Friday, March 20, 2026

প্রবন্ধ - অনাদি কালের স্রোতে

 সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। আশরাফুল মখলুকাত। এই মানুষ দুই প্রকারের। একজন নারী অন্যজন পুরুষ। পুরুষ শারীরিক শক্তিতে বলবান। নারী অপেক্ষাকৃত নাজুক। পুরুষ সংগ্রামী। নারী আয়েশী ।পুরুষ ও নারীর জীবন দ্বিমুখী । পুরুষ  বহির্মুখী । নারী অন্তর্মুখী। পুরুষ নারীকে নিরাপদে রাখে। নারী সেই নিরাপত্তা পুরুষের কাছে প্রত্যাশা করে। পুরুষ পিতা হয়ে, ভ্রাতা হয়ে, স্বামী হয়ে, পুত্র হয়ে নারীকে নিরাপদে রাখার সংগ্রাম চালায়। 

সেই সুদূর অতীতে যখন আইন ছিল না, সমাজ ছিল না তখন এই পুরুষ তার গোত্রের নারীদের নিরাপত্তা বিধানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। এমনকি আজকের দিনেও এত উন্নতির যুগে পুরুষের সহযোগিতা না পেলে নারীদের অনেক কর্মকান্ডই ব্যর্থতায় পর্যবাসিত হবে । পুরুষের সহানুভূতি, সাহায্য ব্যতিরেকে  নারীদের একার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব না।  তদ্রূপ নারীদের সাহায্য, সহানুভূতি  ছাড়া পুরুষের একার পক্ষে উন্নতির লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব না । এই দুইয়ের সহস্র বছরের সহযোগিতায় গড়ে  উঠেছে আজকের  সমাজ ব্যবস্থা।  যদি নারীর অবদান না থাকতো তবে মানুষজাত আদিম জীবন যাপন করতো। এই সভ্যতার সুবাতাস আজ নর নারীর জীবনে বইতে পারতো না। পুরুষের শক্ত হাত আদিমতাকে আলিঙ্গন করতো। মেয়েদের কোমল হাত শুধু দাসত্ব করার কাজে নিয়োজিত থাকতো। 

প্রকৃতপক্ষে মেধা ও মননে নারী পুরুষের কোন পার্থক্য নেই। বুদ্ধি ও মেধা আল্লাহর দান। পুরুষের মধ্যে মেধা ও বুদ্ধির তারতম্য লক্ষ্য করা যায় । প্রত্যেক পুরুষ সমান নয়। সেরূপ নারীরাও সকলে সমান বুদ্ধিমতী নয়। কেউ বেশী, কেউ  কম। বুদ্ধি ও বৃত্তি প্রসারের ক্ষেত্র পুরুষের সীমাহীন। সামাজিক ব্যবস্থা পুরুষকে কথা বলার অধিকার দিয়েছে বেশী, জানবার সুযোগ দিয়েছে বেশী। শারীরিক শক্তির বরে তার সাহসও বেশী। এসব কারণে পুরুষের জ্ঞান  বৃদ্ধি পায়  এবং জ্ঞান প্রয়োগের কৌশল তার অভিজ্ঞতার ভান্ডার পূর্ণ করে। অপরদিকে নারী স্বভাবে নমনীয়। সামাজিক ব্যবস্থার ফলে নিজেকে প্রকাশ করবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। গৃহে বন্দি থাকার দরুণ 'বাহির' -কে দেখবার বা শুনবার কোন সুযোগ তার নেই। সুতরাং জ্ঞানের  ভান্ডারে তার শূন্যের ছড়াছড়ি। তার যা কিছু জ্ঞান তা পুরুষের  নিকট থেকে ধার করা। কিন্তু লেখাপড়া  জানা থাকলে বই পুস্তকের মাধ্যমে যা সঞ্চয় করা, বাস্তব জ্ঞান থেকে সেই জ্ঞান অনেক কম।  

আদিম যুগে পৃথিবী বৃক্ষলতার জালে পরিপূর্ণ  ছিল। তার  ভেতরেই অন্যান্য প্রাণীদের সঙ্গে ছিল মানুষের বসবাস। অন্যান্য পশু প্রাণীরা ক্ষিপ্রতায় মানুষের চাইতে অনেক পটু। সেজন্য মানুষ প্রাণ রক্ষার জন্য  বৃক্ষশাখায় রাত কাটাতে শেখে। বৃক্ষশাখায় তারা তাদের অবস্থান স্থায়ী করে। তারপর বুদ্ধির জোরে গাছের ডালে ঘর বাঁধে , অবস্থান দৃঢ়  এবং নিরাপদ করে। এতেও মানুষ থেমে থাকলো না। লক্ষ্য করল তারা দুই ধরণের। একটি আদম, আরেকটি হাওয়া । একটি আদমি - পুরুষ, অন্যটি রমণীয় -রমণী ।  তারা আরো বুঝতে পারলো পুরুষ নারীর সঙ্গ পছন্দ করে। নারী চায় পুরুষের পাশে থাকতে। এভাবেই তারা দিবারাত্রি অতিক্রম করছিল। একদিন এক আদিম মানব কি জানি কি মনে করে একটি জংলী ফুল চয়ন করে তার সঙ্গিনীর এলো খোপায় গুঁজে দেয় । এ কাজটি করে তারা দুজনে স্তম্ভিত হয়ে যায়। এটা কি করে হলো ! সেদিন মনুষ্য জাতি সেই  অরণ্যের  অন্যান্য প্রাণীকুল থেকে পৃথক হয়ে গেল। তাদের বোধোদয় হলো  যে তারা সবার থেকে আলাদা, তারা অসাধারণ । তাদের অনেক কিছুই করার ক্ষমতা আছে। 

আদিম যুগে গৃহ রচিত হয়েছিল নারীদের জন্যই। মেয়েরা কোমল। প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকা তাদের জন্য খুবই কঠিন। তাই  পুরুষকে তার নিজের এবং দলের মেয়েদের নিরাপত্তা বিধানের ভার নিতে হয়। নিরাপদ রাখতে হয় হিংস্র পশুর থাবা থেকে এবং অন্য গোত্রের হিংস্র নরের হাত থেকে। কারণ নারী অপহরণ আজকের মতন আদিম যুগেও ছিল। নারীরা তখনো পুরুষের সম্পত্তির মত ছিল। আজকের যুগেও স্বীকার করতে হয় যে নারী পুরুষের সম্পত্তি। যদিও অনেক মর্যাদা আমরা লাভ করেছি, অনেক অধিকারও পেয়েছি। কিন্তু তা পুরুষের ইচ্ছায়। 

নারীরা প্রাকৃতিক ভাবেই মাতৃত্বের অধিকারী। নারীই মাতা । অন্য কেউ নয়। মাতৃত্ব লাভের সময় তার ক্ষমতা একটু সীমিত থাকে। তখন শত্রুদের হাত হতে রক্ষা করতে হলে সার্বক্ষণিক প্রহরায় পুরুষকে নিয়োজিত থাকতে হয়। সেজন্য পুরুষ অনুভব করে গৃহের প্রয়োজনীয়তা। যেখানে তার নারী নিরাপদে অবস্থান করবে। ঝড়, ঝঞ্ঝা স্পর্শ করবে না, জীব জন্তু আক্রমণ করবে না, শত্রুরা হানা দেবে না। সেই চিন্তা থেকেই পুরুষ নির্মাণ করলো গৃহ - সুরক্ষিত, নিরাপদ আস্তানা তার নারীর জন্য। এই নারীই গৃহলক্ষ্মী, গৃহকর্ত্রী। তাই  নারীর নিরাপত্তা সুরক্ষায় পুরুষের গৃহ নির্মাণে নিত্য নতুন কলাকৌশল আবিষ্কার। এর মূলে যে মন্ত্র কাজ করে তার নাম ভালবাসা।  তাই তার ভালবাসার ধন সুরক্ষিত থাকুক, পুরুষ তাই -ই চায়। 

পুরুষ নারীকে ভালবাসে। এটা প্রাকৃতিক ও চিরন্তণ। একজন নারীও ঠিক একই ভাবে একটি পুরুষকে  তার হৃদয় কুসুম দান করে।  সেই জন্য মানুষ চিন্তা  করতে থাকে এই ভালবাসাকে কিভাবে স্থায়ী করা যায়। একে স্থায়ী করবার জন্য একটি বন্ধন তৈরী  করা প্রয়োজন। এই বন্ধনই বিবাহ। এই বিবাহ নারী পুরুষের ভালবাসাকে চিরস্থায়ী করবার জন্য চালু করা হয়েছে। এ রাখী বন্ধন মানুষের  হাজার বছরের তপস্যার ফসল। সমাজ একে স্বীকার করে  নিয়ে অধিকার দিয়েছে। কেউ এই সম্পর্কের মধ্যে ভাগ বসাতে পারে না। কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত এই বিবাহ বন্ধনই নর - নারীর ভাললাগা ও  ভালবাসার  সম্পর্ককে ধরে রাখার একমাত্র উপায়। যদি তাই না হতো তবে মানুষ এতদিনে এই প্রথা রদ  করে  অন্য কোন প্রথা উদ্ভাবন করতো। 

সকল ধর্মেই বিয়ের প্রথা প্রচলিত আছে। সুতরাং নারী পুরুষের পারস্পরিক অধিকার কারো একার নয়। দুজনেরই সমান। নর নারীর মধুর সম্পর্কের একটি সুন্দর কথা বলে গিয়েছেন  আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, 

'নর বাহে হল, নারী বহে জল,  সেই জল-মাটি   মিশে
ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।'

আরো  বলা যায়, 
'নারীর  বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি প্রাণ
যতকথা তার হইলো কবিতা, শব্দ হইলো গান।'

এই চমৎকার কথাগুলো শুনলে পরান জুড়িয়ে যায় । মনে হয় দুনিয়াতে এর চাইতে মহৎ ও সুন্দর আর কিছুই নেই। স্বর্গ যেন আমাদের কুঁড়ে ঘরে এসে ঠাই নেয় । তবে পুরুষ কর্তৃক নারী যে নির্যাতিত হচ্ছে না তা নয়। শিক্ষিত, অশিক্ষিত নির্বিশেষে মেয়েরা অত্যাচারিত  হচ্ছে।  যেখানে ভালবাসা নেই, স্নেহ মমতা অনুপস্থিত, সেখানে নারী অবশ্যই নির্যাতিত।  নির্যাতনের বা পীড়ণের অন্য একটি দিক আছে। সেটি হচ্ছে, যে সবল সে দুর্বলকে কষ্ট দেয়। দেখা যায় দুর্বল সর্বদাই নিপীড়িত, অত্যাচারিত। এমনকি নারীরা যে ক্ষেত্রে সবল, সেখানে দুর্বল পুরুষ বা দুর্বল মেয়ে, অল্প বয়স্করা অথবা গৃহে কর্তব্যরত গৃহ কর্মীরাও  অত্যাচারিত হচ্ছে। সুতরাং পুরুষ মাত্রেই যে নারীকে নির্যাতন করছে তা নয়।  তাই সবচেয়ে বড়  কথা নারীকে যোগ্য হতে হবে। তাকে অবলা হয়ে ঘরে বসে স্বামীর পায়ের নীচে বেহেশতের সন্ধান করলে চলবে না। তাকে মানুষ হতে হবে। কিন্তু কে নেবে সেই ভার, সেই গুরুদায়িত্ব তাকে মানুষ করে তুলবার? এর উত্তর হল শিক্ষা। 

শিক্ষাই একমাত্রও শক্তি যা মানুষকে মনুষ্যত্ব এবং যোগ্যতা দিতে সক্ষম। মেয়েরা যদি শিক্ষিত হয় তবেই তারা তাদের অধিকার স¤\^ন্ধে সচেতন হবে। তাকে মানুষের  যোগ্যতা অর্জন করতে গিয়ে জানতে হবে তার কর্তব্য কি, দায়িত্ব কি। যদি কর্তব্যজ্ঞান তার ভিতর না জাগ্রত হয়, তবে অধিকার সচেতন নারী ঘরে ঘরে কলহ বিবাদের সূত্রপাত ঘটাবে। সেজন্য দেশের সরকারকে নাগরিকদের সুশিক্ষার ভার নিতে হবে। তাহলেই  পুরুষ ও রমণী সুশিক্ষিত হয়ে নিজের নিজের অবস্থান দৃঢ় ও সুন্দর করতে সক্ষম হবে। শিক্ষিত পুরুষ, নারীকে নির্যাতন করা থেকে বিরত থাকবে। 

