Saturday, January 7, 1978

আমাদের আবু ভাই

 বগুড়া ক্যান্টনমন্টে তখন নর্মিানাধীন।সজেন্য র্কনলে হারুন এবং অন্যান্য অফসিারগণ ক্যান্টনমন্টেরে বাইরে শহরে বাড়ি ভাড়া করে বসবাস করতনে। আমরা যে আলাকায় বাসা নয়িছেলিাম তার নাম ছলি ঠনঠনয়িা। সময়টি ছিল ১৯৭৮ সালরে জানুয়ারি মাস। বগুড়ায় অবস্থান কালে আমাদের বাড়িতে আরেকটি ঘটনা ঘটে, যা ভুলবার নয়। তা হচ্ছে আমাদের প্রিয় আবু ভাইয়ের (আবু আয়ুব) মৃত্যু। তিনি হারুন সাহেবের আপন চাচাতো ভাই এবং আপন জ্যেষ্ঠ ভগ্নীর স্বামী। তিনি এদের সকলের ফ্রেন্ড, গাইড এবং ফিলসফার ছিলেন। তিনি যেন নিজের ভাইয়ের চাইতে অধিক দায়িত্বশীল ছিলেন। সেই ভাই বুকের ব্যথায় একটু অসুস্থ হন খুলনায়। সেখানকার ডাক্তার বললেন বাত জ্বরের ব্যথা, সেরে উঠবেন। কন্তিু আবু ভাই এর ধারণা হারুনরে চিকিৎসায় তিনি সেরে  উঠবেন। তিনি  বগুড়ায়  এলেন। প্রথমেই  গেলেন  সি.এম. এইচ. -এ । হারুন উনার এক্সরে, দেখেন এবং অন্যান্য পরীক্ষা করেন। তিনি দেখতে পান উনার হার্ট এনলার্জড। বৃহৎ আকার ধারণ করেছে। হাটের অবস্থা মোটেই ভাল নয়। শরীরের জন্য রীতিমত রক্ত সঞ্চালন করা হৃদপিন্ডের জন্য  কষ্ট সাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। হারুন খুব ব্যাকুল হন। কিন্তিু আবু ভাইকে এসব বলেননি। আবু ভাই বাসায় চলে এলেন। বললেন, ‘হারুনরে মুখ কাল হয়ে গেল এক্স-রে দেখে। আমাকে কিছু বললো না। তুমি একটু জিজ্ঞেস করে দেখতো, আমার কি হয়েছে। খুলনার ডাক্তার তো বললেন বাতের ব্যথা, সেরে যাবে অষুধ-পত্র খেলে।’ 

আমার মন ভারাক্রান্ত ছিল আগে থেকেই। কারণ আবু ভাই বাসায় পৌঁছাবার আগেই হারুন  ফোনে উনার বিপদ জনক ব্যাধির কথা জানিয়ে দিয়েছেন। বললাম, ঠিক আছে, আমি এখনই উনার সঙ্গে কথা বলে দেখি। পরে উনাকে বললাম, আপনার হার্টে একটু অসুবিধা দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসার প্রয়োজন। হারুন বাসায় এসে বেড রেস্টের পরামর্শ দিলেন, এবং সেই রকম ব্যবস্থা করে দিলেন। বিছানার শিয়েরের দিকটা উঁচু করে দলিনে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করলেন। পরে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ফিজিসিয়ান ডাক্তার তৈয়বকে কল দিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের বিশেষ বন্ধু। তিনি এসে উনাকে পরীক্ষা করে দেখলেন। চিকিৎসায় একমত পোষণ করলেন। 

সেই সময় বগুড়ায় কোন ইসিজি মেশিন ছিল না। মিলিটারি কিম্বা সরকারী হাসপাতালে, কোথাও ইসিজি মেশিন নেই। রংপুর সিএমএইচ থেকে মেশিন, স্পেশাল পারমিশনে, আনিয়ে উনার ইসিজি করা হল। তাতে দেখা গেল উনার মাইওকার্ডিয়াল ইনফারকশান-হার্টের অবস্থা ভাল নয়। হার্ট  ফেইলিওরের দিকে যাচ্ছে। যে কোনদিন  দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সপ্তাহ দুয়েক বেশ ভালই চলছিলেন। কারণ অসুখটা বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিলনা। বিছানায় থাকতেন বেশীর ভাগ সময়, উঠে বসতেন, টেবিলে এসে খাবার খেতেন। টেলিভিশনে খবর দেখতেন। আমার সঙ্গে অনেক গল্প করতেন দেশের সমস্যার কথা, জীবনের কথা, উনার পরিবারের কথা। আর হারুনরে প্রশংসা করতেন খুব বুঝতে পারতাম হারুন তাঁর খুব প্রিয় পাত্র। একদিন দিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘আমাকে তওবা করাবার ব্যবস্থা কর।’ 

হারুন অফিসিয়াল কাজে রংপুর গিয়েছিলেন। ফিরে আসার পর তাকে জানালাম উনার অভিপ্রায়। শুনে হারুনরে মন খারাপ হল, মুখভার হল। তা লক্ষ্য করে আবুভাই আমাকে বললেন, ‘হারুনকে মন খারাপ করতে নিষেধ কর। মানুষ যারা খাবার আগেই কেবল তওবা পড়তে হয় এমন কোন কথা নেই। আমার ভাল লাগবে সেজন্য করতে চাই।’ 

আমি পারুলরে বোন রানু আপাকে একথা জানাই। তিনি খুব তাড়াতাড়ি সব বন্দোবস্ত করে দেন। মৌলবী সাহেব, দুতিনজন সঙ্গীসহ এসে উনাকে তওবা পড়ান। তিনি নিজেও এসব পাঠ খুব ভাল রকম জানেন। তারপর উনার আরোগ্য লাভের জন্য প্রার্থনা করা হয়। তিনি বললেন, মনের দিক থেকে তিনি খুব আরাম বোধ করছেন, তাতে আমাদের ও মন খুব হালকা হয়। 

হারুন প্রতিদিন উনাকে একবার চেস্ট এগজামিন করেন। কিন্তু অবস্থার উন্নতি লক্ষ্য করা যায় না। মন আরো খারাপ হয়। আবু ভাই খুব ধার্মিক ছিলেন। বসে বসে নামাজ পড়তেন। কারণ উঠাবসা একদম নিষেধ ছিল। আমাদের বাসায় যতদিন ছিলেন ততদিন একদম চিৎ হয়ে কখনও শুতে পারেননি। মাথার দিক উঁচু রেখেই শয়ন করতেন। 

একদিন তিনি বাথরুমে যান সকাল দশটার দিকে। কিন্তু আর উঠতে পারছেন না। বাসায় কেউ নেই নেই, কাজের একটি ছোট ছেলে, আর ভাসুরের ছোট ছেলে ফারুক ছাড়া। দুই ছোট ছেলেকে দিয়ে কোন কাজ হল না। তিনি লম্বা চওড়া বিশাল দেহি মানুষ। বাড়ির সামনে। একটি দোকান ছিল। সেই দোকানী  দুলালকে ডেকে আনলাম। দুলাল ও দুই ছোট ছেলে বহু কষ্টে উনাকে বাথরুম থেকে বের করে এনে চেয়ারে বসায়। পরে চেয়ার টেনে এনে বারান্দায় রৌদ্রে বাসানো হয়। 

আমি খুব ঘাবড়ে যাই। শুধালাম, ‘বুবুকে (উনার স্ত্রীকে) আসতে বলি? ’ 

বললেন,‘না, বাসা খালি, বাবুল ও অফিসে যায়। থাক, উনার আসার প্রয়োজন নেই। তুমিই তো আমার দেখাশুনা করছ।’ 

বললাম, ‘বুবু হয়ত আপনার পছন্দের খাবার তৈরী করতে পারতেন। আপনার হয়ত ভাল লাগতো। আপনি একদম খাবার খাচ্ছেন না। আমার খুব চন্তিা হচ্ছে।’ 

বললেন, ‘না, তোমার রান্নাই ভাল। আমার মুখে রুচি নেই। আবার ঠিক হয়ে যাবে শীগিগীরই।’ 

আবু ভাই এরকম অসুস্থ শুনে আমাদের আত্মীয় বন্ধু অনেকেই আমাদের বাসায খুব আসতেন, উনার খবর নিতেন। তখন অনেকেই আমাকে বলতে লাগলেন, উনার স্ত্রী পুত্রকে ডাকেন, উনার অবস্থা ভাল ঠেকছে না। একদিন তিনি খুলনায় ট্রাংকলে কথা বলেন বাবুলের সঙ্গে। সকলের খবরাখবর জানতে চাইলেন। কে একজন মারা গিয়েছেন উনার বগুড়ায় আসার আগের দিন, তাদের সবার কুশল সংবাদ শুধালেন। পরের দিন হতে তিনি একটু বেশী কথা বলতে লাগলেন। আমি হারুনকে বললাম, ‘খুলনায় ফোন বুক কর।’ যান্ত্রিক কারণে সেদিন খুলনার লাইন বিকল ছিল। বগুড়ার আমজাদ ভাইয়ের স্ত্রী টেলিফোনে চাকুরী করতেন। তিনি মেজর হারুনরে  ফোনকল  পড়ে আছে দেখে বাসায় ফোন করেন। ওনাকে  বললাম সব কথা। তিনি রাজশাহী দিয়ে খুলনায় ফোন কানেকশান লাগিয়ে দেন। কথা ভাল মত শোনা যাচ্ছিলনা। আমি হারুনকে বললাম, কষ্ট করে লাইন পাওয়া গিয়েছে, অন্য কোন কথা নয়। বাবুলকে বল ওর আম্মাকে নিয়ে আজই রওনা হতে। বাবুল কথা বুঝতে পারে না। তবুও হারুন উচ্চস্বরে একই বার্তা বারবার উচ্চারণ করতে লাগলেন। লাইন সত্যি কেটে গেল। জোরে জোরে কথা বলার দরুণ  আবু ভাই সবই শুনে ফেললেন । তিনি বললেন, ‘কেন তাদেরকে টানাটানি করছ। আমি কয়েক দিনের মধ্যে চলে যাবো। সেখানে আমার অনেক কাজ পড়ে আছে। একটু ভাল হলেই আমি চলে যাবো।’ 

খাদ্যের প্রতি উনার খুব বিতৃষ্ণা। খাবার দেখলেই বিরক্ত বোধ করতেন। বলতেন এত খাবার । একটু খানি দাও। পরেই ভাল লাগছে না বলে, একেবারেই খেতেন না। বলতেন একটু পরে দিও। কমলা লেবু একটু খানি মুখে নিতেন। অন্য কিছুই নয়। পরে আমি অনুভব করেছিলাম এবং অন্যদের কাছ থেকে শুনেছিলাম যে, মৃত্যুর পরওয়ানা যার এসে যায়, তার মুখের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। 

সেদিন সন্ধ্যায় আমি উনার শয্যাপাশে বসা। উনি আধো শোয়া অবস্থায় অনেক গল্প করলেন। নিজের গল্প, পরিবারের গল্প। মাঝরাত থেকে একটু প্রলাপ বকতে শুরু করলেন। তন্দ্রাচ্ছন্নভাব। তারই মাঝে কাকে যেন অংক শেখাচ্ছেন। তিনি ছিলেন সেই যুগের বি.এস.সি পাশ এবং অংকে ওস্তাদ । টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন ডিপার্টমেন্টে  সে আমলে ইঞ্জিনিয়ারের চাকুরী করতেন। যারা মৃত এবং বহুদিন পূর্বে গত হয়েছেন তাদের সকলের নাম ধরে কথা বলতে লাগলেন। আমি তাদেরকে অনেককে চিনি না। তিনি তাদের কথা বলতে থাকলেন অনর্গল। 

হারুন সাহেব, বাড়িওয়ালা ও অন্যান্য পরিচিত সকলকে আবু ভাইয়ের অবস্থার অবনতির কথা জানিয়ে রাখলেন। পরদিন বাসা র্ভতি লোকজন। কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দিচ্ছেন। কিন্তু নিজে থেকে কথা বন্ধ রাখতে পাচ্ছেন না। আর্মি ইউনিটের মৌলভী সনাহেবরা এসে অনেক দোয়া পড়ালেন। আর্মির চিকিৎসকরা এলেন। দেখলেন, বুঝলেন যে আর তেমন কিছু করবার নেই। 

সন্ধ্যার দিকে বুবু ও বাবুল (উনার স্ত্রী পুত্র) এসে পৌঁছালেন। আবু ভাই তাদেরকে চিনলেন। বললেন, ‘এসেছ, এসেছ তোমরা?’ 

তারপর আবার সেই প্রলাপ, সারারাত এইভাবে কেটে গেল। ভোরেও বাসায় প্রচুর লোকজন। ব্রিগেড কমান্ডার সাদেকুর রহমান চৌধুরী নির্দেশ দিলেন, মেজর হারুনরে  যা কিছু সাহায্যের প্রয়োজন, তা যেন ইউনিট থেকে দেয়া হয়। মেজর হারুন সাহেবের পুরো ইউনিট আমাদের পাশে ছিল। সি এম এইচ -এর সি. ও. কর্নেল আব্দুস সালাম, মেজর হারুনকে সর্ব প্রকার সহযোগীতা দান করেছেন। মেডিকেল এসিসট্যান্টরা সাকশান মেশিন দিয়ে একটু পর পর উনার গলা পরিষ্কার করে দিতে থাকলো। 

এদিকে আমি মুখ রোচক খাবার কি দেয়া যায় সেজন্য বাজারে লোক পাঠালাম। শিং মাছের পাতলা ঝোল দিয়ে যদি নরম ভাত একটু খাওয়ানো যায়। সকাল নয়টার দিকে কমলা লেবুর কোয়া ছিলে উনার মুখে তুলে দিচ্ছিলাম। পিছনে বেড উঁচু করে উনাকে বসানো হল। একটি কোয়ার ভেতরে বীজ ছিল। আস্তে আস্তে সেটিকে বের করে নিজের হাতে নিয়ে আমাকে দিলেন। 

বললাম, ‘মিষ্টি কমলা আরেকটু খান, আপনার ভাল লাগবে।’ 

বললেন, ‘কি যে বল তুমি!’  

তারপর আর খাবেন না বলে ইশারা করলেন। মনে মনে ভাবলাম, আজ দুপুরের খাবারটা একটু আগেই দেবো। উনার খাদ্য গ্রহণ বিশেষ প্রয়োজন। শরীরের শক্তি ক্রমশই কমে আসছে। খাচ্ছেন না বলেই এই অবস্থা। 

 একটু পরেই উনার গলায় কেমন ঘরঘর আওয়াজ হতে লাগলো। বুবু ব্যাকুল হলেন। বললেন, এ আওয়াজ আমার চেনা। জীবনে অনেকবার এ আওয়াজ আমি শুনেছি। এ আওয়াজ বাঁচার আওয়াজ নয় বলে কান্না শুরু করলেন। সেই সময় আমাদের বাসা লোকে লোকারণ্য। হারুনরে চাচাতো ভগ্নিপতি সালউদ্দিন ভাইও ঘরে বসে আছেন। আরো কতজন! মৌলভী সাহেব কোরান তেলাওয়াত করতে লাগলেন। মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট গলা পরিষ্কার করে দিচেছ। বুবু, বাবুল, হারুন উনাকে জাপটে ধরে  রেখেছেন। আমি ও অন্যান্যরা উনার হাতে, পায়ে ধরে রাখলাম। প্রায় আধ ঘন্টা ধরে এরকম চলতে থাকলো। হঠাৎ  উনার গলার আওয়াজ থেমে গেল। একবার চারিদিকে তাকিয়ে তাঁর চোখের পাতা মুদ্রিত হল। তিনি শান্ত হলেন। নীরব হলেন। চলে গেলেন মহা প্রস্থানের পথে চিরতরে। আমাদের সকলের হাতের বন্ধন আগ্রাহ্য করে কখন চলে গেলেন বুঝতে পারলাম না। 

সারা শরীর গরম, হাত, পা ঠান্ডা নয়, স্বাভাবিক। মনে হয় ক্লান্ত  হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। কিন্তু না তিনি আর ইহজগতে নেই। মাত্র একটি নিশ্বাসের এপার ওপার। এই মাত্র ছিলেন, এখনই নেই। নাই, নাই, কোথাও নাই। মাত্র ৫৭ বৎসরের দেহ ত্যাগ করে তিনি চলে গেলেন। ঘর ভরা লোক। কেউ তাকে রাখতে পারলো না। সকল মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে তিনি উর্দ্ধলোকে আরোহন করলেন। কত কাজ করা বাকী ছিল। সব ফেলে রেখে  চলে গেলেন। 

‘প্রিয়া তারে রাখিল না,রাজ্য তারে ছেড়ে দিল পথ,
রুধলি না সমুদ্র পর্বত।
আজি তার রথ
চলিয়াছে রাত্রির আহ্বানে
নক্ষত্রের গানে
প্রভাতের সিংহ-দ্বার পানে।
জীবনেরে কে রাখিতে পারে!
আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে।
তার নিমন্ত্রণ লোকে লোকে
নব নব পূর্বাচলে আলোকে আলোকে।’

আমরা গভীর দুঃখে মগ্ন হলাম। উপস্থিত আমাদের বন্ধু ও অন্য ভদ্র মহিলাগণ আমাদের ন্ত্বনা  দিতে লাগলেন। জীবনের  বাস্তবতা কথা বললেন কেউ কেউ। সকলকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, জন্মিলে মরিতে হবে........। কত কথা বলে তারা আমাদের সীমাহীন শোকে অংশ গ্রহণ করেন। 

বাজার করতে দিয়েছিলাম অনেক কিছু। রান্না আর করা হলনা। তিনি আর কোনদিন বলবেন না, ‘একটু খাবার দাও, ক্ষুধা পেয়েছে।’

সকলে মিলে আবু ভাইয়ের শেষ কৃত্যের প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন। দেখে মনে হচ্ছে তিনি ঘুমাচ্ছেন শান্ততিে । প্রাণহীন দেহ পড়ে আছে মনেই হচ্ছে না। ডাকলেই যেন উঠে বসবেন। নামাজ পড়বার জন্য তৈরী হবেন, কথা বলবেন। কিন্তু তা আর কোনদিন হবে না। উনার নুরানী চেহারা বড় পবিত্র দেখাচ্ছিল। বিকেলের দিকে নামাজে জানাজা শেষে বগুড়ার ভাই পাগলার মাজার সংলগ্ন সরকারী কবরস্থানে উনাকে সমাহিত করা  হলো। হারুন সাহেবের পুরো মেডিকেল ইউনিট ও অন্যান্য বন্ধু বান্ধব, পরিচিত ও সকলে ও উনার জানাজায় শরীক হলেন।

আমাদের এই দুঃসময়ে পারুলরে বোন রানু আপা, আমাদের বন্ধু কাইয়ূম সাহেব, আমাদের দেশের ছেলে মহিউদ্দিন, বাড়িওয়ালার ছেলে আক্কাস ও অনান্য স্থানীয়রা ভীষণভাবে সাহায্য করেছিলেন। আল্লাহর রহমতে দাফন কার্য এমন সহজতর হয়েছিল, যা কল্পনা করা যায় না। নিজের গ্রাম নয়, নিজের শহর নয়, আত্মীয়স্বজন নেই সেখানে,তবু ও সকলে এমন সাহায্যের হাত বাড়ালেন যেন আপনার চেয়ে আপন তারা। মানুষের বিপদে যারা পাশে দাঁড়ায়, তারাই প্রকৃত আপন জন। আমরা চিরকাল তাদের সহানুভূতি ও সদাচরণের কথা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ রাখবো। 

আবু ভাইয়ের মৃত্যু বগুড়াকে আমাদের নিকট চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। উনার অর্ন্তধান  আমাদের পরিবারে এক বিরাট ক্ষতি। উনার মৃত্যুতে পরিবারের সকলের মনোবল ভেঙ্গে যায়। আজও আমরা উনার জন্য খুবই কষ্ট পাই। উনার  অভাব অনুভব করি। তাঁর কবর আজও সেই গোরস্থানে বাঁধানো রয়েছে। চির নিদ্রায় শায়িত আছে তাঁর মরদেহ। মহাকালের যাত্রীদের কাফেলায় তিনি শরীক হয়েছেন।

Thursday, December 16, 1971

লাহোর খান


 ভূমিকা

এই রচনাটি জীবনের জলছবি নয়, সমাজের চালচিত্র নয়, ফেলে আসা অতীতের ঘটনাবলীর স্মৃতিচারণ নয়। এটি হচ্ছে নিজের অবস্থান থেকে একটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করবার ভয়ংকর বাস্তব অভিজ্ঞিতার বর্ণনা। এ সংগ্রাম ছিল পাকিস্তান সরকারের দীর্ঘদিনের অবহেলা, অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চনা ও কুশাসনের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করবার সংগ্রাম। ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়ের মায়া ত্যাগ করে কিশোর, তরুণ, যুবা এক মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। যার জন্য মূল্য দিতে হয়েছিল এক সাগর রক্ত। অর্জিত হয়েছিল এক লাল সূর্য খচিত অমূল্য রত্ন -সবুজ পতাকা। তাই আজ বিশ্বের দরবারে স্থান করে নিয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমরা পাকিস্তানে ছিলাম। সে অবস্থান থেকে আমি নিজে চোখে যা দেখেছি, যা শুনেছি এবং উপলব্ধি করেছি, তারই একটি অংশ এই কথিকাটিতে তুলে ধরবার প্রয়াস পেয়েছি। অবশেষে পাকিস্তানিরা মারাত্মক যুদ্ধে পরাজিত হয়। আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এই দিনিটিকে আমরা বলি বিজয় দিবস। পাকিস্তানিরা বলে Fall of Dhaka.. 

তাদের পরাজয়ের দিনটির একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা, এই গল্পের মূল চরিত্র, যার নাম লাহোর খান।

স্থান - কোয়েটা, ১৯৭১  

ই.এম.ই. মেসে আসার পর আমাদেরকে একজন ব্যাটম্যান দেওয়া হল। ব্যাটম্যানরা সাধারণত অফিসারের ইউনিফর্ম ইত্যাদি দেখাশুনা করে, সবসময় তৈয়ার রাখে আর ঘরের ছোটখাট কাজে সহায়তা করে। এই লোকটির নাম লাহোর খান। জাতিতে পাঠান। নামটি যেমন অদ্ভুত, স্বভাবটিও তেমনি একরোখা, রাগী। আমি মনে মনে তাকে ভয় করতাম।

হারুন সাহেব তার ফিল্ড  অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে অন্যত্র বদলি হয়ে যান। চলে যাওয়ার পূর্বে লাহোর খানকে ব্যাটম্যান হিসাবে মনোনীত করে যান। আমি আমার ভয়ের কথাটি ব্যক্ত করলাম। তিনি বললেন, আমরা বাঙ্গালী, আমাদের জীবন বিপন্ন। যে কোন মুহূর্তে, যে কোন বিপদ এসে আমাদের জীবন পর্যুদস্ত করতে পারে। আমাদের কিছুই করবার নেই। এই একরোখা পাঠান তোমাদেরকে নিরাপদ রাখবে। তার জিম্মায় যখন তোমরা থাকবে, তখন সে তার নিজের জীবন বাজি রেখে তোমাদেরকে বাঁচাবে। এই কথাটি বিশ্বাস কর। বাকি আল্লাহ্ ভরসা। 

ই.এম.ই. অফিসার্স  মেসে আমি দুটি স্যুইট নিয়ে বসবাস করতাম। যুদ্ধের সময় সন্ধ্যার পর Black Out থাকতো। সমগ্র এলাকা নিঃশব্দ, গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। আলো জ্বালাবার উপায় ছিলনা। বাচ্চার খাবার সূর্যাস্তের পূর্বেই তৈরী করে রাখতে হতো। টর্চ বা কোন প্রকার আলো জ্বালাতে পারতাম না। কারণ ঐ আলোর অজুহাতে হয়ত আমাকের নাজেহাল করবে, শত্রু পক্ষকে সহায়তা করার অপরাধ বলে। যখন লাহোর খান বিকালে কাজ করে চলে যেতো, তখন সে সকল জানালা-দরজা বন্ধ করে দিয়ে যেতো। যতক্ষণ না আমি ভিতর থেকে দরজা ভালমত বন্ধ করতাম ততক্ষণ সে দাঁড়িয়ে থাকতো। বারবার সাবধান করে যেতো যেন কোন কারণে দরজা না খুলি। যাওয়ার আগে সে দরজা ধাক্কা দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতো আমি দরজার সব ছিটকিনি লাগিয়েছি কিনা। লাহোর খান চলে যাওয়ার পর আমি দরজার সামনে একটি চেয়ার রেখে দিতাম। যদিও অর্থহীন তবুও আমি দুটি দরজার সামনেই চেয়ার রেখে দিতাম। একদিন সকালে ব্যাটম্যান এসে এ ব্যাপারটি লক্ষ্য করে। সেদিন থেকে সে নিজেই দরজার সামনে চেয়ার রেখে দিয়ে বাইরে যেতো। সন্ধ্যার পর জানালা বন্ধ করা খুব ভয়ঙ্কর ব্যাপার ছিল আমার জন্য, কারণ জানালার নেট ছিল, কিন্তু গ্রীল ছিলনা। সে দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও আমার গা ছমছম করে। তখন কি করে যে আমি একটি ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে ঐ বিদেশে শত্রুপক্ষের লোক হয়ে একাকী একটি মেসে যেখানে আর কোন মহিলা নেই,  দিবারাত্রি অতিক্রম করেছিলাম, তা আজও বিস্ময় জাগায়। 

একটি ক্রিশ্চিয়ান মহিলা এসে আমার সকালের কাজ করে দিয়ে যেত। নাম তার শিলা। সে একটি অতিশয় ভদ্র মেয়ে। আমার শিশুকন্যাকে খুব আদর করতো। আরেকজন ছিল পুরুষ সুইপার। সেও মসীহ্-ক্রিশ্চিয়ান। বৃদ্ধই বলা চলে। সাইকেলে চড়ে আসতো। রাজনীতির গল্প করতো প্রায়ই। পাকিস্তানীরা যে বাঙ্গালীদেরকে বঞ্চিত করছে, শোষণ করছে, এ যেন তার নিজের চোখে দেখা। আমি মনে মনে সতর্ক থাকতাম। লোকটি স্পাই নয় তো? হতেই পারে যুদ্ধের সময় স্পাইদের কাজ বেড়ে যায়। যে কেউ স্পাইং এর কাজে নামে। সে বলতো, পাঞ্জাবীরা কখনও বাঙ্গালীদেরকে উচ্চপদ দেয় না; কি সিভিলে, কি মিলিটারীতে! 

-‘কই, আপকা নাজমুদ্দিন কো জেন্রেল বানায়া? সুকরাবর্দীকো (সোহরোয়ার্দী) জেন্রেল বানায়া? নেহি বানায়া।’ আপনাদের বাঙ্গালী জেনারেল কতজন আছেন? উর্দুতে সে ভাষণ দিতে থাকে। সব সুযোগ-সুবিধা, প্রমোশন তারা নিজেরাই ভোগ করছে? ওর কথা শুনে আমি একটা নিরপেক্ষ উত্তর দিতাম। তারপরেও সে বলতো, 'আপকা বাঙ্গাল আজাদ হো যায়েগা।'

কোয়েটা শহর ইরানের কাছাকাছি। পাকভারত রণাঙ্গন থেকে অনেক দূরে। পাঞ্জাবের বর্ডারে তখন প্রচন্ড লড়াই। সেখানকার যুদ্ধাহতদেরকে ট্রেন বোঝাই করে কোয়েটায় নিয়ে আসতো। প্রতিদিন শত শত রক্তাক্ত সৈনিককে কোয়েটার হাসপাতালগুলোতে প্রেরণ করছিল। আর্মির ইউনিটের সুইপার, হাসপাতালেও ডিউটি করে। আহত জওয়ানদের অবস্থা দেখে প্রতিদিন সে আমাকে এ সব সংবাদ বলে। একদিন সে বলছিল এত ‘জখমী আদমী’ হাসপাতালে আসছে যে, সেখানে তিল ধারনের ঠাঁই নেই। একটা কিছু বলতে হয় বলেই আমি বললাম, ‘বহুত আফসোস কি বাত হ্যায়।’  এতলোক মরে যাওয়া, আহত হওয়ার সংবাদে সমবেদনার ভাব জানাতে হয়। এত লোক মরে যাচ্ছে বলে আর্শ্চয বোধ করলাম। সে তৎক্ষণাত বলে উঠলো, সিপাহীদেরকে মরতেই হবে। ‘সারা সাল ইসকো খিলাতে হ্যায়, পিলাতে হ্যায়, সব কুছ করতে হ্যায়, মরনেকা ওয়াক্ত নেহি মরেগা?’ মমার্থ হলো যে, সিপাইদেরকে সারা বছর খাদ্য, পানীয় দেওয়া হয়, যা কিছু প্রয়োজন সব দেওয়া হয়, আর মরবার সময় তারা মরবেনা? তারা অন্যায় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, মরতে তাদের হবেই। লোকটির মন্তব্য শুনে মনে মনে অবাক হলাম। কি অদ্ভুত মানুষের চিন্তাধারা। 

লাহোর খানের প্রসঙ্গে আবার আসতে হয়। তার বড় দুঃখ ছিল যে, তার কোন পুত্র সন্তান নেই। পুত্র সন্তানই পাঠান সমাজে বংশের ধারা বহন করে,  কন্যা  নয়। পুত্র না জন্মালে তাদের বংশের ধারা মরুপথে হারিয়ে যাবে। তাদের গৃহে জ্বলবেনা সাঁঝের প্রদীপ। সে আমার শিশু কন্যাকে খুব পছন্দ করতো। বলতো ‘মেরা ভি এয়ছা হ্যায়, কৈ আওলাদ নেহি হ্যায়। মেরা স্রেফ এক বেটি হ্যায়।’ অর্থাৎ -আমারও বংশধর নেই, কেবল একটি কন্যা! আপনার কন্যার মতই ছোট। বৃদ্ধ বয়সে আমিও একা হয়ে যাবো, মেয়ে চলে যাবে পরের ঘরে! আমার মৃত্যুর পর আমার ঘর আঁধার হবে,কেউ বাতি জ্বালাবে না! 

পাঠানদের গ্রাম আমাদের বাংলাদেশের গ্রামের মত নয়। আমাদের গ্রামগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি গা ঘেঁষাঘেষি করে থাকে। নিবিড় বনজঙ্গল, শস্যক্ষেত্র, খামার, গ্রামগুলোকে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। সেদেশে ছায়াঘন বৃক্ষরাজি নেই। খাঁ খাঁ মরু প্রান্তর। বৃক্ষলতাহীন সমতল ভূমি। মাঠের পর শূন্য মাঠ দিগন্তে হয়ত কোন পাহাড়ে গিয়ে কূল পেয়েছে। সেখানে মাঠে ঘাটে দুর্বাঘাস জন্মায় না। মাটি বড় রুক্ষ। কাঁকড়, পাথর, শুকনো মাটি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। মাঠের মাঝখানে প্রাচীর বেষ্টিত একেকটি গ্রাম। চারিদিকে মাটির দেয়াল অথবা কঠিন শিলাময় পাথরের প্রাচীর। গ্রামটির চারপাশই খোলা প্রান্তর। বিশেষ মৌসুমে তারা গম, ভুট্টা, যব অথবা অন্য ফসল ফলায়। বেশীর ভাগই সেচ ব্যবস্থার কল্যাণে। বৃক্ষ যেগুলো আছে সেগুলো পত্র-পল্লবহীন দাঁড়িয়ে থাকে। শীতের পর যখন একটু বৃষ্টিপাত হয় তখন বৃক্ষলতার শাখা-প্রশাখা প্রাণ ফিরে পায়। হঠাৎ করেই পাতা গজিয়ে তর তর করে বেড়ে উঠে। তারপর তাদের জাত অনুযায়ী ফুলে ফলে ভরে উঠে। ফুল ফলের মৌসুম শেষ হলে আবার উর্দ্ধমুখী হয়ে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তবে বেশীর ভাগ গ্রামেই গাছপালা নেই। একেবারে নিরেট। আমাদের দৃষ্টিতে প্রাণ ধারণ সম্ভব নয়। কিন্তু ওরা বেশ আছে। কুয়ার পানি অথবা ইরিগেশনের ক্যানেলের পানি ব্যবহার করে। আমাদের ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামখানি মেঘে ঢাকা, এরকমটি কোথাও নেই। এরা প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। সেজন্য পরিশ্রমী, কঠোর এবং রাগী। 

লাহোর খানের পরিবারটি বড়। পিতা, পিতৃব্য ও তাদের সন্তান-সন্ততি এক বাড়িতে বাস করে। রক্ষণশীল পরিবার। তবে একটু বেশীই। তারা ধর্মপ্রাণ। তারা যে যেখানে থাকে, সেখানেই নামাজ আদায় করে। লাহোর খানের পরিবার ও আত্মীয়দের মধ্যে চৌদ্দজন লোক আর্মিতে চাকুরী করে। দুর্ভাগ্যবশতঃ তারা সকলেই পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত। 

নভেম্বরে কোয়েটায় প্রচন্ড শীত পড়ে। ডিসেম্বরে পুরো কোয়েটা শহর বরফের নীচে থাকে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মত বরফ কুচি আকাশ থেকে পড়তে থাকে অনবরত। দেখতে দেখতে মাঠ ভরে যায় শুভ্র তুষারে। পত্র পল্লবহীন বৃক্ষশাখাও তাদের সাধ্যমত বরফ ধারণ করে। বাড়ির ছাদ, কার্নিশ সব সাদা। বরফগলা জল ছাদের কার্নিশ বেয়ে যখন নীচের দিকে পড়তে থাকে তখন সেগুলো জমে যায়। সরু কাঠির মত নীচের দিকে সারিবদ্ধভাবে ঝুলে থাকে। বরফ পড়া যখন বন্ধ হয় তখন সম্মুখে দৃষ্টি প্রসারিত করা সম্ভব হয়। যতদূর দৃষ্টি যায় কেবল তুষারবৃত রাস্তা, মাঠ, ঘাট, প্রান্তর আর দিগন্তে আছে পাহাড় পর্বত। সব যেন সাদা টুপি পরে আছে। 

কোয়েটা শহরের চারিদিকে পাহাড়। যখন কোন বরফ মুক্ত দিনে পূর্ব দিগন্তে র্সূযোদয়  হয়, তখন এক অপরূপ দৃশ্য চোখে পড়ে। বরফের চূড়ায় এক নয়ন ভোলানো চোখ ধাঁধানো রূপালী রেখা ফুটে উঠে। ছবিতে যেমন দেখা যায় পিরামিডের ন্যায় পাহাড়, একটির পিছনে আরেকটি, তার পিছনে আরেকটি। ঠিক সেরকম ভাবে রূপালী রেখাটি পর্বত শ্রেণীর উপরিভাগে এক অপূর্ব সৌন্দর্য্যের অবতারণা করে। এরকম হাড় কাঁপানো শীতে আগুন ছাড়া বাঁচা সম্ভব নয়। হাঁড় কাঁপানো শব্দটি কথার গুরুত্ব বোঝাবার জন্য নয়। বস্তুতই হাড়ে কাঁপুনি ধরে। তাই আগুন জ্বালাবার জন্য উদ্ভাবিত হয়েছে ‘কোয়েটা স্টোভ।‘ একটি মাঝারি সাইজের ড্রামের ভিতরে কয়লা ভরে, তাকে ২৪ ঘন্টা জ্বালিয়ে রাখা হয়। তাতেই ঘরখানি গরম থাকে। এই কাজটি করতে হতো লাহোর খানকে। সে কয়লা সংগ্রহ করে কোয়েটা স্টোভটি জ্বালাতো এবং মাঝে মাঝে আরও কয়লা দিয়ে ইন্ধন যোগাতো। গনগনে লাল হয়ে থাকতো স্টোভটি। দেখলেই দোজখের আগুনের কথা মনে পড়তো, কল্পনায় যেমন দেখি। ঘর গরম থাকতো সারাক্ষণ। এই স্টোভের উপরেই পাত্রে পানি গরম হত। ঘর মোছার কাজ, কাপড় ধোয়ার কাজ, সব কাজই এই গরম পানি দ্বারা করা হতো। বাচ্চাকে সন্ধ্যার পর গোসল করিয়ে একেবারে লেপের নীচে ঢুকিয়ে দিতাম। 

বাইরে এত ঠান্ডা যে দরজা খুলে কারো সঙ্গে বেশীক্ষণ কথা বলা সম্ভব হতো না। বাজার থেকে আনা শাক-সবজিগুলো বরফ জমে একসঙ্গে শক্ত হয়ে লেগে থাকতো। কাপড় শুকিয়ে যাওয়ার পর ক্লিপের ভেতরের অংশে বরফ জমে যেত। ফলে দুটি কাপড়ের কোনা টেনে পৃথক করতে হতো। সেজন্য সে দেশের বাড়ির দখিন দিকে তৈরী করা হত একটি সানরুম, কাঁচের ঘর, যার ভেতর রোদ ঢোকে, কিন্তু বাতাস ঢোকেনা। ঐ রুমটি বাসায় সবচেয়ে প্রিয় স্থান দিনের বেলায়। বড় কোজি, আরামদায়ক। 

আমাদের ব্যাটম্যান লাহোর খান একেক দিন একেক সংবাদ নিয়ে আসতো আমার জন্য। সে বলে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানদের উপর হিন্দুরা খুব জুলুম করছে। মুসলমান মেয়েদের ইজ্জত তারা লুটে নিচ্ছে। আমি জানতে চাইলাম, কোন কাগজে বেরিয়েছে এ খবরটি? সে বললো, যারা ওখান থেকে হাত, পা, নাক, কান, চোখ হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছে, তারা বলেছে। তারা স্বচক্ষে দেখে এসেছে। আর প্রশ্ন করা ঠিক হবে না বলে চুপ করে রইলাম। সে বলে, শুনেছি ওখানকার জবান (ভাষা) হিন্দুদের জবান। মুসলমানদের নিজের ভাষা উর্দু তারা বলতেই জানে না। সেখানে মুসলমানেরা মাছলি খায়, গোস্ত খায় না। ভাত খায়, রুটি খায় না। ওরা হিন্দুদের মত চলে। 

সে আরো বলতো, চিন্তা করবেন না, আল্লাহ্ মুসলমানদের জিতিয়ে দেবেন। এদেশ পাক দেশ, পবিত্র দেশ। এখানে বোমা ফেললে, সব বোমা সাদা পোশাক পরিহিত ফেরেশতারা লুফে নেয়। বুজুর্গ লোকেরা এসব দেখতে পান। আমাদের কোন চিন্তা নেই, আখেরি ফাতাহ্ আমাদের হবে। শেষ বিজয় আমাদেরই হবে। এটাই আল্লাহ্-র ইচ্ছা। 

দৃঢ় অন্ধবিশ্বাস নিয়ে সেদেশের আপামর জনগণ সময় কাটাচ্ছিল। যেদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হলো আমি সে খবর পেয়েছিলাম রেডিও মারফত্। কিন্তু লাহোর খানকে সে কথা বলার সাহস হলো না। ভয়ে বক্ষ আমার দুরু দুরু। এই লাহোর খানই হয়ত ক্ষেপে গিয়ে এক্ষুণি আমাকে আমার বাচ্চাসহ কেটে ফেলবে। পাঠানদের রাগ সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মত।

১৭ই ডিসেম্বর কয়েকজন তরুণ অফিসার ক্যাপ্টেন জহির, ক্যাপ্টেন আলম, আরেকজন আমাদের ঘরে এসে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হলো। তারা লাফিয়ে লাফিয়ে ঘরের ছাদ স্পর্শ করতে লাগলো। বললো, মিষ্টি খাবো ভাবী, মিষ্টি তৈরী করেন। তাদের আনন্দ দেখে আমি আবেগ আপ্লুত  হয়ে পড়লাম। আমি বললাম, আপনারা এবার থামেন; কেউ এই আনন্দ-শব্দ শুনতে পেলে বিপদ  হতে পারে। তারা অনেক আনন্দ  করে, অনেক কথা বলে চলে গেলেন। আমার মনে মনে একটু ভয় করতে লাগলো। পাকিস্তানীরা এবার বাঙ্গালীদের উপর হয়ত প্রতিশোধ নেবে। 

দুপুরের দিকে লাহোর খান এলো। এসেই বললো, জানেন কি হয়েছে মাশরেকি (পূর্ব) পাকিস্তানে? বললাম, জানি, খবরের কাগজে লিখেছে। সে খুবই উত্তেজিত। বললো, আপনি বিশ্বাস করেন? এসব কথা? আমি বললাম, না, হতেই পারেনা। 

সে ভীষণ মর্মাহত এবং রাগান্বিত। আমি চেহারা যত করুণ করা যায় ততই করুণ হয়ে রইলাম। সে অনেক কথা বলতে লাগলো। .......পাকিস্তানী ফৌজ কাফিরদের কাছে হেরে গেল.....? 

বললাম, অপেক্ষা কর। আরও খবর হয়ত আগামীকাল পাওয়া যাবে। 

সে বললো, ‘নেহিজী, আওর কেয়া খবর? এ খবর ছাহি হ্যায়’ বলে হাত তালি দিয়ে দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে থাকলো - ‘কেয়া হো গিয়া! কেয়া হো গিয়া!’ 

সে দেশে ধীরলয়ে হাত তালি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। মৃত্যু শোকে বা অন্য কোন গভীর বিপদের সংবাদে তারা হাতে হাতে করঘাত করে হৃদয়ের বেদনা ভার লাঘব করার প্রয়াস পায়। লাহোর খান বড় মর্মান্তিকভাবে আহাজারি করতে লাগলো, আমাদের ভাষায় যাকে বিলাপ করা বলে। তার খাওয়া বন্ধ হল, চা খেতে ভালবাসে, তাও বন্ধ হল। যেন তার বাড়ি শুদ্ধ লোকের অপাঘাতে মৃত্যু হয়েছে। 

একজন সাধারণ সৈনিক, একজন মানুষ নিজের দেশকে কত ভালবাসে! এই দেখে আমি স্তম্ভিত হলাম। মনে মনে আমি ভেবেছিলাম, লাহোর খান ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করবে। বাস্তবে হলো বিপরীত। একটু সাহস সঞ্চয় করে বললাম, খানা খাও। ভগ্ন স্বরে বললো, দেশ যেখানে ভেঙ্গে গেছে, সেখানে জীবন বাঁচিয়ে রেখে আর কি লাভ? সেদিন সে আর কোন কাজে হাত দিল না। খাবারও খেলনা। চলে গেল ব্যারাকে। 

আমার মনে একটি প্রশ্নের উদয় হলো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, যে ইয়াহিয়া খান বা ভুট্টো সাহেব কিংবা পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের, দেশের জন্য এই রকম মমত্ব বোধ নেই - যে মমত্ববোধ যে দেশপ্রেম একজন সৈনিক কিংবা একজন সাধারণ নাগরিকের মধ্যে আছে। যুগে যুগে, দেশে দেশে এই সব তথাকথিত নেতারা সভ্যতার পতন ঘটাচ্ছে এবং মানুষের প্রাণ ও সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে। 

পরদিন লাহোর খান এলো। বড় বিষন্ন! কোয়েটা স্টোভ ধরাচ্ছিল। কয়লা দিয়ে আগুনের তেজ বাড়াবার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ করে সে বলতে শুরু করলো,  ‘আব্ আপ কেয়া কারেঙ্গে?’ (এখন আপনি কি করবেন)? কাঁহা জায়েঙ্গে?’  

বিব্রত বোধ করলাম আমি। সতর্ক উত্তর দিলাম। বললাম, ‘ইঁহাই রাহেঙ্গে।’ 

উৎসাহের সঙ্গে সে বললো, ‘আপ মাৎ যাইয়ে ওধার। ওঁহা সব খতম হো গিয়া। হিন্দুও নে সব্ কব্জা কার লিয়া। ওঁহা আপকা কেয়া হ্যায়?’ 

বললাম, ‘কুছ নেহি।’ 


সে বললো, ‘আপ পাকিস্তান মে রাহে। ম্যায় আপকো জমিন দেঙ্গে। হামারা গাঁও মে বহুত জমিন হ্যায়। আপ হামারা গাঁওমে রাহেঙ্গে। পাঠান জো কওম হ্যায়, ও বহুত কমিন হ্যায়। ও আপকো বাঙ্গাল মে নেহি যানে দেঙ্গে।’ 

আমি একটু ভীত হলাম। লোকটা কি বলতে চায়? পরে বললাম, ‘হাম নেহি যায়েঙ্গে। ইঁহা মেরা ভাইকা পিন্ডিমে মাকান হ্যায়, করাচীকা ক্লিফটন বীচমে জামিন হ্যায়। হাম ইস্ মুলক্মে রাহেঙ্গে। তুম ফিকির মাৎ কারো।’ 

লাহোর খান আরো বললো, ‘যব সাহাব জংছে ঘর ওয়াপাস আয়েঙ্গে তব ম্যায় উনকো সামঝায়েঙ্গে।’ 

আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি শত্রু কবল থেকে মুক্তি লাভ করার কিছুকাল আগে একদিন এক পাঞ্জাবী অফিসার আমাদের দরজায় করাঘাত করে। ভাবলাম হয়তবা কোন হয়রানী করবার পরোয়ানা নিয়ে এসেছে। অর্গল খুলে জানতে চাইলাম, তিনি কি উদ্দেশ্যে এসেছেন। তিনি জানতে চাইলেন, ‘ডক্টর সাহাব ঘর মে হ্যায়?’ হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলাম। তিনি আগেই হয়ত জানতে পেরেছেন যে ইনি মেডিকেল কোরের অফিসার। হারুন সাহেবকে আগন্তুকের আগমন বার্তা পৌঁছে দিলাম। স্বাভাবিক অভিবাদন বিনিময়ের পর তিনি বললেন, তিনি গতকালই পূর্ব পাকিস্তান হতে ফিরেছেন। ওখানকার পুরো পরিস্থিতি তার অবগত। তিনি অনেক কথা বললেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাংলাদেশে তিনি পাকিস্তানীদের যুদ্ধ দেখেছেন, অত্যাচার দেখেছেন। অন্যদিকে তিনি বাঙ্গালীদের সাহস, এবং রুখে দাঁড়াবার কৌশল দেখেছেন। ‘সেখানে ভয়ঙ্কর এক শ্বাস রুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে আপনাদের বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। এ যুদ্ধ অন্যায় যুদ্ধ! এ যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল না। বাঙ্গালীরা জয়ী হবে। আমি এখানে এসেই শুনেছি যে এই মেসে একটি বাঙ্গালী পরিবার আছে। তাই দেখা করতে এসেছি । এই কথাগুলো বলার জন্য। একটি কথা স্মরণ রাখবেন এবং অন্যদেরকে বলবেন যে, সব পাকিস্তানী খারাপ লোক নয়। পাকিস্তানেও বিবেকবান, হৃদয়বান লোক আছেন, যারা এ যুদ্ধ চায় না, নিষ্ঠুরতা  চায় না। এই আমার অনুরোধ আপনার কাছে।'

উপসংহার

বাংলার দামাল ছেলেদের এক কঠিন, প্রাণপণ রক্তক্ষয়ী লড়াই- এ এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই সংগ্রামের প্রত্যক্ষদর্শীরা এখনো জীবিত আছেন। মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, তাদের প্রতি আমার অন্তরের অন্তঃস্থল হতে উৎসারিত অকুন্ঠ ভালোবাসা, মমতা ও শ্রদ্ধা বয়ে যাবে নিরন্তর। তাঁদের কাছে আমাদের ঋণ জন্ম জন্মান্তরেও শোধ হবে না। প্রতিজন মুক্তিসংগ্রামী অমর হোক। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। বাঙ্গালীর জয়রথ শান্তির পথে, সমৃদ্ধির পথে, বিশ্বের রাজপথে এগিয়ে চলুক।

...........

Wednesday, March 24, 1971

৭১ এর কালরাত্রি


১৯৭১ সাল। পাকিস্তানের রাজনৈতিক আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা। কারণ নির্বাচনে এ্যাবসোলিউট মেজরিটি পেয়েও শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ, সরকার গঠন করতে পারছে না l কারণ সরকার গঠনে দেশের দুই অংশের সহযোগীতা প্রয়োজন l ওদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা ভুট্টো ঘোষণা করেছেন যে, যে এম পি ঢাকায় সংসদ অধিবেশনে যোগদান করতে যাবে তার পা ভেঙ্গে দেয়া হবে l

পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তখন খুবই অস্থির, উত্তেজিত l ভুট্টো, জেনারেল ইয়াহিয়া খানের বৈঠক চলছে শেখ মুজিবের সঙ্গে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল – বর্তমানের শেরাটনে l এ বৈঠক ছিল নিছক প্রহসন l বৈঠকের নাম করে পাকিস্তানের ধূর্তরা কালক্ষেপণ করছিল মাত্র l ঐ ‘সময়’ টুকু তাদের প্রয়োজন ছিল। কারণ সেই সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে বিপুল সংখ্যক অস্ত্র পাকিস্তান থেকে আনা হয়। বন্দরের বাঙ্গালী কর্মচারীরা এতো বিশাল পরিমাণ মারাণাস্ত্র প্রত্যক্ষ করে চমকে ওঠে। তাদের বুঝতে বাকী থাকে না যে, এগুলো বাঙ্গালীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। তারা জাহাজ থেকে মাল খালাস করতে অস্বীকৃতি জানায়। তাই পাকিস্তান সরকার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বাঙ্গালীদের সরিয়ে নিয়ে পাঞ্জাবী খালাসী নিয়োগ করে।

যাত্রীর ছদ্মবেশে লক্ষ লক্ষ পাঞ্জাবী সেনায় দেশ ছেয়ে যায়। এদিকে সাধারণ জনগণের আশা মুজিব-ভুট্টো বৈঠকে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু শেখ মুজিব বুঝেছিলেন এই দরবার বাস্তবে কোন ফল বয়ে আনবে না। তাই তিনি দেশের জনগনকে ডাক দিলেন। বললেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম – এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

বাংলাদেশের পরিস্থিতি তখন উত্তাল। এরকম সময় ভুট্টো, ইয়াহিয়া রাতের অন্ধকারে ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে যান করাচীতে আর হুকুম দিয়ে যান কুখ্যাত এক জেনারেল, টিক্কা খানকে। টিক্কা খান ছিলেন অতি নিচাশয় নিষ্ঠুর প্রকৃতির ব্যক্তি। ‘বাঙাল’দেরকে খতম করে দেয়ার সনদ লাভ করে টিক্কা খান খুব খুশী। টিক্কা খান সৈন্যদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিল, ‘হামে জামিন চাহিয়ে-ইনসান নেহি।’ বাঙ্গালীদের বাংলা বলার সাধ মিটিয়ে দাও। পাঞ্জাবী এনে বাংলা মুলুকে মানুষের আবাদ করব। উন্মত্ত সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়লো ঢাকা নগরীর ঘুমন্ত মানুষদের উপর। সেদিন ছিল ২৫ শে মার্চের কালরাত্রি ১৯৭১.

ঢাকায় শোনা গেল গুরুগম্ভীর যন্ত্র নিনাদ।

ঢাকাবাসী কাঁচা ঘুম থেকে জেগে উঠলো। মনে করলো ঝড় আসছে , আসছে প্রচন্ড বৃষ্টি। হ্যা, বৃষ্টি হলো ঠিকই, তবে তা কোন কালো মেঘ হতে ঠান্ডা জলকণা নয়। তা ছিল ট্যাংকের ব্যারেল হতে নিক্ষিপ্ত জীবন হরণকারী উত্তপ্ত গোলা। ঘুম ভাঙ্গা মানুষেরা জানতেও পারলো না যে, তাদের মরণ ঘনিয়ে এসেছে। নিরাপরাধ, নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে হত্যা করতে অস্ত্র চালকদের কোন দ্বিধাই থাকলো না। এই নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতশত তাজা প্রাণ ঝরে পড়লো। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে বাঙ্গালীদের নির্মম ভাবে হত্যা করা হলো। মানুষ মেরে খড়ির বোঝার মতন রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্তুপ করে রাখা হলো।

আমরা তখন কোয়েটায় — বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী। ভুট্টো, মুজিবের বৈঠকের ফলাফল শোনার জন্য উৎকর্ণ। পাকিস্তানী প্রচার মাধ্যমের ওপর কোন আস্থা ছিল না আমাদের। বিদেশী রেডিও শোনা ছিল খুবই বিপদজনক। গভীর রাত্রে বিদেশী প্রচার মাধ্যমে ইয়াহিয়া, ভুট্টোর ঢাকা ত্যাগের সংবাদ পেয়ে দারুণ ভাবে উদ্বিগ্ন হই। বিনিদ্র রজনী আর শেষ হতে চায় না। ভোর রাত্রে অল ইন্ডিয়া রেডিওর একটি স্টেশান পাই। রেডিও প্রচার করছে, ‘পূর্বি বাঙ্গাল মে ভারী জান–ই নুকসান হো রাহা হ্যায়।’

সংবাদ শুনে শিউরে উঠলাম। বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু জেনোসাইটের সংবাদ তো আর মিথ্যা হতে পারে না। গভীর দুঃখে পতিত হলাম। একটু পরেই ভোর হলো। দোর খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। চারিদিক শান্ত, সুনসান। রুটিওয়ালা রুটি, দুধওয়ালা দুধ, কাগজওয়ালা পত্রিকা দিয়ে গেল। রেডিওর খবর শুনে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত আমরা। বহির্বিশ্বে পাকিস্তান প্রচার করলো এটা তাদের আভ্যন্তরীন ব্যাপার। কিছু বিদ্রোহী বাঙ্গালীকে শায়েস্তা করবার জন্য তাদেরকে এ পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। এসব লোকদেরকে শেখ মুজিব নষ্ট করে ফেলেছে। শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী করা হয়েছে।

কিন্তু পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী জানতো না যে, অত্যাচার যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, নির্যাতিতের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে, তখন কোন না কোন শেখ মুজিবের জন্ম হবেই হবে। কারার ওই লৌহ কপাট ভেঙ্গে মুক্তির মশাল জ্বালাবে সেই মুজিব। মুজিবের বাণী প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে।

“এরপর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমাদের অনুরোধ রইলো, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। রক্ত যখন দিতে শিখেছি, রক্ত আরো দিব – এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম – এবারের সংগ্রাম – – স্বাধীনতার সংগ্রাম। ”

সেই হাতখানি

  এপ্রিলের মাঝামাঝি এক সোনালী সন্ধ্যায় আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সের এক বিমানে চড়ে মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বহুদিন মনে ছিল আশা যদি মক্কা ...