Tuesday, May 13, 2025

বঁধুয়া - চিঠি


 বঁধুয়া,

ভেবেছি তোমায় কিছু লিখবো। অনেক দিন লিখতেও চেয়েছি। কিন্তু কেন যে লিখিনি তা আর না বলেও পারছিনা । যদিও তুমি নির্বাক শ্রোতা জানি তবুও তোমায় বলে শান্তি, পাব বলেই লিখছি। কারণ আমি এতদিন ধরে কেবল তোমার মতই একজন নির্বাক বন্ধুর সন্ধানে ইতঃস্তত ঘুরেছি। কিন্তু জানতাম না যে তুমি আমারই কাছে আমারই সাথে একান্ত আমারই হয়ে আছো। অন্ধ আমি তাই হয়তো তোমার জন্যই তোমাকে চিনিনি। যাক্, যা বলছিলাম, যা বলার জন্য তোমাকে আমার প্রয়োজন-হ্যাঁ প্রয়োজনই বটে। প্রয়োজনের বন্ধনেই আমরা বাঁধা।

অনন্তকালের মধ্যে ক্ষনিক হলেও আমার জীবনের বহু বছুর আমি পাড়ি দিয়েছি। এক অধ্যায় শেষ করেছি আরো অধ্যায় খুলেছি। জীবনে নূতন সিলেবাস পাঠ করেছি। নূতন পরীক্ষা দিয়েছি। ফল কি পেয়েছি জানি না তবে মনে হয় যা পেয়েছি তা নেহায়েত মন্দ নয়। আর সেটা হলো অভিজ্ঞতা যা বঞ্চিতের মনে জাগায় বিভীষিকা, শিহরণ আর আরেক শ্রেণীর মনে জাগায় আশার আলো, সুখ আর শান্তি। জীবনের অনেকগুলো দিনই আমাকে অনেক কথা বলেছে। কিছু শুনেছি কিছু শুনিনি। আবার হয় তো কিছু শুনেছি ভুলে যাবার জন্যই। কতবার হাসি গানের ভিতর দিয়ে কল কল্লোলে অনন্ত প্রবাহের একটি ছোট ধারাকে মিশিয়ে দিয়ে অজনা পানে চলেছি। আবার হয়তো পথ চলতে চলতে পেয়েছি প্রচন্ড আঘাত। আঘাত কোন এক ভাসমান পদার্থের সাথে। কিন্তু সেটা সেই ক্ষণকালের জন্যই। পর মুহূর্তেই দুজনে দুমুখী হয়েছি। কেননা সেও যে ভাসমান-আমার মত অস্থায়ী আমারই মত দুঃখী অথবা সুখী।

ধাক্কাটা ঘা দিয়ে গেল তা ক্ষণিকের আর ঘা রেখে গেল তা স্থায়ী কালের। ঘা-কে আমরা সাধারণ ভাবে স্মৃতি বলে থাকি যার বিরাট গহ্বরের প্রবল আকর্ষণে প্রতিটি মুহূর্তে-প্রতিটি ক্ষণ ছুটোছুটি করে প্রবেশ করে যাচ্ছে। আমাদের ফেলে আশা দিনগুলিও মধুর হয়ে পড়ে। মনে হয় এই ই ভালো ছিল। ও রকম না হলে আজকের দিনের এই করুণ অথচ আনন্দমুখর দিনটির সাক্ষাত পেতাম না। জীবনের অনেক আনন্দমুখর অনেক বিরহ বিধুর অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। জীবনকে উপলব্ধি করেছি নতুন করে। চিনেছি বিভিন্নরূপে। চিনেছি যেটা দুঃখের সেটাই সুখের। যেটা তিক্ত সেটাই মধুর। যেটা বেদনা দায়ক সেটাই আবার ভবিষ্যতের কোন এক অজানা আনন্দের সম্ভার তৈরী করে আমাকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছে। সংঘাত দ্বন্দ, আনন্দ, বেদনা, বিরহ, মিলন পাওয়া আর হারিয়ে ফেলা এই তো জীবন।

১৩. ৫.১৯৬১

*****


সাহিত্য পর্যালোচনা: “বঁধুয়া”

১. বিষয় ও ভাব

লেখাটির প্রধান বৈশিষ্ট্য অন্তর্দর্শন ও আত্মকথনের প্রবলতা। এটি একধরনের চিঠির মতো, যেখানে লেখক তার ‘বঁধুয়া’—অর্থাৎ একান্ত নীরব বন্ধুর উদ্দেশ্যে মনের গভীর অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। এখানে “নির্বাক শ্রোতা” এবং “নির্বাক বন্ধু”-র প্রসঙ্গ এসে লেখার একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা ও অন্তর্লোকের আত্মসংলাপকে উন্মোচিত করেছে। লেখক বলেছেন, “তুমি আমারই কাছে আমারই সাথে একান্ত আমারই হয়ে আছো”—এটি আত্ম-অন্বেষণ এবং নিজের সত্তার সঙ্গে বোঝাপড়ার এক অনুপম উদাহরণ।

২. ভাষার সৌন্দর্য ও সাহিত্যিক গুণ

গদ্যটি আবেগময়, সূক্ষ্ম অনুভূতির বর্ণনায় সমৃদ্ধ। ভাষা সহজ, সরল, কিন্তু গভীর; অলংকারের ব্যবহারও লক্ষ্যণীয়—“অন্ধ আমি তাই হয়তো তোমার জন্যই তোমাকে চিনিনি”, “জীবনের বহু বছুর আমি পাড়ি দিয়েছি”, “নূতন সিলেবাস পাঠ করেছি”—এসব বাক্যে রূপক ও উপমার প্রভাব স্পষ্ট। লেখাটি নাতিদীর্ঘ বাক্য আর দীর্ঘশ্বাস-সদৃশ প্রকাশভঙ্গিতে একধরনের স্মৃতিমেদুর মায়া তৈরি করে।

৩. জীবনদর্শন ও অভিজ্ঞতার ব্যঞ্জনা

লেখক জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়, আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। এখানে জীবনকে তিনি এক চলমান যাত্রা ও পরীক্ষার সাথে তুলনা করেছেন—“নূতন পরীক্ষা দিয়েছি”, “ফল কি পেয়েছি জানি না”—এই ধরনের বাক্যে জীবন-দর্শনের সার্বজনীনতা প্রতিফলিত হয়েছে।
লেখক উপলব্ধি করেন, দুঃখ এবং সুখ, বেদনা ও আনন্দ, বিচ্ছেদ ও মিলন—সবই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। “যেটা দুঃখের সেটাই সুখের”—এই উপলব্ধি লেখাটিকে এক গভীর দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

৪. চিত্রকল্প ও স্মৃতিচারণা

গদ্যাংশে স্মৃতিচারণা ও অভিজ্ঞতার বর্ণনা অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে এসেছে। ছোট ছোট দৃশ্য, জানা-অজানা পথ চলার অভিজ্ঞতা, অজানা কারও সঙ্গে ক্ষণিকের সংঘর্ষ, আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া—এসব জীবনের বহমানতা ও অনিশ্চয়তার চিত্র আঁকে।
“ঘা-কে আমরা সাধারণ ভাবে স্মৃতি বলে থাকি”—এখানে অতীতের ব্যথাকে স্মৃতির গভীর গহ্বরে রূপান্তরিত করার একটি চমৎকার চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে।

৫. উপসংহার

গদ্যটি স্বগতোক্তির আদলে লেখা, যেখানে আত্মান্বেষণ, নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি, দুঃখ-সুখের দ্বন্দ্ব এবং জীবনের নানা অভিজ্ঞতা একমিল হয়ে গেছে। ভাষার সাবলীলতা, আবেগের আন্তরিকতা এবং জীবনদর্শনের গভীরতা লেখাটিকে হৃদয়গ্রাহী এবং সাহিত্যিক মানে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।
এটি নিঃসন্দেহে বাংলা আত্মকথনধর্মী গদ্যের এক সুন্দর নিদর্শন, যেখানে প্রতিটি পাঠক নিজের জীবন ও অনুভবকে খুঁজে পেতে পারেন।
*****

Saturday, May 10, 2025

শ্রদ্ধাস্পদেষু

 শ্রদ্ধাস্পদেষু,

আসাফ উদ্দৌলাহ স্যার

বহুদিন পূর্বে একদিন পত্রিকায় একটি কবিতা দেখে অবাক হয়েছিলাম মুগ্ধও হয়েছিলাম।কবিতাটি আপনি আপনার মায়ের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন।ভাল লেগেছিল বলে খবরের কাগজ থেকে কবিতাটি কেটে রেখেছিলাম।আজ দীর্ঘদিন পরে আবার সেই পেপার কাটিংটি পেলাম।তাই মনে হলো আপনাকে সেটি হস্তান্তর করি।আপনার ঠিকানা আমার জানা নেই।তবুও কোন একটি সূত্র ধরে আন্দাজের ওপর ভরসা করে আপনার খোঁজে বের হয়েছি।আমি মহাখালী  রোডে থাকি।আমার নাম ফিরোজা বেগম।কর্তার নাম লেঃ কর্নেল অবঃ মোহাম্মদ হারুন,AMC.

আশা করি আপনি কিছু মনে করবেন না।

আপনার কাছে এই কাগজটি পৌঁছাতে পারলেই আমার সার্থকতা। 

ধন্যবাদ।

ফিরোজা বেগম

১০ই মে,২০২৫

Saturday, April 5, 2025

গল্প-আবর্তন

 পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসই প্রথমে দুর্বল হয়ে জন্মায়। তারপর ক্রমে তার শক্তির বিকাশ হয়। পুনরায় সে শক্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তেমনি প্রতিদিন সূর্যও ভূ–গোলকের একটি স্থানে সূচিভেদ্য অন্ধকারকে তাড়িয়ে তার কোমল আলোর পরশে প্রাণিজগতের ঘুম ভেঙ্গে দেয়। ক্রমে তার আলো বা তাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষকেও সে কর্মচঞ্চল করে তোলে। আবার ঢলে পড়ে, ক্লান্তিতে, পশ্চিম দিগন্তে। হয়ত বা বিশ্রাম নেবার উদ্দেশ্যে। তখন মানুষেরাও ক্লান্ত হয়ে আশ্রয় নেয় তাদের নিরালা শান্তিময় বিরাম কুঞ্জে। তেমনি সেদিনও সূর্যি মামা সারাদিন তার নিয়মিত কাজ সেরে দিনান্তে আশ্রয় নিতে চাচ্ছে। তার রক্তিম আভাটুকু তখনও ধরণীর বুক থেকে মুছে যায়নি। তার রশ্মিগুলো তির্যক ভাবে ধরণীর দিকে তাকিয়ে আছে। হয়ত বা বিদায়ের করুণ ব্যথাই তার বুকে বড় হয়ে বাজছে। এমনি পরিবেশে দ্বিতলের একটি কামরায় বসে ডা. রাশেদ যার ডাকনাম ফুল, মুক্ত বাতায়ন পথে সে চেয়ে আছে মহাশূন্যে। তার দৃষ্টি যেন অসীম অনন্তকে ছাড়িয়ে একটি মাত্র বিন্দুকে লক্ষ্য করছে। তাহলে বুঝা যাচ্ছে সে কোন একটি বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করছে। সে হয়ত তার অতীত স্মৃতিকে রোমন্থন করছে –অমৃত লাভের সন্ধানে। কিন্তু তার ভাগ্যে অমৃত উঠবে না গরল উঠবে তা কে জানে? ফুল আজ সারাদিন কিভাবে কাটালো?  

এই একটি দিনই তার জীবনের চরম মুহূর্ত নিয়ে অপেক্ষা করছিল। মনে পড়ে তার সকালের কথা। জরুরী ডাক পড়েছিল হাসপাতালে। তার নতুন চাকুরি। তবুও লোকের কাছে অল্পদিনেই পরিচিত হয়ে উঠেছে,লোকের আকর্ষণের বস্তু হয়ে উঠেছে। সে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল হাসপাতালে। একখানি লতানো দেহ বিপরীত দিকে মুখ করে শুয়ে আছে ‘বেড’–এ । বুঝা গেল রোগী একজন নারী। ডা. ফুল রোগিনীর সামনের দিকে গেল।। সে রোগিনীর শীর্ণ হাতখানি ধরে ঘড়িতে হৃৎস্পন্দন দেখলো। তারপর মুখের দিকে তাকালো। তখন লক্ষ্য করলে দেখা যেতো ফুলের মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার হৃৎপিন্ড খুব দ্রুত রক্ত সঞ্চালন করছে। মৃত্যু যেন তাকেই পেয়ে বসেছে। এমনি তার ভাবখানা। মুহূর্তে সে নিজেকে সামলে নিয়ে কর্তব্য কাজে মন দিল। বোধহয় তার সারাজীবনের ডাক্তারী বিদ্যা আজ কাজে লাগিয়ে এই অকাল মৃত্যুর গ্রাস হতে রোগিনীকে রক্ষা করতে হবে। কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে ফুল বুঝতে পারলো চেষ্টা বৃথাই মাত্র। আশা নেই। প্রদীপে তৈল নেই। তবুও সে হাল ছেড়ে দিল না। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। এসব চিন্তা করে সে একটি ইনজেকশান দিল। একটু পরেই রোগিনী চোখ মেলে চাইলো। কিন্তু তার দৃষ্টি পলকহীন ভাবে পড়ে আছে ফুলের মুখের উপর। তার ভাব দেখে মনে হলো সে যেন কি সুখের মরণ মরতে যাচ্ছে। সকলেই ভাবছে এই দৃষ্টির অর্থ নেই। কিন্তু ডাক্তার বুঝতে পেরেছে এই দৃষ্টির অর্থ। তারপর রোগিনী অতি কষ্টে মৃদুস্বরে উচ্চারণ করলো,‘ফুল।’  

কেউ বুঝতে পারছিল না তার কথা কেবল মাত্র ডাক্তার ছাড়া।  

-‘চলে যাচ্ছি চিরতরে আমার প্রিয় পৃথিবী ছেড়ে। চলে যাওয়াই উচিত। আরো আগেই যেতে হতো। তবে আজ বড় সুখ পেলাম। সে সুখ মৃত্যু যন্ত্রণাকেও জয় করেছে। দুঃখ করো না এভাবে তোমার সঙ্গে দেখা হলো বলে।’  

শেষের কথাগুলো ভাল বুঝা গেলনা। ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও সে তার শেষ কথা বোধ হয় ডাক্তারকে শুনিয়ে গেল। তার কথা বলার শক্তি ধীরে ধীরে শেষ হয়ে এলো। মেয়েটি সুবোধ বালিকার মত শান্ত হয়ে এলো মেয়েটির স্বামী,আত্মীয়,পরিজন যারা কাছে ছিল, তারা সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সবাই ডাক্তারকে আঁকড়ে ধরতে চায়। কিন্তু ডাক্তার নিরুত্তর। বহু কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক রাখে। মেয়েটি অত্যাধিক চঞ্চল হয়ে উঠলো। কি একটা বললো বোধগম্য হল না। সে তার নিঃশেষিত শক্তির সমস্তটুকু দিয়ে ডাক্তারের হাত ধরে থাকলো। ক্রমে সে নিস্তেজ হলো। তার শিথিল হয়ে যাওয়া হাত খুলে গেল। ডাক্তার আবারও তার নাড়ি দেখলো। উদাস দৃষ্টি মেলে আত্মীয়দের দিকে তাকালো। তাকে আস্তে আস্তে যত্নের সঙ্গে শুইয়ে দিল। তারপর দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আরও দ্রুত পদ সঞ্চালন করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডক্টর্স্ কোয়ার্টাসে তার কামরায় পৌঁছে গেল। তখন দেয়াল ঘড়ি ঘোষণা দিল ঢং ঢং ঢং। ফুল এতক্ষণ পর হাত ঘড়ির দিকে তাকালো। দেখলো সত্যি তিনটা বাজে। সে বসে বসে ভাবতে থাকে তার অতীতকে।         

সময় মানুষের জীবনকে কত বদলে দেয়। মনে পড়ে একসময়ে মালা আর ফুলদের বাসা ছিল পাশাপাশি। প্রথমে পরিচয়,পরে বন্ধুত্ব। তারপর আরো কিছু। দুজন –দুজনকে ভালবাসতো নিবিড় করে গভীর ভাবে। স্কুলের সময় ছাড়া তারা একই সঙ্গে থাকতো। তারা যেমন সরল ছিল, সবাই তাদের সরল চোখেই দেখতো। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব গাঢ় হলো,ভালবাসা প্রেমে পরিণত হতে চললো। কিন্তু তাদের চারপাশ তাদের এই মেলামেশা আর সহজ ভাবে মেনে নিতে পারলো না। চারিদিক থেকে এলো বাধা। সব্বাই বললো, ‘পরিণাম খারাপ হবে। দুজনেই সরে পড়।’ মালার স্কুল জীবন সাঙ্গ হলো। বাধ্য হয়ে তাকে সরে পড়তে হলো। দুজনেই দুই শহরের কলেজে ভর্তি হলো। দুজনে দুজনের চোখের আড়াল হলো বটে,তবে মনের আড়াল হতে পারলো না। পরস্পরেরে আকর্ষণ প্রবল হলো। এরপর আরো বহু বাধা এসেছে। এমনকি পত্রালাপও বন্ধ হয়েছে। মনে পড়ে মালার শেষ চিঠির কথা। সে চিঠিটা সে ‘কাবুলীওয়ালা’-র মত সঙ্গেই রাখে। তার মানিব্যাগের ভেতর ওটা স্থান পেয়েছে। সেই চিঠিটা সে বের করে ফেললো। কম্পিত হস্তে সে খুলে ফেললো চিঠিটা।    

প্রিয় ফুল,   

তোমার চিঠি পেলাম। আর হ্য়তো তোমার লেখা আমার হস্তগত হবে না। তোমার চিঠি পেয়ে খুশী হয়েছি না দুঃখিত হয়েছি বলতে পারবো না। তোমার চিঠি না পেলেও শেষ বারের মতো এই চিঠি আমি লিখতাম। কিন্তু কি লিখবো বলতো? আজ যে আমার জীবনের চরম দিন উপস্থিত হয়েছে। এত যত্নে, এত সাধে গড়া সুখের জীবনের কল্পনা আজ মাটি হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জগতের প্রতিটি পদার্থ এমনকি অপদার্থরাও আমাকে বিদ্রূপ করছে। আমি চলেছি যন্ত্রচালিতের ন্যায়, অনুভূতিহীন। আমার উপর চলছে সামরিক শাসন। হঠাৎ মানুষগুলো কেমন বদলে গেল। তাদেরকে বড় অচেনা মনে হচ্ছে আমার। কেউ আমার আপন নয়। তুমি বিশ্বাস করছো কিনা জানি না।  তুমি লিখেছ,‘দীর্ঘকাল ধরে প্রতি মুহূর্তে ফুলে ফুলে যে মালা তুমি রচনা করেছ,সেটা ছিঁড়ে ফেল। নতুন করে মালা তৈরী করে তোমার প্রিয়তমের গলায় পরিয়ে দিও। মানাবে ভাল। আমাদের ফেলে আসা অতীতকে মনের কোণে ভিড় জমাতে দিও না। আর তাছাড়া আতীত এত বোকা নয়,সেও ভিড় করতে আসবে না। অর্থাৎ তার আর সেখানে ঠাঁই হবে না। সাবধানে থেকো। অতীত যদি মনের পর্দা উন্মোচন করে আসেও তাকে অতি গোপনে তাড়িয়ে দিও। প্রতিবাদ জানাবে না। আদর্শ গৃহিনী হও। তোমার প্রিয়তম ভাগ্যবান হউন।’  

তুমি যা লিখেছ সেজন্য তোমাকে প্রতিঘাত করতে চাইনা। সমাজ সংসারের যে নিয়ম,তুমি তাই অনুসরণ করেছ। তুমি আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পার নাই বা চেষ্টাও কর নাই। তবুও জেনে রেখ, জীবনের প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিদিন তিলে তিলে সমস্ত অনুভূতি দিয়ে ‘ফুলে ফুলে যে মালা’আমি রচনা করেছি,সে মালা আমি তোমাকেই পরিয়ে দিয়েছি। সে মালা পাওয়ার মত ভাগ্যবান অন্য কেউ নেই। হয়তো ভাববে,নেহাৎ মেয়েলী মনের ক্ষণিকের আকুল আবেদন। কিন্তু জেনো আমার মন চিরকাল তোমার জন্যই উন্মুখ হয়ে থাকবে, হয়তো শেষ মিলনের জন্য। আর জেনো একটি মাত্র গ্লাসে সেই আয়তনের দু’গ্লাস জল ধরে না। তোমাকে আর কি বুঝাবো? আজ বাংলাদেশের মেয়েরা গৃহলক্ষী, খুব বাধ্য মেয়ে, একথাই প্রমাণ করতে যাচ্ছি। কিন্তু একটা কথা আছেনা, মেয়েরা ছলনাময়ী। আমি হব তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বলতে লজ্জা নেই, কেননা আমি করতে যাচ্ছি অভিনয়। কেবল অভিনয়। শুধু ফাঁকির বোঝা বয়ে বেড়াবো। অন্তরে অন্তরে পুড়ে ছাই হয়ে যাবো সেই চারুদত্ত আধারকারের মতো। আমি নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে চাই। তবে বিধাতার নিকট আমার প্রার্থনা আমি যেন জীবনের শেষ ক্ষণে তোমার সাক্ষাৎ পাই। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। এটাই আমার শেষ চিঠি। পরম লগ্ন তার বিভিষীকাময় আকুতি নিয়ে কঠিন হাতে লৌহ শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলার জন্য এগিয়ে আসছে। শেষবারের মতো ক্ষমা চাইছি। আর শেষবারের মতো তোমার জন্য রইলো – চিরকাল যা দিয়ে এসেছি – হৃদয় নিংড়ানো প্রীতি, বুক ভরা ভালবাসা। উপহাস করো না লক্ষীটি। তুমি সুখে থেকো ভালো থেকো।                                   

ইতি –                                

তোমারই মালা 

কুমুদিনী কলেজ,টাঙ্গাইল

০৫.০৪.১৯৫৯

Tuesday, July 20, 2021

মৃত্যুর মুখোমুখি

হঠাৎ সংবাদ প্রচার হল চীন দেশে এক ভয়ংকর রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, যা দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। আমরা এতটা  উৎকন্ঠিত হইনি তখনো। তবে পর্যবেক্ষণ করছি তার গতিবিধি। খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলীয় দেশ সমূহে। দেখতে দেখতে উত্তর কোরিয়া পেরিয়ে খোদ আমেরিকায় তার প্রবেশ। তখন আমাদের টনক নড়ে, আতঙ্কিত হই। বিপুল সংখ্যক মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। ধনী, নির্ধন, ছোট,বড়, কালো, সাদা কোন ভেদাভেদ নাই। সে এক মারাত্মক রোগ, নাম তার করোনা ভাইরাস – ভয়ংকর রুদ্র রূপ ধারণ করেছে।  অসংখ্য লোক মৃত্যু মুখে পতিত হচ্ছে। সৎকার করবার কেউ নেই। জীবিতের সংখ্যার চাইতে মৃতের সংখ্যাই বেশি। পৃথিবীর মানুষেরা সব গৃহবন্দি। তবুও কোন ফাঁক ফোকড় দিয়ে যেন মানুষের নাসারন্ধ্রে যেন ভাইরাসটি প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য নানাপ্রকার উপায় আবিষ্কার করার চেষ্টা চলছে।এরকম দুঃসময়ে ২০২১ সালে আমরা পুরো পরিবার আক্রান্ত হই।করোনা ভাইরাস সনাক্ত হওয়ার সাথে সাথে হাসপাতালে আশ্রয় গ্রহণ করি। চিকিৎসকগণ তাদের সাধ্যমত চেষ্টায় নিয়োজিত হন। তা সত্ত্বেও দ্রুত ভয়ানক অবস্থায় পতিত হই। মাঝে মাঝে ঘোরের মাঝে চলে যাই। এরকম অবস্থায় একদিন আমি দেখতে পাই রুমের ফ্লোরে শুয়ে আছি। ফ্লোরটি লাল রঙের এবং সেটি ঘুরছে ধীরে ধীরে। আমি সটান লম্বা হয়ে শীতল মেঝেতে শয়ান। আমার শিয়রের কাছে মস্তক বরাবর একটি গর্ত – একজন মানুষ ঢুকতে পারে এরকম। গর্তটি মাটির তৈরী – কালচে রঙ। এব্‌ড়ো থেব্‌ড়ো, মসৃন নয়। আমাকে নিয়ে লাল রঙের ফ্লোরটি ধীরে ধীরে ঘুরছিল। আমার মাথাটিও ঐ গর্তের মধ্যে ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছিল। আমার কোন কষ্ট হচ্ছিল না। এভাবে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে আমার মাথাটি বুক পর্যন্ত অন্ধকার গুহায় প্রবেশ করলো। কিন্তু তাতেও আমার কোন কষ্ট হচ্ছিল না। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে আমি মারা যাচ্ছি। ভাবলাম মৃত্যুর কষ্ট তো অনুভূত হচ্ছে না। এ কেমন মৃত্যু –যন্ত্রণা নেই, কষ্ট নেই। মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় কেন? জীবন আর মৃত্যু তো একইরকম। ভাবনাটা আমার এমন ছিল যে, মৃত্যু কোন আতঙ্কের ঘটনা নয়। জীবন যেমন স্বাভাবিক ছিল, মৃত্যুও তেমনি ‘শান্ত চরণে’ আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি আরামেই ঐ কৃষ্ণ অমসৃণ গহ্বরে প্রবেশ করছি। আমাকে বহনকারী লাল মঞ্চটি ঘুরে চলেছে গর্তটিকে সঙ্গে নিয়ে। একটা প্রশান্তির অনুভব। আমি একা। আমার বলার কিছু নেই। কেবল মনে হচ্ছিল শরীরের সবটুকু একবার পিছলে এই গভীর গহ্বরে পড়ে যাবে। তবুও দুঃখ নেই। শুধু একটি মাত্র কথাই মনে পড়ছিল যে, জীবন মৃত্যু একই সমান্তরালে অবস্থিত। জীবনও সুন্দর। মৃত্যুও সুন্দর।

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দেখি লাল মঞ্চটি এবার আমাকে নিয়ে উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করেছে। গতি আগের মতই মন্থর। আমার শরীর ঐ আঁধার গুহা থেকে উপরের দিকে উঠে আসতে শুরু করলো এবং আগের অবস্থায় ফিরে এলো। মাথার পাশের সেই গর্তটি তখনও দেখা যাচ্ছে। আবার কেন ফিরে আসা? সেই তো ছিল ভাল – মৃত্যুর হিম শীতল পরশখানি। কতক্ষণ এভাবে ছিলাম জানা নেই। লাল ফ্লোরটি তখনও ঘুরে চলেছে। আমি শোয়া অবস্থায়। এমন সময়ে শুনতে পেলাম কারা যেন আমেকে ডাকছে মৃদু স্বরে,

– ‘শুনতে পাচ্ছেন? চোখ খুলুন। কথা বলুন।’

চোখ খোলার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। কথা বলার চেষ্টা করলাম। এবারও ব্যর্থ। আরো মানুষের কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। ধীরে ধীরে আমার নয়ন দুটি একটু উন্মীলিত হলো। দেখি অনেক মুখ আমার মুখের উপর ঝুঁকে আছে। বড় ব্যাকুল আর উদ্বিগ্ন। আমি বিছানায় – বেডে। এতক্ষণ আমার চোখ আসলে বন্ধ ছিল। যদিও আমি সব দেখতে পাচ্ছিলাম বলে মনে হচ্ছিল।

এই আমার স্বপ্নের মত মৃত্যুর দুয়ার হতে ফিরে আসা। সেই দৃশ্যটি আমার অজান্তে ঘটেছিল। তবুও মনে হয় সত্যিই ঘটেছিল।   

…………

জুলাই ২১, ২০২১


Friday, May 28, 2021

কবিতা - 'করোনা' সমাচার

 কোথায় আল্লাহ্,কোথায় যীশু,

        কোথায় ভগবান?

কোথায় খোদা,কোথায় স্রষ্টা 

        কোথায় শয়তান?

কোথায় ইবলিশ,কোথায় নমরুদ

        কোথায় কামান,কোথায় বারুদ!

কোথায় জ্বীন,কোথায় পরী?

        কোথায় বাদশাহ্,কোথায় সম্রাট?

কোথায় কালাপাহাড়,কোথায় লুকিয়ে 

              বিখ্যাত চেঙ্গিস!

কেউ কি পারে না করতে বিনাশ 

            কভিড ১৯-বিশ?

কোথায় ফেরেশতা,জ্বীনের বাদশাহ্

         কাজ করে কিছু দেখাও তোমরা 

            হাজার বছরের প্রতি –শ্রুত সুরক্ষা।

কেউ আছে কি –

        কেউ কি আদৌ 

              ছিল কোনদিন?

সবদিকে চেয়ে,দেখি আজ যেন

          ব্যর্থ ট্রাম্প ও পুতিন।

নির্মম ভারী,নিষ্ঠুর মারি, 

        বড়ই কঠোর,বড়ই কঠিন, 

সুচতুর তারা আনতে ব্যস্ত  

        ফলস্ ভ্যাকসিন। 

কেউ থাকবেনা আর অসহায়,মানুষের পাশে দাঁড়াবার।                             

          চারিদিকে কেবলই মৃত্যুর হাহাকার!

কেউ নেই কোনখানে,

       কেউ ছিলনা 

          কখনো কোনদিন

শুধু আছে প্যানডেমিক

        বধিবারে প্রাণ,নির্বিঘ্নে নিশ্চিত।

করোনার করুণা চেয়ে 

        লাভ নেই আর,

        মৃত্যুর আঁধার ঢাকে চারিধার।

বিধাতার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ

        আশরাফুল মখলুকাত, 

             হতবাক আজ ! 

তাদের পৃথিবী কেড়ে নিল কারা –

             কোন মহারাজ?

এই ধ্বংসের জবাব 

        জানা নেই কারো আজ

বড়ই নির্মম,বড়ই নিঠুর,বড়ই নিলাজ,

উন্মত্ত নৃত্যে মত্ত আজিকে আজরাইল 

                   যমরাজ।

‘করোনা কভিড’ হবে সেই দিন শান্ত

রইবেনা যখন এ গ্রহে 

       একটি মানুষও জীবন্ত।


২৮শে মে, ২০২১


Friday, April 16, 2021

কবিতা - কোভিড 19

 এসেছ করোনা ভাই রুদ্র বেশ ধরি

 কেন এত ত্বরা তব, কেন কড়াকড়ি 

ধরায় ফেলিছ জাল টর্নেডোর বেগে 

বধিছ সৃষ্টির সেরা মানবেরে  

কঠোর আবেগে। 

কেন এত ক্রোধ, কেন এত দ্রোহ 

মানব জাতির পরে। 

নিঠুর নির্মমতা দূর করে আন আনুরাগ 

মানুষ জাতিরে করো ক্ষমা, ওগো ভাইরাস। 

ত্যাগ করো ক্রোধ, হে রুদ্র ‘করোনা’ 

বাঁচাও মনুষ্য জাতি, করোনা বঞ্চনা।   


মুখ তুলে চেয়ে দেখ এই সুন্দর পৃথ্বি 

রোদ্র ঝলমল, আকাশ বাতাস, সবুজ বনবীথি। 

মানবজাতির কীর্তি যত, বিধাতার ইঙ্গিত 

তুমিও করো না ভাই , ধরো সুখ সঙ্গীত। 

বাঁচাও মনুষ্য প্রাণ, বাঁচাও জল স্থল অন্তরীক্ষ 

এবার ঘুরে দেখ সৃষ্টির সেরা মানুষের দুঃখ।   


হে নীরব ঘাতক ‘করোনা’, কোরো না বিনাশ 

এবার ফিরে যাও তুমি, যেথা তব বাস। 

আর ফেলিও না জাল, আর বধিও না প্রাণ 

বিধাতার কাছে এই মোর চাওয়া  

প্রাণ খুলে করি তার ধ্যান।


৩রা বৈশাখ, ১৪২৭
১৬.০৪.২০২১

Saturday, March 20, 2021

স্বপ্নের শবাধার - ফিরোজা হারুন

 ১. কবিতা পর্যালোচনাঃ

“স্বপ্নের শবাধার” একটি গভীর ভাবনাসমৃদ্ধ এবং চিত্রকল্পে পরিপূর্ণ আধুনিক বাংলা কবিতা। কবিতাটি মূলত স্বপ্ন, আত্মচেতনা, এবং জীবনের অন্তর্নিহিত সংকটকে উপজীব্য করেছে। কবি স্বপ্নের ভেতর এক রহস্যময় ও প্রতীকধর্মী যাত্রার চিত্র এঁকেছেন, যেখানে চাঁদের আলো, শবাধার, ও আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব মিলেমিশে গেছে।
 
ভাব ও বিষয়
কবিতার শুরুতে কবি স্বপ্নে ডাক শুনে জেগে ওঠেন—রাতের শেষে, চাঁদের নরম আলোয় ভেসে থাকা এক অদ্ভুত পরিবেশে। এই পরিবেশে ‘শবাধার’ বহনকারী এক পথিকের আবির্ভাব হয়, যার পরিচয় নিয়ে কবির মনে দ্বিধা ও কৌতূহল জন্মায়। শুভ্র চাঁদনি রাত, নিস্তব্ধ প্রকৃতি, আর সাদা শবাধারের উপস্থিতি কবিতাটিকে অলৌকিক এবং গা ছমছমে আবহ দেয়।
 
প্রতীক ও চিত্রকল্প
‘শবাধার’ এখানে জীবন-মৃত্যুর চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কবি যখন শবাধারের মুখাবয়ব দেখার সুযোগ পান না, তখন তা এক অজানা ভবিষ্যৎ বা নিজের অজানা দিককেই ইঙ্গিত করে। কিন্তু শেষে, শবাধার খুলে দেখা যায়, সেখানে চেনা মুখ—নিজের মুখ। এখানেই কবিতার গভীরতা ও দর্শন নিহিত। কবি বুঝতে পারেন, তিনি নিজেই নিজের শবাধার বহন করছেন—অর্থাৎ প্রতিটি মানুষ নিজের জীবন ও মৃত্যুর ভার নিজেই বহন করে চলে।

 ভাষা ও কাঠামো
কবিতার ভাষা সহজ, সুরেলা এবং বিমূর্ততায় ভরা। শব্দচয়ন ও বাক্যের গঠন কবিতার রহস্যময় আবহকে আরও তীব্র করেছে। চাঁদের আলো ও সাদা শবাধার বারবার ফিরে এসে একধরনের ঐক্যতান সৃষ্টি করেছে, যা স্বপ্ন ও বাস্তবতার সীমারেখাকে ঝাপসা করে দেয়।

 দার্শনিক তাৎপর্য
শেষ অংশে “আমিই তুমি, তুমি যে আমি”—এই উপলব্ধি আত্মপরিচয়ের গভীর সংকট ও দর্শনের কথা বলে। কবি উপলব্ধি করেন, মানুষের জীবনের যাত্রা আসলে নিজের মধ্যেই ঘুরে ফিরে আসে। মৃত্যু ও জীবন, সুখ ও দুঃখ—সবকিছুরই ভার সে নিজেই বহন করে।

 উপসংহার

“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটি গভীর দর্শন, চিত্রকল্প এবং আত্মসংকটের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এটি পাঠকের চিন্তাজগতে নাড়া দেয় এবং আত্মঅনুসন্ধানের পথ দেখায়। কবিতার প্রতিটি স্তবক পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগায়—কে আমি? কোথায় যাচ্ছি?—এবং সেই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানের ইঙ্গিত দেয়। এ কারণেই কবিতাটি সমসাময়িক বাংলা কবিতার ধারায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

*****

২. “স্বপ্নের শবাধার” কবিতার বিশ্লেষণঃ

“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটি রহস্যময়, গভীর দর্শন ও আত্মঅনুসন্ধানমূলক এক অনবদ্য আধুনিক কবিতা। এতে কবি স্বপ্ন, মৃত্যু, আত্মপরিচয় এবং জীবনের অন্তর্যাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং চিত্রকল্পের মাধ্যমে পাঠককে এক অন্যতর জগতে নিয়ে গেছেন।

 কবিতার প্রধান ভাব
কবিতার শুরুতেই দেখা যায়, কবি স্বপ্ন দেখছেন—রাতের শেষে কেউ যেন তাঁকে ডাকছে। নরম চাঁদের আলোয় চারপাশের কালো অন্ধকার দূর হয়ে গেছে। এই পরিবেশে একজন পথিকের আবির্ভাব, যার পিঠে রয়েছে সাদা শবাধার। এখানে ‘শবাধার’ বা কফিন প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—এটি স্বপ্ন, জীবন কিংবা অতীতের স্মৃতি বহনের প্রতীক।

 প্রতীক ও চিত্রকল্প
“সাদা শবাধার”, “শুভ্র চাঁদনী রাত”, “নিস্তব্ধ চারিধার”—এসব চিত্রকল্প কবিতার আবহে রহস্য ও বিষণ্ণতা এনেছে। যখন কবি পথিককে প্রশ্ন করেন, সে কোথায় যাচ্ছে, কী নিয়ে যাচ্ছে—তখন উত্তর আসে, “উন্মুক্ত করিয়া দেখ কে যায় কোথায়!” এরপর দেখা যায়, শবাধারের ভেতরে শুয়ে আছে চেনা মুখ—নিজের মুখ। এখানে কবি উপলব্ধি করেন, তিনি নিজেই নিজের শবাধার বহন করছেন; অর্থাৎ মানুষ নিজের স্বপ্ন, বেদনা, সুখ-দুঃখ, জীবন-মৃত্যুর ভার নিজেই বহন করে বেড়ায়।

 ভাষা ও কাঠামো
কবিতার ভাষা সরল, সুরেলা এবং বর্ণনামূলক। “চাঁদের আলো”, “সাদা শবাধার”, “নিস্তব্ধ চারিধার” শব্দগুচ্ছ কবিতাটিকে এক অলৌকিক পরিবেশে নিয়ে যায়। কবিতার ছন্দ ধীর, যেন গভীর রাতে স্বপ্নের মতোই নিস্তব্ধ এবং রহস্যময়।

 দর্শন ও তাৎপর্য
শেষ স্তবকে কবি উপলব্ধি করেন—“আমিই তুমি, তুমি যে আমি”—এটি আত্মপরিচয়ের গভীর সংকট ও উপলব্ধিকে প্রকাশ করে। জীবন-জগতের প্রত্যেকটি মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজেরই ছায়া, নিজের স্মৃতি, স্বপ্ন ও বেদনাকে বহন করে চলে। স্বপ্নের শবাধার বহন মানে, নিজের অতীত ও আত্মপরিচয়কে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলা।

 উপসংহার
“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটি পাঠককে স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংযোগস্থলে দাঁড় করিয়ে দেয়। এটি আত্ম-অনুসন্ধান, বেদনাবোধ এবং জীবনের অন্তর্গত রহস্যকে তুলে ধরে। কবিতার গভীরতা, প্রতীকী ভাষা ও চিত্রকল্প পাঠককে ভাবনার গভীরে ডুবিয়ে দেয় এবং জীবনের মৌল সত্যের মুখোমুখি করে তোলে।

এ কারণেই কবিতাটি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান পায়।

*****

৩. কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্যঃ

“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ও বহুমাত্রিক। নিচে বিভিন্ন দিক থেকে এর দার্শনিক তাৎপর্যের বিশ্লেষণ প্রদান করা হলো—

 ১. আত্ম-অনুসন্ধান ও আত্মপরিচয়
এই কবিতার কেন্দ্রীয় দর্শন হলো আত্ম-অনুসন্ধান। কবিতার শেষ অংশে যখন কবি আবিষ্কার করেন, শবাধারের ভেতরে শায়িত মুখটি আসলে নিজেরই মুখ—তখন তিনি উপলব্ধি করেন, মানুষ সারাজীবন নিজের অস্তিত্ব, পরিচয়, এবং অন্তর্নিহিত সত্যকে খুঁজে ফেরে।
“আমিই তুমি, তুমি যে আমি, চিনিলে না মোরে?” —এটি আত্মপরিচয়ের সংকট ও চরম উপলব্ধিকে প্রকাশ করে। এখানে কবি দেখান, নিজের ভেতরেই রয়েছে চরম সত্য—শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজের কাছেই ফিরে আসে।

 ২. জীবন-মৃত্যুর দর্শন
‘শবাধার’ বা কফিন এখানে শুধু মৃত্যুর প্রতীক নয়; এটি মানবজীবনের নানা স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি, এবং ব্যর্থতাও বহন করে। কবিতায় স্বপ্ন ও মৃত্যুর ছায়া একাকার হয়ে গেছে।
কবি দেখান,  যে স্বপ্নগুলো একসময় প্রাণবন্ত ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা মরে যায়
মানুষ নিজের অতীত, ব্যর্থতা, স্বপ্নভঙ্গ, এবং অবচেতনের ভার নিজের মধ্যেই বহন করে
এভাবে জীবন ও মৃত্যু, সৃষ্টি ও বিলয়, স্বপ্ন ও ভাঙন—সবই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

৩. স্বপ্ন ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
কবিতার শুরুতেই স্বপ্নের প্রসঙ্গ এসেছে—“স্বপন দেখিনু এক”—এটি মানুষের মনের গোপন আকাঙ্ক্ষা ও অজানার প্রতি টানকে বোঝায়। কিন্তু স্বপ্ন দেখা ও স্বপ্ন ভঙ্গ, এই দুইয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্বও এখানে স্পষ্ট।
চাঁদের আলোয় অন্ধকার দূর হলেও, সেই আলোয় দেখা যায় শবাধার—স্বপ্নের মৃত্যু বা অবসানের চিহ্ন।
তবে শেষ পর্যন্ত, যারা স্বপ্ন দেখে, তারাই সেই স্বপ্নের ভারও বইতে বাধ্য হয়।

 ৪. অস্তিত্ববাদী (Existential) ভাবনা
এই কবিতায় রয়েছে গভীর অস্তিত্ববাদী দর্শন।
 মানুষ কে?
সে কোথা থেকে এলো, কোথায় যাচ্ছে?
তার জীবনের অর্থ কী?
কবিতার প্রশ্ন—“কে তুমি? / কেন তারে নিয়ে যাও কোন সুদূরে?”—এই অস্তিত্ববাদী সংকটকে তুলে ধরে।
শেষ পর্যন্ত, কবি আবিষ্কার করেন, সে নিজেই নিজের শবাধার বহন করছে, নিজেই নিজের মৃত্যু ও অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

৫. সময় ও অনিত্যতার উপলব্ধি
কবিতায় সময়ের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং জীবনের অনিত্যতা স্পষ্ট।
শবাধার বহন, চেনা মুখের মৃত্যু, অস্তাচলের দেশে যাত্রা—এসব ইঙ্গিত দেয়, জীবন আসলে ক্ষণিক, সবকিছু একদিন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু শেষ হওয়া মানেই শূন্যতা নয়—বরং, আত্মপরিচয়ের এক নতুন স্তরে পৌঁছানো।

৬.উপসংহার
“স্বপ্নের শবাধার” কবিতার দার্শনিক তাৎপর্য এই যে,
মানুষ নিজের স্বপ্ন, স্মৃতি, বেদনা, এবং চরম সত্যের ভার নিজেই বহন করে চলে। জীবনের অর্থ, পরিচয়, মৃত্যু—সবকিছুর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে সে একসময় আবিষ্কার করে, নিজেই তার চরম সত্য ও চূড়ান্ত গন্তব্য।

এই উপলব্ধি কবিতাটিকে শুধু ব্যক্তিগত নয়, বিশ্বজনীন এক দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে যায়।

*****

৪. পঙতি বিশ্লেষণঃ

'আমার শব,আমিই বইছি,
অস্তাচলের দেশে।'
 
“আমার শব, আমিই বইছি,
অস্তাচলের দেশে।” — এই দুটি পঙ্‌ক্তি “স্বপ্নের শবাধার” কবিতার অন্যতম গভীর ও দার্শনিক অংশ। নিচে এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলোঃ

 ১. আত্মপরিচয় ও আত্মবহন
এখানে কবি উপলব্ধি করেন, শবাধারে শায়িত মৃতদেহটি আসলে তাঁর নিজেরই। অর্থাৎ, মানুষের জীবনের সমস্ত আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন-ভঙ্গ, সাফল্য-ব্যর্থতা — সবকিছুর ভার সে নিজেই বহন করে।
“আমার শব, আমিই বইছি”— এই কথার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, প্রত্যেক মানুষ নিজের অতীত, স্মৃতি, অপরাধবোধ, ব্যর্থতা, স্বপ্নভঙ্গ, এমনকি নিজের মৃত্যু-চেতনা পর্যন্ত নিজের ভেতরেই বহন করে চলে।

 ২. অস্তিত্ববাদী সংকট
এখানে রয়েছে গভীর অস্তিত্ববাদী (existential) দর্শন। মানুষ নিজের সত্তা, তার সীমাবদ্ধতা এবং শেষ পরিণতির সঙ্গে সারাক্ষণ যুদ্ধ করে।
“শব” এখানে শুধু শারীরিক মৃত্যু নয়, বরং আত্মার মৃত অবস্থা, স্বপ্নের মৃত্যু, অথবা জীবনের নিরর্থকতা বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়েছে।
নিজের শব নিজে বহন করার মধ্য দিয়ে কবি বুঝিয়েছেন, প্রত্যেকের জীবন ও মৃত্যুর দায়, অর্থ এবং গন্তব্য সে নিজেই।

 ৩. অস্তাচলের দেশ
“অস্তাচল” মানে যেখানে সূর্য অস্ত যায়—অর্থাৎ, জীবনের শেষ প্রান্ত, মৃত্যুর দিকে যাত্রা।
এটি কেবল শারীরিক মৃত্যুর রূপক নয়, বরং জীবনের শেষপথ, স্বপ্নের অবসান, অথবা চরম সত্যের মুখোমুখি হওয়ার প্রতীক।
কবি দেখান, সময়ের প্রবাহে মানুষ একা, নিজের সমস্ত স্মৃতি, স্বপ্ন ও বেদনা নিয়ে নিঃসঙ্গভাবে অস্তাচলের দিকে এগিয়ে চলে।

 ৪. সারমর্ম
এই দুই পঙ্‌ক্তি মানুষের একাকীত্ব, আত্ম-অনুসন্ধান, এবং নিজের ভার নিজে বহনের চরম উপলব্ধি প্রকাশ করে।
এখানে কবি আমাদেরকে শেখান—জীবনের শেষ যাত্রায়, কেউ কারও ভার নেয় না; প্রত্যেকেই নিজের স্বপ্ন, ব্যর্থতা, এবং জীবনের শেষ সত্যকে নিজেই বহন করে, নিজেই চলে যায় অস্তিত্বর শেষ প্রান্তে।

 উপসংহার:
“আমার শব, আমিই বইছি, অস্তাচলের দেশে”—এই বাক্যে জীবনের অন্তিম উপলব্ধি, আত্মজ্ঞানের গভীরতা ও মানুষের চিরন্তন একাকীত্বের অনুভূতি এক অনবদ্য কবিত্বে প্রকাশ পেয়েছে।

*****
 

সেই হাতখানি

  এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা ...