বসন্তের
বিকাল। বসে ছিলাম দ্বিতলের বারান্দায়। একখানি বই হাতে। নামে মাত্র পড়ার ভান করে
তাকিয়ে ছিলাম সম্মুখপানে। সারাদিন ভ্রমন করে সূর্যি মামা ক্লান্তিতে ঝিমিয়ে পড়েছে।
ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে দীপ্তি। নিভে যাওয়ার পূর্বে সে তার এই তেজহীন আভাকে
রূপান্তরিত করেছে সোনালী আলোতে। আর সেই সোনালী আলো মাখিয়ে দিয়েছে সকল প্রকার
মানুষের মনে। এরকম ভালো লাগার আমেজে সকলেই উৎফুল্ল। বেশী উৎসাহীরা খেলছে,
নিরুৎসাহীরা খেলা দেখছে। সেই নিরুৎসাহীদের দলে আমি একজন। সামনের মাঠে ছেলেমেয়েরা
খেলা করছে। তাই দেখছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম যদি ওদের সঙ্গে মিশে খেলা করতে পারতাম।
আমি আসলে স্বার্থপর। অন্যকে আনন্দ দেবার চেয়ে নিজে আনন্দ উপভোগ করতে ভালবাসি।
খেলোয়াড়গণ প্রাণপণ খেলে দর্শকদের দেয় অনাবিল আনন্দ। আর আমরা অনেক সময় তা দেখতেও
যাইনা। এসব কথা ভাবতে ভাবতে সহসা মনে পড়ে গেল অতীতকে। আমরাও তো একদিন এমনি
ছোটাছুটি করতাম। সব কাজে আগ্রহ ছিল প্রবল। আনন্দ পেতাম প্রচুর। এমনি ভাবে অতীতের
প্রতিটি ঘটনা আজ মনের কোণে স্মৃতি হয়ে ভিড় করেছে। তারা যেন দীর্ঘকালের অদর্শণীয়
প্রিয়জনকে পেয়ে কে কার আগে অভ্যররথনা জানাবে সেজন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। তাই হারিয়ে
যাওয়া মধুর অতীতকে কৃত্রিম ভাবে পাওয়ার আশায় স্মৃতির খাতার পাতা উল্টাতে শুরু
করলাম।
রবীন্দ্রনাথ
বলেছেন, ‘প্রকৃতি ছিল মুক্ত, আমি ছিলাম বন্দী। তাই মুক্তর প্রতি বন্দীর আকর্ষণ
স্বভাবতঃই প্রবল ছিল।’ কিন্তু আমার বেলায় প্রকৃতিও মুক্ত ছিল, আমিও ছিলাম মুক্ত। কাজেই
বন্দি হিসেবে মুক্ত প্রকৃতির প্রতি কতটুকু
আকর্ষণ থাকতে পারে, সেরকম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার নেই। আমি মুক্ত বিহংগের ন্যায়
ডানা মেলে সীমাহীন প্রকৃতির কোলে স্বাধীনভাবে বিচরণ করেছি।
যদ্দূর মনে পড়ে তখন আমার বয়স ছিল তিন বৎসর। বেশীর ভাগ সময়েই মায়ের কাছে থাকতাম। বাকী সময় আমার সমবয়সীদের সঙ্গে মিলে মিশে খেলা করতাম। সেই ছোটবেলা থেকে আমি আমাদের দলের সর্দারি করতাম। ওরা সবাই আমার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতো। এভাবেই কেটে গেল আরো কিছু কাল। মায়ের নিকট থেকে বাধ্য হয়ে সরে আসতে হলো। আমাদের আশেপাশে কোন প্রকার স্কুল ছিলনা। আমাদের পড়াশুনার সুবিধার জন্য আমার পিতা বাড়ির পাশে একটি ঘর তৈরী করেন। তিনি নিজের সাধ্যমতো স্কুলের আসবাবপত্র ক্রয় করেন। তারপরেই একজন সুযোগ্য মৌলভী সাহেবকে শিক্ষক হিসাবে নিযুক্তি প্রদান করেন। তার নাম ছিল মোহর আলী। আমার বাবা গ্রামের প্রত্যেকের ঘরে ঘরে গিয়ে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ছাত্রী জোগাড় করে এই স্কুল আরম্ভ করেন। ক্রমেই এই স্কুলে পড়াশুনা করবার পালা পড়লো আমাদের দলের। আমরাও স্কুলে গেলাম। ভর্তি হওয়ার কোন রেওয়াজ ছিলা না সেই সময়ে। আমি খুব ছোট থেকেই স্কুলে যেতাম। কারণ স্কুলটি ছিল বাড়ির পাশেই। পড়াশুনা করতাম কি না মনে নেই। তবে ইংরেজী বর্ণ পরিচয়ের কথা মনে আছে। ছোট একটি বই টানা টানা বড় বড় অক্ষরে পূর্ণ ছিল। তাদের নীচে আবার বাংলায় উচ্চারণ লেখা ছিল। যেমন ‘C’ এর নীচে ‘ক’, ‘G’ এর নীচে ‘গ’ ইত্যাদি। উর্দূ বর্ণ পরিচয়ের কথাও বেশ মনে আছে। আরবী থেকে একটু আলাদা। নিজেরা কালো কালি্ প্রস্তুত করে বাঁশের কঞ্চির কলম অথবা পাখির পালকের কলম দ্বারা কলা পাতায় মোটা মোটা করে যথাসাধ্য সুন্দর উর্দু অক্ষর তৈরী করতাম। তখন আমার লেখাই সবচেয়ে সুন্দর হতো। তাছাড়া পড়াশুনার দিক দিয়ে আমি অন্যদের চাইতে ভাল ছিলাম। আমাদের বাড়ির সকলেই পড়াশুনা জানতো। কিন্তু অন্যদের বাড়ির সবাই লেখাপড়া জানতো না। কেবল স্কুল ছাড়া ওদের পড়া লেখাপড়ার চর্চা ছিল না। আমি বাড়িতে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতাম না। স্কুলের বই নিয়ে পড়াশুনা করতাম। সেজন্য আমার সমবয়সীরা আমাকে তাদের চেয়ে বড় করে দেখতো এবং আমাকে খুব ভালবাসতো। আমিও প্রতিদান দিতে কার্পণ্য করতাম না। পড়ালেখায় সাহায্য করতাম। স্কুলের শিক্ষক মৌলবী সাহেব আমাকে খুব স্নেহ করতেন। শহর থেকে যারা স্কুল পরিদর্শন করতে আসতেন তারাও আমার খুব প্রশংসা করে যেতেন। মোটামুটি এই ছিল আমার একদম ছোটবেলার স্কুল জীবনের কথা।
শৈশবের বেশীর ভাগ সময় কাটতো খেলাধুলায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে কাপড় জামা পরে নিতাম। যদি বাবা কিম্বা আমার ভাইয়েরা কেউ বাড়িতে থাকতেন, তাহলে খুব চিৎকার করে ছোট ছোট গল্প পড়ে ফেলতাম। ছড়া ও কবিতাও সুর করে আবৃত্তি করতাম। আর যদি শাসক শ্রেণীর কেউ বাড়িতে না থাকতো, তবে আমি রাম রাজত্ব পেয়ে যেতাম। সকালেই সব বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে যেতাম। আমাদের আড্ডা হতো ঐ স্কুল ঘরে। তাছাড়া স্কুলের পেছনে বাগানের আনাচে কানাচে ছিল আমাদের খেলা ঘর। ছোট ছোট ঘর। সেখানে আমরা সর্বপ্রকার বিদ্যা – যতরকম খেলাধুলা সম্ভব – সব অনুশীলন করতাম। আমরা সব কাজে পাকা হয়ে উঠেছিলাম। পনের ষোলজন মেয়ে দিনের বেশীর ভাগ সময়ে একত্রে কাটাতাম। আমাদের পাড়া থেকে যারা একটু দূরে থাকতো তারা মাঝে মাঝে আমাদের দর্শন দিয়ে আনন্দ দিয়ে যেত।
কৃষকের বাড়ির উদ্বৃত্ত ছন, খড় দিয়ে ছোট ছোট ঘর তৈরী করতাম। পাট খড়ি দিয়ে ঘরের বেড়া দেওয়া হতো। চূন দিয়ে ঘরের মেঝেতে নানারকম কারুকাজ করা হতো। পাটের তৈরী শিকা ঝুলিয়ে তাতে হাড়িপাতিল সাজিয়ে রাখতাম। পুতুলের জন্য খাট প্রস্তুত করে সেখানে সুসজ্জিত শয্যা পাতা হতো। চিকন তার দিয়ে পুতুলের অলংকার এবং শাড়ি কাপড় বানিয়ে তাদেরকে মনের মতো সাজাতাম। সোনার খাটের পুতুলেরা সম্ভবত মনের সুখে ঘুমের দেশের স্বপ্ন দেখতো। মৌচাক থেকে মোম সংগ্রহ করে সেগুলো দিয়ে ওদের ঘরে প্রদীপ জ্বেলে দিয়ে আসতাম। পুতুলের জন্য পালকি ছিল। এবাড়ীর পুতুল ও বাড়ীতে বিয়ে দিয়ে আত্মীয়তা স্থাপন করতাম।
আমরা হাট বসাতাম। সেখানে জিনিসপত্র বেচাকেনা হতো। আমরাই ক্রেতা, আমরাই বিক্রেতা। পুতুলের জন্য সুন্দর সুন্দর শাড়ী, অলংকার বাজার থেকে কিনে আনতাম। আমাদের যানবাহনের অভাব ছিল না। আমরা সুপারীর খোলে অথবা কলা গাছের খোলে পালকি তৈরী করতে পারতাম। সুপারীর খোলে একেক জন উপবেশন করতো এবং বাকীরা খোলের পাতার গুচ্ছ ধরে টেনে পাড়াময় ঘুরে আসতো। আমরাই যাত্রী আমরাই বেহারা। বাদল দিনে কখনো গাছ পড়ে যেত ঝড়ে। সেই গাছকে ট্রেন বানিয়ে ফেলতাম। সেই ট্রেনে চড়ে আমরা ঢাকা অথবা ময়মনসিংহ চলে যেতাম। গাছের ডালে ঝাকুনী দিয়ে দিয়ে সকলে মিলে ঝিক ঝিক শব্দ করে শহরে বেড়াতে যেতাম। আরো বলতাম ‘ঢাকা যাব টাকা পাব, যতই যাব, ততই পাব।’ আনন্দের আতিশয্যে নাচানাচি করতে করতে কেউ কেউ গাছ থেকে ছিটকে পড়েও যেত। ডাক্তার সেজে আমরা তার চিকিৎসা ও সেবা দিতাম। আমাদের সকলেরই ঘুড়ি ছিল। প্রতিদিন বিকেলে আমরা ঘুড়ি উড়াতাম। ঘুড়িতে সুন্দর সুন্দর করে নাম লিখে রাখতাম। খুব আনন্দের সঙ্গে ঘুড়ি সূতার সঙ্গে প্যাচ লাগিয়ে বকাট্টা করে চিৎকার করে উঠতাম। এত আনন্দ আর আনন্দ –রাখবো কোথায়!
আমরা যেখানে থাকতাম সেখানকার ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ প্রতিটি বস্তুর সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল। সর্বপ্রকার পাখির বাসায় আমাদের যাতায়াত ছিল। পাখির ডিম থেকে শুরু করে যে পর্যন্ত বাচ্চা না উড়তে পারে, সে পর্যন্ত প্রত্যেক দিন আমরা দল বেঁধে গিয়ে চুপিচুপি পাহারা দিয়ে আসতাম। টুনটুনি পাখিরা গাছ গাছালীর ঝোপের আড়ালে দুটি বড় পাতা একসঙ্গে করে তূলা দিয়ে আটকিয়ে বাসা তৈরী করতো। এই পাখির ইংরেজী নাম টেইলার বার্ড। এই পাখির ডিম হালকা সবুজ রঙের। ছোট ছোট ডিম। দেখতে খুব সুন্দর। একবার একটি ঘুঘু পাখির ছানা ধরে নিয়ে এসেছিলাম। কয়েকদিন রাখার পর আমার আসর্তকতার দরুণ উড়ে গিয়েছিল। সেদিন পাখিটার জন্য খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। যত্নের কোন ত্রুটি ছিল না। তবুও সে চলে গেল। ভেবেছিলাম ছানাটির কথা জীবনেও ভুলবো না। কিন্তু সেই মুক্ত ধর্মীয় পাখি শাবককে বন্দী করে রাখলে, তার কি দুঃখ হতো, তা তিলে তিলে উপলব্ধি করেছি। বনের পাখিকে খাঁচায় বন্দি করে রাখা উচিৎ নয় । তার জগৎ আকাশ, বাতাস, বৃক্ষরাজি। আমার গৃহের সুদর্শন খাঁচা নয়। এ সত্যটি অনুধাবন করে আমার সারাজীবনের জন্য একটি শিক্ষা লাভ হলো –বন্যেরা বনে সুন্দর।
আমার গাছে চড়ার ঝোঁক ছিল বেশী রকম। বাড়ির আশে পাশে এমন কোন গাছ নেই, যে গাছের শিরে আমি হাত দিয়ে আশীর্বাদ করিনি। ঝড় বৃষ্টির দিনে যখন মৌলবী সাহেব ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়তেন, তখন আমরা সেই ফাঁকে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতাম। আম, জাম, কুল, তেঁতুল ইত্যাদি নিয়ে ফিরে আসতাম। অন্য মেয়েরা মৌলবী সাহেবকে বলে দিত। কিন্তু মৌলবী সাহেব আমাদেরকে মৃদু তিরস্কার ছাড়া আর কিছুই করতেন না। আমরা তখন শান্তশিষ্ট অথচ লেজ বিশিষ্ট প্রাণী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। সেদিন বাড়ি ফিরে মায়ের বকুনিওঃ খেতে হতো নির্ঘাৎ। বৃষ্টির দিন ব্যতীত দোলনা তৈরী করে আমরা পালাক্রমে দোল খেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেতাম।
এই তো গেল স্কুলে আধিপত্যের বিবরণ। এবার এলাম জলে। জলের নীচে প্রাণীরাও আমাদের খেলার শিকার হতো। মাছ ধরতে আমি খুব ভালবাসতাম। আমার বড়শিতে বেশী মাছ ধরে বলে আমার তখন খুব সুনাম। কারো বড়শিতে মাছ না ধরলেও আমার বড়শিতে একটি হলেও মাছ ধরা পড়তো। মৎস্য শিকারে ব্যক্তি বিশেষের কোন গুণ থাকতে পারে বলে আমি আজও বুঝতে পারিনা। তবে মাছ ধরার আনন্দ আছে।
সাঁতারেও আমি ছিলাম পটু। সন্তরণ প্রতিযোগিতায় আমি ছিলাম সকলের অগ্রভাগে। সেজন্য আমাদের মনের তৃপ্তি আর দর্শকদের হাত তালি মিলতো প্রচুর। ডুবের বেলায়ও আমি আগে। আমার সঙ্গে কেউ পেরে উঠতো না। প্রস্থের দিক দিয়ে এক ডুবেই পুকুর পার হতে পারতাম। কি যে রোমাঞ্চকর ছিল সেই সব ডুব সাঁতার খেলা। আজ তা কল্পনার অতীত মনে হয়।
অনেক সময়ে ব্যাঙ ধরে নিয়ে আসতাম। সেগুলোকে সিঁদুর পরিয়ে বিয়ে দিতাম। লোকে বলে ব্যাঙের বিয়ে দিলে বৃষ্টি হয়। আমরা সমস্বরে গান গাইতাম –আল্লা মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই আল্লা মেঘ দে...। এই বিয়ের অনুষ্ঠানে গ্রামের লোকের জড়ো হয়ে আনন্দ উপভোগ করতো। একদিন হঠাৎ গুরু গুরু গরজনে আকাশ কালো করে বৃষ্টি নেমেছিল। সেদিন মনের আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলাম সবাই। এ যেন ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে – আমাদেরও ঠিক তাই হয়েছিল।
এসব কর্মকান্ড ছাড়াও আমরা সুদক্ষ তীরন্দাজ ছিলাম। কিন্তু সুখের বিষয় কখনোও পাখি শিকার করিনি। কারণ ওসব হত্যা – চেষ্টা আমাদের ধাতে সইতো না। তীরের নিশানা ঠিক হলেই আনন্দ পেতাম। কলাপাতার ডাঁটা দিয়ে, দড়ি বেঁধে ঘোড়া তৈরী করে প্রতিযোগিতা চলতো। হার জিতের কোন ব্যাপার ছিল না। নিছক মজা কুড়ানোই উদ্দেশ্য ছিল।
বিকালে বাড়ী ফিরে পুকুরে হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসতে হতো। চিৎকার করে পড়তাম। ছড়া, কবিতা সুর করে পাঠ করতাম। খুব মজা করে মুখস্থ করে ফেলতাম। আনন্দের দিনটি শীঘ্র শেষ হয়ে যেত। রাত কখন শেষ হবে, কখন আবার সংগী – সাথীদের নিয়ে কর্মব্যস্ত হয়ে পড়বো সেই অপেক্ষায়, সেই আশায় ঘুমিয়ে পড়তাম।
এমনি করে পৃথিবী নিজের কক্ষে ঘুরে ঘুরে সূর্যকে চার পাঁচবার প্রদক্ষিণ করে ফেললো। চেয়ে দেখি আমিও পৃথিবীর চক্রে পড়ে খানিকটা দূরে চলে এসেছি। সুতরাং সেই চিরমধুর সংগীদের ত্যাগ করে বেদনা বিধুর হৃদয় নিয়ে চলে এলাম শহরে,উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে। বান্ধবীরা পড়ে রইলো আমা হতে দূরে, বহু দূরে, সুদূর পল্লীতে। তাদের নেতা না থাকায় তারাও ক্রমে হয়ে পড়লো নিস্তেজ। তারা যে মণিহারা ফণী। ডানপিটে, দুরন্ত, গেছো মেয়ে ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ উপাধি স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে বাংলাদেশের গৃহলক্ষী হিসাবে গৃহকোণে আশ্রয় নিল। এদিকে আমার অবস্থা হলো, ‘ফিশ আউট অব ওয়াটার।‘ অথবা বলতে পারি রবীন্দ্রনাথের ছুটি গল্পের ফটিকের অবস্থা।
এই দুর্দিন কেটে উঠতে আমার বেশ সময় লেগেছিল। স্কুলের এবং হস্টেলের মেয়েরা আমাকে খুব স্নেহ করতো। নতুন পরিবেশ। বলতে পারি উন্নত পরিবেশ তবুও আমার মন পড়ে রইলো সুদূর পল্লীতে। মায়ের কাছে, বান্ধবীদের কাছে। এই হস্টেলে এসে পড়লাম মাসীর হাতে। গ্রামের স্মৃতি পুরানো হয়ে এলো। কত সুখ –দুঃখের মধুর অতীত মনের মণিকোঠায় সঞ্চিত রইলো। আজ আমি উঁচু ক্লাসে পড়ি। পেছনে চেয়ে দেখি বাল্যসখীরা সব রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে। তাদের শৈশবের আনন্দ, চাঞ্চল্য মরে গিয়েছে অলক্ষ্যে। তারা এখন পরের ঘর আলো করে সোনার বৌ। স্নেহময়ী জননী। সংসারের কর্ত্রী হিসাবে আঁচলে চাবির গোছা। অতীত তাদের হৃদয়ের কতখানি অংশ দখল করে আছে, তা আমার জানা নেই। আজিকার সাথে সেদিনের তুলনা করে দেখলাম মাঝে রয়েছে বিরাট ব্যবধান। কেবল কালের ব্যবধানই নয়, সবকিছু হতে ওদের থেকে আমি অনেক দূরে চলে এসেছি। আর কোনদিন ফিরে গিয়ে বলা হবেনা, এইযে, আমি, আমি তোমাদের মাঝে ফিরে এসেছি, তোমাদের কেউ। ‘এ পথ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়!’
No comments:
Post a Comment