিষ প্রয়োগে এবং কুখ্যাত কারবালা মরু প্রান্তরে শত্রুর হাতে নিহত হয়েছিলেন। ভাগ্যে লেখা ছিল বলেই।  

এই যে মানুষের নিরন্তন আত্মরক্ষার প্রয়াস, তার প্রধান কারণ হচ্ছে মনুষ্য প্রাণ সর্বাপেক্ষা মূল্যবান। ‘মানব জনম সার/ এমন পাবেনা আর।’ মৃত্যু সামনে আছে বলেই বাঁচার বাসনা এত প্রবল। জন্ম মৃত্যুর মাঝখানের অংশটুকুই জীবন। এই জীবনটুকু যতখানি দীর্ঘায়িত করা যায়, এইই মানুষের চিরন্তন চাওয়া। আদম (আঃ) এর সময়  হতে কেয়ামতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা সমান থাকবে।

মৃত্যু কখন দরজার করাঘাত করবে জানিনা। তবুও ইচ্ছা করে মৃত্যু দূরে থাকুক – বিলম্বে দেখা দিক। পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ সব উপভোগ করি। সেইজন্য নিজেকে প্রতি মুহূর্তে সুরক্ষিত রাখতে সচেষ্ট হই। পরিবারের, সমাজের, দেশের সকলে ভাল  থাকি। ভালবাসার বন্ধনে সুখের সন্ধান করি, শান্তি লাভ করি, আনন্দ পাই, জীবন সার্থক করি, হিংসা – দ্বেষ ভুলে গিয়ে আনন্দের সেতু বন্ধন গড়ে তুলি। ‘গলায়ে গলায়ে বাসনার সোনা’ দিয়ে প্রতিদিন আমরা জীবনকে নিত্য নব নব আনন্দ সম্ভারে সাজিয়ে তুলবার প্রয়াস পাই।  

বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন। তা সত্বেও পৃথিবীতে কিছু লোক আছে যাদের অন্তর কোন না কারণে বেদনায়, যন্ত্রণায় কিংবা আঘাতে আঘাতে জর্জরিত। পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ সব তার কাছে ম্লান হয়ে গিয়েছে। জীবন তাদের নিবিড় ঘন আঁধারে আচ্ছন্ন। প্রিয়জন কিংবা সমাজ  তাকে দুঃখ  দিয়েছে। দিয়েছে চরম বঞ্চনা। তাদের কেউ হয়তো নক্ষত্রের পানে চেয়ে মৃত্যুকে আহ্বান জানায়। সে ভাবে মৃত্যুই একমাত্র শরণ, যে তার জীবনের জ্বালা জুড়াতে সক্ষম। মানুষের উপর তার আস্থা হারায়, ভালবাসার বন্ধন ছিন্ন হয়, সে বিদায় নিতে চায় অকালে, আত্ম হননের পথে। স্বেচ্ছায় বরণ করে মৃত্যুকে। পুনরায় সেই কথাই মনে পড়ে  - ‘এ ভাবেই লেখা ছিল তার মরণ।’  তাই আত্মহত্যার পথ তাকে বেছে নিতে হল।    

লোকে বলে, যে আত্মহত্যা করে তার জন্য শাস্তির বিধান কেন? শাস্তির বিধান ধর্মে আছে, দেশের আইনেও রয়েছে। কারণ মানুষের প্রাণের চাইতে মূল্যবান আর কিছু নেই। সেই অমূল্য সম্পদ এভাবে অপঘাতে, ইচ্ছাপূর্বক ইতি টানুক ত্যা বাঞ্ছনীয় নয়। প্রাণ হরণ পাপ, অপরাধ, তা পরের হোক আর নিজের হোক। সে হত্যাকারী। তবে নিজের প্রাণ হননের পর তাকে শাস্তি দেয়া যায় না। তবু যদি বেঁচে যায় তবে তাকে শাস্তি পেতে হয়। মরে যাওয়ার পরও সৎকারে স্বাভাবিক সম্মানজনক নিয়ম পালন করা হয় না। এটাও সেই মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদানের পর্যায়ে পড়ে। এই সুন্দর পৃথিবীতে আর ফিরে আসা যাবে না। সুতরাং একবারই মানুষের মানব জন্ম, দুর্লভ জন্ম, সার্থক হোক। 

মানুষের কাজ হলো বেঁচে থাকবার প্রয়াস চালানো। নিজে বাঁচবে, অন্যকে বাঁচতে সাহায্য করবে। ধরণীর ফুল, ফল, মাটি, জল, শস্য, নিসর্গ – সব উপভোগ করে ধন্য হবে। তারপর যখন মরণ আসবে তখন হাসিমুখে চলে যাবে। তখন যেন বলতে পারে আমার জন্ম সার্থক, জীবন ধন্য, মরণ  সুখের হলো। ‘মরণরে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান।’

‘যে মাটি হতে আমার উত্থান, সেই মাটিতেই আমার পতন, আবার সে মাটিতেই আমি মিশে যাব।’ সেই আমার সুখ, সেই আমার শান্তি।

No comments:

Post a Comment

সেই হাতখানি

  এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা ...