Thursday, April 7, 2011

মক্কা মদিনায় একদিন

পবিত্র মক্কা মদিনায় কোনদিন যেতে পারবো কল্পনা করতে পারিনি। হঠাৎ করে সুযোগ এসে গেল। আমাদের নিকট আত্মীয় ডা. মোহাম্মদ আবু তাহের মক্কায় বসবাস করেন। তিনি সৌদি সরকারের কিং ফয়সল হাসপাতালে সার্জন হিসাবে কর্মরত। তিনি বললেন, উমরাহ ভিসা দেওয়া শুরু হয়েছে, আপনারা একবার আসেন। আমার স্বামী লে. কর্নেল ডা. মোহাম্মদ হারুন রাজী হয়ে বললেন ‘চল ঘুরে আসি।’ এরপর হয়তো যাওয়া হবে না বয়সের ভারে। প্রস্তুতি নিলাম সেই সুদূর মক্কা মদিনার পূণ্যভূমি স্বচক্ষে দেখব বলে। আমার পূর্ব পুরুষেরা, আমার মাতামহ, আজ থেকে প্রায় ১২৫ বৎসর পূর্বে এই পবিত্র ভূমিতে নগ্ন পদে কা’বা ঘর প্রদক্ষিণ করেছিলেন বহুবার। নানাজান মো. হানিফ সেখানে একটানা বসবাস করেছিলেন ১১ বছর। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বালক পুত্র মো. সিদ্দিক। এর আগে ও পরেও তিনি কয়েকবার গিয়েছেন মক্কায়।

সতেরই এপ্রিল বিকালের  ফ্লাইটে ঢাকা এয়ারপোর্ট ত্যাগ করলাম। সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের বিশাল প্লেন ডানা মেলে দিল মুক্ত বিহঙ্গের মতো। সাড়ে পাঁচ ঘন্টা উড্ডয়নের পর জেদ্দা বিমান বন্দরের ভূমি স্পর্শ করলো আমাদের বাহন। ঢাকার সূর্য আমাদের সাথে সাথে ভ্রমণ করছিল। ঘড়ি অনুযায়ী যখন বাংলাদেশে মাগরিবের আযান হচ্ছিল তখনও প্লেনের বাইরে রৌদ্র ঝলমল উজ্জ্বল দিন। ঢাকার রাত নয়টার পর প্লেনে সূর্যাস্তের সময় হলো। ঘটনাটি খুব মজার। জেদ্দা বিমান বন্দর বিরাট এলাকা। কত যে প্লেন দাঁড়িয়ে আছে, মনে হয় কিছুই না ! বারো মিনিট বাস চলার পর আমরা বন্দর টার্মিনালে পৌঁছালাম। সেখানে দিবালোকের মত ড্যাজলিং লাইট। রাত মনেই হয় না।

এখানে বাসের  কথা একটু বলতে হয়। আমাদের দেশের বাসের মতো নয়। বাসের ভেতরে কিছু কিছু সীট, কিছু চেয়ার টেবিল, কিছু জায়গা খালি – ব্যাগ,ছোট খাটো মালপত্র রাখার জন্য। স্টিলের রড যাত্রীদের ধরে রাখবার জন্য। বাস থামলে যাত্রীরা সব হুড়মুড় করে নেমে পড়লো। আমরা ইহরাম বাঁধা উমরাহ’র যাত্রীরা নির্দিষ্ট লাইনে দাঁড়ালাম। লম্বা লাইন অনেক। আমি আমার স্বামীর পাশে দাঁড়ালাম। আমার সামনে আরেকজন মহিলা তার সঙ্গীর পাশে দাঁড়িয়ে। হাসিমুখে তাকাচ্ছেন আমার দিকে। জানতে চাইলাম , ‘হোয়্যার ডু ইউ কাম ফ্রম?’ বললেন, ‘সাউথ আফ্রিকা।’ আমি নিজের দেশের নাম বললাম, বাংলাদেশ। চিনতে পারলেন। আগে তিনি পাকিস্তানে ছিলেন। এবার উমরাহ করতে এসেছেন। ইতিপূর্বে হজ্ব করেছেন। বললাম , ‘এবার আমাদের প্রথম উমরাহ্‌ করতে আসা।’ দু’চার কথা বলার পর দেখি মহিলাদের একটি নাতিদীর্ঘ লাইন। সেখানে আমার কাগজপত্র নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেই মহিলাকে আমার সঙ্গে ডেকে নিলাম। খানিকক্ষণ পর আমার পাসপোর্ট চেক করে একটি কাগজ দিয়ে ছেড়ে দিল। সেই ভদ্রমহিলাও পাসপোর্ট চেক করতে দিলেন। আমি আমার লাগেজ- পত্র ট্রলিতে তুলে নিয়ে একটু দূরে হারুন সাহেবের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ওনার ছাড়পত্র পেতে বেশ সময় লাগলো। এদিকে ডা. আবু তাহের আমাদের জন্য আপেক্ষা করছিলেন। তার সহায়তায় আরো ঘন্টাখানেক পাসপোর্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে পার্কিং লটে এসে পৌঁছালাম। এমন সময় কে যেন আমা হাতখানি ধরে ফেললো। চমকে চেয়ে দেখি সেই ভদ্রমহিলা –যিনি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এসেছেন । খুশীতে আনন্দে আমার ‘বক্ষমাঝে চিত্ত আত্মহারা নাচে রক্তধারা।’বললেন, যাচ্ছেন?

- হ্যা মক্কায় যাচ্ছি। আগামীকাল উমরাহ করে পরশু বিশ্রাম। তার পরদিন বুধবারে মদীনা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হব। 

- আমরাও বুধবারে মদীনায় যাব। দেখা হবে আবার।

- দেখা হবে ইনশাল্লাহ বলে তার হাতে মৃদু আন্তরিকতার চাপ দিয়ে হাতখানি ছেড়ে দিলাম। 

তাঁর হাতখানি ছেড়ে দিয়ে কেন জানিনা, চিত্ত চঞ্চল হল। হৃদয় হল বেদনায় ভারাক্রান্ত। ‘আরো কিছুক্ষণ না হয় রহিতে কাছে।’ সময়ের স্বল্পতা হেতু চলে আসতে হল। এই হয়তো মানুষের মন। স্বল্প সাক্ষাতে কত আপন হয়ে যায়!

মক্কা শহরে এসে পৌঁছালাম দেড় ঘন্টা পর। ১২০ মেইল স্পীডে গাড়ি চালানো যেন কোন ব্যাপারই নয়। মক্কা শহরের সীসায় ডা. আবু তাহের সাহেবের বাসা। সেখানেই আমরা উঠলাম। পরেরদিন সকালের দিকে ক্বাবা শরীফে উপস্থিত হয়ে উমরাহ্‌ পালন করলাম। সাতবার বাইতুল্লাহ শরীফ (কা’বা ঘর) প্রদক্ষিণ করে, সাতবার সাফা –মারওয়া সায়ী করতে হলো। সাফা –মারওয়া এখন আর পূর্বের ন্যায় বিপদ সংকুল পাহাড় পর্বত নয়। সেগুলো কেটে অত্যন্ত সুন্দর মসৃণ সুদৃশ্য রাস্তা তৈরী করা হয়েছে। বিল্ডিং এর ভেতর দিয়ে অনায়াসে সাতবার সায়ী করা যায়। নিয়ম মাফিক সব কাজ সম্পন্ন করে বাসায় চলে এলাম। মিসেস আবু তাহের আমাদের প্রিয় ভাবী –ডা. রওশন আরা, আমাদের খুব দেখাশুনা করেছেন। সবসময় সঙ্গ দিয়েছেন। 

বুধবার উনারা আমাদের সঙ্গে মদীনা শরীফে রওনা হলেন। পৌঁছাতে রাত হলো। হোটেল পেতে সময় লাগলো। কারণ সব হোটেল বুকড। এই কষ্টের কাজগুলো ডা. তাহের করলেন। চারশয্যা বিশিষ্ট কক্ষ পেলাম। দুই কামড়া ভাড়া নিলাম। রাত তিনটায় মদীনায় মসজিদে–নব্বীতে ফজরের নামাজ আদায় করবার জন্য রওনা হলাম। মসজিদের চত্বরে জায়গা পেলাম তাও গেটের কাছাকাছি। এত রাতে এত লোকের সমাগম দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হলাম। কিন্তু এ লোকের সমাবেশে কোন কোলাহল নেই। সকলেই বসে যার যার মত এবাদত বন্দেগী করছেন। মেয়েদের দিকটি পৃথক করা। তবুও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কোনরকম জায়গা করে বসে পড়লাম। কোরান তেলাওয়াত, নফল নামাজ পড়তে পড়তে ফজরের ওয়াক্ত এসে গেল। জামাতের সংগে ফজরের নামাজ আদায় করলাম। আশ্চর্য্য হয়ে লক্ষ্য করলাম ভোরের পাখির কিচির মিচির আওয়াজ। ভোরের আলো ফুটে উঠলো। সময়টা বড়ই মৌন, শান্ত, পবিত্র। বড়ই স্বর্গীয় সুষমায় মন্ডিত। 

হাজার হাজার লোকের ভীড় ঠেলে দীর্ঘ সময় ধরে বাইরে এলাম। এরকম ভীড় এখনে প্রতিদিন হয়। অধিকাংশই আমাদের মতন নবীন তীর্থ যাত্রী। সেখান হতে বেরিয়ে এসে বাঙ্গালী রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার সংগ্রহ করে হোটেলের রুমে এসে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম। বেলা দশটার দিকে আবার বের হলাম। প্রথমে জান্নাতুল বা’কী। দ্বারবান ভিতরে ঢুকতে বাধা দিল। বললো ঢোকার সময় শেষ। বিফল মনোরথ হয়ে পাশের গ্রিলের দেয়াল ঘেঁষে সমাধিক্ষেত্রের ভিতরে দৃষ্টিপাত করলাম। মৃত্তিকা, কাঁকড় পাথরের মাঠ বিস্তীর্ণ। এটিই কবরস্থান। বিখ্যাত জান্নাতুল বা’কী। আমরা বাইরে থেকেই কবরস্থান জিয়ারত করলাম। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ), হজরতা ফাতেমা (রাঃ), হজরত হাসান (রাঃ) এবং আরো অসংখ্য সাহাবী বুজুর্গানে দ্বীন এখানে শেষ শয্যায় শায়িত আছেন। 

মদীনা শরীফে আমরা বেশ কয়েকটি মসজিদ পরিদর্শনে গেলাম। সেখানে প্রত্যেক মসজিদে দুই রা’কাত করে  নামাজ আদায় করে মসজিদগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম। তারমধ্যে দেখেছি মসজিদ –এ কুবা। হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) যখন হিজরত করে মদীনায় আসেন তখন তিনি এই মসজিদটির বুনিয়াদ স্থাপন করেন। আরেকটি মসজিদে নামাজ পড়েছি। তার নাম মসজিদ –এ  ক্বিবলাতাইন। পূর্বে জেরুজালেমের মসজিদ আল আকসা কে কিবলা ধরে নিয়ে সেদিকে মুখ করে নামাজ আদায় করা হতো। কিন্তু নবীজীর অন্তর চাইতো মক্কার হারাম শরীফকে কিবলা করে নামাজ পড়তে। অবশেষে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তার অন্তরের বাসনা পূর্ণ করলেন। একদিন জোহরের নামাজ পড়ার সময় সেই নির্দেশ তিনি অন্তরে অনুভব করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জামাতসহ ঘুরে বাইতুল্লাহ শরীফের (মক্কা শরীফ) দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে নামাজ শেষ করলেন। এই মসজিদের দক্ষিণ দেয়ালে স্থাপিত হলো কিবলার চিহ্ন।  সেই সময় থেকে নবীজীর প্রিয় কা’বা ঘর সারা পৃথিবীর কিবলায় পরিণত হলো। 

তারপর গেলাম ওহোদের ঐতিহাসিক যুদ্ধক্ষেত্রে। এখানে অবিশ্বাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ করে বহু সাহাবী, বীর যোদ্ধা শহীদ হন। তাদের সকলের সমাধিক্ষেত্র এই ওহোদের প্রান্তরে গ্রিলের বেষ্টনী দ্বারা সুরক্ষিত আছে। এবার মসজিদে নব্বীর দিকে রওনা হই জোহরের নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে। এবার ভাগ্য ভাল। মসজিদের অভ্যন্তরে যেতে সমর্থ হই। মসজিদে নব্বী এক বিরাট মসজিদ। এই মসজিদ তুর্কী নির্মাণ প্রকৌশলীদের কারুশিল্প এবং চারুশিল্পের সমন্বয়ে নির্মিত এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য্যের নিদর্শন। যারা এর সৌন্দর্য্য দর্শন করেছেন তারাই কেবল এর বর্ণনা বুঝতে সক্ষম হবেন। এর কারুকাজ মন্ডিত খিলান চারিদিকে বিস্তৃত। সবুজ এবং ক্রিম কালারের সমন্বয়ে এই ডিজাইন তৈরী। বিস্তীর্ণ ফ্লোর কারুকাজ খচিত মখমলে আবৃত। বিরাট পিলার সমূহ যার নীচের দিকটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করে। শুনেছি এর উপর দিকে অনেক ডোম আকৃতির ছাতার মত স্থান আছে। ভোরের দিকে সেগুলো সরে যায়। তাতে ভোরের প্রথম নরম আলো মসজিদে প্রবেশ করে। তখন এক অনুপম সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি হয়। মুসল্লিদের অন্তরে এক  স্বর্গীয় সুখের অনুভূতির  সঞ্চার হয়। আল্লাহর অশেষ কৃপা লাভের আশায় তারা ব্যাকুল হন। কিছুক্ষণ পর সেই ছাতা আপনি আপনি বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে তখন ঊষার কোলে রাঙ্গা রবি প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। 

আমরা মসজিদের ভিতরে নফল নামাজ পড়ে কোরান তেলাওয়াত করে সময় কাটালাম। জোহরের আজান হলো। ফরজ নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করলাম। প্রচন্ড ভীড় । দাঁড়ানোর স্থান নেই। নামাজ শেষ হলো। মসজিদে নব্বীর ভিতরে একদিকে মেয়েরা। কারুকাজ করা শক্ত কাঠের দরজার ওপারে পুরুষদের জন্য স্থান। নামাজ অন্তে সেখানকার পুরুষ মুসল্লিদের সরিয়ে দিয়ে একটি বিশাল লম্বা চাকাওয়ালা পার্টিশান টেনে মহিলাদের জন্য এদিককার দরজা খুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে মহিলাগণ এমন দৌড় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলেন যে, সে এক বিস্ময়কর দৃশ্যও বটে। আমার পায়ে ব্যথা। সেজন্য আমি এবং রওশন – আরা ভাবী একপাশে একটু ধীরে চলতে লাগলাম। কারণ সামনে নবীজীর রওজা মোবারক। সবুজ রঙের রওজা মোবারক গ্রিল দিয়ে ঘেরা। সেই কক্ষে প্রবেশ করে বুঝতে পারলাম কি ভয়ংকর চাপ। মনুষ্য স্রোতের চাপ। সেই চাপ সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি কোন মানুষের নেই। কয়েক নজর রওজা মোবারকের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজের প্রাণ রক্ষায় ব্যস্ত হলাম। শুনেছি আমাদের সামনে রয়েছে তিনটি কবর। একটি হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ), অন্যটি হজরত ওসমান (রাঃ)- এর কবর। তৃতীয় কবরটি খালি। সেটিতে ভবিষ্যতের কোন এক সময়ে হজরত ঈসা (আঃ) অথবা ইমাম মেহেদীকে  সমাহিত করা হবে। সেখানেও দু’রাকাত নফল নামাজ পড়তে হয়। অনেকে এরই মধ্যে সেজদায় রত। ছোট কামরায় প্রচন্ড ভীড়ে সব মেয়েরা কালো বোরখায় আবৃত। নীচে দেখবার বা ঠাহর করবার কোন উপায় নেই। পেছনের প্রচন্ড ধাক্কায় সামনের মহিলাগণ সিজদারত মহিলাদের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি সম্ভবত দু’জন মহিলার উপরে পড়েছি। প্রাণ সংশয়ের সম্ভবনা চিন্তা করে ‘হোয়্যার ইজ দ্যা এক্সিট’ বলে চিৎকার করলাম। কেউ সাড়া দিল না। পুনরায় বললাম, ‘এক্সিট কিধার হ্যায়?’ কেউ একজন প্রতি উত্তরে চিৎকার করে বললো, ‘ইছ তরফ হ্যায়, ইধার।’ আমি জানি না কেমন করে মানুষের উপর দিয়ে ভাসতে ভাসতে বহির্গমনের  নিকট পৌঁছালাম। পায়ের নীচে মাটি পেলাম। বেরিয়ে এলাম। প্রাণভরে শ্বাস নিলাম। অপেক্ষা করলাম মনুষ্য স্রোতের একপাশে দাঁড়িয়ে। আরেকটু পরে আরেকটু দূরে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলাম। 

দুইবার ফিরে গেলাম বাইরে আসার দরজার কাছে, রওশন আরা ভাবীর খোঁজে। সেই যে আমার হাত থেকে ছুটে গিয়েছিলেন, আর খুঁজে পাচ্ছিনা। আবার গেলাম ভীড় ঠেলে  সেই দরজার  কাছাকাছি। দেখি তিনি তাঁর হাত ব্যাগ উঁচু করে তুলে ধরেছেন। হাত তুলে আমিও জানান দিলাম। আরো কাছে গিয়ে উনাকে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলাম। আল্লাহ্‌কে ধন্যবাদ দিলাম এই জন্য যে তিনি এক বিষাদময় পরিণতির হাত থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন। ধীরে ধীরে হেঁটে  মসজিদের ভিতর দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। দেখি ডা. তাহের  আর ডা. হারুন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। 

পরদিন শুক্রবার। সেদিনও সকালের দিকে তৈরী হয়ে মসজিদে নব্বীতে চলে এলাম। ভেতরে জায়গা নেই। বাইরের চত্বরে বেশ দূরে মাঝামাঝি স্থানে বসার জায়গা করে নিলাম। সেখানে তাল গাছে মতো বিরাট ছাতা ভাঁজ করা আছে – অসংখ্য। রৌদ্রের হাত থেকে মুসুল্লিদের ছায়া দান করবার জন্য সে সব ছাতা যান্ত্রিক কৌশলে খুলে দেওয়া হয়। তাতে পুরো এলাকা ছায়াময় হয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যবশতঃ এসব যান্ত্রিক বিরাট বিরাট ছাতা খোলা এবং বন্ধ করবার দৃশ্য দেখতে পাইনি। মসজিদে নব্বীর মাঠে টাইলস্‌ বিছানো ঝকঝকে পরিষ্কার জায়গা। সকলেরই খালি পা অথবা মোজা পরা। সেখানে বসে নফল নামাজ, দোয়া কালাম পড়তে থাকলাম। দেশদেশান্তর থেকে মহিলারা এসেছেন। বিভিন্ন জাতের মানুষ তারা। সাদা কালো, উঁচু লম্বা, মোটা চিকন, বিরাটাকায় বপুর নানা ভাষার মানুষ। কিন্তু সকলেরই উদ্দেশ্যে এক, নিয়ত অভিন্ন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা  বোরখা পরা অথবা লম্বা সাদা ড্রেস পরা। খুব ভাল লাগছিল দেখে। যেন বেহেস্তের দূত। খুব ছোট বাচ্চাও অনেকে নিয়ে এসেছেন। প্যারাম্বুলেটরে রেখে পাশে নামাজ, এবাদত করছেন।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নামাজের আযান পড়লো। আমরা নামাজে শরীক হলাম। খুব শান্তি পেলাম। লক্ষণীয় বিষয় যে প্রতিটি নামাযের অন্তে জানাজার নামায থাকে। মদীনা শরিফেও দেখলাম প্রতিটি ওয়াক্তেই সম্ভবত নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। মনটা বিষন্ন হয়। এইভাবে প্রতিটি মানুষকে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হয় একদিন।  কিন্তু আমরা সে কথাটি ভুলে বসে থাকি।

মসজিদে নব্বীতে জুমার নামায আদায় করে আমরা দ্রুত হোটেলে চলে আসি। আরো দ্রুত আমাদের ব্যাগ পত্র নিয়ে, কামরার চাবি জমা দিয়ে বাস ধরবার জন্য বেরিয়ে পড়ি । তড়িঘড়ি ট্যাক্সি ধরে বাসে এসে সিট নিলাম। যাত্রা হলো শুরু মক্কার উদ্দেশ্যে। বাসে খুব মজাদার খাবার পরিবেশন করলো। বাসমতি চাউলের ভাত, চারটি নাগেট, দুটি জয়তুন আর কোমল পানীয়, যাত্রাপথের জন্য যথেষ্ট এবং আরামদায়ক খাবারও বটে।

পথিমধ্যে আমাদের বাস মীকাতে এসে পৌঁছালো। মীকাত হছে একটি নির্দিষ্ট স্থান, যেখানে পৌঁছাবার পূর্বেই উমরাহ্‌ যাত্রীদেরকে ইহরাম বাঁধতে হয়। বাংলাদেশিগণ জেদ্দা বিমান বন্দরে পৌঁছাবার পূর্বেই মীকাত (ইয়া – লামলাম) অতিক্রম করে। সেজন্য ঢাকা থেকেই ইহ্‌রাম পরিধান করে উমরাহ্‌ পালনের লক্ষ্যে যাত্রা করেছিলাম। 

মদীনা শরীফ থেকে নবীজীর রওজা মোবারক জিয়ারত করে যখন মক্কা মদিনায় ফিরে আসি তখন এই মীকাতে আমাদের বাসটি থামে। বহু যাত্রী যারা উমরাহ্‌ পালনের জন্য মক্কায় এসেছিলেন তারা অবতরণ করেন। এখানে একটি সুন্দর মসজিদ আছে, পানি আছে। ফুলের বাগান এবং যথেষ্ট গাছগাছালি দৃষ্টিগোচর হলো। এই মীকাতে তীর্থ যাত্রীগণ ইহ্‌রামের শুভ্র সূতি বস্ত্র পরিধান করে, মসজিদে দুই রাকাত নফল নামায পড়ে, পুনরায় মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। এখান থেকে শুরু হয় তাদের উমরাহ্‌ পালনের আচার আচরণ। 

একটি লক্ষ্যনীয় বিষয়, বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় প্রতি মিনিটে বাস এসে থামছে। অবতরণ করছে হাজার হাজার তীর্থ যাত্রীর দল। কত জাতের, কত বর্ণের, কত ভাষার, কত উচ্চতার, কত মোটা মানুষ আছে এ পৃথিবীতে তা এই এক জায়গায় বসে অবাক হয়ে দেখলাম। আশ্চর্য্য ব্যাপার হল বিভিন্ন জাতের মানুষ হওইয়া সত্ত্বেও ইহ্‌রাম বাঁধার পর সকলের চলাফেরা এবং ব্যবহার অভিন্ন। শতশত বাস দাঁড়ানো। হাজার হাজার মানুষ। দোকান আছে অসংখ্য। ইহ্‌রামের নানা কাপড়, সাদার মধ্যে সাদা ডিজাইন করা, ভারী রকমারি কাপড়, তসবিহ্‌, টুপি, আতর, খাদ্যদ্রব্য, প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। একসময়ে আমাদের বাস ছাড়লো। ঊমরাহ্‌ পালনকারীরা মৃদু স্বরে তালবিয়া – লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক – পাঠ শুরু করলেন। পরিবেশ এমন হলো যেন আমরা বেহেশতের উদ্যানে বেড়াতে এসেছি। এটা পৃথিবীর কোন স্থান নয়।

মক্কা শহরে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। নৈশকালীন বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন বাজারে ঘুরতে গেলাম। বিরাট মার্কেট একই বিল্ডিং এর ভিতর – বিচিত্র সম্ভারে পূর্ণ। ক্রেতার সংখ্যা প্রচুর, বিক্রেতার সংখ্যা একেবারেই কম। এখানে কেউ চুরি করে না, জালিয়াতি করে না। সিসিটিভি ক্যামেরা তো লাগানোই আছে। পরের দিন রোববার আমরা দ্বিতীয়বার উমরাহ্‌ করতে গেলাম। এবারের উমরাহ্‌র সংগী হলেন সুলাইমান। ডাক্তার তাহের সাহেবের পরিচিত বাঙ্গালী ছেলে। অতিশয় ভদ্র। ছোট বেলা থেকে মক্কায় থাকে তার বোনের সঙ্গে। লেখাপড়া আরবীতেই করেছে। ট্যাক্সি চালায়। নিজের গাড়ি। সেই ছেলেটি আমাদের সঙ্গে গেল। এবারও উমরাহ্‌ করবার জন্য ইহরাম বাঁধার প্রয়োজন পড়ে।  যেহেতু আমরা এখন মক্কা শহরের ভেতরেই অবস্থান করছি, সেহেতু আমরা তানাইম নামক মসজিদে প্রবেশ করি। সেখানে দুই রাকাত নফল নামায পড়ে উমরাহ্‌ পালনের নিয়ত করি। এই মসজিদটির আরেকটি নাম আছে। তা হচ্ছে আয়েশা মসজিদ। তারও একটি ইতিহাস আছে। এখান থেকে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে মক্কা শরীফে  প্রবেশ করি। বিধি মোতাবেক সব কাজ সমাধান করে বের হয়ে আসি। 

বায়তুল্লাহ শরীফ (কা’বা শরীফ) হতে ফিরে এসে বাসায় বিশ্রাম করে বিকেলে বাজার দেখতে গেলাম। বাজারগুলো আজান পড়ার সংগে সংগে বন্ধ হয়ে যায়। প্রত্যেকে তখন নামাজ পড়ে যে যেখানে থাকে। এর কোন ব্যতিক্রম নাই। নামাজ শেষে পুনরায় মার্কেটের দরজা খুলে যায়।

পরের দিন দেখা হলো আরাফাতের ময়দান। বিরাট প্রন্তর। সারি সারি তাঁবু – শত শত। পাহাড়ের কোল ঘেঁষেও অনেক তাঁবু। গাছপালা আছে যথেষ্ট। তবে বিরাট বৃক্ষ নজরে পড়ে নাই। নিম গাছের প্রাচুর্য্য আছে। একস্থানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আরাফাতের ময়পদানে পা রাখলাম। বাঁদিকে মুজদালেফা –কাঁকড় পাথরে পূর্ণ। এই পাথরই শয়তানের উদ্দেশ্যে নিক্ষিপ্ত হয়। একুশটি করে পাথর এক একজন হাজী সাহেব সংগ্রহ করেন। সেগুলো সাতটি করে তিন শয়তানের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করেন। বিরাট আকারের তিনটি শয়তানের প্রতিকৃতি (জামারা) নির্মাণ করা আছে। বড় শয়তান, মাঝারি ও ছোট শয়তান। এবং তিনদিন এই কঙ্কর মারতে হয়। হজ্জ্বের সময় প্রচন্ড ভিড় হয়। আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন একটি মানুষও দৃষ্টিগোচর হলো না।

কবরস্থান দেখার আগ্রহ আমার সবসময়ই। ফেরার পথে একটি কবরস্থানে যাত্রা বিরতি হলো। এই কবরস্থানের নাম জান্নাতুল মওয়া। তৃণ পল্লবহীন মাটির সমতল  প্রান্তর যেন শস্য বপনের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। এখানে হজরত খাদিজা (রাঃ) এবং আরো বড় বড় ব্যক্তি এবং বীরদের দেহ সমাহিত রয়েছে। কিন্তু কোন চিহ্ন নেই। সবই সমান, নীরব নিস্তব্ধ। অথচ এর নীচে কত পূণ্যবান মানুষ শায়িত আছেন অন্তহীন শয্যায়। সেখান হতে চলে গেলাম হেরা পর্বতের পাদদেশে। নাম তার জবলে নূর। এই হেরার গুহায় বসে আমাদের প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) আল্লাহ্‌র ধ্যানে মশগুল থাকতেন। বিবি খাদিজা এই বিপদসংকুল উচ্চ পাহাড়ে আরোহণ করে নবীজীকে আহার –সামগ্রী পৌঁছে দিতেন প্রতিদিন। এখানে দীর্ঘ সাধনার পর তাঁর ওপর ওহী নাজিল হয়। “ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাকা, খালাকাল ইনসানা মিন আলাক। ... পড়, পাঠ কর তোমার প্রভুর নামে, যিনি মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে কলমের সাহায্যে শিক্ষাদান করেছেন।”     

হেরা পর্বতের একদম গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে দেখলাম কত নর নারী ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাচ্ছে। সেই গুহা দর্শন করবার মানসে। মানুষগুলোকে এত ক্ষুদ্র দেখাচ্ছিল যে পোষাকের রঙ দেখে মানুষকে সনাক্ত করা হচ্ছিল। আমার আফসোস! আরো কম বয়সে আসলে আমরা হেরা পর্বতের গুহা দর্শন করবার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারতাম। এই হেরা পর্বতের পাদদেশের অদূরেই রয়েছে হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর জন্মস্থান। ছোট্ট একটি বাড়ি। প্রাচীর ঘেরা। জন্মস্থানের কক্ষটি বন্ধ থাকে। পাশে একটি লাইব্রেরী সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। বাইরে থেকে দেখে চলে এলাম। সরু পাহাড়ি রাস্তা। দু’পাশে ছোট ছোট দোকানপাট। পাশে, পেছনে, উপরে বিরাট বিরাট পাথরের চাঁই শাখা মেলে আছে। সূর্য অস্ত যায় যায়। রাস্তায় লোকজন নেই বললে চলে। প্রকৃতি শব্দহীন মৌন। বাসায় ফিরে এলাম। সাথে করে নিয়ে এলাম স্মৃতি যা চিরকাল অন্তরে মুদ্রিত থাকবে।  

উমরাহ্‌ করবার পর বিদায়ী তাওয়াফ করতে হয়। সূর্যের কিরণ প্রখর থাকায় সকালের দিকেই যেতে হলো। সেদিনও সুলাইমান সাথে। সুলাইমান বললেন, আজ পায়ে হেঁটে তাওয়াফ করবার চেষ্টা করেন। তেমন ভীড় নেই। আর যদি নাই-ই পারেন, তখন হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করা যাবে। সেদিন সেই লোকটির সাহস দানের দরুণ কা’বা ঘর তাওয়াফ করলাম। যাবতীয় নিয়ম মেনে সাত বার প্রদক্ষিণ সমাপ্ত করে কা’বা ঘর সংলগ্ন খালি জায়গায় দুই রাকাত নামাজ পড়বার খুব ইচ্ছে হয়। প্রচন্ড ভীড়ের জন্য সেখানে ঢোকা সম্ভব হচ্ছিল না। দ্বিধায় পড়ে গেলাম। হঠাৎ জনতার চাপে আমরা সেখানে ঢুকে গেলাম। দাঁড়িয়ে দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করলাম। এখানে নামাজ পড়লে লক্ষগুণ সোয়াব বেশী পাওয়া যায়। মাত্র দুই তিন ফিট দূরে সামনে এগিয়ে গিয়ে কা’বা ঘরের গায়ে হাত দিয়ে স্পর্শ করি। দেহমনে এক অপূর্ব পূণ্যময় অনুভূতির সৃষ্টি হয়। অন্য সকলের মত আমারও চোখের কোল বেয়ে অশ্রুধারা নামতে থাকে। 

কা’বা  শরীফ ধরে মনপ্রাণ খুলে পরম করুণাময়ের নিকট ক্ষমা চাইলাম। নিজের, পরিবারের, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বান্ধব সকলের  জন্য সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করলাম। মন হলো আমরা এই জনসমুদ্রে থেকেও যেন পৃথিবীতে ছিলাম না। অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে, যেন সৃষ্টিকর্তার নিকটবর্তী হয়েছিলাম। যদিও তিনি সর্বদা আমাদের সাথেই আছেন। কি অপূর্ব আকর্ষণ কা’বা  শরীফের। ছেড়ে আসতে ইচ্ছা করে না। মনে হয় আরো ধরে থাকি কিছুক্ষণ।ভীড়ের চাপে সরে আসতে হলো। কত ভাষাভাষীর নারী পুরুষ। কিন্তু তাদের হৃদয়ের ভাষা এক রকম। যখন উচ্চারণ করে লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক – আমি হাজির আছি তোমার দরবারে –তখন এক স্বর্গীয় অনুভূতি প্রতিটি মানুষকে অন্য এক অপার্থিব জগতে নিয়ে যায়।

 তাওয়াফ শেষ করে সিঁড়িতে গিয়ে বসলাম। সেখানে জমজমের সুশীতল পানি পান করে প্রাণ জুড়ালো। বসে বসে দীর্ঘক্ষণ কা’বা  ঘরের দৃশ্য অবলোকন করলাম। চোখ ফেরানো যায় না। সেই ছোটবেলা থেকে যে ছবি দেখে এসেছি আজ তা চোখের সামনে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে যে কা’বা  শরীফের দিকে মুখ করে নামাজ পড়ি – তা মাত্র কয়েক গজ দূরে। এইমাত্র ছুঁয়ে এলাম। কি এক চৌম্বক শক্তির বলে কেবলই  দেখতে ইচ্ছা করে। ভাল লাগায় হৃদয় মন আপ্লুত, তৃপ্ত। পরের শুক্রবারে আবার জুমার নামাযের সময়  দেখতে পাব এই আশা নিয়ে ঘরে ফিরে এলাম

সেদিন বিকেলে গাজা এলাকায় বাজার করতে গেলাম। জায়নামাজ, তসবীহ, আতর –এসব জিনিসপত্র ক্রয় করে বাসায় ফিরে আসি। পরের দিন বৃহস্পতিবার বিকেলে মক্কা শরীফে এশার নামাজ আদায় করলাম। বেশী ভেতরে প্রবেশ সম্ভব ছিল না। প্রচন্ড ভীড়।  নামাজের  পর হোটেল হিলটনে ঘুরতে গেলাম। বিরাট বাজার! । বহুসংখ্যক এসকেলেটর বেশ দ্রুত গতিতে সারাক্ষণ উঠানামা করছে। আমার কন্যা হুমায়রার বলা মতো ‘গাজাজ’ নামক মার্কেটে প্রবেশ করলাম। নীচের তলায় বিরাট দোকান। চোখ ধাঁধানো আলো। তৈজস-পত্র মনকাড়া –তবে অগ্নিমূল্য।

আমার হাঁটার সমস্যা ছিল বলে বহু কষ্টে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে পৌঁছালাম। ট্যাক্সি পেতে একটু দেরি হলো। কারণ সকলেরই তখন নীড়ে ফেরার তাড়া। পরদিন শুক্রবার। জুমার নামাজ পড়তে হবে। আগে ভাগেই রওনা হতে হলো। কিন্তু যে ভীড়, সেই ভীড়। কোন কম নেই। বাইতুল্লাহ্‌ শরীফের পাশেই মসজিদের অভ্যন্তরে অবস্থান গ্রহন করলাম। দলে দলে মহিলা মুসুল্লিগণ এসে কাতারে দাঁড়ালেন। মুহূর্তে ভরে গেল সুদৃশ্য কার্পেট বিছানো নামাজের স্থান। মহিলাদের একদিক, পুরুষদের অন্যদিক। তবে সকলেই কা’বামুখী। সুদূর বাংলাদেশ থেকে আমরা যে কেবলামুখ হয়ে নামাজের জন্য দাঁড়াই –সেখানেও তাই। পার্থক্য এই যে কা’বাঘর বা কিবলা মাত্র কয়েক গজ দূরে –চোখের সামনে। কালো আচ্ছাদনের উপর সোনার সূতায় কোরানের আয়াত লিপিবদ্ধ করা আছে। তাও হাতের কারুকাজ মন্ডিত –ছাপার অক্ষর নয়। বিশেষ পরিবার কেবল এই কাজেই নিয়োজিত থাকে। সারা বৎসর ধরে এই কালো আচ্ছাদনের উপর অত্যন্ত তমিজের সাথে এই সূক্ষ্ম চারুশিল্পের চর্চা করেন তারা, সুন্দর আকর্ষণীয় রূপে তৈরী করেন। দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যায়। অন্তর আত্মা এক আধ্যাত্মিক অনুভূতিতে পূর্ণ হয়। ক্লান্তি আসে না। মনে হয় আরো দেখি, আরো চেয়ে থাকি। এত কি জাদু আছে জানি না, তবে আছে এক অনির্বচনীয় আকর্ষণ ও সন্তুষ্টি।

জুমার নামাজের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি সবাই। এরই মাঝে যে যার মতো নামাজ পড়ছেন, কোরান পাঠ করছেন। ওখানে মসজিদের ভেতর বিরাট বিরাট পিলারের গায়ে শেলফ আছে। তাতে রক্ষিত আছে অনেক কোরান শরীফ। যে যার যার মত গিয়ে পাঠ করছেন আবার সুন্দর ভাবে সঠিক স্থানে রেখে দিচ্ছেন। অগণিত মানুষ। সকলের উদ্দেশ্য এক! চিত্ত মহান আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে নিবেদিত। বিনয়ী, নম্র, ভদ্র, কারো কোন অহংকার নেই। 

জুমার নামাজ শুরু হলো। নামাজ শেষে মন প্রাণ ঢেলে প্রার্থনা করলাম। সুখে দুঃখে চিত্ত ভারাক্রান্ত। এগিয়ে গেলাম আরো সামনের দিকে যেন কা’বা ঘর ভালোমত দেখতে পাই। এমন সময়ে সামনের কাতারের একজন ইরানী মহিলা আমাকে একটি রুটির বড় টুকরা দিলেন। আমি কিছুতেই নেব না। তবুও তিনি ও তারা আমাকে সেটি জোর করেই দিয়ে দিলেন। শুকরিয়া জানিয়ে সম্মুখপানে এগিয়ে গেলাম। ইংরেজী জানেন বলে মনে হলো না। সামনে অগ্রসর হয়ে রওশন আরা ভাবীর সঙ্গে দাঁড়ালাম। নির্নিমেষ নয়নে কা’বা ঘর দেখতে থাকলাম। ততক্ষণে আমার স্বামী মোহাম্মদ হারুন এবং ডাক্তার তাহের ভাই আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। স্বচক্ষে কা’বাঘর দেখার সৌভাগ্য আর কোনদিন হবে না। তাই দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বাইতুল্লাহ্‌ শরীফের অপরূপ শোভা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। ফেরার পথে একটি তুর্কী রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করি। অনেক বাঙ্গালী কর্মচারী। আরবী বলছে অনর্গল। খাবারও আমাদের পছন্দের সঙ্গে মেলে। অনেকটা মোগলদের স্টাইল। মজাদার খাবার সংগ্রহ করে বাসায় ফিরে এলাম।

সেদিন রাতে মোটামুটি এবং পরেরদিন শনিবার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম। শনিবার মধ্যরাতে আমাদেরকে জেদ্দা বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে বের হতে হবে। সময় মতো সুলাইমান ট্যাক্সি নিয়ে হাজির। তাহের ভাই আমাদের সঙ্গে। তিনি এত পরিশ্রম ও এবং সহযোগিতা করেছেন যা কল্পনার অতীত। তার সহযোগিতা পেয়ে আমরা যেন সত্যি স্বর্গরাজ্য ভ্রমণ করে এসেছি।  জেদ্দা বিমান বন্দরে ভি.আই.পি., লাউঞ্জে খুব সুন্দর ব্যবস্থা। বসার ব্যবস্থার পাশেই টিভি স্ক্রিন, খাবার, ফলমূল, চা, কফি অঢেল। একটুক্ষণ পর ভোর হলো। দোর খোলার প্রশ্ন নেই যদিও। কারণ দরজা সব খোলাই। টিভি স্ক্রিনে আমাদের বিমানের ফ্লাইট নাম্বার এবং ছেড়ে যাওয়ার সময় দেখাচ্ছে। আমরা বাসে উঠে বিমান বন্দরের ভেতর দিয়ে সাউদিয়া এয়ার লাইন্সের বিমানের সিঁড়ির নকটবর্তী হলাম। ধীরে ধীরে এক পা, এক পা করে মক্কার মাটি পেছনে ফেলে জাহাজে আরোহণ করে বরাদ্দকৃত সীটে গিয়ে উপবেশন করলাম। উল্লেখযোগ্য যে, এই সীটেই বসেই আমরা জেদ্দা গিয়েছিলাম। আমাদের সামনে আর কোন সীট ছিলনা।

এবার বিমান উড্ডইয়নের পালা। উচ্চতা ভীতি আমার আগেও ছিল, এখনো আছে। যথারীতি সীট বেল্ট বেঁধে আল্লাহ্‌র নাম স্মরণ করে , দোয়া দরূদ পড়তে পড়তে উর্ধ্বাকাশে উঠে গেলাম। বিমানে খুব যত্ন করেছে এয়ার হোস্টেসগণ। সুস্বাদু খাদ্য পানীয় সরবরাহ করেছেন প্রচুর। আপ্যায়নের অন্ত নেই। অপরাহ্নে ঢাকা এয়ারপোর্টে অবতরণ করলো আমাদের বিমান। ক্রুদের ধন্যবাদ জানিয়ে বিমান থেকে বেরিয়ে এলাম বোর্ডিং ব্রিজের মধ্য দিয়ে। দাঁড়ালাম কনভেয়ার বেল্টের পাশে। মালপত্র এসে পৌঁছাল হাতের কাছে। দুটি ট্রলিতে সেগুলো তুলে নিয়ে আমরা দু’জন অগ্রসর হলাম নির্গমনের পথ ধরে। হঠাৎ দেখি আমাদের নাতনী ছোট্ট ফারহিন আর তার বাবা ববি হাস্যমুখে দডায়মান।  ছোট্ট ফারহিনকে তার বাবা, বারের ওপর দিয়ে এপাশে ছেড়ে দিল। সে ছোট্ট হাতে আমাদের ট্রলি ঠেলতে সাহায্য করলো। পুত্র কায়সার হারুন ববি নিয়ে এলো আমাদেরকে বাইরে। গাড়ি ডাকলো। বাক্স পেট্‌রা গাড়িতে তুলে আমরা মহাখালী ডি ও এইচ এস (DOHS)এর বাসার দিকে রওনা হলাম। বাসায় অপেক্ষা করছিল পুত্রবধূ তানিয়া ও অন্যান্যরা । সবাইকে দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। শান্তির নীড়ে আপনার জনের মাঝে ফিরে এলাম।।

...

অগাস্ট ২০১১, ঢাকা             


Monday, February 21, 2011

একুশে ফেব্রুয়ারি

২১ শে ফেব্রুয়ারি
৮ ই ফাল্গুনে এসেছিলে তুমি
পলাশের মালা পরি’।

সেই কবে
’৫২–র পড়ন্ত বিকেলে
রমনার মাঠে জড়ো হয়েছিলে
বাংলার দামাল ছেলে।

দস্যু করে ধন লুন্ঠন, তস্কর করে
সামান চুরি
ভাষা লুন্ঠন?
শুনিনি কখনো
এ জগতে নেই জুড়ি!

ভাষার জন্য প্রাণ দিল যারা
অকৃপণ অকাতরে
সাহসের বীজ বুনে দিল তারা
শহীদ মিনারে।

বাংলার ছেলে প্রাণ দিয়ে গেল
মায়ের ভাষার তরে
সোনার আঁখরে লেখা রবে নাম
বাংলার ঘরে ঘরে।

সালাম বরকত রফিক জব্বার
শফিক আরো কতজনা
দিনে দিনে কত রক্ত দিয়েছে
নাম তার নাই জানা।
ত্যাগের শীর্ষে উচ্চে উঠিল
বাঙ্গালী বীর সেনা
(আজ) শুধিতে হচ্ছে রক্তের ঋণ
আরো ছিল যত দেনা।

মায়ের মুখের ভাষার জন্য
দিয়ে গেল যারা প্রাণ,
গাইবো তাঁদের গৌরব গাথা
রাখবো ভাষার মান।

Friday, December 31, 2010

কাফেলা

 নদীর স্রোতের মত মানুষের জীবন। মহাকালের পথে সতত  বহমান, সঞ্চরমান। মানুষের জন্ম হয় বিধাতার ইচ্ছায়। শুরু হয় যাত্রা। ব্যক্তি পর্যায়ে তার যাত্রার বিরতি আসে। কিন্তু মহাকালের যাত্রায় নিত্য নব নব যাত্রী এসে সেই যাত্রায় যোগদান করে। এ যাত্রা অগণিত মানুষের যাত্রা চলছে তো চলছে, যেন কাফেলা। তীর্থ যাত্রীর দল। মানুষ মরে যায়, চলে যায়, না জানে কোথায়! তবুও চলতে থাকে বিয়ামহীন। তাতে কাফেলার কলেবর বিন্দুমাত্র হ্রাস পায় না। এই চলার পথের পথিকেরা কেউ সুস্থ, সবল, কেউ অবলা দুর্বল, অসুস্থ। তবুও বাধ্য হয়ে তাকে চলতে হচ্ছে। আর তো উপায় নেই, আর তো পথ নেই।

মানুষের জীবনে ঘাত –প্রতিঘাত আসে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জীবন হয় জর্জরিত। ক্রমাগত জীবন সংগ্রাম জীবনকে করে পর্যদুস্ত। মানুষের মধ্যে ষড়রিপু বাস করে। তার মধ্যে আছে মাৎসর্য নামে এক রিপু। সেজন্য দুর্বল যারা, দরিদ্র্য যারা, তারা সবলের হস্তে হয় নিপীড়িত, নির্যাতিত। অনাদিকাল হতে আজ পর্যন্ত এবং ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া চলে আসছে, চলতে থাকবে। 

এই যাত্রী দল ‘দুর্গম গিরি, কান্তার মরু’ পার হয়ে চলতে থাকে সমুখ পানে। পেছনে ফেরার উপায় নেই। যাত্রীদের ধারণা পথ চলায় যত শ্রম, যত ক্লেশ, ততই পূণ্য অর্জন। পূণ্য অর্জন যদি নাই হবে, পহ চলা যে বৃথা হবে। অর্জনের ঝুলি থাকবে শূন্যতায় ভরা। সময়ের পথ চলতে চলতে অনেকে অবসাদ গ্রস্ত হয়। মিছিলের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনা। কারো গতি হয় শ্লথ, কেউ পড়ে যায়। কেউ আর উঠে দাঁড়াতে পারে না। 

যাত্রীদের কাউ হয়তো তার সুহৃদের জন্য ক্ষণিক দাঁড়ায়। কিন্তু স্রোতের টানে তিষ্ঠাতে পারেনা। ‘মোছাফির মোছ রে আঁখিজল, ফিরে চল আপনারে নিয়া।’ চোখের জল মুছে পথ চলতে থাকে সে। পথের ধূলিতে কে পড়ে রইল, কে চলে গেল চিরতরে, তার খোঁজ রাখতে পারেনা। 

পুরাতন চলে যায়। নতুন আসে। বিশ্ব বিধাতা সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষার জন্য এ বিধান তৈরী করেছেন। বিধাতার সংসারে সকলে তার সৃষ্ট জীব। সেখানে মাতা নেই, পিতা নেই, পুত্র নেই, কন্যা নেই। সকলেই আল্লাহ্‌র বান্দা। সৃষ্টি লীলার অংশ। যাদেরকে আমরা মাতা –পিতা  বলি তাদের মাধ্যমে তিনি তার সৃষ্টির ধারা বজায় রাখেন। সন্তান প্রকৃত পক্ষে পিতামাতার নিকট আল্লাহ্‌ তায়ালার আমানত। মা –বাবা মমতার বন্ধন দিয়ে সন্তানকে আল্লাহ্‌ তায়ালার অনুগত বান্দা হিসাবে গড়ে তোলেন। কি সমতলে, কি পাহাড় –পর্বতের পাদদেশে মানুষের সাধনা হয়ে দাঁড়ায় সন্তানকে সুশীল মানুষ হিসাবে গড়ে তুলবার। পরবর্তীকালে এই ছেলেমেয়েরাই ভবিষ্যতের মানুষ জন্ম দিয়ে যাবে বংশানুক্রমে। তারাও এ তীর্থ যাত্রীদের কাফেলায় শরীক হবে। সারা পৃথিবী জুড়ে এই কাফেলা চলতে থাকবে নিরবচ্ছিন্ন, নিরলস গতিতে। তারা কারও জন্য অপেক্ষা করবে না। কারো জন্য থেমে থাকবে না।‘Let the dog bark and the caravan pass.’এ প্রসঙ্গে কাহলিল জিবরান তাঁর The Prophet গ্রন্থে বলেছেন, ‘তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়। তারা প্রবাহিত জীবনের আকুল প্রত্যাশার পুত্র –কন্যা। তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, কিন্তু তোমাদের ভেতর জন্ম নেয় না। তারা যদিও তোমাদের সাথে থাকে, তারা তোমার সম্পদ নয়।’ পিতা মাতার মাধ্যমে তারা আসে, তারা চলে যায়। তাদের বংশধরেরা একই পথ অনুসরণ করে তাদের প্রতিনিধি রেখে যায়। তাদেরো সেই একি পরিণতি। ওমর খৈয়াম তাঁর রুবাইয়াতের এক জায়গায় বলেছেন, ‘যদি নিয়ে নাও প্রভু তোমার বান্দাকে, তবে সৃষ্টি করবার কি প্রয়োজন ছিল? ’ বংশ পরম্পরায় সকল বান্দা মৃত্যুর অধীন। তবে জন্মানো কেন? বিশ্ব বিধাতার লীলা খেলা অংশ মানুষের জন্ম –মৃত্যু। আর তা একজন ব্যক্তি মানুষের সমগ্র জীবন। 

জীবনে কাছে এবং দূরে বহু মানুষ দেখেছি। তাদের জীবনের সুখের কথা, দুখের কথা শুনেছি। হাতে হাত রেখেছি, কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়েছি, অনেক পথ হেঁটেছি একসাথে, ফুল তুলেছি, গান গেয়েছি। পথ চলতে চলতে একজন, একজন, করে কে যে কোথায় হারিয়ে গেল! জানতে পারিনি। যারা একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তারা অনেকে আজ নেই। 

কোথায় তারা? 

যেদিকে তাকাই কেবল নতুন মুখ, অচেনা, নামহীন, পরিচয়হীন জনতা। তবুও আঁখি কেবল খুঁজে ফেরে সেই পুরাতন সহযাত্রীদের মুখ। যদি কখনও দু’একজনের সাক্ষাৎ পাই, একে অপরকে শুধাই কোথায় তারা? সেই প্রশ্নের উত্তরে ওই সমুখের গোধূলি লগ্নের সন্ধ্যাতারার দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে বলে, নাই নাই সে পথিক নাই। ঐ আকাশের তারাদের মাঝে ভীড় করে আছে। রেখে গেছে কেবল পদচিহ্ন – তাদের কীর্তি জীবনের বালুকা বেলায়।       

এই অভিযাত্রীদের মিছিল, এই কাফেলা তার পরিপূর্ণ দলবল নিয়ে ধীরে ধীরে সমুদ্র স্রোতের ন্যায় চলতে থাকে। কে গেলো, কে এলো; তার খোঁজ রাখে না। প্রতিদিন কত মানুষ –এই কাফেলা যাত্রী – মরে গিয়ে পথের ধূলায় লীণ হয়ে যাচ্ছে! আবার কতজনা জন্মগ্রহন করে এই কাফেলায় শরীক হচ্ছে। এটাই নিয়ম। এই দীর্ঘ মিছিলের যেমন শুরু নেই, তেমন শেষও নেই। 

কোন্‌ সাগরের তীরে মানুষের তীর্থ তা সে জানে না। তবুও পুণ্য লাভের আশায় মানুষ ঐ তীর্থ যাত্রী পথিকের দলে ভিড়ে যায়। তারপর একদিন বৃক্ষের হরিদ্রাভ পত্রের ন্যায়, পরিপক্ক ফলের ন্যায়, বৃন্ত হতে বিচ্যুত হয়ে ভূতলে পতিত হয়। সহযাত্রীর নয়ন ভরে উঠে জলে। ‘যেতে নাহি দেব –তবু চলে যায় ।’ আর আসে নাকো ফিরে। এভাবেই চলবে। একদল এই কাফেলায় যোগদান করবে, অন্যদল ঝরে পড়বে। কাফেলায় যাত্রীরা কেউ চিরস্থায়ী নয়। কেউ আসে, কেউ যায়। কাফেলার কলেবর ঠিক থাকে। সে চলবে চিরকাল। 

‘এ পথ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়।’ থেমে যাবার পথও নয়। জীবনের যা কিছু অর্জন, তার কষ্টার্জিত সম্পদ, যক্ষের মত বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল, সব ছেড়ে সে চলে যায়। ক্লান্ত, শ্রান্ত পথিক আক্ষেপ করে বলে, 

‘হায়রে হৃদয়, তোমার সঞ্চয়,

দিনান্তে, নিশান্তে, শুধু পথপ্রান্তে, 

ফেলে যেতে হয়।            

নাই, নাই, নাই যে সময়।’

............

১১.১.১১ 

Tuesday, December 15, 2009

জীবনের বাঁকে

 শেষ পর্যন্ত মালিহার পোস্টিং অর্ডার এলো। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক পল্লী গ্রামের কলেজে। মালিহা ইচ্ছে করেই এরকম একটি অদ্ভুত স্থানে চলে এলো। এই কলেজে কয়েকটি মাত্র মেয়ে পড়ে। আর বাকী ছাত্ররা সব আশে পাশের কয়েক গ্রামের। মেয়েদের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ কম্পাউন্ডের ভেতরেই দু’টি রুম নির্দিষ্ট করে রেখেছে। সেই মেয়েদের কামরাতেই মালিহার থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এ কলেজটি সরকারি কলেজ। অনেক সুযোগ দিয়েছে সরকার। কিন্তু শিক্ষকের বড়ই অভাব। এই পাড়াগাঁয়ে কেউ থাকতে চায় না। মালিহার মন্দ লাগে না। গ্রামীণ পরিবেশ। গাছপালার মর্মর ধ্বনি, চারিদিকে সবুজ শ্যামল শস্যক্ষেত্র। অনেকে ভাবে এ মহিলা এখানে কেন? কিন্তু কেউ জানে না মালিহা তার পরিচিত জগৎ থেকে পালিয়ে এসেছে। 

কাজে দক্ষ বলে মালিহাকে সকলে সমীহ করে। এখানে একজন অংকের প্রফেসর আছেন, তিনি অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য তদবীর করেন না। তিনি কলেজের জন্য খুব পরিশ্রম করেন। কলেজে প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপাল নেই।। কারণ এখানে শহরের কোলাহল নেই, বিজলী বাতির চমক নেই। সেই কাক ডাকা ভোরে মালিহার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুরে ঘুরে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে। ‘ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে’- দিনের সূর্যোদয় দেখে। আর দেখা হয়, ‘একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিশির বিন্দু!’

কালক্রমে দেখা যায় অংক স্যার নাসিরুদ্দিন আর মালিহাই কলেজ চালান। অন্য বিষয়ও তাদেরকে পড়াতে হয়। শিক্ষক যায় বদলি হয়ে, নতুন শিক্ষক আসে। ছাত্র ছাত্রীরা পরীক্ষা দিয়ে চলে যায়, নতুন ছাত্র ছাত্রী আসে। স্থায়ী থাকে দু’জন মাত্র। মালিহা আপা, নাসিরুদ্দিন স্যার। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। 

মজার বিষয় এরা দুজন দুজনকে চেনে। কিন্তু পরিচয় জানে না। একদিন নাসিরুদ্দিন বললেন, আপা, আপনার পরিচয় জানা হয়নি। মালিহা বলেন, পরিচয় আমার আহামরি কিছু নয়। ঐ চাকুরীর খাতায় যা লেখা আছে তাই।

– তবুও আরো কথা থাকে।

– আমার সবকিছু থাকা সত্ত্বেও আমি এক নীড়হারা পাখি।এই জন–অরণ্যে আমি একা। পথ হারিয়ে এই নিভৃত পল্লীর কোলে ঠাঁই খুঁজে পেয়েছি।

– আপনি এত হাসি –খুশী, এত কাজ করেন, দেখে মনে হয় না আপনার কোন দুঃখ আছে।

– দুঃখ আমার নেই। তবে অপমান বোধ আছে। একজনকে আশ্রয় – প্রশ্রয় দিয়ে আমি প্রতারিত হয়েছি।  

– যদি আপনার আপত্তি না থাকে তবে আমাকে বলতে পারেন।

– আপনাকে বলে আমার কি লাভ? আপনি কি আমার মনের ভার লাঘব করতে পারবেন? আপনার পরিচয় তো আমার জানা নেই। আগ্রহও জাগেনি। মনে হয় যারা একা থাকে তাদের একটা অতীত আছে। 

– নাসিরুদ্দিন চুপ করে থাকে। নিজের মগ্ন চৈতন্যে কোথায় যেন বেদনার সুর বেজে উঠে। তারপর বলে, আপা, যদি অজান্তে আপনাকে কষ্ট দিয়ে থাকি তার জন্য ক্ষমা চাই। 

– ক্ষমা চাওয়ার মত অপরাধ করেন নি। স্বাভাবিক জীবন যাদের, তাদের গল্প –সল্প আলাদা। তারা জীবনের সুখ –দুঃখের কথা আপনা থেকে অনর্গল বলে যায়। আপনার আমার মত দরজায় অর্গল এঁটে রাখে না। আমার জীবনে অনেক কথা নেই, অনেক ঘটনা নেই। তবে যা ঘটেছে তা মর্মান্তিক। আমি ছোটবেলা থেকে একজনকে চিনতাম। স্কুলের নীচের ক্লাস থেকে। তারপর বহুদিন গত হয়েছে। ইউনিভার্সিটিতে পড়বার সময়ে আবার তার সঙ্গে দেখা হয়। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে মেলা –মেশা একটু বেশী হয়ে গেল। ভাবলাম প্রেমে পড়েছি। সেও তাই ভাবলো। আমার চাইতে তার আগ্রহই অধিক। আমি তা সত্য বলে মেনে নিলাম। পাশ করে বের হলাম উভয়েই। ভাল রেজাল্ট বলে তার ভাল চাকুরী হল। আমি পেলাম শিক্ষকতা। তার আর বিলম্ব সইছে না। সুতরাং পরিবারের দ্বারস্থ হতে হল। উভয় পরিবারের সম্মতি ক্রমে আমাদের সাজানো গোছানো ঘর –সংসার হলো। সুখে, আনন্দে, শান্তিতে দিন যেতে লাগলো। বছর দুয়েক কেটে গেল স্বপ্নের ঘোরে। এবার পরিবারের কলেবর বৃদ্ধির চিন্তায় আমরা বিভোর। সব কাজে তারই উৎসাহ অন্তহীন।

– আমরা ক্লাবে, পার্টিতে যাই। খুব মজা করি। একবার পরীক্ষার খাতা নিয়ে খুব ব্যস্ত। বেশ কিছুদিন যে কোথা দিয়ে গেল! এই সময় তাকে বেশ উদাসীন মনে হতে লাগলো। প্রশ্ন করলে উড়িয়ে দেয়। অল্পদিনের মধ্যে তার আমার দূরত্ব বৃদ্ধি পায়। আমি নিজের দোষ খুঁজে বেড়াই। হঠাৎ একদিন বলে, আমার পোস্টিং হয়ে গেছে।     

– বদলি হয়েছ, কোথায় ? 

– চট্টগ্রামে।      

– হঠাৎ বদলি কেন?

– আমি আর এখানে থাকবো না। কালই চলে যাব।

মনে পড়লো সেদিন সে বাসায়ই ছিল। অফিসে যায়নি। আমি ছিলাম কলেজে। এরই মাঝে তার যা কিছু সব গুছিয়ে রেখেছে। আগে কোনদিন কাপড় –চোপড় , বাক্স গোছাতে জানতো না। এবার খুব ভালভাবে পেরেছে। অবাক হয়ে বললাম, এত তড়িঘড়ি পোস্টিং অর্ডার এলো কেন? কি করেছ অফিসে?

- কিছুই করিনি। আমি যেতে চেয়েছি, তাই যাচ্ছি।  

আরো বিস্মিত হয়ে বললাম, কেন? কি বলছো এসব? 

পরে তোমার সব কথার উত্তর দেবো, আজ নয়। বলে ঘুমিয়ে পড়লো। পরদিন সে চলে যাওয়ার পর আমি আমার টেবিলের উপর ডিভোর্স লেটার পেলাম। বিশ্বাস করতে পারিনি। ঘটনার আকস্মিকতায় জ্ঞান হারালাম।সেদিন ছিল ছুটির দিন। দুপুরে আমাদের বাড়ির লোকজনদের ডেকেছিলাম একসংগে লাঞ্চ করবো বলে। তারা এসে আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় আবিষ্কার করে। শুশ্রূষা করে। জ্ঞান ফেরে আমার। বিকেলে অবস্থার উন্নতি হলে ইকবাল কোথায় তারা জানতে চায়। আমার মনে পড়ে গেল সব কথা। আমি তাদেরকে চিঠিটি দেখতে বললাম।তারাও বিস্ময়ে নির্বাক। কি করে বুঝাই যে কিছুই হয়নি, কোন ঘটনা ঘটেনি। আমার ভাইয়েরা ইকবালের অফিসে খোঁজ নিতে গেল। এক অবিশ্বাস্য সংবাদ সংগ্রহ করে আনলো।ইকবাল কারো বাগদত্তাকে নিয়ে পালিয়ে গেছে দেশের বাইরে। চট্টগ্রামে নয়। চাকরীতে সে বেশ কিছুদিন আগেই ইস্তফা দিয়েছে। আমি আবার মূর্ছিত হয়ে পড়লাম। 

একটানা এত কথা বলে মালিহা থামলো। নাসিরুদ্দিন ও এরকম একটি গল্পের আকস্মিকতায় নির্বাক। মনে মনে খুবই বিব্রত বোধ করল। ভাবলো, এরকম প্রশ্ন করা মোটেই উচিত হয়নি। কেউ আর কোন কথা না বলে উঠে যার যার গন্তব্যে চলে গেল। কেন যেন অনেকদিন পর মালিহার চোখে অশ্রু এলো। বঞ্চনার যন্ত্রণায় অধীর হলো। মেয়েদের হোস্টেলে এসে হাতমুখ ধূয়ে শয্যায় আশ্রয় নিল। ছাত্রী রুমমেটরা আপার বিষন্নতায় বিস্মিত। তারা চা-নাস্তা তৈরী করে নিয়ে এলো। জানতে চাইলো আপার শরীর খারাপ কিনা। জবাবে বললেন, তেমন কিছু নয়। বাড়ির কথা মনে পড়ছে। একমেয়ে সাহস দিয়ে বললো, সামনে তো রমজানের ছুটি আছে, তখন বাড়ি যাবেন। চা পান করলো মালিহা। মেয়েদের খোঁজ –খবর নিল। 

মেয়েদের সর্বপ্রকার তত্ত্বাবধান মালিহা করে থাকেন। কারণ প্রিন্সিপাল, ভাইস –প্রিন্সিপাল ক্ষণস্থায়ী। বদলী হয়ে এ কলেজে আসার পর পরই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দরজায় ধর্না দিতে থাকেন অন্যত্র চলে যাবার জন্য। মালিহার মনে হয় এ কাজটি খুবই খারাপ। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। এ দিকটিতে কারো মনোযোগ নেই। যে কিছুদিন থাকেন, কলেজে না পড়িয়ে প্রাইভেট টিউশানী করে চলে যান। 

সপ্তাহখানেক পর। নাসিরুদ্দিন আর মালিহা কলেজ শেষে গল্প করছিলেন। নাসিরুদ্দিন বললেন, আপা, সেদিন আপনার সঙ্গে কথা বলে সারারাত ঘুমাতে পারিনি। কেবলই মনে পড়ছিল, কোথায় যেন আপনার ঘটনার সঙ্গে আমার জীবনের ঘটনার মিল রয়েছে। আপনার অনুমতি পেলে বলতে পারি। মালিহা বলেন, অনুমতি দিলাম।   

নাসিরুদ্দিন বলতে লাগলেন, আমার জীবনের ঘটনাও খুব মর্মান্তিক। আমি যখন অনার্স পড়ি তখন ট্রেনে একদিন ইডেন কলেজের একটি ছাত্রীও ভ্রমণ করছিল। আলাপ হলো। জানতে পারলাম আমরা একই গন্তব্যের যাত্রী। স্টেশনে নামবার পর মেয়েটির গার্জিয়ান বললো, আপনি যখন আমার এলাকার ছেলে, এরপর নুসরাত আপনার সংগেই আসা যাওয়া করবে। নুসরাত আমার অনেক জুনিয়র। কয়েক বছর ধরে তাকে নিয়ে যাতায়াত করতে হলো নিজের বড় ভাইয়ের মত। সে দেখতে শুনতে ভাল, হাসিখুশী। ঝর্ণার মত চঞ্চল, উদ্দাম, উচ্ছ্বল। আমি চুপচাপ বলে প্রায়ই সে অভিযোগ করে। ঢাকায় আমি তার লোকাল গার্জিয়ান। আমার পড়াশুনা শেষ। সে তখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। তাকে নিউমার্কেট নিয়ে যাওয়ার বায়না ধরে। আমার অস্বস্তি বোধ হয়। শেষ পর্যন্ত আমাদের মেলামেশা শুরু হয়। সে বলে, আমার পড়াশুনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি কোথাও যাবেন না। বললাম, চাকুরী করতে হবে না?

- চাকুরী করবেন, বিয়ে করবেন  না? 

- চাকুরী না থাকলে বিয়ে করবে কে?  

- আগে চেষ্টা করে দেখেন, তারপর বলবেন।

- বৃথা চেষ্টায় কাজ নেই। মেয়ে খোঁজার চাইতে চাকুরী খোঁজার প্রয়োজন অধিক। পাত্রী তো পথে ঘাটে পড়ে থাকে না।

- পড়ে থাকে। দেখতে পান না আপনি? দেখার চোখ থাকতে হয়।

- একদিন ও না দেখিলাম তারে। কোথায় আছে সে?

- আমার চোখের দিকে তাকান। সেখানে যার ছায়া ভেসে উঠবে সেই হবে আপনার পাত্রী। আপনি তাকে খুব চেনেন।

- কই দেখছিনা তো? চোখের মণি দেখা যাচ্ছে।

- কেন আমাকে দেখছেন না? আমি কি অদৃশ্য, অশরীরি?

- তুমি? 

- হ্যা আমি। এবং আমিই, আর কেউ নয়, কোন ভাবেই নয়, কোনদিন নয়, কোন কালেই নয়। চিরকালের আমি! কোনদিন যদি আমাকে ছেড়ে গেছ!

সে আমাকে জড়িয়ে ধরে রইলো। তার বক্ষের হৃদস্পন্দন আমার বক্ষে সঞ্চারিত হলো। আমি সুপ্তিমগ্ন থেকে জেগে উঠলাম। দেখলাম নুসরাতের চোখে পানি।

- কাঁদছো কেন?

- কাঁদবো না, আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। আমি মরে যাব, আমার পড়াশুনা হবে না, জীবন নষ্ট হবে। আমি কি ভাল মেয়ে নই? খারাপ কোনদিক?

- নিশ্চয়ই ভাল মেয়ে। কোনদিন কিছু বলেছি?

- তবে কেন আমার সঙ্গে ভাইগিরি কর?

চিন্তায় পড়ে গেলাম। লোকে কি ভাববে? ওর গার্জিয়ান হয়ে ওকে দখল করে নিয়েছি! কিন্তু বেশী চিন্তা করবার সুযোগ পেলাম না। সে আমাক এত কথা বলতে লাগলো, এত আব্দার করতে লাগলো, যে আমার সকল বাধা চূর্ণ –বিচূর্ণ  হয়ে বন্যার স্রোতে ভেসে গেল। সে নিজে উদ্যোগী হয়ে বিয়ে ঠিক করে ফেললো। দুই পরিবারের সম্পর্ক দেখলাম বেশ জমে উঠেছে। ইতিমধ্যে তারও ইউনিভার্সিটির চৌকাঠ অতিক্রম করা হয়ে গেছে। আমি একটি কলেজে চাকুরী করি। বাসা ভাড়া করে থাকি। সে আমার বাসায় আসে প্রতিদিন বিকেলে। গোছগাছ করে। চা তৈরী করে নিজে খায়, আমাকে দেয়। সে তখনও হোস্টেলে থাকে। চাকুরীর খোঁজে অফিসে এবং অন্যান্য স্থানে ধর্না দেয়। এভাবে সম্ভবতঃ তখনই কারো সাথে তার পরিচয় ঘটে। সে কথা বলে প্রচুর। সাহসী মেয়ে। ছিনিয়ে নিতেও জানে, মারিয়ে যেতেও পারে। আমি তা পারিনা। শেষের দিকে তার কি যেন ব্যস্ততা থাকতো। আমার কাছে তেমন আসতো না। বলতো একটু বিরহ সহ্য কর। না চাইতে জল পেলে তেষ্টা মিটে যায়। 

তার সাজগোজের সখ। দুই পক্ষের কেনাকাটা হয়েছে প্রচুর। বিয়ের অনুষ্ঠান ঢাকায় হোক, তাই তার পছন্দ। সুতরাং সেভাবেই বন্দোবস্ত করা হয়। বিয়ের দিন বিবাহ –বাসরে অতিথিরা সবাই হাজির। কনের দেখা নেই। তিনি গিয়েছেন বিউটি পার্লারে। অভ্যাগতদের আর কত বসিয়ে রাখা যায়। খাবার পরিবেশন করা হয়। খাওয়া শেষে সবাই প্রায় নববধূকে না দেখেই চলে যায়। সময়টা ছিল দুপুরে। দুই পরিবারের লোকেরা কনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এমন সময়ে হন্তদত হয়ে তিন মেয়ে ছুটে এলো। তারা নুসরাতের সংগেই ছিল। তারা যে সংবাদ পরিবেশন করলো, তা অবিশ্বাস্য, মর্মান্তিক। তাদের বক্তব্য হচ্ছে নুসরাত সাজগোজ করতে অনেক সময় নেয়। তারপর ঘড়ি দেখে নেমে আসে নীচে। একটি বেবি ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল। সে তার ভিতর ঢুকে পড়ে তার স্যুটকেস সহ। সঙ্গীদের বলে তোমরা অন্য বেবি ট্যাক্সি ভাড়া করে আস। তিন মেয়ে হতভম্ব। একটু দূরে গিয়ে ট্যাক্সি থামে। কাকে যেন ত্বরিত তুলে নেয়। তিন মেয়ের কাঁপুনি শুরু হয়। তারাও দ্রুত এসে বিবাহ আসরে উপস্থিত হয়। প্রথমে দেখে নুসরাত পৌঁছেছে কি না। তারপর বরকে প্রশ্ন করলো সে কিছু জানে কিনা। কোথায় যেতে পারে, কোথায় গেল। সঙ্গে অনেক গহনা, টাকাপয়সা আর কাপড় চোপড়। কিড্‌ন্যাপড্‌ হয়েছে কিনা। তিন মেয়ের কান্না আর সকলের বিমর্ষ ভাবে ক্যমিউনিটি সেন্টারে এক বেদনা বিধুর পরিবেশের সৃষ্টি হলো। সব বিল শোধ করে ওরা সবাই বাসায় ফিরে এলো। এমন সময় একটা ফোন এলো। এক অপরিচিত লোকের কন্ঠ। আমি নুসরাতকে নিয়ে ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছি। নুসরাতের বাবা নুসরাতের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। নুসরাত বললো, আপনারা আমাকে চেনেন। আমি স্বেচ্ছায় ইকবালের সঙ্গে সহযাত্রী হয়েছি। ঐ মুখচোরা নাসিরুদ্দিনের সাথে নিরানন্দ জীবন কাটানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এ লোক আমারই মত, আমার উপযুক্ত। আমার পথ আমি খুঁজে পেয়েছি। আমার সিদ্ধান্তে আমি অটল। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের ফ্লাইট। 

শুনে সকলের প্রাণবায়ু বহির্গত হওয়ার উপক্রম। কান্নার রোল পড়ে গেল। বিশেষ করে কনের মা ও বোনেরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো। নাসিরুদ্দিন বরের পোশাক খুলে ফেললো। নুসরাতের বাবা মাকে সান্ত্বনা দিল। বললো, আপনারা আজকের ঘটনার জন্য দায়ী নন। তারা বললো, নুসরাত বাটপারের পাল্লায় পড়েছে। তোমার মত ছেলে সে কোথায় পাবে। নাসিরুদ্দিনের আত্মীয়েরা সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে গ্রামে ফিরে গেল। বলে গেল তোমার কোন চিন্তা নাই। কবুল তো ভাগ্যিস পড়া হয়নি। যে যাই বলুক, নাসিরুদ্দিন জানে গত পাঁচ বছরে তাদের কত কথা, কত স্বপ্ন, কত স্মৃতি। কেউ জানে না ভুলে যাওয়া এত সহজ নয়। ‘ভুলে যাওয়ার কঠিন সংকল্পই মনে রাখার প্রবল সহায়ক।’ নাসিরুদ্দিনের মনে পড়লো, অতীতের ঘটনা আমি ঘটাই নি। স্মৃতির আগুনে দগ্ধ হতে হবে চিরকাল। চিরকুমার থাকবো। বৌ খুঁজতে আর যাব না কোনদিন। ‘দৃষ্টিপাত’ –এর আধারকারের কথাগুলো তার জীবনে সত্য হলো, ‘প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে মহিমা।  কিন্তু প্রবঞ্চিতকে দেয় কি? তাকে দেয় দাহ। যে আগুন আলো দেয় না, অথচ দহন করে।’ এই পাড়াগাঁয়ে বেশ আছি। ঐ বাঁশ বনের ধারে লেকচারারদের জন্য দুটি কুড়ে ঘর বাঁধা আছে। একটি উঠান, একটি ইঁদারা, একটি রন্ধনশালা। রাতে যখন ঐ বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ ওঠে তখন মনে হয়, স্বর্গের বাগানে বিরাজ করছি। বসে বসে তার রূপসুধা পান করি। স্বপ্নের ঘোরে চলে যাই। অন্য প্রফেসাররা থাকলে তাদের সঙ্গে আনন্দলোকের গল্প করে সময় কাটাই।

নাসিরুদ্দিন থামলেন। শ্রোতা মালিহা নির্বাক। এই তো সেই ব্যক্তি যে তাকে প্রতারনা করেছে। তার ক্ষেত্রে ইকবাল প্রচন্ড উৎসাহী, উদ্দাম। মালিহা শান্ত, স্নিগ্ধ, বিশ্বাসী। ভাগ্য যাকে মারে তাকে রক্ষা করে কে?

মালিহা, নাসিরুদ্দিন দুজনেই শান্ত, সৎ, কর্তব্যপরায়ণ।কাজ করতে ভালবাসেন। সারা বছর কলেজের কাজে ব্যস্ত থাকেন। দুজনের জীবনের প্রতারণা আর বঞ্চনার গল্প শুনে তাদের পরস্পরের জন্য কেমন একটা সহানুভূতির মমতা জাগে। নাসিরুদ্দিন একদিন বলেন, মালিহা আপা, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেন না? মালিহা নীরব থাকেন। তারপর বলেন, ভবিষ্যৎ চিন্তা করে কি লাভ? এইসব ইতিহাস নিয়ে নতুন করে পাত্র খোঁজা, ভাল মন্দের পরীক্ষা দেয়া এসবে আর রুচি নেই। আআর মন আমারই থাক।কারো কাছে বন্দক রাখার দরকার কি? নির্ঝঞ্ঝাট জীবন, শান্ত নদীটির মত –যেমন আপনার।

- উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমারও নেই, আপনারও নেই। তবুও পাশাপাশি বন্ধুর মত থাকলে মন্দ কি? না হয় বন্ধুর মত দুঃখ সুখ ভাগ করে নিলাম। জীবন কাটিয়ে দিলাম নদীর আপন স্রোতের মত। 

- তাকে কি জীবন বলে? এক সঙ্গে থাকলে অনেক স্বার্থ, অনেক আশা, অনেক পাওয়া –না পাওয়ার প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। তখন আনন্দ বেদনার জীবন তরী বাইতে গিয়ে বৈঠা হয়ে দাঁড়ায় অস্ত্র –একে অপরকে ঘায়েল করতে দ্বিধা করে না। আপনার আমার অতীতে কোন টানা পোড়েন ছিলনা। বিনা মেঘে নীলাকাশের কোল থেকে বজ্র পড়ে সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে গেল। ওরা তো সুখেই আছে – আমার ইকবাল, আপনার নুসরাত। আপনি আমি নির্বাসিত জীবন যাপন করছি। আগেকার দিন হলে আন্দামান অথবা নিকোবরে গিয়ে আশ্রয় নিতে হতো!

- আমার তো বলার কিছু নেই। আপনি চিন্তা করে দেখেন। আমাদের তো এখানে অনেকদিন থাকা হলো। আমরা অন্য কোথাও বদলী হতে পারি। এ জীবন থেকে অন্য জীবনে পলায়ন।‘হেথা নয়, অন্য কোথাও অন্য কোনখানে।’

মালিহা গভীর ভাবনার মধ্যে পড়ে গেল। ইকবাল কত ভাল ছেলে ছিল। সেই তাকে ত্যাগ করলো। আর একে তো চেনেই না। কেমন ভবিষ্যৎ? আবার যদি দুঃখ আসে, রাখবে কোথায়? তবে লোকটিকে তার পছন্দ। একসঙ্গে জীবন যাপন করতে গেলে যে জিনিসের প্রয়োজন হয়, তার নাম সহমর্মিতা, বিশ্বাস আর ধৈর্য। নাসিরুদ্দিনের তা আছে। নাসিরুদ্দিনের চিন্তা, ভাবনা কম নয়। সে মালিহাকে সুখে রাখতে পারবে কিনা। মালিহা শান্ত মেয়ে। বঞ্চনার বেদনায় তার অন্তর  নীল হয়ে আছে। সে যন্ত্রণা সে লাঘব করতে পারবে কিনা। বেশ কিছুদিন এভাবে গত হলো। একদিন মালিহা বললো, ঠিক আছে, চলেন সামনের গ্রীষ্মের ছুটিতে আমাদের বাড়িতে যাই। তার আগে পোস্টিং চেয়ে দরখাস্ত দিয়ে যাই। এখানে প্রিন্সিপাল, ভাইস –প্রিন্সিপাল, আরেকজন প্রফেসর বদলী হয়ে আসছেন। আমাদের এখন আগের মত দায়িত্ব নেই। 

সে ভাবেই পরিকল্পনা করা হল। ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে আড়ম্বর না করে উদ্বাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। দুই পরিবারের পরিচয় হলো। দুটি প্রাণের গভীর অন্ধকার জীবনে যেন একটি আলোর মশাল জ্বলে উঠলো। ছুটি শেষে তারা কলেজে ফিরে এলেন। থাকলেন আগের মতই। যেহেতু তারা এখানে বহুদিন ধরে চাকুরী করছিলেন, সুতরাং তাদের পোস্টিং আসতে বিলম্ব হল না। একই শহরে। একজন মেয়েদের কলেজে, অন্যজন ছেলেদের কলেজে। যথাসময়ে তাদের বিদায় সম্বর্ধনা এবং নতুন কলেজে যোগদান। এখানে একটি বাসা ভাড়া করে তাদের সংসার জীবন শুরু। অনেকদিন পর মালিহার কেমন জানি অস্বস্তি বোধ হতে থাকে।তবুও তাদের যাত্রা শুরু হয় ভালভাবেই। কলেজের কাজও ভাল চলছে। এর কিছুকাল পরেই তাদের সংসারে নতুন মুখের আগমন ঘটে। একটি পুত্র সন্তান তাদের কোলে আসে। মুখখানা তার অবিকল মায়ের মত। দেখতে দেখতে সে বড় হয়ে উঠে। স্কুল, কলেজ অতিক্রম করে সে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। ইতিমধ্যে মালিহা, নাসিরুদ্দিন নানা স্থানে বদলী হয়েছে।এবার সিনিয়র হিসাবে ঢাকায় বদলী হয়ে আসে। ছেলে আশীস অর্থপেডিক সার্জারিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান করছে। ছোট টি মেয়ে। সে পড়ে বাবার মত অংক। 

ছেলে প্রতিদিন তার রোগীদের কষ্টের কথা বলে, তাদের মানবিক আচরণের কথা বলে।একদিন বললো, একজন পেশেন্ট এসেছে মাল্টিপল্ ফ্র্যাকচার নিয়ে। থাকেন বিদেশে। ত্রিশ বছর পর দেশে এসেছেন বেড়াতে।একদিন সড়ক দুর্ঘটনায় শিকার হন হাইওয়েতে। সঙ্গে থাকা স্ত্রী নিহত হন। ইনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। হাসপাতালে আছেন কয়েক মাস ধরে। খুব কষ্ট তার। আশীসকে তার খুব পছন্দ।তিনি আশীসের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। আশীস তাকে একবার দেখে গেলে তার কষ্ট অনেক উপশম হয়। প্রায়দিনই সে এই অদ্ভুত চঞ্চল রোগীর গল্প বাসায় বলে।রোগী চায় কোন দৈব বলে উঠে দাঁড়াতে। তবে তার অবস্থার এখন  উন্নতি হয়েছে। হাঁটতে শিখেছে ক্র্যাচে ভর করে।বাড়ি গিয়ে দেখবে তার শূন্য ঘর। কান্নায় তার চোখ ছল ছল করে ওঠে। তার একমাত্র পুত্র সাত সাগর পারের নীল নয়নার হাত ধরে আলাদা জীবন যাপন করে। সেই শ্বেতাঙ্গিনী দক্ষিণ এশিয়া লোকদেরকে দু’চক্ষে দেখতে পারেনা।ছেলের সাথে ফোনেই বাতচিত হয়। চেহারা দেখবার সৌভাগ্য আর হয় না। তাদের ইচ্ছা ছিল দেশ থেকে বেড়িয়ে গিয়ে নিজের বাড়িতেই দুজনে জীবন কাটাবে। মাঝে মাঝে এদেশ ওদেশ ঘুরতে যাবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। There is a slip between the cup and the lip. কিন্তু এখন কি হবে? বিলেতে একাকী জীবন যাপন বড় দুঃসহ। দেশে যারা আছে তারা আন্য জেনারেশান। আদর যত্ন করে তারা। তবে ভার নেবার মত কেউ নেই।

সেদিন ভদ্রলোকের প্লাস্টার খোলার দিন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোগী ভদ্রলোক বলেন, আমি গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। একমাত্র তোমার মুখখানা আমার অনন্দের উৎস। মনে হয় তুমি আমার জন্ম জন্মান্তরের চেনা। স্ত্রী নেই, স্বজন নেই। এই বিশ্বসংসারে কোথায় গিয়ে পড়বো! কি পাপ করেছিলাম। আমার কেন এমন হলো? তোমার মুখখানা স্মরণ করে যেন আমার দিনগুল শেষ হয়। তোমার জন্য আমার অশেষ দোয়া থাকবে।

আশীসের মা এই পথে বাড়ি ফিরছিলেন। ছেলের দেরী দেখে ফোন করলেন। জানতে পারলেন আশীস এখনই বাড়ি ফিরবে। মা বললে, চল তোমাকে নিয়ে যাই, তোমার রোগীটিকেও একবার দেখে যাই। মালিহা হাসপাতালে প্রবেশ করলেন। পায়ে পায়ে গিয়ে হাজির হলেন সেই রোগীর কেবিনে। দরজায় নক্‌ করায় আশীস এসে দরজা খুলে দিল। বললো, মা  এই আমার পেশেন্ট। একবার দেখে যাও। ইনার নাম মিস্টার ইকবাল। বড় কষ্ট পেলেন তিনি।

মালিহা একদৃষ্টিতে পেশেন্টের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন –ইকবাল! এতকাল পরে চেহারা চিনতে একটুও দেরী হয়নি। অন্তরের অন্তঃস্থলে ইকবালের চেহারা একটুও ম্লান হয়নি। যদিও বয়সের চিহ্ন ধারণ করেছে। ইকবালেরও তাই। তারও ইচ্ছা করছিল সেই বহুকাল পূর্বের মত মালিহা বলে চিৎকার করে ওঠতে। 

আশীস ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত। কেউ কোন কথা বললেন না! কোন সাধারণ কুশল বিনিময় পর্যন্ত নয়। দুজনেরই কন্ঠ রুদ্ধ। তাদের মধ্যে কোন অমিল বা বিরোধ ছিলনা। তবুও ভাগ্য তাদের টেনে দুদিকে দুজনকে ছিনিয়ে নিল। এর কি নাম কে জানে? হয়তো বা নিয়তি! তারপর সম্ভাষণ বিনিময় ব্যতিরেকেই মালিহা কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হলেন। ইকবাল আশীসকে ডেকে বললো, তোমার মা কে আমার সালাম দিও। মায়ের সঙ্গে তোমার চেহারার বড্ড মিল। এবার তুমি আস। অনেক রাত হলো। তোমার মা অপেক্ষা করছেন। আশীস বেরিয়ে গেল। ইকবালের চোখে অশ্রুর বান এলো। মনে পড়তে লাগলো অতীতের সেই সোনাঝরা দিনগুলো। তবুও এতবড় অন্যায় কাজটি করেছিল একটি উদ্ভ্রান্ত উচ্ছৃঙ্খল মেয়ের জন্য। কি জানি কি ছিল বিধাতার মনে! তারই পাপের ফল তাকে বাকী জীবন ভোগ করতে হবে। 

মালিহা বাসায় ফেরে। বাধ ভাঙ্গা কান্নার স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অচিন গাঙ্গের স্রোতে। অশীস কম্পিউটার নিয়ে বসে তার কাজে। নাসিরুদ্দিন লক্ষ্য করে মালিহার বিষন্নতা। জানতে চায় কোথায় কোন বিভ্রাট ঘটেছে কিনা। মালিহা ব্যালকনিতে গিয়ে বসে। নাসিরুদ্দিন তার পাশে। মালিহা ব্যক্ত করে তার অগ্নিদগ্ধ হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কথা। কেমন করে দুজন প্রতারক দুটি ভাল মানুষকে প্রবঞ্চিত করে অনায়াসে আরেকটি নৌকায় উঠে চলে গেল। পিছনে পড়ে রইলো দুজন আধারকার, যারা সেই ‘দিপ্তীহীন অগ্নির নির্দয় দহনে পলে পলে দগ্ধ হলেন।’

বিধাতা বড় নাট্যকার। মালিহা নাসিরুদ্দিনের মিলন, আর আজকের এই নাটকীয় সাক্ষাৎ একেবারেই অপ্রত্যাশিত। নাসিরুদ্দিনের বক্ষ পিঞ্জরে সেই একই ঝড়। তার নুসরাত এখন পরলোকে চলে গেছে। বলার মত আর কিছুই ছিল না। দুজনে উদাস দৃষ্টি মেলে সুনসান শূন্য গলির দিকে তাকিয়ে রইল। 

.......

১৬.১২.২০০৯        


Thursday, January 1, 2009

ফারহিন মণির জন্মদিন

ডিসেম্বরে বয়ে যায় শীতের বাতাস,

কুয়াশায় ভরা ছিল ঢাকার আকাশ।

২০০৮ সালের দোসরা ডিসেম্বর,

আমাদের ঘরে এলো অনিন্দ্য সুন্দর।

১৪১৫ সালের অগ্রহায়ণ মাসে

১৮ তারিখ পড়ে মঙ্গলবারে এসে।

১৪২৯ হিজরী সালের শেষ চাঁদ এলো,

৩রা জিলহজ্জ্ব দিনে খুকু জন্ম নিলো।

প্রথম ক্রন্দন ধ্বনি পশিল কর্ণকুহরে,

সেই ধ্বনি শুনে সবে দোয়া দরূদ পড়ে।

হেমন্তের ঘুম ভাঙা প্রথম প্রহরে,

ঘড়ির কাঁটা তখন দশটার ঘরে।

খুকুমণি কেঁদে বলে আমি এসেছি,

সকলের সাথে মোর রাখি বেঁধেছি।

এসো এসো খুকুসোনা এসো মোর ঘরে,

স্বাগত জানাই সবে আবেগে আদরে।

তোমার কান্না,কান্না তো নয় সুখের বারতা বলে,

চেয়ে দেখি খুকুমণি দোলে বাবার কোলে।


ফুলের কুঁড়ির মতন মুখখানি তার দেখে,

আশীর্বাদের পরশ দিয়ে কোলে নিলাম ঢেকে।

কুয়াশার চাদর তুলে দেখি তার মুখ,

অপার আনন্দে মোর ভরে গেল বুক।

একয়টি মাস, খুকু ছিল মায়ের সঙ্গে মিশে,

এবার যে এসে গেল নতুন একটি দেশে।

বড় হয়ে শুনতে পাবে জন্মকথা তার,

বুঝতে পারবে কি সম্পর্ক মায়ের সাথে তার।

কদিন পরে এলো সময় নামকরণের দিন,

মা বলেন তার কন্যার নাম হবে ফারহিন ।

নামটি তার বড়ই মধুর অর্থটিও ভাল,

সুখ সমৃদ্ধির আলো দিয়ে ঘর করবে আলো।

তোমরা সবাই প্রাণ ভরে করো আশীর্বাদ,

ফারহিন যেন সারা জীবন পায় সাধুবাদ।

জন্ম হোক ধন্য ফারহিন, জীবন হোক অনন্য,

নিজেকে ফুটিয়ে তোল সকলের জন্য ।।

 


ফিরোজা হারুন (দাদী)

ফারহিনের একমাস পূর্তি উপলক্ষ্যে রচিত

২রা জানুয়ারি,২০০৯ , ভোর ৩টা৩০


Saturday, June 14, 2008

বাবা দিবসের কিছু কথা


চলমান সময়ের ধারা বেয়ে সামনে এলো বাবা  দিবস। অশ্রুতপূর্ব শব্দ হলেও বাবাদের জন্য সুখবরই বটে। তাদেরকে স্মরণ করবার কেউ ছিল না কোনদিন। কলুর বলদের মতো ঘানি টেনে জীবনের পথপ্রান্তে এসে কাঁধের জোয়াল খানি ফেলে দিয়ে থেমে যেতেন।  তাদের জীবনের যা কিছু অর্জন সবই পড়ে থাকতো এ মাটির পৃথিবীতে অন্য কারো ভোগের জন্য। আজ সময় বদলে গিয়েছে। তাই বাবা দিবসের কথা শুনতে পাচ্ছি। আমরা এখন পুরাতন, বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া বাবাকে স্টোর রুম থেকে উদ্ধার করে, ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে একবার দেখবার প্রয়াস পাচ্ছি। বাবা ছিলেন পরিবারে হুঁশিয়ার কান্ডারী। আজও জীবিত বাবারা পরিবারের কর্ণধার। ঝড় ঝঞ্ঝা, সিডর অথবা নার্গিস, মানবিক কিম্বা অর্থনৈতিক যে কোন বিপদ থেকে পুত্র কন্যাকে নিজের বক্ষের ঢাল খানি দিয়ে ঘিরে রাখেন। তাদেরকে মানুষের মত মানুষ করবার, সুখী ও সম্মানের জীবন গ্রহন করবার জন্য তার সামর্থ্যের বাইরে চলে যান। সেই বাবাদের স্মরণ করা সত্যি একটি মহত কাজ। কাজ কর্মের ধারা অনুযায়ী বাবারা মায়ের মত সন্তানদের এত কাছাকাছি থাকতে পারেন না, সেজন্য হয়তো বাবাদের সঙ্গে ছেলেমেয়েদের কিছুটা দূরত্ব থাকে। তবুও পিতা পিতাই। বুকের ঢাকনাটি উন্মুক্ত করলে দেখা যাবে অন্তহীন স্নেহ ভালাবাসা সন্তানদের জন্য বয়ে চলেছে নিরন্তর। মাকে যেমন ছেলেমেয়েরা অনায়েসে ডাকে,মা মাগো, কোথায় তুমি? বাবাকে সেভাবে বলতে পারেনা, বাবা, বাবাগো এই যে আমি। দেখ তোমার পাশে আমি তোমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছি। সেই ছোট্টবেলা তুমি যেমন আগলে রাখতে আমাদের, বার্ধক্যে তোমার পাশে আমার আছি। বাবা তুমি মুক্ত করো ভয়, আপন মাঝে শক্তি ধরো-এই ভেবে যে তোমার সন্তানেরা তোমাকে ভালবাসে, তোমার বিষয় সম্পত্তির জন্য নয়, তুমি যে আমাদের সেই স্নেহময় পিতা। শিশুকালে তুমি যেমন আমাদেরকে ছায়া দিতে আজ আমরা তোমার এই বৃদ্ধ-শিশু জীবনে ছায়াতরু হয়ে তোমাকে আগলে রাখব। 
 
বৃদ্ধবয়সে যে পিতা পুত্রের হাত ধরে উঠে দাঁড়ায় তাতে তার গর্ব ও আনন্দের সীমা থাকে না - এই ই হওয়া উচিত বাবা দিবসের  স্মরণীয় বিষয়। কেবল শুভেচ্ছা সহ একখানি সুদৃশ্য কার্ড পাঠালেই চলবে না।
 
১লা আষাঢ় ১৪১৫
১৫ ই জুন ২০০৮
 

Sunday, November 25, 2001

সংলাপ

 পন্ডিত ব্যক্তিরা বলেন, অনন্তকালের মাঝে মহাসমুদ্রের বুদবুদের মত নাকি মানুষের জীবন। জন্ম এবং মৃত্যুর মধ্যবর্তী ব্যপ্তিকালকে জীবন বলা হয়। মহাকালের যাত্রাপথে প্রকৃতপক্ষেই মানুষের স্থিতি অতিশয় অল্প সময়ের। এই অল্পকাল জীবনটুকু একজন মানুষের সারাজীবন, দীর্ঘজীবন, চিরকাল। শৈশব, কৈশর, যৌবন, বার্ধক্য, মোটামুটি এই কয়টি জীবনের পর্ব । ধাপে ধাপে মানব সন্তান এসব পর্ব অতিক্রম করে তার আয়ুষ্কালের নাটকের যবনিকা টানে।

সৌরজগতে গ্রহনক্ষত্র সতত সঞ্চরমান। দিবাবসনে রাত্রি নামে। নিশি অবসানে ঊষার অভ্যুদয় ঘটে। এরই মাঝে মানবসন্তান জন্ম লাভ করতে থাকে। মহাশূন্যে জড়বস্তুরা কে কোথায় তখন অবস্থান করে, কে জানে? তবুও সেই জড় পদার্থ গ্রহনক্ষত্রই নাকি মানুষের জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যুর দিনক্ষণও স্থির করে দেয়। অর্থাৎ তার আয়ু, স্থিতিকাল রচিত হয় । 

এই আয়ু বা স্থিতিকালের মধ্যে মানুষ কি চায়? সুখ চায়, শান্তি চায়, ভালবাসা চায়, দীর্ঘদিন বাঁচতে চায়। বাঁচতে গিয়ে প্রতি পদক্ষেপেই অসুখ, অশান্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয়। লড়াই করে কেউ জয়ী হয়, কেউ হেরে যায়। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে একজন মানুষ হেরে যায় বা জয়ী হয় তা নয়। আর প্রতি মুহূর্তে জয়ী হয় তাও নয়।

Life is a pendulum between joys and sorrows, distress and happiness, hopes and despair. সুখ দুঃখ, শান্তি অশান্তি, জয় –পরাজয়, আশা –নিরাশা এসব পর্যায়ক্রমে মানুষের জীবনে আসে। সুখের পরে দুঃখ, দুঃখের পরে সুখ –এভাবেই জীবন কাটে। কারো সুখের পাল্লা ভারী, কারো বা দুঃখের। সেইদিক দিয়ে কেউ ভাগ্যবান, কেউ ভাগ্যহত। 

জন্মের পর মাতৃক্রোড় এক পরম সুখের স্থান। যারা মায়ের কোল পায় তারা পরম ভাগ্যবান। পরম স্নেহে, পরম নির্ভরতায় স্বর্গীয় বিমল আনন্দে কাটে তাদের শিশুকাল। হাঁটি হাঁটি পা পা করে মাতৃ ক্রোড় ছেড়ে নেমে আসে মাটিতে। তারপর বাটির অঙ্গন ছেড়ে প্রাঙ্গনে। তারপর বাল্যকাল, হাসি আর আনন্দ, খেলাধুলা, অক্ষরজ্ঞান লাভ, বিদ্যালয়ে প্রবেশ। পরে শুরু হয় মহাযজ্ঞ। জ্ঞান অর্জনের তপস্যায় ছাত্রজীবন গ্রহণ। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাপ অতিক্রম করে অগ্রসর হতে থাকে। পদার্পণ করে যৌবনে। যৌবন হচ্ছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। ‘এখন যৌবন যার/সময় হচ্ছে তার যুদ্ধে যাবার।’ জীবনে যা কিছু অর্জন, এই যৌবনকালেই সম্ভব। যে যেমনই ব্যক্তি হোক, তার কিছু প্রাপ্তি –ভাল হোক, মন্দ হোক, সফলতা ব্যর্থতা – সব এই সময়ে অর্জিত হয়।

সুশীল তরুণ, জীবনের একটি লক্ষ্য স্থির করে। সেই লক্ষ্যে সে অগ্রসর হয়। নিজেকে প্রস্তুত করে। বিশেষ কোন লক্ষ্য না থাকলে সেই যুবক পথ হারায়। লক্ষ্য না থাকলে গন্তব্যে পৌঁছাবে কি করে? ধরা যাক কেউ শিক্ষক হতে চায়। তাকে মনদিয়ে বিদ্যা উপার্জন করতে হবে। পাঠ্য বহির্ভূত পুস্তকাদিতে মনোনিবেশ করতে হবে। নিজের অধীত জ্ঞান অন্যকে দান করবার ক্ষমতা আয়ত্ত করতে হবে। ‘যতই করিবে দান, তত যাবে বেড়ে।’ বিদ্যা দান করার মধ্য দিয়ে নিজের জ্ঞানের পরিধি বিস্তার লাভ করে। এভাবে একদিন সে সুশিক্ষক হওয়ার গৌরব লাভ করে।   

অন্যদিকে যদি সেই যুবক কোন রকমে পরীক্ষা পাশ করে আর কোন উপায় নেই বলে শিক্ষকের পেশা গ্রহন করে, তবে তার ফল হবে বিপরীত। জ্ঞানের ভান্ডার তার অপূর্ণ। সুতরাং দান করবে কি? পাঠ্যপুস্তকের একই সিলেবাস সারাজীবন ধরে আউরে তিনি নিঃস্ব হবেন। শিক্ষকতার আনন্দ বা গৌরব লাভ তার কোনদিন হবে না। রিক্ততাই তার জীবনের শেষ পাওয়া হবে। 

এরকম সকল পেশায় মানুষকে দক্ষ ও পারদর্শী হতে হবে। নচেৎ সফলতা আসবে না। সফলতাই জীবনের সুখ। নিজের ও পরের কল্যাণ সাধনই জীবনের সন্তুষ্টি আনয়ন করে। এই সন্তুষ্টিই আনন্দ। আনন্দই সফলতার বার্তা বহন করে। 

অনেকে বলেন গ্রহ, নক্ষত্রই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে। যা ভাগ্যে আছে তাই হবে। সুতরাং সে ব্যক্তির করবার তেমন কিছু নেই। গ্রহ নক্ষত্র আসলেই ভাগ্য স্থির করে কিনা তা জ্যোতিষীরা জানেন। তবে এটি একটি বিতর্কিত বিদ্যা। 

অনাদিকাল থেকে মহাশূন্যে গ্রহ নক্ষত্র নিজেরাই অবিরত ঘুরপাক খাচ্ছে, তাদের কেন্দ্রের মহাশক্তিকে ঘিরে। আবর্তনের নিজস্ব ও নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। ভূ-পৃষ্ঠে ২৪ ঘন্টায় যত মানুষ জন্মগ্রহন করে তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণে এসব গ্রহ নক্ষত্রের কোন ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে হয়না। একই সময়ে জন্মগ্রহনকারী সকল জাতকের ভাগ্য একই রকম হয়না। সেইরকম একই ঘটনার শিকার সকল মানুষের জন্ম একই সময় হয়নি। তবুও অনেকে এসব গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থানের সময়ের সঙ্গে মানুষের জন্মের একটা সম্পর্ক স্থাপন করে দীর্ঘকাল গবেষণা করে তারা এক যোগসূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করে। এরকম একটি চিন্তার চর্চা করে তারা হয়তো একটি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। তবে কবে আসবে সেইদিন যেদিন জ্যোতিষিরা হস্তরেখা দ্বারা অনাগত ভবিষ্যতের সকল তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারবে। সকল বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে মানুষকে, সে আশা সুদূর পরাহত।

ভাগ্যের হস্তে সব সমর্পণ করে কেউ সাফল্যের পথে অগ্রসর হতে পারেনা। যে তরী যাত্রীকে তীরে ভিড়ায় সে তরীকেও চালনা করতে হয়। ভাগ্যে যাই থাকুক, মানুষকে তার অন্বেষণ করতে হয়। God has created food for the birds. But they are to fly for it. জীবনের পথকে নির্মাণ করতে হয়। তবেই সে পথে সে হাঁটতে পারবে তার গন্তব্যে পৌঁছার জন্য। একদিন পথের শেষে এসে দেখবে, ‘বেলা যে পড়ে এলো, জলকে চল।’ সময় শেষ। জীবনের অপরাহ্ন সামনে গোধূলী লগ্নের ম্লান আলো। জল নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা তার হিসাব কষতে হবে। হিসাব বরাবরই ভুল হবে, মিলবে না আর। চুপি চুপি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসবে বক্ষপিঞ্জরের ওপার হতে। তারপর একদিন নিজের চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক, হস্ত –পদ সব বিদ্রোহ করবে। মালিকের কথা আর শুনতে চাইবে না। অধীনস্তদের অধীনে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে। সকল কর্ম সমাপ্ত। চুকিয়ে দিতে হবে সকল লেনা দেনা। তামাম শোধ। বিচরণের পরিধি সীমিত। ক্রমে গৃহকোণ, তারপর শয্যা। পদচিহ্ন আর কোথাও পড়েনা। অপেক্ষা করতে হয় জীবন নাটকের শেষ দৃশ্যের।

‘জন্মিলে মরিতে হবে/অমর কে কোথা কবে,
চিরস্থির কবে নীর/ হায়রে জীবন নদে।’

এ যে চিরন্তন বাণী। অনন্ত কালের ধারায় ক্ষণিকের জীবন। কত সুখ, কত দুঃখ, কত বিচিত্রতার ভিতর দিয়ে অতিক্রম করতে হয়।  একটু সুখের জন্য কত না সংগ্রাম করতে হয়। কঠোর পরিশ্রমে তৃপ্ত হয় এই ভেবে যে একদিন তার পরিশ্রমের সোনার ফসল তার গোলা ভরে দেবে। 

‘জীবন যেন পদ্মপত্রে নীড়।’ মৃদু সমীরণে কত না সহজে ঘটে তার পতন! এ যে অমোঘ, এ যে বিধান। জন্ম, জরা, মরণ!   

     

২০০১


শিশু শ্রম -১৯৯৭