Friday, April 16, 2021

কবিতা - কোভিড 19

 এসেছ করোনা ভাই রুদ্র বেশ ধরি

 কেন এত ত্বরা তব, কেন কড়াকড়ি 

ধরায় ফেলিছ জাল টর্নেডোর বেগে 

বধিছ সৃষ্টির সেরা মানবেরে  

কঠোর আবেগে। 

কেন এত ক্রোধ, কেন এত দ্রোহ 

মানব জাতির পরে। 

নিঠুর নির্মমতা দূর করে আন আনুরাগ 

মানুষ জাতিরে করো ক্ষমা, ওগো ভাইরাস। 

ত্যাগ করো ক্রোধ, হে রুদ্র ‘করোনা’ 

বাঁচাও মনুষ্য জাতি, করোনা বঞ্চনা।   


মুখ তুলে চেয়ে দেখ এই সুন্দর পৃথ্বি 

রোদ্র ঝলমল, আকাশ বাতাস, সবুজ বনবীথি। 

মানবজাতির কীর্তি যত, বিধাতার ইঙ্গিত 

তুমিও করো না ভাই , ধরো সুখ সঙ্গীত। 

বাঁচাও মনুষ্য প্রাণ, বাঁচাও জল স্থল অন্তরীক্ষ 

এবার ঘুরে দেখ সৃষ্টির সেরা মানুষের দুঃখ।   


হে নীরব ঘাতক ‘করোনা’, কোরো না বিনাশ 

এবার ফিরে যাও তুমি, যেথা তব বাস। 

আর ফেলিও না জাল, আর বধিও না প্রাণ 

বিধাতার কাছে এই মোর চাওয়া  

প্রাণ খুলে করি তার ধ্যান।


৩রা বৈশাখ, ১৪২৭
১৬.০৪.২০২১

Saturday, March 20, 2021

স্বপ্নের শবাধার - ফিরোজা হারুন

 ১. কবিতা পর্যালোচনাঃ

“স্বপ্নের শবাধার” একটি গভীর ভাবনাসমৃদ্ধ এবং চিত্রকল্পে পরিপূর্ণ আধুনিক বাংলা কবিতা। কবিতাটি মূলত স্বপ্ন, আত্মচেতনা, এবং জীবনের অন্তর্নিহিত সংকটকে উপজীব্য করেছে। কবি স্বপ্নের ভেতর এক রহস্যময় ও প্রতীকধর্মী যাত্রার চিত্র এঁকেছেন, যেখানে চাঁদের আলো, শবাধার, ও আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব মিলেমিশে গেছে।
 
ভাব ও বিষয়
কবিতার শুরুতে কবি স্বপ্নে ডাক শুনে জেগে ওঠেন—রাতের শেষে, চাঁদের নরম আলোয় ভেসে থাকা এক অদ্ভুত পরিবেশে। এই পরিবেশে ‘শবাধার’ বহনকারী এক পথিকের আবির্ভাব হয়, যার পরিচয় নিয়ে কবির মনে দ্বিধা ও কৌতূহল জন্মায়। শুভ্র চাঁদনি রাত, নিস্তব্ধ প্রকৃতি, আর সাদা শবাধারের উপস্থিতি কবিতাটিকে অলৌকিক এবং গা ছমছমে আবহ দেয়।
 
প্রতীক ও চিত্রকল্প
‘শবাধার’ এখানে জীবন-মৃত্যুর চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কবি যখন শবাধারের মুখাবয়ব দেখার সুযোগ পান না, তখন তা এক অজানা ভবিষ্যৎ বা নিজের অজানা দিককেই ইঙ্গিত করে। কিন্তু শেষে, শবাধার খুলে দেখা যায়, সেখানে চেনা মুখ—নিজের মুখ। এখানেই কবিতার গভীরতা ও দর্শন নিহিত। কবি বুঝতে পারেন, তিনি নিজেই নিজের শবাধার বহন করছেন—অর্থাৎ প্রতিটি মানুষ নিজের জীবন ও মৃত্যুর ভার নিজেই বহন করে চলে।

 ভাষা ও কাঠামো
কবিতার ভাষা সহজ, সুরেলা এবং বিমূর্ততায় ভরা। শব্দচয়ন ও বাক্যের গঠন কবিতার রহস্যময় আবহকে আরও তীব্র করেছে। চাঁদের আলো ও সাদা শবাধার বারবার ফিরে এসে একধরনের ঐক্যতান সৃষ্টি করেছে, যা স্বপ্ন ও বাস্তবতার সীমারেখাকে ঝাপসা করে দেয়।

 দার্শনিক তাৎপর্য
শেষ অংশে “আমিই তুমি, তুমি যে আমি”—এই উপলব্ধি আত্মপরিচয়ের গভীর সংকট ও দর্শনের কথা বলে। কবি উপলব্ধি করেন, মানুষের জীবনের যাত্রা আসলে নিজের মধ্যেই ঘুরে ফিরে আসে। মৃত্যু ও জীবন, সুখ ও দুঃখ—সবকিছুরই ভার সে নিজেই বহন করে।

 উপসংহার

“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটি গভীর দর্শন, চিত্রকল্প এবং আত্মসংকটের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এটি পাঠকের চিন্তাজগতে নাড়া দেয় এবং আত্মঅনুসন্ধানের পথ দেখায়। কবিতার প্রতিটি স্তবক পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগায়—কে আমি? কোথায় যাচ্ছি?—এবং সেই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানের ইঙ্গিত দেয়। এ কারণেই কবিতাটি সমসাময়িক বাংলা কবিতার ধারায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

*****

২. “স্বপ্নের শবাধার” কবিতার বিশ্লেষণঃ

“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটি রহস্যময়, গভীর দর্শন ও আত্মঅনুসন্ধানমূলক এক অনবদ্য আধুনিক কবিতা। এতে কবি স্বপ্ন, মৃত্যু, আত্মপরিচয় এবং জীবনের অন্তর্যাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং চিত্রকল্পের মাধ্যমে পাঠককে এক অন্যতর জগতে নিয়ে গেছেন।

 কবিতার প্রধান ভাব
কবিতার শুরুতেই দেখা যায়, কবি স্বপ্ন দেখছেন—রাতের শেষে কেউ যেন তাঁকে ডাকছে। নরম চাঁদের আলোয় চারপাশের কালো অন্ধকার দূর হয়ে গেছে। এই পরিবেশে একজন পথিকের আবির্ভাব, যার পিঠে রয়েছে সাদা শবাধার। এখানে ‘শবাধার’ বা কফিন প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—এটি স্বপ্ন, জীবন কিংবা অতীতের স্মৃতি বহনের প্রতীক।

 প্রতীক ও চিত্রকল্প
“সাদা শবাধার”, “শুভ্র চাঁদনী রাত”, “নিস্তব্ধ চারিধার”—এসব চিত্রকল্প কবিতার আবহে রহস্য ও বিষণ্ণতা এনেছে। যখন কবি পথিককে প্রশ্ন করেন, সে কোথায় যাচ্ছে, কী নিয়ে যাচ্ছে—তখন উত্তর আসে, “উন্মুক্ত করিয়া দেখ কে যায় কোথায়!” এরপর দেখা যায়, শবাধারের ভেতরে শুয়ে আছে চেনা মুখ—নিজের মুখ। এখানে কবি উপলব্ধি করেন, তিনি নিজেই নিজের শবাধার বহন করছেন; অর্থাৎ মানুষ নিজের স্বপ্ন, বেদনা, সুখ-দুঃখ, জীবন-মৃত্যুর ভার নিজেই বহন করে বেড়ায়।

 ভাষা ও কাঠামো
কবিতার ভাষা সরল, সুরেলা এবং বর্ণনামূলক। “চাঁদের আলো”, “সাদা শবাধার”, “নিস্তব্ধ চারিধার” শব্দগুচ্ছ কবিতাটিকে এক অলৌকিক পরিবেশে নিয়ে যায়। কবিতার ছন্দ ধীর, যেন গভীর রাতে স্বপ্নের মতোই নিস্তব্ধ এবং রহস্যময়।

 দর্শন ও তাৎপর্য
শেষ স্তবকে কবি উপলব্ধি করেন—“আমিই তুমি, তুমি যে আমি”—এটি আত্মপরিচয়ের গভীর সংকট ও উপলব্ধিকে প্রকাশ করে। জীবন-জগতের প্রত্যেকটি মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজেরই ছায়া, নিজের স্মৃতি, স্বপ্ন ও বেদনাকে বহন করে চলে। স্বপ্নের শবাধার বহন মানে, নিজের অতীত ও আত্মপরিচয়কে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলা।

 উপসংহার
“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটি পাঠককে স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংযোগস্থলে দাঁড় করিয়ে দেয়। এটি আত্ম-অনুসন্ধান, বেদনাবোধ এবং জীবনের অন্তর্গত রহস্যকে তুলে ধরে। কবিতার গভীরতা, প্রতীকী ভাষা ও চিত্রকল্প পাঠককে ভাবনার গভীরে ডুবিয়ে দেয় এবং জীবনের মৌল সত্যের মুখোমুখি করে তোলে।

এ কারণেই কবিতাটি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান পায়।

*****

৩. কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্যঃ

“স্বপ্নের শবাধার” কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ও বহুমাত্রিক। নিচে বিভিন্ন দিক থেকে এর দার্শনিক তাৎপর্যের বিশ্লেষণ প্রদান করা হলো—

 ১. আত্ম-অনুসন্ধান ও আত্মপরিচয়
এই কবিতার কেন্দ্রীয় দর্শন হলো আত্ম-অনুসন্ধান। কবিতার শেষ অংশে যখন কবি আবিষ্কার করেন, শবাধারের ভেতরে শায়িত মুখটি আসলে নিজেরই মুখ—তখন তিনি উপলব্ধি করেন, মানুষ সারাজীবন নিজের অস্তিত্ব, পরিচয়, এবং অন্তর্নিহিত সত্যকে খুঁজে ফেরে।
“আমিই তুমি, তুমি যে আমি, চিনিলে না মোরে?” —এটি আত্মপরিচয়ের সংকট ও চরম উপলব্ধিকে প্রকাশ করে। এখানে কবি দেখান, নিজের ভেতরেই রয়েছে চরম সত্য—শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজের কাছেই ফিরে আসে।

 ২. জীবন-মৃত্যুর দর্শন
‘শবাধার’ বা কফিন এখানে শুধু মৃত্যুর প্রতীক নয়; এটি মানবজীবনের নানা স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি, এবং ব্যর্থতাও বহন করে। কবিতায় স্বপ্ন ও মৃত্যুর ছায়া একাকার হয়ে গেছে।
কবি দেখান,  যে স্বপ্নগুলো একসময় প্রাণবন্ত ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা মরে যায়
মানুষ নিজের অতীত, ব্যর্থতা, স্বপ্নভঙ্গ, এবং অবচেতনের ভার নিজের মধ্যেই বহন করে
এভাবে জীবন ও মৃত্যু, সৃষ্টি ও বিলয়, স্বপ্ন ও ভাঙন—সবই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

৩. স্বপ্ন ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
কবিতার শুরুতেই স্বপ্নের প্রসঙ্গ এসেছে—“স্বপন দেখিনু এক”—এটি মানুষের মনের গোপন আকাঙ্ক্ষা ও অজানার প্রতি টানকে বোঝায়। কিন্তু স্বপ্ন দেখা ও স্বপ্ন ভঙ্গ, এই দুইয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্বও এখানে স্পষ্ট।
চাঁদের আলোয় অন্ধকার দূর হলেও, সেই আলোয় দেখা যায় শবাধার—স্বপ্নের মৃত্যু বা অবসানের চিহ্ন।
তবে শেষ পর্যন্ত, যারা স্বপ্ন দেখে, তারাই সেই স্বপ্নের ভারও বইতে বাধ্য হয়।

 ৪. অস্তিত্ববাদী (Existential) ভাবনা
এই কবিতায় রয়েছে গভীর অস্তিত্ববাদী দর্শন।
 মানুষ কে?
সে কোথা থেকে এলো, কোথায় যাচ্ছে?
তার জীবনের অর্থ কী?
কবিতার প্রশ্ন—“কে তুমি? / কেন তারে নিয়ে যাও কোন সুদূরে?”—এই অস্তিত্ববাদী সংকটকে তুলে ধরে।
শেষ পর্যন্ত, কবি আবিষ্কার করেন, সে নিজেই নিজের শবাধার বহন করছে, নিজেই নিজের মৃত্যু ও অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

৫. সময় ও অনিত্যতার উপলব্ধি
কবিতায় সময়ের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং জীবনের অনিত্যতা স্পষ্ট।
শবাধার বহন, চেনা মুখের মৃত্যু, অস্তাচলের দেশে যাত্রা—এসব ইঙ্গিত দেয়, জীবন আসলে ক্ষণিক, সবকিছু একদিন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু শেষ হওয়া মানেই শূন্যতা নয়—বরং, আত্মপরিচয়ের এক নতুন স্তরে পৌঁছানো।

৬.উপসংহার
“স্বপ্নের শবাধার” কবিতার দার্শনিক তাৎপর্য এই যে,
মানুষ নিজের স্বপ্ন, স্মৃতি, বেদনা, এবং চরম সত্যের ভার নিজেই বহন করে চলে। জীবনের অর্থ, পরিচয়, মৃত্যু—সবকিছুর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে সে একসময় আবিষ্কার করে, নিজেই তার চরম সত্য ও চূড়ান্ত গন্তব্য।

এই উপলব্ধি কবিতাটিকে শুধু ব্যক্তিগত নয়, বিশ্বজনীন এক দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে যায়।

*****

৪. পঙতি বিশ্লেষণঃ

'আমার শব,আমিই বইছি,
অস্তাচলের দেশে।'
 
“আমার শব, আমিই বইছি,
অস্তাচলের দেশে।” — এই দুটি পঙ্‌ক্তি “স্বপ্নের শবাধার” কবিতার অন্যতম গভীর ও দার্শনিক অংশ। নিচে এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলোঃ

 ১. আত্মপরিচয় ও আত্মবহন
এখানে কবি উপলব্ধি করেন, শবাধারে শায়িত মৃতদেহটি আসলে তাঁর নিজেরই। অর্থাৎ, মানুষের জীবনের সমস্ত আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন-ভঙ্গ, সাফল্য-ব্যর্থতা — সবকিছুর ভার সে নিজেই বহন করে।
“আমার শব, আমিই বইছি”— এই কথার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, প্রত্যেক মানুষ নিজের অতীত, স্মৃতি, অপরাধবোধ, ব্যর্থতা, স্বপ্নভঙ্গ, এমনকি নিজের মৃত্যু-চেতনা পর্যন্ত নিজের ভেতরেই বহন করে চলে।

 ২. অস্তিত্ববাদী সংকট
এখানে রয়েছে গভীর অস্তিত্ববাদী (existential) দর্শন। মানুষ নিজের সত্তা, তার সীমাবদ্ধতা এবং শেষ পরিণতির সঙ্গে সারাক্ষণ যুদ্ধ করে।
“শব” এখানে শুধু শারীরিক মৃত্যু নয়, বরং আত্মার মৃত অবস্থা, স্বপ্নের মৃত্যু, অথবা জীবনের নিরর্থকতা বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়েছে।
নিজের শব নিজে বহন করার মধ্য দিয়ে কবি বুঝিয়েছেন, প্রত্যেকের জীবন ও মৃত্যুর দায়, অর্থ এবং গন্তব্য সে নিজেই।

 ৩. অস্তাচলের দেশ
“অস্তাচল” মানে যেখানে সূর্য অস্ত যায়—অর্থাৎ, জীবনের শেষ প্রান্ত, মৃত্যুর দিকে যাত্রা।
এটি কেবল শারীরিক মৃত্যুর রূপক নয়, বরং জীবনের শেষপথ, স্বপ্নের অবসান, অথবা চরম সত্যের মুখোমুখি হওয়ার প্রতীক।
কবি দেখান, সময়ের প্রবাহে মানুষ একা, নিজের সমস্ত স্মৃতি, স্বপ্ন ও বেদনা নিয়ে নিঃসঙ্গভাবে অস্তাচলের দিকে এগিয়ে চলে।

 ৪. সারমর্ম
এই দুই পঙ্‌ক্তি মানুষের একাকীত্ব, আত্ম-অনুসন্ধান, এবং নিজের ভার নিজে বহনের চরম উপলব্ধি প্রকাশ করে।
এখানে কবি আমাদেরকে শেখান—জীবনের শেষ যাত্রায়, কেউ কারও ভার নেয় না; প্রত্যেকেই নিজের স্বপ্ন, ব্যর্থতা, এবং জীবনের শেষ সত্যকে নিজেই বহন করে, নিজেই চলে যায় অস্তিত্বর শেষ প্রান্তে।

 উপসংহার:
“আমার শব, আমিই বইছি, অস্তাচলের দেশে”—এই বাক্যে জীবনের অন্তিম উপলব্ধি, আত্মজ্ঞানের গভীরতা ও মানুষের চিরন্তন একাকীত্বের অনুভূতি এক অনবদ্য কবিত্বে প্রকাশ পেয়েছে।

*****
 

Wednesday, January 22, 2020

সাহিত্য ও শিল্পবোধ

 

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। স্বর্গ হতে বহিস্কৃত হয়ে আদম এই  বিশ্ব প্রকৃতিকে কেমন দেখেছিলেন জানি না তবে অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন তাতে  কোন সন্দেহ নেই। চারিদিকে সুন্দর আরে সুন্দরের সমারোহ। বৈচিত্র্যে ভরপুর। তারপর দেখা পেলেন হাওয়ার । হৃদয় মন আত্মা তার নেচে উঠেছিল আনন্দে।  তার হৃদয় নিঃসৃত শব্দ কালি – কলমে লেখা না হলেও , সেই আনন্দ নিঃসৃত বাক্যই সাহিত্য। সৌন্দর্য্য মিশ্রিত শব্দ বলেই সেটি সাহিত্য। ঐ সৌন্দর্য্য মিশ্রনই শিল্প। সেদিক থেকে কথাশিল্পী একজন সাহিত্যিক।

শিল্পবোধের স্থান মানুষের মনে। রসবোধ না থাকলে শিল্প সৃষ্টি হয় না।

ভাবনাকে ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে সঞ্চারিত করাই সাহিত্য চর্চা। মানুষ মাত্রেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখ ও সৌন্দর্য্যের অনুভূতির পরশ পায়। সেই অনুভূতির প্রকাশ করবার অভিলাষ তাদের আছে। কেউ কেউ অনায়াসে মনের ভাব সৌন্দর্য্য রসে জারিত করে প্রকাশ করে। অনেকেই সাধনা করে হৃদয়ের শিল্পমন্ডিত ভাব প্রকাশ করে । আমরা পাঠকগন সেই সব বাক্য বা সাহিত্য পাঠ করে  আমাদের অন্তরের না বলা কথার বহিঃপ্রকাশ দেখে আনন্দ লাভকরি।  নিজেকে নির্ভার মনে করি।

‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইলো না কেহ’। না শুধালেও আমরা সাহিত্যের মাধ্যমে সেই শৈল্পিক রসবোধের আস্বাদ পাই – তখন নিজেকে ধন্য মনে করি।  

মনে করি যা বলতে চেয়েছিলাম, তা এই সাহিত্যের মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে।

সাহিত্য বিশ্বের তাবৎ বিষয় নিয়ে লিখিত হয়। মানুষের জীবন বোধকে জাগ্রত করে। জীবনের মানকে উন্নত করে। মানুষকে অন্ধকার হতে আলোতে আনয়ন করে। তার জীবনকে ভালবাসার এবং ভাললাগার অংগনে নিয়ে যায়। জীবনে পুলক অনুভব করে আনন্দ পায় এবং অন্যকে সেই আনন্দ বিলিয়ে, নিজেকে পরিবারকে, সমাজকে সুখী ও কলষমুক্ত রাখে। সেই জন্য সাহিত্য চর্চার মূল্য বা দান অপরিসীম।

সাহিত্য একটি শিল্প। শিল্পবোধ জাগার ফলে মানুষের জীবন ছন্দময় হয়ে ওঠে। সাহিত্য সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে মানুষ নব নব সৃষ্টির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়।  তখন সে উপলব্ধি করতে পারে, ‘নাল্পে সুখনাস্তি’ – অল্পে সুখ নাই।

সাহিত্য চর্চা মানুষের নিত্যদিনের সংগী হোক । রাওয়া উদ্যোগে এই সাহিত্য সভা আরো সুন্দর হোক। সাহিত্য পাঠ করে জীবন আনন্দময় হোক - এই কামনা করি। 

০০০০০০০০

সাহিত্য একটি শিল্প। শিল্পবোধের স্থান মানুষের মনে। রসবোধ না থাকলে শিল্প সৃষ্টি হয় না। শিল্পবোধ জাগার ফলে মানুষের জীবন ছন্দময় হয়ে ওঠে। সাহিত্য সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে মানুষ নব নব সৃষ্টির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়। তখন সে উপলব্ধি করতে পারে, ‘নাল্পে সুখনাস্তি’ – অল্পে সুখ নাই।

ভাবনাকে ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে সঞ্চারিত করাই সাহিত্য চর্চা।

মানুষ মাত্রেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখ ও সৌন্দর্য্যের অনুভূতির পরশ পায়। সেই অনুভূতির প্রকাশ করবার অভিলাষ তাদের আছে। কেউ কেউ অনায়াসে মনের ভাব সৌন্দর্য্য রসে জারিত করে প্রকাশ করে। অনেকেই সাধনা করে হৃদয়ের শিল্পমন্ডিত ভাব প্রকাশ করে ।

আমরা পাঠকগন সেই সব বাক্য বা সাহিত্য পাঠ করে  আমাদের অন্তরের না বলা কথার বহিঃপ্রকাশ দেখে আনন্দ লাভকরি।  নিজেকে নির্ভার মনে করি।

সাহিত্য বিশ্বের তাবৎ বিষয় নিয়ে লিখিত হয়। মানুষের জীবন বোধকে জাগ্রত করে। জীবনের মানকে উন্নত করে। মানুষকে অন্ধকার হতে আলোতে আনয়ন করে। তার জীবনকে ভালবাসার এবং ভাললাগার অংগনে নিয়ে যায়। জীবনে পুলক অনুভব করে আনন্দ পায় এবং অন্যকে সেই আনন্দ বিলিয়ে, নিজেকে পরিবারকে, সমাজকে সুখী ও কলুষমুক্ত রাখে। সেই জন্য সাহিত্য চর্চার মূল্য  অপরিসীম।

সাহিত্য চর্চা মানুষের নিত্যদিনের সংগী হোক । রাওয়া উদ্যোগে এই সাহিত্য সভা আরো সুন্দর হোক।

সাহিত্য পাঠ করে জীবন আনন্দময় হোক - এই কামনা করি।  ধন্যবাদ।

0000000000000000000

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। স্বর্গ হতে বহিস্কৃত হয়ে আদম এই  বিশ্ব প্রকৃতিকে কেমন দেখেছিলেন জানি না তবে অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন তাতে  কোন সন্দেহ নেই। চারিদিকে সুন্দর আরে সুন্দরের সমারোহ। বৈচিত্র্যে ভরপুর। তারপর দেখা পেলেন হাওয়ার । হৃদয় মন আত্মা তার নেচে উঠেছিল আনন্দে।  তার হৃদয় নিঃসৃত সেই শব্দ এই শূন্য পৃথিবীতে  বলাকার গতির ঝংকারের মতো দিক থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই শব্দতরংগ ভাষা না হলেও , কালি কলমে লেখা না হলেও, তাই –ই সুর, তাই –ই আনন্দ, শিল্প এবং সাহিত্য । সেই সুরের ধ্বনি একদিন ভাষায় রূপ নেয়।

অযুত বরষের পরে আমরা মানুষেরা নানান ভাষায় কথা বলি, গান গাই, অলংকৃত করে সাহিত্যে রূপ দান করি।

 সাহিত্য কেবল কথার সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করা নয়, নান্দনিকতাই নয়, মানুষের জীবনবোধকে উপলব্ধি করা তার বিশেষ একটি দিক। সাহিত্যের প্রধান কাজ মানুষের আত্মাকে অজ্ঞানতার অন্ধকার হতে বাইরে বের করে আনা, তার উপলব্ধিকে জাগ্রত করা, ভালমন্দের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। মানুষকে সুন্দর এবং শান্তির স্বপ্ন দেখানো।

আজকের বিশ্ব যখন হতাশা, অস্থিরতা, অন্যায়, অবিচারে অশান্ত, তখন সাহিত্য  মানুষকে পথ দেখায়। মানুষের এই স্বপ্ন শান্তির পক্ষে, সুন্দরের পক্ষে, অসুন্দর এবং বিনাশের বিপক্ষে।

মানুষের অন্তর যখন দুঃখে কষ্টে বিষাদে ম্রিয়মান হয় তখন মানুষ আশ্রয় খোঁজে সাহিত্যে, সংগীতে এবং কবিতায়। সৌন্দর্য্য মিশ্রিত শব্দ বলেই সেটি সাহিত্য। ঐ সৌন্দর্য্য মিশ্রনই শিল্প। সেদিক থেকে কথাশিল্পী একজন সাহিত্যিক।

শিল্পবোধের স্থান মানুষের মনে। রসবোধ না থাকলে শিল্প সৃষ্টি হয় না। ভাবনাকে ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে সঞ্চারিত করাই সাহিত্য চর্চা। মানুষ মাত্রেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখ ও সৌন্দর্য্যের অনুভূতির পরশ পায়। সেই অনুভূতির প্রকাশ করবার অভিলাষ তাদের আছে। কেউ কেউ অনায়াসে মনের ভাব সৌন্দর্য্য রসে জারিত করে প্রকাশ করে। অনেকেই সাধনা করে হৃদয়ের শিল্পমন্ডিত ভাব প্রকাশ করেন । আমরা পাঠকগন, সেই সব বাক্য বা সাহিত্য পাঠ করে  আমাদের অন্তরের না বলা কথার বহিঃপ্রকাশ দেখে আনন্দ লাভকরি।  নিজেকে নির্ভার মনে করি।

‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইলো না কেহ’। না শুধালেও আমরা সাহিত্যের মাধ্যমে সেই শৈল্পিক রসবোধের আস্বাদ পাই – তখন নিজেকে ধন্য মনে করি। 

মনে করি যা বলতে চেয়েছিলাম, তা এই সাহিত্যের মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে।

সাহিত্য বিশ্বের তাবৎ বিষয় নিয়ে লিখিত হয়। মানুষের জীবন বোধকে জাগ্রত করে। জীবনের মানকে উন্নত করে। মানুষকে অন্ধকার হতে আলোতে আনয়ন করে। তার জীবনকে ভালবাসার এবং ভাললাগার অংগনে নিয়ে যায়। জীবনে পুলক অনুভব করে আনন্দ পায় এবং অন্যকে সেই আনন্দ বিলিয়ে, নিজেকে পরিবারকে, সমাজকে সুখী ও কলষমুক্ত রাখে। সেই জন্য সাহিত্য চর্চার মূল্য বা দান অপরিসীম।

সাহিত্য একটি শিল্প। শিল্পবোধ জাগার ফলে মানুষের জীবন ছন্দময় হয়ে ওঠে। সাহিত্য সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে মানুষ নব নব সৃষ্টির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়।  তখন সে উপলব্ধি করতে পারে, ‘নাল্পে সুখনাস্তি’ – অল্পে সুখ নাই।

সাহিত্য চর্চা মানুষের নিত্যদিনের সংগী হোক ।

মহাখালী DOHS COUNCIL এর উদ্যোগে এই সাহিত্য সভা আরো সুন্দর হোক।

সাহিত্য পাঠ করে জীবন আনন্দময় হোক - এই কামনা করি। 

ধন্যবাদ।

 

 

 

 

Friday, January 3, 2014

বেদনার কালিদহে

 রাস্তার পাশের বাড়িতে বসবাস করবার উপকারিতা আছে, মজাও আছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একই লোক একই  সময়ে ঐ রাস্তায় চলাচল করে। প্রায় প্রতিদিনই দেখতাম একটি লোক ধীরে ধীরে হেঁটে এসে রিক্সায় উঠতো। পরিধানে তার লাল কালো অথবা নীল রঙের পোশাক। আপাদমস্তক। অর্থাৎ তার লুংগি, কুর্তা, পাগড়ি একই রঙের। লম্বা, ফর্সা, বৃদ্ধ, শীর্ণকায়া লোকটি। দীর্ঘদিন একই দৃশ্য অন্তরে কৌতূহল জাগায়। একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে, সে একজন কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি। বহুকাল ধরে এই কবরস্থানের পাশে এই দীঘির ঘাটে বাস করে। দীঘির ঘাটটি শান বাঁধানো। গম্বুজ বিশিষ্ট একটি স্নানঘর আছে, সুদৃশ্য। বিরাট পুকুরটি অতীতের কোন ধনবান ব্যক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কেবল ঘাটই নয়, পুকুরটির চারপাশ নক্সা করা দেয়ালে ঘেরা –সুরক্ষিত ও বটে। পুকুরটির তিন দিকে কবরস্থান। সম্প্রতি কবরস্থান উঠে যাওয়ায় পুকুরের অপর পাশে ঐ বিরাট বটবৃক্ষের গোঁড়ায় তাকে থাকতে দেয়া হয়েছে। লোকটি এখন রোগমুক্ত। লোকটির নাম করম আলী শাহ্‌।           

ভূমিষ্ঠ হয়েছিল মুষ্টিবদ্ধ হাতে বাঁচার অংগীকার নিয়ে। সেদিন সমারোহ না হোক, অনন্দ হয়েছিল তাদের গৃহে। কারণ সে ছিল পিতামাতার পুত্র সন্তান। আশার আলো জ্বলবে ঘরে, সংসারে আনয়ন করবে সমৃদ্ধি আর উন্নতি।

করম আলী শাহ্‌ বাঁচার জন্য এসেছিল। বেঁচেও ছিল অনেকদিন। কিন্তু সে বাঁচা কেমন বাঁচা, আমার গল্পে তাই –ই ব্যক্ত হয়েছে। করম আলী শাহ্‌ এক অভিশপ্ত ব্যাধির শিকার হয়। যার নাম কুষ্ঠ। টগবগে যুবকের আলোক লতার মতন ঝলমলে জীবন। শক্তিতে, আবেগে, আনন্দে, উচ্ছ্বাসে ভরপুর যৌবনে, জীবন তরী বেয়ে যায় সে। হঠাৎই একখন্ড কালো মেঘ কোথা হতে উড়ে এসে তার উপর ছায়া ফেলে। করম আলী শাহ্‌’র অসুখ ধরা পড়ে। ঘনঘোর অন্ধকারে এক ঘূর্ণিঝড় তার জীবন নৌকাখানিকে প্রচন্ড বেগে কয়েক পাক ঘুরিয়ে জলদেশের অতলে কোথায় নিয়ে গেল, কে জানে! তারপর শুরু হল তার দুর্বিষহ জীবন। আপন গৃহ, আপন পরিবার হতে বিতাড়িত হয় সে। প্রথমে নির্জন নদী তীরে পর্ণকুটিরে বন্য পশু পাখিদের সঙ্গে বসবাস। পরে সেখান হতে বহিষ্কৃত হয়ে পরবাস অর্থাৎ গ্রাম ছেড়ে শহরে। যেখানে সবাই পর, কেউ আপন নয়। অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তান হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন। ভিক্ষা গ্রহণ করবার মত ঘৃণ্য কাজ যে আর নাই –তা সে কল্পনাও করতে পারে নাই। কাজটি বড় কঠিন কাজ। মানুষ বড় নির্দয়, ভিক্ষা দিতে চায় না। তবুও পেটের দায় বড় দায়। 

ইচ্ছে করে মানুষ মরতে পারে না। করম আলী শাহ্‌ এই রোগগ্রস্ত দেহ ত্যাগ করবার জন্য প্রস্তুত ছিল। যমদূত অন্যদিকে ব্যস্ত থাকায় তার কথা ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু জীবন তাকে ছাড় দেয়নি, মৃতের চাইতে অধম করে রেখেছিল। দীর্ঘকাল রোগ ভোগের পর রোগমুক্তি হয়েছিল তার। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া হস্তপদের অনেকাংশ ফেরৎ পায়নি সে। হয়নি তার মনুষ্য সমাজে পুনর্বাসন। মানুষ হিসাবে সে আর স্বীকৃতি পায়নি। পরিত্যক্ত মনুষ্যরূপী প্রাণী হিসাবে খাদ্যের অন্বেষণে দিন কাটাতো। রাতে কবরস্থানের এক কোণে মৃতদের পাশেই নিদ্রার আবেশে ফেলে আসা অতীতের স্বপ্নীল জীবনে ঘুরে বেড়াত। সেই সুদূর অতীতে প্রায় ৭৫ বৎসর পূর্বে সে লিখতে পড়তে শিখেছিল। সন্ধ্যায় দোকানে বসে কন্ঠের দরদ দিয়ে পুঁথি পাঠ করতো। গ্রামের লোকদের চিঠি পড়ে দিত। তার কন্ঠে মধু ছিল, হৃদয়ে আবেগ ছিল, চেহারায় সৌন্দর্য্য ছিল, অন্তরে সৃজনশীলতা ছিল। কোথায় গেল সব!

আমার বাসস্থান হতে প্রায় ৫০০ গজ দূরেই ছিল তার জীর্ণ কুটির। সেই কবরস্থানের পাশে সেই বিরাট রাজকীয় দীঘি। তার অপর পাশে এক কোণে আছে এক বিরাট বট বৃক্ষ। শতবর্ষের প্রাচীন তো বটেই। বিশাল এলাকা জুড়ে তার শাখা প্রশাখা বিস্তৃত। তার গুড়িটির পরিধিও খুব বড়। তার বৃহৎ মূল মৃত্তিকার বহু গভীরে প্রোথিত। বৃক্ষের গোঁড়া ঘেঁষে ছিল করম আলী শাহের ক্ষুদ্র নিবাস। ঘরের ভেতর একটি টিনের মাঝারি সাইজের ট্রাংক। আর তার দৈনন্দিন ব্যবহার্য দ্রব্যাদি। আর ছিল গাঢ় নীল, গাঢ় লাল আর কালো বর্ণের লুঙ্গি,পাঞ্জাবী,পাগড়ির সেট। প্রতিক্ষণের সঙ্গী একখানি লাঠি, ঝোলা আর পানীয় জলের ছোট একটি ক্যান।

তারপর বেশ কিছুদিন আর তাকে রাস্তায় যাতায়াত করতে দেখিনা। যে লোকটি আমাকে করম আলী শাহের খবর দিত তাকে জিজ্ঞেস করায় সে উত্তর দিল, সে তো বহুদিন আগে, বছরখানেকের উপরে হবে, চলে গেছে। বললাম, চলে গেছে মানে? 

- কোথায় চলে গেল?

- তিনি তো মারা গেছেন!

- মারা গেছেন? কই শুনিনি তো?

- শুনবেন কি করে। গরীব মানুষ, অসুস্থ, বয়সের ভার। উঠতে বসতে পারছিলেন না। তারপর একদিন...।

- আমার কন্ঠের ব্যাকুলতা দেখে লোকটি আর কিছু বললো না। 

করম আলী শাহ্‌ যে জনমানবহীন কবরস্থানের পাশে আস্তানা গড়েছিল, সেখানে এখন একটি পীরের মাজার ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। মৃতের সমাধিস্থলে এখন গড়ে উঠেছে জীবন্ত মানুষের আধুনিক সুদৃশ্য আবাসিক অট্টালিকা। সেজন্য আবাসিক এলাকা পাহারা দেবার জন্য করম আলী শাহের আস্তানার অদূরেই ছিল সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা রক্ষীদের ব্যারাক। ওরাও তার খোঁজ খবর রাখতো। একটি লোক নিয়োগ করেছিল করম আলী শাহ্‌ নিজেই। সেই তাকে দেখাশুনা করতো, রান্না বান্না করে দিত। তখন করম আলী শাহ্‌’র চলাফেরার ক্ষমতা ছিলনা। বাইরেও যেতে পারতো না। 

লোকটি আরোও বললো, তার কেউ ছিলনা। সরকারি কবরস্থানে তার দাফন হয়েছে। মৃত্যু যাকে দয়া করে নাই, জীবন তাকে মেরে রেখে দিয়েছিল। 

‘জিসে মওত নে  না পুছা

উসে জিন্দেগি নে মারা।’

জানিনা তার আত্মা এই মনুষ্য দেহ থেকে মুক্ত হয়ে কেমন আছে! 

মানুষের থাকে বাঁচার শখ। করম আলী শাহের ছিল মরবার শখ। রাস্তার পাশে বসে থাকতো মানুষের একটু দানের আশায়। মানুষেরা বড় নিষ্ঠুর, ভিক্ষা দিতে চায় না। করম আলী শাহ্‌ কত তরতাজা মানুষকে মরতে দেখেছে এই রাজপথে। কতজনকে দেখেছে প্রিয় স্বজন পরিবৃত্ত হয়ে সমাধিস্থলে যেতে। আজ এতদিন পরে আজরাঈলের সময় হলো। সে করম আলী শাহের দরজায় আঘাত করলো। ইচ্ছে ছিল যমদূতকে দেখবে। একবার –শেষবার। কিন্তু সে সুযোগ যে পায়নি। কেমন যেন ঘনঘোর অন্ধকার তার চোখের আলো কেড়ে নিল। প্রথম কুষ্ঠ রোগের সংবাদ শুনে যেমন তার চেতনার অবলুপ্তি ঘটেছিল, এবারও যেন তাই হলো। সেজন্য মৃত্যুর হীমশীতল পরশখানি তার উপলব্ধির বাইরে থেকে গেল। জীবন এবং মৃত্যুর কোন আশাই পূরণ হলো না। সবই সেই অচেনা, অজানা, অদৃষ্টের হাতে তোলা রইলো। নিঃসংগ করম আলী শাহ্‌ নিভৃতে, নিশীথে, নীরবে, নিঃশব্দে, নির্জন কুটিরে তার জীর্ণ, শীর্ণ, দীর্ঘ দেহখানি ফেলে রেখে চলে গেল। 

করম আলী শাহ্‌র ছোট্ট কুটিরের কি অবস্থা জানতে চাইলাম। লোকটি বললো, সে তো কবেই আর্মি এসে ভেঙ্গে পরিষ্কার করে রেখে গেছে। এটা আর্মির জায়গা তো! করম আলী শাহ্‌কে থাকতে দেওয়া হয়েছিল তার আশ্রয় ছিলনা বলে। 

অন্তরে বেদনা অনুভব  করলাম। একজন মানুষের জীবন কি? দীর্ঘকাল এই পৃথিবীর আলো বাতাসে জীবন সংগ্রাম করে অন্তিম মুহূর্ত অতিক্রম করে চলে গেছে। কেউ আজ জানবে না –এখানে কেউ ছিল! এই প্রাচীন বৃক্ষ তাকে আশ্রয় দিয়েছিল, ছায়া দিয়েছিল, বাতাস দিয়ে তার দেহমন শীতল করেছিল। সেই আশ্রয়দাতা বিরাট বটবৃক্ষই আজ করম আলী শহের জীবন –মরণের নীরব সাক্ষী। তারই দীর্ঘশ্বাস তার পত্র –পল্লবে মর্মরিত হয়।

..............

০৪.০১.২০১৪     

Tuesday, April 23, 2013

রানা প্লাজা

 ২৪শে এপ্রিল। ২০১৩ সাল। সকাল ৯ ঘটিকার দিকে ঘটে এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা সাভারের রানা প্লাজায়। জরাজীর্ণ ৯ তলা ভবন। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ নেই। ভগ্ন পিলারগুলো তার ভার বহন করতে পারছিল না। কয়েক হাজার লোক তখন সেই গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে কাজে ব্যস্ত ছিল। বিকট শব্দ করে ধ্বসে পড়লো সেই বিল্ডিংটি। ৯টি ঢালাই করা ছাদ।একটির উপর আরেকটি পড়ে গেল, যেন পাউরুটির স্লাইস! নিহত হলো, আহত হলো, আটকা পড়লো কয়েক হাজার মানুষ! তাদের সেই আঘাত ও যন্ত্রণা বর্ণনা করবার ভাষা আমার জানা নেই। এই ভয়ঙ্কর মর্মান্তিক ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। পম্পাই –এর ভূমিকম্পের ঘটনা, উড়িষ্যার দ্বারভাঙ্গার ভূমিকম্পের প্রাকৃতিক মর্মস্পর্শী ঘটনাও যেন এর কাছে হার মানে।

উদ্ধারকর্মে যারা নিজের জীবন বাজি রেখে নিয়োজিত হয়েছিলেন তাদের সাহস ও মানবতাবোধ তুলনা রহিত। নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যারা আটকে পড়া শ্রমিকদেরকে উদ্ধার করেছেন তারা মনুষ্য সমাজে শ্রেষ্ঠ মানুষ। যারা দিনরাত একাকার করে সংবাদ পরিবেশন ও চিত্রধারণ করেছেন দেশের জনগণের জন্য তাদের তুলনা নেই। একেই বলে, ‘মানুষ মানুষের জন্য।’

দেশে দুর্ঘটনার অন্ত নেই। যদি রানা প্লাজার নিদারুণ ঘটনাবলী, ভগ্নস্তুপ, উদ্ধারকাজ, দৃশ্যাবলী, সংবাদ পরিবেশন, চলচ্চিত্র আকারে সংরক্ষিত হয় তবে এটি একটি জীবন্ত মহাট্র্যাজেডি রূপে সমগ্র পৃথিবীর মনুষ্যকে কাঁদাবে। এই হৃদয় বিদারক বাস্তব ঘটনা কল্প কাহিনীকেও হার মানায়। পরবর্তী প্রজন্মের মানুষেরা এই দৃশ্য দেখে সচকিত হবে। এরকম ভয়ংকর দুর্ঘটনা আর না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখবে এবং সচেতন থাকবে।

এই চলচ্চিত্র যদি প্রতি বৎসর ২৪শে এপ্রিল প্রচার করা হয়, তবে যারা মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেছেন, পেছনে ফেলে রেখে গেছেন তাদের চিরদুখী পরিবার, তারা এবং অন্য সকলে তাদের অকালে ঝরে যাওয়া আত্মার জন্য জন্য প্রার্থনা করতে পারেন। এই ঘটনাবলীর দৃশ্য প্রচার করে এ বিশ্বের তথাকথিত ধনী মানুষেরা যেন দরিদ্র জনগণের জীবন নিয়ে খেলা করতে না পারে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

২৪/০৪/২০১৩

Thursday, April 7, 2011

মক্কা মদিনায় একদিন

পবিত্র মক্কা মদিনায় কোনদিন যেতে পারবো কল্পনা করতে পারিনি। হঠাৎ করে সুযোগ এসে গেল। আমাদের নিকট আত্মীয় ডা. মোহাম্মদ আবু তাহের মক্কায় বসবাস করেন। তিনি সৌদি সরকারের কিং ফয়সল হাসপাতালে সার্জন হিসাবে কর্মরত। তিনি বললেন, উমরাহ ভিসা দেওয়া শুরু হয়েছে, আপনারা একবার আসেন। আমার স্বামী লে. কর্নেল ডা. মোহাম্মদ হারুন রাজী হয়ে বললেন ‘চল ঘুরে আসি।’ এরপর হয়তো যাওয়া হবে না বয়সের ভারে। প্রস্তুতি নিলাম সেই সুদূর মক্কা মদিনার পূণ্যভূমি স্বচক্ষে দেখব বলে। আমার পূর্ব পুরুষেরা, আমার মাতামহ, আজ থেকে প্রায় ১২৫ বৎসর পূর্বে এই পবিত্র ভূমিতে নগ্ন পদে কা’বা ঘর প্রদক্ষিণ করেছিলেন বহুবার। নানাজান মো. হানিফ সেখানে একটানা বসবাস করেছিলেন ১১ বছর। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বালক পুত্র মো. সিদ্দিক। এর আগে ও পরেও তিনি কয়েকবার গিয়েছেন মক্কায়।

সতেরই এপ্রিল বিকালের  ফ্লাইটে ঢাকা এয়ারপোর্ট ত্যাগ করলাম। সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের বিশাল প্লেন ডানা মেলে দিল মুক্ত বিহঙ্গের মতো। সাড়ে পাঁচ ঘন্টা উড্ডয়নের পর জেদ্দা বিমান বন্দরের ভূমি স্পর্শ করলো আমাদের বাহন। ঢাকার সূর্য আমাদের সাথে সাথে ভ্রমণ করছিল। ঘড়ি অনুযায়ী যখন বাংলাদেশে মাগরিবের আযান হচ্ছিল তখনও প্লেনের বাইরে রৌদ্র ঝলমল উজ্জ্বল দিন। ঢাকার রাত নয়টার পর প্লেনে সূর্যাস্তের সময় হলো। ঘটনাটি খুব মজার। জেদ্দা বিমান বন্দর বিরাট এলাকা। কত যে প্লেন দাঁড়িয়ে আছে, মনে হয় কিছুই না ! বারো মিনিট বাস চলার পর আমরা বন্দর টার্মিনালে পৌঁছালাম। সেখানে দিবালোকের মত ড্যাজলিং লাইট। রাত মনেই হয় না।

এখানে বাসের  কথা একটু বলতে হয়। আমাদের দেশের বাসের মতো নয়। বাসের ভেতরে কিছু কিছু সীট, কিছু চেয়ার টেবিল, কিছু জায়গা খালি – ব্যাগ,ছোট খাটো মালপত্র রাখার জন্য। স্টিলের রড যাত্রীদের ধরে রাখবার জন্য। বাস থামলে যাত্রীরা সব হুড়মুড় করে নেমে পড়লো। আমরা ইহরাম বাঁধা উমরাহ’র যাত্রীরা নির্দিষ্ট লাইনে দাঁড়ালাম। লম্বা লাইন অনেক। আমি আমার স্বামীর পাশে দাঁড়ালাম। আমার সামনে আরেকজন মহিলা তার সঙ্গীর পাশে দাঁড়িয়ে। হাসিমুখে তাকাচ্ছেন আমার দিকে। জানতে চাইলাম , ‘হোয়্যার ডু ইউ কাম ফ্রম?’ বললেন, ‘সাউথ আফ্রিকা।’ আমি নিজের দেশের নাম বললাম, বাংলাদেশ। চিনতে পারলেন। আগে তিনি পাকিস্তানে ছিলেন। এবার উমরাহ করতে এসেছেন। ইতিপূর্বে হজ্ব করেছেন। বললাম , ‘এবার আমাদের প্রথম উমরাহ্‌ করতে আসা।’ দু’চার কথা বলার পর দেখি মহিলাদের একটি নাতিদীর্ঘ লাইন। সেখানে আমার কাগজপত্র নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেই মহিলাকে আমার সঙ্গে ডেকে নিলাম। খানিকক্ষণ পর আমার পাসপোর্ট চেক করে একটি কাগজ দিয়ে ছেড়ে দিল। সেই ভদ্রমহিলাও পাসপোর্ট চেক করতে দিলেন। আমি আমার লাগেজ- পত্র ট্রলিতে তুলে নিয়ে একটু দূরে হারুন সাহেবের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ওনার ছাড়পত্র পেতে বেশ সময় লাগলো। এদিকে ডা. আবু তাহের আমাদের জন্য আপেক্ষা করছিলেন। তার সহায়তায় আরো ঘন্টাখানেক পাসপোর্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে পার্কিং লটে এসে পৌঁছালাম। এমন সময় কে যেন আমা হাতখানি ধরে ফেললো। চমকে চেয়ে দেখি সেই ভদ্রমহিলা –যিনি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এসেছেন । খুশীতে আনন্দে আমার ‘বক্ষমাঝে চিত্ত আত্মহারা নাচে রক্তধারা।’বললেন, যাচ্ছেন?

- হ্যা মক্কায় যাচ্ছি। আগামীকাল উমরাহ করে পরশু বিশ্রাম। তার পরদিন বুধবারে মদীনা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হব। 

- আমরাও বুধবারে মদীনায় যাব। দেখা হবে আবার।

- দেখা হবে ইনশাল্লাহ বলে তার হাতে মৃদু আন্তরিকতার চাপ দিয়ে হাতখানি ছেড়ে দিলাম। 

তাঁর হাতখানি ছেড়ে দিয়ে কেন জানিনা, চিত্ত চঞ্চল হল। হৃদয় হল বেদনায় ভারাক্রান্ত। ‘আরো কিছুক্ষণ না হয় রহিতে কাছে।’ সময়ের স্বল্পতা হেতু চলে আসতে হল। এই হয়তো মানুষের মন। স্বল্প সাক্ষাতে কত আপন হয়ে যায়!

মক্কা শহরে এসে পৌঁছালাম দেড় ঘন্টা পর। ১২০ মেইল স্পীডে গাড়ি চালানো যেন কোন ব্যাপারই নয়। মক্কা শহরের সীসায় ডা. আবু তাহের সাহেবের বাসা। সেখানেই আমরা উঠলাম। পরেরদিন সকালের দিকে ক্বাবা শরীফে উপস্থিত হয়ে উমরাহ্‌ পালন করলাম। সাতবার বাইতুল্লাহ শরীফ (কা’বা ঘর) প্রদক্ষিণ করে, সাতবার সাফা –মারওয়া সায়ী করতে হলো। সাফা –মারওয়া এখন আর পূর্বের ন্যায় বিপদ সংকুল পাহাড় পর্বত নয়। সেগুলো কেটে অত্যন্ত সুন্দর মসৃণ সুদৃশ্য রাস্তা তৈরী করা হয়েছে। বিল্ডিং এর ভেতর দিয়ে অনায়াসে সাতবার সায়ী করা যায়। নিয়ম মাফিক সব কাজ সম্পন্ন করে বাসায় চলে এলাম। মিসেস আবু তাহের আমাদের প্রিয় ভাবী –ডা. রওশন আরা, আমাদের খুব দেখাশুনা করেছেন। সবসময় সঙ্গ দিয়েছেন। 

বুধবার উনারা আমাদের সঙ্গে মদীনা শরীফে রওনা হলেন। পৌঁছাতে রাত হলো। হোটেল পেতে সময় লাগলো। কারণ সব হোটেল বুকড। এই কষ্টের কাজগুলো ডা. তাহের করলেন। চারশয্যা বিশিষ্ট কক্ষ পেলাম। দুই কামড়া ভাড়া নিলাম। রাত তিনটায় মদীনায় মসজিদে–নব্বীতে ফজরের নামাজ আদায় করবার জন্য রওনা হলাম। মসজিদের চত্বরে জায়গা পেলাম তাও গেটের কাছাকাছি। এত রাতে এত লোকের সমাগম দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হলাম। কিন্তু এ লোকের সমাবেশে কোন কোলাহল নেই। সকলেই বসে যার যার মত এবাদত বন্দেগী করছেন। মেয়েদের দিকটি পৃথক করা। তবুও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কোনরকম জায়গা করে বসে পড়লাম। কোরান তেলাওয়াত, নফল নামাজ পড়তে পড়তে ফজরের ওয়াক্ত এসে গেল। জামাতের সংগে ফজরের নামাজ আদায় করলাম। আশ্চর্য্য হয়ে লক্ষ্য করলাম ভোরের পাখির কিচির মিচির আওয়াজ। ভোরের আলো ফুটে উঠলো। সময়টা বড়ই মৌন, শান্ত, পবিত্র। বড়ই স্বর্গীয় সুষমায় মন্ডিত। 

হাজার হাজার লোকের ভীড় ঠেলে দীর্ঘ সময় ধরে বাইরে এলাম। এরকম ভীড় এখনে প্রতিদিন হয়। অধিকাংশই আমাদের মতন নবীন তীর্থ যাত্রী। সেখান হতে বেরিয়ে এসে বাঙ্গালী রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার সংগ্রহ করে হোটেলের রুমে এসে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম। বেলা দশটার দিকে আবার বের হলাম। প্রথমে জান্নাতুল বা’কী। দ্বারবান ভিতরে ঢুকতে বাধা দিল। বললো ঢোকার সময় শেষ। বিফল মনোরথ হয়ে পাশের গ্রিলের দেয়াল ঘেঁষে সমাধিক্ষেত্রের ভিতরে দৃষ্টিপাত করলাম। মৃত্তিকা, কাঁকড় পাথরের মাঠ বিস্তীর্ণ। এটিই কবরস্থান। বিখ্যাত জান্নাতুল বা’কী। আমরা বাইরে থেকেই কবরস্থান জিয়ারত করলাম। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ), হজরতা ফাতেমা (রাঃ), হজরত হাসান (রাঃ) এবং আরো অসংখ্য সাহাবী বুজুর্গানে দ্বীন এখানে শেষ শয্যায় শায়িত আছেন। 

মদীনা শরীফে আমরা বেশ কয়েকটি মসজিদ পরিদর্শনে গেলাম। সেখানে প্রত্যেক মসজিদে দুই রা’কাত করে  নামাজ আদায় করে মসজিদগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম। তারমধ্যে দেখেছি মসজিদ –এ কুবা। হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) যখন হিজরত করে মদীনায় আসেন তখন তিনি এই মসজিদটির বুনিয়াদ স্থাপন করেন। আরেকটি মসজিদে নামাজ পড়েছি। তার নাম মসজিদ –এ  ক্বিবলাতাইন। পূর্বে জেরুজালেমের মসজিদ আল আকসা কে কিবলা ধরে নিয়ে সেদিকে মুখ করে নামাজ আদায় করা হতো। কিন্তু নবীজীর অন্তর চাইতো মক্কার হারাম শরীফকে কিবলা করে নামাজ পড়তে। অবশেষে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তার অন্তরের বাসনা পূর্ণ করলেন। একদিন জোহরের নামাজ পড়ার সময় সেই নির্দেশ তিনি অন্তরে অনুভব করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জামাতসহ ঘুরে বাইতুল্লাহ শরীফের (মক্কা শরীফ) দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে নামাজ শেষ করলেন। এই মসজিদের দক্ষিণ দেয়ালে স্থাপিত হলো কিবলার চিহ্ন।  সেই সময় থেকে নবীজীর প্রিয় কা’বা ঘর সারা পৃথিবীর কিবলায় পরিণত হলো। 

তারপর গেলাম ওহোদের ঐতিহাসিক যুদ্ধক্ষেত্রে। এখানে অবিশ্বাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ করে বহু সাহাবী, বীর যোদ্ধা শহীদ হন। তাদের সকলের সমাধিক্ষেত্র এই ওহোদের প্রান্তরে গ্রিলের বেষ্টনী দ্বারা সুরক্ষিত আছে। এবার মসজিদে নব্বীর দিকে রওনা হই জোহরের নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে। এবার ভাগ্য ভাল। মসজিদের অভ্যন্তরে যেতে সমর্থ হই। মসজিদে নব্বী এক বিরাট মসজিদ। এই মসজিদ তুর্কী নির্মাণ প্রকৌশলীদের কারুশিল্প এবং চারুশিল্পের সমন্বয়ে নির্মিত এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য্যের নিদর্শন। যারা এর সৌন্দর্য্য দর্শন করেছেন তারাই কেবল এর বর্ণনা বুঝতে সক্ষম হবেন। এর কারুকাজ মন্ডিত খিলান চারিদিকে বিস্তৃত। সবুজ এবং ক্রিম কালারের সমন্বয়ে এই ডিজাইন তৈরী। বিস্তীর্ণ ফ্লোর কারুকাজ খচিত মখমলে আবৃত। বিরাট পিলার সমূহ যার নীচের দিকটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করে। শুনেছি এর উপর দিকে অনেক ডোম আকৃতির ছাতার মত স্থান আছে। ভোরের দিকে সেগুলো সরে যায়। তাতে ভোরের প্রথম নরম আলো মসজিদে প্রবেশ করে। তখন এক অনুপম সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি হয়। মুসল্লিদের অন্তরে এক  স্বর্গীয় সুখের অনুভূতির  সঞ্চার হয়। আল্লাহর অশেষ কৃপা লাভের আশায় তারা ব্যাকুল হন। কিছুক্ষণ পর সেই ছাতা আপনি আপনি বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে তখন ঊষার কোলে রাঙ্গা রবি প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। 

আমরা মসজিদের ভিতরে নফল নামাজ পড়ে কোরান তেলাওয়াত করে সময় কাটালাম। জোহরের আজান হলো। ফরজ নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করলাম। প্রচন্ড ভীড় । দাঁড়ানোর স্থান নেই। নামাজ শেষ হলো। মসজিদে নব্বীর ভিতরে একদিকে মেয়েরা। কারুকাজ করা শক্ত কাঠের দরজার ওপারে পুরুষদের জন্য স্থান। নামাজ অন্তে সেখানকার পুরুষ মুসল্লিদের সরিয়ে দিয়ে একটি বিশাল লম্বা চাকাওয়ালা পার্টিশান টেনে মহিলাদের জন্য এদিককার দরজা খুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে মহিলাগণ এমন দৌড় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলেন যে, সে এক বিস্ময়কর দৃশ্যও বটে। আমার পায়ে ব্যথা। সেজন্য আমি এবং রওশন – আরা ভাবী একপাশে একটু ধীরে চলতে লাগলাম। কারণ সামনে নবীজীর রওজা মোবারক। সবুজ রঙের রওজা মোবারক গ্রিল দিয়ে ঘেরা। সেই কক্ষে প্রবেশ করে বুঝতে পারলাম কি ভয়ংকর চাপ। মনুষ্য স্রোতের চাপ। সেই চাপ সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি কোন মানুষের নেই। কয়েক নজর রওজা মোবারকের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজের প্রাণ রক্ষায় ব্যস্ত হলাম। শুনেছি আমাদের সামনে রয়েছে তিনটি কবর। একটি হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ), অন্যটি হজরত ওসমান (রাঃ)- এর কবর। তৃতীয় কবরটি খালি। সেটিতে ভবিষ্যতের কোন এক সময়ে হজরত ঈসা (আঃ) অথবা ইমাম মেহেদীকে  সমাহিত করা হবে। সেখানেও দু’রাকাত নফল নামাজ পড়তে হয়। অনেকে এরই মধ্যে সেজদায় রত। ছোট কামরায় প্রচন্ড ভীড়ে সব মেয়েরা কালো বোরখায় আবৃত। নীচে দেখবার বা ঠাহর করবার কোন উপায় নেই। পেছনের প্রচন্ড ধাক্কায় সামনের মহিলাগণ সিজদারত মহিলাদের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি সম্ভবত দু’জন মহিলার উপরে পড়েছি। প্রাণ সংশয়ের সম্ভবনা চিন্তা করে ‘হোয়্যার ইজ দ্যা এক্সিট’ বলে চিৎকার করলাম। কেউ সাড়া দিল না। পুনরায় বললাম, ‘এক্সিট কিধার হ্যায়?’ কেউ একজন প্রতি উত্তরে চিৎকার করে বললো, ‘ইছ তরফ হ্যায়, ইধার।’ আমি জানি না কেমন করে মানুষের উপর দিয়ে ভাসতে ভাসতে বহির্গমনের  নিকট পৌঁছালাম। পায়ের নীচে মাটি পেলাম। বেরিয়ে এলাম। প্রাণভরে শ্বাস নিলাম। অপেক্ষা করলাম মনুষ্য স্রোতের একপাশে দাঁড়িয়ে। আরেকটু পরে আরেকটু দূরে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলাম। 

দুইবার ফিরে গেলাম বাইরে আসার দরজার কাছে, রওশন আরা ভাবীর খোঁজে। সেই যে আমার হাত থেকে ছুটে গিয়েছিলেন, আর খুঁজে পাচ্ছিনা। আবার গেলাম ভীড় ঠেলে  সেই দরজার  কাছাকাছি। দেখি তিনি তাঁর হাত ব্যাগ উঁচু করে তুলে ধরেছেন। হাত তুলে আমিও জানান দিলাম। আরো কাছে গিয়ে উনাকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলাম। আল্লাহ্‌কে ধন্যবাদ দিলাম এই জন্য যে তিনি এক বিষাদময় পরিণতির হাত থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন। ধীরে ধীরে হেঁটে  মসজিদের ভিতর দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। দেখি ডা. তাহের  আর ডা. হারুন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। 

পরদিন শুক্রবার। সেদিনও সকালের দিকে তৈরী হয়ে মসজিদে নব্বীতে চলে এলাম। ভেতরে জায়গা নেই। বাইরের চত্বরে বেশ দূরে মাঝামাঝি স্থানে বসার জায়গা করে নিলাম। সেখানে তাল গাছে মতো বিরাট ছাতা ভাঁজ করা আছে – অসংখ্য। রৌদ্রের হাত থেকে মুসুল্লিদের ছায়া দান করবার জন্য সে সব ছাতা যান্ত্রিক কৌশলে খুলে দেওয়া হয়। তাতে পুরো এলাকা ছায়াময় হয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যবশতঃ এসব যান্ত্রিক বিরাট বিরাট ছাতা খোলা এবং বন্ধ করবার দৃশ্য দেখতে পাইনি। মসজিদে নব্বীর মাঠে টাইলস্‌ বিছানো ঝকঝকে পরিষ্কার জায়গা। সকলেরই খালি পা অথবা মোজা পরা। সেখানে বসে নফল নামাজ, দোয়া কালাম পড়তে থাকলাম। দেশদেশান্তর থেকে মহিলারা এসেছেন। বিভিন্ন জাতের মানুষ তারা। সাদা কালো, উঁচু লম্বা, মোটা চিকন, বিরাটাকায় বপুর নানা ভাষার মানুষ। কিন্তু সকলেরই উদ্দেশ্যে এক, নিয়ত অভিন্ন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা  বোরখা পরা অথবা লম্বা সাদা ড্রেস পরা। খুব ভাল লাগছিল দেখে। যেন বেহেস্তের দূত। খুব ছোট বাচ্চাও অনেকে নিয়ে এসেছেন। প্যারাম্বুলেটরে রেখে পাশে নামাজ, এবাদত করছেন।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নামাজের আযান পড়লো। আমরা নামাজে শরীক হলাম। খুব শান্তি পেলাম। লক্ষণীয় বিষয় যে প্রতিটি নামাযের অন্তে জানাজার নামায থাকে। মদীনা শরিফেও দেখলাম প্রতিটি ওয়াক্তেই সম্ভবত নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। মনটা বিষন্ন হয়। এইভাবে প্রতিটি মানুষকে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হয় একদিন।  কিন্তু আমরা সে কথাটি ভুলে বসে থাকি।

মসজিদে নব্বীতে জুমার নামায আদায় করে আমরা দ্রুত হোটেলে চলে আসি। আরো দ্রুত আমাদের ব্যাগ পত্র নিয়ে, কামরার চাবি জমা দিয়ে বাস ধরবার জন্য বেরিয়ে পড়ি । তড়িঘড়ি ট্যাক্সি ধরে বাসে এসে সিট নিলাম। যাত্রা হলো শুরু মক্কার উদ্দেশ্যে। বাসে খুব মজাদার খাবার পরিবেশন করলো। বাসমতি চাউলের ভাত, চারটি নাগেট, দুটি জয়তুন আর কোমল পানীয়, যাত্রাপথের জন্য যথেষ্ট এবং আরামদায়ক খাবারও বটে।

পথিমধ্যে আমাদের বাস মীকাতে এসে পৌঁছালো। মীকাত হছে একটি নির্দিষ্ট স্থান, যেখানে পৌঁছাবার পূর্বেই উমরাহ্‌ যাত্রীদেরকে ইহরাম বাঁধতে হয়। বাংলাদেশিগণ জেদ্দা বিমান বন্দরে পৌঁছাবার পূর্বেই মীকাত (ইয়া – লামলাম) অতিক্রম করে। সেজন্য ঢাকা থেকেই ইহ্‌রাম পরিধান করে উমরাহ্‌ পালনের লক্ষ্যে যাত্রা করেছিলাম। 

মদীনা শরীফ থেকে নবীজীর রওজা মোবারক জিয়ারত করে যখন মক্কা মদিনায় ফিরে আসি তখন এই মীকাতে আমাদের বাসটি থামে। বহু যাত্রী যারা উমরাহ্‌ পালনের জন্য মক্কায় এসেছিলেন তারা অবতরণ করেন। এখানে একটি সুন্দর মসজিদ আছে, পানি আছে। ফুলের বাগান এবং যথেষ্ট গাছগাছালি দৃষ্টিগোচর হলো। এই মীকাতে তীর্থ যাত্রীগণ ইহ্‌রামের শুভ্র সূতি বস্ত্র পরিধান করে, মসজিদে দুই রাকাত নফল নামায পড়ে, পুনরায় মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। এখান থেকে শুরু হয় তাদের উমরাহ্‌ পালনের আচার আচরণ। 

একটি লক্ষ্যনীয় বিষয়, বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় প্রতি মিনিটে বাস এসে থামছে। অবতরণ করছে হাজার হাজার তীর্থ যাত্রীর দল। কত জাতের, কত বর্ণের, কত ভাষার, কত উচ্চতার, কত মোটা মানুষ আছে এ পৃথিবীতে তা এই এক জায়গায় বসে অবাক হয়ে দেখলাম। আশ্চর্য্য ব্যাপার হল বিভিন্ন জাতের মানুষ হওইয়া সত্ত্বেও ইহ্‌রাম বাঁধার পর সকলের চলাফেরা এবং ব্যবহার অভিন্ন। শতশত বাস দাঁড়ানো। হাজার হাজার মানুষ। দোকান আছে অসংখ্য। ইহ্‌রামের নানা কাপড়, সাদার মধ্যে সাদা ডিজাইন করা, ভারী রকমারি কাপড়, তসবিহ্‌, টুপি, আতর, খাদ্যদ্রব্য, প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। একসময়ে আমাদের বাস ছাড়লো। ঊমরাহ্‌ পালনকারীরা মৃদু স্বরে তালবিয়া – লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক – পাঠ শুরু করলেন। পরিবেশ এমন হলো যেন আমরা বেহেশতের উদ্যানে বেড়াতে এসেছি। এটা পৃথিবীর কোন স্থান নয়।

মক্কা শহরে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। নৈশকালীন বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন বাজারে ঘুরতে গেলাম। বিরাট মার্কেট একই বিল্ডিং এর ভিতর – বিচিত্র সম্ভারে পূর্ণ। ক্রেতার সংখ্যা প্রচুর, বিক্রেতার সংখ্যা একেবারেই কম। এখানে কেউ চুরি করে না, জালিয়াতি করে না। সিসিটিভি ক্যামেরা তো লাগানোই আছে। পরের দিন রোববার আমরা দ্বিতীয়বার উমরাহ্‌ করতে গেলাম। এবারের উমরাহ্‌র সংগী হলেন সুলাইমান। ডাক্তার তাহের সাহেবের পরিচিত বাঙ্গালী ছেলে। অতিশয় ভদ্র। ছোট বেলা থেকে মক্কায় থাকে তার বোনের সঙ্গে। লেখাপড়া আরবীতেই করেছে। ট্যাক্সি চালায়। নিজের গাড়ি। সেই ছেলেটি আমাদের সঙ্গে গেল। এবারও উমরাহ্‌ করবার জন্য ইহরাম বাঁধার প্রয়োজন পড়ে।  যেহেতু আমরা এখন মক্কা শহরের ভেতরেই অবস্থান করছি, সেহেতু আমরা তানাইম নামক মসজিদে প্রবেশ করি। সেখানে দুই রাকাত নফল নামায পড়ে উমরাহ্‌ পালনের নিয়ত করি। এই মসজিদটির আরেকটি নাম আছে। তা হচ্ছে আয়েশা মসজিদ। তারও একটি ইতিহাস আছে। এখান থেকে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে মক্কা শরীফে  প্রবেশ করি। বিধি মোতাবেক সব কাজ সমাধান করে বের হয়ে আসি। 

বায়তুল্লাহ শরীফ (কা’বা শরীফ) হতে ফিরে এসে বাসায় বিশ্রাম করে বিকেলে বাজার দেখতে গেলাম। বাজারগুলো আজান পড়ার সংগে সংগে বন্ধ হয়ে যায়। প্রত্যেকে তখন নামাজ পড়ে যে যেখানে থাকে। এর কোন ব্যতিক্রম নাই। নামাজ শেষে পুনরায় মার্কেটের দরজা খুলে যায়।

পরের দিন দেখা হলো আরাফাতের ময়দান। বিরাট প্রন্তর। সারি সারি তাঁবু – শত শত। পাহাড়ের কোল ঘেঁষেও অনেক তাঁবু। গাছপালা আছে যথেষ্ট। তবে বিরাট বৃক্ষ নজরে পড়ে নাই। নিম গাছের প্রাচুর্য্য আছে। একস্থানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আরাফাতের ময়পদানে পা রাখলাম। বাঁদিকে মুজদালেফা –কাঁকড় পাথরে পূর্ণ। এই পাথরই শয়তানের উদ্দেশ্যে নিক্ষিপ্ত হয়। একুশটি করে পাথর এক একজন হাজী সাহেব সংগ্রহ করেন। সেগুলো সাতটি করে তিন শয়তানের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করেন। বিরাট আকারের তিনটি শয়তানের প্রতিকৃতি (জামারা) নির্মাণ করা আছে। বড় শয়তান, মাঝারি ও ছোট শয়তান। এবং তিনদিন এই কঙ্কর মারতে হয়। হজ্জ্বের সময় প্রচন্ড ভিড় হয়। আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন একটি মানুষও দৃষ্টিগোচর হলো না।

কবরস্থান দেখার আগ্রহ আমার সবসময়ই। ফেরার পথে একটি কবরস্থানে যাত্রা বিরতি হলো। এই কবরস্থানের নাম জান্নাতুল মওয়া। তৃণ পল্লবহীন মাটির সমতল  প্রান্তর যেন শস্য বপনের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। এখানে হজরত খাদিজা (রাঃ) এবং আরো বড় বড় ব্যক্তি এবং বীরদের দেহ সমাহিত রয়েছে। কিন্তু কোন চিহ্ন নেই। সবই সমান, নীরব নিস্তব্ধ। অথচ এর নীচে কত পূণ্যবান মানুষ শায়িত আছেন অন্তহীন শয্যায়। সেখান হতে চলে গেলাম হেরা পর্বতের পাদদেশে। নাম তার জবলে নূর। এই হেরার গুহায় বসে আমাদের প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) আল্লাহ্‌র ধ্যানে মশগুল থাকতেন। বিবি খাদিজা এই বিপদসংকুল উচ্চ পাহাড়ে আরোহণ করে নবীজীকে আহার –সামগ্রী পৌঁছে দিতেন প্রতিদিন। এখানে দীর্ঘ সাধনার পর তাঁর ওপর ওহী নাজিল হয়। “ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাকা, খালাকাল ইনসানা মিন আলাক। ... পড়, পাঠ কর তোমার প্রভুর নামে, যিনি মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে কলমের সাহায্যে শিক্ষাদান করেছেন।”     

হেরা পর্বতের একদম গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে দেখলাম কত নর নারী ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাচ্ছে। সেই গুহা দর্শন করবার মানসে। মানুষগুলোকে এত ক্ষুদ্র দেখাচ্ছিল যে পোষাকের রঙ দেখে মানুষকে সনাক্ত করা হচ্ছিল। আমার আফসোস! আরো কম বয়সে আসলে আমরা হেরা পর্বতের গুহা দর্শন করবার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারতাম। এই হেরা পর্বতের পাদদেশের অদূরেই রয়েছে হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর জন্মস্থান। ছোট্ট একটি বাড়ি। প্রাচীর ঘেরা। জন্মস্থানের কক্ষটি বন্ধ থাকে। পাশে একটি লাইব্রেরী সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। বাইরে থেকে দেখে চলে এলাম। সরু পাহাড়ি রাস্তা। দু’পাশে ছোট ছোট দোকানপাট। পাশে, পেছনে, উপরে বিরাট বিরাট পাথরের চাঁই শাখা মেলে আছে। সূর্য অস্ত যায় যায়। রাস্তায় লোকজন নেই বললে চলে। প্রকৃতি শব্দহীন মৌন। বাসায় ফিরে এলাম। সাথে করে নিয়ে এলাম স্মৃতি যা চিরকাল অন্তরে মুদ্রিত থাকবে।  

উমরাহ্‌ করবার পর বিদায়ী তাওয়াফ করতে হয়। সূর্যের কিরণ প্রখর থাকায় সকালের দিকেই যেতে হলো। সেদিনও সুলাইমান সাথে। সুলাইমান বললেন, আজ পায়ে হেঁটে তাওয়াফ করবার চেষ্টা করেন। তেমন ভীড় নেই। আর যদি নাই-ই পারেন, তখন হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করা যাবে। সেদিন সেই লোকটির সাহস দানের দরুণ কা’বা ঘর তাওয়াফ করলাম। যাবতীয় নিয়ম মেনে সাত বার প্রদক্ষিণ সমাপ্ত করে কা’বা ঘর সংলগ্ন খালি জায়গায় দুই রাকাত নামাজ পড়বার খুব ইচ্ছে হয়। প্রচন্ড ভীড়ের জন্য সেখানে ঢোকা সম্ভব হচ্ছিল না। দ্বিধায় পড়ে গেলাম। হঠাৎ জনতার চাপে আমরা সেখানে ঢুকে গেলাম। দাঁড়িয়ে দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করলাম। এখানে নামাজ পড়লে লক্ষগুণ সোয়াব বেশী পাওয়া যায়। মাত্র দুই তিন ফিট দূরে সামনে এগিয়ে গিয়ে কা’বা ঘরের গায়ে হাত দিয়ে স্পর্শ করি। দেহমনে এক অপূর্ব পূণ্যময় অনুভূতির সৃষ্টি হয়। অন্য সকলের মত আমারও চোখের কোল বেয়ে অশ্রুধারা নামতে থাকে। 

কা’বা  শরীফ ধরে মনপ্রাণ খুলে পরম করুণাময়ের নিকট ক্ষমা চাইলাম। নিজের, পরিবারের, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বান্ধব সকলের  জন্য সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করলাম। মন হলো আমরা এই জনসমুদ্রে থেকেও যেন পৃথিবীতে ছিলাম না। অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে, যেন সৃষ্টিকর্তার নিকটবর্তী হয়েছিলাম। যদিও তিনি সর্বদা আমাদের সাথেই আছেন। কি অপূর্ব আকর্ষণ কা’বা  শরীফের। ছেড়ে আসতে ইচ্ছা করে না। মনে হয় আরো ধরে থাকি কিছুক্ষণ।ভীড়ের চাপে সরে আসতে হলো। কত ভাষাভাষীর নারী পুরুষ। কিন্তু তাদের হৃদয়ের ভাষা এক রকম। যখন উচ্চারণ করে লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক – আমি হাজির আছি তোমার দরবারে –তখন এক স্বর্গীয় অনুভূতি প্রতিটি মানুষকে অন্য এক অপার্থিব জগতে নিয়ে যায়।

 তাওয়াফ শেষ করে সিঁড়িতে গিয়ে বসলাম। সেখানে জমজমের সুশীতল পানি পান করে প্রাণ জুড়ালো। বসে বসে দীর্ঘক্ষণ কা’বা  ঘরের দৃশ্য অবলোকন করলাম। চোখ ফেরানো যায় না। সেই ছোটবেলা থেকে যে ছবি দেখে এসেছি আজ তা চোখের সামনে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে যে কা’বা  শরীফের দিকে মুখ করে নামাজ পড়ি – তা মাত্র কয়েক গজ দূরে। এইমাত্র ছুঁয়ে এলাম। কি এক চৌম্বক শক্তির বলে কেবলই  দেখতে ইচ্ছা করে। ভাল লাগায় হৃদয় মন আপ্লুত, তৃপ্ত। পরের শুক্রবারে আবার জুমার নামাযের সময়  দেখতে পাব এই আশা নিয়ে ঘরে ফিরে এলাম

সেদিন বিকেলে গাজা এলাকায় বাজার করতে গেলাম। জায়নামাজ, তসবীহ, আতর –এসব জিনিসপত্র ক্রয় করে বাসায় ফিরে আসি। পরের দিন বৃহস্পতিবার বিকেলে মক্কা শরীফে এশার নামাজ আদায় করলাম। বেশী ভেতরে প্রবেশ সম্ভব ছিল না। প্রচন্ড ভীড়।  নামাজের  পর হোটেল হিলটনে ঘুরতে গেলাম। বিরাট বাজার! । বহুসংখ্যক এসকেলেটর বেশ দ্রুত গতিতে সারাক্ষণ উঠানামা করছে। আমার কন্যা হুমায়রার বলা মতো ‘গাজাজ’ নামক মার্কেটে প্রবেশ করলাম। নীচের তলায় বিরাট দোকান। চোখ ধাঁধানো আলো। তৈজস-পত্র মনকাড়া –তবে অগ্নিমূল্য।

আমার হাঁটার সমস্যা ছিল বলে বহু কষ্টে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে পৌঁছালাম। ট্যাক্সি পেতে একটু দেরি হলো। কারণ সকলেরই তখন নীড়ে ফেরার তাড়া। পরদিন শুক্রবার। জুমার নামাজ পড়তে হবে। আগে ভাগেই রওনা হতে হলো। কিন্তু যে ভীড়, সেই ভীড়। কোন কম নেই। বাইতুল্লাহ্‌ শরীফের পাশেই মসজিদের অভ্যন্তরে অবস্থান গ্রহন করলাম। দলে দলে মহিলা মুসুল্লিগণ এসে কাতারে দাঁড়ালেন। মুহূর্তে ভরে গেল সুদৃশ্য কার্পেট বিছানো নামাজের স্থান। মহিলাদের একদিক, পুরুষদের অন্যদিক। তবে সকলেই কা’বামুখী। সুদূর বাংলাদেশ থেকে আমরা যে কেবলামুখ হয়ে নামাজের জন্য দাঁড়াই –সেখানেও তাই। পার্থক্য এই যে কা’বাঘর বা কিবলা মাত্র কয়েক গজ দূরে –চোখের সামনে। কালো আচ্ছাদনের উপর সোনার সূতায় কোরানের আয়াত লিপিবদ্ধ করা আছে। তাও হাতের কারুকাজ মন্ডিত –ছাপার অক্ষর নয়। বিশেষ পরিবার কেবল এই কাজেই নিয়োজিত থাকে। সারা বৎসর ধরে এই কালো আচ্ছাদনের উপর অত্যন্ত তমিজের সাথে এই সূক্ষ্ম চারুশিল্পের চর্চা করেন তারা, সুন্দর আকর্ষণীয় রূপে তৈরী করেন। দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যায়। অন্তর আত্মা এক আধ্যাত্মিক অনুভূতিতে পূর্ণ হয়। ক্লান্তি আসে না। মনে হয় আরো দেখি, আরো চেয়ে থাকি। এত কি জাদু আছে জানি না, তবে আছে এক অনির্বচনীয় আকর্ষণ ও সন্তুষ্টি।

জুমার নামাজের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি সবাই। এরই মাঝে যে যার মতো নামাজ পড়ছেন, কোরান পাঠ করছেন। ওখানে মসজিদের ভেতর বিরাট বিরাট পিলারের গায়ে শেলফ আছে। তাতে রক্ষিত আছে অনেক কোরান শরীফ। যে যার যার মত গিয়ে পাঠ করছেন আবার সুন্দর ভাবে সঠিক স্থানে রেখে দিচ্ছেন। অগণিত মানুষ। সকলের উদ্দেশ্য এক! চিত্ত মহান আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে নিবেদিত। বিনয়ী, নম্র, ভদ্র, কারো কোন অহংকার নেই। 

জুমার নামাজ শুরু হলো। নামাজ শেষে মন প্রাণ ঢেলে প্রার্থনা করলাম। সুখে দুঃখে চিত্ত ভারাক্রান্ত। এগিয়ে গেলাম আরো সামনের দিকে যেন কা’বা ঘর ভালোমত দেখতে পাই। এমন সময়ে সামনের কাতারের একজন ইরানী মহিলা আমাকে একটি রুটির বড় টুকরা দিলেন। আমি কিছুতেই নেব না। তবুও তিনি ও তারা আমাকে সেটি জোর করেই দিয়ে দিলেন। শুকরিয়া জানিয়ে সম্মুখপানে এগিয়ে গেলাম। ইংরেজী জানেন বলে মনে হলো না। সামনে অগ্রসর হয়ে রওশন আরা ভাবীর সঙ্গে দাঁড়ালাম। নির্নিমেষ নয়নে কা’বা ঘর দেখতে থাকলাম। ততক্ষণে আমার স্বামী মোহাম্মদ হারুন এবং ডাক্তার তাহের ভাই আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। স্বচক্ষে কা’বাঘর দেখার সৌভাগ্য আর কোনদিন হবে না। তাই দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বাইতুল্লাহ্‌ শরীফের অপরূপ শোভা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। ফেরার পথে একটি তুর্কী রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করি। অনেক বাঙ্গালী কর্মচারী। আরবী বলছে অনর্গল। খাবারও আমাদের পছন্দের সঙ্গে মেলে। অনেকটা মোগলদের স্টাইল। মজাদার খাবার সংগ্রহ করে বাসায় ফিরে এলাম।

সেদিন রাতে মোটামুটি এবং পরেরদিন শনিবার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম। শনিবার মধ্যরাতে আমাদেরকে জেদ্দা বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে বের হতে হবে। সময় মতো সুলাইমান ট্যাক্সি নিয়ে হাজির। তাহের ভাই আমাদের সঙ্গে। তিনি এত পরিশ্রম ও এবং সহযোগিতা করেছেন যা কল্পনার অতীত। তার সহযোগিতা পেয়ে আমরা যেন সত্যি স্বর্গরাজ্য ভ্রমণ করে এসেছি।  জেদ্দা বিমান বন্দরে ভি.আই.পি., লাউঞ্জে খুব সুন্দর ব্যবস্থা। বসার ব্যবস্থার পাশেই টিভি স্ক্রিন, খাবার, ফলমূল, চা, কফি অঢেল। একটুক্ষণ পর ভোর হলো। দোর খোলার প্রশ্ন নেই যদিও। কারণ দরজা সব খোলাই। টিভি স্ক্রিনে আমাদের বিমানের ফ্লাইট নাম্বার এবং ছেড়ে যাওয়ার সময় দেখাচ্ছে। আমরা বাসে উঠে বিমান বন্দরের ভেতর দিয়ে সাউদিয়া এয়ার লাইন্সের বিমানের সিঁড়ির নকটবর্তী হলাম। ধীরে ধীরে এক পা, এক পা করে মক্কার মাটি পেছনে ফেলে জাহাজে আরোহণ করে বরাদ্দকৃত সীটে গিয়ে উপবেশন করলাম। উল্লেখযোগ্য যে, এই সীটেই বসেই আমরা জেদ্দা গিয়েছিলাম। আমাদের সামনে আর কোন সীট ছিলনা।

এবার বিমান উড্ডইয়নের পালা। উচ্চতা ভীতি আমার আগেও ছিল, এখনো আছে। যথারীতি সীট বেল্ট বেঁধে আল্লাহ্‌র নাম স্মরণ করে , দোয়া দরূদ পড়তে পড়তে উর্ধ্বাকাশে উঠে গেলাম। বিমানে খুব যত্ন করেছে এয়ার হোস্টেসগণ। সুস্বাদু খাদ্য পানীয় সরবরাহ করেছেন প্রচুর। আপ্যায়নের অন্ত নেই। অপরাহ্নে ঢাকা এয়ারপোর্টে অবতরণ করলো আমাদের বিমান। ক্রুদের ধন্যবাদ জানিয়ে বিমান থেকে বেরিয়ে এলাম বোর্ডিং ব্রিজের মধ্য দিয়ে। দাঁড়ালাম কনভেয়ার বেল্টের পাশে। মালপত্র এসে পৌঁছাল হাতের কাছে। দুটি ট্রলিতে সেগুলো তুলে নিয়ে আমরা দু’জন অগ্রসর হলাম নির্গমনের পথ ধরে। হঠাৎ দেখি আমাদের নাতনী ছোট্ট ফারহিন আর তার বাবা ববি হাস্যমুখে দডায়মান।  ছোট্ট ফারহিনকে তার বাবা, বারের ওপর দিয়ে এপাশে ছেড়ে দিল। সে ছোট্ট হাতে আমাদের ট্রলি ঠেলতে সাহায্য করলো। পুত্র কায়সার হারুন ববি নিয়ে এলো আমাদেরকে বাইরে। গাড়ি ডাকলো। বাক্স পেট্‌রা গাড়িতে তুলে আমরা মহাখালী ডি ও এইচ এস (DOHS)এর বাসার দিকে রওনা হলাম। বাসায় অপেক্ষা করছিল পুত্রবধূ তানিয়া ও অন্যান্যরা । সবাইকে দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। শান্তির নীড়ে আপনার জনের মাঝে ফিরে এলাম।।

...

অগাস্ট ২০১১, ঢাকা             


Monday, February 21, 2011

একুশে ফেব্রুয়ারি

২১ শে ফেব্রুয়ারি
৮ ই ফাল্গুনে এসেছিলে তুমি
পলাশের মালা পরি’।

সেই কবে
’৫২–র পড়ন্ত বিকেলে
রমনার মাঠে জড়ো হয়েছিলে
বাংলার দামাল ছেলে।

দস্যু করে ধন লুন্ঠন, তস্কর করে
সামান চুরি
ভাষা লুন্ঠন?
শুনিনি কখনো
এ জগতে নেই জুড়ি!

ভাষার জন্য প্রাণ দিল যারা
অকৃপণ অকাতরে
সাহসের বীজ বুনে দিল তারা
শহীদ মিনারে।

বাংলার ছেলে প্রাণ দিয়ে গেল
মায়ের ভাষার তরে
সোনার আঁখরে লেখা রবে নাম
বাংলার ঘরে ঘরে।

সালাম বরকত রফিক জব্বার
শফিক আরো কতজনা
দিনে দিনে কত রক্ত দিয়েছে
নাম তার নাই জানা।
ত্যাগের শীর্ষে উচ্চে উঠিল
বাঙ্গালী বীর সেনা
(আজ) শুধিতে হচ্ছে রক্তের ঋণ
আরো ছিল যত দেনা।

মায়ের মুখের ভাষার জন্য
দিয়ে গেল যারা প্রাণ,
গাইবো তাঁদের গৌরব গাথা
রাখবো ভাষার মান।

শিশু শ্রম -১৯৯৭