ধরে নিই যে সব পুরুষ অত্যাচারী।  তাই তাদের সংস্পর্শ সযত্নে পরিহার করা উচিত। অথবা যদি বলা হয়, 'ওহে সতী সাধ্বী নারী সমাজ, তোমরা পুরুষের নির্যাতনের শিকার  হয়ো না, তাদের পরিত্যাগ করো, নিজেরা  আত্মমর্যাদার অধিকারী হও', তাহলে অবস্থা কি দাঁড়াবে? উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত পৃথিবী নামক গোটা গ্রহটি মহিলাদের ক্রুদ্ধ পদাঘাতে প্রকম্পিত হবে। তারা যে ধর্মের বা যে বর্ণেরই হোক না কেন সকলে একযোগে বিদ্রোহ  করবে, মিছিল করবে, শ্লোগান দেবে, অনশন পর্যন্ত করবে। এমনকি বরফের ঘরে বাস  করে যে এস্কিমো নারী, তারাও অনশন থেকে বাদ যাবে না। তারপর নারীকুল বলবে, 'আমরা একা বাঁচতে চাই না, আমরা পুরুষের সংস্পর্শে বাঁচতে চাই। পুরুষ বিনে জীবন প্রাণহীন দেহের মতোই মূল্যহীন । আমাদেরে পরম প্রিয় পিতা, ভ্রাতা, পতি ও পুত্রকে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিও না।' অন্যদিকে যদি পুরুষকুলকে বলা হয়, 'ওহে পুরুষ প্রবর, তোমরা রাফ্ , তোমারা টাফ্। তোমরা জুলুমকারী, আর তারা শস্যক্ষেত্র নয়, তাদের কাছে যেও না, তাদেরকে মুক্তি দাও।' যদি পুরুষেরা সুবোধ বালকের মত এসব বাণী মেনেও  চলে তবে কি হবে? ঠিক সেই  মুহূর্ত থেকে দুনিয়াতে প্রলয় শুরু হবে। বিধাতার  সৃষ্টি  স্তব্ধ হবে। সেদিন যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হবে সে হবে এ ধরিত্রীর শেষ মানব সন্তান। সেসময় থেকে শতকরা পঁচিশ ভাগ মানুষ, যাদের বয়স পঞ্চাশের বেশী তারা আগামী পঁচিশ বছরেরে মধ্যে এ ধরণীর মায়া ত্যাগ করে মারা যাবে। তারপরে পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছরের মধ্যে আরও পঞ্চাশ ভাগ মানুষ শুধু বয়সের কারণে নয় অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারণে মারা যাবে।   ততদিনে মানব সম্পদ কমে আসবে। অরণ্য সম্পদ বৃদ্ধি পাবে। ভূপৃষ্ঠ অনাবাদী জমিতে পরিণত হবে। সভ্যতার কর্ণধার এই মানবজাতির সংখ্যা নগণ্য হতে হতে যান্ত্রিক সভ্যতা বিকল হয়ে পড়বে। শস্য উৎপাদনের জন্য সক্ষম পুরুষেরা বৃদ্ধ হবে। নগর সভ্যতা পরিচর্যার অভাবে অকার্যকর হবে। পানি, বিদ্যুত ,গ্যাস, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, শিক্ষা মুখ থুবড়ে পড়বে। যে মানব গোষ্ঠী কৃষ্টি ও সভ্যতাকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় তার জন্ম রহিত হবে। তাদের কাজ আর কে করবে? বনজঙ্গল জনপদ গ্রাস করবে। যে কয়জন নারী পুরুষ চরম ঘোষণার শেষদিনে জন্মগ্রহণ করেছিল, তারা যদি শতবর্ষের পরমায়ু নিয়েও জন্মায় তবুও তারা বাঁচতে পারবে না। জীবন ধারণের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে। জরা, ব্যাধি ও  মৃত্যু তাদের নিকটবর্তী হবে। 

মানুষ অরণ্য থেকে সভ্যতায় উত্থান লাভ করতে পারে, কিন্তু সভ্যতা থেকে বের হয়ে অরণ্যে বাঁচতে পারে না। তাই পুরুষ রমণীর সেই ভাল থাকার 'সারমান' বা বাণী ঘোষণার পর থেকে সত্তর পঁচাত্তর বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জীব মানবজাতি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। 'দাও ফিরে সে অরণ্য, লহো এ নগর' -রবিঠাকুরের সেই প্রার্থনা বাস্তবে পরিণত  হবে। সৃষ্টির আদিযুগের মত পৃথিবী গভীর অরণ্যে পরিণত হবে। জীবজন্তুর পদচারণায় বনভূমি মর্মর ধ্বনিতে ভরে উঠবে। পাখির কণ্ঠে প্রভুর জয়গানে অরণ্য মুখরিত হবে। নদীর কলোচ্ছাস বহুদূর হতে শোনা যাবে। যদিও নদীর কলগান শোনার জন্য কেউ কান পেতে থাকবে না। মনুষ্যবিহীন পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। প্রতিদিন সূর্যোদয়  হবে। পশ্চিমাকাশ লালিমায় ঢেলে দিয়ে সূর্য অস্তও  যাবে। বাংলার ছয় ঋতুর পরিক্রমা কাউকে পুলকিত করবে না। কেউ দুঃখ পাবে না, কেউ হাসবে না, কেউ কাঁদবে না। কেউ কবিতা লিখবে না , গান গাইবে না, কেউ আর আনন্দ করবে না। কেউ আর  ভালবাসবে না। নারীকে  আর নির্যাতনের প্রশ্নই উঠবে না। সব শেষ - সব শান্ত।  

জল পড়ে পাতা নড়ে -ফিরোজা হারুন

 

ছন্দের হাত ধরে দাঁড়ালো দু’জন।
ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে পাতায় পাতায়
নৃত্যের তালে তালে পাতা দোল খায়।

বৃষ্টির ধারা নামে বাগানের আঙিনায়
জলকেলি করে রাধা, শ্যাম পিছু ধায়।
রিমঝিম বাদলের নূপুরের ছন্দে
চঞ্চলা পায়ে নাচে প্রকৃতি আনন্দে।

বাগিচার এককোণে, 
কে যে বসে বাতায়নে
দেখেছিল বরষার রূপ রস গন্ধ
তন্ময় হয়েছিল মগ্ন দু’দন্ড।

বৃষ্টির গান আর বাতাসের বাদ্য,
বীণাখানি দিয়ে বলে সুর তোল সদ্য।
ছন্দের শিহরণে পুলকিত ‘রবি’
জল পড়ে পাতা নড়ে বলে ওঠে কবি।

ছন্দ নূপুর পরে বাণী পেল প্রাণ,
তালে তালে বেজে ওঠে কবিতার গান।
কাব্যের পরশ পেল কবির অন্তর,
জন্ম লভিল কবিগুরু জাদুকর।

********

 সাহিত্য পর্যালোচনা ১ঃ “জল পড়ে পাতা নড়ে”

“জল পড়ে পাতা নড়ে”—এই বিখ্যাত ছন্দোবদ্ধ পংক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শৈশবকালের প্রথম রচিত পদ্য। বাংলা কাব্য সাহিত্যে এই পংক্তিটি এক বিশেষ ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব বহন করে। ফিরোজা হারুন-এর “জল পড়ে পাতা নড়ে” কবিতাটি ঠিক এই ছন্দ ও পংক্তিকে ভিত্তি করে রচিত, ফলে এতে রবীন্দ্র-ঐতিহ্য ও আধুনিক অনুভবের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে।

সাহিত্যিক গুরুত্ব ও বিশ্লেষণঃ

১. রবীন্দ্রনাথের ছন্দবোধ ও কবিতার জন্ম

রবীন্দ্রনাথের “জল পড়ে পাতা নড়ে” পংক্তিটি বাংলা শিশুসাহিত্যে কাব্যময়তা, ছন্দ ও সংগীতের এক সহজ অথচ অমোঘ প্রকাশ। এটি ছিল তাঁর সৃষ্টিশীলতার সূচনা, যা পরবর্তীকালে বাংলা কাব্যের গতিপথকেই বদলে দেয়।

ফিরোজা হারুন এই ঐতিহ্যবাহী ছন্দ ও ভাবনাকে আধুনিক প্রসঙ্গে টেনে এনে কাব্যিক ব্যঞ্জনা দিয়েছেন এবং শিশুসুলভ সহজতা ও প্রকৃতির মায়া ধরে রেখেছেন।

২. রবীন্দ্র-প্রভাবের শিল্পিত পুনর্নির্মাণ

ফিরোজা হারুনের কবিতায় ছন্দ, প্রকৃতি ও সংগীত—এই তিনটি উপাদান রবীন্দ্র-কবিতার মতোই প্রবলভাবে উপস্থিত।

মূল পংক্তির (“জল পড়ে পাতা নড়ে”) সুর ও চিত্রকল্পকে কেন্দ্র করে তিনি পুরো কবিতায় বর্ষা, পাতার দোলা, বৃষ্টির নৃত্য, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও ছন্দময়তা তুলে ধরেছেন।

রবীন্দ্রনাথের প্রথম পদ্য ছিল সরল এবং স্বতঃস্ফূর্ত; ঠিক তেমনি এই কবিতাতেও সহজতা, স্বাভাবিকতা এবং প্রকৃতির মায়াময়তা বিদ্যমান।

৩. ছন্দের ঐতিহ্য ও আধুনিক সম্প্রসারণ

মূল পংক্তিটি বাংলা ছন্দের এক সহজ উদাহরণ, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে কাব্যের মেলবন্ধন হয়েছে। ফিরোজা হারুন সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক কাব্যভাষায় রূপ দিয়েছেন। তিনি জল ও পাতার মিতালী, বর্ষার আনন্দ, বৃষ্টির সুর, এবং কবিতার জন্মের কাহিনি সাজিয়েছেন ছন্দোবদ্ধ ভাষায়।

এভাবে রবীন্দ্রনাথের ছন্দ-উন্মেষের ঐতিহ্য বাংলার নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন আঙ্গিকে পৌঁছে যায়।

৪. কবিতার আত্মপরিচয় ও কাব্যিক অর্জন

শেষ স্তবকে, “কাব্যের পরশ পেল কবির অন্তর, / জন্ম লভিল কবিগুরু জাদুকর”—এই সরল স্বীকারোক্তি বাংলা কবিতার ইতিহাসে রবীন্দ্র-উন্মেষের মাহাত্ম্য স্মরণ করিয়ে দেয়।

ফিরোজা হারুন বুঝিয়ে দিয়েছেন — ছোট্ট একটি ছন্দ, প্রকৃতির সহজ দৃশ্য, এবং শিশুমনের কল্পনা—সবই মিলেমিশে বাংলা কাব্যের চিরন্তন ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে।

উপসংহার

ফিরোজা হারুন-এর “জল পড়ে পাতা নড়ে” শুধুমাত্র প্রকৃতিবিষয়ক কবিতা নয়, এটি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। মূল পংক্তির সহজ ছন্দ, শিশুসুলভ অনুভূতি, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং কাব্যিক প্রাণ—সবকিছু এই কবিতায় নতুনভাবে ধ্বনিত হয়েছে।

এভাবে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পদ্য ও তার সাহিত্যিক তাৎপর্যকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থ ও আবেগে উপস্থাপন করার জন্য এই কবিতাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

*****

সাহিত্য পর্যালোচনা ২ঃ “জল পড়ে পাতা নড়ে”


Thursday, March 5, 2026

প্রলাপ

সর্বশক্তিমান স্রষ্টার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। সেই মানুষ কখনও এমন পর্যায়ে পড়ে যা সে নিজেই বুঝে উঠতে পারে না। বিংশ শতাব্দীতে মানুষ প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব চালাচ্ছে, মানুষের মনের উপর প্রভুত্ব চালাচ্ছে। একে অন্যের মনও জয় করছে। নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধির বলে অপরের মনের অবস্থা  হৃদয়ঙ্গম করতেও সক্ষম হচ্ছে। জীবনের সকল ক্ষেত্রেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিচ্ছে। অথচ এই বুদ্ধিমান মানবেরও এমন অবস্থা আসে যখন সে নিজে কোথায় আছে, কি ভাবছে, কি করা উচিৎ, কিছুই বুঝতে পারে না। তার অন্তরে সুখ থাকেনা, শান্তিও থাকে না। সে সর্বদা অস্বস্তি অনুভব করে। কিন্তু কেন, কি কারণে সে অপ্রার্থণীয় ‘মনো বেদনা’ তাকে পেয়ে বসে তা সে নিজে বুঝতে পারেনা। মন কি চায় তা সে খোলাখুলি বলতে পারেনা। আত্মার সেই অব্যক্ত ক্রন্দন  কেউ তো শুনতে পায়না। কেবল শুনতে পায় সে নিজে।

কিন্তু কই? সে শোনারও তো কোন অর্থ নেই। সেতো তার কোন অর্থ করতে পারেনা, সেই বেদনার ভাবকে ভাষায় রূপ দিতে পারেনা। কেন পারেনা? সেই কেন পারেনা-র দলে আমিও তো একজন। ধিক!। 

নিজেকে শতধিক! 

কেন আমি আমার মনের অব্যক্ত কথা প্রকাশ করতে পারিনা। আমি তো পাষাণ নই। আমি মানুষ। আমি এই ব্যাধিগ্রস্ত মানুষ হতে নিজেকে পৃথক করে নিতে চাই, কেবল নিজের মনকে দেখার জন্য।

কি সে?

কি চায় সে?

কেনই বা চায়? 

হয়তো তার প্রশ্নের যথার্থ জবাব খুঁজে না পেলেও ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। অনেক সময় বন্ধুদের কাছে আবোল তাবোল বকে যাই। তাদের তা অপ্রিয় লাগে তা জানি। তা জেনেও কেন এমন ভাবে নিজের মনকে সান্ত্বনা দেবার প্রয়াসে কেন অন্যকে উৎপীড়ন করতে যাই? যার কাছে মনের ভাব প্রকাশ করবো, সেই যদি প্রচন্ড মুষ্ঠাঘাত করে, আমার চঞ্চল, কম্পমান, দিশেহারা হৃদয়কে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয়, তবে আমি কি করবো? এমনভাবে বহুদিন আহত হয়েছি। কিন্তু কেন? আর নয়। এবার আমার মানসিক শান্তি, আনন্দ অক্ষুণ্ণ রাখার দায় আমাকেই নিতে হবে। নিজের সুখ, নিজের শান্তির ব্যাঘাত কেন ঘটাব?

হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমিও না সৃষ্টির সেরা জীবদের একজন। তবে কেন এই অন্যায়ের প্রশ্রয় দেব? তাই মনে পড়লো আমার কাগজ আছে, কলম আছে, কালি আছে। তবে কেন আর অন্যের নিকট ব্যর্থ আব্দার করে ব্যথার বোঝা বড় করা? নীরব শ্রোতা হয়ে কাগজের সাদা, পরিষ্কার, পবিত্র বুকে এঁকে যাব আপন মনে। আসবেনা কোন প্রতিবাদ, না আসুক সহানুভূতি।

তাই আজ কাগজ কলমকেই একমাত্র অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করলাম। সে ভুলে যাবে না কিছুই। যেদিন অতীতকে জানতে চাইবো, ঠিকঠিক কথাগুলো সে জানিয়ে দেবে। মিথ্যে বলবে না একটুও। আমার খুব ভাল লাগবে। আজ সারাটা দিনই কেমন মনমরা হয়ে কাটালাম।কোন বিশেষ কাজ করিনি। সময়ের অপচয় বললে দোষ হবে না। নিছক আকাশ কুসুম কল্পনা করেই কাটিয়েছি। আর ভেবেছি মানুষের মন কতই না বিচিত্র। 

কেটেছে একেলা বিরহের বেলা
            আকাশ কুসুম চয়নে
সব কথা এসে শেষ হলো শেষে
          তোমারই দু’খানি নয়নে, নয়নে...

.............................

০৬/০৩/১৯৫৯   

Tuesday, August 19, 2025

এক কৌটা কেরোসিন

 ঝন ঝন ঝনাত –গভীর নিশিথের অখন্ড নীরবতা খান খান করে পিক্‌দানির উল্টো পিঠে রক্ষিত পিতলের কুপিটা বিকট আর্তনাদ করে উঠলো। কুপিটা ছিটকে পড়েছে। পাশের ঘর থেকে শ্বশুর –শাশুড়ি ও একটি শিশু তাল মিলিয়ে পরিবেশটাকে আরো জমকালো করে তুললো। তারপর সমস্বরে ভেসে এলো, 

–‘কি অইছে বউ? কি হইছে? রাইতেও তোমরা একটু শান্তিতে থাকতে দিবা না? কোন কুক্ষণে যে তোমার মত অলক্ষী বউ ঘরে আনছিলাম, তা আল্লাই জানেন।’ ভীত সন্ত্রস্ত বধুটি যথাস্থানে দিয়াশলাই না পেয়ে স্বামীর বালিশের নীচ থেকে তা আবিষ্কার করলো। আলো জ্বালালো। দেখলো আর বুঝতে পারলো যে ঘুমের ঘোরে যে বিড়ালটিকে আঘাত করেছিল, তারই প্রতিঘাতে এই ভীষণ কান্ডের সৃষ্টি। খানিকটা কেরোসিন তৈল গড়িয়ে পড়েছে মাটিতে। প্রকৃত ঘটনা কি তা জানার জন্য পাশের ঘর থেকে বিষমাখা অজস্র প্রশ্নবাণ ছুটে আসছে। শরাহত বধুটি ভীত কন্ঠে ছোট্ট জবাব দিল, ‘কিছু তৈল পইড়া গেছে, মা –জান!’ কিন্তু কথা শেষ হতে না হতেই শ্বাশুড়ীর বেশ কিছুদিনের পুঞ্জিভূত কথার বাণগুলো রুদ্ধমুখ নির্ঝরের মত বাঁধনহারা হয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে ধ্যানী –মৌনী রাত্রির সুগভীর স্তব্ধতাকে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ইথারের তরঙ্গে তরঙ্গে ছড়িয়ে পড়লো। ‘তোমার মত পোড়া কপালী আর কেউ নাই। তোমার কপালের বাতাসে এই কয়মাসেই আমার সংসারের সব ধুইয়া যাইতাছে গা। এই তো সেই দিনকা, কোলের পোলাডার লগে তামাশা কইরা সাড়ে চার টাকা দামের নতুন হারিকেনের চিমনিটা ফাটাইয়া ফেলাইছ। চাইল –ডাইল ধুইবার সময় সের খানিক পানির লগেই থাইক্যা যায়। নবাব সিরাজুদ্দোলার মাইয়া কিনা, হের লিগা কিছু গায়ে লাগেনা।’

তরুণী বধু রাহেলা শুধুই ভাবে আল্লাহ্‌ যদি তার ভাগ্যে তাই –ই লিখেছেন তবে কেন তাকে বধির করে সৃষ্টি করেন নি? আবার ভাবে, বধির হয়ে জন্মগ্রহন করলে, সে যাদেরকে ভালবাসে তাদের আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত থাকতো। তার অতি প্রিয় মানুষটিও বোধহয় শ্বশুর –শাশুড়ির দলে ভিড়ে যেত। না, ঠিক আছে। এমন বকাঝকা শাশুড়িরা বউদের করেই থাকে। তাতে রাগ করবার কি আছে? অনেক রকম চিন্তা করে নিজের মনকে সে বুঝিয়ে বললো, যে, স্বামীর কাছে থাকতে হলে তাকে সবই সইতে হবে। তাই সে রাত্রে স্বামীর ভাষাহীন নীরব সহানুভূতি নিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো।

নিরব পৃথিবী আবার জেগে উঠলো পরদিন প্রভাতে। চোখ মেলে চাইলো।  মুচকি হাসিতে পূর্বাকাশে রাঙা হয়ে উঠলো। ফুল ফুটলো। কিন্তু ঘুম কাতুরে দুটো কুঁড়ি যেন আজ সহসা ফুটতে চাইছে না। ওসমান, রাহেলার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো –শিগগির ওঠো। মা তো অহনাই উইঠা পড়বো। উঠ্‌, উঠ্‌। পাশের ঘর থেকে শিশুর ক্রন্দন ধ্বনি  ভেসে এলো। ধড়মড় করে উঠে বসলো রাহেলা। ওসমান বেরিয়ে গেল। গত রাতের ঘটনা স্মরণ করে রাহেলা শিউরে উঠলো। এত দীর্ঘ দিনটা যে আজ কেমন করে পাড়ি দেবে। পিতৃহীন দুলালী, মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে। তার মা তো তাকে কোনদিনও বকে না। ওসমানও বকে না। তবে ওসমানের মা –বাবা কেন তার ভুল ধরে। 

ক্রমে সূর্যিদেব তার আলোর রথ ছুটিয়ে সব মানুষকে কর্মচঞ্চল করে তুললো। রাহেলার শাশুড়িও জড়তা কাটানোর জন্য বৌকে একই কথা পুনঃ পুনঃ বলতে লাগলো। এক কুপি তেলের দাম দুই আনা। তোমার নবাব বাপের বাড়ি থেইকা আইন্যা ঢালবার পারনা? পরের জিনিসের তো দরদ নাই। এইডা খুব হস্তা! আমার কপালের দোষ। নাইলে এমন অভাগা বউ আইলো আমার ঘরে? খালি খাইবার যম। তোমারে আর রাখতাম না। তোমারে পাঠাইয়া দিমু। 

শেষের বাক্য দুটি রাহেলাকে প্রচন্ড ভাবে আঘাত করলো। দিনের পর দিন যদি তার অপরাধের বোঝা এমনিভাবে বেড়ে যায় –তবে সে কি করবে? তাই সে নিজের ভাগ্যকে বারবার ধিক্কার দিতে লাগলো। যদি তাই না হবে ওসমানের মতো স্বামী কে হারাতে চায়? অজ্ঞানেই হোক আর সজ্ঞানেই হোক, যেখানে একবার ফাটল ধরেছে, তা আর জোড়া দেবার নয়। কাজেই রাহেলা তার ভবিষ্যত চিন্তা করে আকুল হয়ে পড়লো।

দিনান্তে ওসমান বাড়ি ফিরলো। তখন ওসমানের কাছে বউ এর একদফা নালিশ পেশ করা হলো। চঞ্চল পৃথিবী আবার নীরব হলো। রাত্রি নামলো। সে তার সন্তানদের তার ক্রোড়ে আশ্রয় দান করলো। ওসমান আর রাহেলা মিলিত হলো। তারা যেন ক্ষণিকের জন্য দুঃখ ভুলে গেল। অন্যদিনের মত আজও তেমনি জোৎস্না প্লাবিত ছোট্ট আঙ্গিনা পেরিয়ে দিঘীর ঘাটে তারা উপস্থিত হলো। নিত্যকারের মত আলাপ হলো না। শুধু মনের কাছে মন ভীত হলো। কাছে আসতে পারলো না। রাহেলা কেবলই শুনতে পায় –তোমারে আর রাখতাম না। ওসমান বলে, আমি রাখলে তোমারে ছাড়ে কেডা? কিন্ত রাহেলা জানে পারিবারিক ব্যাপারে ওসমানের কোন ক্ষমতা নেই। রাহেলা কোনদিন তার স্বামীর কাছে কোন অভিযোগ জানাতো না। কিন্তু ওসমান সবই অনুমান করতে পারতো। এমনি ভাবে কিছুদিন চলে যায়। কালের পাতায় লেখা ঘটনা মুছে যায় অনেক। কিন্তু শাশুড়ির অন্তর থেকে আধা ছটাক কেরোসিনের দাগ আর শুকায় না। দিনের পর দিন এই বেদনা তাকে পাগল করে তোলে। তাছাড়া প্রতিদিন অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ঘটনা নিয়েও সে এটার আয়তন বৃদ্ধি করে চলছে। রাহেলার কচি মন দিনে দিনে অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে অকেজো হয়ে পড়লো। সে আর কোন রকমেই নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারলো না সেই পরিবেশে। এই অপরাধে অপরাধী হয়ে তাকে পরের দিনই মায়ের বাড়িতে চলে যেতে হয়। যাবার পূর্ব রাত্রিটি তার জীবনের চরম ও পরম রাত্রি হয়ে ধরা দেয়। সেই রাত আর সেই চাঁদ তাদের দুজনার জন্যই যেন সৃষ্ট। ব্যথিত, মথিত, বিক্ষুব্ধ দুটি চিত্তের সেতু বন্ধন। একজনকে আরেকজনের কাছে সমর্পণ করবার উপযুক্ত সময়। অন্তরে অন্তরে আলিঙ্গন। চোখে চোখ আর হাতে হাত রেখে কেবল নিবিড় করে গভীর ভাবে অনুভব করবার এই –ই সময় –এই মহিমাময়ী মৌনা রজনী। অনেক কিছুই বলার ছিল। কিন্তু কিছুই তো মনে আসছে না। তবে হ্যা, নিতান্ত ভাবেই তাকে দু’একটা কথা আজ বলতেই হবে। তাই রাহেলা ভাব বিহ্বল জগতের বাইরে এসে বললো, ‘আমাকে তো কাইল মায়ের কাছে পাঠাইয়া দিব, তুমি তো জানই। আমি তোমার কাছে চিঠি লিখুম। তুমি তো লিখতে জান না, কেবল পড়তেই শিখছো। চিঠির উত্তর চাইনা। আমার চিঠি পাইয়া তুমি যাইও। চিঠির কথা কেউর কাছে কইও না।’ উত্তরে ওসমান বলেছিল, ‘অত ভাইঙ্গা পড়ছ ক্যা? তুমি কাইল যাও। কয়েকদিন পরেই আমি তোমারে লইয়া আসবো। পরে দেখবা সব ঠিক হইয়া যাইব।’ আরো তার কথা বলার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু বাবা –মা যে রকমই হোক না কেন, তারা তো মুরুব্বী। তাই চুপ করে থাকলো। রাহেলা শেষ বারের মত নয়নের জলে ওসমানকে সিক্ত করে দিল। 

রজনী প্রভাত হলো। কিন্তু অন্যদিনের মত রাহেলা তার মায়ের কাছে যাবার আনন্দে আত্মহারা হলনা। যথাসময়ে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হল। মা মেয়েকে কাছে পেয়ে খুব খুশী হল। আদর করে ভরিয়ে দিল। 

গেল বেশ কিছুদিন। রাহেলা ক্রমে ক্রমে অসুস্থ হতে চলল। কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না! অবস্থা খারাপ হতে খারাপতর হতে লাগলো। রাহেলার মা ব্যস্ত হল। রাহেলা স্বামীর স্মরণে স্মারক লিপি রচনা করলো। কোন একটা হিতাকাংখী কর্তৃক পত্রখানি ওসমানের নিকট প্রেরিত হল। 

দুপুর গড়িয়ে গেল। ওসমান লাঙ্গল তুলে গরু ছেড়ে বাড়ির দিকে রওনা হল। আজ তার মনটা ভাল নেই। কোন কাজেই মন বসছে না। তাছাড়া একটা কাক তার মাথার উপর দিয়ে কা –কা কর্কশ রবে উড়ে গেল। ওসমানের অন্তর আর্তনাদ করে উঠলো। সকালে ঘর থেকে বের হবার সময় তার মাথাটা  চালের সঙ্গে ঠুকে গিয়েছিল। এ সমস্ত মোটেই ভাল লক্ষণ নয়। তবে কি তার রাহেলার অসুখ করেছে! তার তো চিঠি পাঠানোর কথা ছিল। আর চিঠি লিখলেই বা এত তাড়াতাড়ি চিঠি নিয়ে কেউ আসবে না। এসব ভাবতে ভাবতে একবার হোঁচট খেয়ে কোনক্রমে টাল সামলে নেয়। এমন সময় একটা লোক এদিক ওদিক তাকিয়ে তার হাতে একটি পত্র গুঁজে দিল। ওসমানের বুকটা ধড়াস করে উঠল। সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিঠি নিয়ে বসে পড়লো। কাঁচা বড় বড় হরফে লেখা সে পড়তে শুরু করলো। 

প্রিয়তম, 

সারা জীবন তোমাকে যাহা দিয়া আসিয়াছে আজ তাহার ব্যতিক্রম হইবে না। আমি জানি তুমি আজও তাহাই গ্রহণ করিবে। তোমাকে ছাড়িয়া আসিতে খুব কষ্ট হইয়াছে। আমি দিনরাত কিছুই চিন্তা করিনা। কেবল পূর্ণিমা রাতের সেই হাসিমাখা মুখটার দিকে চাহিয়া থকি। তুমি এখানে আসিলে তোমার সাথে প্রাণ খুলিয়া কথা বলিতাম। তুমি যে ছল করিয়া আমার হাসি দেখিবার জন্য রান্না ঘরে বার বার আগুন আনিতে যাইতে তাহা আমার মনে পড়ে। এখানে তোমাকে, হাসিয়া কথা বলিলে কেহ তিরস্কার করিবে না।

আমার শরীর অত্যন্ত দুর্বল। তোমাকে দেখিতে খুব ইচ্ছা হয়। হাতের লেখা দেখিলেই বুঝিতে পারিবে আমার শরীর কত খারাপ। অনেক সময় মনে হয় বাঁচিব না। আর না বাঁচলেই বা কি? আমার জীবনের দাম এক কুপি কেরোসিন তেলের চেয়েও কম। আমি মরিয়া গেলে মনে করিও আধা ছটাক কেরোসিন তৈল দৈবক্রমে মাটিতে পড়িয়ে গেল। আর তোমাদের যা কিছু আমার সঙ্গে ছিল, এখান হইতে লইয়া যাইও। দুঃখ করিও না। তোমার জীবনে সুখ আসুক আমি তাই কামনা করি। আর শেষবারের মত যা দেবার ছিল, তা কাছে পাইলাম না বলিয়া বাকী রহিল। 

ইতি –ভাগ্যহীনা রাহেলা


চিঠি পড়া শেষ হল। ওসমানের মাথাটা যেন একবার ঘুরে উঠলো। সে বাহ্যিক জ্ঞানহারা হয়ে পড়লো। উর্ধ্বশ্বাসে রাহেলার কাছে ছুটে চললো। অনেক দূর দৌড়াবার পর সে রাহেলার বাড়ির কাছে এসে হঠাৎ থেমে গেল। দেখলো অনেক লোক জড়ো হয়ে কার যেন জানাজা পড়ছে!

.............

২০.০৮.১৯৬১

Tuesday, May 13, 2025

বঁধুয়া - চিঠি


 বঁধুয়া,

ভেবেছি তোমায় কিছু লিখবো। অনেক দিন লিখতেও চেয়েছি। কিন্তু কেন যে লিখিনি তা আর না বলেও পারছিনা । যদিও তুমি নির্বাক শ্রোতা জানি তবুও তোমায় বলে শান্তি, পাব বলেই লিখছি। কারণ আমি এতদিন ধরে কেবল তোমার মতই একজন নির্বাক বন্ধুর সন্ধানে ইতঃস্তত ঘুরেছি। কিন্তু জানতাম না যে তুমি আমারই কাছে আমারই সাথে একান্ত আমারই হয়ে আছো। অন্ধ আমি তাই হয়তো তোমার জন্যই তোমাকে চিনিনি। যাক্, যা বলছিলাম, যা বলার জন্য তোমাকে আমার প্রয়োজন-হ্যাঁ প্রয়োজনই বটে। প্রয়োজনের বন্ধনেই আমরা বাঁধা।

অনন্তকালের মধ্যে ক্ষনিক হলেও আমার জীবনের বহু বছুর আমি পাড়ি দিয়েছি। এক অধ্যায় শেষ করেছি আরো অধ্যায় খুলেছি। জীবনে নূতন সিলেবাস পাঠ করেছি। নূতন পরীক্ষা দিয়েছি। ফল কি পেয়েছি জানি না তবে মনে হয় যা পেয়েছি তা নেহায়েত মন্দ নয়। আর সেটা হলো অভিজ্ঞতা যা বঞ্চিতের মনে জাগায় বিভীষিকা, শিহরণ আর আরেক শ্রেণীর মনে জাগায় আশার আলো, সুখ আর শান্তি। জীবনের অনেকগুলো দিনই আমাকে অনেক কথা বলেছে। কিছু শুনেছি কিছু শুনিনি। আবার হয় তো কিছু শুনেছি ভুলে যাবার জন্যই। কতবার হাসি গানের ভিতর দিয়ে কল কল্লোলে অনন্ত প্রবাহের একটি ছোট ধারাকে মিশিয়ে দিয়ে অজনা পানে চলেছি। আবার হয়তো পথ চলতে চলতে পেয়েছি প্রচন্ড আঘাত। আঘাত কোন এক ভাসমান পদার্থের সাথে। কিন্তু সেটা সেই ক্ষণকালের জন্যই। পর মুহূর্তেই দুজনে দুমুখী হয়েছি। কেননা সেও যে ভাসমান-আমার মত অস্থায়ী আমারই মত দুঃখী অথবা সুখী।

ধাক্কাটা ঘা দিয়ে গেল তা ক্ষণিকের আর ঘা রেখে গেল তা স্থায়ী কালের। ঘা-কে আমরা সাধারণ ভাবে স্মৃতি বলে থাকি যার বিরাট গহ্বরের প্রবল আকর্ষণে প্রতিটি মুহূর্তে-প্রতিটি ক্ষণ ছুটোছুটি করে প্রবেশ করে যাচ্ছে। আমাদের ফেলে আশা দিনগুলিও মধুর হয়ে পড়ে। মনে হয় এই ই ভালো ছিল। ও রকম না হলে আজকের দিনের এই করুণ অথচ আনন্দমুখর দিনটির সাক্ষাত পেতাম না। জীবনের অনেক আনন্দমুখর অনেক বিরহ বিধুর অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। জীবনকে উপলব্ধি করেছি নতুন করে। চিনেছি বিভিন্নরূপে। চিনেছি যেটা দুঃখের সেটাই সুখের। যেটা তিক্ত সেটাই মধুর। যেটা বেদনা দায়ক সেটাই আবার ভবিষ্যতের কোন এক অজানা আনন্দের সম্ভার তৈরী করে আমাকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছে। সংঘাত দ্বন্দ, আনন্দ, বেদনা, বিরহ, মিলন পাওয়া আর হারিয়ে ফেলা এই তো জীবন।

১৩. ৫.১৯৬১

*****


সাহিত্য পর্যালোচনা: “বঁধুয়া”

১. বিষয় ও ভাব

লেখাটির প্রধান বৈশিষ্ট্য অন্তর্দর্শন ও আত্মকথনের প্রবলতা। এটি একধরনের চিঠির মতো, যেখানে লেখক তার ‘বঁধুয়া’—অর্থাৎ একান্ত নীরব বন্ধুর উদ্দেশ্যে মনের গভীর অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। এখানে “নির্বাক শ্রোতা” এবং “নির্বাক বন্ধু”-র প্রসঙ্গ এসে লেখার একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা ও অন্তর্লোকের আত্মসংলাপকে উন্মোচিত করেছে। লেখক বলেছেন, “তুমি আমারই কাছে আমারই সাথে একান্ত আমারই হয়ে আছো”—এটি আত্ম-অন্বেষণ এবং নিজের সত্তার সঙ্গে বোঝাপড়ার এক অনুপম উদাহরণ।

২. ভাষার সৌন্দর্য ও সাহিত্যিক গুণ

গদ্যটি আবেগময়, সূক্ষ্ম অনুভূতির বর্ণনায় সমৃদ্ধ। ভাষা সহজ, সরল, কিন্তু গভীর; অলংকারের ব্যবহারও লক্ষ্যণীয়—“অন্ধ আমি তাই হয়তো তোমার জন্যই তোমাকে চিনিনি”, “জীবনের বহু বছুর আমি পাড়ি দিয়েছি”, “নূতন সিলেবাস পাঠ করেছি”—এসব বাক্যে রূপক ও উপমার প্রভাব স্পষ্ট। লেখাটি নাতিদীর্ঘ বাক্য আর দীর্ঘশ্বাস-সদৃশ প্রকাশভঙ্গিতে একধরনের স্মৃতিমেদুর মায়া তৈরি করে।

৩. জীবনদর্শন ও অভিজ্ঞতার ব্যঞ্জনা

লেখক জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়, আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। এখানে জীবনকে তিনি এক চলমান যাত্রা ও পরীক্ষার সাথে তুলনা করেছেন—“নূতন পরীক্ষা দিয়েছি”, “ফল কি পেয়েছি জানি না”—এই ধরনের বাক্যে জীবন-দর্শনের সার্বজনীনতা প্রতিফলিত হয়েছে।
লেখক উপলব্ধি করেন, দুঃখ এবং সুখ, বেদনা ও আনন্দ, বিচ্ছেদ ও মিলন—সবই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। “যেটা দুঃখের সেটাই সুখের”—এই উপলব্ধি লেখাটিকে এক গভীর দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

৪. চিত্রকল্প ও স্মৃতিচারণা

গদ্যাংশে স্মৃতিচারণা ও অভিজ্ঞতার বর্ণনা অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে এসেছে। ছোট ছোট দৃশ্য, জানা-অজানা পথ চলার অভিজ্ঞতা, অজানা কারও সঙ্গে ক্ষণিকের সংঘর্ষ, আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া—এসব জীবনের বহমানতা ও অনিশ্চয়তার চিত্র আঁকে।
“ঘা-কে আমরা সাধারণ ভাবে স্মৃতি বলে থাকি”—এখানে অতীতের ব্যথাকে স্মৃতির গভীর গহ্বরে রূপান্তরিত করার একটি চমৎকার চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে।

৫. উপসংহার

গদ্যটি স্বগতোক্তির আদলে লেখা, যেখানে আত্মান্বেষণ, নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি, দুঃখ-সুখের দ্বন্দ্ব এবং জীবনের নানা অভিজ্ঞতা একমিল হয়ে গেছে। ভাষার সাবলীলতা, আবেগের আন্তরিকতা এবং জীবনদর্শনের গভীরতা লেখাটিকে হৃদয়গ্রাহী এবং সাহিত্যিক মানে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।
এটি নিঃসন্দেহে বাংলা আত্মকথনধর্মী গদ্যের এক সুন্দর নিদর্শন, যেখানে প্রতিটি পাঠক নিজের জীবন ও অনুভবকে খুঁজে পেতে পারেন।
*****

Saturday, May 10, 2025

শ্রদ্ধাস্পদেষু

 শ্রদ্ধাস্পদেষু,

আসাফ উদ্দৌলাহ স্যার

বহুদিন পূর্বে একদিন পত্রিকায় একটি কবিতা দেখে অবাক হয়েছিলাম মুগ্ধও হয়েছিলাম।কবিতাটি আপনি আপনার মায়ের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন।ভাল লেগেছিল বলে খবরের কাগজ থেকে কবিতাটি কেটে রেখেছিলাম।আজ দীর্ঘদিন পরে আবার সেই পেপার কাটিংটি পেলাম।তাই মনে হলো আপনাকে সেটি হস্তান্তর করি।আপনার ঠিকানা আমার জানা নেই।তবুও কোন একটি সূত্র ধরে আন্দাজের ওপর ভরসা করে আপনার খোঁজে বের হয়েছি।আমি মহাখালী  রোডে থাকি।আমার নাম ফিরোজা বেগম।কর্তার নাম লেঃ কর্নেল অবঃ মোহাম্মদ হারুন,AMC.

আশা করি আপনি কিছু মনে করবেন না।

আপনার কাছে এই কাগজটি পৌঁছাতে পারলেই আমার সার্থকতা। 

ধন্যবাদ।

ফিরোজা বেগম

১০ই মে,২০২৫

সেই হাতখানি

  এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা ...