Monday, February 21, 2011

একুশে ফেব্রুয়ারি

২১ শে ফেব্রুয়ারি
৮ ই ফাল্গুনে এসেছিলে তুমি
পলাশের মালা পরি’।

সেই কবে
’৫২–র পড়ন্ত বিকেলে
রমনার মাঠে জড়ো হয়েছিলে
বাংলার দামাল ছেলে।

দস্যু করে ধন লুন্ঠন, তস্কর করে
সামান চুরি
ভাষা লুন্ঠন?
শুনিনি কখনো
এ জগতে নেই জুড়ি!

ভাষার জন্য প্রাণ দিল যারা
অকৃপণ অকাতরে
সাহসের বীজ বুনে দিল তারা
শহীদ মিনারে।

বাংলার ছেলে প্রাণ দিয়ে গেল
মায়ের ভাষার তরে
সোনার আঁখরে লেখা রবে নাম
বাংলার ঘরে ঘরে।

সালাম বরকত রফিক জব্বার
শফিক আরো কতজনা
দিনে দিনে কত রক্ত দিয়েছে
নাম তার নাই জানা।
ত্যাগের শীর্ষে উচ্চে উঠিল
বাঙ্গালী বীর সেনা
(আজ) শুধিতে হচ্ছে রক্তের ঋণ
আরো ছিল যত দেনা।

মায়ের মুখের ভাষার জন্য
দিয়ে গেল যারা প্রাণ,
গাইবো তাঁদের গৌরব গাথা
রাখবো ভাষার মান।

Friday, December 31, 2010

কাফেলা

 নদীর স্রোতের মত মানুষের জীবন। মহাকালের পথে সতত  বহমান, সঞ্চরমান। মানুষের জন্ম হয় বিধাতার ইচ্ছায়। শুরু হয় যাত্রা। ব্যক্তি পর্যায়ে তার যাত্রার বিরতি আসে। কিন্তু মহাকালের যাত্রায় নিত্য নব নব যাত্রী এসে সেই যাত্রায় যোগদান করে। এ যাত্রা অগণিত মানুষের যাত্রা চলছে তো চলছে, যেন কাফেলা। তীর্থ যাত্রীর দল। মানুষ মরে যায়, চলে যায়, না জানে কোথায়! তবুও চলতে থাকে বিয়ামহীন। তাতে কাফেলার কলেবর বিন্দুমাত্র হ্রাস পায় না। এই চলার পথের পথিকেরা কেউ সুস্থ, সবল, কেউ অবলা দুর্বল, অসুস্থ। তবুও বাধ্য হয়ে তাকে চলতে হচ্ছে। আর তো উপায় নেই, আর তো পথ নেই।

মানুষের জীবনে ঘাত –প্রতিঘাত আসে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জীবন হয় জর্জরিত। ক্রমাগত জীবন সংগ্রাম জীবনকে করে পর্যদুস্ত। মানুষের মধ্যে ষড়রিপু বাস করে। তার মধ্যে আছে মাৎসর্য নামে এক রিপু। সেজন্য দুর্বল যারা, দরিদ্র্য যারা, তারা সবলের হস্তে হয় নিপীড়িত, নির্যাতিত। অনাদিকাল হতে আজ পর্যন্ত এবং ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া চলে আসছে, চলতে থাকবে। 

এই যাত্রী দল ‘দুর্গম গিরি, কান্তার মরু’ পার হয়ে চলতে থাকে সমুখ পানে। পেছনে ফেরার উপায় নেই। যাত্রীদের ধারণা পথ চলায় যত শ্রম, যত ক্লেশ, ততই পূণ্য অর্জন। পূণ্য অর্জন যদি নাই হবে, পহ চলা যে বৃথা হবে। অর্জনের ঝুলি থাকবে শূন্যতায় ভরা। সময়ের পথ চলতে চলতে অনেকে অবসাদ গ্রস্ত হয়। মিছিলের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনা। কারো গতি হয় শ্লথ, কেউ পড়ে যায়। কেউ আর উঠে দাঁড়াতে পারে না। 

যাত্রীদের কাউ হয়তো তার সুহৃদের জন্য ক্ষণিক দাঁড়ায়। কিন্তু স্রোতের টানে তিষ্ঠাতে পারেনা। ‘মোছাফির মোছ রে আঁখিজল, ফিরে চল আপনারে নিয়া।’ চোখের জল মুছে পথ চলতে থাকে সে। পথের ধূলিতে কে পড়ে রইল, কে চলে গেল চিরতরে, তার খোঁজ রাখতে পারেনা। 

পুরাতন চলে যায়। নতুন আসে। বিশ্ব বিধাতা সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষার জন্য এ বিধান তৈরী করেছেন। বিধাতার সংসারে সকলে তার সৃষ্ট জীব। সেখানে মাতা নেই, পিতা নেই, পুত্র নেই, কন্যা নেই। সকলেই আল্লাহ্‌র বান্দা। সৃষ্টি লীলার অংশ। যাদেরকে আমরা মাতা –পিতা  বলি তাদের মাধ্যমে তিনি তার সৃষ্টির ধারা বজায় রাখেন। সন্তান প্রকৃত পক্ষে পিতামাতার নিকট আল্লাহ্‌ তায়ালার আমানত। মা –বাবা মমতার বন্ধন দিয়ে সন্তানকে আল্লাহ্‌ তায়ালার অনুগত বান্দা হিসাবে গড়ে তোলেন। কি সমতলে, কি পাহাড় –পর্বতের পাদদেশে মানুষের সাধনা হয়ে দাঁড়ায় সন্তানকে সুশীল মানুষ হিসাবে গড়ে তুলবার। পরবর্তীকালে এই ছেলেমেয়েরাই ভবিষ্যতের মানুষ জন্ম দিয়ে যাবে বংশানুক্রমে। তারাও এ তীর্থ যাত্রীদের কাফেলায় শরীক হবে। সারা পৃথিবী জুড়ে এই কাফেলা চলতে থাকবে নিরবচ্ছিন্ন, নিরলস গতিতে। তারা কারও জন্য অপেক্ষা করবে না। কারো জন্য থেমে থাকবে না।‘Let the dog bark and the caravan pass.’এ প্রসঙ্গে কাহলিল জিবরান তাঁর The Prophet গ্রন্থে বলেছেন, ‘তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়। তারা প্রবাহিত জীবনের আকুল প্রত্যাশার পুত্র –কন্যা। তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, কিন্তু তোমাদের ভেতর জন্ম নেয় না। তারা যদিও তোমাদের সাথে থাকে, তারা তোমার সম্পদ নয়।’ পিতা মাতার মাধ্যমে তারা আসে, তারা চলে যায়। তাদের বংশধরেরা একই পথ অনুসরণ করে তাদের প্রতিনিধি রেখে যায়। তাদেরো সেই একি পরিণতি। ওমর খৈয়াম তাঁর রুবাইয়াতের এক জায়গায় বলেছেন, ‘যদি নিয়ে নাও প্রভু তোমার বান্দাকে, তবে সৃষ্টি করবার কি প্রয়োজন ছিল? ’ বংশ পরম্পরায় সকল বান্দা মৃত্যুর অধীন। তবে জন্মানো কেন? বিশ্ব বিধাতার লীলা খেলা অংশ মানুষের জন্ম –মৃত্যু। আর তা একজন ব্যক্তি মানুষের সমগ্র জীবন। 

জীবনে কাছে এবং দূরে বহু মানুষ দেখেছি। তাদের জীবনের সুখের কথা, দুখের কথা শুনেছি। হাতে হাত রেখেছি, কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়েছি, অনেক পথ হেঁটেছি একসাথে, ফুল তুলেছি, গান গেয়েছি। পথ চলতে চলতে একজন, একজন, করে কে যে কোথায় হারিয়ে গেল! জানতে পারিনি। যারা একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তারা অনেকে আজ নেই। 

কোথায় তারা? 

যেদিকে তাকাই কেবল নতুন মুখ, অচেনা, নামহীন, পরিচয়হীন জনতা। তবুও আঁখি কেবল খুঁজে ফেরে সেই পুরাতন সহযাত্রীদের মুখ। যদি কখনও দু’একজনের সাক্ষাৎ পাই, একে অপরকে শুধাই কোথায় তারা? সেই প্রশ্নের উত্তরে ওই সমুখের গোধূলি লগ্নের সন্ধ্যাতারার দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে বলে, নাই নাই সে পথিক নাই। ঐ আকাশের তারাদের মাঝে ভীড় করে আছে। রেখে গেছে কেবল পদচিহ্ন – তাদের কীর্তি জীবনের বালুকা বেলায়।       

এই অভিযাত্রীদের মিছিল, এই কাফেলা তার পরিপূর্ণ দলবল নিয়ে ধীরে ধীরে সমুদ্র স্রোতের ন্যায় চলতে থাকে। কে গেলো, কে এলো; তার খোঁজ রাখে না। প্রতিদিন কত মানুষ –এই কাফেলা যাত্রী – মরে গিয়ে পথের ধূলায় লীণ হয়ে যাচ্ছে! আবার কতজনা জন্মগ্রহন করে এই কাফেলায় শরীক হচ্ছে। এটাই নিয়ম। এই দীর্ঘ মিছিলের যেমন শুরু নেই, তেমন শেষও নেই। 

কোন্‌ সাগরের তীরে মানুষের তীর্থ তা সে জানে না। তবুও পুণ্য লাভের আশায় মানুষ ঐ তীর্থ যাত্রী পথিকের দলে ভিড়ে যায়। তারপর একদিন বৃক্ষের হরিদ্রাভ পত্রের ন্যায়, পরিপক্ক ফলের ন্যায়, বৃন্ত হতে বিচ্যুত হয়ে ভূতলে পতিত হয়। সহযাত্রীর নয়ন ভরে উঠে জলে। ‘যেতে নাহি দেব –তবু চলে যায় ।’ আর আসে নাকো ফিরে। এভাবেই চলবে। একদল এই কাফেলায় যোগদান করবে, অন্যদল ঝরে পড়বে। কাফেলায় যাত্রীরা কেউ চিরস্থায়ী নয়। কেউ আসে, কেউ যায়। কাফেলার কলেবর ঠিক থাকে। সে চলবে চিরকাল। 

‘এ পথ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়।’ থেমে যাবার পথও নয়। জীবনের যা কিছু অর্জন, তার কষ্টার্জিত সম্পদ, যক্ষের মত বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল, সব ছেড়ে সে চলে যায়। ক্লান্ত, শ্রান্ত পথিক আক্ষেপ করে বলে, 

‘হায়রে হৃদয়, তোমার সঞ্চয়,

দিনান্তে, নিশান্তে, শুধু পথপ্রান্তে, 

ফেলে যেতে হয়।            

নাই, নাই, নাই যে সময়।’

............

১১.১.১১ 

Tuesday, December 15, 2009

জীবনের বাঁকে

 শেষ পর্যন্ত মালিহার পোস্টিং অর্ডার এলো। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক পল্লী গ্রামের কলেজে। মালিহা ইচ্ছে করেই এরকম একটি অদ্ভুত স্থানে চলে এলো। এই কলেজে কয়েকটি মাত্র মেয়ে পড়ে। আর বাকী ছাত্ররা সব আশে পাশের কয়েক গ্রামের। মেয়েদের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ কম্পাউন্ডের ভেতরেই দু’টি রুম নির্দিষ্ট করে রেখেছে। সেই মেয়েদের কামরাতেই মালিহার থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এ কলেজটি সরকারি কলেজ। অনেক সুযোগ দিয়েছে সরকার। কিন্তু শিক্ষকের বড়ই অভাব। এই পাড়াগাঁয়ে কেউ থাকতে চায় না। মালিহার মন্দ লাগে না। গ্রামীণ পরিবেশ। গাছপালার মর্মর ধ্বনি, চারিদিকে সবুজ শ্যামল শস্যক্ষেত্র। অনেকে ভাবে এ মহিলা এখানে কেন? কিন্তু কেউ জানে না মালিহা তার পরিচিত জগৎ থেকে পালিয়ে এসেছে। 

কাজে দক্ষ বলে মালিহাকে সকলে সমীহ করে। এখানে একজন অংকের প্রফেসর আছেন, তিনি অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য তদবীর করেন না। তিনি কলেজের জন্য খুব পরিশ্রম করেন। কলেজে প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপাল নেই।। কারণ এখানে শহরের কোলাহল নেই, বিজলী বাতির চমক নেই। সেই কাক ডাকা ভোরে মালিহার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুরে ঘুরে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে। ‘ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে’- দিনের সূর্যোদয় দেখে। আর দেখা হয়, ‘একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিশির বিন্দু!’

কালক্রমে দেখা যায় অংক স্যার নাসিরুদ্দিন আর মালিহাই কলেজ চালান। অন্য বিষয়ও তাদেরকে পড়াতে হয়। শিক্ষক যায় বদলি হয়ে, নতুন শিক্ষক আসে। ছাত্র ছাত্রীরা পরীক্ষা দিয়ে চলে যায়, নতুন ছাত্র ছাত্রী আসে। স্থায়ী থাকে দু’জন মাত্র। মালিহা আপা, নাসিরুদ্দিন স্যার। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। 

মজার বিষয় এরা দুজন দুজনকে চেনে। কিন্তু পরিচয় জানে না। একদিন নাসিরুদ্দিন বললেন, আপা, আপনার পরিচয় জানা হয়নি। মালিহা বলেন, পরিচয় আমার আহামরি কিছু নয়। ঐ চাকুরীর খাতায় যা লেখা আছে তাই।

তবুও আরো কথা থাকে।

আমার সবকিছু থাকা সত্ত্বেও আমি এক নীড়হারা পাখি।এই জন–অরণ্যে আমি একা। পথ হারিয়ে এই নিভৃত পল্লীর কোলে ঠাঁই খুঁজে পেয়েছি।

আপনি এত হাসি –খুশী, এত কাজ করেন, দেখে মনে হয় না আপনার কোন দুঃখ আছে।

দুঃখ আমার নেই। তবে অপমান বোধ আছে। একজনকে আশ্রয় – প্রশ্রয় দিয়ে আমি প্রতারিত হয়েছি।  

যদি আপনার আপত্তি না থাকে তবে আমাকে বলতে পারেন।

আপনাকে বলে আমার কি লাভ? আপনি কি আমার মনের ভার লাঘব করতে পারবেন? আপনার পরিচয় তো আমার জানা নেই। আগ্রহও জাগেনি। মনে হয় যারা একা থাকে তাদের একটা অতীত আছে। 

নাসিরুদ্দিন চুপ করে থাকে। নিজের মগ্ন চৈতন্যে কোথায় যেন বেদনার সুর বেজে উঠে। তারপর বলে, আপা, যদি অজান্তে আপনাকে কষ্ট দিয়ে থাকি তার জন্য ক্ষমা চাই। 

ক্ষমা চাওয়ার মত অপরাধ করেন নি। স্বাভাবিক জীবন যাদের, তাদের গল্প –সল্প আলাদা। তারা জীবনের সুখ –দুঃখের কথা আপনা থেকে অনর্গল বলে যায়। আপনার আমার মত দরজায় অর্গল এঁটে রাখে না। আমার জীবনে অনেক কথা নেই, অনেক ঘটনা নেই। তবে যা ঘটেছে তা মর্মান্তিক। আমি ছোটবেলা থেকে একজনকে চিনতাম। স্কুলের নীচের ক্লাস থেকে। তারপর বহুদিন গত হয়েছে। ইউনিভার্সিটিতে পড়বার সময়ে আবার তার সঙ্গে দেখা হয়। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে মেলা –মেশা একটু বেশী হয়ে গেল। ভাবলাম প্রেমে পড়েছি। সেও তাই ভাবলো। আমার চাইতে তার আগ্রহই অধিক। আমি তা সত্য বলে মেনে নিলাম। পাশ করে বের হলাম উভয়েই। ভাল রেজাল্ট বলে তার ভাল চাকুরী হল। আমি পেলাম শিক্ষকতা। তার আর বিলম্ব সইছে না। সুতরাং পরিবারের দ্বারস্থ হতে হল। উভয় পরিবারের সম্মতি ক্রমে আমাদের সাজানো গোছানো ঘর –সংসার হলো। সুখে, আনন্দে, শান্তিতে দিন যেতে লাগলো। বছর দুয়েক কেটে গেল স্বপ্নের ঘোরে। এবার পরিবারের কলেবর বৃদ্ধির চিন্তায় আমরা বিভোর। সব কাজে তারই উৎসাহ অন্তহীন।

আমরা ক্লাবে, পার্টিতে যাই। খুব মজা করি। একবার পরীক্ষার খাতা নিয়ে খুব ব্যস্ত। বেশ কিছুদিন যে কোথা দিয়ে গেল! এই সময় তাকে বেশ উদাসীন মনে হতে লাগলো। প্রশ্ন করলে উড়িয়ে দেয়। অল্পদিনের মধ্যে তার আমার দূরত্ব বৃদ্ধি পায়। আমি নিজের দোষ খুঁজে বেড়াই। হঠাৎ একদিন বলে, আমার পোস্টিং হয়ে গেছে।     

বদলি হয়েছ, কোথায় ? 

চট্টগ্রামে।      

হঠাৎ বদলি কেন?

আমি আর এখানে থাকবো না। কালই চলে যাব।

মনে পড়লো সেদিন সে বাসায়ই ছিল। অফিসে যায়নি। আমি ছিলাম কলেজে। এরই মাঝে তার যা কিছু সব গুছিয়ে রেখেছে। আগে কোনদিন কাপড় –চোপড় , বাক্স গোছাতে জানতো না। এবার খুব ভালভাবে পেরেছে। অবাক হয়ে বললাম, এত তড়িঘড়ি পোস্টিং অর্ডার এলো কেন? কি করেছ অফিসে?

- কিছুই করিনি। আমি যেতে চেয়েছি, তাই যাচ্ছি।  

আরো বিস্মিত হয়ে বললাম, কেন? কি বলছো এসব? 

পরে তোমার সব কথার উত্তর দেবো, আজ নয়। বলে ঘুমিয়ে পড়লো। পরদিন সে চলে যাওয়ার পর আমি আমার টেবিলের উপর ডিভোর্স লেটার পেলাম। বিশ্বাস করতে পারিনি। ঘটনার আকস্মিকতায় জ্ঞান হারালাম।সেদিন ছিল ছুটির দিন। দুপুরে আমাদের বাড়ির লোকজনদের ডেকেছিলাম একসংগে লাঞ্চ করবো বলে। তারা এসে আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় আবিষ্কার করে। শুশ্রূষা করে। জ্ঞান ফেরে আমার। বিকেলে অবস্থার উন্নতি হলে ইকবাল কোথায় তারা জানতে চায়। আমার মনে পড়ে গেল সব কথা। আমি তাদেরকে চিঠিটি দেখতে বললাম।তারাও বিস্ময়ে নির্বাক। কি করে বুঝাই যে কিছুই হয়নি, কোন ঘটনা ঘটেনি। আমার ভাইয়েরা ইকবালের অফিসে খোঁজ নিতে গেল। এক অবিশ্বাস্য সংবাদ সংগ্রহ করে আনলো।ইকবাল কারো বাগদত্তাকে নিয়ে পালিয়ে গেছে দেশের বাইরে। চট্টগ্রামে নয়। চাকরীতে সে বেশ কিছুদিন আগেই ইস্তফা দিয়েছে। আমি আবার মূর্ছিত হয়ে পড়লাম। 

একটানা এত কথা বলে মালিহা থামলো। নাসিরুদ্দিন ও এরকম একটি গল্পের আকস্মিকতায় নির্বাক। মনে মনে খুবই বিব্রত বোধ করল। ভাবলো, এরকম প্রশ্ন করা মোটেই উচিত হয়নি। কেউ আর কোন কথা না বলে উঠে যার যার গন্তব্যে চলে গেল। কেন যেন অনেকদিন পর মালিহার চোখে অশ্রু এলো। বঞ্চনার যন্ত্রণায় অধীর হলো। মেয়েদের হোস্টেলে এসে হাতমুখ ধূয়ে শয্যায় আশ্রয় নিল। ছাত্রী রুমমেটরা আপার বিষন্নতায় বিস্মিত। তারা চা-নাস্তা তৈরী করে নিয়ে এলো। জানতে চাইলো আপার শরীর খারাপ কিনা। জবাবে বললেন, তেমন কিছু নয়। বাড়ির কথা মনে পড়ছে। একমেয়ে সাহস দিয়ে বললো, সামনে তো রমজানের ছুটি আছে, তখন বাড়ি যাবেন। চা পান করলো মালিহা। মেয়েদের খোঁজ –খবর নিল। 

মেয়েদের সর্বপ্রকার তত্ত্বাবধান মালিহা করে থাকেন। কারণ প্রিন্সিপাল, ভাইস –প্রিন্সিপাল ক্ষণস্থায়ী। বদলী হয়ে এ কলেজে আসার পর পরই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দরজায় ধর্না দিতে থাকেন অন্যত্র চলে যাবার জন্য। মালিহার মনে হয় এ কাজটি খুবই খারাপ। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। এ দিকটিতে কারো মনোযোগ নেই। যে কিছুদিন থাকেন, কলেজে না পড়িয়ে প্রাইভেট টিউশানী করে চলে যান। 

সপ্তাহখানেক পর। নাসিরুদ্দিন আর মালিহা কলেজ শেষে গল্প করছিলেন। নাসিরুদ্দিন বললেন, আপা, সেদিন আপনার সঙ্গে কথা বলে সারারাত ঘুমাতে পারিনি। কেবলই মনে পড়ছিল, কোথায় যেন আপনার ঘটনার সঙ্গে আমার জীবনের ঘটনার মিল রয়েছে। আপনার অনুমতি পেলে বলতে পারি। মালিহা বলেন, অনুমতি দিলাম।   

নাসিরুদ্দিন বলতে লাগলেন, আমার জীবনের ঘটনাও খুব মর্মান্তিক। আমি যখন অনার্স পড়ি তখন ট্রেনে একদিন ইডেন কলেজের একটি ছাত্রীও ভ্রমণ করছিল। আলাপ হলো। জানতে পারলাম আমরা একই গন্তব্যের যাত্রী। স্টেশনে নামবার পর মেয়েটির গার্জিয়ান বললো, আপনি যখন আমার এলাকার ছেলে, এরপর নুসরাত আপনার সংগেই আসা যাওয়া করবে। নুসরাত আমার অনেক জুনিয়র। কয়েক বছর ধরে তাকে নিয়ে যাতায়াত করতে হলো নিজের বড় ভাইয়ের মত। সে দেখতে শুনতে ভাল, হাসিখুশী। ঝর্ণার মত চঞ্চল, উদ্দাম, উচ্ছ্বল। আমি চুপচাপ বলে প্রায়ই সে অভিযোগ করে। ঢাকায় আমি তার লোকাল গার্জিয়ান। আমার পড়াশুনা শেষ। সে তখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। তাকে নিউমার্কেট নিয়ে যাওয়ার বায়না ধরে। আমার অস্বস্তি বোধ হয়। শেষ পর্যন্ত আমাদের মেলামেশা শুরু হয়। সে বলে, আমার পড়াশুনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি কোথাও যাবেন না। বললাম, চাকুরী করতে হবে না?

- চাকুরী করবেন, বিয়ে করবেন  না? 

- চাকুরী না থাকলে বিয়ে করবে কে?  

- আগে চেষ্টা করে দেখেন, তারপর বলবেন।

- বৃথা চেষ্টায় কাজ নেই। মেয়ে খোঁজার চাইতে চাকুরী খোঁজার প্রয়োজন অধিক। পাত্রী তো পথে ঘাটে পড়ে থাকে না।

- পড়ে থাকে। দেখতে পান না আপনি? দেখার চোখ থাকতে হয়।

- একদিন ও না দেখিলাম তারে। কোথায় আছে সে?

- আমার চোখের দিকে তাকান। সেখানে যার ছায়া ভেসে উঠবে সেই হবে আপনার পাত্রী। আপনি তাকে খুব চেনেন।

- কই দেখছিনা তো? চোখের মণি দেখা যাচ্ছে।

- কেন আমাকে দেখছেন না? আমি কি অদৃশ্য, অশরীরি?

- তুমি? 

- হ্যা আমি। এবং আমিই, আর কেউ নয়, কোন ভাবেই নয়, কোনদিন নয়, কোন কালেই নয়। চিরকালের আমি! কোনদিন যদি আমাকে ছেড়ে গেছ!

সে আমাকে জড়িয়ে ধরে রইলো। তার বক্ষের হৃদস্পন্দন আমার বক্ষে সঞ্চারিত হলো। আমি সুপ্তিমগ্ন থেকে জেগে উঠলাম। দেখলাম নুসরাতের চোখে পানি।

- কাঁদছো কেন?

- কাঁদবো না, আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। আমি মরে যাব, আমার পড়াশুনা হবে না, জীবন নষ্ট হবে। আমি কি ভাল মেয়ে নই? খারাপ কোনদিক?

- নিশ্চয়ই ভাল মেয়ে। কোনদিন কিছু বলেছি?

- তবে কেন আমার সঙ্গে ভাইগিরি কর?

চিন্তায় পড়ে গেলাম। লোকে কি ভাববে? ওর গার্জিয়ান হয়ে ওকে দখল করে নিয়েছি! কিন্তু বেশী চিন্তা করবার সুযোগ পেলাম না। সে আমাক এত কথা বলতে লাগলো, এত আব্দার করতে লাগলো, যে আমার সকল বাধা চূর্ণ –বিচূর্ণ  হয়ে বন্যার স্রোতে ভেসে গেল। সে নিজে উদ্যোগী হয়ে বিয়ে ঠিক করে ফেললো। দুই পরিবারের সম্পর্ক দেখলাম বেশ জমে উঠেছে। ইতিমধ্যে তারও ইউনিভার্সিটির চৌকাঠ অতিক্রম করা হয়ে গেছে। আমি একটি কলেজে চাকুরী করি। বাসা ভাড়া করে থাকি। সে আমার বাসায় আসে প্রতিদিন বিকেলে। গোছগাছ করে। চা তৈরী করে নিজে খায়, আমাকে দেয়। সে তখনও হোস্টেলে থাকে। চাকুরীর খোঁজে অফিসে এবং অন্যান্য স্থানে ধর্না দেয়। এভাবে সম্ভবতঃ তখনই কারো সাথে তার পরিচয় ঘটে। সে কথা বলে প্রচুর। সাহসী মেয়ে। ছিনিয়ে নিতেও জানে, মারিয়ে যেতেও পারে। আমি তা পারিনা। শেষের দিকে তার কি যেন ব্যস্ততা থাকতো। আমার কাছে তেমন আসতো না। বলতো একটু বিরহ সহ্য কর। না চাইতে জল পেলে তেষ্টা মিটে যায়। 

তার সাজগোজের সখ। দুই পক্ষের কেনাকাটা হয়েছে প্রচুর। বিয়ের অনুষ্ঠান ঢাকায় হোক, তাই তার পছন্দ। সুতরাং সেভাবেই বন্দোবস্ত করা হয়। বিয়ের দিন বিবাহ –বাসরে অতিথিরা সবাই হাজির। কনের দেখা নেই। তিনি গিয়েছেন বিউটি পার্লারে। অভ্যাগতদের আর কত বসিয়ে রাখা যায়। খাবার পরিবেশন করা হয়। খাওয়া শেষে সবাই প্রায় নববধূকে না দেখেই চলে যায়। সময়টা ছিল দুপুরে। দুই পরিবারের লোকেরা কনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এমন সময়ে হন্তদত হয়ে তিন মেয়ে ছুটে এলো। তারা নুসরাতের সংগেই ছিল। তারা যে সংবাদ পরিবেশন করলো, তা অবিশ্বাস্য, মর্মান্তিক। তাদের বক্তব্য হচ্ছে নুসরাত সাজগোজ করতে অনেক সময় নেয়। তারপর ঘড়ি দেখে নেমে আসে নীচে। একটি বেবি ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল। সে তার ভিতর ঢুকে পড়ে তার স্যুটকেস সহ। সঙ্গীদের বলে তোমরা অন্য বেবি ট্যাক্সি ভাড়া করে আস। তিন মেয়ে হতভম্ব। একটু দূরে গিয়ে ট্যাক্সি থামে। কাকে যেন ত্বরিত তুলে নেয়। তিন মেয়ের কাঁপুনি শুরু হয়। তারাও দ্রুত এসে বিবাহ আসরে উপস্থিত হয়। প্রথমে দেখে নুসরাত পৌঁছেছে কি না। তারপর বরকে প্রশ্ন করলো সে কিছু জানে কিনা। কোথায় যেতে পারে, কোথায় গেল। সঙ্গে অনেক গহনা, টাকাপয়সা আর কাপড় চোপড়। কিড্‌ন্যাপড্‌ হয়েছে কিনা। তিন মেয়ের কান্না আর সকলের বিমর্ষ ভাবে ক্যমিউনিটি সেন্টারে এক বেদনা বিধুর পরিবেশের সৃষ্টি হলো। সব বিল শোধ করে ওরা সবাই বাসায় ফিরে এলো। এমন সময় একটা ফোন এলো। এক অপরিচিত লোকের কন্ঠ। আমি নুসরাতকে নিয়ে ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছি। নুসরাতের বাবা নুসরাতের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। নুসরাত বললো, আপনারা আমাকে চেনেন। আমি স্বেচ্ছায় ইকবালের সঙ্গে সহযাত্রী হয়েছি। ঐ মুখচোরা নাসিরুদ্দিনের সাথে নিরানন্দ জীবন কাটানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এ লোক আমারই মত, আমার উপযুক্ত। আমার পথ আমি খুঁজে পেয়েছি। আমার সিদ্ধান্তে আমি অটল। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের ফ্লাইট। 

শুনে সকলের প্রাণবায়ু বহির্গত হওয়ার উপক্রম। কান্নার রোল পড়ে গেল। বিশেষ করে কনের মা ও বোনেরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো। নাসিরুদ্দিন বরের পোশাক খুলে ফেললো। নুসরাতের বাবা মাকে সান্ত্বনা দিল। বললো, আপনারা আজকের ঘটনার জন্য দায়ী নন। তারা বললো, নুসরাত বাটপারের পাল্লায় পড়েছে। তোমার মত ছেলে সে কোথায় পাবে। নাসিরুদ্দিনের আত্মীয়েরা সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে গ্রামে ফিরে গেল। বলে গেল তোমার কোন চিন্তা নাই। কবুল তো ভাগ্যিস পড়া হয়নি। যে যাই বলুক, নাসিরুদ্দিন জানে গত পাঁচ বছরে তাদের কত কথা, কত স্বপ্ন, কত স্মৃতি। কেউ জানে না ভুলে যাওয়া এত সহজ নয়। ‘ভুলে যাওয়ার কঠিন সংকল্পই মনে রাখার প্রবল সহায়ক।’ নাসিরুদ্দিনের মনে পড়লো, অতীতের ঘটনা আমি ঘটাই নি। স্মৃতির আগুনে দগ্ধ হতে হবে চিরকাল। চিরকুমার থাকবো। বৌ খুঁজতে আর যাব না কোনদিন। ‘দৃষ্টিপাত’ –এর আধারকারের কথাগুলো তার জীবনে সত্য হলো, ‘প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে মহিমা।  কিন্তু প্রবঞ্চিতকে দেয় কি? তাকে দেয় দাহ। যে আগুন আলো দেয় না, অথচ দহন করে।’ এই পাড়াগাঁয়ে বেশ আছি। ঐ বাঁশ বনের ধারে লেকচারারদের জন্য দুটি কুড়ে ঘর বাঁধা আছে। একটি উঠান, একটি ইঁদারা, একটি রন্ধনশালা। রাতে যখন ঐ বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ ওঠে তখন মনে হয়, স্বর্গের বাগানে বিরাজ করছি। বসে বসে তার রূপসুধা পান করি। স্বপ্নের ঘোরে চলে যাই। অন্য প্রফেসাররা থাকলে তাদের সঙ্গে আনন্দলোকের গল্প করে সময় কাটাই।

নাসিরুদ্দিন থামলেন। শ্রোতা মালিহা নির্বাক। এই তো সেই ব্যক্তি যে তাকে প্রতারনা করেছে। তার ক্ষেত্রে ইকবাল প্রচন্ড উৎসাহী, উদ্দাম। মালিহা শান্ত, স্নিগ্ধ, বিশ্বাসী। ভাগ্য যাকে মারে তাকে রক্ষা করে কে?

মালিহা, নাসিরুদ্দিন দুজনেই শান্ত, সৎ, কর্তব্যপরায়ণ।কাজ করতে ভালবাসেন। সারা বছর কলেজের কাজে ব্যস্ত থাকেন। দুজনের জীবনের প্রতারণা আর বঞ্চনার গল্প শুনে তাদের পরস্পরের জন্য কেমন একটা সহানুভূতির মমতা জাগে। নাসিরুদ্দিন একদিন বলেন, মালিহা আপা, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেন না? মালিহা নীরব থাকেন। তারপর বলেন, ভবিষ্যৎ চিন্তা করে কি লাভ? এইসব ইতিহাস নিয়ে নতুন করে পাত্র খোঁজা, ভাল মন্দের পরীক্ষা দেয়া এসবে আর রুচি নেই। আআর মন আমারই থাক।কারো কাছে বন্দক রাখার দরকার কি? নির্ঝঞ্ঝাট জীবন, শান্ত নদীটির মত –যেমন আপনার।

- উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমারও নেই, আপনারও নেই। তবুও পাশাপাশি বন্ধুর মত থাকলে মন্দ কি? না হয় বন্ধুর মত দুঃখ সুখ ভাগ করে নিলাম। জীবন কাটিয়ে দিলাম নদীর আপন স্রোতের মত। 

- তাকে কি জীবন বলে? এক সঙ্গে থাকলে অনেক স্বার্থ, অনেক আশা, অনেক পাওয়া –না পাওয়ার প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। তখন আনন্দ বেদনার জীবন তরী বাইতে গিয়ে বৈঠা হয়ে দাঁড়ায় অস্ত্র –একে অপরকে ঘায়েল করতে দ্বিধা করে না। আপনার আমার অতীতে কোন টানা পোড়েন ছিলনা। বিনা মেঘে নীলাকাশের কোল থেকে বজ্র পড়ে সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে গেল। ওরা তো সুখেই আছে – আমার ইকবাল, আপনার নুসরাত। আপনি আমি নির্বাসিত জীবন যাপন করছি। আগেকার দিন হলে আন্দামান অথবা নিকোবরে গিয়ে আশ্রয় নিতে হতো!

- আমার তো বলার কিছু নেই। আপনি চিন্তা করে দেখেন। আমাদের তো এখানে অনেকদিন থাকা হলো। আমরা অন্য কোথাও বদলী হতে পারি। এ জীবন থেকে অন্য জীবনে পলায়ন।‘হেথা নয়, অন্য কোথাও অন্য কোনখানে।’

মালিহা গভীর ভাবনার মধ্যে পড়ে গেল। ইকবাল কত ভাল ছেলে ছিল। সেই তাকে ত্যাগ করলো। আর একে তো চেনেই না। কেমন ভবিষ্যৎ? আবার যদি দুঃখ আসে, রাখবে কোথায়? তবে লোকটিকে তার পছন্দ। একসঙ্গে জীবন যাপন করতে গেলে যে জিনিসের প্রয়োজন হয়, তার নাম সহমর্মিতা, বিশ্বাস আর ধৈর্য। নাসিরুদ্দিনের তা আছে। নাসিরুদ্দিনের চিন্তা, ভাবনা কম নয়। সে মালিহাকে সুখে রাখতে পারবে কিনা। মালিহা শান্ত মেয়ে। বঞ্চনার বেদনায় তার অন্তর  নীল হয়ে আছে। সে যন্ত্রণা সে লাঘব করতে পারবে কিনা। বেশ কিছুদিন এভাবে গত হলো। একদিন মালিহা বললো, ঠিক আছে, চলেন সামনের গ্রীষ্মের ছুটিতে আমাদের বাড়িতে যাই। তার আগে পোস্টিং চেয়ে দরখাস্ত দিয়ে যাই। এখানে প্রিন্সিপাল, ভাইস –প্রিন্সিপাল, আরেকজন প্রফেসর বদলী হয়ে আসছেন। আমাদের এখন আগের মত দায়িত্ব নেই। 

সে ভাবেই পরিকল্পনা করা হল। ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে আড়ম্বর না করে উদ্বাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। দুই পরিবারের পরিচয় হলো। দুটি প্রাণের গভীর অন্ধকার জীবনে যেন একটি আলোর মশাল জ্বলে উঠলো। ছুটি শেষে তারা কলেজে ফিরে এলেন। থাকলেন আগের মতই। যেহেতু তারা এখানে বহুদিন ধরে চাকুরী করছিলেন, সুতরাং তাদের পোস্টিং আসতে বিলম্ব হল না। একই শহরে। একজন মেয়েদের কলেজে, অন্যজন ছেলেদের কলেজে। যথাসময়ে তাদের বিদায় সম্বর্ধনা এবং নতুন কলেজে যোগদান। এখানে একটি বাসা ভাড়া করে তাদের সংসার জীবন শুরু। অনেকদিন পর মালিহার কেমন জানি অস্বস্তি বোধ হতে থাকে।তবুও তাদের যাত্রা শুরু হয় ভালভাবেই। কলেজের কাজও ভাল চলছে। এর কিছুকাল পরেই তাদের সংসারে নতুন মুখের আগমন ঘটে। একটি পুত্র সন্তান তাদের কোলে আসে। মুখখানা তার অবিকল মায়ের মত। দেখতে দেখতে সে বড় হয়ে উঠে। স্কুল, কলেজ অতিক্রম করে সে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। ইতিমধ্যে মালিহা, নাসিরুদ্দিন নানা স্থানে বদলী হয়েছে।এবার সিনিয়র হিসাবে ঢাকায় বদলী হয়ে আসে। ছেলে আশীস অর্থপেডিক সার্জারিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান করছে। ছোট টি মেয়ে। সে পড়ে বাবার মত অংক। 

ছেলে প্রতিদিন তার রোগীদের কষ্টের কথা বলে, তাদের মানবিক আচরণের কথা বলে।একদিন বললো, একজন পেশেন্ট এসেছে মাল্টিপল্ ফ্র্যাকচার নিয়ে। থাকেন বিদেশে। ত্রিশ বছর পর দেশে এসেছেন বেড়াতে।একদিন সড়ক দুর্ঘটনায় শিকার হন হাইওয়েতে। সঙ্গে থাকা স্ত্রী নিহত হন। ইনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। হাসপাতালে আছেন কয়েক মাস ধরে। খুব কষ্ট তার। আশীসকে তার খুব পছন্দ।তিনি আশীসের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। আশীস তাকে একবার দেখে গেলে তার কষ্ট অনেক উপশম হয়। প্রায়দিনই সে এই অদ্ভুত চঞ্চল রোগীর গল্প বাসায় বলে।রোগী চায় কোন দৈব বলে উঠে দাঁড়াতে। তবে তার অবস্থার এখন  উন্নতি হয়েছে। হাঁটতে শিখেছে ক্র্যাচে ভর করে।বাড়ি গিয়ে দেখবে তার শূন্য ঘর। কান্নায় তার চোখ ছল ছল করে ওঠে। তার একমাত্র পুত্র সাত সাগর পারের নীল নয়নার হাত ধরে আলাদা জীবন যাপন করে। সেই শ্বেতাঙ্গিনী দক্ষিণ এশিয়া লোকদেরকে দু’চক্ষে দেখতে পারেনা।ছেলের সাথে ফোনেই বাতচিত হয়। চেহারা দেখবার সৌভাগ্য আর হয় না। তাদের ইচ্ছা ছিল দেশ থেকে বেড়িয়ে গিয়ে নিজের বাড়িতেই দুজনে জীবন কাটাবে। মাঝে মাঝে এদেশ ওদেশ ঘুরতে যাবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। There is a slip between the cup and the lip. কিন্তু এখন কি হবে? বিলেতে একাকী জীবন যাপন বড় দুঃসহ। দেশে যারা আছে তারা আন্য জেনারেশান। আদর যত্ন করে তারা। তবে ভার নেবার মত কেউ নেই।

সেদিন ভদ্রলোকের প্লাস্টার খোলার দিন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোগী ভদ্রলোক বলেন, আমি গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। একমাত্র তোমার মুখখানা আমার অনন্দের উৎস। মনে হয় তুমি আমার জন্ম জন্মান্তরের চেনা। স্ত্রী নেই, স্বজন নেই। এই বিশ্বসংসারে কোথায় গিয়ে পড়বো! কি পাপ করেছিলাম। আমার কেন এমন হলো? তোমার মুখখানা স্মরণ করে যেন আমার দিনগুল শেষ হয়। তোমার জন্য আমার অশেষ দোয়া থাকবে।

আশীসের মা এই পথে বাড়ি ফিরছিলেন। ছেলের দেরী দেখে ফোন করলেন। জানতে পারলেন আশীস এখনই বাড়ি ফিরবে। মা বললে, চল তোমাকে নিয়ে যাই, তোমার রোগীটিকেও একবার দেখে যাই। মালিহা হাসপাতালে প্রবেশ করলেন। পায়ে পায়ে গিয়ে হাজির হলেন সেই রোগীর কেবিনে। দরজায় নক্‌ করায় আশীস এসে দরজা খুলে দিল। বললো, মা  এই আমার পেশেন্ট। একবার দেখে যাও। ইনার নাম মিস্টার ইকবাল। বড় কষ্ট পেলেন তিনি।

মালিহা একদৃষ্টিতে পেশেন্টের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন –ইকবাল! এতকাল পরে চেহারা চিনতে একটুও দেরী হয়নি। অন্তরের অন্তঃস্থলে ইকবালের চেহারা একটুও ম্লান হয়নি। যদিও বয়সের চিহ্ন ধারণ করেছে। ইকবালেরও তাই। তারও ইচ্ছা করছিল সেই বহুকাল পূর্বের মত মালিহা বলে চিৎকার করে ওঠতে। 

আশীস ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত। কেউ কোন কথা বললেন না! কোন সাধারণ কুশল বিনিময় পর্যন্ত নয়। দুজনেরই কন্ঠ রুদ্ধ। তাদের মধ্যে কোন অমিল বা বিরোধ ছিলনা। তবুও ভাগ্য তাদের টেনে দুদিকে দুজনকে ছিনিয়ে নিল। এর কি নাম কে জানে? হয়তো বা নিয়তি! তারপর সম্ভাষণ বিনিময় ব্যতিরেকেই মালিহা কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হলেন। ইকবাল আশীসকে ডেকে বললো, তোমার মা কে আমার সালাম দিও। মায়ের সঙ্গে তোমার চেহারার বড্ড মিল। এবার তুমি আস। অনেক রাত হলো। তোমার মা অপেক্ষা করছেন। আশীস বেরিয়ে গেল। ইকবালের চোখে অশ্রুর বান এলো। মনে পড়তে লাগলো অতীতের সেই সোনাঝরা দিনগুলো। তবুও এতবড় অন্যায় কাজটি করেছিল একটি উদ্ভ্রান্ত উচ্ছৃঙ্খল মেয়ের জন্য। কি জানি কি ছিল বিধাতার মনে! তারই পাপের ফল তাকে বাকী জীবন ভোগ করতে হবে। 

মালিহা বাসায় ফেরে। বাধ ভাঙ্গা কান্নার স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অচিন গাঙ্গের স্রোতে। অশীস কম্পিউটার নিয়ে বসে তার কাজে। নাসিরুদ্দিন লক্ষ্য করে মালিহার বিষন্নতা। জানতে চায় কোথায় কোন বিভ্রাট ঘটেছে কিনা। মালিহা ব্যালকনিতে গিয়ে বসে। নাসিরুদ্দিন তার পাশে। মালিহা ব্যক্ত করে তার অগ্নিদগ্ধ হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কথা। কেমন করে দুজন প্রতারক দুটি ভাল মানুষকে প্রবঞ্চিত করে অনায়াসে আরেকটি নৌকায় উঠে চলে গেল। পিছনে পড়ে রইলো দুজন আধারকার, যারা সেই ‘দিপ্তীহীন অগ্নির নির্দয় দহনে পলে পলে দগ্ধ হলেন।’

বিধাতা বড় নাট্যকার। মালিহা নাসিরুদ্দিনের মিলন, আর আজকের এই নাটকীয় সাক্ষাৎ একেবারেই অপ্রত্যাশিত। নাসিরুদ্দিনের বক্ষ পিঞ্জরে সেই একই ঝড়। তার নুসরাত এখন পরলোকে চলে গেছে। বলার মত আর কিছুই ছিল না। দুজনে উদাস দৃষ্টি মেলে সুনসান শূন্য গলির দিকে তাকিয়ে রইল। 

.......

১৬.১২.২০০৯        


Thursday, January 1, 2009

ফারহিন মণির জন্মদিন

ডিসেম্বরে বয়ে যায় শীতের বাতাস,

কুয়াশায় ভরা ছিল ঢাকার আকাশ।

২০০৮ সালের দোসরা ডিসেম্বর,

আমাদের ঘরে এলো অনিন্দ্য সুন্দর।

১৪১৫ সালের অগ্রহায়ণ মাসে

১৮ তারিখ পড়ে মঙ্গলবারে এসে।

১৪২৯ হিজরী সালের শেষ চাঁদ এলো,

৩রা জিলহজ্জ্ব দিনে খুকু জন্ম নিলো।

প্রথম ক্রন্দন ধ্বনি পশিল কর্ণকুহরে,

সেই ধ্বনি শুনে সবে দোয়া দরূদ পড়ে।

হেমন্তের ঘুম ভাঙা প্রথম প্রহরে,

ঘড়ির কাঁটা তখন দশটার ঘরে।

খুকুমণি কেঁদে বলে আমি এসেছি,

সকলের সাথে মোর রাখি বেঁধেছি।

এসো এসো খুকুসোনা এসো মোর ঘরে,

স্বাগত জানাই সবে আবেগে আদরে।

তোমার কান্না,কান্না তো নয় সুখের বারতা বলে,

চেয়ে দেখি খুকুমণি দোলে বাবার কোলে।


ফুলের কুঁড়ির মতন মুখখানি তার দেখে,

আশীর্বাদের পরশ দিয়ে কোলে নিলাম ঢেকে।

কুয়াশার চাদর তুলে দেখি তার মুখ,

অপার আনন্দে মোর ভরে গেল বুক।

একয়টি মাস, খুকু ছিল মায়ের সঙ্গে মিশে,

এবার যে এসে গেল নতুন একটি দেশে।

বড় হয়ে শুনতে পাবে জন্মকথা তার,

বুঝতে পারবে কি সম্পর্ক মায়ের সাথে তার।

কদিন পরে এলো সময় নামকরণের দিন,

মা বলেন তার কন্যার নাম হবে ফারহিন ।

নামটি তার বড়ই মধুর অর্থটিও ভাল,

সুখ সমৃদ্ধির আলো দিয়ে ঘর করবে আলো।

তোমরা সবাই প্রাণ ভরে করো আশীর্বাদ,

ফারহিন যেন সারা জীবন পায় সাধুবাদ।

জন্ম হোক ধন্য ফারহিন, জীবন হোক অনন্য,

নিজেকে ফুটিয়ে তোল সকলের জন্য ।।

 


ফিরোজা হারুন (দাদী)

ফারহিনের একমাস পূর্তি উপলক্ষ্যে রচিত

২রা জানুয়ারি,২০০৯ , ভোর ৩টা৩০


Saturday, June 14, 2008

বাবা দিবসের কিছু কথা


চলমান সময়ের ধারা বেয়ে সামনে এলো বাবা  দিবস। অশ্রুতপূর্ব শব্দ হলেও বাবাদের জন্য সুখবরই বটে। তাদেরকে স্মরণ করবার কেউ ছিল না কোনদিন। কলুর বলদের মতো ঘানি টেনে জীবনের পথপ্রান্তে এসে কাঁধের জোয়াল খানি ফেলে দিয়ে থেমে যেতেন।  তাদের জীবনের যা কিছু অর্জন সবই পড়ে থাকতো এ মাটির পৃথিবীতে অন্য কারো ভোগের জন্য। আজ সময় বদলে গিয়েছে। তাই বাবা দিবসের কথা শুনতে পাচ্ছি। আমরা এখন পুরাতন, বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া বাবাকে স্টোর রুম থেকে উদ্ধার করে, ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে একবার দেখবার প্রয়াস পাচ্ছি। বাবা ছিলেন পরিবারে হুঁশিয়ার কান্ডারী। আজও জীবিত বাবারা পরিবারের কর্ণধার। ঝড় ঝঞ্ঝা, সিডর অথবা নার্গিস, মানবিক কিম্বা অর্থনৈতিক যে কোন বিপদ থেকে পুত্র কন্যাকে নিজের বক্ষের ঢাল খানি দিয়ে ঘিরে রাখেন। তাদেরকে মানুষের মত মানুষ করবার, সুখী ও সম্মানের জীবন গ্রহন করবার জন্য তার সামর্থ্যের বাইরে চলে যান। সেই বাবাদের স্মরণ করা সত্যি একটি মহত কাজ। কাজ কর্মের ধারা অনুযায়ী বাবারা মায়ের মত সন্তানদের এত কাছাকাছি থাকতে পারেন না, সেজন্য হয়তো বাবাদের সঙ্গে ছেলেমেয়েদের কিছুটা দূরত্ব থাকে। তবুও পিতা পিতাই। বুকের ঢাকনাটি উন্মুক্ত করলে দেখা যাবে অন্তহীন স্নেহ ভালাবাসা সন্তানদের জন্য বয়ে চলেছে নিরন্তর। মাকে যেমন ছেলেমেয়েরা অনায়েসে ডাকে,মা মাগো, কোথায় তুমি? বাবাকে সেভাবে বলতে পারেনা, বাবা, বাবাগো এই যে আমি। দেখ তোমার পাশে আমি তোমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছি। সেই ছোট্টবেলা তুমি যেমন আগলে রাখতে আমাদের, বার্ধক্যে তোমার পাশে আমার আছি। বাবা তুমি মুক্ত করো ভয়, আপন মাঝে শক্তি ধরো-এই ভেবে যে তোমার সন্তানেরা তোমাকে ভালবাসে, তোমার বিষয় সম্পত্তির জন্য নয়, তুমি যে আমাদের সেই স্নেহময় পিতা। শিশুকালে তুমি যেমন আমাদেরকে ছায়া দিতে আজ আমরা তোমার এই বৃদ্ধ-শিশু জীবনে ছায়াতরু হয়ে তোমাকে আগলে রাখব। 
 
বৃদ্ধবয়সে যে পিতা পুত্রের হাত ধরে উঠে দাঁড়ায় তাতে তার গর্ব ও আনন্দের সীমা থাকে না - এই ই হওয়া উচিত বাবা দিবসের  স্মরণীয় বিষয়। কেবল শুভেচ্ছা সহ একখানি সুদৃশ্য কার্ড পাঠালেই চলবে না।
 
১লা আষাঢ় ১৪১৫
১৫ ই জুন ২০০৮
 

Sunday, November 25, 2001

সংলাপ

 পন্ডিত ব্যক্তিরা বলেন, অনন্তকালের মাঝে মহাসমুদ্রের বুদবুদের মত নাকি মানুষের জীবন। জন্ম এবং মৃত্যুর মধ্যবর্তী ব্যপ্তিকালকে জীবন বলা হয়। মহাকালের যাত্রাপথে প্রকৃতপক্ষেই মানুষের স্থিতি অতিশয় অল্প সময়ের। এই অল্পকাল জীবনটুকু একজন মানুষের সারাজীবন, দীর্ঘজীবন, চিরকাল। শৈশব, কৈশর, যৌবন, বার্ধক্য, মোটামুটি এই কয়টি জীবনের পর্ব । ধাপে ধাপে মানব সন্তান এসব পর্ব অতিক্রম করে তার আয়ুষ্কালের নাটকের যবনিকা টানে।

সৌরজগতে গ্রহনক্ষত্র সতত সঞ্চরমান। দিবাবসনে রাত্রি নামে। নিশি অবসানে ঊষার অভ্যুদয় ঘটে। এরই মাঝে মানবসন্তান জন্ম লাভ করতে থাকে। মহাশূন্যে জড়বস্তুরা কে কোথায় তখন অবস্থান করে, কে জানে? তবুও সেই জড় পদার্থ গ্রহনক্ষত্রই নাকি মানুষের জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যুর দিনক্ষণও স্থির করে দেয়। অর্থাৎ তার আয়ু, স্থিতিকাল রচিত হয় । 

এই আয়ু বা স্থিতিকালের মধ্যে মানুষ কি চায়? সুখ চায়, শান্তি চায়, ভালবাসা চায়, দীর্ঘদিন বাঁচতে চায়। বাঁচতে গিয়ে প্রতি পদক্ষেপেই অসুখ, অশান্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয়। লড়াই করে কেউ জয়ী হয়, কেউ হেরে যায়। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে একজন মানুষ হেরে যায় বা জয়ী হয় তা নয়। আর প্রতি মুহূর্তে জয়ী হয় তাও নয়।

Life is a pendulum between joys and sorrows, distress and happiness, hopes and despair. সুখ দুঃখ, শান্তি অশান্তি, জয় –পরাজয়, আশা –নিরাশা এসব পর্যায়ক্রমে মানুষের জীবনে আসে। সুখের পরে দুঃখ, দুঃখের পরে সুখ –এভাবেই জীবন কাটে। কারো সুখের পাল্লা ভারী, কারো বা দুঃখের। সেইদিক দিয়ে কেউ ভাগ্যবান, কেউ ভাগ্যহত। 

জন্মের পর মাতৃক্রোড় এক পরম সুখের স্থান। যারা মায়ের কোল পায় তারা পরম ভাগ্যবান। পরম স্নেহে, পরম নির্ভরতায় স্বর্গীয় বিমল আনন্দে কাটে তাদের শিশুকাল। হাঁটি হাঁটি পা পা করে মাতৃ ক্রোড় ছেড়ে নেমে আসে মাটিতে। তারপর বাটির অঙ্গন ছেড়ে প্রাঙ্গনে। তারপর বাল্যকাল, হাসি আর আনন্দ, খেলাধুলা, অক্ষরজ্ঞান লাভ, বিদ্যালয়ে প্রবেশ। পরে শুরু হয় মহাযজ্ঞ। জ্ঞান অর্জনের তপস্যায় ছাত্রজীবন গ্রহণ। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাপ অতিক্রম করে অগ্রসর হতে থাকে। পদার্পণ করে যৌবনে। যৌবন হচ্ছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। ‘এখন যৌবন যার/সময় হচ্ছে তার যুদ্ধে যাবার।’ জীবনে যা কিছু অর্জন, এই যৌবনকালেই সম্ভব। যে যেমনই ব্যক্তি হোক, তার কিছু প্রাপ্তি –ভাল হোক, মন্দ হোক, সফলতা ব্যর্থতা – সব এই সময়ে অর্জিত হয়।

সুশীল তরুণ, জীবনের একটি লক্ষ্য স্থির করে। সেই লক্ষ্যে সে অগ্রসর হয়। নিজেকে প্রস্তুত করে। বিশেষ কোন লক্ষ্য না থাকলে সেই যুবক পথ হারায়। লক্ষ্য না থাকলে গন্তব্যে পৌঁছাবে কি করে? ধরা যাক কেউ শিক্ষক হতে চায়। তাকে মনদিয়ে বিদ্যা উপার্জন করতে হবে। পাঠ্য বহির্ভূত পুস্তকাদিতে মনোনিবেশ করতে হবে। নিজের অধীত জ্ঞান অন্যকে দান করবার ক্ষমতা আয়ত্ত করতে হবে। ‘যতই করিবে দান, তত যাবে বেড়ে।’ বিদ্যা দান করার মধ্য দিয়ে নিজের জ্ঞানের পরিধি বিস্তার লাভ করে। এভাবে একদিন সে সুশিক্ষক হওয়ার গৌরব লাভ করে।   

অন্যদিকে যদি সেই যুবক কোন রকমে পরীক্ষা পাশ করে আর কোন উপায় নেই বলে শিক্ষকের পেশা গ্রহন করে, তবে তার ফল হবে বিপরীত। জ্ঞানের ভান্ডার তার অপূর্ণ। সুতরাং দান করবে কি? পাঠ্যপুস্তকের একই সিলেবাস সারাজীবন ধরে আউরে তিনি নিঃস্ব হবেন। শিক্ষকতার আনন্দ বা গৌরব লাভ তার কোনদিন হবে না। রিক্ততাই তার জীবনের শেষ পাওয়া হবে। 

এরকম সকল পেশায় মানুষকে দক্ষ ও পারদর্শী হতে হবে। নচেৎ সফলতা আসবে না। সফলতাই জীবনের সুখ। নিজের ও পরের কল্যাণ সাধনই জীবনের সন্তুষ্টি আনয়ন করে। এই সন্তুষ্টিই আনন্দ। আনন্দই সফলতার বার্তা বহন করে। 

অনেকে বলেন গ্রহ, নক্ষত্রই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে। যা ভাগ্যে আছে তাই হবে। সুতরাং সে ব্যক্তির করবার তেমন কিছু নেই। গ্রহ নক্ষত্র আসলেই ভাগ্য স্থির করে কিনা তা জ্যোতিষীরা জানেন। তবে এটি একটি বিতর্কিত বিদ্যা। 

অনাদিকাল থেকে মহাশূন্যে গ্রহ নক্ষত্র নিজেরাই অবিরত ঘুরপাক খাচ্ছে, তাদের কেন্দ্রের মহাশক্তিকে ঘিরে। আবর্তনের নিজস্ব ও নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। ভূ-পৃষ্ঠে ২৪ ঘন্টায় যত মানুষ জন্মগ্রহন করে তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণে এসব গ্রহ নক্ষত্রের কোন ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে হয়না। একই সময়ে জন্মগ্রহনকারী সকল জাতকের ভাগ্য একই রকম হয়না। সেইরকম একই ঘটনার শিকার সকল মানুষের জন্ম একই সময় হয়নি। তবুও অনেকে এসব গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থানের সময়ের সঙ্গে মানুষের জন্মের একটা সম্পর্ক স্থাপন করে দীর্ঘকাল গবেষণা করে তারা এক যোগসূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করে। এরকম একটি চিন্তার চর্চা করে তারা হয়তো একটি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। তবে কবে আসবে সেইদিন যেদিন জ্যোতিষিরা হস্তরেখা দ্বারা অনাগত ভবিষ্যতের সকল তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারবে। সকল বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে মানুষকে, সে আশা সুদূর পরাহত।

ভাগ্যের হস্তে সব সমর্পণ করে কেউ সাফল্যের পথে অগ্রসর হতে পারেনা। যে তরী যাত্রীকে তীরে ভিড়ায় সে তরীকেও চালনা করতে হয়। ভাগ্যে যাই থাকুক, মানুষকে তার অন্বেষণ করতে হয়। God has created food for the birds. But they are to fly for it. জীবনের পথকে নির্মাণ করতে হয়। তবেই সে পথে সে হাঁটতে পারবে তার গন্তব্যে পৌঁছার জন্য। একদিন পথের শেষে এসে দেখবে, ‘বেলা যে পড়ে এলো, জলকে চল।’ সময় শেষ। জীবনের অপরাহ্ন সামনে গোধূলী লগ্নের ম্লান আলো। জল নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা তার হিসাব কষতে হবে। হিসাব বরাবরই ভুল হবে, মিলবে না আর। চুপি চুপি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসবে বক্ষপিঞ্জরের ওপার হতে। তারপর একদিন নিজের চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক, হস্ত –পদ সব বিদ্রোহ করবে। মালিকের কথা আর শুনতে চাইবে না। অধীনস্তদের অধীনে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে। সকল কর্ম সমাপ্ত। চুকিয়ে দিতে হবে সকল লেনা দেনা। তামাম শোধ। বিচরণের পরিধি সীমিত। ক্রমে গৃহকোণ, তারপর শয্যা। পদচিহ্ন আর কোথাও পড়েনা। অপেক্ষা করতে হয় জীবন নাটকের শেষ দৃশ্যের।

‘জন্মিলে মরিতে হবে/অমর কে কোথা কবে,
চিরস্থির কবে নীর/ হায়রে জীবন নদে।’

এ যে চিরন্তন বাণী। অনন্ত কালের ধারায় ক্ষণিকের জীবন। কত সুখ, কত দুঃখ, কত বিচিত্রতার ভিতর দিয়ে অতিক্রম করতে হয়।  একটু সুখের জন্য কত না সংগ্রাম করতে হয়। কঠোর পরিশ্রমে তৃপ্ত হয় এই ভেবে যে একদিন তার পরিশ্রমের সোনার ফসল তার গোলা ভরে দেবে। 

‘জীবন যেন পদ্মপত্রে নীড়।’ মৃদু সমীরণে কত না সহজে ঘটে তার পতন! এ যে অমোঘ, এ যে বিধান। জন্ম, জরা, মরণ!   

     

২০০১


Wednesday, November 26, 1997

আমাদের হেলেন আপা

স্মৃতিচারণ মূলক রচনা


বিদ্যাময়ী গার্লস’ হাই স্কুল। ময়মনসিংহের তথা সমগ্র বাংলাদেশের সেরা স্কুল। আমরা গর্ব বোধ করতাম বিদ্যাময়ী স্কুলের ছাত্রী ছিলাম বলে। সে সময় হেলেন আপাকে পাই আমাদের শিক্ষক হিসাবে। সবে মাত্র সপ্তম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছি। নতুন ক্লাসে নতুন আপাদের সাক্ষাৎ লাভ, সেটা একটা খুবই রোমাঞ্চকর ঘটনা। একটি মেয়ে বললো, এবার আমাদেরকে বাংলা পড়াবেন হেলেন আপা। শুনে চমকে উঠলাম। হেলেন আপা! যাকে দূর থেকে দেখেছি, ভয় পেয়েছি। তিনিই স্বয়ং আমাদের ক্লাস নেবেন। মেয়েটি বলল, কেন আমরা এখন বড় ক্লাসে পড়িনা?  আমরা তো প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রথম সোপানে পা রেখেছি। 

প্রথম বাংলা সাহিত্যের ক্লাসে হেলেন আপার আগমন। ক্ষণটি বেশ স্পষ্টই স্মৃতিতে ভাসে। প্রথম পিরিয়ডেই আপা আমাদের শ্রেণী কক্ষে প্রবেশ করলেন। যেন এক মহিয়সী নারী আমাদের সামনে উপস্থিত। আমরা সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যথাযথ অভিবাদন জানালাম। তিনি মেয়েদের নাম ও মেধার ভিত্তিতে পরিচয় জেনে নিলেন। তাঁর সৌন্দর্য, রুচিশীল পোশাক দেখে আমরা চমৎকৃত হলাম। তিনি বই খুলে একটি গল্প নির্বাচন করে আমাদেরকে পড়াতে শুরু করলেন। গল্পটির নাম ছিল ‘প্যারী নগরী’। হেলেন আপা তখন সদ্য বিলেত ফেরত। ইংল্যান্ডের ওপারেই ফরাসী দেশ। যার রাজধানীর নাম প্যারিস। হেলেন আপা সে দেশও ভ্রমন করে এসেছেন। প্যারিসকে সে দেশের লোকেরা প্যারি উচ্চারণ করে। হেলেন আপা স্বচক্ষে দেখে আসা পৃথিবীর সুন্দরতম শহরের বর্ণনা দিতে লাগলেন। যেন উনার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও সেই শহর ঘুরে ঘুরে দেখছি। বইয়ে যা কিছু লেখা আছে, তিনি তার সবকিছু দেখে এসেছেন। আমরা তাতে পুলকিত হয়েছি সবচেয়ে বেশী। ধাতু নির্মিত আইফেল টাওয়ারের কথা, শহরের স্থাপত্য শিল্পের কথা, রাস্তা ঘাটের কথা, প্রাচুর্যের কথা, সীন নদী  ও তার তীরভূমির নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যের কথা –সব তিনি বর্ণনা করেছেন অতিশয় প্রাঞ্জল ভাষায়। তাঁর পাঠদানের পদ্ধতি ছিল খুব সুন্দর। উনার পড়াবার স্টাইল এত আকর্ষণীয় ছিল যে বাংলা গদ্য আর গদ্যময় মনে হতো না। পাঠদানের ফাঁকে ফাঁকে হেলেন আপার প্রাসংগিক জ্ঞানদান আমাদেরকে বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে সচেতন করে তুলেছে। আমরা বিস্মিত হলাম যে আপা কেবল বাহিরে নয়, অন্তরেও সুন্দর। পরিপূর্ণ একজন মানুষ ও দক্ষ শিক্ষক। তিনি নিজে সাহিত্য চর্চা করেন। তিনি বহু গ্রন্থের প্রণেতা। জীবন ও সমাজ সচেতন একজন লেখক। জীবন ও জগতের ঘাত প্রতিঘাত ও আনন্দ –বেদনার প্রতিচ্ছবি তার গল্পে, উপন্যাসে রূপায়িত করেছেন। তাঁর লেখা ‘আমার পরিচিত বৃহত্তর ময়মনসিংহের কয়েকজন বিশিষ্ট নারী’ –একটি বিশিষ্ট গ্রন্থ। এটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ বলে আমি মনে করি। তিনি যথেষ্ট শ্রম, মনোযোগ দিয়ে সাফল্যের সঙ্গে এই বইটি প্রকাশ করে একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ময়মনসিংহের তখনকার দিনের শিক্ষিত মেয়েদের জন্য এটি একটি ইতিহাসও বটে। বইটি একটি মহা মূল্যবান গ্রন্থ। তিনি আরো লিখুন এবং সুস্থ ও দীর্ঘজীবন লাভ করুন – এই আমার প্রার্থনা। একটি অনন্য প্রয়াসের জন্য হেলেন আপাকে আন্তরিক ধন্যবাদ  জানাই।

তারিখ – ২৭.১১.১৯৯৭ 

ঢাকা।

পরিশিষ্ট

হেলেন আপার দেখা পাইনি অনেকদিন। তার সাক্ষাৎ লাভের জন্য চেষ্টা করেছি অনেকবার। পরিচিত অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি তিনি কোথায়? তারা বলেছেন, তিনি দেশে নাই। বিফল মনোরথ হয়ে আশায় আশায় দিন গুনেছি, যেদিন তিনি দেশে আসবেন সেদিন উনার সঙ্গে দেখা করতে যাব। কিন্তু আশা কুহকিনী। মার্চের একদিন পত্রিকা খুলে দেখি হেলেনা খান আর নেই। চলে গিয়েছেন প্রিয় মানুষজন, প্রিয় মাতৃভূমি ত্যাগ করে সেই পরপারে। আর একটিবারও ফিরে আসবেন না। এই যে আমি তোমাদের পরম প্রিয় হেলেন আপা ফিরে এসেছি, তোমাদের কাছে –এ কথাটি আর বলবেন না। ‘এ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়।’ 

পত্রিকায় সংবাদটি দেখে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। একদৃষ্টে চেয়ে থাকলাম সেই ছবিটির পানে। আর তিনি কথা কইবেন না। কলমটি হাতে নেবেন না। লিখবেন না আমাদের জন্য। আমাদের মনের কথাটি আর বলবেন না –‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক। আমি তোমাদেরই লোক।’

কিন্তু তিনি সশরীরে না এলেও আছেন আমাদের মাঝে, থাকবেন আমাদের মাঝে –স্মৃতির মণিকোঠায়। বিদ্বান, বুদ্ধিমান, মমতাময়ী এবং একজন আদর্শ শিক্ষাদানকারী ও সুপথে চলার উপদেশ দানকারী হিসেবে আমাদের অন্তরে চির জাগরূক থাকবেন। তার অন্তর ছিল আলোকিত। তিনি সকল ছাত্রীদেরকে আলো দান করে গেছেন। তিনি উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। সেই সময় খুব কম সংখ্যক মেয়ে সেই সুযোগ লাভ করেছিলেন। সেখান থেকেই তিনি শিক্ষার আলোর মশালটি পরবর্তী নারী শিক্ষা অর্জনের জন্য তুলে ধরেছিলেন। আমরা তাঁর ছাত্রী। অনেক প্রতিকূল অবস্থা অতিক্রম করে শিক্ষার আলোকে আলোকিত হয়েছিলাম। তাই তাঁর কথা আজ খুব মনে পড়ছে। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট লেখিকা। প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। সমাজের এবং মেয়েদের অনেক সমস্যায় আলোকপাত করেছেন। শিক্ষত মেয়েদের সুস্থ চিন্তা ধারার দুয়ার খুলে দিয়েছেন। এগিয়ে চলার উৎসাহ দান করেছেন। 

আজ তিনি নেই। মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ থেকে কারো নিস্তার নেই। তবুও হৃদয় বীণায় তার চলে যাওয়ার বেদনার সুর বাজে। তার জন্ম সার্থক। জীবন সাফল্যময়। এটাই মানুষের জীবনের বেঁচে থাকার সার্থকতা। তাঁকে আমরা চিরকাল স্মরণ রাখবো আমাদের হৃদয়ের মণিমঞ্জুষায়।

‘জীবনের যাত্রাপথে 
কত অগণিত যাত্রীচলে
বিরাম, বিশ্রামহীন –
কেবা মনে রাখে?
তবু তারি মাঝে ক্ষণিক দাঁড়িয়ে 
স্মৃতির ফলকে
যারা পদচিহ্ন আঁকে,
তারা মনে থাকে।’

আমাদের হেলেন আপা ইহলোকে যেমন আলোকিত ছিলেন পরলোকেও সেরকম শান্তি লাভ করুন এবং পরম করুণাময়ের ক্ষমা ও দয়া প্রাপ্ত হউন। এই আমার প্রার্থনা।

০৪.০৭.২০১৯     

সেই হাতখানি

  এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা ...